#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:36
রাত তখন আটটা বেজে কুড়ি। নিস্পার রুমে দ্বন্দ্ব বেধেছে একপ্রকার।তিনজনই নিস্পাকে আগলে নিতে চাচ্ছে বাহুডোরে, যার দরুন এগোনো হচ্ছে না কারোই,তিনজনেই লড়াইয়ে নেমেছে নিস্পার কাছে যাওয়ার জন্য।
নিস্পা অতিষ্ট,প্রান তার ওষ্ঠাগত,কি করবে ভেবে না পেয়ে এদিক ওদিক হাতড়াতেই সাইড টেবিলের উপর থকে তুলে নিলো একটা ছোট্ট ছুড়ি।তারপর দ্রুত নিজের হাতের উপর রেখে চিৎকার ছুড়ে বললো,
“সাবধান তিনজনের একজনও আমাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করবেন না, আমি কিছু একটা করে ফেলবো বলে দিলাম।”
নিস্পার চওড়া কন্ঠের হুমকিতে থেমে গেলো তারা।শান্ত হয়ে তাকালো নিস্পার হাতের ছুড়ির দিকে।
তাকরিম ভয় পেয়ে বিনয়ী কন্ঠে বললো,
“শান্ত হও আলো,আমাকে বিশ্বাস করো, তোমার মন স্পর্শ আগে শরীর স্পর্শ করার কোন ইচ্ছে আমার নেই।”
পরপরই কিয়ান অনুনয় করে বললো,
“তোমার শরীরের কন্ডিশন ভালো নয়,ছুড়িটা নামাও।কথা দিচ্ছি আমরা কেউ স্পর্শ করার চেষ্টা করবো না তোমায়।”
ত্রিজয় ততক্ষণে দু পা এগিয়ে গেলো, কৌশলে চেপে ধরেলো নিস্পার হাতের ছুড়ি।হেচকা টানে মেয়েটাকে এনে ফেললো চওড়া বুকের মধ্যখানটায়, ভরাট কন্ঠে বললো,
“চব্বিশ হাজার টাকার শাড়ি,সত্তর হাজার টাকার মেকাপ,আড়াইশ টাকার ডাব,খাবার খরচ বাবদ এক লাখ টাকা খরচ করেছি তোর পেছনে,স্পর্শ করবো না আবার কি?টাকা উশুল না হওয়া অব্দি জড়িয়ে ধরে বসে থাকবো,দেখি কার বাপের কি।”
নিস্পার অস্তিত্ব ত্রিজয়ের বুকে দেখা মাত্রই তাকরিমের পা থেকে মস্তকের চূড়া অব্দি আগুন জ্বলে উঠলো দাউদাউ করে। তেড়ে গেলো ত্রিজয়ের দিকে,এবার আর কলার চেপে ধরলো না, সোজা ঘুষি বসিয়ে দিলো ত্রিজয়ের নাক বরাবর, ত্রিজয় কিঞ্চিৎ টলে গেলো,চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো দু সেকেন্ডের মতো, অথচ হাতের বাঁধন টললো না, সেই একই ভাবে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে রাখলো নিস্পার নরম শরীর টা।নিস্পা পরিস্থিতি উপলব্ধি করার চেষ্টা চালালো, তার আগেই তাকরিমের ছুড়ে দেওয়া আরেকটি আঘাতে শরীর ঝাকুনি দিয়ে উঠলো তার।
নিস্পা নির্বাক,আতঙ্কে জমে গিয়েছে তার সত্তা। হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। ত্রিজয়ের শক্ত বাহু-বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও ব্যর্থ সে,যেন আটকে গেছে দুর্বার শক্তির মাঝে। ত্রিজয় তার মাথাটা বুকের ভেতর চেপে ধরে আছে নিঃসংশয় দৃঢ়তায়,মনে হচ্ছে ত্রিজয়ের পেশিবহুল বুকের কঠিন পাঁজরের সাথে তার নাক, মুখ, ঠোঁট পিষে যেতে বসেছে চিরতরে ।
ততক্ষণে তাকরিমের ছুড়ে দেওয়া আরেকটি জোরালো ঘুষি এসে পড়ল ত্রিজয়ের গালে আঘাতের তোপে ত্রিজয়ের মুখ একপাশে ঘুরে গেল, ফর্সা ত্বকে বসলো লাল ছাপ ।তাকরিম ক্রোধিত কন্ঠে চেচালো,
“জানোয়ারের বাচ্চা ওকে ছাড়, আমি তোকে খুন করে ফেলবো।”
ত্রিজয় নির্বিকার, নিস্পৃহ।মারের বদলে মার, বা চওড়া কন্ঠে প্রতিবাদ তুললো না এবার, তার হাতের বন্ধনী একটুও টলেনি।নিস্পা তখন ভয়ে মুচড়ে উঠল। মুখ হা করে নিঃশ্বাস নিয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো
“মার খাচ্ছেন, তবুও ছাড়ছেন না কেন?ছাড়ুন আমাকে, প্লিজ, ছাড়ুন”
ত্রিজয় ছাড়লো না,হাতের বন্ধনী দৃঢ় করে ভরাট কন্ঠে বললো,
“ছাড়তে ইচ্ছে করছে না মেয়ে, মনে হচ্ছে একটা ভয়ংকর মৃত্যু যাত্রার তৃষ্ণা মেটাচ্ছি।”
তারপর কন্ঠ খাদে নামিয়ে শান্ত স্বরে বললো,
“বুকের বা পাশটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে,এতো শান্তি কেন পাচ্ছি বলতো?”
নিস্পার হৃৎপিন্ডের গতি বাড়লো,ত্রিজয়ের ঠান্ডা কন্ঠের স্বর নাড়িয়ে তুললো তার অস্তিত্ব।ঝাকুনি দিয়ে উঠলো হৃৎপিন্ড,নিস্ক্রিয় লাগলো ভোতা অনুভুতি গুলো।
তাকরিম তার আঙুলগুলো কড়াকড়ি করে মুড়েছিল,পরবর্তী আঘাতের জন্য প্রস্তুত করেছিলো মুষ্টি । কিন্তু ত্রিজয়ের শান্ত, দৃঢ় কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছতেই থেমে গেল তার হাত, ঠিক ত্রিজয়ের নাকের কাছাকাছি এসে।মুষ্টিবদ্ধ হাতটা থরথর করে কাঁপছে তার।রাগে,ক্ষোভে আর অসহায়ত্বে চোখে ধরা দিয়েছে উত্তপ্ত লাল অশ্রু।
ডক্টর কিয়ান ততক্ষণে এগিয়ে এসে চেপে ধরেছে তাকরিমের হাত। তার চোখে ছড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত শীতলতা, অথচ সেই চোখের গভীরে দাউদাউ করে জ্বলছে অপ্রকাশ্য আগ্নেয়গিরি।
এক অবিচল দৃঢ়তায় কিয়ান তার হাত বাড়িয়ে তাকরিমের মুষ্টিবদ্ধ হাত সরিয়ে নিল ত্রিজয়ের মুখের উপর থেকে। তারপর ত্রিজয়ের আত্মা বিদীর্ণ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ত্রিজয়ের দৃষ্টি বরাবর ছুড়ে দিল এক তীক্ষ্ণ, ভয়ংকর দৃষ্টি।রাগান্বিত শান্ত কন্ঠে বললো,
” ছাড় ওকে।”
তাকরিম কপাল কুঁচকালো, চমকে উঠে চকিত দৃষ্টিতে তাকালো কিয়ানের দিকে। তার কুচকানো চোখে প্রশ্ন,কিন্তু উত্তর পাবার আগেই কিয়ানের মুখাবয়বে ভেসে উঠল এক বিভ্রান্তিকর নীরবতা, পরপরই ঘটালো অপ্রত্যাশিত ঘটনা।
ডক্টর কিয়ানের আঙুলের ফাঁকে ধরা ছোট্ট একটি ছুরি ত্রিজয়ের দিকে ছুটে গেলো নিখুঁতভাবে হিসেব করা সরু গতিতে।কিন্তু ত্রিজয়ের শরীরের চামড়া স্পর্শ করার আগেই ছুড়িটি চেপে ধরলো নিস্পা।ত্রিজয়ের বুকে মুখ গুজেই অস্পষ্ট কুকিয়ে উঠলো সে,
“আহ!”
ত্রিজয় ঘাবড়ালো,দ্রুত তাকালো নিস্পার মুখের দিকে।পরপরই অস্থির দৃষ্টি ঘোরালো কিয়ানের হাতের দিকে।কিয়ানের হাত কাঁপছে চোখে মুখে অজ্ঞাত দ্বিধার জটিল ছায়া,নিস্পার হাতের চামড়া ছিলে গিয়ে সাদা ফ্লোরে টুপটুপ করে পড়েছে কয়েক ফোটা রক্ত।
তাকরিম স্পষ্ট দেখলো নিস্পার হাতের টকটকে লাল রক্তের ফোঁটা।ঘটনার আকস্মিকতায় এক বিদ্যুৎখণ্ড বয়ে গেল তার শরীরের, আত্মা কেঁপে উঠল হাড়ের গভীরে।
না ভাবার সময়, না প্রশ্ন করার সুযোগ,এক ন্যানো সেকেন্ডের ক্ষিপ্রতায় হেঁচকা টানে ত্রিজয়ের বুক থেকে ছিনিয়ে নিল নিস্পাকে। দুনিয়ার সব বিপদ থেকে আজীবনের জন্য ঢেকে রাখার উদ্দেশ্যে দুই বাহুর শক্ত বেষ্টনীতে আগলে নিলো মেয়েটির নাজুক শরীরটা।
পরপরই আগুন চোখে কিয়ানের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলো,
‘কুত্তার বাচ্চা! তোর রক্ত দিয়ে গোসল করবো আমি!’
কিয়ান বিভ্রান্ত, একবার দেখছে তার হাতে ধরে থাকা ছুড়ি টার দিকে, আরেকবার দেখছে নিস্পার রক্তাক্ত হাত আর রিক্ত শূন্য মুখের দিকে।তার হাত কাঁপছে,কাঁপতে কাঁপতে এক পর্যায়ে ফ্লোরের উপর ঝনঝনিয়ে ছিটকে পড়ে ছুড়ি টা।
পরপরই সবকিছু উপেক্ষা করে কিয়ান উন্মাদের মতো ছুটে যায় নিস্পার কাছে, কেমন পাগলের মতো লুটিয়ে পরে নিস্পার পায়ের উপর,অস্থির কন্ঠে প্রলাপ বকে,
“আমি তোমায় মারতে চাই নি রুপ।আমি তোমাকে ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি।”
নিস্পা হকচকায়, তাকরিমের বাহু বন্ধনে আবদ্ধ থেকেই গুটিয়ে নিতে চায় নিজের পা, অস্বস্তিকর কন্ঠে বলে,
“আরে কি করছেন পা ছাড়ুন।”
তাকরিম হিংস্র, কুকুরের ন্যায় লাথি বসায় কিয়ানের বুকে, ক্রোধিত কন্ঠে বলে,
“ওকে স্পর্শ করার সাহস দেখালি কি করে তুই?তোর হাত কেটে রেখে দিবো জানোয়ারের বাচ্চা।”
এত এত কিছু হচ্ছে অথচ ত্রিজয় স্তব্ধ,তার ধ্যান জ্ঞান উপলব্ধি পুরোটাই অবস হয়ে গিয়েছে নিস্পার ছিলে যাওয়া কোমল হাতটা দেখা মাত্রই।
কিয়ানের ছুড়িটা যদি তার বুকের দু ইঞ্চি গভীরে ঢুকে যেতো? তবে তো নিঃশ্বাস বন্ধ হতো আজীবনের মতো।মেয়েটাকি তাকে বাঁচিয়ে দিলো?
কিন্তু কি হয়েছিল তার?এই মেয়েটার সংস্পর্শে যতবার আসে কেন হারিয়ে যায়?কেন সেই হারিয়ে যাওয়ার কারণ যানে না সে?কোন এক অদ্ভুত অদৃশ্য অস্তিত্ব ভর করে তাকে, দিন দুনিয়ায় খেয়াল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় পুরোতরে।মেয়েটা তাকে হিপনটাইজ করছে না তো?কিন্তু কিভাবে? অক্ষিদ্বয় ছাড়াও কি হিপনোটাইজ করা সম্ভব?চোখের সংযোগ ছাড়া বুঝি মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ করা যায়?
কিন্তু নিস্পা তো করছে,কোন এক অজানা প্রক্রিয়াতে আয়ত্ত করে নিচ্ছে ত্রিজয়ের মন মস্তিষ্ক।আচ্ছা,মেয়েটার কি?অলৌকিক শক্তি আছে?যা দ্বারা হৃদয় হিপনোটাইজ করা সম্ভব।
****
“গার্ডস।গার্ডস।”
তাকরিমের চওড়া কন্ঠের হুংকারে হুরমুর করে কেবিন রুমে প্রবেশ করলো কয়েকজন গার্ড।তারা রুমে প্রবেশ করতেই ভাবনার জাল ছিড়ে বেড়িয়ে এলো ত্রিজয়।চোখে মুখে তখনও ঝাপসা ঘোর।সে কেবল তাকালো নিস্পার দিকে, যার তুলতুলে শরীর টা তাকরিমের সৌবিষ্ঠ বাহুর অভ্যন্তরে আবদ্ধ।
মেয়েটা ছটপট করছে,তাকরিমের সংস্পর্শ থেকে বেড়িয়ে আসার জন্য হাত মুচড়াচ্ছে, মিনমিনে কন্ঠে আওড়াচ্ছে,
“ছাড়ুন, ছাড়ুন। আমাকে কেউ স্পর্শ করবেন না।মুক্তি দিন, নয়তো মৃত্যু দিন।ছাড়ুন আমাকে।”
তাকরিমের কান অব্দি পৌছায় না নিস্পার মিনমিনে কন্ঠের মিনতি,তার চোখের গভীরে জ্বলন্ত ক্রোধ।কালো সুট বুটের আস্তরনে ঢাকা গার্ড গুলো ছুটে আসা মাত্রই সে ক্রোধিত কন্ঠে হুকুম তালিম করলো,
“এই জানোয়ার টাকে গোডাউনে নিয়ে গিয়ে এমন হাল করবে যেন শরীরে এক ফোটা রক্ত অবশিষ্ট না থাকে।আমার আলেকজান্দ্রার শরীর থেকে ঝড়া প্রতিটি ফোটা রক্তের দাম ওকে দিতে হবে।”
তাকরিমের কথায় আতংকে শিটিয়ে গেলো নিস্পা।রক্তান্ত হাতটা উঠিয়ে আতংকে চেপে ধরলো মুখ,ভয়ে জর্জরিত চাপা কন্ঠে বললো,
“রক্তের খেলা বন্ধ করুন।আমার ভয় হচ্ছে, আমার মতো একটা সাধারণ মেয়ের জন্য কেন করেছেন এমন?আপনাদের শরীর থেকে ঝড়ে পরা এক ফোটা রক্তের অভিশাপ আমার জীবন ধ্বংস করে দিবে।”
তাকরিম এবারে শুনলো নিস্পার আওড়ানো বুলি, উত্তরে শান্ত কন্ঠে বললো,
“ভয় পেয়ো না আলেকজান্দ্রা।নিজেকে সাধারণ ভেবে ভুল করো না একদম।তুমি অসাধারণ, যার ভালোবাসা মোহ আমাকে জন্ম দিয়েছে দু দুবার।বিধাতার দেওয়া দ্বিতীয় সুযোগ আমি হাতছাড়া করতে পারবো না আলো”
নিস্পা শুখনো ঢোক গিললো, নরম কন্ঠে শুধালো,
“আপনি বিধাতা বিশ্বাস করেন তাইনা?”
“হ্যাঁ, বিশ্বাস না করার কোন কারণ নেই।”
“তবে ছেড়ে দিন আমায়,বিধাতা যদি আপনার ভাগ্যে আমাকে লিখে থাকে তবে আমাকে জয় করার জন্য কোন লড়াইয়ে জড়াতে হবে না আপনার।”
“তাতো সম্ভব নয় আলেকজান্দ্রা, তোমার ক্ষেত্রে আমি বড্ড বেপরোয়া, তোমাকে ছেড়ে দিয়ে লড়াই মুলতবি করার ভুল আমি কখনোই করবো না।নিয়তি চায় যুদ্ধ, এই পৃথিবীর জমিন হলো সেই যুদ্ধের ময়দান ,যেখানে পেতে হলে হারতে হবে, বিজয়ী হতে হবে যেকোনো একজনকে।”
নিস্পা অবাক হলো, বিস্ময়ে চোয়াল ঝুললো তার,খরখরে জ্বিভের আগা শুখিয়ে গিয়েছে।সে বুঝে গিয়েছে এ যুদ্ধে সে পুরস্কার মাত্র,এছাড়া তার কোন মূল্য নেই,তার ইচ্ছে বা মতামতের কোনো গুরুত্ব নেই।
তবুও সে বলতে চাইলো, নিজের তুচ্ছতা স্বীকার করতে চাইল না এতো সহজে।অথচ কঠিন কন্ঠে কিছু শক্ত কথা বলতে চেয়েও বলা হলো না তার,কানে ভেসে এলো কিয়ানের কন্ঠ,
“ডোন্ট ওয়ারি রুপাঞ্জেল, তোমাকে জয় করার যুদ্ধ তো শুরু হয়েছে সেই পঞ্চাশ বছর আগে এখন শুধু তোমাকে জয় করার অপেক্ষা। ”
কিয়ানের ভয়ডরহীন কন্ঠে, মাত্রাতিরিক্ত রেগে উঠলো তাকরিম,চেচিয়ে বললো,
“কুত্তার বাচ্চা তোর জ্বিভ কেটে কুত্তাকে খাওয়াবো আমি।আমার আলেকজান্দ্রাকে জয় করার যুদ্ধে কোন প্রতিধন্ধিকে বাচিঁয়ে রাখবো না আমি।”
তাকরিমের কথায় ঠোঁট বাকিয়ে হেসে দিলো কিয়ান।তবে প্রতিত্তোর করার আগেই শোনা গেলো ত্রিজয়ের কন্ঠস্বর,
“প্রতিধন্ধী বীহিন যুদ্ধ তো কাপুরষরা করে এমপি মশাই।”
ত্রিজয়ের কথার রেশ টেনে কিয়ান বললো,
“শালা এমনিতেই মেরুদন্ডহীন কাপুরষ, দু টাকার পাওয়ার ছাড়া আছে কি এর?”
তাকরিম রাগে ফুসে উঠলো,দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডের দিকে আদেশ ছুড়ে বললো,
“দাঁড়িয়ে দেখছো কি?নিয়ে যাও ওকে।আমি না আসা অব্দি একটা আঁচড়ও দিবে না, শালাকে আমি বোঝাবো তাওসিফ তাকরিমের মেরুদণ্ডের জোর কতটা।”
তাকরিমের আদেশ পাওয়া মাত্রই গার্ডরা এগিয়ে এলো কিয়ানকে ধরার জন্য,কিয়ানের শিরায় শিরায় এটিটিউড,গার্ড গুলো এগিয়ে আসা মাত্রই হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলো।চোখ ভর্তি আত্মবিশ্বাস নিয়ে তাকালো তাকরিমের চোখের দিকে,চাপা ভরাট কন্ঠে বললো,
“ওয়েলকাম এমপি তাওসিফ তাকরিম,একটি নতুন যুদ্ধের জন্য স্বাগতম।তবে আমার গায়ে একটা টোকা দেওয়ার ভুল করবেন না আশা করি।”
“হুমকি দিচ্ছিস?তাও এমপি তাওসিফ তাকরিমকে?”
কিয়ান ঠোঁট বাকিয়ে হেসে দিলো এবার,ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
“গত এক সপ্তাহ হলো আমার হসপিটালে একজ রোগী ভর্তি হয়েছে, নামটা যেন কি?ওহ হ্যাঁ!জেসমিন বেগম। মহিলা মানুষ টা খুব ভালো কিন্তু কি করার বলুন।উনার যে একটা মস্ত বড় পাপ রয়েছে এমপি মশাই, আপনাকে জন্ম দেওয়াটা ওনার জীবনের কাল হয়ে দাড়ালো।”
শেষের কথাটা আফসোসের সহিত বললো কিয়ান।
কিয়ানের ঠান্ডা কন্ঠস্বর আর রহস্যময় হাসির ঝিলিক দেখেই চোখ বড় বড় করে তাকালো তাকরিম,নিস্পাকে একহাতে ধরে রেখে অন্য হাতে কলার চেপে ধরলো কিয়ানের, ক্রোধিত কন্ঠে বললো,
“মা*দার*চো** আমার আম্মাকে কি করেছিস?”
কিয়ান খুব ধিরে সুস্থে কলারের উপর থেকে ছাড়িয়ে নিলো তাকরিমের হাত।শান্ত অভিব্যক্তিতে দেখলো সময়, তারপর ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
“আমি আসছি এমপি মশাই।আমার রুপাঞ্জেলকে জয় করার লড়াই আমি আরো আগে থেকেই করে রেখেছি। বড্ড নিখুঁতভাবে সাজিয়েছি এই খেলা।আমাকে টেক্কা দিয়ে ওকে জয় করা এতো সহজ হবে না।”
কিয়ান নিজের পরনের সাদা এফ্রোন টা ঠিক করে নিলো,তারপর এগিয়ে গেলো নিস্পার দিকে, নিস্পা কাধের উপর থেকে তাকরিমের হাতটা সরিয়ে দিতে দিতে বললো,
“চলো রুপাঞ্জেল।ডক্টর কিয়ান চৌধুরির বাড়ি তোমার অপেক্ষায় আছে।”
কথাটা বলেই নিস্পার কোমল হাত ধরলো কিয়ান,নিস্পাকে নিয়ে যেতে চাইলো কিন্তু তাকরিম যেতে দিলো না, বরং পূর্বের চেয়ে দ্বিগুণ শক্ত করে চেপে ধরলো নিস্পার হাত,শক্ত কঠিন কন্ঠে গার্ডদের উদ্দেশ্যে বললো,
“জানোয়ার টাকে নিয়ে গিয়ে এমন মার মারবে যেন দিন দুনিয়া ভুলে যায়।”
কিয়ান কপাল কুচকালো,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,
“তুই ভুলে যাচ্ছিস এমপি তোর মা আমার আন্ডারে আছে।”
তাকরিম ডোন্ট কেয়ার ভাব নিলো,দাম্ভিক কন্ঠে বললো,
“ভালোবাসার যুদ্ধে কোরবানি দিতে হয়, আমি না হয় আমার মাকে কোরবানি করে দিলাম।যা ইচ্ছে কর,একমাত্র আলেকজান্দ্রা ছাড়া আমার কোন পিছুটান নেই।”
নিস্পা অবাক হয়,বিস্ময়ে জবান আটকে যায় গলায়,খুব করে বলতে ইচ্ছে হয়,
“যে নিজের জন্মদাত্রী মাকে ভালোবাসতে পারে না, সে কি করে অন্য একটা মেয়েকে ভালোবাসতে পারে?এটা ভালোবাসা হতে পারে না, এটা কেবল আকাঙ্খা, জয় করার আকাঙ্খা।”
নিস্পার কিছু বলার প্রয়োজন পরলো না,তার আগেই ভেসে এলো ত্রিজয়ের দু হাতের করতালি।ত্রিজয় খুব জোরে জোরে করতালি দিয়ে এগিয়ে এসে দাড়ালো ডক্টর কিয়ান আর এমপি তাওসিফ তাকরিমের মাঝখানে, তারপর দাপটিয় ভঙ্গিতে শার্টের ভেতর থেকে বের করে আনলো একটা হিডেন ক্যামেরা,ক্যামেরা টা দু আঙুলের ভাজে ধরে বললো,
“এটা কি চিনতে পেরেছেন নিশ্চয়ই?এতোক্ষণ ধরে একটা মেয়েকে নিয়ে আপনারা দুজন যে পরিমাণ বেহায়াপনা করেছেন তার সবকিছু এই ক্যামেরায় রেকর্ড করা হয়ে গিয়েছে,এখন এটা যদি আমি পাবলিক করি, কি হবে বলুন তো?”
কথাটা বলতে গিয়ে শব্দ করে হেসে ফেললো ত্রিজয়,ব্যাঙ্গ কন্ঠে বললো,
” দ্যা গ্রেট ডক্টর কিয়ান চৌধুরী আর দেশের এমপির এমন কামড়াকামড়ি বেশ ইঞ্জয় করবে পাবলিক।”
তাকরিম রেগে গিয়ে শার্ট চেপে ধরলো ত্রিজয়ের,হিসহিসিয়ে বললো,
“ইউ ব্লাডি বাস্টার্ড।”
ত্রিজয় কঠিন দৃষ্টিতে তাকালো তাকরিমের হাতের দিকে,তারপর নরম অথচ শক্ত কন্ঠে বললো,
“শার্ট ছাড়।”
তাকরিম ছাড়লো না, বরং একইভাবে চেপে ধরে অগ্নি চোখে তাকিয়ে রইলো ত্রিজয়ের দিকে,ত্রিজয় এবার কন্ঠ জোড়ালো করলো,উচ্চস্বরে ধমকে উঠলো,
“শার্ট ছাড় শালা স্লাট।”
তাকরিম ছেড়ে দিলো ত্রিজয়ের শার্ট, তারপর ধির গতিতে ত্রিজয়ের শার্ট ঠিক করে দিতে দিতে নরম কন্ঠে বললো,
“তোর ভালোর জন্য বলছি শোন, ক্যামেরা টা দিয়ে দে, নয়তো খুব খারাপ হয়ে যাবে ”
ত্রিজয় নিচের ঠোঁট এলিয়ে হেসে দিলো, ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিলো তাকরিমের হাত, তারপর নিস্পাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“এই কানার বাচ্চা গুনে গুনে চার পা সামনে আয়।”
নিস্পা একটু নড়েচড়ে দাড়াতেই তাকরিম নিশ্বব্দে ছেড়ে দিলো নিস্পার হাত,নিস্পা দীর্ঘশ্বাস ফেললো,সীদ্ধান্ত নিলো জীবন তাকে যেদিকে ঠেলে দিবে সে সেদিকেই হাঁটবে, এছাড়া দ্বিতীয় কোন রাস্তা তার জানা নেই, কারণ সে চাক বা না চাক এই যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে, আর এই যুদ্ধ জয় না আসা অব্দি থামবেও না।
তাই কোন দ্বিরুক্তি না করে এগিয়ে গেলো চার পা,পরপরই টের পেলো ত্রিজয়ের হাতের মুঠোয় বন্দী হয়েছে তার হাত,ত্রিজয় চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই এগিয়ে আসতে চাইলো কিয়ান, কিন্তু তার আগেই ধমকে উঠলো ত্রিজয়,
“খবরদার ডক্টর, এক পা এগোনোর সাহস দেখাবেন না।মান সম্মান যেটুকু আছে অচিরেই হারিয়ে ফেলবেন।আপনি নিশ্চয়ই জানেন বাঙালির হাতে কিছু পৌছানো মানেই ভাইরাল হয়ে যাওয়া?ভিডিও টা পাবলিক একবার পেয়ে গেলে আপনাদের তো ভাইরাল থেকে ভাইরাস বানিয়ে দিবে।এটুকু তো ভয় করুন অন্তত।”
নিস্পাকে নিয়ে দু কদম এগিয়ে গেলো ত্রিজয়, তারপর কিছু একটা মনে করে থেমে গেলো চট করেই,ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়ে তাকরিমকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“লাল সালাম এমপি মশাই, ভাগ্যে থাকলে খুব তাড়াতাড়ি দেখা হবে।”
__________
নিস্পাকে গাড়িতে নিয়ে ড্রাইভিং করছে ত্রিজয়।।নিস্পা গাড়ির জানালার সাথে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে চুপচাপ, কোন কথা নে শব্দ নেই।নিজের জীবন নিয়ে বড্ড ক্লান্ত সে, সামনে পেছনে সবকিছু অন্ধকার।তার দু চোখের মতো তার জীবনটাও বুঝি অন্ধকারে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে একট একটু করে ।
ত্রিজয় ড্রাইভিং-এ মনযোগ ধরে রাখতে পারলো না,যতবারই সামনের দিকে দৃষ্টি স্থির রাখতে চায়, ততবারই কোন না কোনভাবে পিচলে যায়,সমস্ত ধ্যান এসে আটকায় নিস্পার নাজুক মুখের উপর।
ত্রিজয় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,শুখনো ঢোক গলদঃকরন করে মিলন ঘটালো কণ্ঠনালীর,
“তুই হিপনোটাইজ করতে জানিস?”
নিস্পা নড়েচড়ে উঠলো,বন্ধ চোখের পাতা খুলে অস্ফুটে বললো,
“হু?”
ত্রিজয় আবার বললো,
“তুই হিপনোটাইজ করতে পারিস তাই না? ”
নিস্পা কপাল কুচকালো,অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বললো,
“সম্মোহনের কথা বলছেন?”
ত্রিজয় ছোট্ট করে উত্তর দিলো,
“হু,,”
নিস্পা ম্লান হেসে দিলো হুট করে, বললো,
“দিনে চল্লিশ বার কানা বলেন অথচ আমি যে চোখে দেখতে পাই না সেটা ভুলে যান কি করে?হিপনোটাইজ করার জন্য নিশ্চয়ই দুটো চোখের প্রয়োজন হয় তাই না।”
“কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে তুই হিপনোটাইজ জানিস,কোন অন্য টেকনিকে।”
“সেটা কি করে?”
“মনের সাথে মনের কোন কানেকশন তৈরি করতে পারিস তুই তাই না?”
নিস্পা ভ্রু উচালো, কৌতুহলি কন্ঠে বললো,
“এমনটা কেন মনে হলো আপনার?”
ত্রিজয় গাড়ির স্টেয়ারিং এর দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বললো,
“তখন তোর মাথাটা বুকে রাখার পর আমার দুনিয়া পাল্টে গেছিলো, মনে হচ্ছিলো তুই হিপনোটাইজ করেছিস আমাকে, আর তার চক্করে ওই শালা এমপির মার তো খেলাম তারউপর পাগল ডাক্তারের হাতে জীবনটাও যেতে বসেছিলো।”
কথাটা বলতে বলতে থামলো ত্রিজয়,আচমকা থামিয়ে ফেললো গাড়ি, হটাৎ গাড়ি থেমে যাওয়ায় ঝাকুনি দিয়ে উঠলো নিস্পা,পেটের ক্ষত স্থানে হাত রেখে কুকিয়ে উঠলো মৃদু স্বরে,
“আহ!”
ত্রিজয় চমকালো ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে নিজের হাতটাও বাড়িয়ে দিলো নিস্পার পেটের দিকে,তাড়াহুড়ো কন্ঠে বললো,
“সরি সরি।খুব লেগেছে?”
নিস্পা যন্ত্রণা গিলে শুখনো ঢোক গিললো,ত্রিজয়ের হাতটা সরিয়ে দিতে চেয়ে বললো,
“হাত সরান এতো দরদ দেখাতে হবে না।”
ত্রিজয় সরালো না নিজের হাত,বরং নিস্পার পেটের উপর হাত রাখা অবস্থায় আরেকটি হাত নিয়ে জড়িয়ে ধরলো নিস্পার বাহু,চঞ্চল কন্ঠে বললো,
“ব্রেইন শট মহিলা এটা আলগা আদর না, এটা একজন হাসবেন্ড হিসেবে আমার দায়িত্ব।”
“হটাৎ এতো স্বামীজ্ঞান আসলো কোত্থেকে?কাল কোথায় ছিলো দায়িত্ব?কই আমাকে বাঁচাতে তো ছুটে আসেন নি, সেই তো নিজের জান্নাতকে বেছে নিয়েছেন।”
“যদি তুই দেখতে পেতি মেয়েটার কেমন ভাবে বাজে এক্সিডেন্ট হয়েছে তবে আগে জান্নাতকে বাঁচানোর কথা তুই নিজেই বলতি ।”
“আমিও তো মরে যেতে পারতাম, আমারও তো বাজে অবস্থা হতো, যদি এমপি মশাই সময় মতো না আসতো।যদি ওই ঘাতক আরেকটা ছুড়ি গেঁথে দিত তাহলে?”
“কিছুই হত না, কারণ ওই ঘাতক তোকে মারতে আসে নি জাস্ট আঘাত করতে এসেছিলো।ওটা সামান্য আঘাত ছিলো। তোর কিছু হোক বা না হোক তোর জন্য আমি আর এমপি মশাই দুজনেই ছিলো, কিন্তু জান্নাতের জন্য যদি আমি না থাকতাম তাহলে মেয়েটা মরে যেত।”
“আপনি তো বললেন জান্নাত এমপি মশাইয়ের বোন। আপনি না গেলে উনি নিশ্চয়ই জান্নাতকে বাঁচিয়ে নিতো।”
“নিতো না, কারণ উনার লোকের গাড়িই জান্নাতকে এক্সিডেন্ট করেছে।”
নিস্পা আঁতকে উঠল পুরোদমে,দ্রুত কন্ঠে বললো,
“কিহ!এমপি মশাইয়ের নিজের লোক ওনার বোনের এক্সিডেন্ট করেছে আর আপনি এই বিষয় টা এমপি মশাই কে বলেন নি কেন?”
ত্রিজয় নাক কুচকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকালো নিস্পার সরল মুখের দিকে, তারপর চাপা স্বরে বললো,
“তুই সত্যিই ব্রেইন শট মহিলা।তোর কি মনে হয় এমপির লোক তার বোনকে মেরে দিয়েছে আর এমপি কিছু জানে না?সে সব যানে,এমপি যেনে বুঝে আমাকে টানাপোড়নে ফেলার জন্য এই জঘন্য পরিকল্পনা করেছে।”
নিস্পা হতভম্ব,বিস্ময়ে হা হয়েছে পুরু ঠোঁট,মিনমিনে স্বরে বললো,
“তার মানে আমাকে আঘাত করেছে এমপি মশাইয়ের লোক?”
“হতে পারে।” ছোট্ট করে বললো ত্রিজয়।
নিস্পা আরেকটু চমকালো এবার,হতহ্বিবল হয়ে চোখের পাতা অব্দি ফেলতে ভুলে গেলো সে,রোবটের মতো ঠোঁট নাড়িয়ে বললো,
“কিন্তু উনি তো আমাকে ভালোবাসে বললো,উনার এতো পাগলামি তাহলে কীসের জন্য? ”
“তোকে পাওয়ার জন্য, তোকে ভালোবেসেই ওই এমপি এসব করেছে।জান্নাতকে আমার জীবনে ফিরিয়ে দিয়েছে এমন কায়দায় যেন আমি তোর কাছে ফিরে না যাই, আর তোকে নিজের কাছে রাখার জন্যই, তোর মন জয় করার জন্যই হয়তো পুরো গেম টা সাজিয়েছে।”
নিস্পা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,ছোট্ট করে বললো,
“এমপি মশাই এতো কিছু করার পরেও কেন ফিরে এলেন তাহলে?”
ত্রিজয়ের কাছে উত্তর নেই,চুপচাপ গাড়ি থেকে বেড়িয়ে, নিস্পাকে কোলে তুলে নেওয়ার জন্য ঝুকে গেলো,অস্পষ্ট বললো,
“জানিনা।”
নিস্পা ভড়কালো,দু হাতে জড়িয়ে ধরলো ত্রিজয়ের গলা, তাড়াহুড়ো কন্ঠে বললো,
“হেটেই যেতে পারবো আমি, কোলে নিলেন কেন?”
ত্রিজয় নিস্পাকে কোলে তুলে এগোলো দু কদম,শান্ত কন্ঠে বললো,
“কন্ট্রোল করছি।”
নিস্পা কপাল কুচকে বললো,
“মানে?”
ত্রিজয় শুখনো ঢোক গিললো, এক নজর তাকালো নিস্পার দিকে,তারপর মিহি কন্ঠে বললো,
“চুমু খেতে ইচ্ছে করছে,তাই কোলে নিয়ে নিজেকে কন্ট্রোল করছি।”
নিস্পা নাক উঁচালো,তাজ্জব হয়ে বললো,
“আপনার লজ্জা বোধহয় এক পার্সেন্টও নেই তাইনা?”
“লজ্জা আছে বলেই বোন মনে করে চুমু দিতে চেয়েছি,বউ মনে করে চুমু দিতে চাইলে এতোক্ষণে দূর্ঘটনা ঘটে যেত।”
“ওয়াক থু, আপনার কথা শুনেই বোমি পাচ্ছে আমার।”
“কিছু করলাম না তাতেই বোমি পাচ্ছে?কিছু করলে তো বোমির সাগরে ডুবিয়ে মারবি মনে হচ্ছে।”
“ছিঃ, আপনি সত্যিই একজন নির্লজ্জ পুরুষ।”
“ইউ নো প্রতিটি মেয়েই একটা করে নির্লজ্জ হাসবেন্ড চায়,তোর তো ভাগ্য ভালো, চাওয়ার আগেই পেয়ে গিয়েছিস।”
“এতো ভাগ্য আমার সহ্য হয় না, কপালে জুতা মারতে ইচ্ছে করছে।”
“বছরে এক জোড়া জুতা কিনে দিবো, সেটা তুই কিভাবে ইউজ করবি তোর ব্যাপার, কিন্তু মনে রাখিস এক জোড়ার বেশি পাবি না।”
“ছিঃ,আপনার মতো পুরুষ আমি দুটো দেখি নি।”
“দেখে নে, ভবিষ্যতে আরেকটা ডাউনলোড দিতে সুবিধা হবে।”
নিস্পা ভ্রু গোটাল, অস্পষ্ট জিজ্ঞেস করলো,
“আরেকটা ডাউনলোড মানে?”
ত্রিজয় ভরাট কন্ঠে উত্তর দিলো,
“মানে বাচ্চা গাচ্চা।”
“আমাকে আল্লাহ বেহুশ করে নি, আপনার বাচ্চার মা হতে যাবো।”
ত্রিজয় ঠোঁট কামড়ে হেসে দিলো,ফিসফিসিয়ে বললো,
“ডোন্ট ওয়ারি,দু তিন বার বেহুশ করেই মা বানাবো।”
______________
আইসিউর সামনে বসে বসে ঝিমাচ্ছে ইভান।চোখ বন্ধ করেছে অনেক্ষন হলো।সেই থেকেই মুচকি মুচকি হাসছে ছেলেটা,চোখের সামনে ভেসে উঠছে একটা দস্যি মেয়ের মুখ।
শ্যামল কালো ত্বক,চিকন দুটো ঠোঁট আর এক জোড়া চোখ।কি সুন্দর মেয়েটা,এতো সুন্দর মেয়ে আর কখনো দেখেনি সে।
যেদিন কোর্টের সামনে প্রথম দেখেছিলো,সেদিনই প্রেমে পড়ে গিয়েছিলো, মেয়েটার চোখে মুখে উপচে পরা জেদ জ্যোতি ছড়াচ্ছিলো, অদ্ভুত রকমের সুন্দর লাগছিলো তাকে।
তারপর? তারপর ভেবেছিলো এই বুঝি শেষ দেখা,অথচ শেষ হয়েও হলো না,আবারও মেয়েটার দেখা পেলো,সেই বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় নিস্পার বাড়িতে আবারও দেখেছিলো তাকে।অথচ দ্বন্দ্ব হলো, কথা হলো না।সেবারেও মিস করলো সুযোগ।ছেড়ে দিলো আশা।
সেকি ভেবেছিলো মেয়েটাকে আবার দেখতে পাবে।সেদিন রাতে মেয়েটা যে হুড়মুড় করে দৌড়ে এসে দাঁড়াবে তার সামনে সেকি ভেবেছিলো?কই ভাবে নি তো?মেয়েটাকে তো ভুলতে চেয়েছিলো, অথচ মেয়েটা রাতের পরি হয়ে আবার ফিরে এলো, বারবার ফিরে এসে তার মনে জাগিয়ে তুললো প্রেম।
মেয়েটার কথা ভাবতে ভাবতেই আবারও হেসে উঠলো ইভান,বিরবির করে বললো,
“অনু অনুরিকা রহমান।আপনাকে ভালোবাসি,খুব ভালোবাসি।”
ইভানের কথার প্রতিত্তোরে শোনা গেলো অনুরিকার তেজি কন্ঠ,
“এই ব্যাটা,তোর সাহস কি করে হলো আমাকে ভালোবাসার কথা বলিস?মেরে তক্তা বানিয়ে ফেলবো।”
ইভান ঘাবড়ে উঠলো, তড়িঘড়ি চোখ খুলে তাকালো চারদিকে, শুখনো ঢোক গিলে,থুথু ছেটাল বুকে,বিরবির করে বললো,
“ওহ আল্লাহ,শেষে কিনা এই গুন্ডা মেয়ের প্রেমে পড়তে হলো? বাঁচিয়ে নিও আমাকে।”
__________
একটা মেয়ে, কালো স্কাপে ঢাকা পুরো মুখ,চোখ দুটো বের করে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে আশেপাশে,খুব সাবধানে এগিয়ে যাচ্ছে জান্নাতের কেবিনের দিকে।
ইভান মাত্রই উঠে গিয়ে দাড়িয়েছে হসপিটালের বারান্দায়।ঠিক তখনই খেয়াল করলো মেয়েটাকে।সন্দেহ হওয়ায় দ্রুত এগিয়ে গেলো সেদিকে।মেয়েটা আইসিউর দরজার সামনে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছে জান্নাতকে,তার চোখে অশ্রু,অথচ কোন একটা বিষয়ে বেশ ভয় পেয়ে আছে সে।
তার ভয়কে আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে পেছন থেকে ইভান হাত রাখলো মেয়েটার কাধে, মেয়েটা ঘাবড়াল,ভয় পেয়ে পিছলে গেলো হাত দিয়ে চেপে রাখা ওড়নাটা,টলে গেলো পা, পড়ে যেতে নিলেই ইভান দ্রুত আঁকড়ে ধরলো মেয়েটার কোমর,মেয়েটা ভয় পেয়ে খামচে ধরেছে ইভানের বুকের উপর শার্ট।
ইভানের চোখ ছানাবড়া,চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভীতসন্ত্রস্ত মেয়েটাকে চিনতে পারলো সে,বিস্ময়ে অস্পষ্ট উচ্চারণ করলো মেয়েটার নাম,
“চিত্রা?”
চিত্রার বুক অনবরত কাঁপছে,ইভানের সংস্পর্শে গুলিয়ে গেছে সব।শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঠান্ডা স্রোত,ভেতরকার নাম না জানা কিছু সুপ্ত অনুভুতি ডানা মেলেছে প্রজাপতির ন্যায়।ইভানের অনুভুতি শুন্য চোখের গভীরে ডুবে গিয়েছে অনন্তকালের জন্য।
তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রতঙ্গ অনুভব করতে চাইলো ইভানের স্পর্শ,কি নিদারুণ ভালো লাগায় ছেয়ে গেলো হৃদয়।
চিত্রার উত্তর না পেয়ে ইভান বললো,
“এমপি মশাইয়ের পিএ লুকিয়ে এখানে কি করছে? কোন উদ্দেশ্যে এসেছে শুনি?”
চিত্রা ভয়ে আতংকে তার কম্পিত হাত চেপে ধরলো ইভানের মুখের উপর,কম্পিত কন্ঠে বললো,
“প্লিজ প্লিজ আমি এখানে আসার কথা কাউকে বলবেন না,আমার স্যারের কানে গেলে আমাকে একদম খুন করে ফেলবে।”
ইভান ভড়কালো,চিত্রাকে শান্ত করার জন্য বললো,
“ইটস ওকে, শান্ত হও, বলবো না। কিন্তু আগে বল তো তোমার এখানে আসার কারণ কি?”
“কারণ জান্নাত আমার খুব ভালো বন্ধু।ওর এমন অবস্থার জন্য আমি দায়ি,সব জেনেও ওকে বাঁচাতে পারি নি আমি।আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি ওর কাছে।”
ইভান বুঝতে পেরেছে চিত্রা কীসের কথা বলছে, তাই তেমন আশ্চর্য না হয়েই ধিরে সুস্থে বললো,
“ওনার ভাগ্যে যা ছিলো তাই হয়েছে এখানে তোমার কোন হাত নেই,অযথা নিজেকে দোষারোপ করো না।”
চিত্রা ভঙুর কন্ঠে বললো,
“ওকে আমিই আমেরিকা থেকে দেশে ফেরার কথা বলেছি, ভেবেছি ত্রিজয় স্যার যদি জান্নাতকে পেয়ে যায় তাহলে স্যার তার আলেকজান্দ্রা কে পেয়ে যাবে,এতোদিনের লড়াই সংঘর্ষ সব শেষ হয়ে যাবে।কিন্তু শেষ সময় এসে স্যার যে এমন পরিকল্পনা করবে আমি ভাবতেও পারি নি।”
“এমপি মশাই প্রেমে অন্ধ।যা বুঝেছি উনি নিস্পা ম্যামকে পাওয়ার জন্য সব করতে পারে।”
চিত্রা হেচকি তুললো কয়েকবার,ক্রন্দনরত কন্ঠে বললো,
“জান্নাতের কি অবস্থা এখন?”
“বুঝতে পারছি না। ডক্টর তো বললো কাল আইসিউ থেকে বের করা হবে, দেখি কি হয়।”
চিত্রা তপ্ত শ্বাস ফেললো, চোখের পানি মুছে তাকালো ইভানের দিকে, ইতস্তত কন্ঠে বললো,
“একটা রিকুয়েষ্ট করবো?না মানে আপনার মোবাইল নাম্বার টা দেওয়া যাবে?আসলে আমি বোধহয় আর আসতে পারবো না জান্নাতকে দেখার জন্য তাই একটু,,
পুরো কথা শেষ করতে হলো না চিত্রার, তার আগেই ইভান একটা ভিজিটিং কার্ড এগিয়ে দিয়ে বললো,
“এই নাম্বারে ফোন করলেই চলবে।”
চিত্রা উত্তরে আর কিছু বললো না, মৃদু মাথা নাড়ালো দুপাশে।তারপর ছোট্ট করে বললো,
“থ্যাংক ইউ,আমি তাহলে আসছি।”
চিত্রা স্কাপ টা দিয়ে মুখ ঢেকে নিলো আগের মতো, চলে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করে পা বাড়াতেই পেছনে ডেকে বসলো ইভান,
“শুনো।”
চিত্রা দাঁড়িয়ে গেলো , প্রশ্নবোধক চাহনিতে ঘুরে তাকালো ইভানের দিকে, ইভান একটু অপ্রস্তুত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“ওই অনু মেয়েটা এমপি মশাইয়ের বাড়িতে কেন?ওকে আটকে রাখার কারণ কি?”
চিত্রা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো, তারপর চওড়া কন্ঠে বললো,
“জানা নেই।স্যার ছাড়া এই বিষয় সবার অজানা।কিন্তু কেন বলুনতো? ”
ইভান ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভাবলো, জবাবে বললা,
“এমনি তেমন কিছু না।”
____________
সময় এখন রাত বারোটা।ত্রিজয় মাত্রই ফিরেছে।আইসিউর সামনে বসে থাকতে থাকতে ইভানের বেহাল দশা।খিদায় পেটে ইদুর দৌড়াচ্ছে তার।
ত্রিজয়ের হাতে একটা পানির বোতল আর একটা বিরিয়ানির প্যাকেট দেখেই খুশিতে গদগদ হয়ে গেলো ইভান।বিরিয়ানির প্যাকেট টা হাতে নিয়েই বললো,
“স্যার আপনার মতো মানুষ বিরিয়ানি নিয়ে এসেছে?আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।থ্যাংকস স্যার, থ্যাংকস আ লট।”
ত্রিজয় বিরিয়ানির প্যাকেট টা ইভানের হাতে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“এতো খুশি হয়ে লাভ নেই, টাকাটা মাস শেষে তোমার সেলারি থেকে কেটে রাখা হবে।”
ত্রিজয়ের কথা শুনে মুখটা আমের আঁটির মতো চুপসে ফেললো ইভান,দাঁতে দাঁত চেপে বিরবির করে বললো,
“শালা কিপ্টার বাচ্চা, আল্লাহ তোকে দশটা বাচ্চা দেক, সবগুলো তোর অন্ন ধ্বংস করুক তোর ঘারে বসে।”
“কি হলো? খাবে?নাকি আমি খেয়ে নিবো?”
ত্রিজয়ের কথায় নড়েচড়ে দাড়ালো ইভান,ভোতা মুখে বললো,
“খাবো স্যার।এমন ভাবে প্রতারণা না করলেও পারতেন।”
ত্রিজয় কপাল কুচকালো,গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“তুমি আমার বউ না প্রেমিকা?কোন দুঃখে তোমার সাথে প্রতারণা করতে যাবো আমি?”
ইভান কটমট করে তাকালো, অথচ একগাল হাসি টেনে বললো,
“বাদ দিন স্যার, খাবার যে এনে দিয়েছেন এটাই আমার সাত জন্মের ভাগ্য।এখন বলুন নিস্পা ম্যামের কি অবস্থা?কেমন আছে উনি?”
ত্রিজয় ভরাট কন্ঠে উত্তর দিলো,
“ওকে নিয়ে এসেছি, 407 নাম্বার কেবিনে এডমিট করে দিয়ে এসেছি মাত্র।”
ইভান বেয়াক্কেল বনে গেল,বিস্মিত কন্ঠে বললো,
“আপনি না দেখতে গেলেন?তাহলে নিয়ে কেন এলেন?”
“মন চাইছিলো না।” ত্রিজয়ের ছোট্ট উত্তরে চোখ বড়বড় করে তাকালো ইভান, হতহ্বিবল কন্ঠে বললো,
“তার মানে? আপনার মন নিস্পা ম্যামকে চাইছে?”
ত্রিজয় হতাশ কন্ঠে বললো,
“বুঝতে পারছি না ইভান।তবে আমার মনে হচ্ছে মেয়েটার সাথে আমার অতীতে কোন সম্পর্ক ছিলো, ওর প্রতি একটা অদৃশ্য টান অনুভব হয় আমার।”
“নিস্পা ম্যামের প্রতি টান অনুভব হলে জান্নাতের কি হবে স্যার?এতো লড়াই যুদ্ধ তাহলে কীসের জন্য?”
“জান্নাতকে নিয়ে আপাতত ভাবতে চাইছি না ইভান।মন যা চাইছে তাতে সাড়া দেওয়া উচিত।”
খুশিতে ইভানের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো,আগ্রহী কন্ঠে বললো,
“তার মানে নিস্পা ম্যাম পার্মানেন্ট তাইতো?”
“বুঝতে পারছি না,অদৃশ্য এক টানাপোড়নে অস্থির লাগছে।কিভাবে জানবো বলতো?ওই মেয়েটার সাথে আদৌও অতীতে আমর কোন সম্পর্ক ছিলো কিনা?”
ইভান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো, তারপর ভেবেচিন্তে বললো,
“যদি কিছু মনে না করেন একটা এডভাইস দেই স্যার।”
“কি?”ত্রিজয় অস্পষ্ট জিজ্ঞেস করলো।
ইভান একটু ইতস্তত কন্ঠে বললো,
“একটা বাচ্চা নিয়ে নিন স্যার ।যদি নিস্পা ম্যামের সাথে অতীতের কোন কানেকশন থেকে থাকে, তাহলে বাচ্চার মুখ দেখলে মনে পড়ে যেতে পারে।”
ত্রিজয় কোন রিয়েক্ট করলো না,হাতে ধরে রাখা বোতলের সিপি খুলতে খুলতে বললো,
“সেটা তোমার বলতে হবে না ইভান।বোন থেকে বউ ভাবার সার্টিফিকেট টা পেতে দেও।একটা দু টাকার বেলুন দুশো টাকা দিয়ে কিনে টাকা নষ্ট করবো না আমি।”
ইভান চোখ উল্টে তাকালো,মনে মনে আওড়ালো,
“শালা কিপ্টার বাপ।তোর টাকা ইঁদুরে কাটবে।তোর পোলাপান অনাহারে মরবে দেখিস।”
চলবে,,,,,

