হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পর্ব:41

0
38

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:41

বুড়িগঙ্গা নদীর রুপ বদলে ধারণ করেছে রুদ্ররূপ।দিগন্ত চিরে বিদ্যুতের ঝলকানি, তারপরেই মেঘের গর্জন যেন দেবতার ক্রুদ্ধ হাঁক নিঃশব্দ নিস্তব্ধতা ভেঙে আছড়ে পড়ছে বিকট শব্দে।নদীর পাড়ে সারি সারি তালগাছগুলো দুলছে বেপরোয়া মাতালের মতো। বাতাসের গতি এমন,মনে হচ্ছে যেকোনো মুহূর্তে নদীর বুক থেকে উঠে আসবে ঢেউয়ের দানব।

অথচ প্রকৃতির এমন দিশেহারা তান্ডব নিস্পার কাছে ফিকে,তার সমস্ত মনযোগ ব্যাস্ত প্রিন্স জোসেফের সাথে তর্কে জেতার লড়াইয়ে,

“সত্য আর বীনা পাখি কে রেখে আমি কিছুতেই আপনার মহলে যাবো না।”

প্রিন্স জোসেফ ঠান্ডা কন্ঠে বললো,

“তোমাকে নিমন্ত্রণ জানাতে আসি নি আমি,মহলের বন্দীনি বানাতে এসেছি।”

নিস্পা প্রত্যুত্তর করলো সঙ্গে সঙ্গে,

“সে যাই করুন,ওদের ছাড়া আমি যাবো না।বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখুন,ওকে একা ফেলে রেখে যেতে মায়া হবে না আপনার? ”

নিস্পার ছুড়ে দেওয়া প্রশ্নের জবাবে ধেয়ে এলো জোসেফের বজ্রপাতের ন্যায় কঠিন কন্ঠস্বর,

“আমার মন বা মায়া কোনটাই নেই।”

নিস্পা তাজ্জব,সে প্রিন্স জোসেফের সামনে দাঁড়িয়েই হ্যালুসিনেশন করছে ত্রিজয়কে,ত্রিজয়ের চটপটে স্বর আর রুক্ষতার মাঝে খুঁজে পাওয়া সেই ভালোবাসা আর ভালোলাগা টুকু মিসিং, এই কাটখোট্টা হৃদয়ের মানুষটা যে ভবিষ্যতের ত্রিজয় এই কথাটা মানতে বেশ কষ্ট হচ্ছে নিস্পার।

“নির্দয়,,,”

অস্ফুট স্বরে বিড়বিড়ালো নিস্পা।প্রগাঢ় দৃষ্টিতে তাকালো প্রিন্স জোসেফের একজোড়া নিখাঁদ চোখের দিকে,ফের আওড়াল,

“তাতে কি?আপনাকে ভালোবাসা শেখানোর দায়িত্ব আমার।”

নিস্পার কণ্ঠনালী থেকে ধ্বনিত বাক্য কর্নগোচর হলো না প্রিন্স জোসেফের, তার চোখ জুড়ে বিস্ময়কর ক্রোধ,কপালের ভাজে লুকায়িত কঠোরতা স্পষ্ট প্রায়,সে এগিয়ে আসে,নিস্পার হাতের বাহুতে গেঁথে থাকা ধাতব তীরটা টান মারে স্ব গতিতে।ঠিক যেমনভাবে তীরটি ছুটে এসে বিদ্ধ করেছিল নিস্পার কোমল চামড়া, তার চেয়েও দ্বিগুণ নির্মমতায় ছিঁড়ে যা বিদ্ধ হওয়া চামড়াটুকুর আশপাশের অংশ।

অদৃশ্য যন্ত্রণায় কাতরে উঠে নিস্পা,নিস্পৃহ নেত্রপটে জমা হয় ব্যাথার তুফান। প্রকম্পিত স্বর থেকে বেড়িয়ে আসে শিৎকার,

“ওহ আল্লাহ!”

প্রিন্স জোসেফ তৃপ্তি পেলো, এতোক্ষণে চোটপাট চালানো কন্ঠে আর্তনাদের সুর সঙ্গিতের মতোই মধুর শোনালো তার কানে,সে শক্ত হাতের থাবায় চেপে ধরলো নিস্পার গ্রীবাদেশ,বজ্র কন্ঠে বলে,

“আমার মন নে, তবে একটি পৈশাচিক মস্তিষ্ক আছে৷ যার কাছে তোমার এই আর্তনাদ গুলো সুমধুর শোনায়।”

নিস্পার রক্তাক্ত চোখ ঝাপসা,এপর্যায়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়েছে,চোখের উপর পাতলা ছানির মতো আবরণ টা জ্বলছে, যেন কেউ মরিচের গুঁড়ো লাগিয়ে দিয়েছে সেথায়।
নিস্পা তার হাত দিয়ে ঠেলে সরাতে চাইলো প্রিন্স জোসেফ কে,বিবষ কন্ঠে আওড়াল,

“আমাকে আঘাত করার মতো ভুল দ্বিতীয়বার করবেন না , খোদা না করুক এর খেসারত জন্মের পর জন্ম দিতে হয় আপনাকে।”

প্রিন্স জোসেফ বাঁকা হাসে,ক্ষ্যাপা সিংহের ন্যায় আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে নিস্পার গ্রীবা,রুক্ষ স্বরে বলে,

“হুশশশ!আমাকে খোদার ভয় দেখিও না মেয়ে,আমি নির্দয়, হৃদয়হীনা।কাউকে খেসারত দেওয়ার দরকার পড়বে না আমার।”

পিনপতন নৈঃশব্দ।প্রচন্ড যন্ত্রণায় শীর্ণকায় শরীর টা আর্তনাদ করতে গিয়েও দমে গেলো,চিড়চিড় করে রক্ত বেরিয়ে আসা বাহুর অংশটা এক হাত দিয়ে চেপে ধরলো নিস্পা, অথচ ছাড়ালো না জোসেফের হাত।দাঁতে দাঁত খিচে কেবল হিসহিসিয়ে বললো,

“আমি আপনার ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি,আপনি খুব শীঘ্রই ভালোবাসতে চলেছেন এবং সেই ভালোবাসার আঘাতে আপনার মৃত্যু হতে চলেছে।ভাগ্যের কাছে অনেক বেশি খেসারত দিতে হবে আপনাকে।”

জোসেফ দৃঢ় কন্ঠে প্রত্যুত্তর করলো,

“ভালোবাসা অঙ্কহীন এক সমীকরণ,আমার গাণিতিক সূত্রে বাঁধা জীবনে এর প্রবেশ নিষিদ্ধ।”

জোসেফের কথায় অভিব্যক্তি কঠিন করলো নিস্পা,ভ্রুকুটি করে বললো,

“ভালোবাসা বারিপাতের ন্যায় অনিয়ন্ত্রিত, আপনার অঙ্ক কষা জীবনের সমস্ত কাগজ ভিজিয়ে দিতে পারে এক লামহায়।”

নিস্পার এবারকার যুক্তি খন্ডাতে পারে না প্রিন্স জোসেফ,নিস্পার এমন অকুতোভয় উত্তর আর অদম্য কন্ঠস্বর অবাক করে তাকে,ভিষণভাবে বিব্রত করে নাজুক ফ্লোরেন্সার এমন রুদ্রাণী রুপ।

“তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি মেয়ে,প্রিন্স জোসেফের সাথে তর্কে জড়ানোর ফল কিরুপ হতে পারে ধারণা আছে তোমার?”

নিস্পা এবারেও কন্ঠে আক্রোশ ঢেলে উত্তর দিলো,

“আমি কোন জোসেপ টোসেফকে ভয় পাই না।”

“এই মূহুর্তে তোমার গলার সরু রগটা কেটে ফেলতে ইচ্ছে করছে আমার।একবার ভাবো তো,যদি আমি আমার ইচ্ছেকে প্রাধান্য দেই?”

প্রচন্ড আক্রোশে সশব্দে বাক্য ছুড়লো প্রিন্স জোসেফ। অথচ এক মূহুর্তের জন্যও থমকালো না নিস্পা,দৃষ্টিতে দুঃসাহস সঞ্চার করে ফুসে উঠলো ফের,

“আপনি আমাকে কিচ্ছু করতে পারবেন না, চ্যালেঞ্জ নিচ্ছি।”

প্রিন্স জোসেফ আরেকটু অবাক হয়,কুচকে আসে তার চোখ,ধবধবে ফর্সা চোয়াল শক্ত করে তাকায় নিস্পার মুখপানে।

“ইংরেজি শিখেছো কোথা থেকে?”

“আমি মূর্খ নই।”

প্রিন্স জোসেফের দৃষ্টিতে সন্দেহ,সে সন্দিহান কন্ঠে বললো,

“শিক্ষিতও তো ছিলে না।”

নিস্পার চোখেমুখে উপচে পরা তেজ,চোখ দু’টোতে জ্বলজ্বল করছে বিষাধ,কণ্ঠনালীতে ঘাটি গেড়েছে পাহাড়সম বিতৃষ্ণা,

“আপনি যাকে আমি ভাবছেন আমি সে না।”

“বলতে চাইছো তুমি ফ্লোরেন্সা নও?”

“হ্যাঁ।”

নিস্পার ছোট্ট জবাবের তোয়াক্কা করলো না জোসেফ। প্রত্যুত্তর করলো খুব দ্রুত,

“পৃথিবীতে একই চেহারার সাতজন মানুষ হয় বিশ্বাস করতে বলছো?”

“শুনে নেও মেয়ে নাতো আমার মাঝে বিশ্বাস নামক কোন শব্দ আছে,নাতো আমার জন্য কারো হৃদয়ে বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ আছে, দুটোতেই আস্থা শুন্য আমি।”

প্রশ্ন করে নিজেই উত্তর দিলো জোসেফ।

“বিশ্বাস করা না করা একান্তই আপনার ব্যাপার।তবে আমি মিথ্যা বলি না।”

নিস্পার কন্ঠে চোটপাট। অথচ প্রিন্স জোসেফের প্রত্যুত্তর তরোয়ালের ন্যায় ধারালো,

“তুমি তো ইংরেজিও বলতে না,অস্বাভাবিক ভাবে এখন বলছো।”

“এর সত্য স্বীকারোক্তি আমি দিয়েছি, আপনিই বিশ্বাস করেন নি।”

“তুমি ছলনা করেছ শুরু থেকেই,অবলা সেজে উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য স্বইচ্ছায় মহলে এসেছ তাই না? আমার সাথে ছলনা করার শাস্তি কি হতে পারে যানো নিশ্চয়ই?”

“ছলনা আমার ধাঁচে নেই।আর আপনার শাস্তি সম্পর্কে এই কয়েক মূহুর্তেই ধারণা করে ফেলেছি আমি।বড়জোড় মেরে ফেলার হুমকি দিতে পারবেন,এর চেয়ে বেশি কি করতে পারবেন?”

জোসেফের প্রতিটি নিউরনে ছড়িয়ে পড়লো তীব্র ক্রোধ।দৃষ্টিতে দাবানলের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, যেন সেই আগুনে নিস্পাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে দিবে সে।

পিনপতন নীরবতা।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সত্যের ঘনঘন নাক টানার আওয়াজ, আর নিস্পার ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া বাতাসে আর কোন শব্দের উপস্থিতি নেই।
আচানক নিজের শক্ত থাবায় জোসেফ পিষে ধরলো সত্যের মাথার চুল।অগ্নি কন্ঠে বললো,

“তোমাকে মারার ইচ্ছে নেই, কারণ তোমাকে তড়পানোর ইচ্ছে আমার।তোমাকে প্রতিদন প্রতিনিয়ত তড়পানোর জন্য এমন কিছু তুচ্ছ প্রান নইতে পারবো অবশ্যই।”

সত্যের কোকরানো বাবরি চুল গুলো পিষে ধরতেই, চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো সত্য,চিৎকার করে কাঁদলো,

“আম্মিজান,,,, ও আম্মিজান।”

পরপরই শোনা গেলো বীনা পাখির পিউক পিউক ডাক।বোবা পাখি সত্যকে বাঁচানোর জন্য আঘাত করার চেষ্টা চালাচ্ছে জোসেফের উপর। যদিও তার তুচ্ছ শক্তি জোসেফের সামনে ব্যার্থ তবুও সে হাল ছাড়ে না কোন মতে।তার গলা ফাটিয়ে পিউক পিউক ডাক ভারি করে তুলে আকাশ।

নিস্পা আশ্চর্য হয়,ত্রিজয়ের এমন পৈশাচিক রুপ দেখে অকেজো লাগে মস্তিষ্ক।তার সুস্থ নিউরোন গুলো সংকেত পাঠায়, চেচিয়ে চেচিয়ে বলে,

“ভাগ্য তোকে চোখে আঙুল দিয়ে ভুল দেখিয়ে দিচ্ছে নিস্পা।ত্রিজয় তোর সবচেয়ে ভুল চয়েজ।এই নির্দয় জালিম পুরুষ কখনো তোর ভালোবাসার যোগ্য হতে পারবে না।”

নিস্পা উপায়ন্তর না পেয়ে অতর্কিত ঝাপিয়ে পড়লো প্রিন্স জোসেফের উপর ,ধস্তাধস্তি শুরু করলো জোসেফের সাথে।মেয়েলি শক্তি কিছুতেই পেরে উঠতে না পেরে নিজের দাঁত দিয়ে কাঁমড়ে ধরলো জোসেফের হাতের মাংস।

নিস্পার এমন কান্ডে হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে থাকে জোসেফ।সত্যকে ছেড়ে দিয়ে এক আঙুল ঠেকায় নিস্পার কপালে, নিস্পা চোখ উল্টে তাকায়, জোসেফের আঙুলের ইশারায় ধিরে ধিরে তুলে মাথাটা,কৌতুক কন্ঠে বললো,

“সামান্য দাঁতের আঘাতে প্রিন্স জোসেফকে মারার পরিকল্পনা করেছ?তোমার ভাবনা এতো নিচু কেন মেয়ে?”

জোসেফের এমন প্রশ্নে এক চুল ছাড় দিলো না নিস্পা,পাল্টা অপমান করার জন্য বললো,

“আপনার মতো নিচু মানসিকতার মানুষের জন্য উচ্চতর ভাবনার কোন প্রয়োজনই নেই আমার।কথায় আছে না যেমন কুকুর, তেমনি মুগুর।”

__________

দেয়ালের আড়ালে এক গোপন সিঁড়ি, আঁধারে ঢাকা সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলো আইরিশ।পাথরের তৈরি মোটা দেয়ালগুলো অশরীরীর ন্যায় গ্রাস করে নিতে চাইছে আইরিশকে।

আইরিশ এগিয়ে গেলো আরো কয়েকপা।হাতের বা দিকের একটা সেল থেকে অনবরত ভেসে আসছে চিৎকারের আওয়াজ।মনে হচ্ছে কাউকে পাশবিক টর্চার করা হচ্ছে।

বাতাসে ভারি লৌহ গন্ধ আর পুরনো রক্তের পঁচা গন্ধে গা গুলিয়ে আসছে আইরিশের।ছোট ছোট সেল গুলো আর পাথরের গায়ে লেগে থাকা রক্তের ছাপ চেচিয়ে বলছে,মানবতা নেই,এখানে মনুষ্যত্ব নির্বাসনে গিয়েছে।

প্রত্যেকটি কুঠুরিতে একজন করে বন্দী, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন করে পাহাড়াদার।আইরিশ সতর্ক চোখে পরখ করে, এগোলো ভেতরের দিকে।একটা সেলের সামনে এসে থামালো পা,সেলের ভেতর কয়েদি কিন্তু সামনে পাহাড়াদাড়ের উপস্থিতি নেই।সেলের এক কোণে বসে থাকা লোকটাকে বেশ চেনা মনে হলো তার।
আইরিশ ধির কদমে গিয়ে দাড়ালো সেলের সামনে, লোকটার পড়নের ছেড়া লুঙ্গি,গায়ে অসংখ্য চাবুকের দাগ।ব্লেড চালানো চামড়া ক্ষতবিক্ষত, পোকামাকড়ের আনাগোনা বেড়েছে পচা মাংস খাওয়ার জন্য।আইরিশ ঢোক গিললো,চোখ ছোট ছোট করে তাকালো লোকটার গলায় পড়ে থাকা একটা ব্যাচের দিকে, যেখানে স্পষ্ট লেখা “সন্দেহভাজন দেশদ্রোহী।”

আইরিশ আরেকটু ভালো করে দেখতেই চিনে ফেললো লোকটাকে,বুকের ভেতরটা মুচড়ে এলো অদৃশ্য যন্ত্রণায়,অস্পষ্ট ডাকলো,

“বন্ধু সুলায়মান।”

সুলায়মান নিভু চোখে পিটপিট করে চাইলো,চোখের সামনে পুরনো বন্ধুর দেখা পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে ছুটে এলো হামাগুড়ি দিয়ে,সেলের লোহার সিকে হাত রেখে আতংকিত কন্ঠে বললো,

“আইরিশ? তুই এখানে?এই টর্চার সেলে কি করছিস তুই?তোকেও কি এই সেলের আসামী করে ধরে আনা হয়েছে?”

“আমি স্বইচ্ছায় এখানে এসেছি সুলায়মান।আমাকে কেউ ধরে আনে নি।”
আইরিশের কন্ঠ নিস্তেজ।

অপরদিকে ভয়ে আঁতকে উঠল সুলায়মান, আতংকিত কন্ঠে বললো,

“তুই পাগল হয়েছিস আইরিশ?তুই জানিস না এইখানে যে একবার প্রবেশ করে সে আর বেঁচে ফিরতে পারে না?”

আইরিশ নিজের হাতটা তুলে রাখলো সুলায়মানের হাতের উপর,তারপর কন্ঠে ভরসা জুগিয়ে বললো,

“বেঁচে ফিরবো সুলায়মান, আমি ফিরবো, আর তুইও ফিরবি।”

আইরিশের কথায় ঝুপঝুপ করে চোখের পানি ছেড়ে দিলো সুলায়মান, ভেজা কন্ঠে বলল,

“আমি ফিরব না আইরিশ,আমার আর বাড়ি ফেরা হবেনা।”

আইরিশ থমকালো, আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“ফিরবি না মানে?কেন ফিরবি না তুই বাড়িতে?”

“ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে মরে গেছে,আমি এখন মৃত্যুর দিন গুনছি,যদি এখান থেকে বেঁচে ফিরিস তাহলে রহিমাকে জানিয়ে দিস আমার ফেরার অপেক্ষা ছেড়ে দিতে।”

“ফিরে যেতে চাস না এত সহজে বলে দিলি?তুই তো জানিসও না শুধু রহিমা নয় তোর সন্তানও তোর জন্য অপেক্ষা করছে।তুই নিখোঁজ হওয়ার পর পরই রহিমা জানতে পেরেছে সে গর্ভবতী।সে তোর ফেরার অপেক্ষা করেছে,দিনের পর দিন গিয়েছে, তোর বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হয়েছে পৃথিবীতে,অথচ তুই ফিরিস নি।তোর সন্তানের বয়স এখন দুই বছর।সে বাবা ডাকতে শিখেছে, বাবার খোঁজ করতে শিখেছে,অন্তত তোর সন্তানের জন্য কি তুই ফিরবি না?”

সুলাইমানের কান্নার বেগ বাড়লো,সন্তানের কথা শুনে মুচড়ে এলো বুক,ফিরে যাওয়ার জন্য হাহাকার শুরু করলো ক্লান্ত কোষগুলো,পরপরই সামলে নিল নিজেকে, এক হাত দিয়ে উপরের দিকে তুললো পরনের ময়লা লুঙ্গিটা,অসহায় কণ্ঠে বললো,

“এমন পঙ্গুত্ব নিয়ে রহিমার কাছে ফিরতে চাই না আমি।না তো আমার সন্তানকে দেখাতে চাই আমি এক অক্ষম পঙ্গু বাবা। ”

সুলায়মানের দুটো কাটা পা দেখে আতঙ্কে কেঁপে উঠল আইরিশ,চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম,

“এসব কি সুলায়মান?”

সুলায়মান এর ভিতরটা ভাঙ্গাচুরা অথচ শক্ত কন্ঠে উত্তর দিল,
“ওই জালেমরা ওই জানোয়ার গুলা আমার দুটো পা কেটে দিয়েছে আইরিশ।”

প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে,লোহার শিক চেপে ধরল আইরিশ,ক্রোধিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“কিন্তু কেন? কেন করল এই কাজ? তোর সাথে তো ব্রিটিশদের কোন শত্রুতা ছিল না।”

“ছিল আইরিশ,আমার বিশাল বড় শত্রুতা ছিল ব্রিটিশদের সাথে।”

“আমি সাংবাদিক ফাতেমার রেখে যাওয়া পরবর্তী আর্টিকেলটি আমার ছাপাখানায় ছাপাতে চেয়েছিলাম।যেটা ব্রিটিশদের জন্য ছিল হুমকিস্বরুপ।তাই ওরা আমার উদ্দেশ্য নৎশাত করার জন্য তুলে নিয়ে এসেছে এখানে।পরবর্তীতে আমি পালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম বলে আমার দুটো পা কেটে দিয়েছে।তখন থেকেই আমি পণ করেছি আমি আর পালাবো না,এই জালিমদের ধ্বংস না দেখা অব্দি আমি এখানেই থাকবো।”

সুলায়মানের কথায় ভ্রুকুটি করে আইরিশ, সন্দিহান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,

“সাংবাদিক ফাতেমা? সে তো অনেক আগে মারা গিয়েছে, উনার লেখা আর্টিকেল তুই কোথায় পেলি?”

“সে পেয়েছি এক জায়গায়, সেসব নিয়ে তোর ভাবতে হবে না।তুই শুধু আমাকে একটা কথা দে বন্ধু।”

আইরিশ আর ঘাটলোনা সুলায়মানকে,অস্পষ্ট জিজ্ঞেস করল,

“কি কথা বল? ”

“গঞ্জে ফিরে যেতে পারলে আমার রহিমাকে বলে দিস আমি মরে গেছি,তুই আমার দাপন করে ফিরেছিস, আমার জন্য আর অপেক্ষা না করতে।”

সুলায়মানের এই কথার বিপরীতে কোন উত্তর খুঁজে পেল না আইরিশ,কেবল বুকটা নিংড়ে এল অজানা দহনে,হঠাৎ জ্বলে উঠল দুটো চোখ,ভেজা কন্ঠে ভেঙে ভেঙে বললো,

“আমি মিথ্যে বলতে পারব না।”

কাঁপা কাঁপা হাতে চোখের পানি মুছলো সোলায়মান, ভেতরে স্নায়ুযুদ্ধ থাকা সত্ত্বেও কন্ঠশক্ত করল সুলায়মান,অনুরোধের স্বরে বলল,

“সত্য বললে রহিমা সহ্য করতে পারবে না আইরিশ।তার চেয়ে বরং আমার মৃত্যু সংবাদ ওর অপেক্ষার প্রহরের ইতি ঘটাবে।”

সময় পেরোলো,নিস্তব্ধতায় কাটলো অনেকক্ষণ।আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো আইরিশ, অস্ফুট স্বরে জবাব দিল,

“আমি আসছি।খুব শীঘ্রই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ধ্বংসের খবর পাবি কথা দিলাম,ততদিন বেঁচে থাক।”

আইরিশের কথায় বৃষ্টি শেষে আদ্র বাতাসের মতোই শীতল হয়ে উঠলো সুলায়মানের হৃদয়।হাতের পাঁচ আঙুল মুষ্টিবদ্ধ করে তুলল উপরের দিকে,স্বর মৃদু, অথচ কন্ঠে উত্তাপ,ধীরে ধীরে স্লোগান দিল,

“জয় বাংলা, জয় বাংলা।”

আইরিশ আর দেরি করল না, মায়া বাড়ালো না ক্ষণিকের,দ্রুত উঠে দাঁড়ালো নিজের গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য।দুই কদম এগোতেই সুলায়মান পেছনে ডাকলো মলিন স্বরে,

“আমার সন্তান কার মতো দেখতে হয়েছে আইরিশ?”

সুলায়মানের প্রশ্নে ব্যথায় নীল হয়ে এলো আইরিশের হৃদপিণ্ড।মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো ভেতরের উদভ্রান্ত অন্তঃকরণ,চোখ বুজে দম ছেড়ে উত্তর দিল,

“একদম তোর মতো,ঠিক যেন দ্বিতীয় সুলায়মান।”

___________

সেলের এক কোণে কুঁজো হয়ে বসে আছে নাবহা।পড়নে সাদা-নীল ছোপের সুতির লম্বা ফ্রক,দুহাত হাঁটুর ওপর রাখা, মাথাটা নামানো, পৃথিবীর সমস্ত লজ্জা, সমস্ত ভয় আতংক একটানা ভার হয়ে নেমে এসেছে তার কাঁধে।

পাথরঘেরা ঘরে তার কন্ঠ থেকে উঠে আসা ক্ষীণ গুনগুন কান্নার ধ্বনি ভেঙে দিচ্ছে নৈঃশব্দকে।সেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন ব্রিটিশ সৈন্য।আইরিশ এক ঝলকে মেপে নিল চারপাশ,সেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্রিটিশ সৈন্যকে পরাস্থ করার কৌশল খুজল দ্রুত, শিকারির মতো নিঃশব্দে পা টিপে টিপে এগিয়ে এসে দাড়ালো সৈন্যটির পেছনে।ঘাড়ের ঠিক কোন জায়গায় চাপ দিলে স্নায়ু ছিন্ন হবে, কতটা জোরে চেপে ধরলে চিৎকার না করে অজ্ঞান হবে,সব হিসেব কষে নিল দ্রুত।

তারপর আচমকা এক লাফে ঝাঁপিয়ে পড়ল সৈন্যটির উপর, এক হাতে মুখ চেপে ধরল শক্ত করে,আর অন্য হাত ঘুরিয়ে আনল ঘাড়ের ঠিক গোড়ায়।দেরি না করে মুচড়ে দিলো আচমকা। একটা চাপা শব্দে ঘাড়ের সন্ধিস্থল বেঁকে গেল, সৈন্যের শরীরটা ছটফট করল কিছুক্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে পড়ল।আইরিশ নিথর দেহটা নিচু করে নামিয়ে রাখলো মেঝেতে,চোখ তুলে তাকালো ভয়ে জড়সড় হয়ে সিটিয়ে থাকা নাবহার দিকে।

আলো খুব বেশি নেই সেলে,দেয়ালের উপরের দিকে একটি ছোট ছিদ্র দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকছে মৃদু।গায়ের রং আবছা আলোয় মিশে গিয়ে ধারণ করেছে স্বর্ণের রুপ।ভোরের আগে সীসা রঙের আকাশের মতোই শ্যামলা চেহারা তার।

আইরিশকে এভাবে এগিয়ে আসতে দেখে ঘাবড়ালো ভিষণ,কম্পিত কন্ঠে বললো,

“কে? কে আপনি? এখানে কেন এসেছেন?”

“ভয় পেয়ো না আমি তোমার কাছে কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে এসেছি।”

“কি প্রশ্ন? আমার কাছে আপনার কিসের উত্তর জানার থাকতে পারে? আমি আপনাকে চিনি বলে তো মনে হচ্ছে না।”

“আমি জানি তুমি আমাকে চেনো না কিন্তু আমাকে এমন একজন চিনে, যাকে তুমি চেনো। ”

“কার কথা বলছেন আপনি?”

“ফ্লোরেন্স,আমি ফ্লোরেন্সার কথা বলছি।ওকে নিশ্চয়ই চেনো তুমি?”

ফ্লোরেন্সার কথা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেললো নাবহা,এগিয়ে এসে দাঁড়ালো হন্তদন্ত হয়ে, কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“ফ্লোরেন্সা আপনাকে পাঠিয়েছে?আমাকে নিয়ে যেতে পাঠিয়েছে তাই না?ও কীভাবে পালালো?আমাকে কেন কিছু জানিয়ে গেলো না ও?”

নাবহার বিক্ষিপ্ত চুলগুলো কপাল ছুঁয়ে নেমে এসেছে গালের পাশে, কিছু চুল ঢেকে রেখেছে চোখ ,অনবরত উঠানামা করা বুকে বয়ে যাচ্ছে রুদ্ধ নিঃশ্বাসের বিপ্লব।

এদিকে আইরিশ বিভ্রান্ত,নাবহার কথায় স্পষ্ট যে সেও যানে না ফ্লোরেন্সার খবর। যেই খবর পাওয়ার জন্য এতোটা কষ্ট করে ঢুকেছে এই সেলে, সেই খবরটা তো এই মেয়ে জানেই না।চরমভাবে আশাহত হলো আইরিশ
।হতাশার সুর তুলে বললো,

“ফ্লোরেন্সার খবর সত্যিই যানো না তুমি?”

নাবহা মাথা নাড়ালো দু’দিকে, বোঝালো সে কিছুই জানে না।
আইরিশ দাঁড়ানোর প্রয়োজন মনে করলো না আর,চুপচাপ নির্বিকার চলে যেতে চাইলো নাবহাকে ফেলে রেখে।নাবহা ভড়কালো,আইরিশের পিছুহাঁটা দেখেই ভঙ্গুর হৃদয় কেঁদে উঠলো ফের,তিরতির করে কঁপলো ঠোঁট,ফুলে উঠলো নাকের ডগা,অসহায় কন্ঠে ডাকলো আইরিশকে,

“চলে যাচ্ছেন যে?আমাকে সাথে নেবেন না?এই অন্ধকারে থাকতে ভয় লাগছে আমার।”

আইরিশ থমকালো, তাকালো পিছনের দিকে,মেয়েটার জন্য বড্ড মায়া হলো তার,রাশভারি কন্ঠে শুধালো,

“সাথে যেতে চাইছো?আমাকে না চিনেই ভরসা করে ফেললে?”

“আমি চিনি না তো কি হয়েছে?আপনিই তো বললেন ফ্লোরেন্সা আপনাকে চিনে।”

অনু চটপট উত্তর দিতেই ভ্রু বাঁকালো আইরিশ।গম্ভীর ভরাট কন্ঠে বললো,

“আমিতো ফ্লোরেন্সার ঘাতকও হতে পারি।”

অনু চোখ তুলে তাকালো আইরিশের গাঢ় বাদামি রঙা চোখের দিকে,আইরিশের সুগঠিত পেশিগুলো ফ্রেমের মতো,শরীরের একেকটি বাঁক খাঁটি যোদ্ধার পদ্য,মুখাবয়ব নিখুঁত নিয়ন্ত্রিত,গম রঙা ত্বকে বেশ খাপ খেয়েছে।আইরিশের দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে অস্পষ্ট বিড়বিড়ালো নাবহা,

“আপনাকে দেখলে এমন মনে হয় না।”

আইরিশ নাবহার মুগ্ধ নয়ন জোড়ার দিকে তাকিয়ে বললো,

“আমি ঘাতক নই আমার চেহারায় নিশ্চয়ই লেখা নেই?”

আইরিশের এমন প্রশ্নে কিছুটা থতমত খেলো নাবহা,নাজুক দৃষ্টি নামিয়ে নিলো দ্রুত।

আইরিশ এগিয়ে গিয়ে ঝুকে বসলো মেঝেতে নিথর হয়ে পড়ে থাকা সৈন্যটির কাছে,ব্যস্ত হাত চালিয়ে খুঁজে বের করল চাবি,তারপর খুলে ফেললো সেলের তালা।

“চলো তাড়াতাড়ি।সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না আর।”

মুক্ত পাখির ডানা ঝাপটানোর নয় ছুটে এলো নাবহা,

“চলুন।”

আইরিশ আরেক নজর তাকাল নাবহার দিকে,তারপর রাসভারি কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

“হাত ধরতে অসুবিধা আছে?শক্ত করে ধরতে পারবে আমার হাত?”

আইরিশের এমন প্রশ্নে বিব্রত হয় নাবহা,ফ্যালফ্যাল করে তাকায় আইরিশের দিকে,আইরিশ বুঝতে পারে নাবহার অস্বস্তি, তাকে আস্বস্ত করার জন্য বলে,

“ভুল বুঝোনা মেয়ে,সামনের পথ বিদজ্জনক,তারজন্যই বলা।”

নাবহা ধীরে ধীরে নিজের হাতটা দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল আইরিশের হাত,মনে মনে আওড়ালো,

“আপনিই প্রথম যাকে প্রথম দেখায় হাত এবং মন দুটোই সঁপে দিলাম নির্দিধায়।”

নাবহার শুন্য চোখের গভীরে সদ্য জন্ম নেওয়া অনুভুতিগুলোর বোবা কথা পড়ার সময় পেলো না আইরিশ।সে কেবল নাবহার নরম হাতটা টেনে ধরে সামনে এগোতে শুরু করলো সতর্ক কদমে।

একপা দুপা অত:পর অনেকগুলো কদম ফেলে সিড়ির কাছে পৌছতেই অতর্কিত হামলা ধেয়ে এলো দুজনের দিকে।নাবহা ভয় পেয়ে খামচে ধরলো আইরিশের বুকের উপর পাঞ্জাবি।হনহন করে প্রায় অনেকগুলো সৈন্য ঘিরে ধরলো তাদের।জানালো পালানোর সব পথ বন্ধ। আইরিশ শিকারী চোখে তাকালো সৈন্যদের দিকে, একহাতে শক্ত করে বুকের ভেতর চেপে ধরলো নাবহার মাথাটা,গম্ভীর ভারি কন্ঠে বললো,

“ভয় পেয়ো না,ফ্লোরেন্সার পর তুমিই প্রথম যাকে আমি বুকে আশ্রয় দিয়েছি।কথা দিচ্ছি তোমার কিচ্ছু হতে দিবো না।”

____________

বাতাসের তান্ডব থেমে গিয়ে সূর্য উঠেছে কিছুক্ষণ হলো।অনেক জোড়াজুড়ি আর তর্ক বিতর্কের পর সত্য আর বীনা পাখিকে সাথে নিয়েই ম্যান্ডেট মহলের প্রবেশদ্বার পেরিয়ে ভেতরে পা রেখেছে নিস্পা।ভেতরে এক অন্য জগত। মেঝেতে শীতল মার্বেল,মাথার ওপর ঝুলছে বিশাল এক ঝাড়বাতি,কাঁচের টুকরোগুলোয় সূর্যের আলো লেগে রঙ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে,নিস্পা মাথা তুলে গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে আছে উপরের দিকে,মনে হচ্ছে এটি কোনো প্রাসাদ নয়, রূপকথার মঞ্চ।

দেয়ালজুড়ে গাঢ় রঙের মখমলের পর্দা। সেথায় ঝুলছে বড় বড় তৈলচিত্র,একটি তে প্রিন্স জোসেফের রুদ্রদীপ রুপ।আরেকটা তে লর্ড মাউন্ট আর আরেকটা তে রানী ক্যাথরিন।যদিও জোসেফ ছাড়া আর কাউকেই চিনতে পারে নি নিস্পা।তবুও চোখ ঘুরিয়ে বেশ ভালোভাবেই পরখ করলো ছবি গুলো কে।

চারপাশে এক ধরণের পুরোনো কাঠের সুবাস,মহলের প্রতিটি কোণে বুক ফুলিয়ে হাঁটছে সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার।প্রতিটি বস্তু ফিসিরফিসির করে বলছে”আমরা শাসক, আর তুমি শাসিত।”

সত্যের ছোট ছোট আঙুল গুলো চেপে ধরে নিস্পা ভেতরে প্রবেশ করা মাত্রই হনহনিয়ে ছুটে এলো একদল ব্রিটিশ সৈন্য।সবাই একযোগে চারদিক থেকে আটক করলো নিস্পাকে।কিছু মূহুর্তের জন্য ভয়ে সিটিয়ে গেলো নিস্পা,সত্য ভয়ে দু হাতে জাপ্টে ধরলো তাকে,বীনা পাখি নিস্পার কাঁধের উপর বসে থেকে দুবার ডাকলো পিউক পিউক।এমন ভয়ংকর কার্যকলাপ নিস্পার সাথে প্রথমবার হচ্ছে,তাই ভেতর থেকে নিজেকে প্রস্তুত করে নেওয়ার সময় দরকার ছিলো নিস্পার।কিন্তু নিজেকে প্রস্তুত করার পর্যাপ্ত সময় সুযোগ দেওয়া হলো না নিস্পাকে,তার আগেই একটি জোড়ালো থাপ্পড় অতর্কিত হামলে পড়লো তার গালের উপর।নিস্পা টাল সামলাতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়লো মেঝেতে,পিচলে গেলো সত্যকে ধরে রাখা হাতটা।সত্য ঘাবড়ে উঠে, হাত বাড়িয়ে অস্পষ্ট ডাকে,

“অলিক কন্যা।”

বীনা পাখি উড়ে এসে বসে সত্যের ঘাড়ের উপর, উচ্চস্বর তুলে ডাকতে থাকে অনেকবার।আচনক থাপ্পড়ের তোপে বেশ ব্যাথা পেয়েছে নিস্পা,পড়ে যাওয়ার দরুন হাতের কুনুইতে লেগেছে কিঞ্চিৎ। সেসবে তোয়াক্কা না করে গ্রীবা উঁচু করে তাকায় সামনের দিকে।

সামনে দাঁড়িয়ে আছে রানী ক্যাথরিন।তার পেছনেই ঝুলছে তার আদলে আঁকা তৈলচিত্রটি।নিস্পা মুগ্ধ হয়ে তাকালো দেয়ালের তৈলচিত্রের দিকে, তারপর তাকালো রানী ক্যাথরিনের দিকে,দুজন এক হলেও তার বাস্তব উপস্থিতির পাশে তৈলচিত্রের সৌন্দর্য ম্লান হয়ে আছে।নিস্পার মনে হচ্ছে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রানী ক্যাথরিন জীবন্ত কোনো চিত্রকর্ম, বা এক অতল সৌন্দর্যের মূর্ত প্রতীক।

নিস্পা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। রানী ক্যাথরিনের নাক, মুখ, চোখ, ঠোঁট সবকিছু নিখুঁত শিল্পীর তুলির আঁচড়ে রচিত এক অনবদ্য ক্যানভাস।

তার মুখাবয়ব জুড়ে বিদ্যমান রাজকীয় মাধুর্য,আর দাম্ভিকতা।চোখদুটি নিবিড় হেমন্ত সন্ধ্যা,যার নিভৃত তীক্ষ্ণ মনি জোড়ায় জ্বলজ্বল করছে কঠিন আত্মপ্রতিষ্ঠার ঔজ্জ্বল্য। আর ঠোঁট গুলো যেন রাজ্যের সমস্ত অভিজাত বাগানের প্রথম ফোটা গোলাপ।

নিস্পার ভাবনারে মাঝেই রানী ক্যাথরিন তেড়ে এলো তার দিকে,চেপে ধরলো তার চুলের গোছা,কর্কষ কন্ঠে বললো,

“প্রিন্স জোসেফকে কালো জাদু করেছিস মেয়ে?ওর বিয়ে ভেঙে দেওয়াটাই তোর উদ্দেশ্য ছিলো তাই না?”

নিস্পা ব্যাথায় কুঁকিয়ে উঠতেই ছটপটিয়ে উঠলো তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সত্য,ছোট্ট কোমল দুটো হাত দিয়ে চেপে ধরলো রানী ক্যাথরিনের হাত,কাঁদতে কাঁদতে বললো,

“অলিক কন্যাকে ছাড়ুন,ও ব্যাথা পাইতাছে।”

এক আঙুলের ছোট্ট বাচ্চার স্পর্ধা দেখে রেগে উঠলো রানী ক্যাথরিন,নিস্পার চুলের গোছা ছেড়ে দিয়ে সজোরে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো সত্যের গালে,আগুন কন্ঠে বললো,

“তোর এতো বড় সাহস ওই নোংরা হাত দিয়ে আমাকে স্পর্শ করিস?তোর ওই হাত আমি কেটেই ফেলবো।”

পরপরই দাসীদের উদ্দেশ্যে ছোড়ে আদেশ,

“দাসী সারিকা,দ্রুত ছুড়ি নিয়ে এসো, এই বেয়াদব ছেলের হাত কাটবো আমি।”

থাপ্পড়ের আঘাতে গাল ফেটে রক্ত বেড়িয়ে গিয়েছে সত্যের।নিস্পা হামাগুড়ি দিয়ে ছুটে এসে তুলে নিয়েছে সত্যকে,তারপর মাতৃমমতায় জড়িয়ে ধরেছে বুকের সাথে।সত্য ফোপাচ্ছে,ভয়ে সিটিয়ে ছোট ছোট আঙুল গুলো দিয়ে খামচে ধরেছে নিস্পার পোশাক,কম্পিত কন্ঠে ভয়ে ভয়ে আওড়াচ্ছে,

“অলিক কন্যা আমারে আমার আম্মির কাছে দিয়া আসো,এইখানে থাকলে ওরা আমার হাত কাঁইটা ফালাইবো,আমার হাত না থাকলে আমি খেলুম কি কইরা?বীনা পাখিকে খাওয়ামু কি কইরা?”

নিস্পার চোখে ক্রোধের দাবানাল,সত্যকে রেখে ফোসফাস করে তাকালো রানী ক্যাথরিনের দিকে,প্রতিবাদি কন্ঠে চেচিয়ে উঠলো,

“এই মহিলা আপনি মানুষ নাকি অমানুষ?আপনার মধ্যে মাতৃত্ববোধ নেই?এতটুকু বাচ্চা ছেলের গায়ে হাত তুলে, আবার ওর হাত কাটার কথা বলছেন কি করে?খবরদার বলে দিলাম,ওর গায়ে একটা আঁচর এলে আমি কিন্তু আপনার হাত কেটে রেখে দিবো।”

রানী ক্যাথরিন তাজ্জব।নিস্পার দুঃসাহসিকতায় একটু বেশিই অবাক হয়েছেন তিনি।যে মেয়ে এতোদিন তার অত্যাচার নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করেছে,একটা টু শব্দ অব্দি করেনি, সেই মেয়ের কন্ঠে এমন প্রতিবাদী সুর বড়ই বেমানান।

নিস্পার দুঃসাহসিকতায় অবাক হওয়ার পাশাপাশি মাত্রাতিরিক্ত ফুসে উঠলো রানী ক্যাথরিন,গোখরা সাপের ন্যায় তেড়ে এসে আরেকটি থাপ্পড় ছুড়ে দিলো নিস্পার গালের দিকে,তবে এবার আর সুযোগ দিলো না নিস্পা,প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে মুচড়ে ধরলো ক্যাথরিনের কোমল হাত,

“বাবার রাজকন্যা নই আমি।ছোট থেকে পরিশ্রম করে বড় হয়েছি, এই হাতটা আপনার হাতের মতো কোমল নয়,খেটে খাওয়া ইস্পাতের ন্যায় শক্ত হাত এটা,আপনার কোমল হাত জাস্ট তুড়ি মেরে ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।”

“এইইই মেয়ে,চুপপ!সামান্য দাসী হয়ে রানী ক্যাথরিনের সাথে উঁচু গলায় কথা বলার সাহস কি করে হয় তোর? জ্বিভ কেঁটে টুকরো টুকরো করে দিবো।”

“এ্যইই চুপ।রানী হয়ে কি মাথায় চেপে বসেছেন নাকি?যা ইচ্ছে করে যাবেন আর চুপ থাকবো, কে তৈরি করেছে এই নিয়ম?”

“এই নিয়ম প্রিন্স জোসেফের তৈরি।”

রাশভারী পুরুষালি কন্ঠস্বরের সাথে প্রিন্স জোসেফের শক্ত হাত পেছন থেকে ধেয়ে এসে চেপে ধরেছে নিস্পার হাত।কি এক অনবদ্য মূহুর্ত, নিস্পা ধরে আছে রানী ক্যাথরিনের হাত,আর জোসেফ ধরে আছে নিস্পার হাত।

প্রিন্স জোসেফের দৃষ্টি জুড়ে প্রস্ফুটিত অশুভ আগ্রাসন, ধ্বংসের মতো উদ্যত হয়ে দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে পুনরায় বললো,

“আমার আম্মাজানের গায়ে হাত তোলার ভুল কি করে করলে তুমি?জানের মায়া নেই নাকি?”

কিঞ্চিৎ ভড়কালো নিস্পা,পর মুহূর্তেই শুস্ক কন্ঠতালু ভেদ করে বললো,

“এই মহিলা আপনার মা?আমার তো মনে হচ্ছিলো বাংলা সিনেমার দজ্জাল শাশুড়ী রীনা খানের সেকেন্ড ভার্সন।”

হিমালয়ের ন্যায় অটল মানব হিংস্র দানবের ন্যায় হিসহিসিয়ে উঠলো তৎক্ষনাত,

“আমার আম্মাজানকে সম্মান করি আমি,তাকে অপমান করার স্পর্ধায় মরবে তুমি এখন।”

জোসেফের মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরনে ছড়িয়ে পড়লো তীব্র ক্রোধ,দৃষ্টি জুড়ে দাবানলের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ,যেন সে আগুনেই ভস্ম করে দিবে নিস্পাকে।আচানক একটি চাবুক উঠিয়ে নিয়ে জোড়ালো আঘাত করলো নিস্পার পিঠে।ঘটনার আকস্মিকতায় জোড়ালো ধ্বনীতে চিৎকার করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো নিস্পা।

নিস্পার কন্ঠের তীব্র আর্তনাদেও সামান্যটুকুও টললো না প্রিন্স জোসেফের অন্তর। দক্ষ হাতে ছুড়ে দিলো আরেকটি চাবুকের আঘাত,কিন্তু তার আগেই প্রতিহত করলো নিস্পা,শক্ত হাতে পেচিয়ে ধরলো চাবুক,হিংস্র বাঘিনীর ন্যায় ফুসে উঠে বললো,

“এতো অবলা কেন ভাবছেন আমায়?আমি ফ্লোরেন্সা নই যে আপনার নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করে নিবো।আমি নিস্পাপ শিকদার, ইস্পাতের ন্যায় দৃঢ়,আঘাতের প্রতিঘাত করতে খুব ভালো করে যানি।”

জোসেফ তোয়াক্কা করলো না,হেচকা ঝাড়া দিয়ে ছাড়িয়ে নিলো চাবুক,ভারি কন্ঠে বললো,

“সেল্ফ কনফিডেন্স।আই হেট ইট।ডিচেফশেন আই অলসো হেইট ইট।য”

জোসেফ নিজের হাতের চাবুকটা ছুড়ে দিলো একজন সৈন্যের দিকে,ভরাট কন্ঠে আদেশ করলো ,

“যতক্ষণ না শরীরের মাংস ফেটে রক্ত বের হচ্ছে ততক্ষণ যেন চাবুক মারা বন্ধ না হয়।”

প্রিন্স জোসেফের নির্দয় আদেশে রুহ কেঁপে উঠল নিস্পার,চওড়া কন্ঠে চেচিয়ে বললো,

“ব্রিটিশের বাচ্চা এভাবে চাবুক মারলে মরে যাবো আমি।”

জোসেফের মুখের অভিব্যক্তি শক্ত,তুরন্ত প্রতিত্তোর করলো,

“মহলের পোষা কুকুরগুলো ক্ষুদার্থ, ভোজনের ব্যাবস্থা হয়ে যাবে।”

“শালা ব্রিটিশের বাচ্চা তোর মুখে ঠাডা পড়ুক।”

নিস্পা গলা ফাটিয়ে চেচিয়ে উঠলো ফের।

রাগে প্রিন্স জোসেফের চোয়াল শক্ত হলো,অতিরিক্ত রাগে ফর্সা কপালের রগ নীল হয়ে ফুলে উঠলো,ক্ষ্যাপাটে বাঘের মতো গর্জে উঠলো,

“চাবুকে হবে না। ব্লেড চালাও,ওর শরীরে শেষ রক্ত টুকুও যেন অবশিষ্ট না থাকে।”

নিস্পা এতেও দমে না, বরং দ্বিগুন তেজ সঞ্চার করে ফুসে উঠে,

“শালা সাপের বাচ্চা এতো বড় মহলে দুধ কলার অভাব পড়েছে নাকি?আমার রক্তের পেছনে পড়েছিস কোন দুঃখে? অভিশাপ ছাড়া ভালোবাসার যোগ্য নস তুই।”

প্রিন্স জোসেফ যেতে নিয়েও তেড়ে এলো নিস্পার দিকে,লাইটারের সাহায্যে ধরালো একটি সিগারেট, ঝুকে গিয়ে জ্বলন্ত সিগারেট টা নিস্পার উদরের দিকে এগিয়ে নিলো খুব দ্রুত,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,

“শোন নীল রক্তের মেয়ে তোমার শরীরে ক্ষত করতে শান্তি পাই আমি,আমাকে ভালোবাসা শেখাতে এসো না।তোমার ভালোবাসার প্রয়োজন পড়বে না আমার।”

সিগারেটের জ্বলজ্বলে উল্কা স্পর্শ করতে পারলো না নিস্পার উদর,তার আগেই অকুতোভয় যোদ্ধার ন্যায় জ্বলন্ত সিগারেট হাত দিয়ে চেপে ধরলো নিস্পা,গোখরা সাপের ন্যায় ফুসে উঠে বললো,

“কেমন বাবা মা জন্ম দিয়েছে আপনাকে?প্রসেসিং এর সময় তো মনে হচ্ছে বিসমিল্লাহ টুকুও বলে নি।”

নিস্পার গাল চেপে ধরে হিসহিসিয়ে উঠলো জোসেফ, পৈশাচিক কন্ঠে বললো,

“ক্রমশ তোমার নীল রক্তের বিষ প্রান করার ইচ্ছে কব্জা করেছে আমার পৈশাচিক মস্তিষ্ক।সাবধান!আমাকে রাগীও না।আমি শয়তান,অন্ধকার জগতের শয়তান।”

নিস্পা এবারে প্রত্যুত্তর করে সমান ভাবে,

“আসুন না একবার রক্ত খেতে, অন্ধকারে এমন থুথু খাওয়াবো লজ্জায় আপনার শয়তান লুঙ্গি মাথায় তুলে দৌড় দিবে।”

প্রিন্স জোসেফ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার বৃথা চেষ্টা চালায়,চাপা স্বরে গজগজ করতে করতে বলে,

“তোমার মনে হচ্ছে না তুমি একটু বেশিই কথা বলে ফেলছো?”

গাল চেপে ধরে থাকার দরুন নিস্পার ঠোঁট গোল,সে কেবল কটমট করে তাকালো প্রিন্স জোসেফের দিকে, কৌতুক কন্ঠে বললো,

“সবই আপনার কুদরত,বোন মনে করে ট্রেনিং গুলো আপনিই দিয়েছেন।”

চলবে,,,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here