#মেহবুব
লেখনীতে:#তাবাসসুম_তোয়া
৬.
আমি চোখ মুখে পানি দিলাম অনেকক্ষণ ধরে। এ্যনি আপু আমাকে ধরে নিয়ে গেলেন ওনার ওয়ার্ডে,বসিয়ে পানি খাওয়ালেন।
তারপর দুজনে চুপচাপ এলাম তারিক ভাইয়ের কেবিনের সামনে। আমি কিভাবে যাবো? কান্না, লজ্জা মিলিয়ে অনুভূতি একদম ঘেটে আছে! মাথাটা ধরেছে ভীষণ! কি এক পাগলামি করলাম। ইস যদি ভ্যানিস হয়ে যাওয়ার জাদু জানতাম! এ্যনি আপুকে বললাম,
-” আপনি যান আমি আসছি। ”
আপু ভিতরে চলে গেলে আমি কেবিনের দরজায় থাকা ছোট গ্লাসটা দিয়ে ভিতরে দেখলাম। তখন ভিতরে শুধু আন্টি আর বাপ্পি।
তারিক ভাই নার্সের দিকে তাকাতেই, আপু কিছু বললেন। তারিক ভাই এবার আন্টির দিকে ফিরে কিছু বললেন হয়তো। আন্টিকে দেখলাম গেটের দিকেই আসছেন। আমার মনে হলো ছুটে পালাই। ভবঘুরে হয়ে যাই! এই দুনিয়া আর ভালো লাগে না।
সত্যিই পালাতে চাইলাম কিন্তু পিছনে ফিরতেই দেখি নির্ঝর ভাইয়া। উনি আমাকে দেখে মিষ্টি করে হাসলেন। আন্টি বেরিয়ে এসেছেন ততক্ষণে। আমি স্বাভাবিক হলাম। আন্টি আমাকে জড়িয়ে নিয়ে ভিতরে নিয়ে গেলেন৷ নির্ঝর ভাইয়াও ভিতরে এলেন। বেডের খানিকটা সামনে দাড়ালাম। তারিক ভাই আজ প্রথম সালাম দিলেন। বলিষ্ঠ সে কন্ঠস্বর,
-”আসসলামু আলাইকুম। কেমন আছো মুনিবা? ”
আমি কোনমতে উত্তর করলাম। আমার দৃষ্টি অবনত।
-” ওয়ালাইকুম আসসালাম। ”
আন্টি বলে চললেন,
-” আর বলো না আব্বু,তোমার অবস্থা শুনে আমার মেয়েটার পাগলের মতো অবস্থা হয়েছিলো। আমরা পৌঁছানোর আগেই পৌঁছে গেছে সে। তারপর কি এক ঝামেলা, কেউ কি চেনে তাকে? কি পরিমান ছুটোছুটি করেছে সে আল্লাহই জানে! এসে দেখি ওয়েটিং জোনে একা বসে বসে কাঁদছে! একদম রক্তশূণ্য চেহারা। আমি তো ওকে দেখেই আরেক চোট ভয় পেয়েছি! তারপর আমরা সবটা সামলেছি। অফিসারদের পরিচয় দেবার পর স্যরি বলেছে! ”
আমি একবার উনার দিকে চোখ তুলে তাকিয়েছি, তখনই দেখি উনি নির্ঝর ভাইয়ের দিকে কেমন দৃষ্টিতে তাকালেন! সাথে সাথে নির্ঝর ভাইয়ের চেহারা চেঞ্জ হয়ে গেল!
নির্ঝর ভাই সোজা হয়ে দাড়িয়ে বললেন,
-” আমি ছিলাম না স্যার, সত্যি বলছি, আমি জানিই না এতো কাহিনী হয়েছে। আমি অনেক পরে এসে পৌঁছেছি! ”
উনি রেগে গেলেন কি! তবে শান্ত চেহারা থেকে সেই গাম্ভীর্য মাখা চেহারায় ফেরত গেলেন!
-” দুপুরে খাওয়া হয়েছে তোমাদের? ”
আমাকে বললেন নাকি আন্টিকে, জানিনা! আমি আন্টির দিকে তাকালাম। আন্টি আমার দিকে, উনি আমাদের দুজনকে একনজর দেখে এবার বাপ্পিকে জিজ্ঞাসা করলেন,
-” বাপ্পি, আম্মুরা কেউ খায়নি দুপুরে?”
-” হ্যাহ, খেয়েছে তো? ”
-” কি খেয়েছে? ”
-” আম্মু আর মুনিবা বাটার বান খেয়েছে সাথে কফি।”
উনি ভীষণ হতাশ হলেন,
-” দুপুরের খাবার বাটার বান? ”
-” আরে বাবা এটাই কত জোর করে খাইয়েছি মেয়েটাকে! ”
-” আর তুমি? এ কেমন কথা আম্মু! তুমি বাটার বান খাও? দুপুরে ভাত না খেলে যার হয়না! আমাকে এই হাসপাতালের বেডে শুয়েও তোমাদেরকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে? ”
বাপ্পি টিটকারি করে বললো,
-” বুঝোনা ভাইয়া “সহমরন যাত্রা!” এই উপমহাদেশ থেকে সহমরন প্রথা উঠে গেছে আরোও দুইশো বছর আগে! আর এনারা দুজন এই যুগে এসেও তোমার সাথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন! ”
উনি রাগী চোখে তাকালেন। বাপ্পি থেমে গেল! নির্ঝর ভাইয়ের দিকে তাকাতেই, ভাই বললেন
-” আমি বিষয়টা দেখছি স্যার! আপনি চিন্তা করবেন না।”
উনি তখন আমাদের দিকে তাকিয়ে কাঠকাঠ কন্ঠে বললেন
-” আপনারা দুজন বাইরে যেয়ে আগে আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখবেন! চেহারা ঠিক না করে আর কেউ আমার সামনে আসবেন না! ”
বলেই পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন। ব্যাপারটা তার ভালো লাগলো না মোটেও। নির্ঝর ভাইয়ের পিছনে পিছনে আন্টির সাথে করে বেরিয়ে আসতে গেলাম। তখনই শুনতে পেলাম,
-” আম্মু তোমার মেয়েকে বলো, আমি সুস্থ আছি! এখানে এতো কষ্ট করে আসা লাগবে না! উনি যেন নিজের দিকে খেয়াল রাখেন! ”
বুঝলাম উনি বেশ ক্ষেপেছেন! আপনি করে বলছেন! অভিমান জমেছিল আমার আর উল্টো আমিই রাগী রাগী ধমক খেয়ে ফিরে যাচ্ছি! নিজের কয়লার মতো চকচকে কপালকে এক বালতি সমবেদনা জানালাম মনে মনে! আমার অবস্থা তখন ‘যার জন্য করি চুরি, সেই বলে চোর!’
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
তারপর থেকে আমি যেন ভিআইপি হয়ে গেলাম। সবাই আসতে যেতে আমাকে সালাম দেয়। সৈনিকদের এতো সম্মানের জ্বালায় আমি লজ্জায় কোথাই লুকাবো টের পেলাম না। সিরিয়াসলি, হলে ফিরে সিদ্ধান্ত নিলাম আর যাবো না। এতো সম্মান নেওয়া যাচ্ছে না। আবার উনিও নিষেধ করেছেন কিন্তু ঐ যে মন মানলো না! তারপরের দিন কিভাবে কিভাবে জানি চলে গেছি।
কেবিনের সামনে পৌঁছে হুশ হলো আমি চলে এসেছি। সেদিন ভিতরে গেলাম না। এরপরের দুদিনও আমি গেলাম কিন্তু উনার কেবিনে আর যাইনি। বাইরে থেকে দেখে ফিরে এসেছি। আন্টির সাথে দেখা হতো, বাপ্পির সাথেও। কিন্তু ভিতরে যাওয়ার সাহস হয়নি! কারন আমার চেহারা তখনও ঠিক করতে পারিনি। খেতে পারি না আমি, জোর করলেই কি খাওয়া যাই!
সেদিনও কেবিনের বাইরের ওয়েটিং জোনে পেতে রাখা চেয়ারে বসে ছিলাম। দেখি উনি বের হয়ে এলেন নিজ পায়ে। আমি বুঝলাম আমার উল্টো ঘুরে দৌড় দেওয়া উচিত কিন্তু দৌড় আর দিতে পারলাম না!
উনার নিষেধ শুনিনি! আমি উঠে দাড়িয়ে সালাম দিলাম। উনি চুপচাপ আমার দু’চেয়ার পরে বসলেন!
আমি দাড়িয়ে ছিলাম। উনি ইশারা করলেন। বসো! উনার দৃষ্টি সামনের দিকে। বললেন
-” আন্টি আঙ্কেল কেমন আছেন? ”
-”আলহামদুলিল্লাহ। ”
-“পড়াশোনা কেমন চলছে?”
-”আলহামদুল্লিলাহ ভালো। ”
-” গত এক সপ্তাহ ধরে তো এখানেই থাকা হচ্ছে, তাহলে পড়াশোনা ভালো হয় কি করে?”
আমাকে চুপ দেখে বললেন
-” মুনিবা,আমাদের জীবনটা এমনই। যেকোন সময় কফিনে মুড়িয়ে পতাকায় জড়িয়ে আমাদের লাশটা ফিরবে বাড়িতে। মেনে নিতে পারবে তখন?”
আমার হৃদয়টা কেঁপে উঠলো। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম, তার মানে এগুলো বলতে উনি এসেছেন? মানুষটা সবসময় সরাসরি কথা বলে, আমি শান্ত কন্ঠে বললাম,
-” আমাদের জীবন, মরন সবটাই খোদাতায়ালার হাতে। আমরা কেউই জানি না কতদিন বাঁচবো, তবে যে কয়দিন বাঁচবো সেই কয়দিন …
গলাটা ধরে এলো আমার। আমি চুপ হয়ে গেলাম।
ঠোঁট আঙ্গুল দিয়ে আড়াল করে হাসলেন যেন।
-” কাঠিন্য তোমার এতো পছন্দের! সংগ্রামী জীবন চাও! অপেক্ষার জীবন? এই যে এখন সামান্য আঘাতে পাগল হয়ে যাচ্ছো! তখন যে দিশেহারা হয়ে যাবে না সে গ্যারান্টি কোথায়!”
মানুষটার শুধু হেয়ালি! আমার অভিমান দানা বাধতে থাকলো,
-” আপনি দিশেহারা হবার মতো অবস্থায় রাখেননি আমাকে! যেভাবে ট্রেনিং দিয়েছেন এতগুলো বছর! আপনি পরীক্ষা নিয়ে দেখতে পারেন, আমি একদম ফিট আছি। আর আমার কাছে অপেক্ষায় জীবন,জীবন মানেই অপেক্ষা! ”
-” অতি দুঃখের সাথে জানাচ্ছি তুমি এবারের পরীক্ষায় ফেল করেছো! ”
আমি তীব্র অভিমান নিয়ে বললাম,
-” না, ফেল করিনি! ”
উনি এবার আমার দিকে এক পলক তাকালেন।
-” বিদ্রোহী হয়ে উঠেছো বেশ! ”
আমি কথা বললাম না। উনি বলে চললেন
-” হিউম্যান সাইকোলজি সম্পর্কে তোমার ধারণা আছে? মানুষ যখন কিছুই পায় না তখন সামান্য পেলেই ভীষণ খুশি হয়ে যায়! কিন্তু যখন পেতে শুরু করে এবং পেতেই থাকে তখন আরোও বেশি পেতে চাই, পেতে পেতে একসময় লোভী হয়ে উঠে। সেই চাহিদা কখনও শেষ হয় না। আমি তোমাকে সময় দিতে পারবো না মোটেও! কখনও বা কোন খবরও পাবে না আমার!
তখন হাজারটা অভিযোগ থাকবে! কেন থাকছি না। কেন এতো অল্প সময় দিই! তখন?
-” হাজার অভাব-অভিযোগের মাঝেও আমি শুধু একজনকেই চাইবো। ”
খানিকটা হেসে বলে উঠে
-” ভেবে বলছো তো? ”
-” হুম। ”
-” মুনিবা আমাদের জীবন, দেশের জন্য, রবের জন্য উৎসর্গকৃত। সো তুমি কিন্তু লিস্টে অনেক পরে আসছো। অন্য স্বাভাবিক মানুষের সাথে জীবন কাটালে লিস্টের একদম উপরে তোমার জায়গা হতো। ”
-” যে লিস্টের উপরে থাকে তাকে কখনও ফার্স্ট পজিশন দখল নেওয়ার চিন্তা করা লাগে না! ”
-” এতোটা কনফিডেন্ট?”
আমি পাশ ফিরে হাসলাম।
-” এখন কি আমাদের সাথে খুলনায় ফেরার কোন সুযোগ আছে? ”
মাথা নাড়লাম আমি
- ” আছে! ”
-” কিভাবে? সামনে সেমিস্টার ফাইনাল। এখন তো নিয়মিত ক্লাস, সিটি চলার কথা! বাপ্পীর তো তাই চলছে দেখছি। ”
-” সারাবছর খুব মনোযোগের সহিত ক্লাস পরীক্ষা দিয়েছি। কিছুদিন বন্ধ দিলে কিচ্ছুটি হবে না। ”
-” এটা কি ডিপার্টমেন্টের ঘোষণা নাকি তোমার কথা?”
-” আমি আপনাদের সাথে যাচ্ছি। আমার ক্লাস পরীক্ষা লাগবে না! ”
আবারও থমকে তাকালেন উনি
-” এই বিদ্রোহী চেতনা কি কোনভাবে আম্মুর থেকে পাচ্ছো? ”
তখনই একজন উর্ধতন সেনা অফিসার এলেন। উনি সাথে সাথে উঠে স্যালুট দিলেন। আমিও দূরে সরে দাঁড়ালাম।
-” ইয়াংম্যান আমাদের গর্ব! কি অবস্থা তোমার বলো?”
-” একদম ফিট স্যার। ”
-” গুড”, আমার দিকে তাকিয়ে শুধলেন, ওয়াইফ?”
-” নো স্যার, উড বি। ”
স্যার আমার দিকে মিষ্টি করে হাসলেন। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন,
-” মিস? ”
-” মুনিবা মুবাশ্বিরা, স্যার। ”
-” মুনিবা, আহমেদ তারিক আমার ভীষণ প্রিয় একজন ছাত্র। ভীষণ চৌকস আর বুদ্ধিমান একটা ছেলে। এমন মেধাকে নার্চার করতে হয়। দেশের জন্য একটা খাঁটি সম্পদ সে। এমন একটা সম্পদকে আগলে রাখতে হয়। আমি আশা রাখছি তুমি সেটা পারবে। কি পারবে না? ”
আমি উত্তর করলাম,
-” ইয়েস স্যার। ”
-” that’s like a good girl. ”
উনারা দুজন ভিতরে চলে গেলেন। আমিও চুপচাপ দাড়িয়ে থাকলাম বাইরে। আমার কানে ভাসছে
” উড বি ”
কবে আমি তার উড বি হলাম? নাকি এতো গুলো বছর ধরেই আমি তার উডবিই ছিলাম! আমার ভীষণ ভালো লাগলো উনার স্পষ্ট কথা।
চলবে….

