মেহবুব লেখনীতে: #তাবাসসুম_তোয়া ৮.

0
31

#মেহবুব
লেখনীতে: #তাবাসসুম_তোয়া
৮.

‎ছেলেরা সবাই বাসার পাশের মসজিদে ছিলো। আর আমরা মেয়েরা বাড়িতে। আকদ সম্পন্ন হওয়ার পর যখন খেজুর বিতরন চলছে তখন উনি অনেকটা
‎সিরিয়াস ভঙ্গিতে ফ্লাটে ফিরলেন, এটা দেখে সবার মধ্যেই চাপা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে! সবার একটাই প্রশ্ন

-‎” কি সমস্যা জামাই চলে এলো যে। ”

‎আন্টি আমার পাশ থেকে উঠে চলে গেলেন। ডাইনিং এ গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন উনাকে

-‎” আব্বা কোন সমস্যা? ইউনিট থেকে কল এসেছে? ফিরতে বলেছে? ”

‎আমি রুমে বসে এটা শুনেই আমার জান যাই যাই! কি বলে? এবার আমার হার্ট অ্যটাক হবে নিশ্চিত! আমার দম বন্ধ হয়ে এলো! নিশ্বাস নিতে ভুলে গেলাম!

‎উনি সেই গাম্ভীর্যমাখা চেহারা নিয়ে আমার রুমের দরজার সামনে এসে দাড়াতেই এক এক করে সবাই রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
‎উনি আন্টিকে বললেন,

-‎” আসছি আম্মু এক মিনিট! ”

‎উনার মুখ ভঙ্গি দেখেই আমার কান্না আসলো তার মানে আর্জেন্ট কল এসেছে নিশ্চয়ই! ফিরতে বলেছে উনাকে!

‎উনি ভিতরে ঢুকলেন না, তখনও রিনি আপু আমার পাশে বসে ছিলো, উনি বললেন

-‎” আপু এক মিনিট, it’s urgent. ”

‎আমি এবার একেবারেই ভেঙেচুরে গেলাম। এতো আর্জেন্ট ব্যাপারটা কি?
‎আমার ভেঙেচুরে কান্না পেলো। কষ্টে হৃদয়টা ফেটে চৌচির হয়ে গেল।
মনটা মানবো না মানবো না বলে বিদ্রোহ করে উঠলো। অন্তর আত্মা সব চিৎকার শুরু করে দিয়েছে।
‎তখনই মন বললো এটা বললেই উনি বলবেন আমি আবারও ফেল করেছি!
‎বহু কষ্টে কান্না আটকে আছি। কাঁদবো না উনি যাই বলুক। সব মেনে নিতে প্রস্তুত!
‎বিদায় জানাতে হলেও হাসি মুখেই জানাবো৷ আমিও উনারই স্ত্রী! উনার মতোই কনক্রিট হবো ইনশাআল্লাহ! কান্না করছি আর মনকে বলছি, বোঝাচ্ছি এগুলো !
‎শুধু ভয় হচ্ছে উনি মোটেও সুস্থ হননি! কিভাবে ফিরবেন কি করবেন? আমি উনার ক্ষত গুলোও দেখতে পেলাম না। আমার এমন কপাল! একবার চোখের দেখাও দেখা হলো না মানুষটাকে! উফফ, আকদ না হতেই এ কেমন বিচ্ছেদ! উফফ কি কঠিন জীবন! মনকে শক্ত করছি!
‎এ জীবন আমি নিজে বরন করেছি! আমি উনার অর্ধাঙ্গিনী আর এভাবেই কাটবে আমার সারাজীবন। আমাকে উনার হিম্মত হতে হবে কখনই উনার প্রতিবন্ধক নয়! আমার চোখ ছলছল হলো কিন্তু কন্ঠ না।

‎রিনি আপু বের হয়ে গেলেন। আমিও বিছানা থেকে নেমে পড়েছি। উনার সামনে এগিয়ে এসেছি৷ অন্তরের কান্না আমার সকল লজ্জা নিয়ে চলে গেছে। আমি বাস্তবে দাড়িয়ে আছি।
‎উনি গেটটা আটকে দিলেন৷ তারপর সিরিয়াস ভঙ্গিতে পাঞ্জাবির কটিটা খুলে সোফায় ফেললেন। আমি উনার কর্মকাণ্ড দেখছি আরেকটু পাশে এসে দাড়ালাম। উনার কষ্ট হচ্ছে কি? বুকের ক্ষততে? কেন যে এতো টাইট শেরওয়ানি পড়েছেন উনি! জিজ্ঞাসা করবো কি? আবার এই মোটা কটিটা কেন পরতে হবে। টিশার্ট পরে বিয়ে করতে আসলেও আমি কিচ্ছু বলতাম না! কান্নায় কন্ঠরোধ হয়ে গেছে। তবুও কোনমতে জিজ্ঞাসা করলাম,

-‎”কোন সমস্যা?”

‎উনি কেমন ঐ বড় বড় চোখের পাপড়ি জোড়া তুলে আমার দিকে তাকালেন! মাথা ঝাকাঁলেন শান্ত ভঙ্গিতে। আমি উনার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম উত্তরের আশাই! উনার চোখ কি ছলছল করছে? নাহ, বুঝতে পারলাম না। উনার চোখ কি লাল? তাইতো! আমার অন্তর কেঁপে উঠলো! আমি আবারও চোখের দিকে তাকালাম! উনি বললেন,

-“‎Yeah, it’s very confessional. it’s a matter of the heart.

‎বলেই হুট আমাকে আগলে নিলেন শক্ত করে৷ আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম! খানিকক্ষণ, অনেকক্ষণ…..

‎স্তব্ধ হয়েই থাকলাম। তারপর
‎তারপর…. কি হলো কি জানি! আমি খুব করে কান্না শুরু করে দিলাম।

‎আমার অন্তর আগে থেকেই কাঁদছিলো। উনি আগলে নেওয়াতে কান্নারা আর বাধা মানলো না৷ কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে লাগলাম।
আমি একেবারে চুরমার হলাম। আমার কান্নার বেগ যতটা বাড়ছে উনি ঠিক ততটাই শক্ত করে আমাকে আঁকড়ে নিচ্ছেন।
‎ভেঙেচুরে যাচ্ছে আমার হৃদয়ের প্রকোষ্ঠে জমা থাকা অভিমান কষ্ট ক্ষোভ! সকল অভিযোগ কান্না হয়ে ঝরে পড়ছে৷ ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হচ্ছে এতো বছরের অপেক্ষার প্রহর গুলো !
আর আমি অঝোর ধারায় ভিজিয়ে দিচ্ছি উনার বুক৷

‎আমার জানি না কি হচ্ছিল, শুধু কাঁদছিলাম !
আমার এতো কান্না কোথায় লুকিয়ে ছিলো?
হৃদয়ের কোন প্রকোষ্ঠে?
সারাজনমের কান্না যেন কাঁদলাম আমি। উনি কিচ্ছুটি বললেন না, শুধু আঁকড়ে ধরে থাকলেন আমাকে শক্তভাবে, আরোও শক্তভাবে! মনে হচ্ছিল আমি গুড়ো হয়ে মিশে যাচ্ছি তার সাথে!
‎আমি যখন শান্ত হলাম ঠিক কত মিনিট পর নাকি ঘন্টা, উনি তারও অনেক পরে আমাকে ছাড়লেন! এবার আমার মুখটা তুলে চোখ গুলো মুছিয়ে দিলেন গভীর মমতায়। তারপর বেশ খানিকক্ষণ..

‎অনেকটা সময় পর উনি আমার কানের কাছে বললেন,

-“মেহবুব,আমার মেহবুব,
welcome to my life, মেহবুব।”

‎আমি চোখ বন্ধ করে নাজুক হয়ে পড়ে থাকলাম তখনও। আমি সেদিন আরোও একটা বড় সত্য আবিষ্কার করলাম। কনক্রিটের দেয়ালের ওপারে থাকা আহমেদ আল তারিককে! আসলে সে কনক্রিটের আবরনে থাকা নরম তুলতুলে এক সত্তা! সে ছিলো প্রয়োজনে বজ্রের মতো কঠোর আর প্রয়োজনে কুসুমের মতো কোমল!
‎মন বললো আমি তাকে পেয়েছি। পুরোপুরি ভাবেই পেয়েছি। আমি তাকে আরোও অনেক আগেই পেয়েছি। শুধু বৈধতার কাগজ ছিলো না তাই ধরা দেয়নি! না কথায়, না ব্যবহারে! কিছু বিষয় থাকে মনের অতি সংগোপনে। উনার কাছে আমিও ছিলাম ঠিক তেমনি!

‎দরজায় এর মধ্যে টোকা পড়েছে কয়েক বার। উনি আমাকে ছেড়ে কটিটা বা হাতের উপর ভাঁজ করে নিয়ে গেট খুলে গটগট পায়ে বের হয়ে গেলেন৷ রিনি আপু দৌড়ে এলো।

-‎” কি বললো? ফিরে যেতে হবে? ”

‎আমি চুপচাপ চোখ মুছে মাথা ঝাঁকালাম।

-‎”নাহ ”

‎আমার অবস্থা দেখে উনি আর কোন প্রশ্ন করলেন না।

সবাই একদম মূহুর্তের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে গেল।
পুরো পরিবেশ ঠিক হয়ে গেল। সবার গুঞ্জন থেমে গেল। জামাই ফিরে যাচ্ছে না এর থেকে আনন্দের খবর আর কি হতে পারে।

‎তবে সবাই কেমন মিটিমিটি হাসছিলো। রিনি আপু আমাকে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন,

-‎”এদিকে আয়, তোর মেকআপ নষ্ট হয়েছে। কাঁদছিলিস খুব?”

‎আমি তখন বুঝলাম সবার হাসির কারন। সিরিয়াসলি তখন আমার এতো লজ্জা লাগছিলো! আমার ইচ্ছে হচ্ছিল মাটিটা দুই ভাগ হয়ে যাক আমি নেমে যাই! উফফফ!


‎চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here