#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:34
“ভালোবাসা হয় জন্ম জন্মান্তরের, কাল কে জয় করে,ইতিহাসকে ম্লান করে সে ফিরে আসে বারবার।তুমি তারে অস্বীকার করতে পারবা না লো কন্যা।”
হাসপাতালের কেবিনে আপাতত কেউ নেই।নিস্পাকে চিকিৎসা করার পর ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে রাখা হয়েছিলো চার ঘন্টার জন্য।তাকরিম এতোক্ষণ এখানেই ছিলো,নিস্পার চোখ না খোলা অব্দি এক পাও নড়বে না এই পন করেই বসেছিলো এতক্ষণ।
কিন্তু নিস্পার চিকিৎসক ডক্টর কিয়ান তাকে চলে যেতে বাধ্য করে,কারণ হিসেবে বলে, রোগীর বর্তমান অবস্থায় সম্পূর্ণ বিশ্রাম প্রয়োজন, এই মুহূর্তে কারো উপস্থিতি রোগীর অবস্থার আরও অবনতি ঘটাতে পারে। তাই আপাতত নিস্পার পাশে কাউকে থাকার অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়।
তাকরিম প্রথমে কিছু বলার চেষ্টা করলেও ডক্টর কিয়ানের যুক্তির সামনে তর্কে গেলো না। দীর্ঘ দৃষ্টিতে নিস্পার দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ। কারণ যত যাই হোক নিস্পার সুস্থতার উপরে কিছু নেই।
তাকরিম যাওয়ার পরেই কিয়ান এসে বসেছিলো নিস্পার কাছে।নিস্পার নরম হাত দুখানা আঁকড়ে ধরে কাটিয়েছিলো বেশ কিছুক্ষণ।তার পরপরই ইমার্জেন্সিতে ডাকা হলো তাকে,চেয়েও নিস্পার কাছে থাকতে পারলো না আরো কিছুটা সময়।
সবাই চলে যাওয়ার পর কেবিন আপাতত খালি।তবে কেবিনের বাইরে তাকরিমের গার্ডরা পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে সঙের মতো।তারউপর পুরো হাসপাতাল জুড়ে রাখা হয়েছে কড়া সিকিউরিটির ব্যাবস্থা।
“ও রহস্য কন্যা।কেন এতো সুন্দর হইলা কও তো?তোমার এই সৌন্দর্য যে তোমার কাল হইয়া দাড়াইলো।”
এবারের কথাটুকু ভেসে আসার সাথে সাথেই ঘুম ভেঙে গেলো নিস্পার,পরিচিত মনে হলো সেই কন্ঠস্বর,তবে মনে পরল না তৎক্ষনাৎ।তাই উৎকন্ঠা মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
“কে?কে কথা বলছে?”
নিস্পার প্রশ্নের উত্তরে শোনা গেলো ডানা ঝাপটানোর শব্দ, পাখিটি উড়ে এসে বসলো নিস্পার কাধের উপর।নিস্পা হতচকিত,হতহ্বিবল হয়ে উপলব্ধি করলো পাখিটির উপস্থিতি, বিস্মিত কন্ঠে অস্ফুট উচ্চারণ করলো,
“সত্যবীনা পাখি?”
“হ লো কন্যা, চিনতে পারছো তাইলে।”পাখিটির উত্তর ভেসে আসতেই বিলম্ব করলো না নিস্পা, ঝটপট বললো,
” তুমি কোথায় থাকো সত্যবীনা পাখি?তুমি সেদিন গেলে আর তো এলে না।তোমাকে কত কথা জিজ্ঞেস করা বাকি যানো।”
“এজন্যই তো আইলাম কন্যা।তুমি মোরে স্মরণ করছো আমি না আইয়া থাকতে পারি কও?তয় তোমার কাছে আইবার পেছনে আরো একখান কারণ আছে।”
“সেই কারণ টা কি সত্যবীনা পাখি?”
“আগে তুমি তোমার প্রশ্ন শেষ করো কন্যা।আমি যেই কারনে আইছি সেই কারণ বইলাই যামু,অতো চিন্তা কইরো না।”
নিস্পা শুকনো ঢোক গিলল। তার মনের ভেতর উথাল-পাথাল প্রশ্নের ঢেউ, একটার পর একটা কল্পনা হানা দিচ্ছে সমগ্র মস্তিষ্ক জুড়ে । কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবে? কোন প্রশ্নটা আগে করবে? খুঁজে পাচ্ছে না সে। মনে হচ্ছে, প্রশ্নগুলো গলায় এসে আটকে যাচ্ছে বারবার।
নিস্পার নিরবতা ভঙুর করে তাড়া দেখালো সত্যবীনা পাখি,
“কিলো কন্যা?কিছু কইলা না তো।সময় যে বড্ড কম।”
নিস্পা নড়েচড়ে উঠলো,নিজেকে আস্বস্ত করে জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো,মোলায়েম কন্ঠে করলো তার প্রথম প্রশ্ন,
“আমার স্বপ্নে কারা আসে সত্যবীনা পাখি?ওই স্বপ্ন আর স্বপ্নের মানুষ গুলো কীসের ইঙ্গিত দিতে চাইছে আমাকে?”
“তোমার স্বপ্নে তোমার ভবিষ্যৎ আসে কন্যা।”
নিস্পা এবার অবাক হলো কিছুটা, আগ্রহী কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“ভবিষ্যৎ মানে?তুমি না বললে পূনর্জন্ম হয়েছে সবার,পূনর্জন্ম তো অতীত হওয়ার কথা।”
“আমি সবার কথা কইছি, কিন্তু তোমার কথা তো কইনাই কন্যা।”
নিস্পা কপাল কুচকালো,উদগ্রীব ঠোঁট জোড়া নাড়িয়ে প্রশ্ন করলো দ্রুত,
“আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না সত্যবীনা পাখি।সবার পূনর্জন্ম হয়েছে কিন্তু আমার হয়নি,এটা কি করে সম্ভব?তুমি যেই সময়ের কথা বলেছিলে সেতো পঞ্চাশ বছর পেছনে,সবার সাথে যদি আমি মারা গিয়ে না থাকি তবে তো আমার বয়স আশি বছরের কোটায় থাকার কথা।”
“এই প্রশ্নের উত্তর তো দেওয়া যাইবো না লো কন্যা,তবে হুইনা রাহো,কিছুদিনের মধ্যেই এই প্রশ্নের উত্তর তুমি পাইয়া যাইবা।অন্য প্রশ্ন থাকলে তাড়াতাড়ি করো কন্যা।”
প্রথম প্রশ্নের কোনরুপ উত্তর না পেয়ে আশাহত হলো নিস্পা,দীর্ঘশ্বাস ফেলে করলো দ্বিতীয় প্রশ্ন,
“তুমি তো সেদিন ত্রিজয় আর এমপি মশাইয়ের কথা বলেছিলো।কিন্তু আরো একজনের পদার্পন হয়েছে আমার জীবনে। সে আমাকে নিজের পরিচয় বারবার আব্দুল হানিফ বলেছিলো।তুমি কি এই ব্যাক্তির আসার কথা জানতে না?”
“জানতাম, জানতাম।আমি এই ব্যাক্তির আগমনের সংবাদ জানতাম।”
“জানতে?তবে বললে না কেন সেদিন?”
“কই নাই,কই নাই।কারণ আমি কইতে চাই নাই।আমি তার কথা কইতে পারুম না লো কন্যা।ওই ব্যাক্তির আগমনের কথা আছিলো,কিন্তু আমি চাই নাই সে এতো তাড়াতাড়ি তোমার সংবাদ পাক।”
“কেন?কেন সত্যবীনা পাখি?ওই লোকটা কি আমার জন্য বিপজ্জনক হতে চলেছে?”
“তোমার জীবনে আসা তিন পুরুষ তোমার জন্য বিপজ্জনক হতে চলেছে কন্যা।তোমার ভালোবাসা তোমার একমাত্র বিপদ।”
“কিন্তু আমি তো চাই না,ভালোবাসা চাই না আমার।”
“তুমি চাও না বা চাও ভালোবাসা আসবে,প্রেম হবে তোমার, সময়ের পরিক্রমায় যে তোমার হৃদয় পেয়েছিলো, সে আবারো তোমার হৃদয়ের মালিকানা পাবে।”
“কিন্তু কীভাবে? আমি কীভাবে জানবো কাকে হৃদয় দিয়েছিলাম আমি?”
“তুমি খুব বোকা লো কন্যা।যাকে তুমি হৃদয় দিবা সে তো তোমার ভবিষ্যৎ।তাকে তো তোমার খুইজা লইতে হইবো।
“বুঝতে পারছি না, আমি সত্যি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না সত্যবীনা পাখি।”
“বুঝোন লাগবো না,শুধু এই টুকুন যাইনা রাহো খুব শীঘ্রই কালের চাকা ঘুরবে,সেই সাথে ঘুরবে তোমার ভাগ্যের চাকা।তুমি পঞ্চাশ বছর পেছনে যাইবা কন্যা,তোমার ভালোবাসা খুঁইজা লওয়ার দুই দুইটা পরিক্ষা দিতে হইবো তোমারে।”
“আমি পারবো না,আর কোন পরিক্ষা দিতে পারবো না।”
“তাতো হইবো না কন্যা,নিয়তি তো লেখা হইয়া গেছে।আমি তোমারে কেবল সতর্ক করার লাইগা আইছি।তোমার ভবিষ্যৎ আমারে টাইনা আনছে।”
কথাটা বলার পরপরই সত্যবীনা পাখি আবার বললো,
“পৃথিবীর সকলের কাছে আমি অতীত শুধুমাত্র তোমার ভবিষ্যৎ। ভাবতে পারতাছো কন্যা?তুমি বাকি সবার চেয়ে আলাদা।তুমি অনন্যা,তুমি সাধারনের মাঝে অসাধারণ।”
নিস্পা এবারেও হতাশ হলো, সত্যবীনা পাখির কোন কথাই বোধগম্য হলো না তার,ফোস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে আশাহত কন্ঠে বললো,
“তুমি সমাধান নও পাখি,তুমি তো জটিলতা।আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বদলে আমাকে জর্জরিত করে দেও হাজারটা নতুন প্রশ্নে।আমি বুঝে গেছি আমার মুক্তি নেই,যতদিন পর্যন্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পাই আমার মুক্তি নেই।”
“তয় সাবধান কন্যা,যতদিন উত্তর খুঁজে বেড়াইবা ততদিন নিজের খেয়াল রাখবা।মনে রাখবা কেউ একজন আছে, যে চায় না তোমার সময় ভ্রমণ হোক,সে চায় তুমি আঁটকে যাও কালের পরিক্রমায়।কিন্তু সে মূর্খ বুঝতে চায় না,মহাকালের চাকা ঘুরেছে, নতুন করে ফিরে এসেছে সবাই, ভালোবাসা জন্মেছে সবার হৃদয়ে।সে যতই চেষ্টা করুক যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে,এই যুদ্ধ থামানোর উপায় নেই।”
নিস্পা অবাক হয়, কিছু একটা জিজ্ঞেস করার আগেই বাইরে থেকে কারো এগিয়ে আসার শব্দ শোনা যায়।পাখি তাড়া দেখায় এবার,চিকন স্বরে বলে,
“আমি যাচ্ছি গো কন্যা,সময় ফুরায়ছে আমার,বিদায়,বিদায়।”
সত্যবীনা পাখির বিদায় সংবাদ শুনেই ছটপটিয়ে উঠলো নিস্পা, একটা শেষ প্রশ্ন ধেয়ে বেড়িয়ে এলো ঠোঁটের আগায়,
“দাড়াও সত্যবীনা পাখি, এটুকু তো বলে যাও,মাত্রই কীসের যুদ্ধের কথা বললে তুমি?”
শোনা গেলো পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ,হিমেল হাওয়ার সাথে ভেসে এলো অস্পষ্ট উত্তর,
“যুদ্ধ যুদ্ধ।ভালোবাসার যুদ্ধ লো কন্যা।”
______________
সত্যবীনা পাখি চলে যাওয়া মাত্রই নিস্পার বেডের পাশে এসে দাড়ালো কিয়ান।তার শরীর থেকে ধেয়ে আসা পারফিউমের গন্ধ খুব চেনা মনে হলো নিস্পার, তবে ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারলো না।
কিয়ানের পরনে সাদা এফ্রোন,গলায় ঝুলানো স্টেথোস্কোপ, চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা।হাইটে ত্রিজয়ের মতোই হবে ছয় ফিট।বডি ফিটনেস আকর্ষণীয়,শরীরের ঘটন দেখলে বোঝা যায় প্রতিদিন নিয়ম করে জিম করে।
কিয়ান শান্ত দৃষ্টি বুলালো হাত ঘড়ির উপর।কাজ শেষ করে প্রায় আধ ঘন্টা পর নিস্পার কাছে আসতে পারলো সে।মেয়েটার স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকাতেই সময়ের দুরত্ব গুছে গিয়েছে,হৃদয়ে বেজে উঠেছে বৈরি হাওয়ার গান।এ মেয়ের কাছ থেকে দূরে থাকা সম্ভব নয়, যে একবার ওর দর্শন করেছে তার সময় থেমেছে ওই রুপের মায়াতে, অন্য কোন কাজে সময় দেওয়ার মতো ইচ্ছে ঝলসে গেছে সেই রুপের আগুনে।
রুমে কারো উপস্তিতি টের পাওয়ার পরেও সাড়া শব্দ পাচ্ছে না নিস্পা,বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো, কিন্তু তাও কোন সাড়া পেলো না,ভয়ে আর অস্বস্তিতে নখ খুটলো সে,ঠোঁট টিপে চাপা কন্ঠে বললো,
“কে? কে আছে এখানে।”
নিস্পার মোলায়েম কন্ঠস্বরে ধ্যান ছুটলো কিয়ানের,দু কদম এগিয়ে এনে পাশে দাড়ালো, শান্ত কন্ঠে বললো,
“শরীর সুস্থ তো রুপাঞ্জেল?”
পরিচিত কন্ঠস্বর পেয়েই চমকে উঠলো নিস্পা,আতংকিত কন্ঠে বললো,
“আপনি? আপনি এখানে কি করে এলেন?”
কিয়ান বাঁকা হেসে উত্তর দিলো,
“ভয় পেয়ো না রুপাঞ্জেল, আমি তো তোমার ডক্টর।তোমার চিকিৎসা আমিই করেছি।”
নিস্পা কিংকর্তব্যবিমুঢ়, রাগে খামচে ধরলো সাদা বেডশিট,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,
“নাটক করছেন?আমার চিকিৎসা করার নাটক করছেন?আমি যানি আমাকে আপনিই ছুড়ি মেরেছেন।আমাকে খুন করতে চেয়ে আবার আমার চিকিৎসা করতে এসেছেন আপনি?”
কিয়ান অবাক হলো,বিস্মিত কন্ঠে বললো,
“তোমার ভুল হচ্ছে রুপাঞ্জেল।আমি তোমাকে জয় করতে চাই,তোমাকে হত্যা করে আমার লাভ কি?আমি ভালোবাসি তোমায়,তোমাকে পাওয়ার জন্য মৃত্যুকে জয় করেছি আমি, তোমার গায়ে একটা আঁচড় দেওয়াও আমার পক্ষে সম্ভব না।”
“বিশ্বাস করি না, একদম মিথ্যা কথা বলবেন না বলছি,আপনি ছাড়া আমার আর কোন শত্রু নেই, যে আমাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করবে।”
নিস্পা হাইপার হয়ে উঠলো,পাগলের মতো নামতে চাইলো বেড থেকে।কিয়ান হতভম্ব, নিস্পার এমন বিহেভিয়ারে ভড়কালো খানিক,নিস্পাকে সামলানো জরুরি মনে করে দ্রুত দু হাতে আগলে নিতে চাইলো নিস্পাকে,কিন্তু না, নিস্পাকে স্পর্শ করা মাত্রই আরেকটু ক্ষেপে উঠলো সে,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,
“স্পর্শ করবেন না, একদম স্পর্শ করবেন না আমাকে।ত্রিজয়?ত্রিজয় কোথায়?ওকে ডেকে দিন।”
কিয়ানের কিছু বলার আগেই নিস্পা ডাকলো,
“ত্রিজয়? ত্রিজয়? কোথায় আপনি?”
কিয়ানের ধৈর্যের বাধ ভাঙলো,মেজাজি কন্ঠে ধমকে উঠলো,
“এনাফ ইজ এনাফ রুপ।কাকে ডাকছো তুমি?যে তোমাকে রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পরে থাকতে দেখেও বাঁচাতে আসে নি?যে নিজের এক্সকে খুঁজে পেয়ে তাকে নিয়েই মত্ত হয়ে গিয়েছিলো তাকে?আমাকে চোখে পরে না? এই কিয়ান, এই কিয়ানকে ডাকতে ইচ্ছে করে না?
এই কিয়ান হানিফ হয়েও তোমাকে পায় নি,আর কিয়ান হয়েও তড়পাচ্ছে, পাগল কুকুরের মতো পড়ে আছে তোমার পেছনে। দু দুটো জনম আমাকে তড়পিয়েই যাচ্ছো তুমি।কি মজা পাও?আমাকে সাজা দিয়ে এতো কীসের শান্তি পাও তুমি?”
নিস্পা স্তব্দ,সে তো থেমে গেছে সেই কখন।সেই কখন থেকেই তো আটকে আছে একটা শব্দে,
“ত্রিজয় তার এক্সকে খুঁজে পেয়েছে।”
বাকি সব কথা তো তার কানের কাছে এসেই মিলিয়ে যাচ্ছে, মস্তিষ্ক কেচ করতে পারলো না পরবর্তী একটি শব্দও।কিয়ানের এতগুলো কথার বিনিময়ে সে কেবল জিজ্ঞেস করলো,
“আমাকে হসপিটাল নিয়ে এসেছে কে?”
কিয়ান আরো কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলো, নিস্পার অন্ধকার আচ্ছন্ন নিস্প্রভ মুখের দিকে তাকিয়েই নিজের চেহারা নরম করলো, ছোট্ট করে উত্তর দিলো,
“এমপি তাওসিফ তাকরিম।”
নিস্পা আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না, পুরোপুরি স্থবির সে,নিস্পাকে অদ্ভুত ভাবে চুপ হতে দেখে কিয়ান তার বাহুতে হাত রাখলো,নরম কন্ঠে বললো,
“আর ইউ ওকে?”
নিস্পা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করেই বসে রইলো, তারপর রিনরিনিয়ে মিনতি করলো,
“আমাকে একটু একা থাকতে দিবেন প্লিজ।”
কিয়ান দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চুপচাপ তাকিয়েই থাকলো নিস্পার ম্লান মুখের দিকে।কোনরূপ শব্দ ব্যয় করার ইচ্ছে করলো না আর।নিস্পাকে একা থাকতে দিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো।লম্বা পা গুলো যথটা ধিরে করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো ঠিক ততটাই দ্রুত থামিয়ে ফেললো আচমকা,ঘুরে তাকালো নিস্পার মুখের দিকে,মোলায়েম কন্ঠে বললো,
“আমি তোমাকে আঘাত করি নি রুপ,আমি তোমার শত্রু নই।”
কথাটা বলেই থেমে গেলো, আরো কিছুক্ষণ নিরব থেকে বললো,
“তেতো হলেও সত্য,তিনজন পুরুষ ছাড়া মহাবিশ্বের বাকি সবাই তোমার শত্রু।”
_______________
জান্নাতের অবস্থা গুরুতর,গাড়ি এক্সিডেন্টে বেশ আহত হয়েছে সে,আইসিউ তে রাখা হয়েছে বর্তমানে।
ত্রিজয় বসে আছে আইসিউর সামনে, তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ইভান।ঘটনার আকস্মিকতায় পুরোপুরি হতভম্ব ইভান,কি থেকে কি হয়েছে মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সব।হাজারটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে কিন্তু পারছে না, ত্রিজয়ের কঠিন শক্ত মুখের দিকে তাকাতেই হাওয়া উড়ে যাচ্ছে তার।
প্রায় অনেক্ষন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে প্রস্তুত করলো ইভান,ভয়ডর সাইডে রেখে প্রশ্ন করেই বসলো,
“স্যার আপনি তো নিস্পা ম্যাম কে আনতে গিয়েছিলেন, তাহলে উনাকে কি করে পেলেন?”
ত্রিজয় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ইভানের মুখের দিকে,তারপর থমথমে কন্ঠে বললো,
“নিস্পাকে নিয়ে ফেরার সময়ই পেয়েছি,একটা গাড়ি ইচ্ছে করে পিষে দিয়েছিলো ওকে।”
ইভান চোখ উল্টে তাকালো, ভ্যাবাচেকা খেয়ে বললো,
“আপনার ভাগ্য দেখে অবাক হচ্ছি স্যার!খুঁজতে গেলেন বউকে,অথচ খুঁজে নিয়ে এলেন প্রাক্তনকে।”
ত্রিজয় হতাশার শ্বাস ফেললো,মাথাটা এলিয়ে দিলো বসে থাকা চেয়ারের উপর, কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
“বুঝলে ইভান,আমার ভাগ্য হলো প্যান্টের চেইনের মতো, যখনই আটকায় বর্তমান ভবিষ্যৎ দুটোই অন্ধকার দেখি।”
ইভান বুঝতে পারলো না ত্রিজয়ের কথা,ভ্যাবলার মতো বললো,
“এজন্যই বলি স্যার, কিপ্টামি টা এবার অন্তত বাদ দিন,মার্কেটে এতো এতো ব্যান্ডের জাইঙ্গা থাকতে, আপনি কিনা চেইনের চিপায় আটকা পড়ে ভবিষ্যৎ অন্ধকার করতে বসেছিলেন?”
ত্রিজয়ের নাক মুখ কুচকে গেলো,চট করেই তাকালো ইভানের মুখের দিকে,দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
“এই উজবুক বললো টা কি?”
কথাটা বোধগম্য হতেই চটে গিয়ে ধমকে উঠলো ত্রিজয় ,
এই কি বললে তুমি?তুমি যানো আমার যতগুলো জাইঙ্গা আছে সেগুলো দিয়ে আমার পরবর্তী প্রজন্মও সুন্দর ভাবে কাটিয়ে দিতে পারবে।”
ইভান ভয়ে চুপসে গেলো,কাচুমাচু করে দাড়ালো দূরে সরে।মনে মনে বিরবির করে বললো,
“শালা কত বড় কিপ্টে হইলে এক জাইঙ্গা দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মও কাটানোর কথা বলে, শালা এই কিপ্টামির জন্য কোন দিন যেন তোর ভবিষ্যৎ পিপড়ে কেটে নিয়ে যায়,প্রজন্ম তো আসবে দূর কি বাত।”
ত্রিজয় চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে তখনও,ইভান কথাগুলো আওড়াতে আওড়াতে যেই দৃষ্টি ঘোরালো,ত্রিজয়ের চোখের কবলে পরে আবার চুপসে ফেললো মুখ,শুখনো ঢোক গিলে প্রসঙ্গ পাল্টালো দ্রুত,
“স্যার নিস্পা ম্যামের খোঁজ নিয়েছেন?”
“হ্যাঁ।” ছোট্ট করে বললো ত্রিজয়।
ইভান পাল্টা প্রশ্নে জিজ্ঞেস করলো,
“কি অবস্থা ওনার?”
“আউট অফ ডেঞ্জার।”
ত্রিজয়ের গম্ভীর উত্তরে কন্ঠ নরম করলো ইভান,বললো,
“নিস্পা ম্যামকে ফেলে নিজের প্রাক্তনকে চয়েজ করা টা বোধহয় উচিত হয় নি স্যার।”
“উচিত অনুচিত তোমার কাছ থেকে শিখতে হবে?”
“না মানে স্যার, আপনাকে এসব শেখানোর আমি কে, শুধু বলতে চাইছিলাম, উনি স্বইচ্ছায় আপনার জীবনে আসে নি,নিস্পা ম্যামকে কিন্তু আপনি জোর করে বিয়ে করেছিলেন। আর এখন যখন উনি আপনাকে ভরসা করতে শুরু করলো আপনি ওনার হাতটা ছেড়ে দিয়ে একা ফেলে আসতে পারলেন?”
“ও একা ছিলো না, এমপি তাওসিফ তাকরিম ছিলো তার জন্য।”
“তার মানে গেম ওভার?এমপি তাওসিফ তাকরিম অবশেষে তার ভালোবাসা পেয়ে জিতে গেলো।”
“গেমটা তো এভাবেই শেষ হওয়ার কথা ছিলো ইভান,আমি জান্নাতকে পেয়ে গেলে এমপিও তার ভালোবাসা পেয়ে যাবে।”
“জান্নাতকে পেয়ে নিজের বিয়ে করা স্ত্রীকে ছেড়ে দিলেন?”
“নিয়তি এমনই হওয়ার কথা ছিলো।”
ইভান আর কথা বাড়ালো না,কেবল তাচ্ছিল্য হেসে বললো,
“অভিনন্দন স্যার,খুব শীঘ্রই এমপি তাওসিফ তাকরিম শালাবাবু হতে চলেছে আপনার।তার সাথে নিজের স্ত্রী এবং শালাবাবুর বিয়ের দাওয়াতও পেতে চলেছেন।কি সৌভাগ্য আপনার।”
ত্রিজয় দুবার নিঃশ্বাস টানলো, চাপা ভরাট কন্ঠে বললো,
“আমাকে খোচা মারা বন্ধ করে নিজের কাজে যাও ইভান।”
ইভান প্রতিত্তোরে এবার আর কিছু বললো না, হু হা না করেই, পা বাড়ালো প্রস্থানের জন্য।ওমনি পেছন থেকে ডেকে বসলো ত্রিজয়,
“দাড়াও।”
ইভান দাঁড়িয়ে গেলো,প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো ত্রিজয়ের দিকে। ত্রিজয় তার ভঙুর শরীরটা টেনে টুনে উঠে দাড়ালো,ইভানের মুখোমুখি এসে বললো,
“এখানে থাকো, আসছি আমি।”
ত্রিজয়ের এবারকার কথায় মুচকি হেসে ফেললো ইভান,মাথা চুলকে ঘাড় কাত করলো কেবল।ত্রিজয় পা বাড়াতেই ডাকলো ইভান,
“স্যার?”
ত্রিজয় দাড়ালো না, লম্বা পা ফেলে বেড়িয়ে যেতে যেতে বললো,
” বলতে হবে না,যাওয়ার সময় ওর পছন্দের ডাবের পানি নিয়ে যাবো।”
পরপরই নিজে নিজে বিরবির করলো,
“ছেঃ, ডাবের পানিও নাকি কারো পছন্দ হয়।এখন আমার কতগুলো টাকা ওই নোনতা পানিতে ভেসে যাবে।”
⭕পরবর্তী পর্বে তিন নায়কের কামড়াকামড়ি দেখতে পাবে।রেসপন্স পেলে পরবর্তী পার্ট কালকেই দেওয়ার চেষ্টা করবো।⭕
চলবে,,,,,,,,,

