হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পর্ব:31 এর দ্বিতীয়াংশ

0
27

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:31 এর দ্বিতীয়াংশ

⭕পূনর্জন্ম বা টাইম ট্রাবল কোন ধর্মে গ্রহনযোগ্য
___________________________________________ নয়,এটি কেবল রুপকথার উপমা।
_______________________________⭕

বৃদ্ধা হাসপাতালে ভর্তি,407 নাম্বার কেবিন টি তার জন্য বরাদ্দ।গত পরশু বৃদ্ধাকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর আর আসে নি তাকরিম।
আজ হসপিটাল থেকে ডিস্টার্জ করা হয়েছে বৃদ্ধাকে, ভেবেছিলো তাকরিম আসবে দেখা করতে অথচ আসে নি, অপেক্ষা করতে করতে রাত হয়েছে অথচ তাকরিম আসে নি, হয়তো এই তুচ্ছ বুড়ির কথা মনেই নেই তার।

বৃদ্ধার পাশে বসে থাকা আরেকজন বৃদ্ধার মুখে কাপড় পেচানো,অনেকক্ষণ যাবৎ বসে থাকার পর অধৈর্য হলো সে,বললো,

“আম্মিজান আপনি মিছেমিছি অপেক্ষা করছেন,আমার মনে হচ্ছে উনি আসবে না।”

বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,হতাশ কন্ঠে বললো,

“ওই মেয়েটা আমার পুরো জীবন এলোমেলো করে দিলো।”

” শুধু কি ওই মেয়ে?ভাবুন তো ও যদি সময় ভ্রমণে না যেতো তাহলেও কি আদৌও সব সুন্দর হতো?

“আমি অভাগী, জনম দুঃখিনী,যা হওয়ার তাই হতো অন্তত এই অভিশপ্ত জীবন পেতে হতো না।আজ পনেরো এপ্রিল,ঠিক দুমাস পর মার্চ মাসের পনেরো তারিখে ওই মেয়েটা সময় ভ্রমণে যাবে ঠিক পঞ্চাশ বছর পেছনে।”

“কি করবেন ভেবেছেন?”

“আমার ভাবনায় নিয়তি পাল্টে যাবে না।সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে।”

“আপনি কি যানেন আপনি বড্ড স্বার্থপর।”

“সেটাও তো নিয়তি নির্ধারন করেছে।আমি স্বার্থপর নই, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি অসহায় আমি।”

“তবে এইটুকু তো জানার কথা, অসহায়দের জন্য কেউ থাকে না,তাদের লড়াই করতে হয় নিজের জন্য।”

“প্রথম থেকেই লড়াই করছি, শেষ পর্যন্তও করবো।”

কথাটা বলে লাঠি ভর দিয়ে উঠে দাড়ালো বৃদ্ধা,দম নিয়ে বললো,

“চলো, বসে থেকে লাভ নেই।”

বৃদ্ধার কথা শুনে উঠে দাড়ালো অন্য বৃদ্ধা মহিলা,তাড়াহুড়ো কন্ঠে বললো,

“কোথায় যাবেন ভাবছেন?”

বৃদ্ধা চুপ করে রইলো কিছুক্ষন, তারপর রহস্যময় কন্ঠে বললো,

“যেখানে আমার যাওয়ার কথা।”

_____________________

“তুই খুব বেশি সুন্দর।”

ঘর থেকে বেড়োতে গিয়ে থমকালো নিস্পার পদযুগল।ত্রিজয়ের ছোট্ট কয়েকটি শব্দের বিনিময়ে বললো,

“স্ত্রী বানিয়েছেন প্রতিশোধের জন্য,কাছে আসছেন সৌন্দর্যের টানে,এখানে প্রেম অনুপস্থিত।”

“তিক্ত হলেও সত্য মানুষ সবার প্রথম বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রেমে পড়ে।”

ত্রিজয়ের এবারকার উত্তরে মলিন হাসলো নিস্পা,মিহি কন্ঠে বললো,

“আপনি তো তার চেয়েও বেশি তিক্ত, না রাখছেন প্রেমে না দিচ্ছেন ছেড়ে।”

“তোর মতো কানার জন্য হৃদয়ে প্রেম নেই আমার।এমন স্বপ্ন দেখে পাপ বাড়াস না।”

ত্রিজয়ের কঠিন উত্তরে একটুও খারাপ লাগলো না নিস্পাপের,বরং অবজ্ঞার সুর তুলে বললো,

“আপনি যে আমার লিপস্টিক মুছে দেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে পাপ বাড়াচ্ছেন সেটার কি হবে?”

“গুনে গুনে সত্তর হাজার টাকা খরচ করেছি,টাকা উশুল করা আমার দায়িত্ব,এটাকে পাপ ভেবে এতগুলো টাকা লস করার কোন মানেই হয় না।”

ত্রিজয়ের কথায় ফুসে উঠলো নিস্পা,দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

“ছিঃ আপনি তো দেখছি চরিত্রহীন কিপ্টে।”

ত্রিজয় কপাল কুচকালো, চোখ ছোট ছোট করে তাকালো নিস্পার দিকে,পুনরায় নিস্পার কোমর চেপে ধরে বললো,

“কিপ্টে বলেছিস ইটস ওকে,কিন্তু চরিত্রহীন কেন বললি?ইউ নো চরিত্রহীন হলে এতোদিনে চার বাচ্চার মা হয়ে যেতি তুই?”

নিস্পা নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ,ত্রিজয়ের কথার পৃষ্ঠে তিক্ত বিরক্ত কন্ঠে উত্তর দিলো,

“আপনার মাথার একটা তাড় যে ছেড়া আপনি বোধহয় জানেন না তাইনা?বিয়ের চৌদ্দ দিনের মাথায় চার বাচ্চার স্বপ্ন কি করে দেখতে পারেন আপনি?”

ত্রিজয় ডোন্ট কেয়ার ভাব নিলো,দাম্ভিক কন্ঠে বললো,

“টাকা পয়সার ব্যাপারে কিপটে হতে পারি, কিন্তু ডিএনএ ট্রান্সপারের ব্যাপের খুব উদার আমি।যাকে দিবো পেট ভরেই দিবো।তোর এসব নিয়ে ভাবতে হবে না।”

রাগে নিস্পা নাকের পাটা ফোলাল,তবে এবার আর প্রতিত্তোর করলো না।মনে মনে চেচিয়ে উঠলো তিব্র প্রতিবাদে,

“আপনি সত্যিই একটা অশ্লীল কিপ্টে।”

__________________

বেশ চমকালো নয়, তবে খুব সাদামাটা ভাবেই শুরু হয়েছে ত্রিজয়ের প্রোগ্রাম।তবে কিছু একটা নিয়ে কানাঘুষা চলছে বেশ কিছুক্ষন ধরে।এমপি তাওসিফ তাকরিমের আসা নিয়ে সবার মধ্যে চাপা উত্তেজনা।

এমন একটা রমরমা প্রোগ্রামে এমপি তাওসিফ তাকরিম আসবে এই কথাটা বিশ্বাস হচ্ছে না অনেকের।পুরো প্রোগ্রামের কোথাও এমপিকে আপ্যায়ন করার জন্য কোন সুব্যবস্থা দেখতে পাচ্ছে না কেউ।এমপি তাওসিফ তাকরিম কি যেসে কেউ যে তাদের মতো আম লোকের সাথে ডিনারে বসবে।

সবার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ত্রিজয়ের বাড়ির ড্রয়িংরুমে প্রথমবারের মতো পা রাখলো তাকরিম।সাথে চারজন বডিগার্ড একজন হুজুর এবং চিত্রাকে নিয়ে ঢুকতেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিলো সে।

ইভান প্যান্টের পকেটে হাত রেখে কথা বলছিলো একজনের সাথে,এমপি মশাইয়ের ধরমার আগমনে নজর স্থির করলো ,ঠোঁটের কোনে অদ্ভুত বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে এগিয়ে গেলো সেদিকে,

“আরেহ! এমপি মশাই যে,আমি তো ভাবতেই পারি নি আপনি আমাদের দাওয়াত গ্রহণ করবেন।”

তারপর একটা চেয়ার টেনে এগিয়ে দিতে দিতে বললো,

“বসুন বসুন।আসলে আমরা ভেবেছিলাম আপনার মতো মন্ত্রী মিনিস্টার এই ছোট খাটো পার্টিতে আসবে না, তাই আর কি আপনার জন্য স্পেশাল কিছু এরেঞ্জ করা হয় নি।”

তাকরিমের ভেতরে চাপা রাগ,অথচ বাইরেটা আবৃত নরম খোলশে,শান্ত সাধারণ দৃষ্টি,কিন্তু তীক্ষ্ণ ভাবে তাকালে দেখা যায় কোন এক সিংহের শিকারী চোখ।

তাকরিম ইভানের দিকে তাকিয়ে চোখের পাতা নাড়ালো একবার,পরপরই কঠোর শক্ত দৃষ্টিতে তাকালো পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডের দিকে,তাকরিমের দৃষ্টির ভাষা বুঝতেই দুজন গার্ড দ্রুত বেড়িয়ে গেলো বাইরে,ঘড়ি ধরা এক মিনি ঊনত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যেই ফিরে এলো একটা চেয়ার নিয়ে।

সবাই হা হয়ে দেখছে তাকরিমকে, তার শিরায় শিরায় প্রবাহিত এটিটিউড যেনো সবার দৃষ্টি আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দু।তাকরিম এবার বাঁকা চোখে তাকালো ইভানের মুখের দিকে, তারপর আয়েশি ভঙ্গিতে বসলো চেয়ারের উপর।মিলন ঘটালো কণ্ঠনালীর,

“আমার আলেকজান্দ্রা কোথায়?”

ইভান ঠোঁট টিপে মুচকি হাসলো,মাথা চুলকে চোখ বাঁকিয়ে তাকালো চিত্রার দিকে,হেয়ালি কন্ঠে বললো,

“আলেকজান্দ্রা?সে আবার কে এমপি মশাই?”

তাকরিমের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা চিত্রা রাগে কটমট করে তাকালো ইভানের দিকে,কিছু একটা বলার জন্য ঠোঁট নাড়াতেই যাবে ঠিক তক্ষুনি ইভান উত্তেজিত কন্ঠে বললো,

“ওই যে আমার স্যার আর স্যারের ওয়াইফ চলে এসেছ,আসছি আমি।”

কথাটা বলেই ইভান এগিয়ে গেলো ত্রিজয় আর নিস্পাপের দিকে,নিস্পাপের একটা হাত বড় যত্ন করে আগলে ধরে সিড়ি ভেঙে নিচের দিকে নামছে ত্রিজয়।ইভানকে অনুসরণ করে আপাতত তাকরিম দৃষ্টি ঘুরিয়েছে সেদিকেই।তবে ইভানের চওড়া পিঠের জন্য স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না নিস্পার মুখ।

ইভান এগিয়ে গিয়ে দাড়ালো ত্রিজয়ের মুখোমুখি, তবে চোরা চোখে একবার তাকালো নিস্পার রাঙা ঠোঁটের দিকে,তারপর একটু ইতস্তত কন্ঠে ফিসফিসিয়ে বললো,

“স্যার সত্তর হাজার টাকার লিপস্টিক মুছে যাবার ভয়ে বউকে একটা চুমু খেতে কৃপণতা করলেন?”

ত্রিজয় চোয়াল শক্ত করে,গম্ভীর কন্ঠে বললো,

“আমি খেয়াল করেছি তোমার মুখের স্ক্রু ঢিলে হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।আমাকে সেলারি কাটতে বাধ্য করো না ইভান।”

সেলারির কথা উঠতেই মুখটা চুপসে ফেললো ইভান,মনে মনে আওড়ালো,

“শালা খচ্চরের বাপ তোর স্ক্রু যে ঢিলে হয়ে গিয়েছে সেটা বুঝিস না?অভিশাপ দিলাম দশ বাচ্চার বাপ হ, প্যাম্পাস কিনতে কিনতে জীবন ত্যানা ত্যানা হয়ে যাবে।”

ইভানের পেছনে নজর যাওয়া মাত্রই চকচক করে উঠলো ত্রিজয়ের চোখ,হাত বাড়িয়ে কাত করলো ইভানের ঘাড়, আরেকটু নিগুঢ় দৃষ্টিতে তাকালো এমপি তাওসিফ তাকরিমের দিকে,অস্পষ্ট কন্ঠে বললো,

“এমপি মশাই এতো তাড়াতাড়ি এসে গেছে?বাহ!”

কথাটা বলেই হাতের মুঠোয় ধরে রাখা নিস্পাপের হাতটা আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরলো ত্রিজয়,কন্ঠের সুর পাল্টে বললো,

“সামনে থেকে সর ইভান।আমার সুন্দরী বউকে স্পেশাল গেস্টের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই।”

ইভান মুচকি হাসলো, সরে দাড়ালো সামনে থেকে,নিস্পা থতমত খেয়ে বললো,

“কি হলো শরীর ঠিক আছে আপনার?জ্বর আসে নি তো?”

ত্রিজয় নিস্পাপের হাত চেপে ধরে সামনে এগোতে এগোতে বললো,
“ঠিকই তো আছে জ্বর আসবে কোন দুঃখে?”

“নিচে নেমেই সুর পাল্টে গেলো যে?জীবনে কখনোই তো এতো সুন্দর করে ডাকতে শুনি নি।”

“কেন ভালো লেগেছে নাকি?আবার ডাকবো?

“আপনার মতিগতি আমার ভালো লাগছে না।”

ত্রিজয় বক্র হাসলো, হাত ছেড়ে দিয়ে আপোষে পেচিয়ে ধরলো নিস্পাত কোমর,নাটকিয় কন্ঠে বললো,

“কেন ভালো লাগছে না জান?কোথায় প্রবলেম হচ্ছে?”

নিস্পা দাঁত কিড়মিড় করলো,মেজাজি কন্ঠে বললো,

“একদম নাটক করবেন না আমার সাথে,কোমরে হাত রেখেছেন কেন?সরান বলছি, হাটতে অসুবিধে হচ্ছে আমার।”

“কিহ!তোমার হাটতে অসুবিধে হচ্ছে।”
উত্তেজিত কন্ঠে কথাটা বলতে বলতে নিস্পাকে কোলে তুলে নিলো ত্রিজয়।পরপরই তাকরিমের উদ্বিগ্ন চোখের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বললো,

“তোমার প্রবলেম হচ্ছিলো আগে বলবে তো জান,তাহলে তো উপর থেকে কোলে তুলে নিয়ে আসতাম।”

নিস্পা ছটপট করলো, চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
“আমি যতদুর জানি এখানে অনেক মানুষ উপস্থিত,সবার সামনে এমন নির্লজ্জ হতে লজ্জা করছে না আপনার?”

“নিজের বউকে কোলে তুলেছি,অন্যের বউকে তো আর তুলি নি,লজ্জা পাবো কোন দুঃখে।”

তাকরিম অধৈর্য হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে এতক্ষণে, চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে আছে ত্রিজয়ের কোলে গুটিয়ে থাকা মোমের পুতুলটার দিকে।
চোখ জ্বলছে তার,কেউ হয়তো মরিচের গুঁড়ো ঢেলে দিয়েছে চোখে,কিন্তু বুকটাও যে জ্বলছে, কেন জ্বলছে বলতো?এই জ্বালার কারণ যে অজানা, অস্বচ্ছ।

ত্রিজয় সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছে,কোল থেকে আলতো করে নামিয়েছে নিস্পাকে।তাকরিম রোবটের মতো তখনও তাকিয়ে, কণ্ঠনালী অবস,অসহায় তার চহনি।যদি চোখে দেখতে পেতো নিস্পা?যদি দর্শন হয়ে যেত এ দুটো শিক্ত চোখের সাথে, তবে কি করতো সে?অনুতাপ হতো?নাকি আক্ষেপ হতো?
অথচ মেয়েটা তো যানেই না তার সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে,কার দুটো নয়ন জোড়া তার উপর নিবদ্ধ সেই তখন থেকে।

সমস্ত নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে,কণ্ঠনালীর মিলন ঘটালো ত্রিজয়,কুশলাদি করার তাগিদে বললো,

“কেমন আছেন এমপি মশাই? মিট মাই ওয়াইফ মিসেস তেজ।”

নিস্পা ধরতে পারলো পারলো না তার সামনে দাড়ানো মানুষ টা কে,সৌজন্যতা দেখাতে ঠোঁট নাড়ালো সে,স্মিথ হেসে সালাম দিলো,

“আসসালামু আলাইকুম।”

তাকরিম যন্ত্রণায় হাসফাস শুরু করলো,ঘনঘন নিঃশ্বাস টানলো শ্বাসকষ্টের রোগীর মতো।ক্ষতবিক্ষত জখম কন্ঠে অস্পষ্ট উচ্চারণ করলো,

“আলেকজান্দ্রা!”

চেনা কন্ঠে খুব পরিচিত ডাকটা শুনতে পেয়েই ধ্বক করে উঠলো নিস্পার হৃৎপিন্ড,কপালে পড়লো ভাজ,বিস্মিত কন্ঠে বললো,

“আপনি? ”

তাকরিম আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যার্থ,পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে মুছলো রক্তলাল চোখ,আহত কন্ঠে বললো,

“এবারেও ধোঁকা দিলে আলেকজান্দ্রা?কি অপরাধ আমার?”

নিস্পা স্তব্দ,শব্দ ফুরিয়েছে তার।
তাকরিম দু’হাতে আঁকড়ে ধরলো নিস্পার কোমল হাত,অনুনয় করে বললো,

“মজা করছো আলো?তুমি মজা করছো তাই না?কীসের বউ? কার মিসেস?আমি মানিনা, তুমি শুধু আমার।তুমি আমার মিসেস হবে, শুধু মাত্র আমার।”

শেষের কথাটুকু ধমকে বললো তাকরিম,নিস্পা আঁতকে উঠল,মুখে হাত চেপে সামলানোর চেষ্টা চালালো নিজেকে।অথচ ত্রিজয়ের ঠোঁট জুড়ে ডেবিল হাসি, এই মূহুর্তটা দেখার জন্য কতদিনের অপেক্ষা তার।অবশেষে তার অপেক্ষা স্বার্থক হলো।

তাকরিমের উচ্চস্বরের ধমকে সবার সমস্ত মনোযোগ ঘুরে গিয়েছে,উৎসুক দৃষ্টিতে সবাই তাকিয়ে আছে তাদের দিকে।চিত্রা বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে সবার দিকে তাকিয়েই দ্রুত এগিয়ে গেলো তাকরিমের কাছে,ভীতি কন্ঠে বললো,

“স্যার সবাই দেখছে,প্লিজ নিজেকে শান্ত করুন।”

“শাট আপ,একদম আমাকে জ্ঞান দিতে আসবে না।”

তাকরিম প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে চেপে ধরলো নিস্পাপের দুই বাহু,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,

“তোমার তো আমার হওয়ার কথা ছিলো আলেকজান্দ্রা,আমি তোমাকে জয় করার জন্য বিষাক্ত হয়েছি,মরন বিষ প্রান করে কবুল করেছি মৃত্যুকে,তবে প্রতারণা কেন করলে তুমি?”

নিস্পা কিছু বুঝতে পারলো না, তবে যেকোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে জড়িয়ে জড়িয়ে বললো,

“আমি আপনাকে কখনো আশ্বাস দেই নি,প্রতারণা করার প্রশ্ন আসে না।”

তাকরিম আরেকটু রেগে গেলো,চেচিয়ে বললো,

“মিথ্যা বাদি,মিথ্যা কথা কেন বলছিস?আমার বউ সেজেছিলি তুই,আমার নামে কবুল পড়ার অপেক্ষায় ছিলি তুই,কিন্তু নিয়তি সব গড়মিল করেছিলো,মৃত্যু পরি হয়ে গিয়েছিল আমাদের বিয়ের মন্ডপ,আমি শেষ নিঃশ্বাস অব্দি আঁকড়ে ধরেছিলাম তোর হাত,আমি আমৃত্যু থাকতে চেয়েছিলাম তোর পাশে।আমি আজন্ম পেতে চেয়েছিলাম তোকে।”

তাকরিম উন্মাদের মতো হাঁপালো,ঘনঘন শ্বাস টেনে বললো,

“বিশ্বাসঘাতক,সেদিন তুই বিষ মিশিয়েছিলি তাইনা?ইচ্ছে করে সব ঘটিয়েছিলি তুই।আমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য তাইতো? কিন্তু কীসের শাস্তি পাপ্য ছিলো আমার?শুধুই কি তোকে ভালোবাসার শাস্তি?”

ত্রিজয় সুযোগ লুপে নিলো এবার,নিজের শক্ত হাতের থাবায় চেপে ধরলো তাকরিমের হাত,প্রচন্ড ক্ষোভে নিস্পার কাধের উপর থেকে তাকরিমের হাতটা সরাতে সরাতে বললো,

“ছিঃ এমপি মশাই,অন্যের বউয়ের প্রতি এমন উদ্ভট আচরণ করতে লজ্জা করছে না আপনার?দেশের এমপির চরিত্র যদি এমন হয় তবে আমজনতা কি শিখবে?”

তাকরিম উত্তর খুজে পেলো না,ফ্যালফ্যাল করে কেবল তাকিয়ে রইলো নিস্পার দিকে।নিস্পা দাঁত মুখ খিচে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে,এমন পরিস্থিতিতে লড়াই করার মতো শব্দ তার কাছে নেই।

ত্রিজয় পুনরায় শক্ত করে চেপে ধরলো নিস্পার হাত,শান্ত কন্ঠে বললো,

“এতো সুন্দর প্রোগ্রামটা কেমন নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছে জান,লেট’স ডান্স বেইবি।”

ত্রিজয় নিস্পার হাত টেনে নিয়ে যেতে চাইলো কিন্তু হতে দিলো না তাকরিম,চট করেই অন্য হাত চেপে ধরে বললো,

“খবরদার আলো,ওর সাথে ডান্স করলে আমি কিন্তু সব ধ্বংস করে ফেলবো।”

ত্রিজয় বাঁকা হাসলো,আপোষ অথচ প্রচন্ড আক্রোশে আবারো ছাড়িয়ে নিলো তাকরিমের হাত।তারপর সোজা টেনে নিয়ে যেতে শুরু করলো নিস্পাকে,তাকরিম অসহায়,প্রচন্ড ক্ষোভে লাথি বসালো পাশের টেবিলটার উপর,টেবিলটা উল্টে পড়া মাত্রই ঝনঝনিয়ে ভেঙে গেলো সাজিয়ে রাখা কাচের গ্লাস গুলো।

গ্লাস ভাঙার শব্দ পেয়ে আঁতকে উঠল নিস্পা,ভয়ে আতংকে থমকে গেলো পা,কম্পিত কন্ঠে বললো,

“ক,,কি হয়েছে?কীসের শব্দ হলো মাত্র?”

ত্রিজয় ঠোঁট কামড়ে হেঁসে দিলো,বেঙ্গ কন্ঠে বললো,

” দুঃখে এমপি মশাই পাগল হয়ে গিয়েছে,আমি জান্নাতকে হারিয়েও এতো বেশি পাগল হইনি।”

____________

পাছ আয়ে, দুরিয়া ফির ভি কাম না হুয়ি…
এক আধুরি-ছি হামারি কাহানী রাহি।

আছমা কো জামি(ন), ইয়ে জরুরি নেহি, জা মিলে… জা মিলে…
ইশক ছাচ্চা ওহি, জিসকো মিলতি নেহি মানজিলে… মানজিলে।

রাঙ্গ থে, নূর ছা, জাব কারিব তু থা ……
এক জান্নাত-ছা থা, ইয়ে জাহা(ন)
ওয়াক্ত কি রেত পে, কুছ মেরে নাম ছা……
লিখকে ছোড় গায়া, তু কাহা…?
হামারি আধুরি কাহানী…

হামারি আধুরি কাহানী…
হামারি আধুরি কাহানী…

খুশবুও ছে তেরি, ইউহি টাকরা গায়ে…

চালতে চালতে, দেখো না, হাম কাহা আ গায়ে…

জান্নাতে আগার এহি, তু দিখে কিউ নেহি…

চান্দ, ছুরাজ ছাভি, হে এ্যাহা…

ইনতেজার তেরা, ছাদিও ছে কার রাহা…

তৃষ্ণার্ত হয়ে বসে আছি, কতদিন ধরে এখানে…
হামারি আধুরি কাহানী…
হামারি আধুরি কাহানী…
হামারি আধুরি কাহানী…

পেয়াছ-কা, এ ছাফার, খাতাম হো জায়েগা…
কুছ আধুরা, ছা জো থা, পুরা হো জায়েগা..

ঝুক গায়া আছমা, মিল গায়ে দো জাহা(ন)…
হার তারাফ হে মিলান-কা ছামা…
দোলিয়া হে ছাজি, খুশবুয়ে হার কাহি…

পাড়নে আয়া খুদা, খুদ ইয়াহা…

হামারি আধুরি কাহানী..
হামারি আধুরি কাহানী..
হামারি আধুরি কাহানী..

গানের তালে তালে পা মেলাচ্ছে ত্রিজয়।নিস্পা দাঁতে দাঁত খিচে চুপ করে আছে ব্যাস,যেনো কাঠে পুতুল,তাকে যেভাবে নাচানো হচ্ছে সেভাবেই নড়ছে সে।

তাকরিম হাইপার হয়ে উঠলো,তাড়াহুড়ো করে পকেট থেকে বের করলো রিভলবার,উন্মাদের মতো চেচিয়ে বললো,

“বন্ধ করো আলেকজান্দ্রা, সহ্য করতে পারছি না আমি।নিজেকে নিজে খুন করে ফেলবো বলে দিলাম।আবারো রক্তাক্ত করবো এই সুখের আসর।আমি আমার মৃত্যু দিয়ে লিখবো আরো একটি পূনর্জন্মের সূচনা।”

****

রক্ত চক্ষু,চোখে মুখে হিংস্রতা,আর কপালে ভেসে উঠা নীল রগ গুলো ক্রোধের জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ।

ডক্টর কিয়ানের নিশ্বাস ভারী, আগুন জ্বলছে দৃষ্টিতে।শোনা যাচ্ছে দাঁত চেপে ধরার ফোঁস ফোঁস শব্দ, কপালের নীল রগগুলো ফেটে বেরোনোর তোড়জোড় চলছে। রাগের তোপে থরথর করে কাঁপছে শক্তপোক্ত শরীর টা , সাথে মুঠো বাঁধা হাত দুটো কাঁপছে বেদম।

অথচ মুখে বিকৃত হাসি,যে হাসির হিংস্রতায় সামনের সবকিছু ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে এই মুহূর্তেই।
তার দৃষ্টির সবটুকু তীক্ষ্ণতা নিবদ্ধ নিস্পার কোমরআঁকড়ে ধরে রাখা ত্রিজয়ের হাতের দিকে।সেদিকে নজর স্থির রেখেই অ্যালকোহল হাতে উঠে দাড়ালো সে,বিরবির করে বললো,

“পূনর্জন্মে নিষিদ্ধ করেছিলে আমাকে, এজন্মে আমি নিষিদ্ধ ঘোষণা করলাম তোমার অপবিত্র শরীরকে। পরপুরুষের ছোয়ায় তোমার যে পাপ হয়েছে বিবি রুপাঞ্জেল।”

কথাটা বলতে বলতে কিয়ান এগিয়ে গেলো মেইন সুইচের বোর্ডের দিকে, তারপর ধিরে ধিরে বন্ধ করে দিলো মেইন সুইচ।ব্যাস! পুরো বাড়ির লাইটিং অফ হয়ে গেলো,অন্ধকারে হৈচৈ পড়ে গেলো একপ্রকার। ত্রিজয় নিস্পাকে দাড় করিয়ে এগিয়ে গেলো মেইন সুইচের বোর্ডের দিকে, ঠিক সেই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে ডক্টর কিয়ান এগিয়ে এলো নিস্পার দিকে,প্রচন্ড ক্ষোভে নিস্পার গায়ে ছুড়ে মারলো হাতের অ্যালকোহলটুকু।

নিস্পা তরলের স্পর্শ পেয়ে ভড়কে গেলো,অপ্রস্তুত কন্ঠে বললো,

“কে?”

ডক্টর কিয়ান হিংস্রভাবে হাসলো। হাতে ধরা লাইটারটা ধীরে ধীরে উঠিয়ে আনলো, নিস্পার কোমরের একেবারে কাছে। আগুনের নীল শিখা লেলিহান হয়ে উঠছে, তার প্রতিফলন কিয়ানের চোখে সৃষ্টি করেছে নরকের জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি।

অজানা নিঃশ্বাসের বাতাস পেতেই কপালের নীল রগগুলো স্ফীত হয়ে উঠলো নিস্পার, গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেলো উত্তেজনায়।

অথচ ঠোঁটের কোণে জ্বলে ওঠা ভয়াল হাসি নিয়ে কিয়ান তার মুখ এগিয়ে নিয়ে গেলো নিস্পার কানের কাছে,ফিসফিসিয়ে ডাকলো,

“বিবি রুপাঞ্জেল, অপবিত্র যায়গাটুকু আগুনে ঝলসে দিয়ে পবিত্র করে নেওয়ার অনুমতি দেও আমার রুপকথিকা।

চলবে,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here