#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_১৯
#জান্নাত_সুলতানা
কিছুদিন আগে সানায়ার টেস্ট এক্সামের রেজাল্ট দিয়েছে। ভালোই এসেছে রেজাল্ট। এভারেজ বলা যায়। কিন্তু আরোরা জাহান এতে সন্তুষ্ট নয়, এনিয়ে মেয়ে কে খুবই বকাঝকা করেছে। কিন্তু সানায়া মায়ের বকাঝকা কানে তুলে না৷ সে এখন পড়ার আগ্রহ পাচ্ছে কি-না জানা নেই। কিন্তু নির্ভাণ ভাইয়ের আশেপাশে থাকতে তার ভালো লাগে। এই যেমন সে আজ ডাক না পেয়েও নির্ভাণ ভাইয়ের রুমে চলে এসছে। নির্ভাণ নিজের ফাইনাল ইয়ারের এক্সাম দিচ্ছে। তাই আজ পরীক্ষা শেষ বাড়ি ফিরে ক্লান্ত থাকায় ঘুমিয়ে পড়েছে। সানায়া রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে গুটিগুটি পায়ে প্রায় কক্ষের ভেতরে ঢুকে গেলো। দুরুদুরু বুক তাকে বারবার নার্ভাস করছে৷ শরীর কাঁপছে অসাবধানতার ফলে দরজার পাশে থাকা একটা শোপিস হাত লেগে মেঝেতে পরে ঝনঝন শব্দ করে ভেঙে চারপাশে ছড়িয়ে গেলো। নির্ভাণের ঘুম খুবই পাতলা। কানের পাশে মশা ডাকলেও তার ঘুম ভেঙে যায়। আর এতো জোরে শব্দ হয়েছে তার তন্দ্রা ছুটবে না এটা ভাবা বোকামি যে।
ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সানায়া। নির্ভাণ ভাই তাকে ধমকেই নিশ্চয়ই আজ বেহুঁশ করে ফেলবে। পেছনে দৌড় দেওয়ার পায়তারা করতেই নির্ভাণ বলে উঠলো, “আস্তে। লেগে যাবে। ইশ!”
নির্ভাণ চোখ মুখ কুঁচকে বন্ধ করে নেয়। সাথে সাথে মেয়ে টার মুখ থেকে ব্যাথাতুর শব্দ ভেসে আসে। নির্ভাণ দ্রুত বিছানা ছাড়লো। গায়ে একটা ট্রাউজার মাত্র। সেদিকে আপাতত খেয়াল নেই যুবকের। সানায়া ফ্লোরে বসে পা চেপে ধরে। নির্ভাণ সাবধানে ভাঙা কাচ ডিঙিয়ে এসে ওকে পাঁজা কোলে করে নিলো। সানায়া ব্যাথার চেয়ে অবাক বেশি হলো। ভয়া গিয়ে লজ্জা সীমানা ছাড়িয়ে গেলো। শরীর কেমন অবস মনে হলো। এরমধ্যে নির্ভাণ ওকে বিছানায় রাখলো। ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে ফার্স্টএইড বক্স বের করলো। কাচ নেই ক্ষতস্থানে। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সে ঔষধ লাগাল সেখানে। এই মেয়ে কবে বড়ো হবে? এমন সব অঘটন ঘটাবে যা কল্পনাও করা যায় না।
সানায়া এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মানুষ টার এলোমেলো চুলের দিকে। হঠাৎ নজর পড়ে নির্ভাণের উদোম গায়ে। কাঁধের একটু নিচে পিঠে একটা কালো তিল ও আছে। সানায়া খুব মনোযোগ দিয়ে এসব খুঁজতে গিয়ে অনুভব করলো মূহুর্তেই তার গাল গরম হয়ে এসছে। লজ্জা পাচ্ছে সে? কী ভয়ংকর অবস্থা। ভেবেই ঠোঁট চেপে ধরে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। এরমধ্যে হঠাৎ নির্ভাণ মাথা তুলে ওর মুখপানে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কেনো এসছি আমার ঘরে?”
সানায়া কিছু জবাব দেওয়ার আগেই নির্ভাণ ফ্লোরে থাকা বই গুলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। বললো, “বোস এখানে। আমি এগুলো পরিষ্কার করে আসছি।”
“কাজল আন্টিকে ডেকে দিলে তিনি করবে।”
সানায়া সংকোচ নিয়ে মিনমিন করে বলে উঠলো। নির্ভাণ প্রতিত্তোরে কিছু বললো না। একটা টি-শার্ট গায়ে জড়িয়ে নিজেই কাজে লেগে গেলো। বড়ো কাচের টুকরো গুলো হাতে তুললো। আর খুব ছোট গুলো একটা স্কচটেপ দিয়ে তুলে নিলো। সানায়া স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নির্ভাণের দিকে। নির্ভাণ যতক্ষণে কাজ শেষ করে ফিরে এলো ততক্ষণে সানায়া ঘুমিয়ে পড়েছে। নির্ভাণ তপ্ত শ্বাস ফেললো। পা গুলো ঝুলে আছে ওর। নির্ভাণ পা গুলো বিছানায় তুলে দিয়ে দ্রুত গেলো সেহেরের রুমে। সেহের রুমে ছিলো না। তার রুম জুড়ে অজস্র খেলনার বদলে এলোমেলো ছিলো রংতুলি বিভিন্ন রংয়ের স্কেচ, টয়, মানুষের চোখ আঁকা এবং কাল্পনিক পরিবেশ। নির্ভাণ রংতুলি এবং আরও কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে ফিরে এলো নিজের রুমে।
—–
সানায়ার যখন ঘুম ভাঙলো তখন সে রুমে কোথাও নির্ভাণকে দেখতে পেলো না। ভয়ে সে নিজেই গুটিয়ে গেলো। সে নিজের কাজিন ভাইয়ের রুমে ঘুমিয়েছে? তা-ও আবার একজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক যুবকের রুমে। কেউ দেখলে কী বলবে? হন্তদন্ত হয়ে বিছানা ছাড়লো। ভয়ে কলজের পানি শুঁকিয়ে আসে। এদিক-ওদিক দৃষ্টি বুলিয়ে দেখে বেরিয়ে এলো তটস্থ ভঙ্গিতে।
“নির্ভাণ কে দেখেছিস সানা? কখনো থেকে দেখছিনা।”
হঠাৎ তন্বী রহমানের কণ্ঠ পেয়ে চমকে উঠলো সানায়া। ঘুরে দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করে বললো, “আমি পড়তে এসে ঘ,,” সানায়ার কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই পেছন থেকে ভারিক্কি সুর ভেসে এলো,
“আমি স্টাডি রুমে ছিলাম আম্মু।” একটু থেমে সানায়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, “তুই পড়তে এসছি? হুম? বোস গিয়ে আমি আসছি।” সানায়ার মাথামুন্ডু কিছুই কাজ করছে না। কী সহজেই ব্যাপার টা সামলে নিলেন তিনি! সানায়া হতভম্ব হয়ে আবারও রুমে ফিরে গেলো। তার পাঁচ সাত মিনিট পরেই নির্ভাণ এলো। সব সময়ের মতো সানায়া ফ্লোরে বসেছে। নির্ভাণ গম্ভীর স্বরে পেছন থেকে বলে উঠলো,
“সোফায় বোস।”
“আপনার পাশে?” সানায়া অবাক হয়ে শুধালো। নির্ভাণ থতমত খেলো। আশ্চর্য এটা ছাড়া আর কোথায় বসবে এখানে? গর্দভ একটা। নির্ভাণ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে থমথমে স্বরে বলে,
“তো আর কোথায়? সোফাতেই।” সানায়ার চোখ দু’টো যেনো একটু চকচক করে উঠলো। তেমন হৃৎস্পন্দন ও বেড়ে গেলো। দুরুদুরু বুক নিয়ে সে একবার সাহস করলো মানুষ টার পাশে বসার। যদিও সে সেদিনও এই মানুষ টার পাশে বসে পুরো সাড়ে তিন ঘন্টা পথ অতিক্রম করেছে। তবুও লজ্জা সংকোচ যেনো আজ গলা চেপে ধরলো। সানায়া মাথা নত রেখে মিহি স্বরে জানাল, “এখানে ঠিক আছি আমি।”
অদ্ভুত! তার কেমন একটা সংমিশ্রণে অনুভূতির জন্ম হয়েছে ইদানীং।
নির্ভাণ ওর পায়ের দিকে এক ঝলক দেখে নিয়ে নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললো, “পায়ে এমনিতেই ইনজুরি তারউপর এভাবে বসে থাকলে পেইন হবে আরও। ওঠে বোস।”
সানায়া আর কিছু বলার মতো খুঁজে পেলো না। সত্যি বলতে এভাবে ফ্লোরে বসতে তার-ও বেশ ব্যাথা হচ্ছে আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে। আর এই মূহুর্তে নির্ভাণের বলা কথা টা যেনো ঔষধের মতোই কাজ করলো। মানুষ টা তাকে নিয়ে একটু ভাবছে৷ বেশি না হোক। একটুই এই মূহুর্তে যথেষ্ট তার জন্য। কিশোরী হৃদয়ে কিছু একটা অনুভব হয়। ধীরে ওঠে নির্ভাণের পাশ ঘেঁষে বসলো। সোফাটা ডাবল হলে-ও সানায়া ইচ্ছে করে একটু চেপে বসলো নির্ভাণের দিকে। নির্ভাণ অপ্রস্তুত না-কি স্বাভাবিক চেহারায় তা প্রকাশ পেলো না। তবে সানায়ার বেশ লাগে এই যুবককে বিরক্ত করতে।
নির্ভাণ ওকে খুব দ্রুত একটা ম্যাথ বুঝিয়ে অন্য নিয়মে আরও একটা ওকে করতে দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে নিজের ফোন টা নিয়ে ব্যালকনিতে ছুটে গেলো।
সানায়া কিছু বুঝলো না। সে ম্যাথ টা আজো সল্ভ করতে পারছে না। যতবার যত নিয়মেই করছে ততবারই একটি করে নতুন উত্তর বের হচ্ছে। এক পর্যায়ে সে ভাবুক হলো। তবে কী সত্যি নির্ভাণ ভাইয়ের কথা অনুযায়ী, সে নতুন ম্যাথ থিওরি আবিষ্কারের জনক হতে যাচ্ছে!
#চলবে…..
[এতোদিন অপেক্ষা করানোর জন্য আমি অত্যান্ত দুঃখিত পাঠক। ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন প্লিজ।]
