#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_২১
#জান্নাত_সুলতানা
“আপনার কফি।” সানায়া রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে নির্ভাণ কে ডেকে বললো। নির্ভাণ নিজের স্টাডি রুম থেকে কিছু বই নিয়ে ফিরে সেগুলো টেবিলে গুছিয়ে রাখছিল। তাই খেয়াল করে না সানায়ার ডাক। সানায়া কিছু সময় অপেক্ষা করে অধৈর্য হলো। মানুষ টাকে একটু দেখার জন্য আধঘন্টা ঘুরঘুর করে কফি নিয়ে আসার একটা সুযোগ পেয়েছে। শুধুমাত্র এক ঝলক দেখার জন্য। আজকাল মনটা বড্ড বেহায়াপনা শুরু করেছে। যখন-তখন সানায়াকে সে বিরক্ত করছে নির্ভাণ ভাইয়ের একটু সান্নিধ্যে পাওয়ার।
“নির্ভাণ ভাই, আপনার কফি।” কণ্ঠে কিশোরীর অধৈর্য। নির্ভাণ এবার হকচকিয়ে দরজার দিকে তাকায় দরজার সামন্য ফাঁকা দিয়ে দেখা যাচ্ছে সানায়ার একটু খানি সাদা রঙের কুর্তি। নির্ভাণ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে উঠলো,
“হুম, আয়।”
“বড়ো মা কাজ করছে।” কফিটা নির্ভাণের সামনে রাখতেই নিচ্ছিল সানায়া। কিন্তু নির্ভাণ তার আগেই ওর হাত থেকে নিজে কফি নিয়ে নিলো। সানায়া কাচুমাচু করতে করতে বললো, “নির্ভাণ ভাই, আপনি প্রিয়ুকে যে কি-চেইন টা দিয়েছেন। ওটা অনেক সুন্দর।” নির্ভাণ কফিতে চুমুক দিতে দিতে কোণ চোখে তাকিয়ে ওর মলিন মুখের দিকে।
“পরীক্ষার জন্য আর কিছু লাগবে?”
নির্ভাণের থেকে একটু আস্কারা পেতেই সানায়ার মন খুশিতে দুলিয়ে উঠলো। দুই দিকে অনবরত মাথা নেড়ে জানাল, “ছোট মামা সব কিনে দিয়েছে।”
নির্ভাণ দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। প্রিয়মের কি-চেইন টা ব্যাগের সাথে ফ্রী ছিলো। এমন কি-চেইন পাওয়া মুশকিল। সে মনে মনে এটা ভেবেই বললো, “যা কাল নিয়ে আসব।”
সানায়া খুশিতে লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে যায়। নির্ভাণ পেছন থেকে গলা উঁচিয়ে সাবধান করে, “দৌড়বি না।ধীরে যা।” সানায়া শুনলো বোধহয়। তাই তো তো সাধারণ ভাবে হাঁটে। নির্ভাণও এবার তপ্ত শ্বাস ফেলে কফি হাতে ব্যালকনিতে চলে গেলো।
—–
নির্ভাণের পরীক্ষা একটু আগেই শেষ হয়েছে। রাতে আজ কোচিং-এ ক্লাস থাকলে-ও সে সেখানে যাবে না। তাদের তিন বন্ধুরই একটা কোচিং সেন্টার আছে। যদিও এটা নির্ভাণের। তবে ইকবাল তিয়ান ও সেখানে সময় দেয়। আজ নির্ভাণ সেখানে যাবে না শুনে দুইজনেই অবাক। তিয়ান ইকবাল পূর্বে কখনোই দেখেনি নির্ভাণ কে এই কোচিং সেন্টার নিয়ে গাফলতি করতে। সেখানে সব স্টুডেন্ট ছেলেরা। মেয়েদের কেনো নেয় না এ-ব্যাপারে নির্ভাণ কখনোই কোনো স্পষ্ট বিবৃতি দেয়নি।
“তুই ঠিক আছিস?” তিয়ান নির্ভাণ কে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলো। নির্ভাণ নাথা নাড়ে। নিজের ফোনে থাকা প্রিয়মের সেই কি-চেইন এর পিকচার দুই বন্ধুর সামনে ধরতেই তিয়ান ইকবাল ভ্রু কুঁচকে নিলো। এটা কেনো দেখাচ্ছে? তিয়ানের কপালে চিন্তার দুই একটা ভাজ দেখা গেলো।
“সেইম আরও একটু চাই।”
“সিরিয়াসলি! সেইম মডেলের কি-চেইন এখন কোথায় খুঁজব আমরা?” তিয়ানের তড়িঘড়ি করে জবাব। ইকবাল কিছু বুঝতে পারছে না।
“পুরো শহরে, প্রয়োজনে পুরো দেশে খুঁজব।” নির্ভাণ সিরিয়াস। ওর মুখের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিয়ান। নিস্তেজ গলায় বলে উঠলো,
“এটা কী লাগবেই ভাই?”
“হুম।” একটু থেমে ব্যাস্ততা দেখিয়ে বাইকে ওঠে বসতে বসতে বলে উঠলো, “চল তিয়ান গতকাল যে শপ থেকে ব্যাগ নিয়েছিস সেখানে।”
তিয়ানের হার্ট বিট ফার্স্ট। সে এই কি-চেইন এখন কোথায় পাবে? এটা তো নিজের কাছ থেকে দিয়েছে। গতকাল নির্ভাণ সময় করতে পারছিল না বিধায় তিয়ানকেই পছন্দ করে ব্যাগ নিয়ে নিতে বলেছিলো।তিয়ান সেদিন একটা শার্ট নিয়েছিল অনলাইনে। সেই শার্টের সাথেই ভুল করে এই কি-চেইন চলে এসছে। আর নিজের কাছে থাকা সেই কি-চেইন টা কী মনে করে প্রিয়মের ব্যাগে রেখে দিয়েছিল তিয়ান।
চিন্তিত তিয়ান আজ যেনো ঝিমিয়ে চলছে। তার চিন্তায় গলায় অব্ধি শুঁকিয়ে কাঠ। একটা বিশাল বড়ো শো-রুমে চলে এলো তিয়ান। যদিও এখান থেকে ব্যাগ নেয়নি সে। তবে এখানে শুধু কি-চেইন টা পেয়ে গেলে ভালো।
শো-রুমে তিন বন্ধুর আগমনে একজন স্টাফ এগিয়ে এলো।
“আপনাদের কেমন ব্যাগ চাই বলুন স্যার।” কিশোরের কণ্ঠ বেশ নমনীয়। হয়তো বয়স টাও বেশি না। নির্ভাণ ইশারা করতেই ইকবাল সেই পিকচার ছেলেটাকে দেখিয়ে বলে উঠলো, “সেইম দেখতে এই কি-চেইন টা লাগবে।”
“দুঃখিত স্যার। এটা তো আমাদের এখানে নেই। তবে আপনারা চাইলে অন্য ব্র্যান্ডের দেখাতে পারি।”
ছেলেটার কথায় তিয়ান বাদে ওরা দু’জনেই বিস্মিত। ইকবাল উত্তেজিত হলো। অস্থির কণ্ঠে বলতে লাগলো,
“নেই মানে? গতকালই তো এখান থেকে এটা নিয়েছে আমার ফ্রেন্ড।” এরপর তিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো, “কী তিয়ান তুই কিছু বলছিস না কেনো?”
তিয়ান তখনও হাত কচলায়। নির্ভাণ ওর ভাবসাব দেখেই কুঁচকে রাখা ভ্রু জোড়া শিথিল করলো। চোয়াল কটমট করছে যুবকের।
তিয়ান আর কোনো উপায়ন্ত পেলো না। বন্ধুদের পেছনে আসতে আসতে ইতস্তত করতে করতে বললো, “ওটা আমি,,,, ”
“আর কোনো মিথ্যা বলিস না প্লিজ।”
ইকবাল হাত জড়ো করে। তিয়ানের চোখমুখে অনুশোচনা। ইকবাল ক্লান্তিকর নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
“বাদ দে। এখন এরকম দেখতে কি-চেইন কোথায় খুঁজব আমরা? চল বাড়ি যাই।”
“তোরা যা।” নির্ভাণ বাইকের চাবি ঘুরায়। ওরা দু’জন থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলো। নির্ভাণ কিছু দূর গিয়ে অনুভব করলো ওরা দুজনেও পেছনে আসছে। তবে এবার আর কিছু বললো না নির্ভাণ।
——
রাত সাড়ে বারোটা। পাঁচ ঘন্টার ও বেশি সময় ধরে এমন সবগুলো শপে খুঁজ করছে যে সকল শপে কাঙ্খিত বস্তু পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু কোথাও এই একই রকম দেখতে কি-চেইন কোনো শপে মিলেনি। নির্ভাণের চেহারার অবস্থা ভয়ংকর। লাল লাল চক্ষুদ্বয়। নাকের পাটা ফুলছে বারবার। গম্ভীর মুখ টা আরও গম্ভীর। তিয়ানের এখন নিজের গালেই নিজের মারতে ইচ্ছে করছে। বন্ধু তার ভালোই প্রেম দিওয়ানা হয়েছে।
“আরও একটা দোকান আছে এসবের। যাবি ওদিকে?”
নির্ভাণ গরম চোখে তাকায়। ইকবাল বন্ধুর তাকানো দেখেই যেনো ভয় পেলো। হড়বড়িয়ে বলে, “আরে ওটা ছোটখাটো একটা দোকান। এইজন্যই এটার লোকেশন বলিনি।”
নির্ভাণ ওদের উপেক্ষা করে নিজে আগে এগিয়ে গেলো। রাস্তার পাশে একটা ছোট টং। একজন বয়স্ক লোক আছে দোকানে৷ হয়তো দোকান বন্ধ করে ফেলবেন। সব গুছিয়ে নিচ্ছে। ইকবাল দূর থেকে ডেকে উঠলো, “দাদু আপনার কাছে ওই মেয়েদের কি-চেইন গুলো আছে না?”
ভদ্রলোক মিষ্টি করে হাসেন। ক্লান্তি মুখ তবুও হাসতে হাসতে জবাব দেন, “এখানে মেয়ে মানুষের সব শখের জিনিস আছে দাদুভাই।”
কথা তিনি ঠিকই বলেছেন। মেয়েদের ব্যান্ড, রাবার ব্যান্ড, নুপুর, পায়েল, চুড়ি, দুল, এটা-সেটা অনেক কিছু আছে। ভদ্রলোক কিছু জিনিস নিজের পুঁটলিতে ভরে নিয়েছেন। আবারও সেগুলো এক এক করে বের করতে লাগলেন। নির্ভাণ শুঁকুনের নজরে তাকিয়ে। অবশেষে একটা প্যাকেট বের করলেন যেখানে সবগুলো কি-চেইন এবং ভিন্ন ভিন্ন রকমের রয়েছে। ইকবাল সেটা খুলে এক এক করে বেছে বেছে দেখতে লাগলো।
“এটা দেখ। ওইটার মতোই।”
স্বচ্ছ রেজিনের ভেতর আসল শুকনো ফুল। আলো পড়াতে ফুলটা ভেতর থেকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। রাতের আঁধারে হঠাৎ এটার ওপর আলো পড়লে যে ভয়ংকর সুন্দর লাগবে তা আর বলার অপেক্ষায় রাখে না। দেখতে এস্থেটিক। নির্ভাণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। এটার দামদর করছে ইকবাল তৎক্ষনাৎ নির্ভাণের নজর গেলে আরও একটা কি-চেইনের ওপর। খুব অদ্ভুত। তার মতো একজন মানুষের এরকম একটা টিনেজ লাভবার্ডসের জিনিস কেনো ভালো লাগবে? হোয়াই?
পঞ্চাশ টাকার জিনিস নির্ভাণ পাঁচশো টাকা দিয়ে নিয়েছে। ইকবাল তিয়ান মুখ বাঁকাল। বাইকের কাছাকাছি এসেও গম্ভীর মানুষ টার মন ছটফট করে যাচ্ছে ওই কাপল কি-চেইন টার জন্য। সে ওদের দাঁড়াতে বলে আবারও দৌড়ে ফিরে এলো সেই দোকানে। এসে হন্তদন্ত হয়ে ভদ্রলোক কে অনুরোধ করলো, “প্লিজ আর একবার কষ্ট করে আমাকে ওই কি-চেইন গুলো দেখাবেন।”
যদিও বয়স্ক মানুষ হওয়ায় নির্ভাণের ইচ্ছে ছিলো না মানুষ টাকে আবারও মেহনত করাতে। কিন্তু নিজের মন কেও মানাতে পারছে না। ভদ্রলোক কোনো কথা ছাড়াই মুচকি হেসে সব পুঁটলি খুললেন। নির্ভাণ এবার নিজেই খুঁজে খুঁজে সেই কাপল সেট টা বের করলো। হাতে নিয়ে চমৎকার করে হাসল যুবক। যা সচারাচর তার মুখে দেখাও মুশকিল। ইকবাল তিয়ান পেছনে বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে দেখেই গেলো বন্ধুর পাগলামো।
#চলবে……
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
