হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পর্ব:33

0
35

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:33

“ভালোবাসা কেবল এক জন্মের উপাখ্যান নয়,সাত জন্মের মহাকাব্য।পূর্ণতার এক অনন্ত যাত্রা।ভালোবাসা যদি বেঁচে থাকে তবে তা ফিরবেই,হয়তো অন্য কোন শরীরে, নয়তো নতুন কোন সন্ধ্যায়।ঠিক যেমন আমি ফিরে এসেছি,মৃত্যুকে জয় করে।”

নিস্পা বিরক্ত,তখন থেকে একই কথা শুনতে শুনতে তিক্ততা ছড়িয়ে পড়েছে মস্তিষ্কে,অথচ কিছু করার নেই,মুখ বুজে এই লোকের পাগলামি সহ্য করতে হবে আপাতত।

“তুমি বিশ্বাস করো না পূনর্জন্মে, অথচ আমি বিশ্বাস করি অবিনাশে,যেখানে ভালোবাসা আছে সেখানে মৃত্যু নেই।আত্মার টানে আত্মা ঘুরে ফিরে জন্ম নেয় বারবার।”

কথাটা বলতে বলতে নিস্পার মুখের সামনে খাবার এগিয়ে দিলো কিয়ান।ছোট করে বললো,

“হা করো।”

নিস্পা মুখ ফিরিয়ে নিলো,দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত হয়ে বসে রইলো টু শব্দ বিহীন।কিয়ান প্রতিক্রিয়া বিহীন আবার বললো,

“হা করো বলছি।”

নাহ!এবারেও নিজের জেদ বজায় রেখে মুখবুজে বসে আছে মেয়েটা।কিন্তু কিয়ান অধৈর্য,এক হাতে চেপে ধরলো নিস্পার গাল,জোর করে খাবার মুখে দিতে দিতে বললো,

“চুপচাপ খাবারটা খেয়ে নেও বলছি।”

নিস্পা শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে প্রতিহত করলো,ঘৃনায় খাবার টুকু ফেলে দিলো মুখ থেকে,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,

“একদম জোর করবেন না বলে দিলাম।আমি খাবো না বলেছি তো খাবো না,আমাকে আমার বাড়িতে পৌঁছে দিন।সাইকো একটা।”

কিয়ান প্রচন্ড ক্ষেপে গেলো এবার,ঠাস করে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো নিস্পার গালে,পরপর আরো একটি থাপ্পড় বসানো মাত্রই ফেটে গেলো নিস্পার ঠোঁট,নিস্পা টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়লো বিছানায়,গালে হাত রেখেই ভয়ে কেঁদে উঠলো হেচকি তুলে।

কিয়ানের অভিব্যক্তি পাল্টে গেলো মূহুর্তেই,ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে দু হাতে টেনে বসালো নিস্পাকে, তারপর ঠিক আগের মতোই নিস্পার মুখে খাবার দিতে দিতে বললো,

“আনাড়ি কেন করছো রুপাঞ্জেল?তোমার মনে নেই, আমি কত যত্ন করে তোমাকে খাবার খাইয়ে দিতাম?তখন কি মারতাম বলো?কেন রাগিয়ে দিচ্ছো আমাকে?লক্ষি মেয়ের মতো পুরো খাবারটা শেষ করো তো তাড়াতাড়ি। ”

নিস্পা ভয়ে গুটিয়ে গেলো,টু শব্দটিও করলো না আর।বাধ্য মেয়ের মতো একের পর এক হা করে খাবার গিললো রোবটের ন্যায়।

নিস্পাকে খাইয়ে দিয়ে উঠে দাড়ালো কিয়ান।আলতো হাত রাখলো নিস্পার গালের উপর, শান্ত কন্ঠে বললো,

“অনেক রাত হয়ে গিয়েছে ঘুমিয়ে পড়।যদি ঘুম পাড়াতেও জোর করতে হয় তবে কিন্তু তার নমুনা ভিন্ন হবে।”

কথাটা বলতে বলতে ঝুকে এলো কিয়ান,নিস্পার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,

“আমি কিন্তু এই বিছানায় ঘুমাতে বাধ্য হবো রুপাঞ্জেল।”

নিস্পা আঁতকে উঠল,খামচে ধরলো শাড়ির আঁচল,কম্পিত কন্ঠে বললো,

“নাহ!ঘুমাচ্ছি, ঘুমাচ্ছি আমি।”

***

গোটা একটা দিন কেটে গিয়েছে। কিয়ানের টর্চারে নাজেহাল মেয়েটা।ভয়ে তটস্থ, জড়োসড়ো আত্মাখানি ছেড়েছে মুক্তির আশা।আর হয়তো কেউ আসবে না,তাকে নিয়ে যাওয়ার মতো কেউ নেই।ত্রিজয় হয়তো হাপ ছেড়ে বেঁচেছে।তার মতো মেয়েকে আর কেনই বা খুজবে সে।কথাগুলো ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ্বাস ফেললো নিস্পা।মাথা এলিয়ে দিলো বালিশে।

বিকেল চারটে নাগাদ,কিয়ান আবার এসেছে নিস্পার ঘরে।খালি হাতে নয়,প্রতিবারের মতো এবারেও হাতে কিছু একটা নিয়ে এসেছে।

যতটা বোঝা যাচ্ছে বেনারসি শাড়ি,সাথে দামি অলংকারও আছে কিছু।
জিনিসপত্র গুলো হাতে নিয়ে বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে এলো কিয়ান,নিস্পার উদ্দেশ্যে বললো,

“শাড়ি, গহনা, কসমেটিকস সবকিছু রাখা আছে এখানে।সন্ধ্যা বেলায় পড়ে লক্ষি মেয়ের মতো বসে থাকবে।”

নিস্পা কপাল কুচকালো, ভীত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো ,

“কেন?আমি এসব কেন পড়তে যাবো?”

কিয়ান ঠান্ডা কন্ঠে উত্তর দিলো,

“পড়বে,কারণ আজ রাতে আমাদের বিয়ে হবে।”

নিস্পা ঘাবড়ালো, আতংকিত কন্ঠে বললো,

“কিন্ত আমি,,,,

” হুশশ।”কিয়ান তার আঙুল নিস্পার ঠোঁটের উপর রাখতেই থেমে গেলো নিস্পা।

কিয়ান কঠোর কন্ঠে বললো,

“কোন কিন্তু নেই রুপ।আমার কথাই এখানে শেষ কথা।”

কথাটা বলেই চলে গেলো কিয়ান।নিস্পা অসহায়ের মতো বসে পড়লো হাটু ভেঙে,ডুকরে কেঁদে উঠে মিনতি করলো প্রভুর নিকট,

“এ কেমন গোলক চক্রে ফেলে দিলে খোদা?এতো নির্মম পরিহাসই কেন আমার জন্য বাছাই করা হলো?তোমার উপর ভরসা,তুমি বাঁচাও খোদা,কাউকে অন্তত পাঠাও আমাকে বাঁচিয়ে নেওয়ার জন্য।”

ঠিক তক্ষুনি নাকে ধরা দিলো পরিচিত স্মেল।ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো নিস্পা,অস্পষ্ট অবিশ্বাস্য কন্ঠে বললো,

“আমার বিশ্বাস হচ্ছে না আপনি এখানে এসেছেন।”

নিস্পার আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে অবাক হলো ত্রিজয়,বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে উঠলো,

“আমি এসেছি কি করে বুঝলি?”

“আমি আপনার ফারপিউমের ঘ্রাণ পেয়েছি।”

ত্রিজয় ঠোঁট আর ভ্রু একসাথে উচিয়ে বললো,
“বাহ!বেশ ইন্টালিজেন্ট তো তুই।”

নিস্পা মুচকি হাসলো, হুট করেই ভুলে গেলো ভয় ডর,প্রশ্ন করে বললো,

“আপনি এখানে কীভাবে এলেন?”

নিস্পার প্রশ্নটা একদমই পছন্দ হলো না ত্রিজয়ের।দাঁতে দাঁত চেপে চাপা স্বরে বললো,

“গন্ধ শুখে এসেছি, ফাজিল কোথাকার।”

নিস্পা মুখের ভঙি স্বাভাবিক রেখে বললো,

“আপনি গন্ধ শুখতে পারেন?আমি তো জানতাম এই ক্ষমতা শুধুমাত্র কুকুরের আছে।”

“বাকি রেখেছিস কি?আমি জাস্ট ভাবতে পারছি না তোর মতো কানার মধ্যে আছে টা কি?তিন তিনটা বেডা কুত্তার মতো কামড়াকামড়ি শুরু করেছে কোন লজিকে?”

“তার মানে আপনি বলতে চাইছেন তিন কুকুরের মধ্যে আপনিও একজন সদস্য।”

ত্রিজয় চোখ রাঙিয়ে তাকালো নিস্পার দিকে,হিসহিসিয়ে বললো,

“থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিবো বেয়াদব।তোর কোন দিক থেকে ডগ মনে হয় আমকে?”

“যাহ বাবা!আপনিই তো বললেন।”

নিস্পার প্যাচপ্যাচানিতে বিরক্ত হলো ত্রিজয়,প্রসঙ্গ পাল্টে বললো,

“ডক্টর কিয়ান নামে কাউকে চিনিস?”

“কেন বলুনতো?”

“যে তোকে কিডন্যাপ করেছে তার নাম ডক্টর কিয়ান,এখন বল চিনিস কি না?”

নিস্পা ভ্রু গোটাল,কিঞ্চিৎ বিস্মিত কন্ঠে বললো,

“উনার নাম কিয়ান হলে উনি যে আমাকে নিজের নাম আব্দুল হানিফ বলল?”

প্রশ্নের উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন শুনে রাগ হলো ত্রিজয়ের,চোখ মুখ শক্ত করে বললো,

“যেই নামই হোক, চিনিস কিনা সেটা বল?”

নিস্পা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো,গভীর ধ্যানে ভাবলো কিছু একটা, তারপর ভাবুক কন্ঠে বললো,

“ডক্টর বলে তো কাউকে চিনি না,কিন্তু কিয়ান নামে একজনকে চিনতাম আমি।”

ত্রিজয় চোখ কুচকে জিজ্ঞেস করলো,

“কি করে চিনতিস?”

“আমার চোখের অপারেশন করেছিলো যেই ডক্টর, তার ছেলের নামও কিয়ান ছিলো।”

“ডক্টরের নাম কি ছিলো?”

নিস্পা ভাবলো, কিন্তু মনে করে উঠতে পারলো না,ফোস করে উত্তর দিলো,

“মনে পড়ছে না।”

ত্রিজয়ের প্রচন্ড রাগ হলো এবার,রাগান্বিত কন্ঠে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,

“অপারেশন করেছে ডক্টর অথচ তার ছেলের নাম মুখস্ত করে রেখেছিস?বাহ!লা জবাব।”

“এভাবে কেন বলছেন?আমি তখন বাচ্চা ছিলাম, কিয়ান ভাইয়া তখন স্টুডেন্ট। আমার বাবা মারা যাওয়ার পর উনিই উনার বাবাকে রিকুয়েষ্ট করে উনার বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন আমাকে।উনার বাবা বেশি সময় হসপিটালে থাকতো আর কিয়ান ভাইয়া আমাকে নিয়ে খেলতো, সময় কাটাতো।একটা ভালো ফ্রেন্ডশিপ ছিলো আমাদের।”

“তাহলে এতোদিন কোথায় ছিলো হারামজাদা?”

“উনি পড়াশোনার জন্য বিদেশ যাওয়ার পর আর কখনো যোগাযোগ হয়নি।আমি দাদির সাথে আমার বাড়িতে ফিরে এসেছিলাম।তাই এসব ব্যাপারে আমি কিছু জানিনা।”

“আমার তো মনে হচ্ছে এই ডক্টর কিয়ানই তোর ফ্রেন্ড কিয়ান।কিন্তু শালা তোকে পরিচয় না দিয়ে ডিরেক্ট কিডন্যাপ কেন করলো?”

“অসম্ভব, যদি উনি সেই কিয়ানই হয় তাহলে নিজের নাম না বলে হানিফ বললো কেন?”

“বাড়তি প্রশ্ন করিস না, তোর জন্য এমনিতেই মাথা হ্যাং হয়ে যাচ্ছে।শালা একটা কানা যে এভাবে জীবন ত্যানা ত্যানা বানিয়ে দিবে ভাবতেই পারি নি।”

শেষের কথা টুকু বলেই ত্রিজয় স্ব জোরে লাথি বসালো পাশের একটা টেবিলের উপর।টেবিলটা কিঞ্চিৎ নড়ে উঠতেই টেবিলের উপর ফুলদানি টা কাত হয়ে পড়ে গেলো ফ্লোরে।ব্যাস!ঝনঝনিয়ে শব্দ হলো ফুলদানি ভাঙার।

নিস্পা ঘাবড়ে গেলো,চট করেই চেপে ধরলো ত্রিজয়ের হাত।তড়িৎ বললো,

“কি করলেন এটা? এতো জোরে শব্দ শুনে ওই পাগলটা এক্ষুনি এসে পড়বে।”

ত্রিজয় শুখনো ঢোক গিললো,নীল নেত্রমনিতে ধরা দিলো নেশা,দৃষ্টি নিবদ্ধ হাতের উপর,যেখান টায় দু হাত দিয়ে খামচে ধরে আছে নিস্পা।হুট করেই কিছু একটা হলো হৃদয় গভীরে,মাদকিয় কন্ঠে বললো,

“বুঝে শুনে ধরলি তো?”

নিস্পা কপাল কুচকালো,টের পেলো নিজের আঙুল গুলো দিয়ে ত্রিজয়ের হাত শক্ত করে খামচে ধরে আছে সে।বিষয় টা বুঝতে পেরেই ইতস্ততে নতজানু হলো মেয়েটা,ধিরে ধিরে হাতটা সরিয়ে নিতে চাইলো কিন্তু হলো না, তার আগেই ত্রিজয় খপ করে চেপে ধরলো আবার,চটপটে কন্ঠে বললো,

“ধরেছিস যখন ছাড়াছাড়ি নেই, চল পালাই।”

নিস্পা বিস্মিত হলো,একটু বিমূঢ় কন্ঠে বললো,

“আপনি চোরের মতো পালাবেন?”

“তো কি?নিজেকে নায়িকা ভাবা বন্ধ কর,আমার মতো হিরো যার-তার জন্য মারামারি করে না, তোর জন্য তো কখনোই না।”

কথাটা বলতে বলতে নিস্পাকে কোলে তুলে নিলো ত্রিজয়,নিস্পা ভড়কালো, ব্যাপারটার জন্য একদমই প্রস্তুত ছিলো না সে,উত্তেজিত কন্ঠে বললো,

“একি কোলে নিলেন কেনো?আমি হেঁটে যেতে পারবো।”

ত্রিজয় আরেকটু শক্ত করে দু’হাতে পেচিয়ে ধরলো নিস্পাকে,ভরাট কন্ঠে বললো,

“তোকে হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়ে ধরা পড়বো নাকি?তুই যে কানা এটা বারবার ভুলে যাস কেন?”

নিস্পা পড়ে যেতে নিলে দুই হাতে আঁকড়ে ধরলো ত্রিজয়ের গলা,বড় শ্বাস টেনে বললো,

“আমি অন্ধ হলেও চলাচল করতে পারি সেটা বোধহয় আপনি ভুলে যান।”

ত্রিজয় উত্তরে কিছু বললো না, তার সমস্ত তীক্ষ্ণতা আপাতত ঘরের বাইরের দিকে।ডক্টর কিয়ানের চোখের সামনে দিয়ে নিস্পাকে নিয়ে গেলে যেকোনো সংঘাত বেধে যেতে পারে সে কথা খুব ভালো ভাবেই আন্দাজ করতে পারছে ত্রিজয়।
মারামারির হাত কাঁচা তার।বলা চলে একেবারেই অপটু।তার ক্ষমতা হিপনোটাইজ অব্দিই সীমাবদ্ধ।তবে অস্থির, অস্থিতিশীল মানুষ কে হিপনোটাইজ করা অসম্ভব।ডক্টর কিয়ানের মুখোমুখি হলে তাকে সম্মোহনের চেষ্টা করাটা হবে বোকামি, তাই নিস্পাকে নিয়ে পালানোটাই এখন বেস্ট অপশন।

ত্রিজয় নিস্পাকে নিয়ে ধিরে ধিরে এগোচ্ছে। করিডোরের প্রতিটি ধাপে পা ফেলা মাত্রই তার হৃদস্পন্দন দ্বিগুণ হয়ে উঠছে। নিস্পা স্পষ্ট শুনছে সেই দাপাদাপির শব্দ।

প্রায় পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আ্যট্রিয়ামে এসে পৌছালো ত্রিজয়।এই খোলা যায়গাটা পেরোলেই বাড়ি থেকে বেড়োনোর দরজার কাছে পৌছাতে পাড়বে তারা।ত্রিজয় এদিক সেদিক তাকিয়ে নিলো পুনরায়,তারপর পা বাড়িয়ে দিলো সম্মুখে,ঠিক তক্ষুনি কয়েকজন মুখোশধারি লোক ঘিরে ধরলো তাদের।প্রায় দশ বারোজনের মতো হবে,যাদের পক্ষে ত্রিজয়ের একা লড়াই করা সম্ভব নয় বললেই চলে,আর এরা যে কিয়ানের লোক সেটা অনেক আগেই বুঝে গিয়েছে সে,ত্রিজয় খুব সাবধানে এক পা এক পা পিছু হাটতে চাইলো,কিন্তু সেই মূহুর্তেই পেছন থেকে ভেসে এলো ধারালো ছুরির মতো কন্ঠ,

“বিবি রুপাঞ্জেল কে স্পর্শ করে একদমই ঠিক করলি না তুই।”

ডক্টর কিয়ানের কন্ঠস্বর তীব্র শীতল ছুরির ন্যায় বয়ে গেল নিস্পার মেরুদণ্ড বরাবর। ত্রিজয় দাঁতে দাঁত চেপে চোখ খিচে বন্ধ করলো, দাঁড়ালো শিরদাঁড়া শক্ত করে,তারপর নিস্পাকে দু’হাতে আগলে রেখেই পেছন ফিরল ধীরে ধীরে । একটা লোহার দন্ড হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ডক্টর কিয়ান।

নিস্পার ঠোঁট কেঁপে উঠল,আতংকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ত্রিজয়ের গলা, ফিসফিসিয়ে বললো,
“এবার কি করবেন?”

ত্রিজয়ের চোখের ভাষা অস্পষ্ট।অথচ ডক্টর কিয়ানের দৃষ্টিতে এক আশ্চর্য অস্থিরতা,যেই দৃষ্টি সম্মোহন করতে ব্যার্থ হচ্ছে ত্রিজয়।

এদিকে ত্রিজয়ের স্থির শক্ত দৃষ্টিকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো কিয়ান, সাথে এগিয়ে এলো লোকগুলোও।

কিয়ান এগিয়ে আসতেই ত্রিজয় নিস্পাকে নিজের বুকের দিকে টেনে নিলো আরেকটু,পেছন হাঁটতে শুরু করল আবার ।
কিন্তু আচমকাই রডের আঘাত এসে আছড়ে পড়লো ত্রিজয়ের মাথার পেছন দিকে,ধুপধাপ আরো কয়েকটি আঘাত এসে পড়লো দুই বাহু এবং মেরুদণ্ড বরাবর।ত্রিজয়ের হাত আলগা হয়ে এলো,চোখ শক্ত হয়ে এলো যন্ত্রনায়,তবুও ছাড়লো না নিস্পাকে।কিয়ান রেগে গেলো,হাতের মুঠোয় থাকা লোহার দন্ডটি তুলে সর্বশেষ আঘাতটা করলো ত্রিজয়ের কপালে। মুহূর্তের ব্যাবধানে ত্রিজয়ের দৃষ্টি ঝাপসা হতে শুরু করলো এবার। শূন্যে ছিটকে যাওয়া পাখির মতন নিস্পা ছিটকে পড়লো তার কোল থেকে।

ত্রিজয়ের পা পিছলে গেলো চকচকে মার্বেল ফ্লোরে। মাথা ঘুরতে ঘুরতে পিছিয়ে পড়ে গেলো অ্যাট্রিয়ামের খোলা ফাঁকা অংশে।তার শরীর বাতাসে স্থবির হয়ে রইল এক সেকেন্ড, তারপর ধপ করেই লুটিয়ে পড়লো ফ্লোরে।

নিস্পা পড়ে যেতেই কুঁকিয়ে উঠলো, তবে তোয়াক্কা করলো না সেসবে, সে কেবল অস্থির চিত্তে ডাকলো,

“ত্রিজয়,ত্রিজয়।শুনছেন?ঠিক আছেন আপনি?”

ভেসে এলো না ত্রিজয়ে প্রতিত্তোর,নিস্পা দম টেনে আবারো ডাকতে চাইলো,কিন্তু তার আগেই কিয়ানের হাত টেনে ধরলো তাকে।

নিজের হাতের উপর অন্যকারো স্পর্শ পেতেই গা রিরি করে উঠলো নিস্পার,হাতটা মুচড়াতে মুচড়াতে বললো,

“হাত ছাড়ুন আমার, ত্রিজয় কোথায়? ত্রিজয় কে কি করেছেন আপনি?”

কিয়ান ছাড়লো না বরং আরেকটু শক্ত করে ধরলো নিস্পার কোমল হাত,ঠান্ডা শীতল কন্ঠে বললো,

“কিছু করিনি রুপাঞ্জেল।তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই কিছু একটা করার পরিকল্পনা করেছি।”

কিয়ান ধীরে ধীরে তার মুখ এগিয়ে নিয়ে গেলো নিস্পার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললো,

“কি পরিকল্পনা শুনবে?”

নিস্পা শিউরে উঠলো,মিনতি করে বললো,

“প্লিজ উনাকে কিছু করবেন না, উনার কোন দোষ নেই।ছেড়ে দিন উনাকে।”

“ওই কুত্তার বাচ্চা তোমাকে স্পর্শ করেছে রুপাঞ্জেল,এটাই যে ওর সবচেয়ে বড় দোষ।তুমি চোখের পানি ঝরিয়ে ওর দোষ আর বাড়িও না রুপাঞ্জেল।নয়তো ওর মৃত্যু আরো যন্ত্রনা দায়ক হতে চলেছে।”

নিস্পা রেগে গেলে, প্রচন্ড আক্রোশে ধাক্কা দিতে চাইলো কিয়ানকে, চেচিয়ে ডাকলো,

“ত্রিজয় শুনছেন আপনি?সাড়া দিন প্লিজ,আপনার কিচ্ছু হতে পারে না।ভবিষ্যৎ বানী যে অন্যকিছু বলেছে, আপনি বিশ্বাস রাখুন,আপনার কিচ্ছু হবে না।”

তারপর কিয়ানের উদ্দেশ্যে চেচালো,

“জানোয়ারের বাচ্চা ছাড় আমাকে?কে তুই? তোর সাথে কীসের সম্পর্ক আমার?কেন আমার পেছনে পড়ে আছিস?”

কিয়ান জোর করে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করলো নিস্পাকে,ঠান্ডা কন্ঠে বললো,

“তোমার সাথে আমার জন্ম জন্মান্তরের সম্পর্ক রুপাঞ্জেল।তোমার সাথে আমার রক্তের দ্বন্দ।তুমি আমার,তোমাকে পাওয়ার জন্য নিজ সন্তানকে হত্যা করেছি আমি,আমার মাতা পিতা মহাদয়ের গলা কেটেছি নির্দিধায়,অথচ তোমাকে পাই নি।”

“আমার অতৃপ্ত আত্মা আবার জন্ম নিয়েছে রুপাঞ্জেল,এবার যে তোমাকে আমার চাইই চাই।”

নিস্পা জোর করে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে আর গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে,

“ছাড়ুন আমায়,ত্রিজয়ের কাছে যেতে দিন ত্রিজয়কে কি করেছেন আপনি?”

নিস্পা কাঁদছে।তার কান্নার তীব্রতা যেন একেকটা দাবানলের ঢেউ, প্রতিটি চিৎকার কাঁপিয়ে তুলছে কণ্ঠনালীর প্রতিটি স্নায়ু। তার শরীরের প্রতিটি কাঁপুনি ভেতর থেকে ছিঁড়ে আসা কোনো আকুতি, কিংবা কোনো অসমাপ্ত আর্তনাদ।

অথচ ত্রিজয় নির্বিকার, পড়ে আছে নিচে,নড়ছে না, সাড়াও দিচ্ছে না,তবে শুনছে, নিস্পার প্রতিটি চিৎকারের শব্দ বিস্ফোরিত হচ্ছে ত্রিজয়ের মস্তিষ্কে।তার কানে বেজে উঠছে তরোয়ালের সংঘর্ষে তৈরি হওয়া ঝনঝনানির শব্দ।পরপরই চোখের পাতায় ভেসে উঠলো এক যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র,যেখানে একাই সে প্রতিহত করছে কয়েকশ সৈন্য কে।তার প্রতিটি আঘাতে ভূমি কাপছে,আকাশ কালো হয়েছে ধোয়ায়।

আচমকাই দৃশ্যপট পাল্টে গিয়ে দেখতে পেলো এক সুন্দরী মেয়েকে,একটা বাচ্চা ছেলেকে কোলে নিয়ে যে দৌড়াচ্ছে, বন জঙ্গলের গুল্মলতায় জড়িয়ে যাচ্ছে তার পা।মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটি পাখি,সাদা পেখমে আবৃত তার পালক,পিউক পিউক করে ডাকছে আর উড়ছে, তাকে অনুসরণ করে মেয়েটি বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে দৌড়াচ্ছে উদ্ভান্ডের ন্যায়।

তারপর? তারপর শোনা গেলো টগবগে ঘোড়ার এগিয়ে আসার আওয়াজ।মেয়েটার পিছু করছে তারা।মেয়েটাকে ধরার জন্য মড়িয়া হয়ে উঠেছে হিংস্র চোখ।
মেয়েটি ধরাশায়ী, অথচ তার পায়ের গতি অপ্রতিরোধ্য,যে কোন মূল্যে সে বাঁচতে চায়, নিজেকে বাঁচাতে চায়।বাঁচাতে চায় শিশুটিকে।

হঠাৎ করেই গাছের অগোছালো শিকড়ের বাঁকে পা জড়িয়ে গেল মেয়েটির।এক নিঃশ্বাসে ছুটে চলা শরীরটা আর ভারসাম্য ধরে রাখতে পারল না।ধপ করে মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে নিলেই বিদীর্ণ কণ্ঠনালী ছিঁড়ে বেড়িয়ে এলো এক আকুল আর্তি,

“আল্লাহ…”

অথচ আশ্চর্যজনকভাবে প্রতীক্ষিত আঘাত উপলব্ধি করতে পারলো না সে মূহুর্তে।তার ঠোঁট, তার নাক,
নুয়ে পড়া ক্লান্ত শরীর দৃঢ় কিছুতে এসে গেঁথে গেছে,কোনো এক উষ্ণ বুকের মাঝে।

বাচ্চা ছেলেটা তার হাতছাড়া হয়ে ছিটকে পড়েছে পাশেই,মাটিতে বসেই কেঁদছে সে।

মেয়েটি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সেই কান্নার শব্দ,অথচ তার মন স্থির হয়ে গেছে এই উষ্ণ বুকের গভীরে।মনের মধ্যে কু ডাকছে তার,তবে কি ধরা পড়ে গেলো? শত্রুর কাছেই নত হতে হলো শেষ পর্যন্ত, না কি নিয়তির পাঠানো কোনো অভিভাবকের বাহুতে সুরক্ষার নিঃশ্বাস নিচ্ছে সে?

এতোকিছু ভাবনার মাঝেই ভেসে এলো গম্ভীর কণ্ঠ,

“ব্লু ব্লাড গার্ল।অবশেষে তোমাকে আমার কাছেই ফিরতে হলো।”

পরপরই দৃশ্যপট পাল্টে গেলো আবার।সেই সুডৌল বাহুর অধিকারী লোকটা যুদ্ধ বাধিয়ে দিলো।প্রত্যেকটি দক্ষ কোপে আলাদা করে দিলো মেয়েটিকে আক্রমণ করতে আসা ঘোড়া আরোহীদের।রক্তের লাল রঙে রঞ্জিত হলো সেই সাদা পেখমে আবৃত পাখিটি।পিউক পিউক শব্দ করতে করতে এসে বসলো বীর যোদ্ধা রুপি লোকটার মাথার উপর,বিজয়ীর ঘোষক রাজমুকুটের মতো।

****

কালের দুঃস্বপ্নের চাকা ভ্রমণ করে সম্বিত ফিরে পেলো ত্রিজয়,আ্যট্রিয়ামের পাথরের ফ্লোরের উপর মুখ থুবড়ে পড়ে থেকেই ফিরে পেলো চেতনা।ঠিক তক্ষুনি তার দেখা স্বপ্নের মতোই একটা পাখি উড়ে এসে বসলো তার মাথার উপর,ঠোঁট দিয়ে ঠোকর দিলো ত্রিজয়ের দু চোখের পাতায়।তবে এবার আর পিউক পিউক শব্দ করলো না, সুরেলা কন্ঠে ডাকলো,

“উঠো প্রিন্স।তোমার নীল রক্তের মেয়েকে রক্ষা করো।রক্ষা করো।”

ত্রিজয়ের সারা শরীরের রক্ত নিমিষে উথলে উঠলো,ভুলে গেল সে ব্যথা,যন্ত্রণা।তার আঙুলে জন্ম নিলো অদৃশ্য অস্ত্রের দৃঢ়তা।নিয়তির কণ্ঠে উচ্চারিত আহ্বান তার রক্তকণায় ছড়িয়ে দিলো এক অচেনা শক্তি।নিজের মধ্যে ধারণ করলো স্বপ্নে দেখা সেই বীর যোদ্ধার অস্তিত্ব।যার হাতে আগুনের মতো ঝলসে উঠছিল তরবারি,যার পায়ের নিচে কাঁপছিলো শত শত্রু।

ত্রিজয় উঠে দাঁড়ালো নিঃশব্দে।ঝাপসা চোখে চাইলো তাকে ঘিরে রাখা লোকগুলোকে।ব্যাস!হুট করেই বাঁকা হাসলো সে,তুলে নিলো কিয়ানের ফেলে যাওয়া লোহার দন্ড টি।লোকগুলো বুঝে উঠার আগেই বিদ্যুৎ গতিতে আক্রমণ করলো,ঠিক সেই স্বপ্নের যোদ্ধার মতো প্রতিহত করতে শুরু করলো একের পর এক গুন্ডা গুলোকে।

_______

এদিকে কিয়ান,নিস্পাকে কাঁধে তুলে নিয়ে এগোচ্ছে।নিস্পা গলা কাটা মুরগির মতো ছটপট করছে ছাড়া পাওয়ার জন্য,দু হাত দিয়ে কিল ঘুষি দিচ্ছে কিয়ানের পিঠের উপর। অথচ কিয়ান নিরুদ্বেগ, নিস্পার কোন আঘাতই গায়ে লাগছে না।তার চোখে কেবল জয় অবশ্যম্ভাবী দম্ভ।

নিঃশব্দ বজ্রপাতের ন্যায় সামনে এগিয়ে এলো ত্রিজয়,
একটি টেবিল থেকে তুলে নিলো ধাতব ট্রে,পরপরই ট্রেটি পেছন থেকে ছুঁড়ে দিল কিয়ানের ঘাড় বরাবর।
ধাতবটি ধেয়ে গিয়ে আঘাত করল কিয়ানের ঘাড়ে।

কিয়ান ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই ত্রিজয় হামলে পড়ল, আক্রমণ করলো তার ওপর,পরপর দু দুবার কনুইয়ের আঘাতে ভেঙে দিল কিয়ানের ভারসাম্য,কিয়ান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিস্পাকে ছাড়তেই নিস্পার টলমলে শরীর টা এসে পড়ল ত্রিজয়ের বাহুতে। ত্রিজয় দু হাতে সামলে নিলো নিস্পাকে,খুব শক্ত করে চেপে ধরলো বুকের ভেতর।

কিয়ান গর্জে উঠল,

“কুত্তার বাচ্চা,তোকে টুকরো টুকরো করে ফেলবো আমি।”

ত্রিজয় তোয়াক্কা করলো না,চাইল না কোনো উত্তর দিতে।তার চোখের ভাষা পরিবর্তিত,মনে হচ্ছে সে নিজের মধ্যে নেই। সে কেবল নিস্পার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

“প্রেম যদি সত্য হয়,মৃত্যু তাহার অন্ত নয়।অসংশোধিত প্রেম আমাকে আবার জন্ম দিয়েছে ব্লু ব্লাড গার্ল।

__________

জায়গাটা একেবারে পরিত্যক্ত। নিঃসঙ্গ, বিস্মৃত স্মৃতির মতো পড়ে আছে সভ্যতার চোখের আড়ালে।চারদিক ঘিরে ফেলেছে ঘন ঝোপঝাড়, প্রকৃতি নিজ হাতে ঢেকে দিয়েছে তার মুখ,হয়তো সময়ও ভুলে গেছে এই স্থানটির অস্তিত্ব।

টিলার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটা,দেখতে ভূতুড়ে উপাখ্যানের ফেলে আসা পৃষ্ঠার মতো। দেওয়ালে লেগে আছে শ্যাতশ্যাতে ছোপ,নামহীন লতা গেঁথে আছে সেই শ্যাতশ্যাতে দেয়াল জুড়ে।

বাড়ির আশেপাশে কোথাও মানুষ বসবাসের চিহ্ন নেই,কেউ হয়তো গত পঞ্চাশ বছরেও একটিবারের জন্য এখানে পা রাখেনি।

তাকরিম এগিয়ে যাচ্ছে, তার সামনে কয়েকজন গার্ড টেনে টেনে সরাচ্ছে লতাপাতা। তৈরি করে দিচ্ছে রাস্তা। প্রায় কয়েকশ পুলিশ পোর্স নিয়ে বাড়িটির ভেতরের দিকে এগিয়ে গেলো সে।
বাড়িটিকে বাইরে থেকে যতটা অবহেলিত লাগছিলো
ভেতরে পা রাখতেই মনে হলো এক ভিন্ন জগৎ।

তাকরিম অবাক হলো দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখতে লাগলো সবকিছু।পুলিশরা তার আদেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইলো স্থির।
মোচড়ানো লোহার গেটের ওপারের রাজকীয় পরত থেকে শুরু করে, মেঝেতে খচিত মার্বেলের মোজাইক,
দেয়ালে চিত্রিত নিস্পার অজস্র ছবি অবাক করল তাকরিমকে,একটি সুবৃহৎ ঝাড়বাতির আলোয় দৃশ্যমান আ্যট্রিয়ামের মেঝের উপর ছড়িয়ে থাকা রক্তের ছোপ একটু আগে বয়ে যাওয়া ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষ্য দিচ্ছে নিরবে।

তাকরিম কপাল কুচকালো,সন্দিহান দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ঝুকে গেলো রক্তের ফোটা গুলোর দিকে।রক্তের ফোটা গুলো স্পর্শ করার মূহুর্তেই, নজর ঘুরে গেলো তাকরিমের,মেঝেতে পড়ে আছে একটা চুড়ির ভাঙা অংশ।তাকরিম ধিরে ধিরে চুড়ির খন্ডটা তুলে নিলো হাতে,চোখের সামনে ধরতেই মনে পড়লো সেম এমন একটা চুড়ি তো নিস্পার হাতে দেখেছিলো সে।তারমানে নিস্পাকে এখানেই আনা হয়েছে।চুড়ির খন্ডটা মুঠোয় চেপে ধরে, ধড়ফড়িয়ে উঠে দাড়ালো তাকরিম,পুলিশ টিমকে ওয়ার্ডার করলো,

“পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খুজো।আলেকজান্দ্রা এখানেই আছে।”

তাকরিমের আদেশ পাওয়া মাত্রই হনহনিয়ে বাড়ির চারপাশে ছড়িয়ে পড়লো পুলিশ ফোর্স।তন্নতন্ন করে খুজলো বাড়ির প্রতিটি কোনা।তবে আশানুরূপ খুঁজে পেলো না কিছুই।নিস্পা বা অন্য কেউ, কোন মানুষের অস্তিত্বই আপাতত এই বাড়িতে নেই।

তাকরিম শান্ত চোখে আবারও পর্যবেক্ষন করলো সবকিছু।ঈগল চোখ সোজা তাক করলো খোলা জানালার বাইরের দিকে,ত্রিজয়ের বাইকটা দাড় করানো সেখানে,চতুর মস্তিষ্ক বুঝে ফেললো ঘটিয়মান ঘটনা।তার আসার আগেই ত্রিজয় যে এখানে পৌছে গিয়েছে সে বিষয় টা ধরে ফেললো চট করেই।
অথচ তার চোখ মুখে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না এবার,বরং ঠোঁট জুড়ে ফুটে উঠলো বাঁকা হাসির ঝলক।মনে মনে সাজিয়ে ফেললো এক ভয়ংকর খেলার গুটি,পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোন বের করে বৃদ্ধাঙুল দিয়ে কিছু একটা টাইপিং শুরু করলো কি বোর্ডে।পরপরই একটি ক্ষুদ্র বার্তা সেন্ড করলো অজ্ঞাত নাম্বারে।

বার্তাটি পাঠিয়েই চোখ বন্ধ করলো তাকরিম, বিরবির করে বললো,

“”মৃত্যু শেষ নয়, শুধু বিরতি,মৃত্যু যখন বলে শেষ, আত্মা তখন ফিসফিসিয়ে বলে, ‘আবার দেখা হবে’।”

“গেম স্টার্ট,,, ত্রিজয় তেজ।রান ফাস্ট।”

_______________

জঙ্গলটা বিস্তৃত,নিঃসীম, নীরবতায় ভাঙা। পাখির হাহাকার,আর শেয়ালের দীর্ঘশ্বাসে কেঁপে উঠছে শুখনো লতাপাতা।সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই গাছেরা লুকিয়ে ফেলেছে তাদের সবুজ মুখচ্ছবি,এখন চারদিকে ঘন ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে এক একটি ছায়াপিশাচ।দিগন্তরেখা কোথায় মিশে গেছে, বোঝা দায়।কেবল কিছু পুরনো টিলা দাঁড়িয়ে আছে সঙের মতো।

তাতে অবশ্য নিস্পার কিছু যায় আসে না,কারণ তার পৃথিবী পুরোটাই অন্ধকার।ত্রিজয়ের হাতটা শক্ত করে খামচে ধরে অনুসরণ করে হাটছে নিস্পা।কিছু মূহুর্তের জন্য ত্রিজয় হয়ে উঠেছে তার ভরসার কেন্দ্রবিন্দু।যার হাত ধরে সে নির্দিধায় পারি দিতে পারবে অনন্ত পথ।মানুষটাকে এতো বেশি ভরসা করার কারণ হয়তো নিজেও জানে না নিস্পা।

কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে এপর্যায়ে ক্লান্ত নিস্পা,আর এক পাও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না তার পক্ষে।তল পেটের বিবষ যন্ত্রণায় নেতিয়ে আসছে শরীর।মনে হচ্ছে মেড়মেড় করে ভেঙে যাচ্ছে শরীরের জয়েন্ট গুলো।দাঁতে দাঁত চেপে আরো কিছুদূর এগিয়ে যায় নিস্পা,সময় গড়ানোর সাথে সাথেই তল পেটের ব্যাথা আরো বেশি তীব্র হয়।পা দুটো টানতে না পেরে ধপ করে বসে পড়ে মেয়েটা।

ত্রিজয় কপাল কুচকায়,এতোক্ষণ নিস্পার উপর একদমই ধ্যান ছিলো না তার,তার মস্তিষ্ক জুড়ে ছিলো হাজারটা প্রশ্নের বিচরণ।জীবনে কখনো মারামারি করতে না পারা ছেলেটা একাই দশ পনেরো জন লোককে মেরে ফেললো? এটা কি করে সম্ভব? কোথা থেকে এলো এই শক্তি?আর ওই পাখিটাই বা কে?কেন আসে তার কাছে?তবে কি ওই পাখিটাই তাকে অলৌকিক শক্তি দিয়েছে?

কোন হিসেব মিলিয়ে উঠতে পারে না ত্রিজয়,তারমধ্যে নিস্পা পেটে হাত চেপে বসে পড়েছে জঙ্গলের মাঝখানে।ত্রিজয় নিস্পার দিকে তাকিয়ে একটু তিরিক্ষি কন্ঠে বললো,

“কি হয়েছে বসে পড়লি কেন?”

পেটের ব্যাথায় কন্ঠ রোধ হয়ে আসছে নিস্পার,যন্ত্রণা গিলে নিয়ে প্রতিত্তোর করলো অস্ফুটে,

“আমি আর হাঁটতে পারবো না,পেটে খুব ব্যাথা করছে।”

ত্রিজয় পুরো দমে বিরক্ত হলো,উপায়ন্তর না পেয়ে কোলে তুলে নিলো নিস্পাকে,মেজাজি কন্ঠে বললো,

“কোলে উঠতে মন চাইছে সেটা বললেই পারিস,আমাকে তো তোর গাধা মনে হয়,যখন ইচ্ছে করবে কোলে উঠে যাবি।”

ত্রিজয়ের উগ্র মেজাজি কথায় নিস্পার রাগ হলো না একদম,বরং ত্রিজয়ের কথা পাত্তা না দিয়ে শরীরের ভর ছেড়ে দিলো, দু হাতে আঁকড়ে ধরলো ত্রিজয়ের গলা,মাথাটা নিয়ে রাখলো ত্রিজয়ের প্রসস্থ বুকে।চোখ বন্ধ করে নিলো পরম আবেষে।

_____________

একটা টিলার নিচে গুহার মতো অংশে গিয়ে দাড়ালো ত্রিজয়,নিস্পাকে কোলে নিয়ে বেশিদূর আগানোর শক্তি তার নেই,তাই আপাতত রাতটা এখানেই কাটানোর সীদ্ধান্ত নিয়ে নিলো ঝটপট।

নিস্পাকে কোল থেকে নামিয়ে দাড় করানো মাত্রই কপাল কুচকে এলো ত্রিজয়ের,অন্ধকারে দেখা মুশকিল তবে তরল জাতিয় কোন কিছুতে তার শার্টের হাতা ভিজে চুপচুপে, এ বিষয় টা উপলব্ধি করতে পেরেই মেজাজ খারাপ হলো ত্রিজয়ের,রাগান্বিত কন্ঠে চেচিয়ে উঠলো,

“ভেজা লাগছে কেন?কি করেছিস অসভ্য মেয়ে?”

নিস্পার চোখে জল, মুখ জুড়ে অস্বস্তি, কন্ঠ নিচু,ক্ষীণ স্বরে হ্যাসহ্যাসিয়ে বললো,

“আমার পিরিয়ড হয়েছে।”

ত্রিজয় তব্দা খেলো,জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে তাকালো একজোড়া অশ্রুসিক্ত লোচনের গভীরে,মেয়াটার ইতস্ততভাব দূর করার জন্য থমথমে কন্ঠে বললো,

“রেড সিগনালের ব্যাপার আগে বলবি না?আমি তো ভেবেছি সামান্য কোলে নিয়েছি বলে তুই রিভেঞ্জ নেওয়ার জন্য হিশু করে দিয়েছিস।”

নিস্পার কান্নার বেগ বাড়লো,মুখের মধ্যে হাত চেপে ফুঁপিয়ে উঠলো আবার।ত্রিজয় ভেংচি কাটলো, অথচ কন্ঠ ফুড়ে বেরিয়ে এলো তির্যক বানী,

“ভ্যাবলার মতো কাঁদছিস কেন?ইউ নো তুই একজন অফিসিয়াল সুপারহিরো,প্রতিমাসে একটা যুদ্ধ জয় করার ক্ষমতা রাখিস তুই।”

নিস্পা ফুপিয়ে উঠলো,এমন একটা বাজে পরিস্থিতিতে কীভাবে কি করবে বুঝে উঠতে পারলো না,তারউপর সাথে একটা পুরুষ মানুষ।
ত্রিজয় ঠোঁট টিপে চুপচাপ তাকিয়ে রইলো নিস্পার মুখের দিকে,মেয়েটা ভয়ের চেয়ে বেশি নার্ভাস হয়ে গিয়েছে লজ্জা আর অস্বস্তিতে।

নিস্পার প্রতি ভিষন মায়া হলো ত্রিজয়ের,এই মূহুর্তে ওকে সামলানো জরুরি, কিন্তু কিভাবে সামলাবে বুঝে উঠতে পারলো না,তীব্র জড়তায় জড়িয়ে যাওয়া হাতটা ধিরে ধিরে এগিয়ে নিয়ে রাখলো নিস্পার গালের উপর, নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে,শান্ত কন্ঠে বললো,

“ডোন্ট ওয়ারি,আমি আছি।”

নিস্পার কান্না থামলো না, বরং ঠোঁট ভেঙে বেড়িয়ে আসলা কান্নার দলা।ত্রিজয় ব্যাতিব্যাস্ত হলো,অজানা কারনেই মেয়েটার চোখের পানি দেখে নিংড়ে এলো বুক,ঠান্ডা কন্ঠে বললো,

“ইট’স ওকে না?বোকা মেয়ে, কান্নার কি আছে এখানে?”

ত্রিজয় একটু এগিয়ে গিয়ে দাড়ালো,দু হাতে আঁকড়ে ধরলো নিস্পার দু বাহু,তারপর নিয়ে গিয়ে বসালো জমে থাকা মাটির স্তম্বের উপর,তারপর নিজেও হাটু ভেঙে বসলো নিস্পার পায়ের কাছে,ছোট্ট করে বললো,

“অস্বস্তি লাগছে?নার্ভাস?”

ত্রিজয়ের ধরে রাখা হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো নিস্পা,দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে মাথা নাড়ালো উপর নিচ।
ত্রিজয় স্মিথ হেসে ফেললো,নিস্পাপের হাতের পৃষ্ঠে বৃদ্ধাঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,

“আমার একটা পরিচয় আছে,হাসবেন্ড হই তো তোর।অস্বস্তির কি আছে?”

নিস্পাকে আরেকটু স্বস্তি দিতে বললো,

“ওকে ওকে, সবকিছু বাদ।ভুলে যা আমি পুরুষ।ফ্রেন্ড?ফ্রেন্ড তো ভাবতে পারিস তাই না?”

নিস্পা আস্বস্ত হলো, থামালো কান্নার গতি, শুখনো ঢোক গিলে, জড়ানো কন্ঠে অস্পষ্ট বললো,

“ন্যাপকিন লাগবে।”

ত্রিজয় এবার পড়লো মহাবিপদে,একে রাতের অন্ধকা,র তারউপর জঙ্গল,ন্যাপকিনের ব্যাবস্থা কি করে করবে ভেবেই পেলো না একদম।কি করবে ভাবতে ভাবতেই মাথায় খেলে গেলো চমৎকার আইডিয়া,দ্রুত খুলে ফেললো শার্টের বোতাম গুলো।তারপর জোরে টান মেরে ছিড়ে ফেললো শার্টটা,দুটো বড় বড় টুকরোর মাপে ছিড়ে নিয়ে বাড়িয়ে দিলো নিস্পার হাতে, অসহায় ইতস্তত কন্ঠে বললো,

“কিপ্টে ভাবিস না আবার।এই মূহুর্তে এর চেয়ে ভালো ন্যাপকিনের ব্যাবস্থা করা অসম্ভব।”

________

ত্রিজয়ের ছেড়া শার্ট টা কোনরকম ইউজ করে বসে আছে নিস্পা।ভয় অস্বস্তি সামান্য কমলেও পেটের ব্যাথা কমার নাম গন্ধ নেই।সেই তখন থেকে পেটে হাত চেপে মুচড়াচ্ছে মেয়েটা।

ত্রিজয় পাশে বসে পর্যবেক্ষন করছে নিস্পার কার্যকলাপ,মেয়েটার ছটপটানিতে আর চুপ থাকতে পারলো না,গম্ভীর কন্ঠে বললো,

“তুই চাইলে আমার কোলে মাথা রাখতে পারিস।”

নিস্পার হৃদয়ে দোলা দিলো ত্রিজয়ের বলা ছোট্ট ছোট্ট শব্দগুলো,আজ কেমন অন্য রকম সুঘ্রাণ আসছে,এর আগে কখনো তো এমন লাগে নি।লাগবেই বা কি করে?কখনো কি এই মানুষটাকে এতো গভীর ভাবে চিনেছে?নাকি কাছে পেয়েছে ঘন্টার বেশি?

নিস্পা চুপচাপ মাথা রাখলো ত্রিজয়ের কোলের উপর।ত্রিজয়ের বুকের ভেতর শুরু হলো ধুকপুকানি,নিজেকে শান্ত রাখার প্রচেষ্টায় বললো,

“পেটে কি বেশি ব্যাথা করছে?”

“হু।” অস্ফুটে উত্তর দিলো নিস্পা।

ত্রিজয় ঘনঘন শ্বাস ফেললো, নিস্পার পেটের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিয়েও আঙুল গুলো গুটিয়ে নিলো ফের,ঠান্ডা কন্ঠে বললো,

“পেট টিপে দিবো?গড প্রমিজ বোন মনে করেও তাকাবো না।”

ত্রিজয়ের কথা ঠোঁট টিপে হেসে দিলো নিস্পা,সম্মতিতে মাথা নাড়ালো দু পাশে।

ত্রিজয় ফোস করে নিঃশ্বাস নিলো, ভেবেছিলো তার কথায় রেগে যাবে নিস্পা,হয়তো শুনিয়ে দিবে চটাং চটাং কথা।তবে এমন কিছু না হওয়ায় হাপ ছেড়ে বাঁচলো ত্রিজয়,ঠান্ডা শীতল হাতটা নিয়ে রাখলো নিস্পার পেটের উপর।নিস্পার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বয়ে গেলো এক শীতল স্রোত,চাপা অনুভুতির দেয়াল ভাঙলো ঝনঝনিয়ে,জাগ্রত হলো শরীরের প্রতিটি লোমকূপ,কেঁপে উঠলো সর্বাঙ্গ।ভাগ্যিস অন্ধকারে আচ্ছন্ন প্রতিটি কোনা,নয়তো তার পেটের সেই চিহ্ন যে উন্মোচন হয়ে যেতো ত্রিজয়ের সামনে,হয়তো ত্রিজয়ের মনে পড়ে যেতো গত জন্মে ফেলে আসা স্মৃতির গোলকধাঁধা।

“আরাম লাগছে?”প্রায় কিছুক্ষণ ধরে নিস্পার পেটের উপর হাত বুলানোর পর জিজ্ঞেস করলো ত্রিজয়।

নিস্পা চোখ বন্ধ করে রাখল,উত্তর দিলো না।চিকন কন্ঠে বললো,

” একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”

“কি?”

“আপনার জান্নাত দেখতে কেমন?”

“তোর চেয়ে সুন্দর নয়।” ত্রিজয়ের অপকট উত্তরে ভড়কালো নিস্পা।জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো,

“শুনেছি আপনি নাকি তার মুখ দেখেন নি,তবে কীভাবে জানলেন আমার চেয়ে সুন্দর নয়?”

“কে বললো দেখিনি,দেখেছিলাম একদিন।”

“কীভাবে?”

“ওদের বাড়িতে লুকিয়ে ঢুকেছিলাম একদিন, সেদিন চুপিচুপি দেখেই প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম।”

নিস্পার কেন যানি ভালো লাগলো না,বুকের ভেতর চিনচিনে ব্যাথায় চুপসে এলো মুখ।অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলো,

“দোয়া করি আপনি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে পান ওকে।”

ত্রিজয় চুপ করে রইলো কিছুক্ষন,তারপর মলিন কন্ঠে বললো,

“পেতে তো হবেই।আমার প্রথম প্রেম, প্রথম নারী ও।”

_______________

জঙ্গলের কাঁটাঝোপ পেরিয়ে মেইন রাস্তায় উঠে এসেছে ত্রিজয় আর নিস্পা।সকালের আকাশে লেপ্টে থাকা ম্লান কমলা আলো ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে গাঢ় বেগুনিতে,সূর্যের উত্তাপে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে চারপাশ।

ত্রিজয়ের বুক উন্মুক্ত, ধুলো আর ঘামে রঞ্জিত বুকে স্পষ্ট পুরুষোচিত সৌন্দর্য।কালো জিন্সটা কোমরের নিচে খানিকটা নামানো,তার মেদহীন, বলিষ্ঠ শরীরের পেশিগুলো হাঁটার ছন্দে উঠছে-নামছে,দূর থেকে পথচলা মেয়েরা তাকাচ্ছে আড়চোখে।

কিন্তু ত্রিজয়ের সেসবে ধ্যান নেই,কারণ তার ডানহাত ধরে আছে একটি নির্ভরযোগ্য নরম স্পর্শ।তার সমস্ত মনযোগ আপাতত সেখানটাতেই স্থির।

নিস্পা হাঁটছে ত্রিজয়ের হাত আঁকড়ে।বেশ অনেক্ষন হাঁটার কারণে পিপাসায় গলা শুকিয়ে হয়েছে কাঠ,একটু পানি না খাওয়া অব্দি এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

নিস্পা থামিয়ে নিলো তার হাটা,সেই সাথে থেমে গেলো ত্রিজয়।কপাল কুচকে জিজ্ঞেস করলো,

“থামলি কেন?আরেকটু এগোলেই সি এনজি স্টেন্ড।ইভানকে যে একটা কল করবো ফোনটাও বন্ধ।”

নিস্পা হাপালো,শুখনো কন্ঠে বললো,

“পানি খাবো,গলা ফেটে যাচ্ছে।”

ত্রিজয় বিরক্ত হলো, তাকালো এদিক সেদিক, রাস্তার অপরপ্রান্তে দেখতে পেলো একটা টং দোকান।দোকানটা দেখতে পেয়েই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো ত্রিজয়,বললো,

“এখানে দাড়া, আমি পানি নিয়ে আসছি।”

নিস্পাকে দাঁড় করিয়ে রাস্তার অপরপ্রান্তে চলে গেলো ত্রিজয়।নিস্পা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো একটা মোটা পিলার ধরে।ঠিক সেই মূহুর্তেই পিলারের পেছন থেকে বেড়িয়ে এলো একটা হাত,আর হাতটায় ধরে রাখা চকচকে ছুড়ি।

পরক্ষণেই এক নিঃশব্দ, নিঃকন্ঠ থাবায় কেউ একজন
ছুরিটা সেকেন্ডের গতিতে ঢুকিয়ে দিলো নিস্পার পেটের বাঁদিকে।কোনো শব্দ বেরোলো না নিস্পার মুখ থেকে, চোখ দুটো ভরে উঠলো বিস্ময়ে,আর যন্ত্রণায়।
এক হাত অজান্তেই চেপে ধরলো ছুড়ি গেথে যাওয়া রক্তাক্ত জায়গাটায়,গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলো,

“ত্রিজয়,,,,,,,,,”

ত্রিজয় ধড়ফড়িয়ে উঠলো, আতংকে হাত থেকে পড়ে গেলো পানির বোতলটা,ঠিক তক্ষুনি একটা গাড়ি ছুটে এসে পিষে দিলো অজ্ঞাত এক রমনিকে, ত্রিজয় উন্মাদের মতো নিস্পার কাছে দৌড়ে যেতে নিয়েও থেমে গেলো,গাড়ি এক্সিডেন্ট করা সেই অজ্ঞাত রমনীর চেহারা তার পরিচিত খুব পরিচিত।রক্ত রঞ্জিত চেহারাটাকেই তো এতোদিন ধরে খুজেছে সে।ত্রিজয় বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ অস্পষ্ট ডাকলো,

“জান্নাত।”

ত্রিজয়ের জিভ কাঁপলো, থরথর করে উঠলো ঠোঁট।
বুকের ভেতর জমে উঠলো গলিত আগ্নেয়গিরি।
এই মুখটাই তো সে খুঁজেছে বছরের পর বছর!
এই মুখটাই তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর। মূহুর্তটাকে পাল্লা দিয়ে নিস্পার কণ্ঠ থেকে ছিটকে এলো ক্ষীণ শীৎকার,

“ত্রিজয়।”

ত্রিজয়ের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো কয়েকগুন।দোটানায় উন্মাদের মতো লাগলো তার।কি করবে?কোথায় যাবে সীদ্ধান্তহীনতায় পাগল পাগল লাগলো, একবার এগোতে চাইলো নিস্পার কাছে, আরেকবার এগোতে চাইলো জান্নাতের কাছে।

ঠিক তক্ষুনি নিস্পার কাছে এসে থামলো তাকরিমের গাড়ি,তাকরিম তাড়াহুড়োয় নেমে দাঁড়িয়ে দেখতে পেলো নিস্পার রক্তাক্ত শরীর,অপরপ্রান্তে নজর বুলাতেই দেখলো তার একমাত্র বোন লুটিয়ে আছে রাস্তায়।

দু মিনিটের জন্য সীদ্ধান্তহীনতায় ভুগলো তাকরিম নিজেও, তবে এবার আর ত্রিজয় কিছু ভাবলো না, নিস্পার কাছে তাকরিমকে দেখেই এগিয়ে গেলো জান্নাতের কাছে,কোন শব্দ ব্যয় না করে দ্রুত তুলে নিলো কোলে।

এদিকে তাকরিম এগিয়ে গেলো নিস্পার কাছে,নিস্পার চোখ অল্প খোলা,চোখের পাতা কাঁপছে ব্যথায়,অথচ এই ব্যাথাতুর কণ্ঠে ধ্বনিত হলো ,

“ত্রিজয়, ত্রিজয়।”

তাকরিম দেরি করলো না এক মূহুর্ত, দু হাতে কোলে তুলে নিলো নিস্পাকে,গম্ভীর কন্ঠে বললো,

“ত্রিজয় আসবে না আলো, ও ওর জান্নাতকে পেয়ে গিয়েছে।”

এ এক অনির্বচনীয় দৃশ্য,শহরের ধূসর আলোয় ভেসে থাকা রক্তরঞ্জিত রাস্তার দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে দুই পুরুষ,একজন বুকের মাঝে আগলে রেখেছে জান্নাতকে,অন্যজন আগলেছে নিস্পাকে।

আকাশ তখন নীলচে হয়ে এসেছে,দূরে কোথাও একপাল কাক ডেকে উঠছে হঠাৎ।
হয়তো সময়ের বুক চিরে একটা অভিশপ্ত অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে পূনরায়।

রাস্তার দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি মানুষ,কেউই সম্পূর্ণ নয়,আবার অসম্পূর্ণও নয়।কেউ হারায়নি,কেউ জয়ও করেনি।এ শুধু নিয়তির নিঃশব্দ পুনর্বিন্যাস।

চলবে,,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here