#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_২০
#জান্নাত_সুলতানা
“এলোয়েনা মেয়ে টা আজো তোর দিকে তাকিয়ে আছে ভাই।”
নির্ভাণ ইকবালের কথা শুনেও যেনো শুনলো না। সে নিজের মতো করে কিছু একটা কাজ করে যাচ্ছে। ইকবাল দীর্ঘ শ্বাস ফেললো, তাদের ডিপার্টমেন্টের অবশ্যই শুধু তাদের ডিপার্টমেন্ট বললে ভুল হবে পুরো ভার্সিটিতে ও যদি সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েদের লিস্ট করা হয় তবে ওই এলোয়েনা নামের মেয়ে টা ফার্স্ট হবে। অথচ নির্ভাণ মেয়ে টার দিকে কখনো দুই সেকেন্ডের জন্য ও এক নজর তাকিয়ে দেখেছে কি-না সন্দেহ। মেয়ে টার মা ইতালিয়ান। বাবা বাঙালি। মা বাবা দুজনেই দেখতে নজরকাঁড়া, এইজন্যই বোধহয় মেয়ে টাও দেখতে এমন সুন্দর। বেশ কয়েকবার করে সে চিঠিও লিখেছে নির্ভাণ কে। নির্ভাণ অন্য সকল সোস্যাল মিডিয়ার একাউন্ট থেকে ব্লক করে রেখেছে মেয়ে টাকে। তবুও মেয়ে টা এখনো চুপচাপ নির্ভাণের পেছনে পড়ে আছে।
ইকবাল তিয়ান দুজনেই বন্ধুর দিকে তাকিয়ে। নির্ভাণ নিজের নোট গুলো তিয়ানের থেকে নিয়ে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে ইকবাল কে উদ্দেশ্য করে বললো, “তুইও তাকিয়ে থাক৷ তোকে কেউ বাঁধা দিবে না।”
নির্ভাণ চলে গেলে ওরা দুজনেই তপ্ত শ্বাস ফেললো। কোনো কিছুই এক্সেপ্ট করতে রাজি না এই ছেলে। না নিজের অনুভূতি আর না তার প্রতি থাকা কারোর অনুভূতি। ইকবালের ফোনে এরমধ্যে কল এলো। সে নাম্বার দেখে লাজুক হাসল। তিয়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এক ঝলক দেখে নিজেও নির্ভাণের পেছনে গেলো।
——
❝মানুষ কারোর প্রেমে পড়লে ঠিক কীভাবে বোঝে, আমি জানি না। হয়তো এই না-জানাটাই প্রেমে পড়ার সবচেয়ে বড় লক্ষণ। আমি নিজেও বুঝে উঠতে পারছি না। আমি কী কোনো এক গম্ভীর মানুষের প্রেমে পড়ে গেছি? শুধু এটুকু জানি, একজন সুদর্শন যুবক হওয়ার জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সবটুকুই যেন নিখুঁতভাবে ওনার মধ্যে মিশে আছে। চোখ দু’টি সামান্য ছোট। কিন্তু সেই ছোট চোখেই এমন এক গভীরতা যেনো তাকালেই কেউ ডুবে যেতে পারে সেই চোখের মায়ায়। চাপ দাড়ির ফাঁকে লুকিয়ে থাকা ওষ্ঠদ্বয় অদ্ভুতভাবে দেখতে চমৎকার। কথা না বললেও যেন কিছু বলে যায়। মাথাভরা চুল, যার কয়েকটি গোছা অবাধ্য হয়ে সারাক্ষণ কপাল ছুঁয়ে থাকে। তিনি কি জানেন, এই সামান্য চুল কপালে এসে পড়লেই তাকে কতটা ভয়ংকর সুন্দর লাগে?
আমার মাঝে মাঝেই রাগ হয়। কেন রাগ হয়, সেটাও পরিষ্কার বুঝি না। হয়তো এই কারণেই। তিনি এত সুন্দর হতে কে বলেছিল? এই সৌন্দর্য যে অযথাই কারোর মনে অদ্ভুত এক আলোড়ন তোলে। অযথাই কাউকে ভাবিয়ে রাখে। অযথাই বুকের ভেতর নাম না জানা একটা অনুভূতির জন্ম দেয়। সেটা কি তিনি জানেন?❞
এতটুকু পড়ে শেষ করতেই সানায়া ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো। ওর সব ফ্রেন্ডরা সতর্ক হলো। একে-অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে। রিক্তা সন্দিহান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“তুই প্রেমে পড়েছিস সানা?”
সানায়া চমকাল। নিজের ডায়েরি টা খপ করে রিক্তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে তড়িঘড়ি করে ব্যাগের চেইন খুলে ভেতরে রাখতে রাখতে কিছু টা রাগান্বিত স্বরে বলে উঠলো, “এটা কিন্তু ঠিক না। কারোর প্রাইভেসি এভাবে,,,, ” সানায়ার কথা সম্পূর্ণ করার আগেই তায়েবা সুর টেনে বললো, “ওলে বাবালে। আমাদের সানা পাখির আবার প্রাইভেসি ও আছে! আমরা জানতাম না। খুবই দুঃখিত আমরা।” এটুকু বলে থেমে আবারও ধমকের গলায় বলে উঠলো, “নাটক কম করো পিও। বল, ডায়েরির ওই ব্যাটাছেলে কে?” ভ্রু উঁচিয়ে সানায়ার দিকে তখন সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে। তবে ওদের মধ্যে সব সময় চুপচাপ থাকা কেয়া শান্ত চোখে চেয়ে বলতে লাগল,”ডায়েরিতে ছেলের বর্ণনা শুনে তো প্রথমেই আমার মাথায় এসছে নির্ভাণ ভাইয়ের কথা। আমি যদি খুব ভুল না এটা শিওর নির্ভাণ ভাই।”
“চুপ কর প্লিজ।” কেয়ার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সানায়া ফিসফিস করে অনুরোধ করলো। চোখ-মুখে লজ্জা যেমন তেমন একটা অস্বস্তি, ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। সবাই বিস্মিত তবে ভ্রু কুটি করে তাকিয়ে ওর মুখপানে। তায়েবা তো অবাক হয়ে বলে উঠলো,
“তুই না একদম অপছন্দ করতি নির্ভাণ ভাই কে?” কোনো জবাব দেয় না সানায়া। নিশ্চুপ সে ভাবতে থাকে। এমন টা তার দ্বারা কিভাবে হয়েছে সে নিজেও ভেবে কুল-কিনারাহীণ। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে জবাব দিলো,
“জানি না। এখন কী হয়েছে আমার।”
“আগুন আর কেরোসিন পাশাপাশি থাকলে এমনই হবে। ইট’স সিম্পল।” রিক্তা কাঁধ উঁচিয়ে বলে। সানায়ার চোখ পিটপিট করে। তায়েবা বলে,
“আচ্ছা ওনার অনুভূতি না জানা পর্যন্ত এমনভাবেই ব্যবহার কর ঠিক যেমন টা আগে করতি।”
সানায়া কিছু বলে না আর। কিছু দিন বাদেই পরীক্ষা। সেইজন্যই আজ শেষবারের মতো পরীক্ষার আগে একদিন আড্ডা দিতে এসছে। তবে এসে ভালোই হয়েছে। নিজের অনুভূতি সম্পর্ক সে নিশ্চিত হতে পেরেছে।
—–
নিজের অনুভূতি নিয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর-ই যেনো সানায়ার অস্বস্তি লজ্জা আরও কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। আজ নির্ভাণ কে দেখেই কেমন লজ্জায় গাল দুটো গরম হয়ে এসছে। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। খাবার টেবিলে নির্ভাণের পাশের চেয়ারে বসেছে ও। তন্বী রহমান ওকে মাছের কাটা ছাড়িয়ে দিয়েছে। তবুও ভুলবশত একটা ছোট কাটা হয়তো রয়ে গিয়ে ছিলো। আর সেটাই কাল হয়ে সানায়ার গলায় আঁটকে গেলো। সানায়ার ভয়ে মূহুর্তেই চোখ-মুখ আতংকিত হয়ে এলো। পানি খেয়ে চুপচাপ বসে থেকে যখন কোনো লাভ হলো না। তখনই কেঁদে ফেললো শব্দ করে। সবাই চমকে গিয়ে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ওর দিকে। নির্ভাণ ওর আচমকাই কান্নার কারণ খুঁজে পায়না। অপ্রস্তুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ওর দিকে। জিজ্ঞেস করলো,
“কী হয়েছে? এমন করছিস কেনো?” সানায়া তৎক্ষনাৎ হেঁচকি তুলে কাঁদছে। আরোরা মেয়ের কান্না শুনে বিরক্ত হয়ে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এলো। সবাই তখন সানায়া কে নিয়ে উদ্বিগ্ন। বোনকে ধমকে নিজাম সিদ্দিকী ভাগ্নিকে আদুরে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো, “কী হয়েছে মামুনি? বলবে তো। না বললে বুঝবো কী করে?” ওনার আদুরে বাক্যে কিছু টা শান্ত হয়ে সানায়া জবাব দিলো,
“মা-মামা মনে হয় কাটা আঁটকেছে গলায়।”
তৎক্ষনাৎ আরোরা আরও চেঁচামেচি করে মেয়ে কে বকাঝকা শুরু করলো। এতো বড়ো দামড়ি মেয়ে এখনো মাছের কাটা ছাড়িয়ে খেতে পারে না আবার গলায় কাটা আঁটকে বসে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছে। ওনার বকাঝকায় সানায়া থম মেরে গেলো। চুপচাপ বসে থেকে আস্তে আস্তে ঢোক গিলে। এরমধ্যে সবাই আরোরা জাহান কে উলটো বকাঝকা করে বিদায় করে দিয়েছে এখান থেকে।
“এখনো মাছের কাটা ছাড়ানো ও শিখতে পারলি না। আর প্রেমে পড়ে যাওয়ার মতো কঠিন একটা কাজ ঠিকই করে ফেলেছিস।”
আফির ফিসফিস সুর সানায়ার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেলো। ঢেকুর তুলে তার কয়েক সেকেন্ড পরই অনুভব করলো কাটা টা বিদায় হয়েছে গলা থেকে। সে খুশিমনে সবাই কে খবর টা দিয়ে খেতে লাগলো আবারও। নির্ভাণ আর খেতে পারেনি। সে হাত ধুয়ে ওঠে গেলো। কিন্তু কেনে পারেনি সে নিজেও বুঝতে পারছে না।
—–
“গতকাল রাতে যখন ও মাছের কাটা আঁটকে যাওয়া নিয়ে কাঁদছিল আমি জানি না কেনো আমার নিজের অজান্তেই হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল।”
চায়ের কাপে মাত্রই চুমুক দিতে যাচ্ছিল ইকবাল। তৎক্ষনাৎ নির্ভাণের উপরোক্ত কথাগুলো শুনে চা তালুতে ওঠে গেলো। সে নিজেকে কোনো রকম সামলে কাশতে কাশতে বলে উঠলো,
“এবার অন্তত মেনে নে তুইও ওকে ভালোবাসিস।”
“শাট আপ ইকবাল।” এটাই হয়তো নির্ভাণের বলা উচিৎ ছিলো। কিন্তু সে আজ ধমক দিতে পারলো না। চায়ে ধীরে ধীরে চুমুক দিলো। তিয়ান মজার ছলে বলে উঠলো, “আর তুই যদি ওকে পছন্দ না করিস। তাহলে আমি একবার ট্রাই করবো।”
নির্ভাণের রাগ হঠাৎ যেনো আকাশ ছুঁয়ে গেলো। চোখ দু’টো রক্তজবার ন্যায় হয়ে উঠলো। শিরা-উপশিরায় টান পড়েছে যেনো। চোয়াল কঠিন। রাগান্বিত কঠিন স্বরে ডেকে উঠলো, “তিয়াইনার বাচ্চা।” নির্ভাণ দাঁতে দাঁত চেপে ধরলো। তিয়ান চায়ের কাপে শেষ চুমুক টা আর দিতে পারলো না। ভয়ে লাফিয়ে উঠলো।
“আরেহ বাপ্রে। পাগল খেপছে।” আরও একটা উস্কানীমূলক শব্দ ব্যবহার করার পড়ই তিয়ান বুঝতে পারলো সে ভুল করে ফেলেছে। আর তার প্রতিফলন স্বরূপ বিস্ফোরণ ঘটাল নির্ভাণ,
“তিয়য়য়ান।”
তিয়ান ইকবালের পেছনে। ইকবাল নাক-মুখ কুঁচকে বিরক্তিকর স্বরে বলে উঠলো, “তুইও না। পাগল কে কেউ পাগল বলে? আশ্চর্য।” ইকবালের কথা টা যেনো আগুন ঘি ঢালার মতোই কাজে দিলো। ইকবাল তিয়ান দুজনেই দৌড়ে পগারপার। নির্ভাণ থম মেরে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। সে পাগল? আশ্চর্য! সে কেনো পাগল হতে যাবে?
#চলবে…..
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
