#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_৩৫
#জান্নাত_সুলতানা
রাস্তার ওপাশে তখন একজন বৃদ্ধ লোক একটা হুইলচেয়ার ঠেলে সামনে এগুচ্ছেন। বৃষ্টিতে ভিজে অবস্থা বেহাল। চেয়ারে একজন বয়স্ক মহিলা বসা। দেহটা এইটুকুন। বয়সের ভারে তাদের চামড়া ঝুলেছে। দুজনের চুল পেকে পাটের আঁশের মতো হয়েছে। যৌবন তাদের দেহ কোথাও খুঁজে পাওয়া বড্ড কঠিন। তবুও একটু খেয়াল করলে বোঝা যাচ্ছে দুজনের ঠোঁট দুটো প্রসারিত। সানাসা সেদিকে মুগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে দম্পত্তিকে দেখলো। কী চমৎকার দেখতে জুটি। এখান পর্যন্ত কয়টা জুটি আসতে পারে? শত শত বাধা-বিপত্তির পেরিয়েও একে-অপরের সঙ্গ কয়জন দেয়? ভালোবাসার মানুষ টার সাথেই সম্ভব সবকিছু। সানায়া আনমনে বিড়বিড় করে,
“আমি আপনার সাথে ওইখান পর্যন্ত যেতে চাই নির্ভাণ ভাই।”
“কার সাথে?” নির্ভাণ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো। এমনিতেই এই মেয়ে তাকে নিয়ে এক কাটি ওপরে। তার থেকে কোনো ইঙ্গিত পেলে মাথায় চড়ে বসবে। সে গম্ভীর দেখালো নিজেকে। সানায়া নির্ভাণের দিকে তাকালো না। সেদিকে তাকিয়ে থেকেই অস্ফুটে বললো,
“আমার ভালোবাসার মানুষ টার সাথে।”
“বয়স কত তোর? এখনই এসব নিয়ে চিন্তা মাথায়?”
সানায়া মুখ টা এইটুকুন করে নিলো। মাথা নুইয়ে রেখে বলে উঠলো, “কেনো, আপনার বুঝি এসব নিয়ে চিন্তা নেই?”
নির্ভাণ জবাব দিলো না। সিগনাল শেষ হতেই গাড়ি আবারও স্টার্ট করলো সে৷ বৃষ্টির মধ্যেও তার শরীর দিয়ে যেনো ধোঁয়া বেরুনোর উপক্রম। কী আশ্চর্য, এমন ঠান্ডার মধ্যেও তার কেনো এমন লাগবে? অবশ্যই লাগার কারণ আছে। পাশে মানুষ টার সেই ক্ষমতা আছে যে।
—-
আফি ছাতা নিয়ে বেরিয়েছিল সকালে। কিন্তু ক্লাসে যাওয়ার আগে ক্যান্টিনে গিয়েছিল সে। সেখানেই ছাতাটা হারিয়ে ফেলেছে। তাই এখন বৃষ্টি না কমলে সে বেরুতো পারছে না ক্যাম্পাস থেকে। বন্ধুদের সাথে বসে আড্ডা দিচ্ছিল তখনই একটা ছেলে এলো দৌড়ে। সিনিয়র ছেলে। এসেই হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
“তোমার ভাইয়া তোমাকে নিতে এসছে আফি।”
আফি অবাক। নির্ভাণ কে ভার্সিটির সিনিয়ররা অনেকেই চিনে। তাকে সেই সুবাদে অনেক খাতিরযত্ন করে। তারউপর চাচা মেয়র। আফির খটকা লাগে। কোন ভাই এসছে? নির্ভাণ আসার কথা থাকলে-ও সেই নিষেধ করেছে কোনো এক অজানা কারণে। তবে তুষার এলো কী? আফি এসব ভেবে বন্ধুদের বিদায় দিয়ে বেরিয়ে এলো। অল্পস্বল্প বৃষ্টির মধ্যে দ্রুত হেঁটে রাস্তায় এলো। গাড়ি দেখেই আফির পেটের ভেতর মোচড় দেয়। একান্ত ভাই? সে এই অসময়ে? গেলো তো মাত্র কাল। আবার আজ চলে এসছে? আফি গাড়ির কাছাকাছি এসে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কাল গেলেন আবার আজ চলে এসছেন? ব্যাপার কী বলুন তো?”
“তোর জন্য আসিনি।”
“তো কার জন্য এসছেন?”
“তোকে কেনো বলবো? চুপচাপ গাড়িতে বোস।”
একান্তর রোষপূর্ণ সুর। মনে হচ্ছে কোনো কিছু নিয়ে সে অসন্তুষ্ট। আফি এসব ভেবে গাড়ির দরজা খুললো। সিটের ওপর একগুচ্ছ ডেইজি ফুল। আফি অবাক হয়ে সেগুলো হাতে নিলো। তার এই ফুল পছন্দ। একান্ত কে তৎক্ষনাৎ কিছু জিজ্ঞেস করবে একান্ত রক্তজবার ন্যায় লাল হয়ে থাকা চোখ দু’টো দেখেই কথা গুলিয়ে ফেললো।
গাড়ির স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে একান্ত কণ্ঠে গম্ভীরতা এটে বলে বললো,
“বলেছিলাম ছেলে ফ্রেন্ড না বানাতে।”
“আপনার কথা কেনো শুনবো? ওরা আমার ফ্রেন্ড আর বয়ফ্রেন্ড। তাতে আপনার কী?”
কথাখানি সম্পর্ক শেষ হওয়ার আগেই নিজের ওষ্ঠপুট অন্য কারোর রাজত্বে বিষয় টা মস্তিষ্কে হানা দিতেই ওর হাত থেকে ফুল গুলো কোলের ওপর গড়িয়ে পড়লো। শরীর জুড়ে বয়ে যায় শীতল স্রোত। বুকের ভেতর হৃৎস্পন্দনের ধুকপুকানি তীব্রতা অকল্পনীয়। পুরুষালী ওষ্ঠপুটে পিষ্ট হয়ে এলো যেনো নরম কোমল অধর। আফি পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায় সামনে। লজ্জায়, চোখ দিয়ে টপ করে এক ফোঁটা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো। ছটফট করার কথা বেমালুম ভুলে গেলে মেয়ে টা। একান্ত ছাড়লো। যখনই বুঝলো আফি নিঃশ্বাস নিচ্ছে না। একান্ত সরে এলো। ওর গালে হাত রেখে আলতো করে চাপড় মেরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো, “নিঃশ্বাস ফেল বেয়াদব।”
একান্ত লম্বা শ্বাস ফেললো। আফি ফোঁপাচ্ছে। একান্ত ওর ফুঁপানো দেখলো। এরপর সিটে গা এলিয়ে দিলো। মিনিট খানিক সময় পর আফির রাগান্বিত কণ্ঠস্বর শোনা গেলো,
“এটা আপনার বিদেশ না। আমি আপনার গার্লফ্রেন্ড না। তাহলে কেনো এমন করলেন?”
“তুই বাচ্চা? এখন আমাকে কলম দিয়ে খাতায় লিখে বোঝাতে হবে আমি তোকে ভালোবাসি?”
আফি স্তব্ধ হয়ে গেলো। অবুঝ চোখে চেয়ে সাথে সাথে জবাব দিলো,
“আপনি আমাকে ভালোবাসেন না। ভালোবাসলে আমার সাথে কথা বলতেন বিদেশ গিয়েও।”
চোখের জল সারা মুখে লেপটে আছে মেয়ে টার। ঘেমে উঠেছে অল্প সময়ে। একান্ত ওর এলোমেলো চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিলো। ওর ভেজা গালে ফের ঠোঁট ছুঁয়াতেই আফি তৎক্ষনাৎ কেঁপে উঠলো। গোলগোল চোখে তাকিয়ে আছে। একান্ত ওর ভোলাভালা মুখের দিকে তাকিয়ে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলে উঠলো,
“এটা বুঝতে তোকে আরো বড়ো হতে হবে।”
—–
সাড়ে সাতটা বাজতেই নির্ভাণ সবাই কে তাড়া দিলো। পৌছাঁতে এগারো কিংবা দশ ঘন্টা লাগতে পারে। আর নির্ভাণ চাইছে তারা পৌঁছে যেনো সকালে সূর্যোদয় দেখতে পারে। সে রেডি হয়ে আগেই বেরিয়েছে। একে একে সবাই এসে উপস্থিত হলে-ও তুষার আর সানায়া আসেনি। নির্ভাণ অধৈর্য হলে-ও নিজেকে শান্ত রেখে দাঁড়িয়ে রইলো। একটু সময়ের মধ্যে এলো দু’জন। ওদের সবাই বিদায় দিয়েছে। সাবধানে, সামলে রাখার দায়িত্ব নির্ভাণ কে পইপই করে মনে করিয়ে দিচ্ছে নিজাম সিদ্দিকী। ছেলেকে ভীষণ চাপে রাখছেন। যদি পারতেন তবে এদের একা কখনোই ছাড়তেন না। এখন সেই সুযোগ নেই। ওরা ড্রাইভার নিচ্ছে না। দূরের পথ। একজন এতো পথ ড্রাইভ করা সম্ভব নয়। তুষার প্রথমে ড্রাইভ করবে। এরপর একান্ত এবং শেষে নির্ভাণ। সেই মোতাবেক গাড়িতে বসলো। সানায়া নির্ভাণ সবার পেছনের সিটে। একান্ত তুষার সবার সামনে। মাঝে আফি প্রিয়ম সেহের। আফি বিকেলের পর থেকে একদম চুপ। একান্ত বুঝে। মেয়ে টা হঠাৎ এতো বড়ো ঝটকা নিতে পারে নি। তবে একান্তর এতে সমস্যা নেই। সে মজা নিচ্ছে বেশ।
নির্ভাণ চোখ বন্ধ করে চোখের ওপর হাত দিয়ে রেখেছে। এখন না ঘুমলে আর সুযোগ নেই। আবার গাড়ি চালানোর সময় কোনো রিস্ক নেওয়া যাবে না। তাই একটু ঘুমিয়ে নিলে ভালো হবে। তবে পাশে আস্ত একটা উনুন নিয়ে বসেছে যেনো সে। অস্থিরতা ভেতর থেকে সে এলোমেলো হচ্ছে। বারবার ঘুরে-ফিরে ওকেই দেখতে মন চাচ্ছে। ইদানীং যেনো এটা বেশি হচ্ছে। বারবার চোখ গুলো ওকেই দেখে ঘুরে-ফিরে বেহায়ার মতো। নিজেকে সামলে চোখ বন্ধ করে রাখলো জোর করে। সানায়া তাকে পর্যবেক্ষণ করছে সে বুঝেও চুপ করে রইলো।
“দেখা শেষ?”
“আমি মোটেও আপনাকে দেখিনি।”
“তো এদিকে তাকিয়ে ছিলি কেনো?”
“এমনই। আপনার শার্ট টা সুন্দর তাই দেখছিলাম।”
নির্ভাণ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সে চুপচাপ চোখ বন্ধ করে। সানায়া ধীরে ধীরে নির্ভাণের ডান হাতটা আলতো করে স্পর্শ করে। নির্ভাণ কিছু বলে না। সানায়া খুশিমনে তাই সেভাবেই বসে থাকে।
——
নির্ভাণ ড্রাইভ করছে তখনও। সবাই যে যার মতো ঘুমিয়ে আছে। তারা প্রায় গন্তব্যে পৌঁছে গিয়েছে। ভোর সাড়ে চারটা তখন। পাঁচটার মধ্যে নিদিষ্ট স্থানে গিয়ে পৌঁছাতে না পারলে সূর্যোদয় দেখা মিস হবে। নির্ভাণ নির্জন রাস্তায় গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে রেখেই একবার ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে চাইলো। আফির কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে সানায়া। চুলের বেণী টা এলোমেলো। ওড়নার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। নির্ভাণ দ্রুত নিজেকে সামলায় এবং ফের ড্রাইভিং-এ মনোযোগ দেয়। এতো দেখেও কেনো মন ভরে না। তৃষ্ণা কাটেই না যেনো।
ভোরের নরম আলো তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। ইনানী বিচের ঢেউগুলো ধীরে ধীরে তীরে এসে ভাঙছে। শব্দটা যেন খুব আস্তে করে কারও নাম ধরে ডাকছে।
আকাশের এক কোণে হালকা কমলা রং ছড়িয়ে পড়ছে। সবাই দাঁড়িয়ে আছে, খালি পায়ে ভেজা বালুর উপর। সানায়ার পাশে হঠাৎ এসে কেউ দাঁড়ায়। কিছু বলে না, শুধু নিঃশব্দে পাশে দাঁড়িয়ে রয়।
ঢেউ এসে সবার পা ছুঁয়ে যায়। আবার ফিরে যায়। সানায়া তাকায় ঘাড় বাঁকিয়ে। নির্ভাণ ভাই তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে দৃষ্টি সরিয়ে আকাশে কমলা রঙের দিকে তাকায়। সূর্যি মামা উঁকি দিচ্ছে একটু একটু করে।
“এটা কত সুন্দর।” সানায়া আস্তে বলে। ওর কথায় নির্ভাণ হালকা হাসে। আসলেই আজ অন্য রকমই মনে হচ্ছে। বন্ধুদের সাথে আরও দুই থেকে তিনবার আসা হলে-ও এমন অনুভূতি অনুভব কখনোই হয়নি।
সূর্য তখন ধীরে ধীরে উঠে আসছে সমুদ্রের বুক চিরে। আলো এসে চুলে লাগে, মুখে পড়ে। নির্ভাণ এক মুহূর্তের জন্য মেয়ে টার থেকে চোখ সরাতে পারে না। কেমন চুম্বকের ন্যায় টানছে।
তারপর খুব আস্তে, দ্বিধা নিয়ে নিজের দানবীয় হাত টা বাড়িয়ে সানায়ার আঙুলে হাত রাখে।
সানায়া চমকায়। হতভম্ব, অবাক দৃষ্টিতে পাশে তাকিয়ে নির্ভাণের মুখের দিকে চায়। কিন্তু লোকটা খুবই শান্ত হয়ে সামনে দৃষ্টি স্থির রেখেছে। সানায়া বুকের ভেতর টিপটিপ করে। হাত সরায় না সে। যেনো মনে হচ্ছে চারপাশে কেউ নেই শুধু ঢেউ, আলো, আর দুজন মানুষের নিঃশব্দ কাছাকাছি থাকা।
সূর্য পুরোটা উঠে গেলে হয়তো সব আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু এই ভোরটা। এই একটা মূহুর্ত সানায়ার মস্তিষ্ক থেকে চিরতরে কখনোই বিলীন হবে না।
সূর্যোদয় হতে হতে অনেক মানুষ জড়ো হলো। নির্ভাণ ভাইবোনের নিয়ে সাত টায় গাড়িতে ওঠে বসলো। রিসোর্টে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগবে না। সবার ফ্রেশ হয়ে রেস্ট এর প্রয়োজন। বিচে তারা বিকেলে আসবে লাঞ্চের পর।
ইনানী বিচের খুব কাছেই ফারাজ সিদ্দিকী ভালো এক রিসোর্টে তাদের থাকার ব্যাবস্থা করেছে। ম্যানেজার কিংবা অন্য কোনো স্টাফ নয়। হোটেলের মালিকের ছেলে এসছে তাদের ওয়েলকাম করতে। ছেলেটার বয়স তুষারের সমান হবে। নির্ভাণের অবশ্য বেশি সুবিধার লাগে না ছেলেটাকে। বারবার জিজ্ঞেস করছিলো তারা কী ভাইবোন না-কি অন্য কোনো সম্পর্ক আছে। বারকয়েক তাকিয়েছে সানায়ার দিকে। নির্ভাণের এটাই অসহ্য লেগেছে। এই মেয়ে নিয়ে সে সাধে বাইরে যায় না? সে রেগে আছে। একান্ত ফ্রেশ হয়ে এসে এটা বুঝতে পেরে মজা নিতে ভুললো না।
“একবার টান দে৷ ভালো লাগবে।”
সিগারেট বাড়িয়ে দিয়ে একান্ত বলে। নির্ভাণ চুপচাপ সিগারেট নিয়ে ব্যালকনিতে চলে যায়। কারণ তুষার তখন ওয়াশরুম আর সে যেকোনো সময় বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু নির্ভাণ বাড়ির কারোর সামনেই স্মোক করে না। একান্ত পেছনে দাঁড়িয়ে মুখ ভেংচি কাটলো।
সকাল টা সবাই ঘুমিয়ে কাটাল। কড়া রোদে বিচে গিয়ে রোদে শুঁটকি হওয়ার কোনো মানেই নেই। সকালে এসে হোটেলের সৌন্দর্য তেমন নজর করে না দেখলেও এখন সবাই বিস্মিত সাথে খুশি। রুম থেকে সমুদ্রের তর্জন-গর্জন শোনা যায়। রুমে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের ঢেউ গুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সানায়ার খুশি আর কে দেখে। জীবনে প্রথম সে এতদূর ঘুরতে এসছে। এমনিতেই খুশি তারউপর এমন সুন্দর পরিবেশ মেয়ে টা আরও খুশি।
লাঞ্চ করে কিছু টা সময় রেস্ট করে সবাই বেরুলো। ইনানী বিচ নিরিবিলি পরিবেশ। তবুও বিকেলে মানুষ হলো ভালোই। নির্ভাণ সেই দেখে মেয়েদের হাঁটু সমান পানির বেশি যেতে কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দিলো। সানায়ার মন তখন বিষণ্ণতায় ঢেকে যায়। নির্ভাণ যে কেনো বলেছে আফি বুঝলেও সানায়া এবার গাল ফুলিয়ে রাখলো। সে আর পানিতে নামলই না। নির্ভাণ গাল ফুলিয়ে রাখা নিজের প্রেয়সীর ছবি গোপনে ক্যামেরাবন্দী করতে গিয়ে মিটমিট করে হাসলো।
নিজেদের মতো ঘুরাঘুরি করে ওরা সন্ধ্যায় চলে এলো। ফ্রেশ হয়ে সবাই নাশতা করতে নিচে গেলেও সানায়া গেলো না। নির্ভাণ বারকয়েক উঁকিঝুঁকি মারলো ওকে দেখার কিন্তু সানায়া রুম থেকে বের হয়নি৷ ব্যালকনিতে বসে সমুদ্রের ঢেউ দেখছে।
তখন চারপাশে আবছা অন্ধকার। তবে কৃত্রিম আলো চারপাশ ঝকঝক করছে। আফি নিচে প্রিয়মকে নিয়ে ছবি তুলতে গিয়েছে। সানায়া কে কত করে বলেও নিতে পারেনি। সে বাহানা দিয়েছে মাথাব্যথা। রুমে কেউ নেই। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে সানায়া ভাবলো আফি এসছে। অভিমানী স্বরে সে তখন অভিযোগ করলো,
“তোমার ভাই খারাপ লোক। খারাপ লোক। আমাকে একটুও সমুদ্রে নামতে দেয়নি।” কোনো উত্তর নেই ওপাশ হতে। সানায়া একটু থেমে নাক টেনে আবার বলতে শুরু করে, “আমার কত শখ ছিলো ঢেউয়ের সাথে সাথে পেছনে হেঁটে একটা ভিডিও করবো।”
সানায়ার শরীর টা হঠাৎ কেমন ভার হয়ে এলো। নাসারন্ধ্রে গিয়ে সুগন্ধি জানান দিলো এটা আফি হতেই পারে না। আস্তে আস্তে ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে তাকাতেই আবছা আলোয়ে নির্ভাণ কে দেখেই লাফিয়ে উঠলো সে। নির্ভাণ দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। ওর কব্জি ধরে নিজের সাথে নিয়ে হাঁটতে লাগলো। সানায়ার ভয়ে কলিজার পানি শুঁকিয়ে এলো বোধহয়। বারকয়েক শুঁকনো ঢোক গিলে। সে কী এক ভয়ংকর কান্ড ঘটিয়ে ফেললো, যার খারাপ তারই কাছে বলেছে! হায় হায়। কী হবে এখন? নির্ভাণ কে কিছু বলতেও পারলো না ও। নির্ভাণ সোজা ওকে নিয়ে বিচে চলে এলো। সানায়া খোলা আকাশের নিচে সমুদ্রের পানি পা স্পর্শ করছে। সে অভিমান ভুলে গেলো। খালি পায়ে পানির দিকে এগিয়ে যেতেই নির্ভাণ পেছন থেকে বলে উঠলো, “সাবধানে।”
সানায়া শুনেছে বলে মনে হয় না। শুনলেও কথা আমলে নেয় না। দৌড়ে পানিতে নামে। নির্ভাণ ওর ঠিক পেছন পেছন। সানায়া হাত দিয়ে পানি নির্ভাণের গায়ে ছুঁড়ে দিয়ে পরক্ষণেই নির্ভাণের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে থতমত খেয়ে ডেকে উঠলো,
“নির্ভাণ ভাই?”
“উম? বল।” নির্ভাণের শান্ত স্বর। সানায়া বুঝলো নির্ভাণ ভাই রাগ করেনি। একটু এগিয়ে এসে আস্তে আস্তে বললো,
“আপনি ভালো।”
“অভিমান কমেছে?”
নির্ভাণ কণ্ঠ খাদে নামিয়ে জিজ্ঞেস করলো। সানায়া ওপর-নিচে মাথা নেড়ে বোঝাল হয়েছে। নির্ভাণ তপ্ত শ্বাস ফেললো। এই মেয়ের দুঃখ, রাগ, অভিমান, অভিযোগ তার গলায় কাঁটার মতো লাগে। যতক্ষণ না স্বাভাবিক করতে পারে সব ঠিকঠাক হয় তার অস্থিরতা কাটতেই চায় না ততক্ষণ।
#চলবে……
[পর্ব কিন্তু বড়ো দিয়েছি। এটা দুই পর্বের সমান। দেরি হয়েছে বলে কেউ বকাঝকা করিয়েন না। আমি অত্যন্ত দুঃখিত। ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
