#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:32
⭕পূনর্জন্ম বা টাইম ট্রাবল কোন ধর্মে গ্রহনযোগ্য
___________________________________________ নয়,এটি কেবল রুপকথার উপমা।
_______________________________⭕
অন্ধকার রাত। চারপাশ আচ্ছন্ন নিস্তব্ধতায়, প্রকৃতি শ্বাস নিচ্ছে নিঃশব্দে ।হঠাৎ হাওয়ায় কেঁপে উঠছে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকা গাছের পাতাগুলো ।
ঘড়ির কাঁটা ঠিক দশটা ছুঁয়েছে,চারপাশের পরিস্থিতি আন্দাজ করে গাড়ির ডিকি খুলে বের হলো অনু।প্রায় ঘন্টার বেশি সময় তাকরিমের গাড়ির ডিকিতে লুকিয়ে ছিলো মেয়েটা।যার ফলে ঘামে তৈলাক্ত হয়েছে পুরো শরীর, চুল গুলো এলো মেলো হয়ে লেপ্টে গিয়েছে ঘামের সাথে।
পালানোর জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে একটা গাড়ি সামনে পেয়েই ডিকিতে উঠে বসেছিলো অনু,সে কি আর বুঝতে পেরেছে যেই গাড়িতে উঠছে সেটা স্বয়ং এমপি মশাইয়ের গাড়ি।
***
“কে? কে আপনি? ছাড়ুন আমায়। কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে।”
খুব পরিচত কন্ঠস্বর কানে আসতেই ধ্যান ভাঙে অনুর।কন্ঠটা কার চট করে মাথায় না আসলেও আরেকবার চিৎকারের শব্দ শুনেই অনু ধড়ফড়িয়ে উঠলো,উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
“নিস্পা?”
অনু আর এক সেকেন্ডও ভাবলো না,অস্থির পায়ে দৌড়ে গেলো চিৎকারের উৎস খুজতে।কিন্তু তার যাওয়ার আগেই একটা গাড়ি হাই স্প্রিড তুললো,মাত্র ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে গাড়িটি চলে গেলো তার দৃষ্টি সীমার বাইরে।অনুর সামনে রেখে গেলো ধুলোর বৃষ্টি আর অজানা রহস্য।অনু আর এক মূহুর্ত সময় অপচয় না করে দৌড়ে গেলো বাড়ির ভেতরের দিকে।
_________
বাড়ির ড্রয়িংরুমে আলো আধারির খেলা চলছিলো প্রায় পাঁচ মিনিট বা তার কম সময়।তারমধ্যেই ত্রিজয় মেইন সুইচ অন করে পুরো ঘরে আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে।
সবাই নিজ নিজ যায়গায় দাঁড়িয়ে, তাকরিমের হাতের রিভলবারের ট্রিগার টা এখনো একই ভাবে চেপে ধরা,কিন্তু কিছু একটা মিসিং।
টানটান পরিস্থিতিময় পরিবেশে ভাসছে এক অনুচ্চারিত প্রশ্ন।
ত্রিজয় চারদিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকালো,চোখ ছোট ছোট করে বললো,
“নিস্পা কোথায়?”
তাকরিম ছটফটিয়ে উঠল। উন্মাদের মতো দৃষ্টি ঘোরালো চারপাশে, না! কোথাও নিস্পার চিহ্ন অব্দি নেই। রাগে ক্ষোভে তার চোখের মণি জ্বলে উঠল। আকাশচুম্বী ক্রোধে তেতে গিয়ে তেড়ে এলো ত্রিজয়ের দিকে। ত্রিজয়ের স্যুটের কলার চেপে ধরে গর্জে উঠল, ভেতরকার সমস্ত জ্বালা উগরে দিয়ে চেচালো,
“কু*ত্তার বাচ্চা আমার আলোকে তুই লুকিয়েছিস, কোথায় লুকিতেছিস বল।”
ত্রিজয় তাগড়া যুবক,কলারে হাত রাখায় বেশ চটেছে সে।রাগের তোপে ভুলেছে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার পরিচয়,প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে সেও পাল্টা চেপে ধরলো এমপি তাওসিফ তাকরিমের পাঞ্জাবির কলার।দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
“বউকে লুকিয়ে রাখার মতো কাপুরষ নই আমি,আমি ভালো করেই জানি নিস্পাকে তুই লুকিয়ে রেখে আমার দোষ দিচ্ছিস।আইনের মারপ্যাঁচ তোর চেয়ে ভালো আমি বুঝি।এমপি বলে নিজেকে চালাক ভাবিস না।”
মূহুর্তটা অকল্পনীয়, ড্রয়িং রুমে উপস্থিত সবাই হতবাক।একজন এমপির গায়ে হাত! কল্পনাতেও আসে না এমন দৃশ্য।অথচ ত্রিজয়ের দ্বিধাহীন শক্ত হাত এমপির পাঞ্জাবির কলারের উপর।মুহূর্তটা যেন সময়কে আরো কয়েকগুন উত্তেজিত করে তুলেছে।সবার হাতে হাতে মোবাইল,ক্যামেরায় ধারণ করা হচ্ছে ঘটিয়মান দৃশ্য।
ইতমধ্যে তাকরিমের সাথে আসা গার্ডরা এগিয়ে এসেছে, তবে তাকরিম হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়েছে তাদের,এমপির নিষেধ অমান্য করে সামনে এগোনোর সাহস করতে পারে নি তারা।
তাকরিমের চোখে তখন ঝলসে উঠলো দাবানলের শিখা।ক্রোধিত কন্ঠে বললো,
“নিজের প্রেয়সীকে লুকিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো কাপুরষ নই আমি,হালাল ভাবে দলিল করে নিয়ে যেতে এসেছি তোর চোখের সামনে দিয়ে।আমার আলেকজান্দ্রাকে কি করেছিস সত্যি করে বল।”
ত্রিজয় ক্ষুদ্ধ কন্ঠে প্রতিত্তোর করলো,
“শালা স্লাট,জাল ভোটে এমপি হয়ে পুরুষত্ব দেখাতে এসেছে।বাপের পাওয়ার না থাকলে তুই তো আমার এসিস্ট্যান্ট হওয়ারও যোগ্য হতি না।”
তাকরিমের ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ হারালো,প্রচন্ড আক্রোশে হাত তুলতো ত্রিজয়কে মারার উদ্দেশ্যে, ত্রিজয় তাকরিমের ছুড়ে দেওয়া আঘাত প্রতিহত করতে নিজের শক্ত হাত দিয়ে চেপে ধরলো তাকরিমের হাত।সামান্য সংঘর্ষ ধারন করলো অনিবার্য ধ্বংসের রুপ।
দুই আগ্নেয়গিরির মুখোমুখি অবস্থানে যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে এমন অবস্থায় বাড়ির ভেতরে দৌড়ে প্রবেশ করলো অনু,হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
” আরে হচ্ছে টা কি?এখানে বাঘে সিংহে লড়াই করছে, আর ওখানে শেয়াল মুরগী নিয়ে পালিয়েছে।”
অনুর কথা কর্ণপাত হতেই মনযোগ ঘুরে গেলো দুজনের।প্রতিবাদী হাত নামিয়ে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো অনুর দিকে।
অনু তখনও হাপাচ্ছে,গলায় পেচানো ওড়না টা দিয়ে মুচছে কপাল আর গলার ঘাম।
তাকরিম ত্রিজয়কে ছেড়ে দিয়ে এগিয়ে গেলো অনুর দিকে, সন্দিহান কন্ঠে সর্বপ্রথম প্রশ্ন ছুড়লো,
“তুমি এখানে কীভাবে এলে?”
তাকরিমের প্রশ্নে থতমত খেলো অনু,ঠোঁট টিপে চিবুক নামিয়ে নিলো দ্রুত,চোরা চোখে কয়েকবার তাকালো তাকরিমের দিকে,তাকরিম ধমকে উঠলো পুনরায়,
“কি হলো প্রশ্নের জবাব দিচ্ছো না কেন?”
অনু চকিতে তাকালো,নড়েচড়ে উঠলো তাকরিমের ধমকের তোপে,শুখনো ঢোক গিলে মাথা তুললো,ভীতসশস্ত্র চোখে তাকালো তাকরিমের কঠিন মুখাবয়বের দিকে,আমতাআমতা করে বললো,
“ইয়ে মানে আপনিই তো নিয়ে এলেন।”
তাকরিম চরম ক্ষেপলো,চাপা স্বরে বললো,
“থাপ্পড় দিয়ে গালের দাঁত ফেলে দিবো ফাজিল মেয়ে।এখানে কি করে এলে সত্যি করে বলো।”
“ইয়ে মানে,ইয়ে আমি তো পালানোর জন্য আপনার গাড়ির ডিকিতে উঠে গিয়েছিলাম,আর আপনি এখানে এসে গাড়ি থামিয়েছেন, আমিও এখানে এসেই গন্তব্য শেষ করেছি।”
তাকরিমের মেজাজ খারাপ হলো এবার,ধৈর্যে কুলিয়ে উঠতে না পেরে স্ব জোরে একটা থাপ্পড় উঠাতে চেয়েও সংযত করলো নিজেকে, আশেপাশে সবার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষলো কেবল।
ত্রিজয় এগিয়ে এসেছে ততক্ষণে।তাকরিমের চেয়ে ত্রিজয়ের হাইট একটু বেশি,তারউপর বডি ফিটনেস ভালো, তাই ত্রিজয় এগিয়ে আসতেই নজর আটকালো অনুর,পরপরই মনে পরলো সেদিনের ঘটনা,প্রচন্ড ক্রোধে তাকরিমকে ডিঙিয়ে তেড়ে এলো অনু,ঝাঝালো কন্ঠে বললো,
“আপনিই তো সেদিন নিস্পাকে কিডন্যাপ করেছিলেন।সেদিন কি করেছিলেন আমার সাথে?আমার কেন কিছু মনে পড়ছে না তখনকার ঘটনা ?”
ত্রিজয় বিরক্ত হলো,কথা বলতে চাইলো মেইন টপিক নিয়ে, জহুরি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“একটু আগে কি বলেছিলে তুমি?বাঘে সিংহে লড়াই, শেয়ালের মুরগী নিয়ে যাওয়ার মতো কিছু একটা বলেছ।”
অনুর মনে পড়লো আসল কথা, যেই কথাটা বলতেই পালিয়ে না গিয়ে বাড়ির দিকে হন্যে হয়ে দৌড়েছে মেয়েটা।ত্রিজয়ের প্রশ্নের উত্তরে এবার তাড়াহুড়ো দেখালো অনু,বললো,
“আরে হ্যাঁ! এটা বলতেই তো এসেছিলাম।আমি এই মাত্রই দেখে এলাম কেউ একজন নিস্পাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়েছে জোর করে।”
তাকরিম অবাক হলো,কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে তাকালো অনুর দিকে,অপ্রতিরোধ্য কন্ঠে বললো,
“হোয়াট?তোমার সামনে দিয়ে কেউ ওকে নিয়ে গেলো আর তুমি বাঁচাতে পারলে না?”
অনু রাগে চোখ খিচলো,নাক ফুলিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
“আজ্ঞে না, আপনার মতো গায়ের জোড় নেই আমার।”
“থাকবে কোত্থেকে? দৌড়ানো ছাড়া আর কোন কাজই তো শিখো নি জীবনে।”
“সেটাও আর ঠিক মতো শিখলাম কই,যতবার দৌড়েছি ততবারই আপনার ঘাড়ের উপর এসে পড়েছি,কোন কুক্ষনে যে আপনার গাড়ির ডিকিতেই উঠতে হলো আমার।”
ত্রিজয় এবারেও বিরক্ত হলো এদের ঝগড়ায়,কপট মেজাজ দেখিয়ে বললো,
“বাজে বকা বন্ধ করো,কে নিয়ে গিয়েছিলো নিস্পাকে?লোকটার চেহারা দেখেছিলে?”
“না।” ছোট্ট উত্তর দিলো অনু।
“তাহলে কি দেখেছিলে, এমন কিছু যেটার মাধ্যমে লোকটাকে আইডেন্টিফাই করা যাবে।”
“গাড়ি, শুধু গাড়িটাই দেখেঁছিলাম।কালো রঙের ছিলো।”
ত্রিজয় দাঁতে দাঁত পিষলো,হিসহিসিয়ে বললো,
“গাড়ির রঙ ধুয়ে পানি খা ছেমরি।”
***
তাকরিম দু সেকেন্ড ভাবলো চুপচাপ, তারপর এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,
“গাড়ি দেখেছ, গাড়ির রঙ দেখেছ, তার মানে তো গাড়ির নাম্বার প্লেট ও দেখার কথা।গাড়ির নাম্বার মনে আছে?”
অনুর উত্তরের আগেই তাকরিম ঘুরে তাকালো ত্রিজয়ের দিকে, তৎপর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“পার্কিং লডে সিসি ক্যামেরা আছে?”
ত্রিজয় ভ্রু গোটায়,ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলে,
“ওসব আজাইরা জায়গায় টাকা নষ্ট করার মতো টাকা আমার নেই।”
তাকরিম, দাঁতে দাঁত পিষে নিজেকে সংযত করে বললো,
“তাহলে নিশ্চয়ই ড্রয়িং রুমে আছে।”
“একবারই তো বললাম,এসব আজাইরা কাজে টাকা নষ্ট করি না আমি।”
তাকরিম ধৈর্য ধরেও ব্যার্থ হলো এবার,রাগে গিজগিজ করে বললো,
“তাহলে আমার কাছে খবর পাঠাতি, দু চারটে সিসি ক্যামেরা ভিক্ষে পাঠিয়ে দিতাম।”
ত্রিজয় ঠোঁট চেপে ব্যাঙ্গ হাসলো,ইভানের দিকে তাকিয়ে বললো,
“শুনছো ইভান কি বলছে?এতোক্ষণ আমার বউকে ভিক্ষা চেয়ে মরা কান্না জুড়ে দেওয়া ভিক্ষুক নাকি আমাকে ভিক্ষা দিবে।”
তাকরিম ক্ষেপে গেলো,তেড়ে এসে বললো,
“এই একদম বাজে কথা বলবি না বলে দিলাম, জ্বিভ টেনে ছিড়ে ফেলবো।”
ত্রিজয় কম যায় না, প্রতিত্তোরে বললো,
“জ্বিভ কি তোর বাপের টাকা খেয়ে বড় করেছি রে শালা?জ্বিভে হাত পৌছানোর আগে জনগনের টাকায় লম্বা করা হাতটা কেটে আলাদা করে ফেলবো।”
অনু ভ্যাবাচ্যাকা খেলো,দুজনের তর্কাতর্কিতে বেচারা কি করবে বুঝে উঠতে পারলো না, দ্রুত কন্ঠে বললো,
“দেখেছি, আমি গাড়ির নাম্বারটা দেখেছি।”
_________
অনু নিঃশ্বাস বন্ধ করে গাড়ির নাম্বারটা বলে ফেললো শেষমেশ।অনুর বলা গাড়ির নাম্বারটা শুনেল্ল বজ্রাঘাতের মতো ছটপটিয়ে উঠলো তাকরিম।পাঞ্জাবির পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ফোন ছুড়ল পরপর পাঁচটি থানায়, প্রত্যেকটা থানার ওসিকে কোনো ভূমিকা ছাড়াই বললো,
” দশ মিনিটের মধ্যে গাড়িটির লোকেশন খুজে বের করো ইমিডিয়েট।”
তাকরিম অস্বাভাবিক ভাবেই উত্তেজিত হচ্ছিলো বারবার,ভালোবাসায় অন্ধ, আতঙ্কে কাতর, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা এক পাগলপ্রায় প্রেমিক তার প্রেয়সীকে খুঁজে পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠছিলো প্রতিটি সেকেন্ডের সাথে পাল্লা দিয়ে।
নিজেকে কোন ভাবেই স্থির করতে পারলো না তাকরিম,রিভলবারটা কোমরে গুঁজে অনুর হাত শক্ত করে ধরে ছোট্ট করে বললো, “চলো,
রাস্তার সব ট্র্যাফিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনটি কালো এসইউভি নিয়ে ঝড়ের গতিতে রওনা দিলো তাকরিম।একটায় সে নিজে, অনু এবং চিত্রা, আর বাকি দুটি গাড়িতে তার গার্ড এবং দপ্তরের বিশ্বস্ত নিরাপত্তাবাহিনী।
মাত্র ত্রিশ মিনিটের মধ্যে শহরের চারদিক থেকে ছুটে এলো ছয়টি পুলিশের গাড়ি, সাইরেন বাজিয়ে, হেডলাইট জ্বালিয়ে, রাস্তার ট্র্যাফিক ছিঁড়ে ফেলে তারা এগিয়ে যাচ্ছে এক অন্ধ মেয়ের খোঁজে। প্রতিটি গাড়িতেই রয়েছে রাইফেলধারী পুলিশ।
____________
এতো আয়োজনের মধ্যে নির্বিকার ত্রিজয়।সে ব্যাস্ত তার নিজ আয়োজনে।তার নীল চোখের নেত্রমনি জুড়ে তীক্ষ্ণতা, যার সবটুকু ল্যাপটপের উপর নিবদ্ধ।
ইভান পাইচারি করছে সমান তালে,ত্রিজয়ের এমন খামখেয়ালি নিরবতায় ধৈর্য হারালো সে,অধৈর্য হয়ে বললো,
“স্যার আপনি কি করতে চাইছেন একটু বলবেন?এমন একটা পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখেছেন কি করে।”
“চুপ থাকো ইভান,ইদানীং একটু বেশিই কথা বলছো তুমি।”
ইভান চুপ করলো না, বরং আফসোসের সহিত বললো,
“কতবার বলেছি স্যার একটা সিসি ক্যামেরা লাগাতে, শুনলেন না তো আমার কথা,আজ একটা ক্যামেরা থাকলে কত ভালো হতো,অন্তত কিডন্যাপারকে আইডেন্টিফাই তো করা যেতো।”
ত্রিজয় ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে তাকালো, ছোট্ট করে বললো,
“ওই এমপির মতো টাকার চুলকানি নেই আমার।”
ইভান কটমট করে তাকালো, বিরবির করে বললো,
“শালা কিপটে মরার পর টাকা কবরে নিয়ে যাস।”
ত্রিজয় ফোস করে নিঃশ্বাস নিলো,ল্যাপটপ টা বন্ধ করে বললো,
“আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাপ কি জানো ইভান?”
“কি স্যার?”
“ওই মেয়েটাকে বিয়ে করা।শালা আগের জন্মে কি এমন পাপ করেছি যে এই মেয়েটাকে নিজ ইচ্ছেতে বিয়ে করতে হলো আমার?”
“স্যার আমার তো মনে হয় আগের জন্মে শুধু পাপি ছিলেন না আপনি, নিশ্চয়ই কোন স্বৈরাচারি ছিলেন।”
“বাজে বকা বন্ধ কর বেয়াদব,আমি না হয় পাপ করে বিয়ে করেছি, ওই এমপি মশাই না হয় গাঁধা হয়ে ভালোবেসেছে, কিন্তু এখন আবার কোন পাগলের আমদানি হলো বলতো?আমরা দুজন কি কম ছিলাম।”
“নিস্পা ম্যামের জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছে স্যার।”
“মীর জাফরের মতো কেন কথা বলছো ইভান?ওই মেয়েতো মেয়ে নয় আস্ত একটা ঝামেলার কারখানা, ওর জন্য যে আমার জীবনটা তেজপাতা হয়ে গেলো আমার জন্য মায়া লাগছে না তোমার?”
ইভান থতমত খেলো,কিছু একটা বলার জন্য উদ্যত হতেই থামিয়ে দিলো ত্রিজয়,বললো,
“বাইকের চাবিটা নিয়ে এসো কুইক।”
“কোথাও যাবেন স্যার।”
“যাবেন আবার কি?বউ হারিয়ে গিয়েছে এখন খুজতে না গেলে তো ফিরে এসে কাপুরষ বলবে।”
“কি করে খুজবেন স্যার?গাড়ির লোকেশন তো আপনি জানেন না।”
“গাড়ির লোকেশন জানতে হবে না,ওর শাড়িতে আমি ট্রেকার লাগিয়ে দিয়েছিলাম।ও কোথায় আছে লোকেশনও পেয়ে গিয়েছি।”
______________
উঁচু সবুজ টিলার উপর দাঁড়িয়ে আছে একটি ভবন।পাথরের তৈরি বিশাল ভবনটি বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় কয়েক শতাব্দী আগের কোনো জমিদার বাড়ি। প্রবেশপথের সামনে পুরোনো যুগের মত দাঁড়িয়ে আছে সিংহের মূর্তি, লোহার ফ্রেমে বাঁধানো ভারী কাঠের দরজা । ছাদের গম্বুজ আর বারান্দাগুলিতে রাজকীয় রীতি মেনে বানানো আছে নকশা।
ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় প্রবেশহলের মাঝখানে একটি স্বচ্ছ কাচের ছাদওয়ালা অ্যাট্রিয়াম, যেখানে সোনার পাতের পুরোনো ঝাড়বাতির পাশেই আধুনিক স্মার্ট লাইটিং সিস্টেম যুক্ত করা হয়েছে।
দেয়ালে প্রাচীন যুগের তৈলচিত্র, তার নিচে হিডেন স্পিকার থেকে ভেসে আসছে শান্ত ধ্রুপদী সঙ্গীত।
নিস্পাকে রাখা হয়েছে সুবিশাল একটি ঘরে,ঘরটির মেঝে মোজাইক পাথরের,দেয়ালে বসানো আছে ইনটারঅ্যাকটিভ স্ক্রিন, যেখানে সংরক্ষিত নিস্পার শ খনেক ছবি।নিস্পাকে আনার সময় ক্লোরোফোম দিয়ে অবচেতন করে এনেছিলো কিয়ান।তবে এখন ধিরে ধিরে মস্তিষ্ক সচল হচ্ছে নিস্পার,ঘুমের মধ্যেই টিপটিপ করছে চোখ,দূর থেকে ভেসে আসা ধ্রুপদী সঙ্গীত সরাসরি ঢুকে যাচ্ছে নিস্পার কর্নগহ্বরে।
নিস্পা চোখ বন্ধ করে হাসফাস করছে,ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলছে মুখ হা করে,তার পরপরই শুনতে পায় একটা ডাক,
“রুপাঞ্জেল,রুপাঞ্জেল, আমার রুপকথিকা।
নিস্পা মাথা নাড়াচ্ছে, সে শুনতে চায়না এই ডাক,খুব চেষ্টা করলো এই ডাকের কবল থেকে নিস্তার পেতে,অবশেষে কিছুক্ষণের মধ্যেই থেমে গেলো ডাকটা ,অত:পর তাকে আরেকটু যন্ত্রণা দিতে ভেসে এলো,
” আলেকজান্দ্রা, আমার আলেকজান্দ্রা, আমার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।”
নিস্পা দাঁতে দাঁত চাপলো, ঘুমের ঘোরে খামচে ধরলো বিছানার নরম চাদর,সে এবারেও শুনতে চাইলো না এই ডাক,কান বন্ধ করার প্রয়াসে ছটপট শুরু করলো কেবল।
পরপরই তার যন্ত্রনাকে আরেকটু তীব্র করে দিয়ে ভেসে এলো এক যাদুকরী কন্ঠ,
“ব্লু ব্লাড গার্ল,কোথায় তুমি?শুনছো নীল রক্তের মেয়ে, মুক্তির আশা ছেড়ে দেও বাকি সাত জন্মের জন্য।”
নিস্পা আর সহ্য করতে পারলো না, ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠলো একপ্রকার,ভয়াতুর কন্ঠে চেচালো,
“শুনতে চাই না, শুনতে চাই না আমি।আমাকে ডেকো না, আমাকে কেউ ডেকো না এভাবে।”
কথাটা বলতে বলতেই হাঁপালো নিস্পা,হাত দিয়ে মুছতে শুরু করলো গলা ঘাড়ের তৈলাক্ত ঘাম।তারপর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ করে বোঝার চেষ্টা চালালো তার বর্তমান অবস্থান।কিন্তু নিস্পা বুঝতে পারলো না নিজের অবস্থান,যায়গাটা নতুন,একেবারেই নতুন মনে হচ্ছে,এই বিছানা আর বিছানার চাদর টাও নতুন,কই আগের সেই গন্ধ পাচ্ছে না তো।আপাতত মনে হচ্ছে সময় থেমে আছে এক অনন্ত ঐশ্বর্যের মধ্যে,তার চারপাশে কোন পরিচিত গন্ধ নেই,বাতাসে ভাসছে কেবল চন্দনের গন্ধ।
কে নিয়ে এলো তাকে?কোথায় নিয়ে এলো?বোঝার চেষ্টা চালাতে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াতে চাইলো নিস্পা।কিন্তু হলো না, বিছানা থেকে নামার জন্য পা বাড়াতেই ভেসে এলো ভরাট পুরুষালী কন্ঠ,
“এতো তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে গেলো?”
নিস্পা কপাল কুচকালো,অপরিচিত, সম্পূর্ণ অপরিচিত এই কন্ঠস্বর,আগে কখনো শুনেছে বলে তো মনে হয় না।নিস্পা শুখনো ঢোক গিললো, বাড়িয়ে দেওয়া পা গুটিয়ে নিয়ে, ভীত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কে? কে আপনি?”
ডক্টর কিয়ান এগিয়ে এলো, হাতে ধরে রাখা খাবারের প্লেট টা টেবিলের উপর রেখে, ধিরে সুস্থে বসলো নিস্পার পাশে,তারপর শান্ত সাবলীল কন্ঠে বললো,
“আমাকে চিনতে পারো নি রুপাঞ্জেল? আমি হানিফ,আব্দুল হানিফ।যে তোমাকে পাওয়ার লোভে নিজের আপন মানুষ গুলোর গলা কেটেছে নির্দিধায়।”
কিয়ানের কথা শুনে চমকে উঠলো নিস্পা,কাঁটা দিয়ে উঠলো গায়ে,কন্ঠে কাঠিন্যতা বজায় রেখে বললো,
“কি বলছেন আপনি এসব?আপনার মাথা ঠিক আছে?”
“ঠিক আছে রুপ,আমার মাথা এবং মস্তিষ্ক দুটোই ঠিক আছে।কেবল তুমি ঠিক নেই, তুমি ভুলে গিয়েছ তোমার অতীত, তোমার ভালোবাসা, প্রথম প্রেম আব্দুল হানিফ কে।”
“অসম্ভব, এসব আপনি কি বলছেন?আমার কোন অতীত নেই,নাতো আমার কোন প্রেম আছে।একদম অবান্তর মিথ্যা কথা বলবেন না।”
ডক্টর কিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেললো,কন্ঠ নরম করে বললো,
“আমার জালে ধরা পরা রুপসী তুমি,আমার হৃদয়ের একমাত্র প্রেম।তোমাকে পাওয়ার লোভ আমাকে খুনি বানিয়েছে, তোমাকে জয় করে নেওয়ার লোভ খুন করেছে আমাকে।”
কিয়ানের কথার আগা মাথা কিছুই বুঝলো না নিস্পা,শুধু ভাবলো সত্যবীনা পাখির কথা,সত্য বীনা পাখিতো তার অতীত সম্পর্কে সচেতন করেছিলো,তার জীবনে দুজন পুরুষের অস্তিত্ব সম্পর্কেও বলেছিলো কিন্তু কই তৃতীয় কোন ব্যাক্তির কথা তো বলে নি,এই আব্দুল হানিফ তাহলে কে?তার সাথে কীসের সম্পর্ক নিস্পার?
চলবে,,,,,,,,,
(স্পয়লার টা মিস হয়ে গিয়েছে, তবে পরবর্তী পর্বে থাকবে অবশ্যই)

