#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:46
“আ,,আপনি?”
অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো রহস্যময় কন্ঠ,
“কোন সন্দেহ?”
সুফির বুক লাফাচ্ছে,অন্ধকার আর বিস্ময় গ্রাস করে নিতে চাইছে তার কন্ঠতালু,সে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
“আমার বিশ্বাস হচ্ছে না আপনি খুন করতে পারেন।”
অপরপ্রান্ত থেকে পুনরায় ভেসে এলো চাপা শক্ত কন্ঠ,
“তোমার বিশ্বাসের দায়িত্ব নিয়ে রাখি নি আমি।”
কান্নায় চেপে আসছে সুফির বুক,সে ঘন ঘন ঢোক গিলে বললো,
“কিন্তু ফ্লোরেন্সা আপনাকে বিশ্বাস করে।”
“ফ্লোরেন্সা তো আমাকে ভালোও বাসে।”
“জেনেও কীভাবে ওকে ধোকা দিতে পারলেন?”
অপরপ্রান্তের ব্যাক্তির ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি,সে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললো,
“ধোকা দেওয়াই তো আমার কাজ। শয়তান তো মানুষকে ধোকা দিয়েই আনন্দ পায়।”
সুফির কন্ঠ নিভে আসে,সে কোনরকম ঢোক গিলে বলে,
“ওর পুরো পরিবার আপনাকে এতো ভালোবাসে তাও?কি শত্রুতা ওদের সাথে?”
অপরপ্রান্তের ব্যাক্তি তার রক্তে ভেজা হাতটা ছুইয়ে দিলো সুফির গালে,তারপর রহস্যময় কন্ঠে বললো,
“শত্রুতা আমার নয় তোমার। আমি তো কেবল তোমাকে সাহায্য করছি।ধরে নেও তোমার প্রতিশোধের অস্ত্র আমি।”
সুফি কেঁপে উঠে,আতংকে শুকিয়ে যায় তারঅ গলবিল,কন্ঠতালু শুকনো কাঠে পরিনত হয়েছে,ঠোঁট গুলো কাঁপছে তীব্র গতিতে,
“কি,,কি,, বলতে চাইছেন আপনি?আমার সাথে ফ্লোরেন্সা বা ফ্লোরেন্সার পরিবারের কোন শত্রুতা নেই।”
“নেই?সত্যিই নে তো নাকি লুকিয়ে যাচ্ছো?”
সুফির বুকের কম্পন বাড়লো আরেকটু,সে গায়ের ওড়না টা খামচে ধরে চাপা স্বরে বললো,
“না,না। কিচ্ছু লুকাচ্ছি না, কিচ্ছু লুকাচ্ছি না আমি।”
বিপরীত প্রান্তের ব্যাক্তি এবারেও কিঞ্চিৎ হাসলো।কোন কথা না বাড়িয়ে সোজা চলে গেলো আশিকের মাথাকাটা শরীর টার কাছে,তারপর একটা রশি আশিকের পায়ে বাধতে বাধতে বললো,
“তোমাকে দেখলে আমার বড্ড আফসোস হয় সুফি।আজ ফ্লোরেন্সার জায়গায় তুমি থাকতে।ফ্লোরেন্সার মতো তুমিও হতে সবার আদরের মেয়ে।হয়তো তখন আইরিশ তোমাকেই ভালোবাসতো।”
সুফি চমকে তাকালো বিহ্বলিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি এটাও,,,,
সম্পূর্ণ করার প্রয়োজন পড়লো না, তার আগেই অজ্ঞাত সেই ব্যাক্তি উত্তর দিলো,
” জানি,সব জানি আমি।”
“জানেন?আমার ব্যাপারে আর কি জানেন?”
“এইযে তুমি ফ্লোরেন্সার সতেলা বোন।এক বাপের রক্ত বইছে তোমাদের দুজনের শরীরে।আব্দুল লতিফ খান আর ফাতেমার মেয়ে তুমি।”
বিস্ময়ে কোটর ফাটার উপক্রম সুফির,হিহ্বলতার তোপে টান টান হয়ে উঠেছে কপালের শিরা গুলো,
“এতোকিছু?এতোকিছু কি করে জানলেন আপনি?”
অজ্ঞাত ব্যাক্তি সুফির দিকে তাকিয়ে ফের মুচকি হাসলো,কন্ঠে রহস্য ধরে রেখে বললো,
“কারণ আমি তোমার ভালো চাই সুফি।”
সুফি আতংক গিলে প্রশ্ন করলো,
“কে আপনি?”
অজ্ঞাত ব্যাক্তি আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলো তাদের থেকে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ঠেলাগাড়ীর দিকে,ভয়ংকর কন্ঠে বললো,
“ওই লাশগুলোর খুনি আমি।”
ঠেলাগাড়িতে স্তরে স্তরে সাজানো লাশ,প্রত্যেকের মাথা কাটা।প্রায় বিশটি লাশ তো হবেই,একসঙ্গে এতোগুলো লাশ দেখে ভিমরি খায় সুফি,ভয় আতংক গ্রাস করে নেয় তার পুরো শরীর, অসার পা দুটো ভেঙে আসে,চোখ দুটো নিভে যায়,কণ্ঠনালী হয়ে যায় বোবা,চিৎকার করতে চেয়েও বের হয় না শব্দ।অচল শরীর নিস্তেজ হয়ে লুটিয়ে পড়ে বটগাছের মোটা শেকড়ের উপর।
________
বাকের গঞ্জে বিক্ষোভ।লাশ পাওয়া গিয়েছে, একটা দুটো না,গুনে গুনে পনেরো টি লাশ পাওয়া গিয়েছে সেই অভিশপ্ত বটতলায়।রক্ত আর মৃত্যুর গন্ধে সৃষ্টি হয়েছে দমবন্ধকর পরিবেশ। চারপাশে ভিড় জমিয়েছে এলাকাবাসী।এই খুন গুলো এখন আর অলৌকিক মনে হচ্ছে না তাদের কাছে,মনে হচ্ছে কেউ ষড়যন্ত্র করে স্বইচ্ছায় এই খুনগুলো করে যাচ্ছে একের পর এক।আর সেই কেউটা যে ব্রিটিশ প্রিন্স সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই বিন্দু মাত্র।
লাশগুলোর একটা বন্ধবস্ত করে গঞ্জের সবাই বসেছে আলোচনায়।সেই আলোচনায় উপস্থিত আছে ফ্লোরেন্সার ছয় ভাইও।সবার মধ্যেই এখন আতংক,আরও একটি নতুন রাত যদি অভিশাপ হয়, কেড়ে নিয়ে যায় আরো কতগুলো প্রাণ তাহলে তো এই গঞ্জ নিশ্চিহ্ন হওয়া থেকে কেউ আটকাতে পারবে না।
ফ্লোরেন্সা চলে যাওয়ার পর ফ্লোরেন্সার বাবা মেয়ের শোকে হয়েছে শয্যাশয়ি।তাই তার অনুপস্থিতিতে গঞ্জের ভালোমন্দ দেখার দায়িত্ব পড়েছে ফুলমতির শশুর মানে ফ্লোরেন্সার বড় ভাইয়ের উপর।সকালে এতোগুলো লাশ দেখার পর উচ্চমাত্রায় রক্তচাপ বেড়েছে তার,দুশ্চিন্তায় ঘামছেন দরদরিয়ে,গঞ্জ বাসির দিকে দৃষ্টিপাত করে জানালেন নিজের মতামত,
“আমি নিশ্চিত ওই ব্রিটিশ প্রিন্স ছাড়া এই কাজ আর কেউ করতে পারে না।ওই ব্রিটিশরাই রাতের আধারে একের পর এক গনহত্যা চালাচ্ছে।”
তার কথায় বাগড়া দিয়ে ইমরান বলে উঠলো,
“কিন্তু ওরা কেন এসব করবে ভাইজান?এতে ওদের কি লাভ?”
ইমরানের কথায় কিঞ্চিৎ ব্যাঙ্গার্থ সুরে প্রত্যুত্তর করলো ফ্লোরেন্সার বড়ভাই ইসমাইল,
“তুই এতো বোকা কেন ইমরান?এই গঞ্জের মানুষ মেরে ওই ব্রিটিশ দেরই তো লাভ।ওরা এই গঞ্জ দখল করার জন্য এসব করছে, বুঝতে পারছিস না?”
ইসমাইলের কথায় সায় জানিয়ে ফ্লোরেন্সার মেঝোভাই ইব্রাহিম বলে উঠলো,
“এই সিধারে কিছু বলে লাভ নাই ভাই,আমরা সবাই খুব ভালো করে বুঝতে পারছি এইসব ওই ব্রিটিশ পুত্রের কাজ,শালা যা ধুরন্ধর আগের বার কি করেছিলো মনে নেই?”
ইসমাইলের চোখমুখ কঠিন, সে দৃঢ় কন্ঠে বললো,
“মনে আছে ভাই,সব মনে আছে।ওদের এই নিপীড়ন অত্যাচার আর সহ্য করা যাচ্ছে না।এভাবে চলতে থাকলে বাকের গঞ্জের মানুষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এক সময়।”
ইসমাইলের কথা শুনে গঞ্জের একজন বলে উঠলো,
“তার মানে এটা নিশ্চিত এই খুন গুলো ব্রিটিশ রাই করছে, যেন আমরা ভয়ে গঞ্জ ছেড়ে অন্যত্র চলে যাই।”
ইসমাইল প্রতিবাদী কন্ঠে বললো,
“কিন্তু আমরা আমাদের মাতৃভুমি ছেড়ে পালাবো না। আর ভয় পাবো না ব্রিটিশ শাসক দের।”
তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বললো,
“শুনো এলাকাবাসী, সময় হয়েছে রুখে দাঁড়ানোর। ব্রিটিশ সেনাদের পরাজিত করার জন্য প্রস্তুত হও সবাই।”
ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো মোটেও সহজ কাজ নয়,ইসমাইলের মুখে রুখে দাঁড়ানোর কথা শুনে ক্ষানিক দ্বিধাদ্বন্দে ভুগলো ইব্রাহিম, কৌতুহলি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কিন্তু কীভাবে পরাজিত করবেন ভাইজান?ব্রিটিশ সৈন্যদের অস্ত্র দেখেছেন আপনি?ওসব আধুনিক দামি অস্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের চাষাদের হাত কি লড়াই করতে পারবে?
ইসমাইল রহস্য হাসলো,কুটিল কন্ঠে জবাব দিলো,
” হাত লড়াই করতে না পারলে চাষাদের মস্তিষ্ক লড়াই করবে ইমরান।যে কাজ শক্তিতে হয় না সে কাজ বুদ্ধিতে বাজিমাত করা যায়।”
একটু থেমে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“শোন সবাই, আমার কাছে একটা দারুণ পরিকল্পনা আছে।কাল রাইতের অন্ধকারে ওই ব্রিটিশ মহলে আগুন লাগিয়ে দিয়ে আসবো আমরা।বাঁচতে দিবো না একটা ব্রিটিশ কেও।ওরা যেমন রাইতের অন্ধকারে আমাদের গঞ্জের মানুষ কে হত্যা করছে, ঠিক তেমনি আমরাও রাইতের আন্ধারে সবাই কে পুড়িয়ে দিয়ে আসবো।”
ইসমাইলের পরিকল্পনায় বেশ খুশি হলো সবাই, একজোটে কড়তালি দিয়ে ফ্লোরেন্সার সেজো ভাই ইকরাম বললো,
“বাহ!ভাই ভাহ!তুমি তো দেখছি ব্রিটিশ দের বুদ্ধিতে ব্রিটিশদেরই পরিজিত করার পরিকল্পনা এঁটেছ।”
কিন্তু এদের এই নৃশংস ভয়ংকর পরিকল্পনা মেনে নিতে পারলো না ইমরান,সবার মতামতের বিরুদ্ধে গিয়ে বললো,
“কিন্তু এটা অসম্ভব।তোমার ভুলে যাচ্ছো ওই মহলে আমদের বোন ফ্লোরেন্সা আর আইরিশ ভাই আছে।”
ফ্লোরেন্সা আর আইরিশের কথা শুনতেই কিছুক্ষণের জন্য থম মেরে যায় সবাই।সবার নিস্তব্ধতা দেখে কিছুটা আশা খুঁজে পায় ইমরান,সবাই অন্তত ফ্লোরেন্সার কথা ভেবে যদি এই পরিকল্পনা নৎসাৎ করে।অথচ ইমরানের ভাবনানুযায়ি কিছুই হলো না,তাকে আশাহত করে দিয়ে ইসমাইল কঠিন কন্ঠে বলে উঠে,
“কিছু পাইতে হইলে কিছু উৎসর্গ করতে হয় ইমরান। গঞ্জের এতোগুলো প্রানের বিনিময়ে আমরা না হয় দুটো প্রাণ উৎসর্গ করে দিলাম।”
ইসমাইলের কথায় আঁতকে উঠল ইমরান,চোখ বড়বড় করে উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
“মানি না। মানি না ভাই।এই সীদ্ধান্ত আমি মানি না।তোমরা কি করে এতো নিষ্ঠুর সীদ্ধান্ত নিতে পারো?ফ্লোরেন্সা আমাদের আদরের ছোট বোন।আমরা ভাইয়েরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম ওকে সারাজীবন আগলে রাখবো।আর সেই ভাইয়েরাই কিনা বোনকে উৎসর্গ করে দিতে চাইছে?”
ইব্রাহিম দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,নিভৃত স্বরে উচ্চারণ করলো কতগুলো নিষ্ঠুর বাক্য,
“ফ্লোরেন্সা এখন আর আমাদের বোন নেই ইমরান।তুই ভুলে গিয়েছিস ফ্লোরেন্সা ওই ব্রিটিশ পুত্রের হাত ধরে বাড়ি ত্যাগ করেছে।এতোদিনে হয়তো বিয়েও করে নিয়েছে ওরা।ফ্লোরেন্সা একবারের জন্যও এই গঞ্জের মানুষ আর আমাদের কথা ভাবে নি।সে এখন আমাদের কাছে ব্রিটিশ পুত্রের রানী,সেই সাথে শত্রুও।”
ইমরান এবারেও দ্বিমত পোষণ করলো,সবার ভুল ভাঙানোর জন্য ফ্লোরেন্সাকে বাচানোর খাতিরে লড়াই করলো একা কন্ঠে,
“এসব তুমি বলতে পারো না ভাই।ফ্লোরেন্সা আমাদের আদরের বোন।ছোট বোন ভুল করলে সেই ভুল ক্ষমা করে দেওয়া ভাইদের দায়িত্ব।আর তুমি বলছো ফ্লোরেন্সাকে সোজা মেরে ফেলবে?এটা আমি কিছুতেই মানতে পারবো না।”
ইসমাইলের চোখমুখ ইস্পাতের মতো শক্ত,ধারালো ছুড়ির ন্যায় ঠান্ডা অথচ কঠিন কন্ঠে বললো,
“মানতে না পারলে এখান চলে যাও ইমরান।”
ইমরান কোনরকম শান্ত করলো নিজেকে,উপায়ন্তর না পেয়ে বললো,
“আচ্ছা ফ্লোরেন্সার কথা বাদই দিলাম, সেখানে আমাদের ভাই আইরিশও তো আছে।সে তো কোন অন্যায় করে নি,ব্রিটিশ মহলে আগুন লাগালে তো আইরিশ ভাইও মারা যাবে।”
তাকে আশাহত করে এবারেও ছুটে এলো ইসমাইলের অখণ্ড যুক্তি,
“একজনের জন্য এতোবড় সুযোগ হাতছাড়া করতে পারবো না ইমরান,আর আইরিশ আমাদের আপন ভাই নয়,চাচাতো ভাই।তার কথা না ভাবলেও চলবে।”
ইমরান কি করবে বুঝতে পারছে না,তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে ফ্লোরেন্সার পবিত্র মুখখানা,যেই মুখখানার দিকে তাকালে তার সকল দুঃখ ঘুচে যায়,সব দুঃশ্চিন্তা হারিয়ে যায়।
ইমরান হাটু ভেঙে বসে পড়লো ইসমাইলের সামনে,হাতজোড় করে বললো,
“হাতজোড় করছি ভাই এমনটা করো না,অন্তত কয়েকটা দিন অপেক্ষা করো,আমার মন বলছে ওরা চলে আসবে।”
“অপেক্ষা করা মানে ওই ব্রিটিশদের আরো কিছু সময় দেওয়া বলে ইমরান।ওরা যে এই সময়ের মধ্যে তোমাকে আর আমার মাথা কেটে বটগাছে ঝুলিয়ে রাখবে না সেটা কে বলতে পারবে?”
অবশেষে হার মানলো ইমরান,উঠে দাড়ালো বসা থেকে, রুদ্ধশ্বাস কন্ঠে বললো,
“যা ইচ্ছে করো,কিন্তু মনে রেখো আমি ফ্লোরেন্সার কিছু হতে দিবো না।”
ইসমাইল গায়ে মাখলো না, ঠান্ডা স্বরে বললো,
“ঘরে গিয়ে ঘুমাও ইমরান তুমি এখনো ছোট আর বোকাই রয়ে গেছো।”
____________
ভোরের নরম আলোটা জানালার ফাঁক গলে এসে পড়েছে আইরিশের চোখের পাতায়,ঘুমভাঙা চোখ দুটোতে আলো স্পর্শ করতেই কেটে গেলো ঘোর।চোখ মেলে ধিরে ধিরে তাকালো চারপাশে।এটা তার কক্ষ নয় এ ব্যাপারে নিশ্চিত হলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই,তবে সবচেয়ে বেশি অবাক হলো জানালার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নাবহাকে দেখে।
মনটা কু গাইলো হটাৎ, বুকের ভেতর উঠল কাঁপুনি,হিম ধরা কন্ঠে বললো,
“আমি এই ঘরে?এই ঘরে কি করে এলাম আমি?”
আইরিশের কন্ঠ শুনে জানালার পাশ থেকে ছুটে এলো নাবহা,লঘু কন্ঠে বললো,
“আপনি জেগে গিয়েছেন?”
আইরিশ কর্ণপাত করলো না,জিজ্ঞেস করলো একই প্রশ্ন,
“আমি এই ঘরে কখন এলাম?”
নাবহা ভনিতা না করে স্পষ্ট জবাব দিলো,
“কাল রাতেই তো এলেন।”
আইরিশের হৃদপিন্ড লাফিয়ে উঠলো,ছলকানো কন্ঠে বললো,
“কাল রাতে এসেছি মানে?রাতে এই ঘরে কি কাজে এসেছিলাম আমি?”
নাবহা এবারেও সুস্পষ্ট জবাবে বললো,
“তাতো জানিনা, তবে আপনি নেশাগ্রস্ত ছিলেন খুব।”
অথচ এমন জবাবে ভ্রু বেঁকে এলো আইরিশের,জিজ্ঞেস করলো উত্তেজিত কন্ঠে,
“নেশাগ্রস্ত!তারমানে তো আমি নিজের মধ্যে ছিলাম না।”
“হ্যাঁ,তবে পুরোপুরি হয়তো ছিলেন না।”
“মানে কি বলতে চাইছো তুমি?”
নাবহা ঠোঁট টিপে বিমূর্ষ কন্ঠে উত্তর দিলো,
“এই যে মাতাল অবস্থায় কোন পুরুষ একটা নারীর বিছানা পর্যন্ত এসেও যে নিজেকে সংযত রাখতে পারে সেটাই বলতে চাইছি।”
আইরিশের কন্ঠে সন্দেহ, সে জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কাল রাতে আমাদের মধ্যে খারাপ,,,,
এই জঘন্য বাক্যটা সম্পূর্ণ করার প্রয়োজন পড়লো না আইরিশের, তার আগেই নাবহা বলে উঠলো,
” ভয় নেই,আমি তেমন মেয়ে নই।আর আপনি তো পুরুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠ।”
“তারমানে কিছুই হয় নি তাইতো?”
“আপনি কাল সারা রাত ফ্লোরেন্সার নাম জপতে জপতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন।”
আইরিশ তপ্ত শ্বাস ফেললো,হাফ ছেড়ে বললো,
“তুমি আমাকে বাঁচালে মেয়ে।”
বিনিময়ে ম্লান হাসলো নাবহা,দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
“আমি বাচাঁলাম কই?বাঁচিয়েছে তো ফ্লোরেন্সার প্রেম।ফ্লোরেন্সা ভাগ্যবতী, কি সুন্দর অবচেতন পুরুষের মস্তিষ্কে রাজ করতে পারে।”
আইরিশ নিম্নোষ্ঠ প্রসারিত করে স্মিথ হেসে উত্তর দিলো,
“ঠিক বলেছ মেয়ে,ফ্লোরেন্সার প্রতি প্রেম আমার মস্তিষ্কে গেড়ে বসে আছে।অবেচতন অবস্থায় নিজেকে ভুলে গেলেও ফ্লোরেন্সাকে ভুলতে পারবো না কখনো।”
আইরিশের কথাগুলো তীক্ষ্ণ ফলার মতো বুকে এসে বিধছে নাবহার,আইরিশ কি বুঝতে পারছে না ফ্লোরেন্সার প্রতি তার এই হুটহাট প্রেম নিবেদন নাবহাকে নিঃশ্বেস করে দিচ্ছে,ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে তার নাজুক সত্ত্বা।
নাবহা অমৃত গেলার মতো করেই গিলে নিলো সমস্ত বিষাধ,চোখের কোনে জমে যাওয়া অশ্রু লুকানোর তাড়নায় বললো,
“আর কথা না বাড়িয়ে আপনার এবার যাওয়া উচিৎ।মহলের কারো নজরে পড়ে গেলে বিপদ।”
সায় জানালো আইরিশ, সম্মতিতে বললো,
“আচ্ছা, আসছি আমি।”
আইরিশ কক্ষ থেকে বের হওয়ার জন্য এগিয়ে গেলো দরজার দিকে, হাত বাড়িয়ে দরজার কপাট খুলতেই যাবে ডেকে বসলো নাবহা,
“শুনুন”
আইরিশ ঘুরে তাকিয়ে অস্পষ্ট বললো,
“হু?”
নাবহা ভেজা স্বরে বললো,
“চলে যাচ্ছেন?”
আইরিশ দ্রুত উত্তর দিয়ে বললো,
“না গেলে যে বিপদ বাড়বে, তুমিই তো বললে।”
নাবহা ঠোঁট কামড়ে নিভৃত কন্ঠে বললো,
“আমার কেন যানি মনে হচ্ছে এই যাওয়াই আপনার শেষ যাওয়া।আপনার সাথে আমার শেষ সাক্ষাৎ।”
আইরিশ স্মিথ হাসলো, ভরসার হাত বাড়িয়ে দিয়ে রাখলো নাবহার মাথায়,স্নেহমাখা কন্ঠে বললো,
“ভয় পেয়ো না মেয়ে এই মহল থেকে যদি কখনো যেতে পারি তবে তোমায় সঙ্গে নিয়ে তবেই যাবো।তুমি খুব ভালো।”
___________
দু’হাতে সত্যের ক্ষতবিক্ষত শরীর আঁকড়ে ধরে কাঁদছে নিস্পা। যন্ত্রণায় বুকটা ছিঁড়ে যাচ্ছে প্রতিটি মুহূর্তে। চুলগুলো এলোমেলো, মুখ বিবর্ণ, ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ,সেই শুকনো ঠোঁট ফেটে বেড়োচ্ছে বুকফাটা তীব্র আর্তনাদ,
“কালাচাঁদ?এই কালাচাঁদ? কথা বলছো না কেন তুমি?আমাকে ডাকছো না কেন অলিক কন্যা বলে?দেখো তোমার অলিক কন্যা কাঁদছে, তুমি তার চোখের পানি মুছিয়ে দিবে না বল?”
সত্যের নিথর দেহ সাড়াশব্দ করে না,কাল দুপুরের মতো করে খিলখিল করে হাসে না, ডাকে না অলিক কন্যা বলে।
নিস্পার গলা ফেটে যাচ্ছে,সত্যের শরীর থেকে বেড়োনো রক্তের মতোই তার কন্ঠ থেকে বেড়োচ্ছে যন্ত্রণার দগ্ধতা,
“ও কালাচাঁদ উঠো,একটু উঠো না।আমাকে একটা বার বলনা ভাত খাইয়ে দিতে।তুমি না উঠলে আজ কাকে ভাত খাইয়ে দিবো আমি?কে আমাকে বলবে গরম ভাতে ফু দিয়ে দিতে?কে করবে এক টুকরো মাছ খাওয়ার আবদার?”
নিস্পার আহাজারিতে থমকেছে আকাশ বাতাস।চারদিকে নেমে এসেছে অনিবার্য নিস্তব্ধতা।রানী ক্যাথরিন থেকে শুরু করে জুবাইদা সহ দাসী শারিকাও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে তামাশা। দীঘির এক পাড়ে নিস্পল দাঁড়িয়ে আছে প্রিন্স জোসেফ।সেই ভোর থেকে নিজেকে নির্দোশ প্রমাণ করার প্রচেষ্টায় ব্যার্থ হয়েছে সে,হাজারটা শব্দ আর শ খানেক বাক্য উচ্চারণ করেও নিজেকে নির্দোশ প্রমান করতে না পেরে সেই ছুড়িটা হাতের মুঠোয় চেপে ধরেই দাঁড়িয়ে রইলো নিরলস।
মহল পুরো ফাঁকা।এমন পরিবেশ দেখে বেশ অবাক হয় আইরিশ।এসেছে পর্যন্ত মহল এমন নিস্তব্ধ হয় নি আগে কখনো।প্রশ্নে জর্জরিত উদ্বিগ্ন নয়ন জোড়া উত্তরের আশায় ছুটে বেড়ালো এদিক ওদিক।অথচ আশানুরূপ তেমন কিছুই দেখতে পেলো না স্বচ্ছ দৃষ্টি।ঠিক তখনই কানে ভেসে এলো নিস্পার কান্নার শব্দ।
মস্তিষ্ক আর হৃদয় দাপিয়ে উঠলো এক জোটে, ছেলেটা আর দাড়ালো না এক মূহুর্ত।উদ্ভান্টের ন্যায় দৌড়ে গেলো মহলের বাইরের দিকে।
রাজ দিঘির কাছে আসতেই থমকালো আইরিশের পা জোড়া,স্তব্দ নয়ন বিস্ফোরিত হলো নিস্পার বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত চেহারার দর্শন হয়ে।
সে ধিরে ধিরে এগিয়ে গেলো,নিটোল বাহুখানা ঝুকিয়ে হাত রাখলো ফ্লোরেন্সার কাঁধে,ঠান্ডা অস্পষ্ট স্বরে ডাকলো,
“আলেকজান্দ্রা।”
নিস্পা ছলছলে নয়ন জোড়া ঘুরিয়ে তাকালো আইরিশের দিকে,ঠোঁট ভেঙে বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠলো ফুপিয়ে, বিধ্বস্ত কন্ঠে বললো,
“আপনি এসেছেন?দেখুন না সত্য কথা বলছে না,ওকে একটু কথা বলতে বলুন না, ওকে ডেকে তুলুন না।”
আইরিশ অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো সত্যের রক্তাক্ত শরীর টার দিকে।বাচ্চাটাকে চেনা না সে,এই মহলে আসার পর আলেকজান্দ্রার সাথেই দেখেছে দু’বার, আর এই দুবার দেখাতেই মায়ায় পড়ে গিয়েছে,কি সুন্দর চেহারা,এমন চেহারার মায়ায় কে না পড়বে।
“কি হলো চুপ করে আছেন কেন আপনি? ডাকতে বললাম না?ওকে ডাকুন, উঠতে বলুন। বলুন আমি ওকে ভাত খাইয়ে দেবো নিজের হাতে।”
আইরিশ কি বলবে বুঝতে পারলো না,শুখনো ঢোক গিলে বিমূর্ষ কন্ঠে বললো,
“ও আর উঠবে না আলো,ও চিরজীবনের জন্য ঘুমিয়ে গিয়েছে।”
নিস্পার মস্তিষ্ক শুন্য,শোকে পাগল পাগল লাগছে নিজেকে,সে উন্মাদের মতো বললো,
“ঘুমিয়ে গিয়েছে?ঘুমিয়ে গিয়েছে?ওই জালিম পুরুষ বাঁচতে দিলো না, বাঁচতে দিলো না আমার কালাচাঁদ কে।ঘুম পাড়িয়ে দিলো,সারাজীবনের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দিলো।”
আইরিশ এক হাতে আঁকড়ে ধরলো নিস্পার বাহু,শান্ত করার জন্য বলল,
“পাগলামি করিস না আলো,কাঁদিস না আর।তোর চোখের পানি পীড়া দিচ্ছে আমায়।”
নিস্পা উন্মাদের মতো দু হাতে মুছলো তার চোখের পানি,বেদনাবিধুর কন্ঠে বললো,
“ঠিক বলেছেন,কাঁদবো না, আর কাঁদবো না আমি।আমি বুঝে গেছি আমার কান্নায় ওই জানোয়ার টা আনন্দ পাচ্ছে।”
তারপর প্রিন্স জোসেফের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললো,
“কি পাচ্ছেন তো আনন্দ?পৈশাচিক আনন্দ লুপে নিচ্ছেন নিশ্চয়ই আমার চোখের পানিতে।”
প্রিন্স জোসেফের ভেতরটা মুচড়ে আসে,সে স্পষ্ট কন্ঠে আওড়ায়,
“কতবার বলবো তোমায়?খুন করি নি আমি।আর কীভাবে বললে বুঝবে তুমি?”
রানী ক্যাথরিন রাগান্বিত হলেন,জোসেফের এমন স্বীকারোক্তিতে অপমানবোধ করলেন খুব, তিনি তেঁতে উঠে বললেন,
“কি করছো কি জোসেফ?খুন যেই করুক না কেন সামান্য একজন দাসীর কাছে তুমি কৈফিয়ত কেন দিচ্ছো?একটা তুচ্ছ প্রাণের জন্য ব্রিটিশ মহলের সম্মানহানি করতে লজ্জা করছে না তোমার?”
সুযোগ বুঝে রানী ক্যাথরিনের কথায় সায় জানালো জুবাইদা,নমনীয় কন্ঠে বললো,
“রানী ঠিক বলেছেন প্রিন্স,আপনি কেন কৈফিয়ত দিতে যাবেন এই সামান্য বিষয়ে।”
প্রিন্স জোসেফের কপালের শিরা গুলো রাগে দপদপ করছে,রাগের তোফে ভয়ংকর আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হলো তার কন্ঠ,
“চুপ, একদম চুপ।এখন শুধু আমি আর ফ্লোরেন্সা কথা বলবো,আমাদের মধ্যে তৃতীয় ব্যাক্তি হয়ে ঢোকার চেষ্টা করবেন না আম্মাজান।সবচেয়ে ভালো হয় আপনি এবং আপনার সঙ্ঘিরা এই স্থান ত্যাগ করুন।”
রানী ক্যাথরিন আর নিতে পারলেন না,অপমানে ফুসে উঠলেন জোসেফের কথায়,আর এক মূহুর্ত দাড়িয়ে না থেকে ঘোখরা সাপের ন্যায় ফোস ফোস করতে করতে চলে গেলো মহলের ভেতরে।তাকে অনুসরণ করে পেছন পেছন ছুটলো জুবাইদা নিজেও।অথচ দাসী শারিকা তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে, ভয়ে আতংকে হাত পা কাঁপছে তার।কাল রাতে কয়েকজন দাসীকে সাথে নিয়ে সেই যে এই বাচ্চাকে হত্যা করেছে,এই কথা কোনভাবে ফাস হলে প্রিন্স জোসেফ যে তাকে কি শাস্তি দিবে ভাবতেই অন্তরাত্মা কাঁপছে তার।
রানী ক্যাথরিন চলে যেতেই তপ্ত শ্বাস ছাড়লো জোসেফ,নিটোল পা জোড়া টেনেটুনে এসে থামলো নিস্পার কাছে, তারপর হাটুভেঙে বসে নিরেট কন্ঠে বললো,
“ভালোবাসি মেয়ে,তোকে কাঁদানোর মতো কাজ কি করে করি বল?একবার ভালোবেসে তাকা সব বুঝে যাবি”
নিস্পার চোখ মুখ শক্ত,এখন আর কাঁদছে না সে,ভেতরে যন্ত্রনা পুশে রেখে বিস্ফোরিত কন্ঠে বললো,
“আপনি সুস্থ মস্তিষ্কের এক নিষ্ঠুর খুনি।আমার বুক চিরে বড়জোড় হৃৎপিণ্ড পাবেন, ভালোবাসা নয়।”
জোসেফ নিরুপায়,তার ভালোবাসার প্রমাণ দেওয়ার জন্য আওড়াল কঠিন এক বাক্য,
“আমার ধমনী চিরে ফোটা ভালোবাসার ফুল ঝড়াতে পারবে না তোমার অস্বীকারের ঠান্ডা বাতাস।”
নিস্পা টলে না,তার ভাঙা হৃদয় বুঝতে চায় না জোসেফের বলা বাক্যের ব্যাখ্যা,সে বিমুঢ় কন্ঠে বলে,
“আমি মৃত ফুল আপনার নিষ্ঠুর আঘাতে খুন হয়েছি।”
জোসেফ খন্ডাতে চাইলো নিস্পার যুক্তি,তর্কে নয় নমনীয়তায় জিতে নিতে চাইলো নিস্পার মন,বিরহবিধুর কন্ঠে বললো,
“আমি সেই মৃত ফুলকেই চুমু খেয়ে বাঁচাতে চাই।তোমার মৃত্যুতেই লুপে নিতে চাই প্রেমের ঘ্রাণ।”
ফ্লোরেন্সার দৃষ্টি সত্যের ঘুমন্ত মুখের দিকে স্থির,সে নিঃসাড় কন্ঠে বললো,
“আপনি বোধহয় জানেন না, মৃত ফুলে বিষ জাগে, ঘ্রাণ নয়।”
জোসেফের কন্ঠ তেঁতে উঠে,অভিমন্যুপ্রায় শুস্ক কন্ঠে চেচিয়ে উঠে,
“ভয় দেখাচ্ছো মেয়ে?অথচ তোমার বিষকেই ভালোবেসেছি আমি ঘ্রাণ ভেবে।”
“আমি ভয় নই, ফলাফল। যে বিষকে আপনি প্রেম ভাবছেন, সে বিষ পতন হয়ে আপনার ধমনীতে দৌড়াচ্ছে।”
জোসেফ নিস্পার সামনে তার মাথা নত করলো, আবেগ রুদ্ধ স্বরে বললো,
“পতন যদি হয় তোমার বিষে , তবে আমি চাই সেই বিষ ধীরে ধীরে ছড়াক আমার শিরা-উপশিরায়।আমার প্রতিটি শ্বাসে হেরে যাক তোমার প্রেমে।”
জোসেফের কোন কথায় আজ থমকায় না নিস্পা,চোখের সামনে সত্যের রক্তাক্ত শরীর টা সব কইছু ফিকে করে দিচ্ছে,সে তাচ্ছিল্য স্বরে উপহাস করে বললো,
“আপনি আমার প্রেমে হেরে যেতে চান, অথচ আমি আপনাকে প্রতিযোগী হিসেবে গন্য করি না।আপনার মতো নিষ্ঠুর খুনি প্রেমের যোগ্য নয়।”
ধৈর্য হারালো,আবারও সেই একই শব্দ শুনে ধৈর্য হারালো জোসেফ,রক্তাক্ত কন্ঠে চেচিয়ে উঠলো উন্মাদের মতো,
“খুনি খুনি খুনি।আর কতবার বলবে হ্যাঁ? বলেছিনা?একবারই তো বলেছি আমি খুন করি নি।”
নিস্পার চোখের কার্ণিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো উত্তপ্ত লাভার ন্যায় একফোঁটা অশ্রু,মুষড়ে পড়া কন্ঠে বললো,
“কীভাবে বিশ্বাস করবো আপনাকে?এই মৃত লাশ তো সাক্ষী দিতে পারে না।”
“কীসের সাক্ষী? কোন সাক্ষীর প্রয়োজন নেই।প্রিন্স৷ জোসেফ কখনো মিথ্যা বলে না।”
“কিন্তু ফ্লোরেন্সাকে এই মহলে আনার জন্য আপনি মিথ্যার আশ্রয়ই নিয়েছিলেন।”
“সেসব ভিন্ন কথা।আমি এখন তো সত্য বলছি,আমি ওকে খুন করি নি।”
“আপনার এই মিথ্যা কথা টা বিশ্বাস করলে খুশি হবেন?যেতে দিবেন?মুক্তি দিবেন এই মহলের চারদেয়াল থেকে?”
“তুমি মুক্তি চাইছো?”
“আপনার থেকে দূরে যেতে চাইছি।”
“নিজেকে স্বার্থপর প্রমান করতে চাইছো?”
“স্বার্থপর নয়,এটাকে আত্মরক্ষা বলে।”
“তোমার সাথে সংঘর্ষ বাধে নি আমার,আত্মরক্ষা নিছক বাহানা।”
“আত্মরক্ষা বাহানা নয় অস্তিত্বের দাবি।একজন ব্রিটিশের বিষাক্ত ভালোবাসায় একটা বাঙালি কন্যা বড়জোর হৃদয় দেয়, আত্মা নয়।”
“অবশেষে স্বীকার করলে আমাকে হৃদয় দিয়েছ তুমি।”
“দেই নি তবে ভুল করে দিতে চেয়েছিলাম।ভাগ্যিস আপনি প্রমাণ করে দিলেন আমার পবিত্র হৃদয় পাওয়ার যোগ্য নন আপনি।”
“যেখানে হৃদয় দেয় ধরা,সেখানেই আত্মা বাঁধে বাসা।তোমার ঠোঁট হৃদয় লুকাতে চাচ্ছে, অথচ তোমার চোখ চিৎকার করে ফাঁস করে দিচ্ছে সেই তথ্য।”
এপর্যায়ে আর চুপ করে বসে থাকতে পারলো না আইরিশ,সে বিক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো,
“ফ্লোরেন্সাকে পুনরায় বিভ্রান্ত করতে চাইছেন তাই না?সম্মোহন করে পরিস্থিতি পাল্টাতে চাইছেন আবার”
তারপর নিস্পার দিকে তাকিয়ে বললো,
“আর এক মূহুর্ত নয় ফ্লোরেন্সা,এই লোকটার নিঃশ্বাসের বাতাসও তোর জন্য বিপজ্জনক।”
নিস্পা সায় জানালো, জোসেফকে একটু ক্ষতবিক্ষত করার তাড়নায় একহাতে খামচে ধরলো আইরিশের বাহু,তারপর আইরিশের উপর ভর করে দাড়াতে দাড়াতে বললো,
“ঠিক বলেছেন আপনি।এই লোকটাকে আর এক সেকেন্ড সুযোগ দিলে হয়তো সত্যিই সম্মোহন করে পরিস্থিতি পাল্টাতে চাইবে।এখানে আর এক মূহুর্ত থাকা সম্ভব নয়।”
এহেন দৃশ্যে লাফিয়ে উঠলো জোসেফের বুকের ভেতর সদ্য জন্ম নেওয়া পবিত্র হৃদয়টা,ছটফটিয়ে বললো,
“থাকা সম্ভব নয় মানে?কোথায় যাবে তুমি?”
আইরিশ জোসেফের চোখের সামনে এক হাতে জড়িয়ে ধরলো নিস্পার বাহু,নিস্পা না চাইতেও সায় জানালো, জোসেফকে কষ্ট পেতে দেখার মতো শান্তি এই মূহুর্তে আর দ্বিতীয় টি নেই।
আইরিশ নিস্পার বাহু আঁকড়ে ধরে ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
“ফ্লোরেন্সা ফিরে যাবে ব্রিটিশ পুত্র।ও আমার সাথে ফিরে যাবে।”
ক্রোধে শরীর কেঁপে উঠলো জোসেফের,হাতে চেপে ধরে রাখা ছুরিটা তাক করলো নিস্পার দিকে, দহন দগ্ধ কন্ঠে চেচিয়ে উঠলো,
“অসম্ভব!এই মহল থেকে এক পাও বেড় করার স্পর্ধা দেখাবে না তুমি।”
নিস্পা নিস্পলক তাকালো জোসেফের ছুড়ির দিকে,তারপর হাত বাড়িয়ে ছুড়িটা টেনে নিয়ে ঠেকালো গলায়,নিস্প্রভ কন্ঠে বললো,
“হয় মুক্তি দিন, নয়তো মৃত্যু দিন।তবুও এই অভিশপ্ত মহলে থাকতে চাই না আমি।”
নিস্পা মাথা তুলে তাকালো আইরিশের দিকে, তারপর শুস্ক কন্ঠতালু ভেদ করে শুধালো,
“আপনি মরতে পারবেন তো ফ্লোরেন্সার জন্য?”
আইরিশের চোখ মুখ শান্ত,সে নির্লিপ্তে নির্দিধায় সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তি দিলো,
“নিঃসন্দেহে।আমি আমার আলেকজান্দ্রার জন্য মরতে প্রস্তুত।”
তারপর নিস্পার আঙুলের ভাজে নিজের আঙুল গুলো পেচিয়ে ধরে এগিয়ে গেলো জোসেফের দিকে,নির্বিক কন্ঠে বললো,
“আত্মসমর্পণ করলাম প্রিন্স জোসেফ,আপনি চাইলে আমাদের দুজনের মাথা আলাদা করে দিতে পারেন।”
প্রিন্স জোসেফ তার ছুড়িটা এবার চেপে ধরলো আইরিশের গলায়,আহত বাঘের ন্যায় গর্জে উঠে বললো,
“তবে তাই হোক।এই মহলেই আজ সমাধি দেওয়া হবে তোমাদের।”
নিস্পার ক্লান্ত চোখে জ্বলে উঠলো আগুন,জোসেফের প্রতি ঘৃনা তড়তড়িয়ে বাড়লো কয়েকগুন,ধিরে ধিরে আইরিশকে আড়াল করে আইরিশের সামনে এসে দাড়ালো সে নিজে,আইরিশের গলায় চেপে ধরা ছুড়িটা মুঠোবন্দি করলো আচমকা।
ধারালো ছুড়িতে চামড়া বিধতেই বিদীর্ণ হলো,খুনি অস্ত্র রক্তে রাঙা হলো পুনরায়।
জোসেফের নীল চোখের শিরাগুলো রক্তে টইটম্বুর হয়ে লাল হয়ে গিয়েছে,রাজ সিংহের মতো ফোস ফোস করে শব্দ করছে নিঃশ্বাস।নিস্পার রক্ত দেখে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে মস্তিষ্ক,নিজেকে সামলাতে না পেরে অতর্কিত জোড়ালো হাতের কয়েকটি থাপ্পড় বসিয়ে দিলো নিস্পার কোমল গালে,রুদ্ধশ্বাস কন্ঠে চেচিয়ে উঠলো,
“এই সমস্যা কি তোর হ্যাঁ?সমস্যা টা কি বল?তুই জানিস না আমি তোকে মারা তো দূর একটা আঁচরও দিতে পারবো না।”
“তাহলে যেতে দিন।বাচ্চাটার প্রানটা তো সুরক্ষিত রাখতে পারলাম না।অন্তত নিথর শরীর টাকে নিয়ে যেতে দিন।”
“যাহ! চলে যা।এই মহল থেকে আর আমার জীবন থেকে, চিরদিনের জন্য চলে যা।”
আইরিশ নিজের গলায় ঝুলানো গামছাটা দিয়ে নিস্পার ক্ষত হাত চেপে ধরে রেখে বললো ,
“চল ফ্লোরেন্সা।”
নিস্পা বিধ্বস্ত জোসেফের দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে থেকে অস্ফুটে বললো,
“হু?”
আইরিশ নিস্পার হাতটা ছেড়ে দিয়ে কোলে তুলে নিলো সত্যের নিথর দেহ, বললো,
“চল,দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
নিস্পা জড়বস্তুর ন্যায় শুকনো কন্ঠে বললো,
“হুম।”
নিস্পা আর আইরিশ ধিরে ধিরে এগিয়ে যেতে শুরু করলো মহলের বাইরের দিকে।জোসেফ দিশেহারা উন্মাদের মতো দৌড়ে এলো পেছন পেছন,নিস্পার হাতের কব্জা টেনে ধরে বললো,
“এ্যই, এ্যই তুই সত্যি সত্যি চলে যাচ্ছিস?”
নিস্পা নিজের হাতের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বললো,
“আপনিই তো বললেন।”
প্রিন্স জোসেফ আজ প্রথমবার এতো অসহায়,ব্রিটিশ মহল আজ স্তব্ধ তার অসহায়ত্বে,অথচ তার সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই,নিস্পাকে রেখে দেওয়ার জন্য তড়পাচ্ছে তার কন্ঠ,
“সেতো অভিমান করে বলেছি।কেন বুঝতে পারছিস না?তুই চলে গেলে এই বুকের রক্ত শুকিয়ে যাবে,জীবন্ত কবর হয়ে যাবে এই জোসেফ।”
নিস্পা ঝাড়া মেরে ছাড়িয়ে নিলো নিজের হাত,কঠিন কন্ঠে বললো,
“শাস্তি ধরে নিন।পাপ তো কম করেন নি জীবনে।”
জোসেফ নিস্পার হাতের মুঠোয় ছুরিটা ধরিয়ে দিয়ে চেপে ধরলো নিজের গলায়,দহন দগ্ধ স্বরে বললো,
“আমার পাপ যদি তোকে ভালোবেসে হয়,তাহলে মেরে দিয়ে যা,ছুড়িটা গেঁথে দিয়ে যা এই বুকের মাঝে।”
ছুরির ধারালো স্পর্শে তৎক্ষনাৎ চামড়া কেটে কয়েক ইঞ্চি ডেবে গেলো,রক্ত বের হতে শুরু করলো পিনিক বেয়ে।অথচ নিস্পা কোনরুপ প্রতিক্রিয়া দেখালো না,অবশ হাতটা ছেড়ে দিলো ছুরিটা।তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললো,
“আসছি আমি।”
জোসেফ দিকভ্রান্ত, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের মাত্রা বেড়েছে,সে উন্মাদের মতো ফ্লোরেন্সাকে ধাক্কা দিয়ে বললো,
“যাহ!চলে যা,দ্রুত যা।”
নিস্পা সামনে ঘুরে তাকায়,আবারও হাটা শুরু করে নাম না জানা গন্তব্যের দিকে,অনুসরণ করে আইরিশের পদচারণ।
জোসেফ শত চেষ্টার পরেও থামাতে পারলো না নিস্পাকে।নিস্পা চলে যাচ্ছে, তার হৃদয়টাকে থমকে দিয়ে তার ভালো থাকা কেড়ে নিয়ে সে চলে যাচ্ছে।অসহায় নিরুপায় হয়ে সে হাটু ভেঙে বসে পড়েছে মেঝেতে।অশুভ জালিম হৃদয় পরাজয় স্বীকার করেছে এক সাধারণ মানবির কাছে।সেই পরাজিত নয়নজোড়া অসহায় হয়ে তাকিয়ে আছে নিস্পার যাওয়ার পানে,নিস্পাকে শেষ বারের মতো আটকানোর প্রচেষ্টায় আত্মাটা চিৎকার করে উঠলো, কন্ঠ ফেটে বেড়িয়ে এলো সেই শব্দ,
“তুই চলে গেলে আমি বাঁচবোনা হার্ট।থেকে যা না।”
নিস্পা তাকায় না, পিছু ফিরে তাকায় না,না তো থামায় তার পায়ের গতি,জোসেফ আবার চিৎকার করে ডাকে,
“আরেহ, তুই কি কানে শুনতে পাস না?আমি তোকে ছাড়া শেষ হয়ে যাবো।”
জোসেফ উঠে দাঁড়ায়,আবারও পাগলের মতো দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ায় নিস্পার সামনে,নিস্পার পথ আটকে বলে,
“এ্যই এ্যই। এই ফ্লোরেন্সা থেকে গিয়ে বাঁচিয়ে দে আমাকে।”
নিস্পা থামে,এক পলক তাকায় জোসেফের দিকে,তারপর আত্ম বেদনা গিলে নিয়ে বলে,
“আমি ফ্লোরেন্সা নই।”
জোসেফ একটানে ছিড়ে ফেললো তার শার্ট, উন্মুক্ত বুকের বা পাশে স্ব জোরে কয়েকটা থাপ্পড় মেরে, বিপর্যস্ত কন্ঠে বললো,
“এই দেখ আমার হৃদপিন্ডটা তড়পাচ্ছে।তোর জন্য তড়পাচ্ছে,তুই যেই হোস না কেন তোকে ভালোবেসে ফেলেছে এই অচল যন্ত্রটা।”
নিস্পা তাকায় না,সে যানে যদি এই বুকের মাঝে একবার তাকায় সে বাধা পড়বে,এই লোকটার প্রেমে বাধা পড়বে আবার।ঠিক যেমন ত্রিজয়ের প্রেমে পড়েছিলো না বুঝে, তেমন করেই যদি প্রেমে পড়ে যায়, চেপে রাখা অনুভুতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায় সে আশঙ্কায় তাকালো না নিস্পা,বরং আইরিশের হাতটা চেপে ধরে লঘু কন্ঠে বললো,
“চলুন।”
আইরিশ যুদ্ধ জয়ের মতো বুক ফুলিয়ে শ্বাস টানলো, ভুলে গেলো নাবহার কথা, নাবহাকে দিয়ে আসা কথা।সে তার আলেকজান্দ্রাকে জয় করে নিয়ে চললো ব্রিটিশ মহলের বাইরে,
“হু চল।”
_________
চাঁদের আলো আজ ইচ্ছাকৃতভাবেই মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়েছে।রাতের নিস্তব্ধতা কানে কানে ফিসফিস করছে ষড়যন্ত্রের গল্প।বাড়ির পেছনের ভাঙা দেয়াল পেরিয়ে বেরিয়ে পড়েছে ইমরান।গায়ে জড়ানো একটা কালো রঙের শাল,আপদমস্তক ঢাকা তাতে, যাতে সহজে কেউ চিনে না ফেলে তাকে।যত যাই হোক কাল রাতের আগেই ফ্লোরেন্সা আর আইরিশ ভাইয়ের কাছে পৌছাতে হবে তার।গঞ্জ বাসির ষষড়যন্ত্রের জাল ছিড়ে বাঁচিয়ে নিতে হবে তাদের।
রাত তখন মাঝপথে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে জোনাকিরা মাঝে মাঝে একটু আলোর ঝিলিক দিয়ে পথ চিনিয়ে দিচ্ছে ইমরানকে।হাঁটার শব্দ ছাড়া আর কোনো সাড়া নেই তখন। গা ছমছমে শ্বাসরোধ করা নিস্তব্ধতা।ঠিক তখনই সামনে বাঁশঝাড়ের পাশ থেকে ভেসে এলো নুপুরের শব্দ।ভিতু ইমরানের পা থমকে গেলো তৎক্ষনাৎ।দোয়ায় ইউনুস পড়ে বুকে ফু দিলো কয়েকবার।শব্দের রহস্য খুঁজতে ভয়ে ভয়ে তাকালো এদিক সেদিক।আতংকিত ভীত এক জোড়া চোখ দেখতে পেলো একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাশ ঝাড়ে হেলান দিয়ে।
মেয়েটির পড়নে সেলোয়ার-কামিজ। মাথায় ওড়না। ঠিক যেমন গঞ্জের মেয়েরা সেজে থাকে তেমনই সাদাদিধে।ইমরান কৌতুহল দমাতে এগিয়ে গেলো কয়েক পা,আইঢাই করে আর চোখে তাকালো মেয়েটির দিকে।
মেয়েটি বুঝতে পারলো,ইমরানের তাকানোর ধরন বিব্রত করলো তাকে,দ্রুত সটান হয়ে দাঁড়িয়ে মৃদু স্বরে বললো,
“একি?কে আপনি?এভাবে তাকাচ্ছেন কেন আমার দিকে?
মেয়েটির কন্ঠ শুনে এতক্ষণে হাপ ছেড়ে বাঁচলো ইমরান, তাও নিশ্চিত হওয়ার জন্য শুধালো,
“এই তুমি কি মেয়ে মানুষ নাকি মেয়ে পেত্নি?”
মেয়েটি নির্লিপ্ত চোখে তাকালো ইমরানের দিকে,স্পষ্ট কন্ঠে বললো,
“আপনি কে?এসব আজব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছেন কেন আমাকে?”
এবারে পুরোপুরি নিশ্চিত হলো আইরিশ, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা কোন পেত্নী নয়,তার মতই মানুষ, একথা নিশ্চিত হতেই মেরুদণ্ড শক্ত করে সোজা হয়ে দাড়ালো, বললো,
“আমি এই গঞ্জের খান বাড়ির ছোট ছেলে।কিন্তু তুমি কে শুনি?আগে কখনো তো এই গঞ্জে দেখি নি।”
মেয়েটি ভ্রুকুটি তুলে জিজ্ঞেস করলো,
“কেন?আপনি কি এই গঞ্জে মেয়েদের দেখেশুনে রাখেন নাকি?”
“আহ!তেমন কিছু না।মিছে মিছে দোষারোপ করো না তো।এই গঞ্জের গুটিকয়েক যতগুলো মেয়ে আছে সবাইকেই চোখের দেখা চিনি।কিন্তু তোমাকে কখনো দেখি নি।”
“দেখবেন কি করে?আমি গতকালই আমার নানার বাড়িতে বেড়াতে এলাম।”
“ওহ তাই বল।তা কোনটা তোমার নানার বাড়ি?”
মেয়েটা এবারেও সোজাসাপ্টা জবাব না দিয়ে বললো,
“এতো যেনে আপনার কি কাজ?আমাকে দেখতে যাবেন নাকি?”
ইমরান মুখ ভেঙালো,রস্য কন্ঠে বললো,
“এ্যহ! যেই না তার চেহারা নাম রাখছে পেয়ারা।এই কটকটির মতো দেখতে মেয়েকে আমি দেখতে যাবো?কখনোই সম্ভব না।”
এতোক্ষণে ঠোঁট দুটো প্রসারিত করে হেসে ফেললো মেয়েটা,নিভৃত কন্ঠে বললো,
“আপনি খুব সুন্দর কথা বলতে পারেন,কত বছর পর হাঁসালেন আমায়।”
ইমরান ঠোঁট উল্টে তাকালো, একটু অবিশ্বাস্য কন্ঠে বললো,
“যেভাবে বললে মনে হচ্ছে যুগ যুগ ধরে হাসো নি।”
অথচ মেয়েটা নির্লিপ্ত কন্ঠে উত্তর দিলো,
“যুগ কিনা যানি না,তবে জন্ম থেকে হাসি নি।”
মেয়েটার এহেন অদ্ভুত উত্তর গায়ে মাখলো না ইমরান,উল্টো বুক ফুলিয়ে রস্য কন্ঠে বললো,
“বিষয় টা অদ্ভুত হলেও আমি কেন যানি গর্বে গর্ভবতি হয়ে যাচ্ছি।”
ইমরানের কথা শুনে পিচলে হাসলো মেয়েটা, ঠোঁট টিপে জিজ্ঞেস করলো,
“কীভাবে ?”
ইমরান জবাব দিলো দ্রুত,
“এই যে জন্ম থেকে না হাসা মেয়েকে প্রথমবার হাসিয়ে গর্ববোধ হয়েছে আর দ্বিতীয় বার হাসাতে পেরে গর্ভবতি হয়েছি।”
এবারে ঠোঁট আরেকটু প্রসারিত হলো মেয়েটার, পিক করে হেসে দিয়ে বললো,
“এখন যে তৃতীয় বার হেসে ফেললাম?”
ইমরান দাঁত কেলিয়ে বললো,
“এখন তো গর্বে গর্ভপাত হয়ে গেলো।”
মেয়েটা উচ্চস্বরে হেসে ফেললো,এক হাত মুখের উপর রেখে হাসি চেপে রেখে বললো,
“আপনি খুব মজার মানুষ।”
“কিন্তু এখন যে আমার মজা করার সময় নেই কটকটি।দুঃখিত তোমার নামটা তো জানি না তাই আরকি।”
“আমার নাম ছবি।”
“সে ছবি চিত্র যাই হও,এই রাস্তা ধরে উত্তর দিকে গেলেই আমাদের বাড়ি, যদি হাসতে ইচ্ছে করে চলে এসো ইচ্ছেমতো হাসাবো।এখন আমার সময় নেই, যেতে হবে,তাড়া আছে বড্ড।”
সম্মতিতে দু’দিকে মাথা নাড়ালো মেয়েটি, অস্ফুটে বললো,
“আচ্ছা।”
“আমি তাহলে আসছি।”
ইমরান আর দাড়ালো না, যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো সামনের দিকে।ঠিক তক্ষুনি বাধা দিয়ে পেছনে ডাকলো ছবি,
“শুনুন।”
ইমরান ঘুরে তাকালো, প্রশ্নবোধক চাহনি নিক্ষেপ করে জিজ্ঞেস করলো,
“হ্যাঁ বলো, কি বলবে?”
মেয়েটা শুখনো ঢোক গলদঃকরন করে ইতস্তত কন্ঠে বললো,
” আপনার নামটা তো জানা হলো না।না মানে যদি কখনো আপনার বাড়িতে যাই তাহলে কীভাবে খোঁজ করবো?”
ইমরান এক গাল হেসে বললো,
“আমার নাম?আমার নাম হলো ইমরান।”
আর দাড়ালো না ছেলেটা, নিজের নামটা বলেই বড়বড় কদম ফেলে এগিয়ে গেলো সামনের দিকে।কয়েক মিনিটের ব্যাবধানে মিলিয়ে গেলো অন্ধকারে।
ছবি সেই প্রান্তরে চেয়ে থেকে ম্লান হাসলো,মৃদু স্বরে বিরবির করে আওড়াল,
“আমি তোমার পরিবারকে ঘৃনা দিয়ে খুন করতে এসেছি,অথচ তুমি প্রথম দেখায় প্রেম বুনে দিলে।”
চলবে,,,,
(আগামী পর্বে আইরিশ আর নিস্পার বিয়ের দৃশ্য আসবে।হয়তো আগামী পর্বই সময় ভ্রমণের শেষ পর্ব হতে চলেছে।আর হ্যাঁ আগামী পর্বে ফ্লোরেন্সা নিস্পাও মুখোমুখি হবে।)

