#মেহবুব
লেখনীতে:#তাবাসসুম_তোয়া
৭.
উনি বেশ কিছুদিনের ছুটি পেলেন। সুস্থ হলে কর্মস্থলে ফিরতে হবে। হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ দেওয়া হলো।
আন্টি আঙ্কেল উনাদের নিজস্ব প্রাইভেট কার নিয়ে এসেছিলেন। আমিও সেটাতেই তাদের সাথে যোগ দিলাম। বলতে গেলে বাধ্য হলাম। আমি অবশ্য ট্রেনে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু উনার কঠোর নিষেধ ‘একা যাওয়ার অনুমতি নেই’। উনি আমাকে একা ছাড়তো না এটা আমিও জানতাম। এতগুলো দিন ঢাকা টু খুলনা আসা যাওয়া করেছি কখনও একা আসার অনুমতি দেননি। আর আব্বুও কখনও আমাকে একা ছাড়েননি! আম্মুর সাথে তার যোগাযোগ ছিলো। আম্মুই বলতেন, ছেলেটা টেনশন করে তোকে নিয়ে!
আর তাই উনি আন্টিকে বললেন
-”আম্মু তোমার মেয়েকে সাথে নাও!”
উনার সাথে জার্নি করবো ভাবতেই হৃদয়টা কেঁপে কেঁপে উঠছিলো! এতোটা মুখোমুখি আমরা কোনদিনই হইনি! এতোটা সময় একসাথে! এক গাড়িতে! ভাবতেই অন্তর ইয়া আল্লাহ বলে চিক্কুর দিচ্ছিলো। আমি পালাতে চাইছিলাম। পারবো না! কেমনে সম্ভব! কিন্তু আমি পড়েছিলাম আটকা! চাইলেও যেটা থামাতে পারবো না! নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টায় রত ছিলাম। বুঝ দিলাম। আন্টি আঙ্কেল সবাই থাকবেন!
উনি সবাইকে বিদায় জানাচ্ছিলেন। উনাদের মধ্যে একটা ব্যাপার দেখলাম উনারা কখনও ইনফর্মাল কথাবার্তা বলে না৷ যা বলে সবটাই ফর্মাল আর মার্জিত ! শুধু নির্ঝর ভাইকে দেখলাম একটু ক্লোজ এবং মাঝে মাঝে সাহস করে একটা দুটো ইনফর্মাল কথাবার্তা বলে ফেলেন। উনি হতাশ কন্ঠে তারিক ভাইকে বললেন,
-” এরপর থেকে আপনাকে আর জীবিত দেখতে পারবো না স্যার,এটা ভেবে খারাপ লাগছে! ”
আমি কথাটা ধরতে পারলাম না। মুখ ফসকে বলে ফেললাম
-” কেন? ”
নির্ঝর ভাই মুখ টিপে হাসলেন আর বললেন,
-” স্যার বিবাহিত হয়ে যাবেন কিনা, তাই! ”
আমি পড়লাম ভীষণ লজ্জাই। সাথে সাথে উল্টো হেঁটে আন্টির পিছনে গিয়ে দাড়ালাম৷ তারা হাসতে হাসতে কথা চালিয়ে গেল। আমি আন্টির পিছন থেকে একবার উঁকি দিলাম। উনি জ্বলজ্বল চোখে আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন! আমি আবারও লজ্জাই লুকিয়ে পড়লাম।
বাপ্পি ড্রাইভ করলো। আর আমরা তিনজন পিছনে বসলাম। আন্টি আঙ্কেল মাঝারি গড়নের হলেও আমি ছিলাম চিপকুস। যার কারনে তিনজন বসতে সমস্যা হলো না৷ আমি পড়ে থাকলাম আমার আন্টির কোলের ভিতরে! যে সত্যিকার অর্থেই আমার আরেকটা মা ছিলো ছোটবেলা থেকেই। বাপ্পি টিটকারি করে বললো
-” মুনিবা তুই চলিস কেমনে? বাতাসে উড়াই নিয়ে যায় না তোকে? তোকে ভাইয়ের পাশে একটুও মানাবে না! ”
আমার ইচ্ছে হলো গাধাটাকে কয়েকটা দিই! সে থামলো না। আমি মাঝে মাঝে আন্টিকে ডেকে বিচার দিতে থাকলাম। আঙ্কেল আর উনাকে দেখলাম সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। দুজনেই বড্ড গম্ভীর!
আর এদিকে আমাদের দুজনের নটখট চলতেই থাকলো৷ যখন বাপ্পি বেশি বলে ফেললো, উনি মাথা উচু করে বাপ্পির দিকে চোখ গরম করে বললেন
-” বিহেইভ ”
বাপ্পি থেমে গেল! এই দৃশ্য পিছন থেকে দেখে আমার চোখে ভাসলো সেই দিন! ক্লাস টু’তে পড়ার সময়কাল। প্রথম যেদিন আমাকে রক্তচক্ষুর দৃষ্টি দিয়েছিলেন উনি!
জীবন কোথা থেকে আমাদের কোথায় নিয়ে যায়! যে মানুষটাকে আমার বিরক্ত লাগতো সেই মানুষটাই এখন আমার সবচেয়ে আপন হতে চলেছে। আমার ভাবনার ঘুড়ি বাতাসে উড়তে থাকলো সেই প্রাইভেট কারের জানালা বেয়ে ঐ আকাশে… উড়ন্ত মেঘের ভেলার সাথে!
সে ছিলো লাজুকতায় মোড়ানো এক অভ্যাস। একটু তাকাই একটু চোখ ফিরাই। পরক্ষনেই আবারও দেখার সাধ জাগে! সারা রাস্তায় চোখ বন্ধ থাকলেও উনি হঠাৎ মাঝে মাঝে এক/দুবার লুকিং গ্লাসের দিকে তাকাচ্ছিলেন। যদিও সে দৃষ্টি ছিলো পরিমিত একদম হাতে গোনা। কখনও গাড়ি হার্ডব্রেক করলে কিংবা কোন বড় গাড়ি পাশ দিয়ে খুব জোরে গেলে উনি চোখ খুলেই আগে গ্লাসে দেখছিলেন! সতর্কতার দৃষ্টি! সেটা কি আমাকে নাকি সবাইকে! আমার সাথে চোখ মিলতেই নামিয়ে নিচ্ছিলাম দু’জনেই। ঐ ওটুকু দৃষ্টিই আমাকে নাজুক করে দিচ্ছিলো! আমি ভীষণ ভাবে মিস করলাম প্রাইভেট কারের সামনে আর পিছনের সিটের মধ্যে পর্দা দেওয়া থাকলে ভালো হতো৷ জার্নিতে একটুও কষ্ট হতো না আমার। উনার সামান্য ঐ দৃষ্টিই যেন আমার শরীরে কাঁটা দিচ্ছিলো বার বার। সেই দৃষ্টিকে কি বলে? আমি দৃষ্টি বিশ্লেষণ করছিলাম! মনোহরি, হৃদয়স্পর্শী নাকি তীক্ষ্ণ ! এক দৃষ্টি এফোড় ওফোড় করে দিয়ে যায় সবকিছু! উনি হঠাৎ ঘুম ভেঙে খেয়াল করছিলেন সব ঠিক আছে কিনা? নাকি এমনি স্বাভাবিক দৃষ্টি! অথচ আমি কেন স্বাভাবিক ছিলাম না সারা রাস্তা? আমার মনে হল উনাদের সাথে আসাই ঠিক হয়নি, আলাদা আসলেই বরং ভালো ছিলো! এমন ভয়ংকর দৃষ্টির মুখোমুখি হতে চাই ক’জন! পুরোটা জার্নিতে আমি বাতাসে ভেসে থাকলাম। জীবনের সবচেয়ে স্মরনীয় জার্নি ছিলো সেটা।
°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°
সেবার বাসায় ফিরে আমাকে দেখে আমার আম্মুও পাগল হয়ে গেল! আমি নাকি আরো বেশি চিকনা হয়ে গেছি! হলে খাওয়া দাওয়া করি না! কিভাবে করতাম! আমার গত কয়েকদিনের ভারেই ওজন ঝরে গেছে কয়েক কেজি!
সেইদিন সকালে মুহাইমিনকে হুটোপুটি করে রেডি করাচ্ছি! ওর স্কুলে দেরি হয়ে যাচ্ছে! বাসায় থাকলে আব্বু, মুহাইমিনের সকল দায়িত্ব আমার কাঁধেই থাকে! ও গেটে দাড়িয়ে আমি দৌড়ে এসেছি টিফিন বক্সটা দিতে, ওমনি দেখি মুহাইমিনের সাথে উনিও দাড়িয়ে! আমি ইয়া আল্লাহ বলে দ্রুত বক্সটা রেখেই উল্টো দৌড়ে রুমে চলে এসেছি! আমার মাথায় ওড়নাও ছিলো না তখন আবার চুল গুলোও খোলা ছিলো!
আমি দৌড়ে রুমে এসে বালিশের নিচে মাথা ঢেকে অসাড় হয়ে পড়ে থাকলাম! উফফ এটা কোন কাজ হলো? ভীষণ কেমন লাগছিলো! লজ্জা খারাপ লাগা একসাথে !
আমি বুঝলাম আমার পাশে কেউ বসেছে। আমার পিঠে হাত দিলো। আমি সাথে সাথে বালিশ সরিয়ে দেখি আন্টি! আন্টি হাসছেন
-” কি হয়েছে,ওমন করে দৌড়ে এলি কেন? ”
আমি চুপ হয়ে উনার পেট জড়িয়ে মুখ গুঁজে থাকলাম।
আন্টি লজ্জা দিলেন!
-” তোর এই বিশাল লম্বা চুল দেখে আমার ক্যাপ্টেনের হুশ উড়ে গেছে! ”
আমি উঠে চলে যেতে নিলে, বললো
-” আরে চলিস কই। তোর সাথেই তো কথা বলতে আসলাম। মেয়ের জামাই বাইরে বসে আছে ”
তখন আম্মু এলেন রুমে। আন্টি বললেন
-” সুফিয়া মেয়ের জামাই বাইরে বসে আছে। মেয়েকে নিয়ে যেতে চাই! কি বলো? ”
আম্মু হাসলেন।
-” আমার আবার কি? মেয়ে তো তোমারই ছিলো এতোগুলা বছর! কিন্তু দেখছো কি অবস্থা করেছে নিজের! ভাবছিলাম কয়েকদিন খাইয়ে দাইয়ে মোটাতাজা করি। ”
-” নাহ, বিয়ের বাতাস গায়ে লাগলে এমনিই মোটা হবে। তোমার জামাইয়ের হাতে পড়লে সব ঠিক হয়ে যাবে। ”
আমি আর বসে থাকতে পারলাম না। উঠে রান্নাঘরে চলে এলাম! বড়দের কথার মাঝে আমার কি?
বাইরের রুমে আব্বুর সাথে আঙ্কেল আর উনি কথা বলছেন আর ভিতরের রুমে আম্মুরা দুজন। আমি চুপচাপ দুই পাশে তাকাচ্ছি। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি এ বাড়িতে আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। আমি এখন অন্য ঘরের বাসিন্দা হবো! এই বাড়ি, এই ঘর ক’দিনের! আমার অনুভূতি গুলো কেমন খাপছাড়া হতে থাকলো! আমি পারবো না উনার সামনে যেতে অসম্ভব! কেমনে! রান্নাঘরের দরজায় দাড়িয়ে আমি বিশাল এক সত্য আবিষ্কার করলাম! আর সেটা হলো! এ জীবন মাত্র কদিনের! দেখতে দেখতে একুশটা বছর কেটে গেল! আমি কবে কবে এতো বড় হলাম! সেদিন না আমরা দুজনই ছোট্ট ছিলাম! হুটোপুটি ছুটোছুটি করেই কেটে গেল একুশটা বছর!
চলবে…..

