মেহবুব লেখনীতে:‎#তাবাসসুম_তোয়া ‎৯.

0
28

‎#মেহবুব
লেখনীতে:‎#তাবাসসুম_তোয়া
‎৯.

‎দুই পরিবার মিলে আমি একমাত্র মেয়ে। এজন্য আমার আদর সবসময় বেশিই ছিলো! আব্বুর কলিজা ছিলাম আমি। আমি রাগ করে খাওয়া বন্ধ করলে আমার আব্বুও খাওয়া বন্ধ করে দিতো। আমার সেই বড্ড আদরের বাপ। আমি তাকে ছেড়ে কিভাবে যাবো? এই ঘর, এই পরিচয়,এই মা সব ছেড়ে আমি রওনা দিচ্ছি আরেক ঠিকানা,পরিচয় বরণ করতে!
‎আব্বু আমাকে যখন উনার হাতে তুলে দিচ্ছিলো, আমি দেখছিলাম উনার হাত কাঁপছিলো! আব্বু কাঁদছিলো।

-‎” আমার বোকা মেয়েটা ওতোকিছু বোঝে না বাবা। ওকে বুঝিয়ে রাখতে হয়। আমার কলিজার টুকরা, আমার মুনিবা। আমার বড় সন্তান! আল্লাহর রহমত হয়ে ও এসেছিলো বাবা আমার জীবনে! এই এটুকু সময় থেকে ওকে কত যত্নে বড় করেছি বাবা, যদি তোমার কখনও মনে হয় ও তোমার কাছে অসহ্য কিংবা তোমার আর ভালো লাগছে না, তখন তুমি আমার মেয়ে আমাকে ফিরিয়ে দিও। কখনও ভুলেও আঘাত করো না বাবা। না কথা দিয়ে না হাত দিয়ে। আমার অতি যতনের রাজকন্যা! ”

‎শক্ত কঠিন উনাকেও দেখলাম নড়েবড়ে, চোখ লাল। আব্বুর হাতের ওপর হাত রেখে সে বললো,

-‎” আব্বু, আপনি আমাকে যে আমানত দিলেন সে আমানতের যথাযথ মূল্যায়ন,সম্মান বজায় রাখবো ইনশাআল্লাহ। আমি ওয়াদা করছি আব্বু আমার শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত এই আমানতকে আগলে রাখবো। আমি বা আমরা যদি কখনও কোন ভুল করি আপনারা গুরুজন আমাদের শুধরে দিবেন। কখনও আমার উপর থেকে বিশ্বাস হারাবেন না আব্বু। আমাদের জন্য সবসময় দোয়া করবেন। আপনাদের দোয়ায় আমাদের সবচেয়ে বড় পাথেয়। আমরা যেন দেশ ও জাতির জন্য সবসময় বরকতময় হতে পারি! ”

‎আকদ বাড়িতে হলেও অতিথিদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হলো বাসার পাশের কমিউনিটি সেন্টারে। আকদ শেষে আমন্ত্রিত অতিথিরা সবাই সেখানে চলে গেল।
‎আমাদের বিয়েতে কোন ওয়েডিং ফটো শুট হলো না৷ উনার কঠোর নিষেধ। উনি এগুলো পছন্দই করেন না। ছোটখালা শাশুড়ী বললেন।

-‎”তোরা ভবিষ্যতের জন্য কোন অ্যালবাম রাখবি না৷ মানুষ তো স্মৃতি জমায় পরে দেখবে বলে। ”

‎উনার কাঠকাঠ উত্তর

-‎” আমি ওর অ্যালবাম, ও আমার। স্মৃতি দেখতে ইচ্ছে হলে দুজন দুজনকে দেখবো আর অতীত মনে করবো। বাচ্চাদের বসে বসে আমাদের বিয়ের গল্প শোনাবো। ওরা মন দিয়ে আঁকবে সে ছবি। ব্যস হয়ে গেল! ”

‎°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

‎বাপ্পি আম্মুর অনেক কাছের একজন! সে আম্মুকে জিজ্ঞাসা করলো

-‎”আন্টি আপনার শুধু একটা মেয়ে কেন? আর একটা দুইটা হইলে আমার কষ্ট কমে যেত! এ যুগে মেয়ে খুঁজে পাওয়া যে কি কষ্ট!!”

‎আমার শাশুড়ি ওর পিঠ চাপড়ে বললেন,

-‎”কেন বাবা, তুমি কি মেয়ে খুঁজছো? তোমার এটা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, সে দায়িত্ব আমার! দেখছো না তোমার বড় ভাইও দায়িত্বটাও আমার ছিলো! ”

-‎”হ্যাহ, ভাই কত দায়িত্ব তোমার উপর দিয়েছিলো আমার জানা আছে! একটা বাচ্চা মেয়েকে নিজে পছন্দ করে ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলো, দেখে রেখো! আমিও কেন একটা বাচ্চা পাইলাম না? ইসস! ”

‎তারপর মুহাইমিনের পিঠে চাপড় দিয়ে বললো

-‎”ঐ বেটা তুই মাইয়া হইবার পারলি না! ”

‎তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললো

-‎”তোরে একটুও ভালো লাগছে না। মুনিবা ভাবীহ! ”
শেষ শব্দটা কেমন কৌতুক করে বললো!

‎সবাইকে বিদায় দিয়ে,আমার ছোট্ট মুহাইমিনকে সাথে নিয়ে গাড়িতে উঠলো। মুহাইমিনের সাথে বাপ্পির ভাব সবচেয়ে বেশি। সারাদিন ভাইয়া ভাইয়া বলে ফেনা তোলে!
‎উনি চুপচাপ গম্ভীর, এজন্য বাচ্চাদের সাথে উনার ভাব তেমন জমে না! আমি নিজেই এখনোও যে ব্যাক্তির সাথে ভাব জমাতে পারিনি! বাচ্চারা কেমনে পারবে?

‎বিয়ের পর আন্টি আম্মু হয়ে গেল। আমাকে আম্মুই নিয়ে আসলো। উনি কোথায় জানি না। গাড়িতে উনাকে দেখলাম না। আমাকে রেখে আগে আগে চলে গেছেন কেন জানি না? প্রাইভেটে উঠার পর আম্মু বললো আব্বু মানে শশুর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এজন্য উনি আব্বুকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন!আন্টিকে দায়িত্ব দিয়ে গেছেন।

‎সন্ধ্যার সময় যখন প্রাইভেট কারটা সেই স্বপ্নের রাস্তায় ঢুকলো আমি অবাক হয়ে চেয়ে দেখলাম পুরোটা রাস্তা জুড়ে লাইটিং! আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। আমার স্বপ্নে রাস্তাটা ঠিক এমনই ছিলো! সেই চিরচেনা রাস্তা আমার! আমার জীবনের রাস্তা! যেই রাস্তায় আমি হেঁটে গেছি উদ্দেশ্যহীন ভাবেই! শত শত বছর ধরে কত শত বার! যে রাস্তায় এসে থমকে গেছে আমার সকল চেতনা, বিচার বিবেচনা! আমি শুধু জানতাম আমাকে এই পথ ধরেই হাঁটতে হবে। তাই হেঁটে গেছি অবিরত!

‎প্রাইভেট কার থেকে নামতে গেলেই উনি কোথা থেকে উদয় হলেন। সামনে এসে হাত বাড়িয়ে দিলেন। সবাই চিৎকার দিয়ে বললো,

-‎” ভাই কোলে নেন ”

‎আমি তাকিয়ে দেখলাম আমার স্বপ্নের পুরুষ! এ যে এক অন্য মানুষ! পাঞ্জাবিতে কি দারুন লাগছে তাকে! আমার তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে হলো! যে পিপাসা আমার মেটেনি কভুও! যে রুপে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম! লোকটা এতো সুন্দর কেন! উফফ। ছেলেদের একটু কম সুন্দর হতে হয়! কিন্তু উনি! অসম্ভব সুন্দর! এজন্য সবাই তাকেই দেখতে থাকে বার বার!
‎উনি ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন? ঐ বড় বড় চোখ জোড়ার দৃষ্টি কি ভয়ানক মারাত্মক! সিরিয়াসলি সেটা দৃষ্টি নয় যেন গুলি! পাপড়ি দুটো আগে আস্তে করে তোলেন যেন গুলি তাক করছেন, তারপর ঠাস করে তাকান একদম বুলেট এসে বিদ্ধ হয় অন্তরে! আমি বার বার বিদ্ধ হয় সেই বুলেটে! আমার ইচ্ছে করে চোখ জোড়া হাত দিয়ে ঢেকে রাখি! আমি কখনও সে চোখে তাকাতে পারিনা ! উনি আবারও ইশারায় অনুমতি চাইলেন,

‎আমার ভীষণ লজ্জা লাগলো। চোখ জোড়া নামিয়ে নিলাম! এখানে কত বড় মানুষ আছে। আমি আস্তে করে বললাম

-‎”এখানে আম্মু খালা মামারা সবাই আছেন ”

‎উনি বুঝলেন। তাই আর জোর করলেন না। হাত ধরে স্বাভাবিক ভাবেই নামালেন। আমি নেমে সামনে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে থাকলাম!

‎দোতলা বাড়িটার আগাগোড়া লাইটিং করা! এই ভরসন্ধ্যে বেলায় সেটা দেখতে অপূর্ব লাগছে। আমার মানসপটে এঁকে গেল এ কোন অনবদ্য ছবি! আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েই থাকলাম। আমি মুগ্ধ হয়ে জীবন দেখতে লাগলাম! আর জীবন আমাকে কি কি দিচ্ছে সেটা!
‎পাশের জন বুঝলো কি আমার স্তব্ধ হয়ে যাওয়া রুপ!
সে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললো

-‎”তোমার স্বপ্নের বাড়ি দেখতে স্বপ্নের মতো হয়েছে? ওহ সরি কলিজার টুকরা বাড়ি! ”

‎আমার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো। চোখ বন্ধ করে নিলাম!
‎পাশের বড় হাতের থাবায় আমার হাত হারিয়ে গেল। সে আলতো করে আমার হাতে খেলা করছে আমি টের পাচ্ছি! সে বাড়িতে আমি এর আগেও অনেকবার এসেছি। তবুও আজ একদম অন্যরকম লাগলো। এ বাড়ি আমি চিনি না। ধীর পায়ে হেঁটে নিয়ে সিঁড়ির গোড়ায় থামলাম। সিঁড়ির গোড়ায় তেমন কেউ ছিলো না। সবাই সামনের লাইটিং এর ওখানে ছিলো। শুধু কাজিনরা আমাদের পিছু পিছু আসছিলো। উনি হুট করে কোলে তুলে নিলেন আমায়! সবাই হোহ হো শব্দ তুলে শিস বাজালো! আমি ভয় পেয়ে আঁকড়ে ধরলাম তাকে, বললাম

‎” আপনি অসুস্থ! ”

‎উনি বললেন

‎” আমি সুস্থ! প্রমান চাই তোমার? ”

‎আমি শক্ত করে চোখ এঁটে ফেললাম! কথাটায় কান ঝালাফালা হয়ে গেল! গাল দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হলো যেন! এতো লজ্জা পেলাম! শক্ত করে পাঞ্জাবির বোতামের কাছটায় চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকলাম। আমি তার ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়ে গেলাম!জোরে শ্বাস টেনে টেনে পৃথিবীর সবচেয়ে মনমুগ্ধকর সুগন্ধি টেনে নিতে থাকলাম নিজের ভেতর! কারো কোলে থাকার অনুভূতি কি ভয়ানক প্রশান্তিদায়ক সেটা স্ট্রংলি অনুভব করতে থাকলাম! আমি চাইলাম এ প্রশান্তিদায়ক যাত্রার শেষ কখনও না হোক,আমি জগতের সবকিছুর বিনিময়ে শুধু এই জায়গাটাই চাইবো। বার বার চাইবো !! উনি দোতলায় উঠিয়ে নিয়ে ধীরে আমাকে নামিয়ে দিলেন। চুপচাপ তাকালেন আমার চোখের দিকে। শান্ত অথচ কি গভীর সে দৃষ্টি! আমি চোখ নামিয়ে নিলাম। আম্মুর হাতে তুলে দিয়ে আবারও নিচে চলে গেলেন।

‎আম্মু আমাকে আদর করে মিষ্টি মুখ করে নিজের রুমে নিয়ে গেলেন। কতশত আত্মীয় স্বজন এসেছেন। আঙ্কেল মানে আব্বু আজ সকাল থেকেই অসুস্থ। বিকালের দিকে হাসপাতালে এডমিট করানো হলো! এজন্য পুরো বিয়ের দায়িত্ব পড়েছে একা উনার ঘাড়ে। বাপ্পিও দায়িত্ব পালন করছে কোমর বেধে। একফাঁকে আমাকে হুমকি দিয়ে গেছে,

-‎” বহু আগে মা দখল করেছিস আজ আবার বড় ভাই! এই তোর ইনটেনশন কি বল? আমাকে ঘর ছাড়া করতে চাস? ”

‎ওর কথায় সবাই হাসলো!
‎উনাকে দেখলাম কাজের ফাঁকে একবার দরজা দিয়ে উঁকি দিয়ে বললেন

-‎” কি বৌ দখল হয়ে গেছে? আমি কি ভাগে পাবো না? ”

‎খালামনি আর মামীরা হেসে উঠলেন। আম্মু উনাকে বললেন,

-‎” তোমার বৌ হওয়ার আগে ও আমার মেয়ে! ”

-‎” তা মেয়ের জামাইকে রুমে প্রবেশের অনুমতি দিবেন শাশুড়ী আম্মা? ”

‎সবাই আবারও হেসে উঠলো। কাজিনরা বললো,

-‎ “কোন সুযোগ নেই। বৌ পাবেন রাতে। এখন আমাদের দখলে।”

‎উনি সবার দিকে একবার দৃষ্টি বোলাতেই সবাই থেমে গেল। আমি বুঝলাম এরা সবাই আমার দলে,আমার মতোই মানুষটাকে ভয় পায় !
‎উনি আম্মুকে বললেন,

-‎”আম্মু এদিকে আসো, মেহমানদের থাকার জন্য নিচের ফ্লাটে এরেঞ্জ করা হয়েছে, যত কাঁথা বালিশ আছে তোমার আলমারিতে সব নিচে পাঠাও।” এসব বলতে বলতে চলে গেলেন দুজনেই।

এর মধ্যে এক ফাঁকে আম্মু গেছিলেন হাসপাতালে। আব্বুকে দেখে এসেছেন।
‎চাচা শশুর, মামা শশুর সবাই আছেন হাসপাতালে। উনারা আম্মুকে ঠেলে পাঠিয়ে দিলো বাড়িতে। এতো মেহমান কে দেখবে? আব্বু নিজেও বললেন ” সমস্যা নাই আমি ঠিক আছি, কাল সকালে এসো।”

বাপ্পি এসে সবাইকে নিচে নিয়ে গেল। সবার দায়িত্ব আলাদা আলাদা ভাগ করে দেওয়া হলো। জুনায়েদ আর সাকিবকে বললো

-‎ ” তোমরা তোমাদের খালাকে সাহায্য করো।
‎আর মেঝ খালা, সেজ খালা আর মামীরা আপনারা সব মেয়েদের খাবারের ব্যবস্থা করেন৷ ”

‎রাতে খাবারের সময় আম্মু এলেন আমাকে খাওয়াতে। আমার ক্ষুধা ছিলো না মোটেও। এক গাল খেয়েই থেমে গেছি। সে খবর কিভাবে জানি পৌঁছে গেছে উনার কাছে। উনাকে দেখলাম পর্দা ঠেলে চুপচাপ এ রুমে এসে বসলেন সরাসরি আমার সামনের সোফায়।

‎কি সে বসার স্টাইল! পাঞ্জাবির উপরের বোতামটা খুলতে খুলতে সোফায় পিঠ এলিয়ে এক মিনিটের মতো চোখ বন্ধ করে থাকলেন। আমি তাকিয়ে দেখতে থাকলাম। আসলেই ভীষণ পরিশ্রম হচ্ছে এই অসুস্থ শরীরে। উনি হুট করেই চোখ মেলে তাকালেন। সেই বড় বড় চোখ! আর সেই চাহুনি দেখে আমার খাবার আটকালো গলায়! উনি স্বাভাবিক ভাবে সামনে থাকা পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিলেন। আম্মুকে বললেন

-‎”এগুলো এখনও কি পরিয়ে রেখেছো? খুলে দাওনি কেন? ”

-‎” আরে তুই দেখবি না! ”

-‎” দেখলাম তো আবার কি দেখবো। ”

‎তখন খালাম্মা ডাকলেন আম্মুকে। আম্মু উনার দিকে তাকালেন। উনি যেতে ইশারা করলেন। আমি খপ করে আম্মুর হাত চেপে ধরে মাথা নাড়িয়ে ইশারা করলাম। সেটা দেখে দু’জনেই হাসলো। আম্মু বললেন

-‎”পাগলি মেয়েটা”

‎তারপর উনার দিকে তাকিয়ে বললেন

-‎” আমার মেয়েকে ধামকি দেবেনা। বড় সাধের মেয়ে আমার! আর জোর করবা না যতটুকু পারে খাবে। আবার পরে ক্ষুধা লাগলে খাবে। রাতে তোমাদের রুমে খাবার পাঠাবো। ঠিক আছে? ”

‎আম্মু চলে গেলেন দরজাটা ভেজিয়ে। উনি ঐ সেই চোখ জোড়া তুলে তাকালেন আমার দিকে…..


চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here