#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:42
অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘর।তবে সেদিনের মতো ফ্লোরেন্সার মুখে কাপড় বাধা নেই আজ।কোমল হাত দুটো বাধা চেয়ারের সাথে, রাগীনি নয়ন জোড়া আগুনের মতো জ্বলছে,ঝুপঝুপ করে পড়ছে চোখের পানি।
তার সামনে বসে থাকা মানুষ টা যে এতো বড় একজন ঘাতক প্রমাণিত হবে সে কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে ফ্লোরেন্সার।
কাল পেছন থেকে কেউ একজন মাথায় আঘাত করেছিলো তার।তারপর? তারপর আর কিছু মনে নেই।জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে আবিষ্কার করে এই অন্ধকার বন্ধ ঘরের চারদেয়ালে।তবে সে যে ব্রিটিশ মহলে নেই সে কথা বুঝতে পেরেছিলো তৎক্ষনাৎ।পুরো শরীরে পঁচে যাওয়া সবজির গন্ধ, হয়তো পঁচে যাওয়া সবজির বস্তার সাথে লুকিয়েই মহল থেকে বেড় করে আনা হয়েছে তাকে।
আইরিশের খুব ভালো বন্ধু আশিক।ছোট থেকে একসাথে ব্যাবসার কাজ শুরু করে, এখন প্রায় সফল দুজনেই।মাঝে মধ্যে আইরিশের সাথে বাড়ির সামনে আসতো, তবে আইরিশ কখনোই তাকে বাড়ির ভেতরে আনে নি,হয়তো ফ্লোরেন্সার প্রতি আশিকের দূর্বলতা টের পেয়েই এমনটা করতো।
কিন্তু ফ্লোরেন্সা তো এসবের কিছুই জানতো না, তার সহজ সরল নাজুক মনে সে কখনোই এসব ভাবনার স্থান দেয় নি।কাচারি পড়তে যাওয়ার সময় মাঝে মধ্যে যদিও আশিকের সাথে দেখা হয়ে যেতো তবে মাথার ঘোমটা টা লম্বা করে টেনে সালাম দিতো সম্মানের সহিত,আশিককে সর্বদাই বড় ভাইয়ের চোখে দেখে এসেছে ফ্লোরেন্সা।তাই আজ ভাই সমতুল্য আশিকের এমন বিশ্বাসঘাতকতা মেনে নিতে পারলো না কিছুতেই,
“আশিক ভাই,আপনি আমাকে আটকে রেখেছেন আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।”
আশিকের অভিব্যক্তি গুরুগম্ভীর, খুব সাধারণ ভাবে উত্তর দিলো,
“আমি তোমাকে ভালোবাসি সেকথা বিশ্বাস হচ্ছে তো ফ্লোরেন্সা?”
ফ্লোরেন্সা ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠলো,বিনয়ী কন্ঠে বললো,
“আমাকে ছেড়ে দিন আশিক ভাই।মুক্তি দিন আমাকে।”
আশিকের প্রতিক্রিয়া বোঝা মুশকিল,চোখমুখ ঠান্ডা,শীতল,
“আমি যানি তুমি আমাকে ভালোবাসবে না ফ্লোরেন্সা।”
ফ্লোরেন্সার দৃষ্টি নমিত,সে কেবল আহত কন্ঠে বললো,
“আমি এই মূহুর্তে দাঁড়িয়ে একটা কথা খুব বেশি উপলব্ধি করছি,,,কথাটুকু শেষ করার আগেই ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো ফ্লোরেন্সা,তারপর নাক টেনে বললো,
“আইরিশ ভাইকে প্রত্যাখ্যান করা জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো আমার।যদি আমি দ্বিতীয় কোন সুযোগ পাই তবে আইরিশ ভাইকে আবার চাইবো।”
আশিকের এবারেও ভাবান্তর হলো না,তবে তার দৃষ্টিতে ধরা দিলো ক্রোধের ছাপ,
“তোমাকে দ্বিতীয়বার কোন সুযোগ দিতে নারাজ আমি।”
আশিকের এমন কথায় ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো ফ্লোরেন্সা,অনুরোধের সুর তুলে বললো,
“দয়া করুন,দয়া করুন আশিক ভাই।দয়া করে ছেড়ে দিন আমায়,অন্তত একটু শান্তিতে বাঁচার সুযোগ দিন।”
“তুমি আমার কাছে থেকে যাও ফ্লোরেন্সা।আমি তোমায় শান্তিতে বাঁচিয়ে রাখবো।পৃথিবীর সব সুখ এনে দিবো তোমার অট্টালিকায়।”
“আপনি কেন বুঝতে চাইছেন না আশিক ভাই?ভালোবাসার মানুষ ছাড়া সুখে থাকা অসম্ভব।পৃথিবীর সব সুখ সেই সুখের কাছে ফিকে হয়ে যায়।”
উপহাস করে হাসলো আশিক,স্পষ্ট গলায় ছুড়লো প্রশ্ন,
“আগে কেন বুঝোনি একথা?দিব্বি তো চলে গিয়েছিলে ভিনদেশী ব্রিটিশ প্রিন্সের হাত ধরে,এতই যখন ভালোবাসা বুঝেছিলে তখন কেন থেকে গেলে না ওই আইরিশের হয়ে?”
ফ্লোরেন্সা অপারগ স্বরে স্বীকারোক্তি দিলো,
“ভুল করেছি,জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছি আমি।সম্মোহিত ছিলাম,ওই ব্রিটিশ প্রিন্স আমার চোখের উপর সম্মোহনের প্রলেপ মেখে অন্ধ করে রেখেছিলো আমায়।আমি ভুল করে পা দিয়েছি ওই জালিম প্রিন্সের ছলনার জালে।”
ফ্লোরেন্সার আপাদমস্তক পরখ করে আশিক ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
“ভুলকে যখন চিহ্নিত করেছ তখন এটাও জেনে নেওয়া উচিত কিছু ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হয় না।”
“কিন্তু আমি করতে চাই,প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই নিজের ভুলের।আইরিশ ভাইয়ের দুটো পায়ে পড়ে ভিক্ষা চাই স্বইচ্ছায় ফেলে আসা সেই ভালোবাসা।”
ফ্লোরেন্সার কন্ঠে উত্তেজনা, অথচ আশিক এবারেও নির্বিকার,
“এতো বোকা কেন তুমি মেয়ে?তুমি কি জানো না ভালোবাসা ফেলে দিলে তা অন্য পাত্রে দান করে দেওয়া হয়।”
“আমি জানি এমন কোন কাজ আইরিশ ভাই করবে না, উনি জেনেশুনে আমি বিহীন ভালোবাসবে না অন্য কাউকে।নাতো আমার জন্য জমিয়ে রাখা ভালোবাসা দান করবে অন্য পাত্রে।”
ফ্লোরেন্সার কন্ঠে বিরোধ, নিজের ভাবাবেগ সংবরণ করে আশিক সাবলীল কন্ঠে বললো,
“বুঝে শুনে বলছো তো?আবার নিজের ভালোবাসা পাওয়ার লোভে স্বার্থপর হয়ে যেয়ো না মেয়ে।”
“আপনি আমাকে মুক্তি দিন, আমি আপনাকে দেখিয়ে দিবো স্বার্থপর না হয়েও ভালোবাসা যায়।আমি নিশ্চিত আইরিশ ভাই আমার অপেক্ষায় আছে।”
“আর সুফি?তার কি হবে?সে যে তোমার অবর্তমানে ঘর বাধার স্বপ্ন দেখছে?তার কি দোষ বলো?সে তো তোমাকে নিজের বোন মনে করেছে,অথচ আইরিশকে নিজের করে পাওয়ার প্রতিযোগিতায় সে শুধু তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে গেলো এখন।”
আশিকের কথা শুনে ফ্লোরেন্সার গলা শুকিয়ে এলো, নিঃশ্বাসটা আটকে গেল বুকের গভীর প্রদেশে। ঝাপসা চোখের পাতায় ভেসে উঠলো অতীতের পঙ্ক্তিমালা,সুফির সাথে কাটানো সেই নির্ভার দিনগুলো। হাতে হাত রেখে দৌড়ে পালানো, হিজলগাছের ডালে দড়ি বেঁধে দোলনা খাওয়ার মুহুর্তে, মোটা দড়ির সাইসাই বাতাসের সাথে ভাসতে থাকা তার আর সুফির রিনিঝিনি হাসির শব্দ, আর?আর আইরিশ ভাইয়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে চুপিচুপি পালানোর মুহূর্ত গুলো মরচে ধরা সুনসান বিকেলের মতো কর্কশ কষ্টময় হয়ে এসে কাঁচি চালালো ফ্লোরেন্সার হৃদয়ের অতল গহ্বরে।তারপর? তারপর সুফির কান্নাভেজা কন্ঠে উচ্চারিত শেষ বাক্য,
“আমার আর আইরিশ ভাইকে পাওয়া হলো নারে, ফ্লোরেন্সা।”
ব্যাস!এটুকু মনে পড়তেই ফ্লোরেন্সা স্তব্দ হয়ে গেলো।চোখের পানি ঝড়ছে অথচ শব্দ হচ্ছে না।ভবিতব্য মেনে নিলো সে,জড়বস্তুর মতো চোখের পানি বিসর্জন দিলো কিছুক্ষণ।তারপর তেঁতো স্বাদের তরল গিলে নিয়ে, বিষন্ন কন্ঠে আওড়াল,
“ভালো থাক সুফি।আইরিশ ভাইকে ভালো রাখ।আমি তোর নামে আমার ভালোবাসা কুরবানী করে দিলাম।”
______
ব্রিটিশ মহলের বিচার সভায় টানটান উত্তেজনা এখন।ব্রিটিশ সৈন্যরা আইরিশকে বাজেয়াপ্ত করে উপস্থিত হওয়ার সাথে সাথেই কলহ সৃষ্টি হয়েছে পুরো সভায়।অথচ আইরিশের মুখ অবিচল, চোখে তীব্র অগ্নি,ঠোঁটে অস্পষ্ট হাসি, সেই হাসিতে উপহাস নয় মিশে আছে ফ্লোরেন্সার শুভ্র মুখশ্রী একনজর দেখতে পাওয়ার উল্লাস।
নাবহাকে ধরে আনা মাত্রই নাবহা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো নিস্পাকে,দুই হাতে নিস্পাকে শক্ত করে ধরে রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“কেন পালালে পরি বোন?আমাকে কেন সাথে নিলে না তোমার?তুমি জানো ওরা আমাকে অন্ধকার কুঠরীতে আটকে রেখেছিলো, তুমি ফিরে না এলে তোমাকে সাহায্য করার অপরাধে ভয়ংকর শাস্তি পেতে হতো আমার।”
নিস্পা স্তব্ধ।একের পর এক ধাক্কা, একের পর এক অপরিচিত মুখ শব্দহীন, শূন্যতায় ডুবে থাকা এক নির্বাক পাথরে পরিনত করেছে তাকে।
চেনা-অচেনার সীমারেখা মিলিয়ে যাচ্ছে, বুকের ভেতর তৈরি হওয়া হাজারটা প্রশ্নের সমারোহে,ভেতরের আত্মাটা বারকে বার সচেতন করছে, ‘সব অচেনা, সব অপরিচিত,সাবধান, নিস্পা, সাবধান।’
নিস্পা কেবল হা হয়ে তাকিয়ে আছে আইরিশের দিকে।লোকটা আহত,চোখ দুটো কেমন তার দিকেই নিবেদিত,লোকটার রক্তমাখা, বিবর্ণ, মুখটা এক অপার আকর্ষণে আবিষ্ট করতে চাইছে তাকে। কিছু কি বলতে চাইছে?লোকটাকি চেনে তাকে?
নাম না জানা হাজারটা প্রশ্ন কণ্ঠনালী শুখিয়ে দিলো নিস্পার।লোকটাকে সে চেনে?এই দৃষ্টিপাত কেন এতো চেনা মনে হচ্ছে তার?কেন মনে হচ্ছে ওই নিবেদিত চোখের ছুড়ে দেওয়া অব্যক্ত আর্তিতে কেবল তারই নাম জপছে লোকটা।
নিস্পার অনুভুতিহীন শুন্য নেত্রদ্বয় ধনুকের মতো নিবদ্ধ আইরিশের উপর, সে ধিরে ধিরে দু কদম এগিয়ে গেলো আইরিশের দিকে,বিধ্বস্ত, প্ররিস্রান্ত লোকটার মুখোমুখি দাঁড়াতেই ঠোঁট কাপিয়ে আকুল কন্ঠে ডেকে উঠলো আইরিশ,
” আলেকজান্দ্রা।”
নিস্পা নির্বাক, নিস্পল।বিস্ময়ে হা হয়ে গিয়েছে তার দুই ঠোঁট।অপ্রত্যাশিত শীতল বাক্যস্রোতে কেঁপে উঠলো তার কণ্ঠনালী,অস্পষ্ট বিরবির করে আওড়াল,
“এমপি মশাই।”
“বাহ!নিজের প্রেমকে বাঁচানোর জন্য জনাব আইরিশ খাঁন শেষে কিনা নিজের জানের মায়া ভুলে গেলো?স্বইচ্ছায় প্রবেশ করলো বাঘের গুহায়।”
প্রিন্স জোসেফের কথায় বেশ অবাক হলো নিস্পা,আরেকটু ভালো করে তাকালো সৈন্যদের হাতে ধরাশায়ী অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা আইরিশের দিকে।কি নিস্প্রভ নিখুঁত চাহনি,যেখানে স্বচ্ছ কাঁচের মতোই দেখা যাচ্ছে ভালোবাসার গভীরতা।নিস্পার এক মূহুর্তের জন্য দেখতে ইচ্ছে হলো ফ্লোরেন্সাকে,কত ভাগ্যবতী সেই মেয়ে,এমন একজন পুরুষ নিজের জানের মায়া ভুলে কেমন তাকে উদ্ধার করতে চলে এলো।
“আমি আলেকজান্দ্রাকে নিজের জানের চেয়েও বেশি ভালোবাসি এ বিষয়ে আপনার সন্দেহ নেই নিশ্চয়ই।”
আইরিশের শক্ত ধারালো কন্ঠ তীরের ফলার ন্যায় ধেয়ে এলো নিস্পার কানে,বিস্ময়ে হা হয়ে গেলো তার পুরু ঠোঁট।
নাবহা মেয়েটা চট করেই ছেড়ে দিলো নিস্পাকে,অদৃশ্য কারণেই ধিরে ধিরে আলগা হয়ে গেলো তার হাত।তার চোখে অসহায়ত্ব,বেদনার রূঢ়তা দলিতমথিত করলো তার বুকে জন্ম নেওয়া সুপ্ত অনুভুতিকে,সে এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলো নিস্পার মুখের দিকে,বিরবির করে আওড়াল,
“সৌন্দর্যই সব।সবাই সুন্দরের পূজারী।”
নিস্পা নিরব দর্শক,ব্রিটিশ মহলের নাটকীয় মঞ্চে তার ঠিক কোন রোল প্লে করা উচিত সে বুঝে উঠতে অক্ষম।
প্রিন্স জোসেফের হাত মুষ্টিবদ্ধ,সে রুক্ষ স্বরে ছুড়ে দিলো শীতল বাক্যস্রোত,
“শীশা ফোটাও,ফুটন্ত গলিত শীশা ঢালা হবে এই অধমের কণ্ঠনালীতে।”
জোসেফের আদেশ কর্ণগোচর হতেই বিস্ফোরিত নয়নে ঘুরে তাকালো নিস্পা,চেচিয়ে বললো,
“মানুষ আপনি?কি মনে করেন নিজেকে ?এতো জঘন্য শাস্তি কি করে নির্ধারন করতে পারেন আপনি?”
“আমি নিজেকে শয়তান মনে করি।শয়তান যা ইচ্ছে তাই করতে পারে।”
জোসেফের শক্ত জবাবে তেঁতে উঠলো নিস্পা,কর্কষ কন্ঠে বললো,
“শয়তানের বাচ্চা নীম গাছের ডাল দিয়ে সব শয়তানি বের করে দিবো বলে দিলাম।উনাকে মুক্ত করে দিন,আপনার যা শত্রুতা আমার সাথে।”
প্রিন্স জোসেফ গোখরা সাপের ন্যায় তেড়ে এলো,আচানক চেপে ধরলো নিস্পার দুই গাল,ক্ষেপা সিংহের ন্যায় ফুসে উঠে বললো,
“তার মানে তুমি বলতে চাইছো ওর প্রাণের বিনিময়ে তুমি নিজের প্রাণ সপে দিতে প্রস্তুত?”
নিস্পা শুখনো ঢোক গিললো, আবার তাকালো আইরিশের দিকে,আইরিশ যে এমপি তাওসিফ তাকরিম এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই নিস্পার।কিন্তু ভবিষ্যৎ আর অতীতের গড়মিল আলাদা।মানুষ গুলো এক হলেও তাদের দুই সময়ের জীবন দুইরকম,চরিত্র দুইরকম।
সামান্যতম পরিচয়ে কারো জন্য নিজের জীবন সপে দেওয়ার মতো বোকামি করতে নারাজ নিস্পা।তাই চট করেই কোন সীদ্ধান্তে আসতে পারলো না।তবে তাকে কয়েক গুন অবাক করে দিয়ে প্রিন্স জোসেফের পায়ের উপর আচরে এসে পড়লো নাবহা,কাঁদতে কাঁদতে বললো,
“প্রস্তুত, আমি প্রস্তুত।উনাকে ছেড়ে দিন প্রিন্স,আমি নিজের জীবন সপে দিতে প্রস্তুত।”
আইরিশ তাজ্জব।কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে তাকালো নাবহার দিকে,মেয়েটার সাথে পরিচয় খুব বেশি হয় নি, বড়জোর দুঘন্টা কি তিন ঘন্টার পরিচয়।এরমধ্যে তার জীবনের বিনিময়ে নিজের জীবনকে সপে দিতে চাওয়া নিতান্তই পাগলামি মনে হলো আইরিশের।
প্রিন্স জোসেফ নির্বাক।চিরাচরিত থমথমে তার অভিব্যক্তি।নাবহার এমন কাজে বেশ অবাক হয়েছে সে নিজেও।পাথরের মতো ভারি পা জোড়া নাড়িয়ে দয়ামায়াহীন সরিয়ে দিলো নাবহাকে,প্রখর কন্ঠে বললো,
“আপনাকে বাঁচানোর মানুষ দেখছি অভাব নেই জনাব।আপনাকে মারার চেয়ে তড়পানোয় বেশি মজা পাবো।”
আইরিশের কন্ঠ ব্লেডের মতো ধারালো,ভয়ডরহীন উত্তর দিলো,
“ভালো মানুষের ভালোবাসার মানুষ অভাব হয় না জনাব।আমাকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই,আমি মৃত্যুকে স্বীকার করেই পা রেখেছি আপনার মহলে।”
প্রিন্স জোসেফের কন্ঠ শক্ত,নিস্পাকে ছেড়ে দিয়ে মুখোমুখি হয়ে দাড়ালো আইরিশের,অবজ্ঞার স্বরে বললো,
“ভালোবাসা মাই ফুট।তোমরা বাঙালী এতো বোকা কেন?কবে বুঝবে ভালোবাসা কেবল মরীচিকা, বাস্তবতা তো হলো স্বার্থ, মানুষ কেবল নিজের প্রয়োজনেই বাঁচে।”
প্রিন্স জোসেফের কথায় বিরোধিতা জানালো আইরিশ,জোসেফের নীল নেত্র দ্বয়ের গভীরে চোখে চোখ রেখে বললো,
“আপনি নির্দয় স্বার্থপর রাজা,আপনার কাছে ভালোবাসার অর্থ এর চেয়ে ব্যাপক হওয়ার কথা নয়।যদি কখনো সত্যিকারের ভালোবাসা জীবনে ভুল করে এসে যায় তখন হয়তো বুঝবেন এই শব্দের মর্ম।”
প্রিন্স জোসেফ তাচ্ছিল্য হাসলো,উপহাস করে বললো,
“আপনার চোখে যেটা ভালোবাসা, আমার চোখে সেটা কৌশল। খেলার নিয়ম না জানলে হারতে হয় যখন তখন।”
এপর্যায়ে ধৈর্য হারালো রানী ক্যাথরিন।প্রায় বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরেও যখন প্রিন্স জোসেফের নিকট থেকে উপযুক্ত কোন শাস্তি ঘোষিত হলো না,ঠিক তখনি তাদের তর্ক বিতর্কে বাগড়া দিয়ে চেচিয়ে উঠলেন তিনি,
“আর কতক্ষণ এই নাটক চলমান থাকবে জানতে পারি আমি?এই মহলে এই প্রথম কোন দাসী পালানোর সাহস করেছে এবং তার শাস্তি ঘোষণা করতে এতো বেশি বিলম্ব হচ্ছে।এখনতো প্রিন্স জোসেফের বিচার ব্যাবস্থা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করতে বাধ্য হচ্ছি আমি।”
কক্ষের মধ্যে পিনপতন নীরবতা।প্রিন্স জোসেফ এগিয়ে এলো স্ব শব্দে,নিস্পা বুঝে উঠার আগেই ব্যাগ্র থাবায় ফের চেপে ধরলো ওর গ্রিবা দেশ। নিঃশ্বাসের বিঘ্নতায় ছটপটিয়ে উঠলো নিস্পার হৃদযন্ত্র,এক মুঠো বিশুদ্ধ বাতাসের তাড়নায় মুখ হা করে শ্বাস টানলো নিস্পা,চাতক পাখির ন্যায় কাতর কন্ঠে বললো,
“ছাড়ুন,প্লিজ ছাড়ুন আমায়।লাগছে।”
নিস্পার ছটপটানি সহ্য করতে পারলো না আইরিশ,যন্ত্রণায় হৃদয়টা এফোড় ওফোড় হয়ে শুরু হলো রক্তক্ষরণ, চোখ বন্ধ করে গলা ফাটিয়ে চেচিয়ে উঠলো,
“ওকে ছেড়ে দে জানোয়ার।আর একটা টোকাও দিস না ওর শরীরে।”
শ্বাসপ্রশ্বাসের বিঘ্নতায় চোখ বড় বড় হয়ে গিয়েছে নিস্পার,ব্যাথার নীল ছাপ স্পষ্টত হয়েছে মুখাবয়বে।অথচ তার দৃষ্টিজুড়ে বিস্ময়,সে চোখ বাঁকিয়ে কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো আইরিশের দিকে।
আইরিশ থামলো না,নিজের বন্দী দু’হাত ছাড়ানোর চেষ্টায় হৃদয় ফাঁটা চিৎকার করলো ফের,
“আলোকে ছেড়ে দে প্রিন্স,বিনিময়ে আমার জানটা নিয়ে নে।ও কষ্ট পাচ্ছে, ওর নিঃশ্বাস টা আটকে আসছে,আমার বুকের পাজর ভেঙে যাচ্ছে, সহ্য করতে পারছি না আমার আলেকজান্দ্রার এমন পরিনতি।”
প্রিন্স জোসেফ শয়তানি হাসলো,আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরলো নিস্পার গ্রিবা,ভ্রুকুটি তুলে তাকালো নিস্পার ব্যাথাতুর অক্ষিকোটরে,অশুভ কন্ঠে আওড়াল,
“বেচারা ভিষণ ভালোবাসে তোমাকে।”
পরপরই চ সূচক শব্দ করে বললো,
“ভালোবাসার শাস্তি ভালোবাসাই হয় মেয়ে।”
প্রিন্স জোসেফের কথার মানে বুঝতে পারলো না নিস্পা,রক্তিম চোখে তাকিয়ে প্রত্যুত্তর করতে চাইলো হিসহিসিয়ে,
“আমাদের ভবিষ্যৎ আলাদা হতে চলেছে ত্রি,,,,,,
বাক্যটুকু শেষ করলো না নিস্পা।শুখনো ঢোক গিলে তাকালো আইরিশের দিকে,জ্বলজ্বলে দৃষ্টি জুড়ে আক্ষেপের দাবানল।খুস্ক অধর নাড়িয়ে আওড়াল,
” প্রকৃত ভালোবাসা চিনতে ভুল হয়েছে আমার,নিয়তি আরও একবার প্রমাণ করে দিলো।”
আইরিশ অসহায়,উন্মাদ প্রেমিকের মতো বসে পড়লো হাঁটুভেঙে,ভিক্ষা চাইলো ফের,
“ফ্লোরেন্সাকে মুক্তি দিয়ে দিন প্রিন্স।আমি কথা দিচ্ছি এই আইরিশ খাঁন আজীবন আপনার গোলামী করবো বিনা সর্তে।”
আইরিশের এমন অসহায়ত্ব মেনে নিতে পারলো না নিস্পা,কন্ঠ চওড়া করে বললো,
“কি করছেন কি আপনি?মাথা কেন নোয়াচ্ছেন অন্যায়ের অবিচারের সামনে?আজীবন গোলামী এমনিতেও কারো করতে হবে না, কারণ খুব শীঘ্রই ব্রিটিশ শাসকরা দেশ ছেড়ে অন্যত্র পালাতে চলেছে।”
রানী ক্যাথরিনের কান ঝাজিয়ে উঠলো এপর্যায়ে,হাঁক ছুড়লো ক্রোধিত কন্ঠে,
“তুমি কি কানে তুলো গুঁজে রেখেছ প্রিন্স?নাকি ব্রিটিশ সম্পর্কে এমন অপমানজনক কথায় আনন্দিত হচ্ছো তুমি?”
প্রিন্স জোসেফের মুখাবয়ব নিস্পন্দ,অভিব্যক্তিহীন, সম সাময়িকভাবে থেমে গেছে সমস্ত অনুভূতির প্রবাহ। তার দৃষ্টিতে স্থির বিস্ময়,চেনা রমণীর চিরপরিচিত মুখের অদ্ভুত নতুন রূপ তাকে মুগ্ধ করেছে,সংশয়ে ফেলেছে নিজের স্বত্ত্বাকে।
রমণীর স্পষ্ট নির্ভীক কণ্ঠস্বর বজ্রধ্বনির ন্যায় ভয়ংকর।দীপ্তিমান চোখে নাচছে তার সাহসের উন্মত্ত শিখা,যে শিখায় জ্বলজ্বল করছে ধ্বংসের বার্তা।কেন যেন মনে হচ্ছে, ধ্বংস অনিবার্য, অনিবার্য এই নারীসত্তার অমোঘ অভিশাপে।মনে হচ্ছে, এই দৃষ্টি যদি দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয়, তবে ভস্ম হবে তার সিংহাসন সহ পুরো সাম্রাজ্য।
প্রিন্স জোসেফ স্থির দৃষ্টিতে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে নিস্পার দিকে,আবদ্ধ হয়েছে অতীন্দ্রিয় শক্তির মোহে।অথচ ঘটিয়মান দৃশ্য সহ্য করতে পারলো না রানী ক্যাথরিন, নাতো সহ্য করতে পারলো জোসেফের এমন নিরবতা।তার ভেতরে আগুন জ্বলে উঠলো। কঠিন হয়ে এলো তার চোয়াল, দাঁতে দাঁত চাপলো ক্ষোভে,ভেতরের ঈর্ষা আর ক্রোধ ছড়িয়ে পড়লো স্নায়ুর প্রতিটি প্রান্তে,তৎক্ষনাৎ রুদ্র কন্ঠে বললো,
“সামান্য এক দাসীর চোখে নিজেকে হারিয়ে নিজের রক্তের অবমাননা করো না প্রিন্স।তোমার মায়ের মতো নিজেকে কুলাঙ্গার প্রমাণ করো না।বলতে বাধ্য হচ্ছি, তুমি তোমার মায়ের মতোই নিচু মানসিকতার।
রাজবংশের রক্তের গৌরব তুমি ওই দাসীর চোখে হারিয়ে ফেলছো ক্রমশ।”
অদৃশ্য কারণে মুষ্টিবদ্ধ হলো প্রিন্স জোসেফের হাতের আঙুলগুলো, তার ঠোঁটের কোণে কাঁপুনি, চোখে জমা বিদ্রোহের আগুন। সে কথা বলল না, চুপচাপ নিস্তব্ধতার মাঝেই গর্জে উঠল তার অভিমানী আত্মা। নিজের মাকে নিয়ে করা তীব্র আঘাতে ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে এলো।মনে পড়ে গেলো তার মায়ের করা ছলনার কথা,সেই প্রতারণার প্রতিচ্ছবি।
যে নারীর চোখে সে মুহূর্তখানি আগে মোহাচ্ছন্ন হয়েছিল অজান্তে, সেই নারীর মূল্য তার রাজত্বের চোখে “সামান্য দাসী” এ কথা স্মরন করতেই বিস্ফোরিত হলো মস্তিষ্ক,তরবারীর ন্যায় ধারালো কন্ঠে উচ্চারণ করলো কয়েকটি অবিচ্ছিন্ন শব্দ,
“আপনি ব্যাতিত আমার কোন মা নেই রানী ক্যাথরিন।তাই দয়া করে কোন নিচু জাতের মহিলার কথা আমার সামনে উচ্চারণ করবেন না।আমি প্রিন্স, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্থপতি আমার হাতেই পৌছাবে দূর দূরান্ত,সামান্য দাসীর জন্য নিজের রক্তের গৌরব হারিয়ে ফেলার মানুষ আমি নই।”
এক নিঃশ্বাসে কথাটুকু শেষ করে নিস্পার দিকে তাকালো প্রিন্স জোসেফ। নিস্পার চোখ দু’টি তখন অনলনির্গত অগ্নিস্রোত,কঠিন অবরুদ্ধ।যে চোখ এক লামহায় কাবু করে নেওয়ার শক্তি রাখে প্রিন্স জোসেফের অশুভ আগ্রাসনকে।এক মূহুর্তের জন্য প্রকম্পিত হলো প্রিন্স জোসেফের নিটোল চিবুক,ঢোক গিলে শুস্ক কন্ঠে বললো কঠিন বাক্য,
“দাসী আপনার, শাস্তি নির্ধারন করার দায়িত্ব আপনার।আপনিই ঠিক করুন আপনার খাস দাসীকে কি শাস্তি দিবেন।”
প্রিন্স জোসেফের সহজ স্বীকারোক্তিতে প্রসন্ন হাসলো রানী ক্যাথরিন,দাম্ভিক কন্ঠে বললো,
“আমি এই দাসীর শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ড চাই জোসেফ।”
নিস্পা চুপ।কিছু বলার নেই তার।সে ভিন্ন সময়ে এসেছে এটা ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।সময় তাকে কেন এখানে এনে ফেলেছে, এই প্রশ্নের উত্তর বোধহয় পেয়ে গিয়েছে সে,ভেতরের নাজুক আত্মাটা চেচিয়ে বলছে,
“ভালোবাসা চিনে নে নিস্পা।ভবিষ্যৎ পাল্টে দে নিপুণ কৌশলে।”
আইরিশ আহত,নাকের ছিদ্রপথ থেকে রক্ত পরছে টুপটাপ।অশ্রুসিক্ত ভেজা চোখ টিমটিম মোমবাতির ন্যায় খুলে আছে কোনরকম,বুকের ভেতর দমফাটা আনন্দ।সহজ সরল, ভীতু মেয়েটার চোখে আজ অন্য রকম দীপ্তি।ভয়ের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখা মেয়েটা আজ রুখে দাঁড়িয়েছে বিস্ফোরিত দেবীর মতো।ভীতু চোখে ঝলসে উঠেছে বজ্রের দীপ্তি। কাঁপা কণ্ঠস্বরের জায়গায় কথা বলছে নির্ভীক নিরবতা।এই রূপ, এই রুদ্রতাই তো সে খুঁজেছিল ,এই নতুন ফ্লোরেন্সার প্রতীক্ষাতেই তো ছিলো এতোদিন।
প্রিন্স জোসেফ বিভ্রান্ত,সীদ্ধান্ত গ্রহণে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে তার।ভেতর ভেতর হীনমন্যতায় ভুগছে মস্তিষ্ক।রানী ক্যাথরিন অপেক্ষা করছে তার রায় শোনার,কিন্তু সে মৃত্যু দন্ড দিতে নারাজ,ফ্লোরেন্সাকে বাঁচিয়ে রেখেই ধুকে ধুকে মারার এক জঘন্য পরিকল্পনা আঁটলো মনে মনে।
“মৃত্যু দন্ড কখনো শাস্তি হতে পারে না আম্মাজান।মৃত্যুদন্ড হলো শাস্তি থেকে বাঁচার কৌশল।আমি এই মেয়েকে এতো সহজে বাঁচতে দিবো না।”
রানী ক্যাথরিন কপাল কুচকালো, সন্দেহ প্রকাশ করে বললো,
“তাহলে? তাহলে কি করতে বলছো তুমি?এই মেয়ের যথাযোগ্য শাস্তি কি দিতে চাও তুমি?”
“দাসত্ব,আজীবনের জন্য এই মেয়ে গোলামী করবে আপনার।তার চোখের সামনে রেখে যন্ত্রণা দিয়ে মারা হবে তার প্রেমিককে, সে শেষ হবে, নিঃশেষ হবে ভেতর থেকে,সে মরতে চাইবে,নিজ থেকে মৃত্যুদন্ড চাইবে,অত:পর পূর্ণ হবে তার শাস্তি।”
“তার মানে তুমি এই গুপ্ত ঘাতককেও মৃত্যুদন্ড দেবে না?বন্দী করবে না টর্চার সেলে?এই ছেলেটাও ঘুরে বেড়াবে এই মহলের মুক্ত বাতাসে?”
“হ্যাঁ আম্মাজান।জনাব আইরিশের সাথে আমার পুরোনো কিছু হিসেব নিকেশ আছে,ওনার বাড়িতে যথেষ্ট আথিতেয়তা পেয়েছি আমি,ঠিক সেরুপ আথিতেয়তা তো ওনারও পাপ্য।”
___________
বিচারের রায় ঘোষণার পরপরই নির্দিষ্ট কক্ষে দিয়ে যাওয়া হয়েছে নিস্পা আর নাবহাকে।নিস্পার অবস্থা মর্মান্তিক। তখন চাবুকের আঘাতে পিঠের চামড়া ছিলে গিয়েছে হয়তো, অসহ্যকর যন্ত্রণা হচ্ছে কখন থেকে।
নাবহা হয়তো বুঝতে পেরেছে নিস্পার দাঁত চাপা আর্তনাদ।তাইতো বাটিতে করে ভেষজ ঔষধ নিয়ে সেই কখন এসে বসেছে নিস্পার শিয়রে।
“কিছু বলবে?”
“হু?” নড়েচড়ে উঠলো নাবহা।
নিস্পা একটু অপ্রস্তুত ভঙিতে আবার জিজ্ঞেস করলো,
“না মানে হাতে ঔষধ নিয়ে এসে সেই কখন থেকে তাকিয়ে আছো যে তাই ভাবলাম কিছু বলবে।”
“বলবো? হ্যাঁ অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করছে।” অস্ফুটে বললো নাবহা।
নিস্পা মুচকি হাসলো, নিজের ডান হাতটা নিয়ে রাখলো নাবহার হাতের উপর,আদুরে কন্ঠে বললো,
“কি বলবে বলতে পারো।”
“না আসলে এতো সাহস কীভাবে এলো তোমার মাঝে?তখন কেমন করে তর্ক করছিলে,তাও স্বয়ং প্রিন্সের সাথে।আমার তো হাত পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিলো।”
নিস্পা ঠোঁট টিপে কিছু একটা ভাবলো , তারপর চুপ করে থেকে বললো,
“কেন?আগে সাহসী ছিলাম না বুঝি?”
“আজকের মতো দুঃসাহস তো কস্মিনকালেও দেখি নি তোমার।জালিম প্রিন্স কম অত্যাচার তো করেনি তোমায়,সবই তো মুখ বুজে সহ্য করেছিলে।”
“সবসময় তো মানুষ সহ্য করে থাকতে পারে না বোন।কখনো কখনো দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে ঘুরে দাড়াতে হয়,প্রতিবাদ করতে হয়।নয়তো সারাজীবন পচে মরতে হবে এই মহলে।”
“তুমি খুব তাড়াতাড়ি মুক্তি পাবে দেখো।”
“কীভাবে বুঝলে?”
“এতো কিছু হওয়ার পরেও প্রিন্স জোসেফ তোমার মৃত্যুদন্ড মওকুফ করেছেন যা এর আগে কখনো হয় নি।”
“তাতে কি?ওই দজ্জাল রানীর হাতে তো হস্তান্তর করেছে।না জানি কি কি শাস্তি ভেবে রেখেছে ওই খাটাশ মহিলা।”
নিস্পার কথা শুনে পিক করে হেসে দিলো নাবহা,মুখে হাত চেপে বললো,
“তোমার কথা শুনতে এতো ভালো লাগছে কেন বলোতো পরি বোন?মন চাইছে সমস্ত কাজ ফেলে রেখে তোমার সাথে কথা বলি।”
“ভালো লাগছে?কেন?আমার কথা আগে ভালো লাগত না বুঝি?”
“না আসলে ঠিক তা নয়,তখন তো তুমি সারাদিন কাঁদতে,অতো বেশি কথা বলতে কই।”
নিস্পা চতুর।কথার মারপ্যাঁচে ফ্লোরেন্সার ব্যাপারে খুটিনাটি সবকিছু জেনে নেওয়ার পায়তাড়া চালাচ্ছে সে।যদিও তেমন বিশেষ কিছু জানতে পারে নি তবে এইটুকু নিশ্চিত ফ্লোরেন্সা মেয়েটা সরল আর ভীতু ছিলো যার কারণে প্রিন্স জোসেফ আর রানী ক্যাথরিন ওর উপর নির্যাতন চালাতো দিনের পর দিন।কিন্তু ভীতু মেয়েটা পালালো কি করে?যার প্রতিবাদ করার সাহস হয় নি, সে পালানোর সাহস কি করে পেলো?
ফ্লোরেন্সার অবর্তমানে তাকে ফ্লোরেন্সা ভাবা হচ্ছে, তাহলে ফ্লোরেন্সা কোথায়?মেয়েটা কি এখনো খবর পায় নি তার মতো দেখতে কোন বহুরুপী মহলে প্রবেশ করেছে? নাকি বিপদে পড়েছে মেয়েটা?কোন কঠিন বিপদে?
“কি গো পরি বোন?কথা বলছো না যে?”
নাবহার ডাকে ভাবনার সুতো ছিড়ে বেরিয়ে এলো নিস্পা,অস্ফুটে বললো,
“হু?আচ্ছা শুনো, ওই যে ওই লোকটা, তখন যে আমাকে আলেকজান্দ্রা বলে ডেকেছিলো,,,,,
” হ্যাঁ, হ্যাঁ, তোমার চাচাতো ভাইয়ের কথা বলছো? ”
নাবহার কন্ঠে আগ্রহ,তবে চুপ করে গেলো নিস্পা,মনে মনে আওড়ালো, “তার মানে এমপি মশাই ফ্লোরেন্সার কাজিন।”
“কিগো?কি বলবে?বলছো না যে?”
নাবহার কৌতুহলি কন্ঠে নড়েচড়ে বসলো নিস্পা,তারপর শুখনো ঢোক গলদঃকরন করে বললো,
“উনাকে একটু ঔষধ লাগিয়ে আসবে?তখন দেখেছিলাম নাক থেকে রক্ত বেড়োচ্ছিলো।”
আইরিশের কাছে যাওয়ার কথা শুনতেই ধ্বক করে উঠলো নাবহার বুক। থমকে গেল নিঃশ্বাস, কেঁপে উঠলো অন্তর্দেশ। শরীরের প্রতিটি শিরায় শিরায় ভয় আর বিস্ময় নামক অজানা শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়লো রক্তস্রোতের মতো। মনে ভেসে উঠলো আইরিশের সেই নির্ভিক চোখজোড়া, দৃঢ় চোয়ালের কঠিন রেখা।প্রকম্পিত কণ্ঠে সে কেবল আওড়াল,
“তুমি না বললেও আমি যেতাম,
নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আমার দুর্বলতা জন্মগত।”
____________
দুপুর মধ্যাহ্ন।ভোর কয়টায় ঘুম থেকে উঠেছে জানা নেই নিস্পার।সময় দেখার সুযোগ পায় নি এপর্যন্ত।ঘুম ভাঙার আগেই কয়েকজন দাসী অগত্যাই হাত পা চেপে তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছে রানী ক্যাথরিনের কক্ষে।
সেই থেকেই নির্বাক বোবা গাঁধার মতো একটার পর একটা কাজ করেই যাচ্ছে তো করেই যাচ্ছে।রানী ক্যাথরিনের জামা কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে যাবতীয় সকল কাজ এক প্রকার গলায় ছুড়ি ধরে করিয়ে নিচ্ছে তাকে দিয়ে।
নিস্পা বুদ্ধি মতি। কাজের সুযোগে মহলের প্রায় অনেক যায়গায় জাওয়ার সুবিধা লুপে নিয়েছে কৌশলে।ফাঁক পেয়ে হন্যে হয়ে খুঁজেছে ফ্লোরেন্সাকে।নাহ!কোথাও মেয়েটার চিহ্ন অব্দি নেই,কোথায় গেলো মেয়েটা?নাকি ফ্লোরেন্সারও টাইম ট্রাবল হয়েছে,তার মতো ফ্লোরেন্সাও চলে গিয়েছে ভবিষ্যতে।আচ্ছা এমনটা তো হতেই পারে, নিস্পা ফ্লোরেন্সার জায়গায় আর ফ্লোরেন্সা নিস্পার জায়গায় চলে যায় নি তো?কথাগুলো ভাবতে ভাবতে হাতের উপর চাপ অনুভব করলো নিস্পা,অতিরিক্ত ব্যাথায় চোখ খিচে দ্রুত সরাতে চাইলো হাত,কিন্তু নাহ!সহসাই সরাতে পারলো না,তার কোমল হাতটা পিষে আছে কারো পায়ের নিচে।নিস্পা প্রচন্ড রাগে তাকালো পায়ের মালিকের দিকে,চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রানী ক্যাথরিনের বিশ্বস্ত দাসী শারিকা।এই মেয়েটাই সকাল থেকে মাথা চিবিয়ে খাচ্ছে নিস্পার,আর চুপ থাকা সম্ভব নয়,এর একটা ব্যাবস্থা করতে হবে দ্রুত।
নিস্পা হাত ঝাড়ি মেরে সরিয়ে নিলো দাসী শারিকার পা,তিরিক্ষি কন্ঠে বললো,
“এই বজ্জাত মেয়ে,আমার হাতের উপর পা রাখার সাহস পেলি কোথায় তুই?”
শারিকার কন্ঠে অহংকার,
“সাহস তো স্বয়ং রানী ক্যাথরিনের কাছ থেকে পেয়েছি।কিন্তু আমাকে তুই বলার সাহস তুই কোথায় পেলি?”
নিস্পা ভ্রুকুটি তুলে প্রতুত্তর করলো দ্রুত,
“আরেহ বাহ!সাহসের চাপে তো দেখছি নিজের পরিচয়ই ভুলে বসে আছেন আপনি।তা মাননীয় দাসী শারিকা,আপনাকে অনুগ্রহ করে মনে করিয়ে দিতে চাই, আপনি নিজেও একজন সামান্য দাসী।”
শারিকা অপমান বোধ করলো কিঞ্চিৎ, নিস্পার কথাগুলোর বিরোধিতা জানিয়ে তুললো হাত,নিস্পাকে মারতে উদ্যোত হতেই পেছন থেকে ডেকে বসলো একজন প্রহরী,
“দাসী শারিকা।”
শারিকা দমে যায়।শুখনো ঢোক গিলে নামিয়ে নেয় হাত,জ্বলন্ত দৃষ্টিতে একবার নিস্পার দিকে তাকিয়ে ঘুরে দাড়ায় প্রহরীর দিকে,
“কি বলবে বলো?”
প্রহরীর হাতে রাজকীয় পোশাক,শারিকার প্রশ্নের জবাবে বললো,
“রিকার্ডো মহলে অনুপস্থিত।জরুরি কাজে গঞ্জে পাঠানো হয়েছে।প্রিন্সের পোশাক কার মাধ্যমে পাঠাবো?”
দাসী শারিকা ভ্রু উঁচালো,ঠোঁট জুড়ে খেলে গেলো শয়তানি হাসি,নিস্পাকে দেখিয়ে ছোট্ট করে বললো,
“ওর হাতে দেও।ও নিয়ে যাবে।”
প্রহরী তাকালো নিস্পার দিকে,দ্বিধাদ্বন্দ্বিত কন্ঠে বলতে চাইলো,
“কিন্তু,,,,,
” কোন কিন্তু নয়।” প্রহরীকে থামিয়ে দিয়ে শারিকা নিস্পার দিকে তাকালো,আদেশের সুরে বললো,
“এই মেয়ে এক্ষুনি প্রিন্স জোসেফের স্নানাগারে পোশাক দিয়ে এসো।”
নিস্পা নড়লো না, খুটির মতো দাঁড়িয়ে থেকে বললো,
“অন্য কোন কাজ দেও আমায়৷ ওই শয়তান প্রিন্সের মুখোমুখি হতে চাই না আমি।”
নিস্পার কথায় ধমকে উঠলো শারিকা,
“এ্যই চুপ।দাসী দাসীর মতো থাকবি,যে কাজ করতে দেওয়া হয়েছে সেটাই করতে হবে নয়তো রানী ক্যাথরিন কে দিয়ে ভয়াবহ শাস্তির ব্যাবস্থা করবো।”
নিস্পা তাচ্ছিল্য হাসলো, ব্যাঙ্গার্থক কন্ঠে উত্তর দিলো,
“তোর বালের হুমকি আমার একটা চুলও বাঁকা করতে পারবে না।”
কথাটা বলেই প্রহরীর হাত থেকে পোশাকের ঝুড়ি টা নিয়ে নিলো নিস্পা,ক্রোধিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“স্নানাগার কোন দিকে?”
প্রহরী উত্তর দেওয়ার আগেই, শারিকা উত্তর দিলো,
“হাতের বা দিকে গিয়ে, সোজা নাক বরাবর।”
নিস্পা আর দাড়ালো না হনহনিয়ে এগিয়ে গেলো সেদিকে,যাওয়ার সময় ধুপধাপ পা ফেলে বলে গেলো,
“যাচ্ছি বলে ভাবিস না তোকে ভয় পেয়েছি।আমি নিস্পা উদ্দেশ্য ছাড়া কোন কাজ করিনা।”
যদিও নিস্পার এরুপ কথার মানে বুঝতে পারে নি শারিকা,তবে খুব একটা মাথা ঘামালো না।প্রহরীকে সাবধান করার উদ্দেশ্যে বললো,
“দাসী ফ্লোরেন্সাকে আমিই যে প্রিন্স জোসেফের স্নানাগারে পাঠিয়েছি এই কথা যেন কেউ না জানতে পারে,এটা রানী ক্যাথরিনের হুকুম।মনে থাকবে?”
প্রহরী মাথা উপর নিচ করে সম্মতি জানিয়ে বললো,
“মনে থাকবে। ”
___________
অলীক রাজ্যের জাদুময় জলমন্দিরের মতো প্রিন্স জোসেফের স্নানাগার।মিশরের নকশা খঁচিত ভারী সেগুন কাঠের বিশালাকৃতির দরজার ওই পাশে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ,এক নিঃশব্দ রাজ্য, যেখানে প্রবেশাধিকার শুধুমাত্র জোসেফের একান্ত সেবকদের। মহলের সাধারণ দাসীরা সেই সীমার এক বিন্দুও অতিক্রম করতে পারে না।
অথচ নিজের অজান্তেই সেই নিষিদ্ধ সীমা লঙ্ঘন করে স্নানাগারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে নিস্পা। স্নানাগারের ভেতরে ঢুকে পুরোপুরি হা হয়ে গিয়েছে সে,সাদা পাথর কেটে বানানো অনন্ত স্বচ্ছ জলধারা,তার একপাশে ধাতব নকশার ফোয়ারা থেকে পড়তে থাকা টলটলে উষ্ণজল , নদীর জলের মতো ছলাৎ ছলাৎ শব্দ করা বিমোহিত সুর নিস্পাকে আকর্ষণ করে।নিস্পা বিমোহিত নয়নে এগিয়ে যায় সেদিকটায়,ধীরেসুস্থে হাতে ধরে রাখা পোশাকের ঝুড়ি টা একটা টেবিলের উপর রেখে বসে পড়ে জলধারার কাছে।
পাশেই কিছু কলসি সাজিয়ে রাখা, নিস্পা উঁকি দিয়ে দেখলো সেগুলোর ভেতর,কলসিতে সুগন্ধি তেল, গোলাপজল, চন্দনবাটা ও জাফরানের মিশ্রণ সহ নানা রকম প্রসাধনী রাখা।কলসির ভেতরে এক ঝলক নজর বুলিয়ে ভেংচি কাটলো নিস্পা, মনে মনে বললো,
“সাদা চামড়ার ডুগডুগি এতো প্রসাদনি মেখে সাদা হয়েছে,শালা মেয়েদের থেকেও এক কদম এগিয়ে।”
নিস্পার ঠিক মাথার উপর ছাদ থেকে ঝুলছে হালকা সবুজাভ স্ফটিকের তৈরি ঝাড়বাতি, যার সবুজ আলো এসে চিকচিক করছে ফোয়ারার জল।নিস্পা আনমনেই নিজের পা বাড়িয়ে দিলো, লম্বা ফ্রক টা একটু উঁচুতে তুলে নিজের ফর্সা কোমল পা জোড়া ডুবিয়ে দিলো পানিতে।
ঠিক তক্ষুনি পেছন থেকে ভেসে এলো ঝমঝমিয়ে পানি পড়ার শব্দ,নিস্পা তুরন্ত লাফিয়ে উঠলো ,ভেজা পা টিপেটিপে এগিয়ে গেলো সামনের দিকে।একটা পাতলা সাদা পর্দার আড়ালে দেখা যাচ্ছে কারো অস্পষ্ট অবয়ব।নিস্পা ধিরে ধিরে হাতটা এগিয়ে নিয়ে সরালো সাদা পর্দাটা,মাথাটা বাড়িয়ে উঁকি দিলো ভেতরের দিকে,ঠিক তক্ষুনি একটা দানবীয় হাত চেপে ধরলো তার গ্রিবা দেশ,অকস্মাৎ আক্রমণে অপ্রস্তুত নিস্পা ঠোঁট কামড়ে বন্ধ করে নেয় চোখ,কানের কাছে শুনতে পায় এক অগ্নিশর্মা রুক্ষস্বর,
“এখানে কি করে এলে তুমি?আমার স্নানাগারে দাসীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ একথা জেনে নিশ্চয়ই এসেছ তাইনা?”
প্রিন্স জোসেফের হুংকারে ভড়কালো নিস্পা,তরাগ করে তাকালো জোসেফের দিকে।ঠোঁট কামড়ে ধরেই মনে মনে ভাবলো,
“ওই শারিকা পারিকার বাচ্চা আমাকে ইচ্ছে করে জেনেশুনে এখানে পাঠিয়েছে।শাক চুন্নি কোথাকার তোর মাথায় বান্দরে পায়খানা করুক।”
জোসেফের পরনে সাদা রেশমি তোয়ালে,সম্পূর্ণ শরীর উন্মুক্ত,উন্মুক্ত শরীর জুড়ে লেপ্টে আছে চন্দনের প্রলেপ, যার মাতোয়ারা সুগন্ধে খেই ধরে রাখা মুশকিল।টান টান ফর্সা ত্বক আর প্রসস্ত সমান্তরাল বক্ষ কি নিখুঁত পরিকল্পনায় নির্মমভাবে আকর্ষণ করছে নিস্পার মনযোগ।
নিস্পা শুখনো ঢোক গিলে, এক হাত সামান্য উঁচু করে স্পর্শ করতে চায় প্রিন্স জোসেফের অ্যাডাম’স আপেল।পরপরই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে থেমে যায়, গুটিয়ে নিতে চায় বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা।ঠিক সে মূহুর্তেই জোসেফ খপ করে মুঠোবন্দি করো নিস্পার কোমল হাত,সন্দিহান কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে,
“আমার স্নানাগারে উঁকি দেওয়ার সাহস কোথায় পেলে তুমি?কোন উদ্দেশ্যে এসেছো এখানে?”
নিস্পা চোখ খিচে বন্ধ করে হাত মোচড়াতে মোচড়াতে অপ্রস্তুত কন্ঠে চেচিয়ে উত্তর দেয়,
“একদম ভুল বুঝবেন না।বড়ভাই মনে করে একটু উঁকি দিয়েছি,ব্যাস এইটুকুই। তাই বলে আপনার ওসব কেঁচো মেচো দেখার কোন উদ্দেশ্য নেই আমার।”
প্রিন্স জোসেফ কপাল কুচকায়,আলগা করে মুঠো,ভ্রুকুটি তুলে জিজ্ঞেস করে,
“কেঁচো মেচো? মানে?কি সেটা?”
নিস্পা আমতা আমতা করে এদিক সেদিক চায়,ঘনঘন ঢোক গিলে প্রতুত্তর করে চটপট,
“কেঁচো?কেঁচো মানে হলো লাল জোঁকের সমুন্ধি।প্রজাতি এক,সাইজে ডিফ্রেন্ট।”
“খুব ভালো ইংরেজি জানো তুমি,কোথায় শিখেছ?”
“বাকি সবাই যেখানে শিখেছে সেখানেই শিখেছি।”
জোসেফের প্রশ্নের উত্তরে এর চেয়ে ভালো কোন যুতসই উত্তর মাথায় এলো না নিস্পার।তবে এমন উত্তরে প্রসন্ন হতে পারলো না জোসেফ,পুনরায় প্রশ্ন করলো,
“এদেশে শিক্ষিত কোন নারী আছে বলে তো মনে হচ্ছে না।একমাত্র তুমিই যে কিনা শিক্ষিতের পাশাপাশি ইংরেজিতেও দক্ষ।কি করে সম্ভব?”
“সম্ভব। ইচ্ছাশক্তি থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।”
“এতো অদ্ভুত কেন তুমি?শরীরের বাঁকে বাঁকে এতো ছলনা কেন তোমার?”
“আমি আগেও বলেছি এখনও বলছি, ছলনা আমার ধারায় নেই।আমাকে ছলনাময়ী প্রমান করার বৃথা চেষ্টা করে সময় নষ্ট করবেন না।”
প্রিন্স জোসেফ রুষ্ঠ হলো,ক্রোধে শক্ত হলো চিবুক,নিস্পাকে ছুড়ে ফেলার ন্যায় ধাক্কা দিয়ে বললো,
“এখানে দাঁড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট করো না মেয়ে,প্রিন্স জোসেফের স্নানাগারে ঢোকার অপরাধে আমি কিন্তু তোমার শিরশ্ছেদ করতে পারি।”
জোসেফের শক্ত থাবার কবল থেকে নিস্তার পেয়ে বুকে হাত রেখে হাপালো নিস্পা,ঘনঘন নিঃশ্বাস টেনে বললো,
“নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আমার ঝোক আর আমার প্রতি আপনার দূর্বলতা দুটোই ধ্বংস বয়ে আনতে চলেছে প্রিন্স।আমি আশা করিনি আপনার দূর্বলতা ধরে ফেলবো এতো দ্রুত।”
প্রিন্স জোসেফ শীতল হাত রাখলো তার উন্মুক্ত বক্ষে,হৃৎপিন্ডটা লাফাচ্ছে,ক্রমাগত শোনা যাচ্ছে তবলা বাজানোর মতো ধুকধুক শব্দ,এক ছন্দে, এক সুরে, এক উন্মাদনা নিয়ে কেউ গান ধরেছে,
“পেহেলি পেহেলি বার মোহাব্বত কি হ্যায়,
কুছ না সমঝ মে আয়ে মে কেয়া কারু।”
ইশকনে মেরি এছে হালত কি হ্যায়,
কুছ না সমঝ মে আয়ে মে কেয়া কারু।”
চলবে,,,,,,,

