#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:47
রাত গভীর।ব্রিটিশ মহলের চারপাশ মৃত্যু পুরির মতো নীরব,গায়ের কালো চাদরটা চেপে ধরে আছে ইমরান,মনে হচ্ছে রাতের আঁধার তাকে সম্পূর্ণ ঢেকে রেখেছে।মহলের পেছনে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সে,চাদরের এক প্রান্ত দাঁতে চেপে ধরে, হাতদুটো দেয়ালের ইটের ফাঁকে স্থিরভাবে বসিয়ে দেয়াল ডিঙালো দক্ষতার সাথে।
তারপর সতর্ক পায়ে এগোলো মহলের ভেতরের দিকে।লম্বা করিডোর পেরিয়ে সোজা চলে গেলো বা দিকে।কোথায় যাচ্ছে, বা কোথায় গেলে ফ্লোরেন্সাকে পাবে যানে না ইমরান,তবে আপাতত নিজেকে লুকিয়ে রেখেই যা করার করতে হবে।ফ্লোরেন্সাকে খুঁজে বের করা না অব্দি তার নিরাপত্তা নেই।যদি কোন ব্রিটিশ সৈনিকের সামনে পড়ে যায়, আর সেই সৈন্য যদি তাকে গুপ্তচর ভেবে যায়গায় গুলি মেরে দেয় তবে?তবে তো আর ফ্লোরেন্সাকে খুঁজে পাওয়া হবে না, আর নাতো নিজের পরিচয় বলার সুযোগ পাবে।
ভয়ে ভয়ে ঢোক গিললো ইমরান।এতোসব না ভেবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে নিলেই থমকায়।সামনে থেকে কারো এগিয়ে আসার পদধ্বনি ভেসে আসছে।ইমরান জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজায়,চকিতে তাকায় এদিক সেদিক।পাশেই একটা ঘর, নিঃশ্বব্দে মোড়ানো। কেউ আছে বলে তো মনে হয় না, আপাতত এই ঘরেই গা ঢাকা দিয়ে নিজেকে লুকানোর পায়তারা করে পায়ের গতি বাড়ায়, হনহনিয়ে ঢুকে যায় ঘরের ভেতর।
ঘঘরের ভেতর কাঁদছে নাবহা।হৃদয়ের ক্ষরণ চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে ঝর্ণার মতো, ঠোঁটের কোণে কোনো শব্দ নেই, না অভিযোগ, না প্রশ্ন।অথচ ভেতরটা ফুপিয়ে উঠে,দমফাটা চাপা আর্তনাদের সাথে বেড়িয়ে আসে ভেতরকার অভিমান,স্বার্থপর সে পুরুষকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে খুব করে,
“আপনি তো বলেছিলেন, শেষবার নয়,আমাদের আরও অনেক দেখা বাকি।
তবু কেন রেখে গেলেন আমায় অসমাপ্ত অপেক্ষার মাঝপথে?”
কোথাও কিছু নেই, শুধু একটানা নিরবতা।
নাবহার প্রশ্ন নিঃশব্দেই হারিয়ে যায়, ফিরে আসে না কোনো উত্তর। শব্দহীন ঘরের দেয়ালগুলো তার নিঃশ্বাসের শব্দেই বোবা হয়ে আছে।
হটাৎ শীতল হাওয়ার সাই-সাই সুরের সাথে ভেসে আসে এক অচেনা পদচারণার স্তব্ধ ছন্দ।হৃদপিণ্ডের ছন্দ এক নিমেষে পাল্টে যায় নাবহার।ছায়াপথের মতো গাঢ় হয়ে ওঠে তার দৃষ্টি। হতচকিত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায় সে। দু’হাতের পিঠে চোখের জল মুছতে মুছতে ধীরে ধীরে তাকায় দরজার দিকে।
কাঠের দরজার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ইমরান।কালো চাদরে মোড়ানো তার সমগ্র অবয়ব,মুখ দেখা যাচ্ছে না স্পষ্টভাবে।সম্পূর্ণ অচেনা অজানা এমন একজন মানুষের অসময় আগমনে বুকের ভেতরটা ধকধক করে ওঠে নাবহার, চোখের পাতা কেঁপে উঠে, ভয়ে শ্বাস আটকে যায় গলায়,
কে?কে আপনি?এভাবে কেন,,,,,
বাকি কথাটুকু শেষ করার সময় বা সুযোগ কোনটাই পেলো না নাবহা,তার আগেই ইমরান বজ্রপাতের মতো দ্রুততায় শক্ত হাতে চেপে ধরলো নাবহার মুখ।
বিদ্যুৎস্পষ্টের ন্যায় চমকে উঠলো নাবহা। চোখের কোণে আতঙ্ক জমে উঠলো শিশিরের মতো।নড়ার চেষ্টা করেও পারলো না। ভয়ে হিম হয়ে জমে গেল শরীর।
ইমরানের চোখদুটি তখন নাবহার খুব কাছে।
নাবহা ধীরে ধীরে তাকায় সেই চোখের দিকে,এক মুহূর্তের জন্য চোখাচোখি হলো দু’জনের।সময় থমকে দাঁড়ায়, নিঃশ্বাস হয়ে ওঠে ভারী, চারপাশের নিস্তব্ধতা ঢেকে দেয় হৃদয়ের শীতল ধ্বনি।নাবহার ভাষাহীন চাহনি ইমরানের হৃদয়ের সমস্ত প্রাচীর ভেঙে কড়া নাড়ে হৃদপিন্ডে।নাবহার শ্যামলরঙা ত্বকে সূর্যছায়ায় মোড়ানো ক্যানভাসের মতো দুটো কোমল চোখে থমকে যায় ইমরানের বোধশক্তি।এক অলৌকিক টানাপোড়েনের অনির্বচনীয় সংমিশ্রিত কন্ঠে বলে উঠে,
“আমি কে সেটা জানার আগে জানা দরকার তুমি কে?
নাবহা শুস্ক ঢোক গুলদঃকরন করে,খুস্ক কন্ঠতালু ভিজিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকায় ইমরানের দিকে।
ইমরান নিজেকে সংযত করে,নাবহাকে ছেড়ে দিয়ে যথাসম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে পুনরায় জিজ্ঞেস করে,
” এই মহলের কি হও তুমি?”
নাবহা একটু ইতস্তত বোধ করে,ভয়ে ভয়ে বলে,
“আমি এই মহলের দা,,,,
দাসী শব্দটা বলতে গিয়েও থামে মেয়েটা,অপমানবোধে জ্বলে উঠে কণ্ঠনালী, ইনিয়ে বিনিয়ে উত্তর দেয়,
” বন্দিনী। এই মহলের বন্দিনী আমি।”
নাবহার উত্তর শুনেই নিশ্চিত হয় ইমরান,এই মেয়ের দ্বারা তার কোন ক্ষতির সম্ভাবনা নেই ভেবেই স্বস্তির শ্বাস ফেলে,তারপর কন্ঠে উত্তেজনার পারদ মেখে জিজ্ঞেস করে,
“বন্দিনী? তাহলে তো এই মহলের রানীর খবর জানার কথা?”
নাবহার চোখে ফুটে উঠে কৌতুহল,সে উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“আপনি কি রানী ক্যাথরিনের কথা বলছেন?”
ইমরান দ্বিমত জানালো,উৎকন্ঠিত স্বরে বললো,
“আরে না,কোন ক্যাথরিন প্যাথরিনের কথা আমি কেন বলতে যাবো?আমি তো ফ্লোরেন্সার কথা বলছি,ব্রিটিশ পুত্র প্রিন্স জোসেফ তো ওকে রানী করার জন্যই এই মহলে নিয়ে এসেছিলো।”
ফ্লোরেন্সার নামটা শুনেই চুপসে যায় নাবহার মুখ,তবে ইমরানকে কিছু বুঝতে না দিয়ে নিম্ন স্বরে বললো,
“আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে,ফ্লোরেন্সা তো এই মহলের রানী নয়।”
ইমরানের চোখে খেলে গেলো বিস্ময়, উদগ্রীব কন্ঠে বললো,
“তাহলে?এতোদিনে তো বিয়ে হয়ে যাওয়ার কথা, হয়নি নাকি?”
নাবহা উত্তর দিলো না,গভীর ভাবে তাকালো ইমরানের দিকে,সশব্দ কৌতুহলে জিজ্ঞেস করলো ,
“আপনি কি হন ফ্লোরেন্সার?”
নাবহার প্রশ্ন শোনা মাত্রই বিলম্ব করলো না ইমরান,সেকেন্ডের গতিতে উত্তর দিলো চঞ্চল কন্ঠে,
“ভাই হই।ওর ছোট ভাই।”
নাবহা এবারে আরেকটু ভালো করে তাকালো ইমরানের দিকে।মানুষটার গায়ের রঙ কালো,ফ্লোরেন্সার মতো এতো ফর্সা সুন্দরী মেয়ের ভাই যে উনি বোঝা মুশকিল।উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরুর মতো বিস্তর ফারাক দুজনের মধ্যে।
নাবহাকে চুপ করে থাকতে দেখে ভ্রুকুটি তুললো ইমরান,তাড়া দিয়ে বললো,
“কি হলো চুপ করে আছ যে?”
নাবহা নড়েচড়ে উঠলো,মুচকি হেসে উত্তর দিলো,
“বাহ!ফ্লোরেন্সার কি সৌভাগ্য,তার খোঁজ করতে অন্তত তার ভাই এসেছে অথচ আজ দু বছর হতে চলেছে আমার খোঁজ করতে একটা পিপড়েও আসে নি।”
নাবহার কথা শুনে এপর্যায়ে খুব মায়া হলো ইমরানের।চোখেমুখে স্পষ্ট হলো দুঃখের ছাপ।তবে তার হাতে কিছু নেই,যদি থাকতো সবার আগে এই মেয়েটার সমস্ত আক্ষেপ দূর করার চেষ্টা করতো।আপাতত এই বিষয় টা এড়িয়ে যাওয়া ছাড়া ইমিরানের হাতে কিছু নেই।
ইমরান গলা পরিস্কার করলো,কথা এড়িয়ে গেলো দূর্ততার সাথে,
“তোমার কথায় তো রহস্যের ঘ্রাণ পাচ্ছি মেয়ে,সেই কখন থেকে ফ্লোরেন্সার নাম ধরে কথা বলছো, ব্রিটিশ প্রিন্স জানতে পারলে কি হবে জানো তো?ফ্লোরেন্সা কিন্তু,,,
নাবহা ঠোঁট টিপে চিবুক নামালো,রিনরিনিয়ে বললো,
” ফ্লোরেন্সা এই মহলের বন্দিনী। আমার মতোই বন্দিনী।”
নাবহার মুখ থেকে কথাটা ধেয়ে আসা মাত্রই বিস্ফোরিত হলো ইমরানের মস্তিষ্ক।আগুনঝরা কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“মানে?কি বলতে চাইছো তুমি?ব্রিটিশ প্রিন্স তো ওকে ভালোবেসে,,,,
নাবহা চিবুক নামিয়ে রেখেই নির্লিপ্তে জবাব দিলো,
” সেটা ভালোবাসা ছিলো না,সম্মোহনের প্রভাব ছিলো।এমন কৌশলে আমি ফ্লোরেন্সা সহ আরও অনেক মেয়েকে নিয়ে এসে এই মহলের দাসীতে রুপান্তর করেছে ওই জালিম প্রিন্স।”
ইমরানের কন্ঠ নিভে এলো,নিজের আদরের বোনের এমন নির্মম পরিনতি বাকরুদ্ধ করে দিলো তাকে,কাঁপা কন্ঠে বললো,
“আমার সহজ সরল বোনটা তাহলে এতোদিন এই মহলের দাসী হয়ে ছিলো?”
নাবহা অস্পষ্ট জবাব দিলো,
“হু। ”
ইমরানের চোখেমুখে জ্বলে উঠলো রাগ আর প্রতিহিংসার আগুন।যে আগুনে প্রিন্স জোসেফকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার ইচ্ছে তার,সে তীব্র স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“ফ্লোরেন্সা কোথায়?ওর সাথে দেখা করতে চাই আমি।”
নাবহা একইভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে,সোজাসাপ্টা উত্তরে বললো,
“ও চলে গিয়েছে।”
ইমরানের কপাল কুচকে এলো,ভ্রুকুটি তুলে উত্তেজিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“চলে গিয়েছে মানে?ফ্লোরেন্সা কি একা চলে গিয়েছে?ওকে নিতে যে আইরিশ ভাই এসেছিলো?ওনার সাথে দেখা হয় নি ফ্লোরেন্সার?”
আইরিশ!এই একটা নাম আবার শুনতে পেলো নাবহা,শুনতে পাওয়া মাত্রই সমস্ত বিষন্নতা উবে গেলো মন আকাশ থেকে।চকিতে তাকালো ইমরানের চোখের দিকে,মনে পড়ে গেলো মানুষ টা তাকে ফেলে রেখে গেছে,সে আসবে না,আর কখনোই আসবে না।কথাগুলো ভেবেই বিষাধ গিলে নিলো নাবহা,অন্তস্থঃতলের অন্তঃকরন খুব সাবধানে লুকিয়ে নিয়ে বললো,
“হ্যাঁ,উনার সাথেই চলে গিয়েছে বোধহয়। সন্ধ্যা থেকে তো তাই শুনছি সবার মুখে মুখে।”
নাবহার মুখে একথা শুনে তপ্ত শ্বাস ফেললো ইমরান।কৃতজ্ঞতাবোধ প্রকাশ করে বললো,
“ধন্যবাদ মেয়ে, খুব উপকার করলে।এখন তাহলে ভালোয় ভালোয় আমাকেও এই মহল থেকে বেড়োতে হবে।”
নাবহা রা রু করলো না, হাত তুলে বা পাশের দিকে ইশারা করে বললো,
“বা পাশের দেয়াল টা একট কম উঁচু ওদিক দিয়ে যাবেন,পালাতে সুবিধে হবে।”
ইমরান ঠোঁট উল্টালো,ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“পালানোর উপায় যানো দেখছি।তা পালাচ্ছো না কেন তাহলে?”
নাবহা ফ্যাকাসে মুখে উত্তর দিলো চটপট,
“পালিয়ে যাওয়ার যায়গা নেই আমার, এখানে বন্দী হয়ে থাকাটা আমার নসিবে লিখা হয়ে গিয়েছে।”
ইমরান দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,শুখনো কন্ঠে বললো,
“আচ্ছা তাহলে থাক কি আর করার।আমি তো সেধে নিজের নসিব খারাপ করতে পারি না বল?আমাকে তো অবশ্যই এখান থেকে বেড়িয়ে যেতে হবে।”
নাবহার উত্তর আশা করে নাবহার মুখপানে তাকিয়ে রইলো ইমরান, অথচ খুব মেপে মেপে কথা বলা মেয়েটা চুপটি করেই নিজেকে গুটিয়ে রাখলো।কিয়ৎক্ষন নাবহার উত্তরের অপেক্ষা করে অধৈর্য হলো সে, ধৈর্য হারা কন্ঠে বললো,
“আচ্ছা একটা কথা বলবো?”
নাবহা চোখ তুলে তাকালো এক পলক,তারপর পুনরায় দৃষ্টি নমিত করে শুধালো,
“কি বলুন?”
ইমরান মোলায়েম কন্ঠে বললো,
“তুমি চাইলে আমার সাথে যেতে পারো।”
“আপনার সাথে কোথায় যাবো?”
“কেন আমার বাড়িতে।”
ম্লান হাসলো নাবহা,হাসির দৌলতে মুখ উজ্জ্বল হবে দূরে থাক, অমাবস্যার মতো আধার নেমে এলো সর্বমুখে,চোখের পাতায় ভেসে উঠলো আইরিশের মুখ,বুকের ভেতর দহন শুরু হলো পুনরায়,বিবষ কন্ঠে আওড়াল,
“আপনার বাড়িতে তো ওই স্বার্থপর পুরুষের দেখা মিলে যাবে,কি করে যাই বলুন?”
ইমরান চটপটে, সময় বড় কম। ভোর হয়ে আসছে।তার আগেই বেড়োতে হবে এই মহল থেকে। অথচ এই মেয়েটা চুপ করে আছে, হা হু কিছুই বলছে না।বেশিক্ষণ চুপ থাকার সুযোগ দিলো না ইমরান,তাড়া দেখিয়ে বললো,
“কি হলো উত্তর দিলে না যে?যাবে আমার সাথে।”
নাবহা জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো,
“সামান্য কিছুক্ষণের পরিচয়,একজন পুরুষের সাথে চলে যাওয়ার জন্য কি এই পরিচয় টুকু যথেষ্ট?”
“আমাকে বিশ্বাস করতে পারছো না তাই না?”
“হু, যেখানে সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষটাই বিশ্বাস ভেঙে ছেড়ে চলে যায় সেখানে আপনি তো নিতান্তই অপরিচিত।”
“বিশ্বাস করে দেখতে পারো,আমি ছেড়ে যাবো না তোমায়।”
“আপনি বিনাসর্তে চলে যেতে পারেন,এসব রোমাঞ্চকর কথাবার্তা না বললেই খুশি হবো।”
ইমরান আশাহত হলো,যদিও মেয়েটার কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি আশা করে নি সে,তবুও সে খুব করে চেয়েছিলো মেয়েটা রাজি হয়ে যাক।সোনালী পরাগ মাখা কন্ঠে বলুক “রাজি।”
ভাবনা মতো তেমন কিছুই হলোনা দেখে রুদ্ধশ্বাস ছাড়লো ইমরান।হতাশ কন্ঠে বললো,
“যাচ্ছি তবে।”
ইমরান আর দাড়ানোর প্রয়োজন বোধ করলো না,মায়া না বাড়িয়ে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যোত হয় দ্রুত।
দু’হাতে কালো চাদর টা দিয়ে আগের মতোই ঢেকে নিলো নিজের মাথা ,তারপর সতর্ক চোখে উঁকি দিয়ে তাকালো ঘরের বাইরে।নাহ! কেউ নেই।চারপাশ সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ।ইমরান কদম বাড়ালো বাইরে বের হওয়ার জন্য দু পা বাড়াতেই পেছন ডাকলো নাবহা,
“শুনুন।”
তড়িৎ পেছন ঘুরে তাকালো ইমরান,এক বুক আশা সঞ্চার করে বললো,
“মত পাল্টেছে? যাবেন তাহলে আমার সাথে?”
নাবহা একটু চোখ রাঙিয়ে তাকালো,চাপা স্বরে বললো,
“আপনি এক লাইন বেশি কেন বুঝেন বলুন তো?”
ইমরান মুখটা চুপসে ফেললো,ফ্যাকাসে কন্ঠে বললো,
“তো?পিছু কেন ডেকেছ তাহলে?”
নাবহা একটু আমতাআমতা করলো,শুখনো ঢোক গিলে, আইঢাই করে বললো,
“আপনার আইরিশ ভাই না কি যেন বললেন?উনাকে গিয়ে একটা কথা বলতে পারবেন?”
“কি কথা আগে শুনি,এখান থেকে বেঁচে বেড়োতে পারলে অবশ্যই বলবো।”
নাবহা কন্ঠে শ্বাস চেপে রেখে বললো,
“বলবেন উনার জন্য অপেক্ষা করেছিলাম আমি,উনার সাথে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করেছিলাম নিজেকে, কিন্তু উনি আসে নি,আমি খুব কষ্ট পেয়েছি।”
ইমরান অতো পেচ ধরলো না, নাবহার বলা কথাটা খুব সাধারণ ভাবে নিয়ে বললো,
“আচ্ছা ফিরে গিয় তোমার কথাই সবার আগে বলবো আমি।খুশি?”
নবহা উপরনিচ মাথা নাড়িয়ে বোঝালো খুশি।ইমরান সন্তুষ্ট হলো না এইটুকুতে, ঠোঁট উল্টে বললো,
“কোথায় খুশি? একটুও যে হাসলে না।”
“খুশি বোঝাতে হাসতে হয় নাকি?”
“দেখা হলো অব্দি একবারও হাসেন নি, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে হাসলে তোমাকে ভিষণ সুন্দর লাগবে।”
“দেখা হলো তো কিছুক্ষণ, এর মধ্যে আমার প্রতি এতো কৌতুহল জেগে গেলো?”
“কৌতুহল?উঁহু, তোমাকে প্রথম দেখে কৌতূহল নয়, মনে হচ্ছে বহু জন্মের অপেক্ষা হঠাৎ এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।”
ইমরানের হৃদয় থেকে নির্গত অনুরাগী বাক্যালাপে বিব্রতবোধ করলো নাবহা।প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে বললো,
“আপনি এখন আসতে পারেন।”
ইমরান কি বলবে ভেবে পেলো না,তবে মেয়েটা যে খুব সাবধানে তাকে এড়িয়ে যেতে চাইছে সে কথা ঠিকই বুঝতে পারলো সে,তাই আর কথা না বাড়িয়ে বললো,
“পথটা দেখিয়ে দিলে উপকৃত হতাম।”
“আমি বেশিদূর যেতে পারবো না,তাছাড়া দুজন একসাথে গেলে নজরে পড়ার ভয় আছে,আপনি এক কাজ করুন,সোজা হেটে,দাসীদের রন্ধনসালার দিকে চলে যান,ওদিক থেকে বা দিকে নজর দিলেই দেখবেন বেড়োনোর পথ,ওখানকার দেয়াল গুলোও উঁচুতে কম।”
“আচ্ছা, যাচ্ছি তবে আমি।ভালো থাকবেন।”
নাবহা অবলীলায় অস্পষ্ট শব্দ করলো,
“হু।”
ইমরান সতর্ক পায়ে ঘর থেকে বেড়োতে বেড়োতে বললো,
“ধন্যবাদ।”
____________
মহলের পেছনের দেয়ালের কাছে এসে থেমেছে ইমরান।নাবহা ঠিকই বলেছে,এই পাশের দেয়াল টা তুলনামূলক অনেকটাই নিচু।এখন এই দেয়ালটা টপকে ওপারে যেতে পারলেই নিশ্চিন্ত।
ইমরান আরও একবার সতর্ক দৃষ্টিতে দেখে নিল চারদিকটা। ভোরের আলো ফোটার জন্য অপেক্ষা করছে দূর আকাশের কিনারায়। খুব বেশি সময় নেই তার হাতে,এর আগেই পালাতে হবে।নিজেকে স্থির করে নিয়ে দেয়ালের গায়ে হাত রেখে দু’ফুট মতো উপরে উঠতেই কুকুরের খেউখেউ শব্দে থমকে গেলো ইমরান।গলার রগ ফুলিয়ে, একজোটে ইমরানের দিকেই এগিয়ে আসছে দুটো কুকুর।
ইমরানের মেরুদণ্ড বেয়ে বরফজল গড়িয়ে নামলো। নিচের দিকে তাকিয়ে বুকটা কেঁপে উঠলো ভয়ে, ছুটে আসা দুটো ভয়ঙ্কর কুকুরের চোখ লালচে, এক থাবাতেই মাটি খুঁড়ে ছুটে আসছে তারই দিকে।নাজেহাল ইমরান কাঁপা গলায় হুস হুস শব্দ করলো, হাত নাড়িয়ে দূরে পাঠানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালালো কুকুর গুলোকে।অথচ কুকুর গুলো চলে যাওয়ার বদলে ফুসে উঠলো, ছোঁ মেরে কামড়ে ধরলো তার লুঙ্গির দু’পাশ!
তারপর? তারপর আরকি?যা ঘটার তাই ঘটলো।কুকুরগুলোকে নিজের শেষ সম্বল লুঙ্গিটা সপে দিয়ে ইমরান জীবন হাতে নিয়ে দৌড়ে পুনরায় ঢুকে গেলো মহলের ভেতরে।
ইমরান প্রানপন ছুটছে,কোন দিকে কোথায় ছুটছে সে জ্ঞান লোপ পেয়েছে বেচারার।পরনের ঢিলেঢালা ফতোয়াটা বেশ বড় হওয়ায় লজ্জা স্থান ঢেকে গেছে কোনরকম। কিন্তু এ অবস্থায় এমন শক্ত পোক্ত দামড়া ছেলেকে দেখতে খুব বেশিই অদ্ভুত দেখাচ্ছিলো।
কুকুরের একঘেয়ে ঘেউঘেউ শব্দে ঘরে বসে থাকতে পারলো না নাবহা।দরজার কপাট খুলে বাইরে বেড়িয়ে এলো পরিস্থিতি বোঝার জন্য।ঠিক তক্ষুনি হাওয়ার বেগে দৌড়ে এসে তার সামনে দাড়ালো ইমরান।
নাবহা হতচকিত।কিংকর্তব্যবিমুঢ়।তাজ্জব হয়ে তাকালো ইমরানের দিকে।ভ্যাবাচেকার চরম পর্যায়ে গিয়ে হতহ্বিবল কন্ঠে আওড়াল,
“নাউজুবিল্লাহ আস্তাগ ফিরুল্লাহ।এই অবস্থা কেন আপনার?
ইমরান নিজের দিকে তাকিয়ে জোর করে ফোকলা হাসলো,ইতস্তত কন্ঠে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো,
“ইয়ে মানে, না মানে, দুটো কুকুর লুঙ্গিটা কামড়ে খুলে নিয়ে গেলো।”
নাবহা কটমট করে তাকালো,ইমরানের গায়ের চাদর টার দিকে ইশারা করে বললো,
“বাহ! চাদর টা ধরে রাখতে পারলেন অথচ লুঙ্গিটা রাখতে পারলেন না?”
ইমরান হাফাচ্ছে,জোড়ে জোড়ে শ্বাস টেনে কিছু বলতেই যাবে ঠিক তক্ষুনি নাবহা আবার বলে উঠলো,
“আপনি এই অবস্থায় আমার সামনে কি করে এলেন?অন্তত এই চাদর টা তো পেচিয়ে নিতে পারতেন।”
ইমরান বিস্মিত নয়নে তাকালো নাবহার দিকে, তারপর পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যের জিনিস দেখার মতো করে তাকালো নিজের গায়ের চাদরটার দিকে,বেক্কেলে কন্ঠে বললো,
“আমার গায়ে চাদর ছিলো?ইয়ে আসলে ভয়ের ঠেলায় স্মৃতিশক্তি চাঁদ ভ্রমণে চলে গিয়েছিলো।ভাগ্যিস তুমি মনে করিয়ে দিলে।”
তারপর দ্রুত হাতে চাদর টা কোমরে পেচাতে পেচাতে বিরবির করে আওড়াল,
“শালা কিপ্টা প্রিন্সের বাচ্চা বেতন দিয়ে দারোয়ান রাখবি তা না,কুত্তা রেখে আমার ইজ্জত কেড়ে নিলি।”
কোমরে চাদর পেচানোর সময়টুকুকে পাল্লা দিয়ে তাকে ঘিরে ধরলো প্রায় পাঁচ ছয়জন ব্রিটিশ সৈন্য।ছেলেটা আনমনা নয়ন তুলে তাকাতেই পিলে চমকে উঠলো, আতংকিত কন্ঠে বললো,
“আরেহ এরা কারা?”
নাবহা দাঁতে দাঁত পিষলো,চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
“আপনার স্মৃতিশক্তির সাথে আপনাকেও চাঁদে পাঠাতে এসেছে এরা।
______________
পরশু রাতের অন্ধকারে হাঁটতে বেড়িয়েছিলো আব্দুল হানিফ।মহলের আবহাওয়া সম্পর্কে তার বিশেষ কোন কৌতুহল ছিলো না,তবে রাতের আধারে কয়েকটা কক্ষ খুঁজে বেড়িয়েছে তার রুপাঞ্জেল কে। অথচ খুঁজে পায় নি,আশাহত হয়ে নিজের উপর নিজেই চরম বিরক্তি প্রকাশ করে হনহনিয়ে বেড়িয়ে আসে মহলের বাইরে।
হাটতে হাটতে প্রায় বেশ অনেকদূর চলে আসার পর সে শুনতে পায় এক অদ্ভুত গোঙানির আওয়াজ।কেউ পানি পানি বলে কাতড়াচ্ছে ভিষন।শব্দের উৎস খুজতে খুজতে হানিফ গিয়ে পৌছায় সেই অন্ধকার আধ ভাঙা কুটিরে, যেখানটায় গত দুইদিন যাবত বন্দী হয়ে পড়ে আছে ফ্লোরেন্সা।
ঘরের মেঝেতে হাত পা বাধা অবস্থায় পড়ে আছে ফ্লোরেন্সা।ভেজা নিঃশ্বাসে মিশে থাকা করুণ আর্তিতে বলছে “পানি,,,, পানি,,,”
আব্দুল হানিফ থমকে দাঁড়ায়।ভুলে যায় দিক দিশা।যেই রুপের রানী রুপাঞ্জেলকে খুজতে এসে ব্রিটিশ প্রিন্সের মহলে অপমানিত হতে হয়েছে সেই মেয়ে কিনা এখানে এভাবে এতো খারাপ অবস্থায় পড়ে আছে?
ব্যাস আর কিছু ভাবার সময় পেলোনা হানিফ।ফ্লোরেন্সাকে তুলে নিয়ে ছাড়লো ব্রিটিশ মহলের বাতাস।রাতের অন্ধকারে তার রুপাঞ্জেলকে নিয়ে চলে গেলো নিজের বাড়িতে।এদিকে সে জানতেও পারলো না মহলে আজ তার জন্য ভিন্ন কিছু অপেক্ষা করছিলো,কেউ খুব সুক্ষ্ম পরিকল্পনায় রক্ত দিয়ে সাজিয়ে রেখেছিলো তার সন্তানের লাশ।যদিও সত্যের নির্মম মৃত্যুতে তার কিছুই যায় আসতো না।
____________
দুপুর মধ্যাহ্নের দিকে আইরিশের সাথে বাকের গঞ্জে পা রেখেছে নিস্পা।বুকের ভেতর দামামা বাঝছে তার।কোথায় যাচ্ছে? যাওয়ার পর কি হবে?কি অপেক্ষা করছে তার জন্য? এমন নানাবিধ প্রশ্নে জর্জরিত হয়েছিলো মস্তিষ্ক।
অত:পর আইরিশের সাথেই ফ্লোরেন্সার বাড়িতে পা রাখে নিস্পা।কারণ তার যাওয়ার জায়গা নেই,যতদিন সে এই সময়ের গহ্বরে আটকে থাকবে ঠিক ততদিন সময়ের নিয়ম মতোই চলতে হবে তাকে,সময় যেদিকে নেয় কূল হারা নদীর মতো সেদিকেই প্রবাহিত হওয়া ছাড়া তার কোন উপায় নেই।তাকে এগিয়ে যেতে হবে চলমান, অনিয়ন্ত্রিত, অজানা এক পরিণতির দিকে।
ফেরার পর তেমন কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় নি তাকে।আইরিশ খুব সুন্দর করে সবটা সামলে নিয়েছে।যদিও সত্যিটা বলার জন্য খুব উশখুশ লাগছিলো নিস্পার তবুও কেন যানি বলতে পারলো না,এতোগুলো ভগ্ন হৃদয়ের মানুষগুলোকে আরেকটু ভেঙে দিয়ে বলতে পারলো না সে আসল ফ্লোরেন্সা নয়।তাছাড়া সত্যের লাশ নিয়ে মালেকার কাছে ফিরে যাওয়ার সাহস হয় নি নিস্পার।তাই খান বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে কবর দেওয়া হয়ছে সত্যকে।
সবচেয়ে বেশি খারাপ লেগেছিলো ফ্লোরেন্সার মায়ের আহাজারিতে।নিস্পাকে বুকে নিয়ে অঝোরে কেঁদেছেন তিনি।উন্মাদের মতো চুমু খেয়েছেন নিস্পার চোখেমুখে। এক মূহুর্তের জন্য নিস্পা ভুলে গিয়েছিলো সে অনাথ,তার জন্মের পাঁচ বছর পর থেকে সে আর মায়ের ভালোবাসা পায় নি।
সময় ভ্রমণ আর কিছু দিতে পারুক বা না পারুক।কিছু সময়ের জন্য একজন সত্যিকারের মায়ের আদর খাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে এটা ভাবলেই সমস্ত যন্ত্রণা লাঘব হয়ে যায় নিস্পার।
মেয়ের শোকে সারাক্ষণ বিছানায় পড়ে থাকা মানুষটাও সে আসার সাথে সাথে নিজের পায়ে হেটে চলে এসেছে তার কাছে।বাবার স্নেহ আদরে ভরিয়ে দিয়েছে তার তৃষ্ণার্ত বুক।
সবচেয়ে অবাক করা বিষয়টা ঘটেছিলো যখন নিস্পা ফুলমতিকে দেখতে পেলে।নিজের বৃদ্ধা দাদিকে যুবতি নারীর বেশে দেখতে পাওয়ার মতো রোমাঞ্চকর ব্যাপার আর কি হতে পারে।
তার জন্মের আগেই দাদা মারা গিয়েছিলো। তাই দাদাকে দেখার সৌভাগ্য নিস্পার হয়নি।অথচ আজ যখন ফুলমতির স্বামী এসে নিস্পার মাথায় হাত রাখলো মনে হলো তার দাদা তাকে আদর করছে,হ্যাঁ দাদাই তো,তার জোয়ান দাদা।কত সৌভাগ্য তার,এমন অপরুপ লীলাখেলার সাক্ষী হতে পারলো সে।
সবাই চলে যাওয়ার যখন ফুলমতি এসে চুপিচুপি বলেছিলো,
“এতোদিন কোথায় ছিলা আম্মিজান?তোমার জন্য তো একখান সুসংবাদ আছে।”
নিস্পা তখন কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকায়,সুসংবাদ টা শোনার লোভে জিজ্ঞেস করে,
“কি সুসংবাদ শুনি?”
ফুলমতি তখন লাজুক হাসে,কোমলপ্রাণ কন্ঠে বলে,
“আমি মা হইতে চলেছি।”
বিস্ময়ে নিস্পার চোখ বড়বড় হয়ে গেলো,এক অদ্ভুত অদৃশ্য আকর্ষণ অনুভব করে চাইলো ফুলমতির পেটের দিকে।এই পেটের সন্তানটাই তো তার বাবা।যে এখন ফুলমতির গর্ভে একটু একটু করে বড় হচ্ছে।ভাবতেই কেমন অবাক লাগছে নিস্পার,এ এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা।এডভাঞ্চারের চেয়েও কম নয়।
_______
পুরো একদিন অজ্ঞান থাকার পর পরের দিন সকালে জ্ঞান ফিরে ফ্লোরেন্সার,জ্ঞান ফেরার সাথে সাথেই টান তিন দিনের অভুক্ত মেয়েটা পেট ভরে খাবার খায়।পানির পিপাসায় কাতর হয়ে উন্মাদের মতো পানি খায় কয়েক গ্লাস।
সেদিন ওই অন্ধকার ঘরে ফেলে রেখে যাওয়ার পর আশিক আর আসে নি।কেন আসে নি, কি জন্য আসেনি সে কারণ জানার চেয়ে বেশি মেয়েটার কলিজাটা ছটপট করছিলো আশিক কবে ফিরবে এই প্রশ্নে।যদি আশিক না ফেরে তবে দম বন্ধ হয়ে সে ওই ঘরেই পচে গলে মরে থাকতো,হয়তো পোকামাকড়ে খেয়ে ফেলতো তার শরীরের পঁচা মাংস। তার আর বেঁচে থাকা হতো না,আইরিশ ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চাওয়া হতো না,বলা হতো না সে ভুল করেছে, মস্ত বড় ভুল করেছে, সে এখন কেবল আইরিশ ভাইকে চায়,বাকি জীবন টা একটু সুখে কাটাতে চায়।
যদি এই ফেরেস্তার মতো মানুষটা সেই ঘরে না আসতো,যদি তাকে বাঁচিয়ে না নিতো সেই মৃত্যুপুরি থেকে তবে তো তার মৃত্যুর সাথে সাথে তার ইচ্ছেগুলোও উইপোকায় খেয়ে ফেলতো।
তৃপ্তি ভরে খাবার খেতে খেতে নানারকম কথা ভাবছে ফ্লোরেন্সা, এদিকে আব্দুল হানিফের মুগ্ধ দৃষ্টি যে তার পানে নিবদ্ধ সে বিষয় টা খেয়াল করে উঠতে পারলো না সে।
পাশেই রোবটের মতো খাবারের বাটি হাতে নিয়ে দাড়ানো মালেকা।তার চোখের অশ্রু বরফের মতো জমে আছে চোখের কোনে। আতংক ভয়ংকর দানবের ন্যায় গিলে ধরে আছে তার সর্বাঙ্গ,হানিফের ইশারাতেই কিছুক্ষণ পর পর ফ্লোরেন্সার থালায় খাবার বেড়ে দিচ্ছে সে।এছাড়া টু শব্দ অব্দি করছে না।
প্রায় অনেকটা সময় নিয়ে খাবার শেষ করলো ফ্লোরেন্সা,তৃপ্তির ঢেকুর তুলে তাকালো আব্দুল হানিফের দিকে,কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললো,
” আপনাকে অনেক ধন্যবাদ,আজ আপনি না থাকলে আমি বোধহয় মরেই যেতাম।”
হানিফ কিঞ্চিৎ ভড়কায়,রুপাঞ্জেলের তার প্রতি এমন সদয় ব্যাবহারের জন্য অপ্রস্তুতই ছিলো বটে।মনে মনে ভাবলো মেয়েটার কি ভুলে যাওয়ার রোগ আছে নাকি?সেদিনের সেই বিভৎষ ঘটনা মনে আছে বলে তো মনে হচ্ছে না।নাকি অভিনয় করছে?এতো সুক্ষ্মভাবে বুঝি ভুলে থাকার অভিনয় করা যায়?
নিজের ভেতরকার প্রশ্নে নিজেই জর্জরিত হলো আব্দুল হানিফ।তপ্ত শ্বাস ফেলে তাকালো ফ্লোরেন্সার দিকে।তারপর ফ্লোরেন্সার ভাবগতি অনুযায়ী খুব সাবধানে উত্তর দিলো,
“ধন্যবাদের প্রয়োজন নেই রুপাঞ্জেল।আমি তোমাকে বিনাসর্তে যেকোনো বিপদ থেকে রক্ষা করতে প্রস্তুত।”
ফ্লোরেন্সা একটু অপ্রস্তুত ভঙিতে তাকায়,খুব সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখে হানিফকে,লোকটাকি তাকে চেনে?এমন ভাবে কথা বলছে যেন চেনে,কিন্তু কি করে চেনে?কই আগে কখনো দেখেছে বলে তো মনে হচ্ছে না।
মনের প্রশ্নে মনে চেপে সৌজন্য হাসলো ফ্লোরেন্সা,তারপর মোলায়েম স্বরে বললো,
“আমি আপনার প্রতি আজিবন কৃতজ্ঞ থাকবো।যদি আমাকে বাড়ি ফেরার ব্যাবস্থা করে দিতেন তবে আরেকটু উপকৃত হতাম।”
ফ্লোরেন্সার মুখে ফিরে যাওয়ার কথা শুনেই দপ করে নিভে গেলো হানিফের উজ্জ্বল চাহনি,ভেতরে ফুসে উঠলো তার হিংস্র সত্ত্বা,অথচ খুব ঠান্ডা স্বরে প্রত্যুত্তর করলো,
“নিজের ক্ষতি করে আমি তো কারো উপকরণ করি না রুপাঞ্জেল।”
ফ্লোরেন্সা রীতিমতো ঘাবড়াল এবার,শুখনো ঢোক গিলে বললো,
“মানে?”
আব্দুল হানিফ ধিরে ধিরে উঠে এসে দাড়ালো ফ্লোরেন্সার কাছে, তারপর ফ্লোরেন্সার কোমল গালে নিজের খরখরে করতালু ছুইয়ে দিয়ে স্বগোতক্তিতে আওড়াল,
“তুমি চলে গেলে যে আমার মস্ত বড় ক্ষতি হয়ে যাবে রুপাঞ্জেল।”
তরাগ করে চোখ উল্টোলো ফ্লোরেন্সা,হানিফের কথার অর্থ বুঝতে না পেরে বললো,
“আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।”
আব্দুল হানিফ কুটিল হাসলো,ভয়ংকর কন্ঠে বললো,
“বেগম হবে তুমি আমার।আজকেই তোমাকে বেগম বানাবো আমি।”
মাথায় বজ্রপাত পড়ার মতো চমকে উঠলো ফ্লোরেন্সা,উৎকন্ঠিত স্বরে বললো,
“এসব কি বলছেন আপনি? মাথা ঠিক আছে আপনার?”
আব্দুল হানিফ অদ্ভুত ভাবে গ্রীবা বাঁকালো ,হিসহিসিয়ে বললো,
“তোমাকে দেখার পর থেকেই মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে বিবি রুপাঞ্জেল।তোমাকে নিজের না করা অব্দি শান্তি নেই, কিছুতেই শান্তি নেই।”
হানিফ আর দাড়ালো না,সময় অপচয় করলো না এক মূহুর্ত।খুব শান্ত স্বরে বললো,
“আগের বারের মতো পালানোর ভুল করোনা রুপ।নয়তো খুব ভয়ংকর রুপ দেখবে আমার।”
বিস্ময়ে ঔষ্ঠ্যদ্বয় ফাঁকা হয়ে এলো ফ্লোরেন্সার।সম্পূর্ণ অচেনা অজানা লোকটার মুখে এমন অদ্ভুত বাক্য শুনে প্রকম্পন খেলে গেলো ফ্লোরেন্সার শরীরে।পুনরায় কিছু প্রশ্ন করার আগেই হনহনিয়ে কক্ষ ত্যাগ করলো হানিফ,প্রতিটি কদমে বুঝিয়ে গেলো তার হিংস্রতা।
__________
বাকের গঞ্জে আজ নতুন সকাল নিস্পার।
কক্ষের ভেতর একাকি মাথা এলিয়ে বসে আছে সে।দুশ্চিন্তায় মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম তার।একটু আগেই ফ্লোরেন্সার মা এসেছিলো তার কাছে,জানিয়ে গিয়েছিলো ভয়ংকর এক সীদ্ধান্ত।আইরিশ নাকি আগামীকালই তাকে বিয়ে করবে।একটা ঝামেলা শেষ না হতে হতে এতো দ্রুত আরেকটা ঝামেলায় জড়িয়ে যাবে ভাবতেই পারে নি নিস্পা।এখন কি করে এই বিয়ে বন্ধ করবে সেই চিন্তায় দপদপ করছে মস্তিষ্ক।
ভাবনার মাঝেই কারো পদচারণার শব্দে নড়েচড়ে উঠলো নিস্পা,তরাক করে গ্রিবা ঘুরিয়ে তাকালো সামনের দিকে।সাদা লুঙ্গি আর একটা সবুজ রঙের ঢিলেঢালা শার্ট পড়ে দাঁড়িয়ে আছে আইরিশ।নিস্পাকে হকচকিয়ে উঠে বসতে দেখে এগিয়ে এলো স্বগোতক্তিতে,তারপর উদগ্রীব কন্ঠে বললো,
“ভয় পেয়েছিস?”
নিস্পা একটু অপ্রস্তুত ভঙিতে দ্রুত উত্তর দিলো,
“না না তেমন কিছু নয়।”
আইরিশ মুচকি হাসলো,তারপর শান্ত নদীর স্রোতের মতো খাপছাড়া কন্ঠস্বরে শুধালো,
“চাচি আম্মা এসেছিলো?”
নিস্পা সোজাসাপ্টা জবাব দিলো ছোট্ট করে,
“হ্যাঁ।
আইরিশ জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ফের শুধালো,
” কিছু বলেছে?”
নিস্পা বুঝতে পারলো আইরিশের ইঙ্গিত, আইরিশকে নিষেধ করার উদ্দেশ্যে ঠোঁট নাড়ালো দ্রুত,
“কিন্তু,,,,
আইরিশ হাত বাড়িয়ে আঙুল রাখে নিস্পার ঠোঁটের উপর,তারপর নিস্পার চোখের সাথে চোখ মিলিয়ে শিশির ভেজা কন্ঠে বললো,
” কোন কিন্তু নেই।তোকে পাওয়ার মূহুর্তে আর এক সেকেন্ডও অবহেলা করতে চাই না আমি।”
তারপর ফ্লোরেন্সার ফেলে রেখে যাওয়া আলেকজান্দ্রা পাথর খচিত আংটিটা বের করলো পকেট থেকে,খুব ধিরে সুস্থে সুন্দর করে আংটিটা পড়িয়ে দিলো নিস্পার অনামিকায়,মোহিত কন্ঠে বললো,
“পাথরটার উজ্জ্বলতা বেড়েছে মনে হচ্ছে, আগের তুলনায় আরেকটু বেশি সুন্দর লাগছে আজ।কি হলো বলতো?আমার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে নাকি তোর সৌন্দর্য বেড়েছে।”
নিস্পা উসখুস করলো, এই আংটিটা দেখেই মনে পড়ে গেলো সেদিনকার কথা।এমপি তাওসিফ তাকরিমও তো তাকে একটা আংটি পড়িয়ে দিয়েছিলো,অনুরিকা আংটিটার বিবরন ঠিক যেমনটা বলেছিলো তেমনটাই তো মনে হচ্ছে এই আংটি টা।তাহলে কি এটাই সেই আংটি?কিন্তু আংটিতে যে তার কোন হক নেই, এই আংটি পড়ার অধিকার শুধুমাত্র ফ্লোরেন্সার।
নিস্পা দম নিয়ে কিছু বলতেই যাবে তার আগেই পেছন থেকে ভেসে আসে সুফির ভগ্ন কন্ঠ,
“আইরিশ ভাই?কোথায় আ,,,,
নিস্পা আর আইরিশকে এতো কাছাকাছি দেখে থমকে যায় সুফি,জমাট বাধা রক্তের মতোই জমে যায় কন্ঠ,আইরিশ কিঞ্চিৎ নড়েচড়ে দূরে সরে দাঁড়ায়া,তারপর সুফিকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“কিরে কিছু বলবি?”
সুফির বুকের ভেতরে রক্তক্ষরণের প্রকোপ,কেন যানি ফ্লোরেন্সার আগমন মেনে নিতে পারছে না সে,না তো সহ্য করতে পারছে তাদের এই বিয়ের সংবাদ।সবাটাই যেন দুঃস্বপ্ন।তাকে জীবিত অবস্থাতেই মেরে ফেলার মতো ভয়ংকর এক দুঃস্বপ্ন।
সুফির উত্তর না পেয়ে এগিয়ে এলো আইরিশ,পুনরায় জিজ্ঞেস করলো,
“কিরে?ডাকছিলি কেন?”
সুফি ঘাবড়ে উঠলো,বড় বড় নিঃশ্বাস টেনে বললো,
“হাতমুখ ধুয়ে আসুন আইরিশ ভাই, খাবার বেড়েছি।”
আইরিশ ভনিতা করল না, সোজাসাপ্টা বললো,
“ঢেকে রাখ।এখন নয়, পরে খাবো।এখন গঞ্জে যাবো ফ্লোরেন্সার জন্য শাড়ি কিনতে।”
সুফির কন্ঠ চেপে আসছে,গলবিল শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে দহনে,ফ্লোরেন্সার জন্য শাড়ি,নিশ্চয়ই বিয়ের শাড়ি কিনতে যাওয়ার কথাই বলছে আইরিশ ভাই।কথাটা ভাবা মাত্রই ব্যাকুল হৃদয় গলাকাটা মুরগী মতো ছটপট শুরু করলো, কোনরকম যন্ত্রণা গিলে নিয়ে বেদনাবিধুর কন্ঠে গুনগুনিয়ে বললো,
“এখনি যাবেন?সকাল থেকে তো কিচ্ছু খান নি।খেয়ে যান এক মুঠো।”
“সমস্যা নেই, গঞ্জ থেকে ফিরে খাবো,তুই এক কাজ কর মাছের কাঁটা টা বেছে রাখ।”
সুফি আস্তে করে এক ফোটা চোখের পানি ছেড়ে দিলো, এই মানুষ টা মাছের কাটা বাছার ক্ষেত্রে তাকে এতো পরিমাণ বিশ্বাস করে অথচ জীবন সঙ্গি হিসেবে বিশ্বাস করতে কত খামখেয়ালি তার।
সুফির নাজুক সত্ত্বা কুন্ঠিত।সে নবনীর মতো স্নিগ্ধ কন্ঠে বলে,
“মাছের কাঁটা বেছে গরম ভাত জুড়িয়ে রেখে এসেছি আপনার খাটের ওপর।দুটো খেয়ে যাবেন।”
আইরিশ এক নজর তাকালো নিস্পার দিকে, তারপর ঠোঁটে হাসি টেনে বললো,
“আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে বরং আমি খেয়েই যাই।”
আইরিশ আর সময় নষ্ট করলো না,সুফিকে রেখেই বেড়িয়ে গেলো ঘর থেকে।আজ প্রচুর ব্যাস্ততা তার,এক মুঠো ভাত খেয়েই বেড়োবে গঞ্জের দিকে।ফ্লোরেন্সার জন্য গঞ্জের সবচেয়ে সুন্দর আর দামি শাড়িটা কিনে আনবে,নিজের পছন্দের রঙের শাড়িতে বউ সাজাবে তার আলেকজান্দ্রাকে।
আইরিশকে চলে যেতে দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সুফি,এগিয়ে এসে দাড়ালো নিস্পার কাছে।নিস্পার অনামিকায় দ্যুতি ছড়াচ্ছে আলেকজান্দ্রা খচিত আংটি টি।সুফি ঝাপসা চোখে সেই পাথরটির দিকে তাকিয়ে বললো,
“তুই খুব ভাগ্যবান ফ্লোরেন্সা।”
নিস্পা নির্বিকার ভ্রু উচালো,বুঝতে না পেরে বললো,
“কেন?”
সুফি ব্যাথাতুর কন্ঠে উত্তর দিলো,
“এই যে তুই হারিয়েও অক্ষত, আমি বেঁচে থেকেও মৃত।”
” কথাটা ঠিক বুঝতে পারলাম না।”
“বুঝতে না পারার কি আছে?আইরিশ ভাইয়ের ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করে চলে যাওয়ার পরেও অক্ষত ফিরে পেলি।অথচ আমাকে দেখ, আমি হাজার চেয়েও পাই না।”
নিস্পা মুচকি হেসে ফেললো,এগিয়ে এসে আলতো হাত রাখলো সুফির গালে,নরম স্বরে বললো,
“বেঁচে গিয়েছ।ভালোবাসার নির্মম দংশন তুমি সহ্য করতে পারতে না।”
“তুই অনেক বদলে গিয়েছিস ফ্লোরেন্সা।”
“কেন মনে হলো ?”
“এই যে আমাকে তুই থেকে তুমিতে নিয়ে এসেছিস।সম্পর্কে কতটা দূরত্ব চলে এসেছে তাই না?অথচ আমার পাপ্যই এটুকু,বাড়ির আশ্রিতা এর চেয়ে বেশি আর কিই বা আশা করে?”
“অযথাই কষ্ট পাচ্ছ তুমি।তুমি যা ভাবছো তেমন কিছুই নয়।আশা করি কাল সব বুঝতে পারবে।”
“কাল?কাল তো তোর বিয়ে,এই বাড়ির মেয়ে থেকে বউ হবি।অধিকার টা আরেকটু বাড়বে। সেজন্যই কি এতো বেশি দূরত্ব।”
আনমনে কথাটা বলতে বলতে চোখের পানি ছেড়ে দিলো সুফি,নিস্পা ঠোঁট টিপে কোমল কন্ঠে বললো,
“তুমি তো দেখছি বেশ অভিমানী মেয়ে,তোমার এবারকার ভাবনাটাও ভুল।চিন্তা করো না কাল এই বিয়েটা আমি করবো না।”
সুফি আচানক মুখ চেপে ধরলো নিস্পার,উদগ্রীব কন্ঠে বললো,
“এমন অশুভ কথা আর বলিস না ফ্লোরেন্সা, ওই যে হাসি খুশি মানুষটাকে দেখছিস উনি মরে যাবে।তোকে না পেলে উনি সর্বশান্ত হয়ে যাবে।”
নিস্পার দৃষ্টি ভঙ্গুর হয়ে আসে,নমনীয় কন্ঠে বলে,
“উনাকে ভালোবাসো তাইনা?উনার কষ্টে নিশ্চয়ই নিজেও কষ্ট পাও।”
সুফি ঠোঁট কামড়ে চোখ মুছে দু হাতে,বেদনাবিধুর কন্ঠে বলে,
“পাই, পাই বলেই তো বলছি, তোকে বিয়ে করতে না পাওয়ার কষ্টে উনি যখন তড়পাবে তখন আমিও তড়পাবো উনার চেয়ে দ্বিগুণ কষ্টে, তার চেয়ে বরং তুই বিয়েটা করে নে,অন্তত উনার সুখ দেখে যদি তৃপ্তি পাই।”
________________
কাল ভোররাত থেকে পুরো একটা দিন ব্রিটিশ কারাগারে বন্দী থাকার পর সন্ধ্যা নাগাদ প্রিন্স জোসেফের সামনে হাজির করা হয় ইমরান আর নাবহাকে।
জোসেফের মতিগতি বোঝার উপায় নেই,তার শুন্য মস্তিষ্কে এখন একটাই প্রশ্ন ” তার মহলে থেকে একটা বাচ্চাকে হত্যা করে তাকেই ফাসিয়ে দেওয়া লোকটা কে হতে পারে?কোনভাবে এই অজ্ঞাত লোকটা নয়তো?
যদি তাইই হয় তবে একটা সুযোগ অন্তত পাবে,তার সমস্ত ভাবনা জুড়ে বিরাজ করা সেই অভিশপ্ত সুন্দরীর মান ভাঙানোর একটা মাত্র সুযোগও হাতছাড়া করতে চায় না জোসেফ।
ধির হিমশিতল পদধ্বনি তুলে ইমরানের কাছে এগিয়ে এলো জোসেফ,ধারালো কন্ঠে বললো,
” কে তুমি?কোন ভাবে ওই বাচ্চাটার হত্যাকারী তুমি নও তো?”
প্রিন্স জোসেফের প্রশ্নে ভড়কালো ইমরান।আকাশ থেকে সদ্য টপকে পড়ার মতোই তাজ্জব হয়ে বললো,
“আরেহ আরেহ, বাচ্চা!কোন বাচ্চা?আমি কেন বাচ্চার হত্যাকারী হতে যাবো?জীবনে কখনো একটা মুরগীও হত্যা করি নি আমি।”
নির্ভিকার ভঙিতে ভ্রুকুটি তুললো জোসেফ,সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“তাহলে কে তুমি?একজন বাঙালি পুত্র ব্রিটিশ মহলে ঘুর ঘুর করার কারণ কি?”
জোসেফের ঠান্ডা কন্ঠের কোপে কথা হারালো ইমরান,ভয়ে ভয়ে বললো,
“আমি, আমি,,,,
ইমরানের স্বীকারোক্তি দেওয়ার আগেই নিজের হাতের বন্ধুক তাক করলো জোসেফ,ঠিক ইমরানের কপালের মাঝ বরাবর রেখে বললো,
” একদম মিথ্যা কথা বলার চেষ্টা করবে না,সত্য কথা বল কে তুমি?কি উদ্দেশ্যে পা রেখেছ এই মহলে?”
ইমরান টেরা চোখে তাকালো বন্ধুকের নলের দিকে,ভয়ে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো তার।কম্পিত কন্ঠে বললো,
“আমি,, আমি আসলে এই মেয়েটাকে ভালোবাসি,ও,, ওর সাথে দেখা করতে এসেছি।”
এতোক্ষণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পর তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো নাবহা।একে তো এই লোকটাকে সাহায্য করতে গিয়ে আজকে সারাদিন অকারণেই বন্দী থাকতে হলো আর এখন,এই ব্যাটা কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাকে ঝামেলা মুক্ত করবে দূরে থাক, উল্টো মিথ্যা দোষারপ চাপিয়ে দিলো?এমন মিথ্যাচার কিছুতেই বরধাস্থ করতে পারলো না নাবহা,চাপা ক্রোধিত কন্ঠে বললো,
“এই,এই কি বললেন আপনি?মিথ্যা কথা কেন বলছেন?আপনার সাথে আমার পরিচয় হলো একটু আগে এর মধ্যে ভালোবাসা হলো কখন?”
ইমরানের চোয়াল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে,ভয়ে ছোট্ট হৃদপিন্ড টা লাফাচ্ছে তার।মেয়েটাকে শান্ত স্বভাবের ভেবে একটু সুযোগ নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছিলো। আর এখন কিনা এই শান্ত মেয়েটাই রুদ্রমূর্তি ধারণ করে তাকেই উল্টো ফাসিয়ে দিলো।অসভ্য মেয়ে,মনে মনে নাবহাকে আচ্ছা রকম গালাগাল দিলো ইমরান।দাঁতে দাঁত চিবিয়ে বললো,
“ওরে স্বার্থপরের বাচ্চা একটু মিথ্যা বললে কি ক্ষতি হয়ে যেত তোর?”
নাবহার কথায় টনক নড়ে জোসেফের,প্রস্তরবেদীর মতো কঠোর হয়ে উঠে জোসেফের চোয়াল,তীরের ফলার মতো ধারালো কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“মিথ্যা বলছে?তাহলে তুমি নিশ্চয়ই জানো সত্য টা কি?দ্রুত বল,কে এই বাঙালি।খুব চেনা চেনা লাগছে আমার,কোথায় যেন দেখেছি।”
নাবহা ঢোক গিলে,কিয়ৎক্ষন হাতের সাথে হাত কচলে ভয়ে ভয়ে উত্তর দেয়,
“ফ্লোরেন্সার ভাই হয় উনি।ফ্লোরেন্সার খোঁজে এসেছে।”
____________
সন্ধ্যার শেষ লগ্নে মহল ছেড়েছে ইমরান।শুধু সে নয় তার সাথে আছে স্বয়ং ব্রিটিশ প্রিন্স।কালো রঙের একটা জীপ গাড়ি নিয়ে ছুটছে বাকের গঞ্জের দিকে।গাড়ির পেছনে একটা বড় বাক্স।যেখানটায় রাখা আছে একটা লাল রঙের শাড়ি।যা নিছক কোনো বস্ত্র নয়,তার ভাঁজে ভাঁজে গুঁজে আছে নিভৃতে রচিত ভালোবাসা কিংবা প্রতীক্ষার গল্প।
বিশুদ্ধ কাঁচা রেশমে তৈরি শারিটির ওপর বিছিয়ে আছে সোনা ও রুপার সূক্ষ্ম কারুকাজ।১১টি বিখ্যাত চিত্রকর্মের প্রতিচ্ছবি সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে হাতে বুননের মাধ্যমে।শুধু স্বর্ন নয় শাড়িটির গায়ে জড়ানো হয়েছে রুবি সহ নানা দুষ্প্রাপ্য রত্ন। দশজন দক্ষ কারিগর দিয়ে তিনদিনের ভেতর এই শাড়িটি প্রস্তুত করেছিল শুধুমাত্র নিস্পার জন্য। ভেবেচ রেখেছিলো এই রাজকীয় শাড়ি পড়িয়েই মহলের রানী বানাবে তাকে।
অথচ সে মেয়ে অভিমানী,অভিযোগের আবরণে আবৃত দুচোখে সে ভালোবাসার সন্ধান করতে পারলো না,এক নিষ্ঠুর অভিযোগের আসামী বানিয়ে দিয়ে সে চলে গেলো,এই মৃত প্রেমিক কে রেখে চলে গেলো অভিমান করে।
আজ যা কিছু হয়ে যাক এই শাড়ি দিয়েই জয় করে আনবে তার হৃদয় রাঙানো অভিশপ্ত সুন্দরীকে।এই শাড়ির প্রতিটি কারুকাজে আঁকবে তার সমস্ত অভিমান আর অভিযোগ।
গাড়ির ভেতর বসেই অস্থিরতা তীব্র হয়ে উঠছে ইমরানের বুকের ভেতর।মনে হচ্ছে কোনো এক অদৃশ্য টান তাকে পিছন থেকে টেনে ধরে রেখেছে, আর সেই বন্ধন ছিন্ন করার যন্ত্রণায় ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে তার বুকের পাঁজরগুলো।
এদিকে আইরিশ আর ফ্লোরেন্সা ফিরে আসায় সময় সুযোগ দুটোই পেয়েছে ইব্রাহিম।এবার আর কোন দোটানা রইলো না,নিশ্চিন্তে ব্রিটিশ মহলে আগুন লাগানোর কাজটা সারতে পারবে তারা।গঞ্জের প্রায় পঁচিশ থেকে ত্রিশজন তাগড়া যুবককে বাছাই করা হয়েছে এই কাজের জন্য।দিনভর ইমরানকে খুঁজে বেড়ালেও তেমন একটা পাত্তা দেয় নি,হয়তো রাগ করে কোথাও গিয়ে বসে আছে একথা ভেবেই মাতামাতি করে নি।
সবার হাতে কেরোসিন, সবাই একজোটে কেরোসিন ছেটাচ্ছে পুরো মহলের চারদিকে।ইব্রাহিম হাতে আগুন,কিছুক্ষনের মধ্যে কেরসিন ছিটানো শেষ হলেই এই আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করে দিবে সম্পূর্ণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য।
এদিকে ইমরানের অস্থিরতার মাত্রা তীব্রতর হয়ে উঠলো।সে তো যানে আজ রাতেই ব্রিটিশ মহলে আগুন লাগানো হবে,আর সেই মহলেই ফেলে রেখে এসেছে তার আত্মার সাথে সংযুক্ত হওয়া মানুষটাকেও,কিছু মূহুর্তের জন্য তার হৃদয়ের সাথে সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে যাওয়া মানুষটিকে বাঁচানো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো ইমরান।তাকে বিপদে ফেলে রেখে কি করেই বা যাবে সে?যে করেই হোক, যেকোনো মূল্যে নাবহাকে বাঁচাতে হবে তার।
মনের ভেতর হাজারটা দ্বন্দের মাঝে নাবহাকেই বেছে নিলো ইমরান।মাঝপথেই উত্তেজিত কন্ঠে জোসেফকে বললো,
“গাড়ি থামান, দয়া করে গাড়ি থামান।”
দ্রুত হাতে গাড়ির ব্রেক কষে জোসেফ,চোয়াল শক্ত করে বিরক্তিকর কন্ঠে বলে,
“কি সমস্যা? কি হয়েছে?”
জোসেফের ঠান্ডা দৃষ্টির তোপে পড়ে ভয় পেয়ে যায় ইমরান,কোনরকম ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে বলে,
“আমকে নামিয়ে দিন।”
জোসেফ ভ্রুকুটি তুলে আশপাশটা দেখে সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কেন?”
ইমরান আমতা আমতা করে ইনিয়েবিনিয়ে বললো,
“কা,,কাজ আছে আমার।বন্ধুর বাড়িতে আজ রাত থাকবো।”
________________
দুপুর থেকে এ অব্দি ফ্লোরেন্সার কক্ষের দরজা বন্ধ।বাইরে থেকে আটকে দিয়ে গিয়েছে হানিফ।শত চেষ্টা চালানোর পরেও এই বন্ধ ঘর থেকে বেড়োনোর উপায় খুঁজে পেলো না ফ্লোরেন্সা।
রাতের গভীরতা বোঝা মুশকিল,বাড়ির উঠানে অসংখ্য মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে।পুরো বাড়ি দিনের আলোর মতো না হলেও ঝকঝকে আলোয় পরিপূর্ণ।
ফ্লোরেন্সার কাছে এই মূহুর্তে দিশাহীন ঘোরের মতো লাগছে সব।হাজারটা অসংশোধিত প্রশ্ন পাথরের মতো বুকে চেপে আছে তার।কি করবে কি না করবে কিছুতেই মাথায় আসছে না।
হানিফের বাড়িতে প্রতিবেশী আসে বলে মনে হয় না।সবাই এক প্রকার ভয় পেয়ে চলে এই লোকটাকে,তাই হয়তো ভুল করেও এমুখো হয় না কোন প্রতিবেশি।
অনেক ভেবে একটা উপায় বের করলো ফ্লোরেন্সা, বাথরুমে যাওয়ার বাহানায় অনেক অনুরোধের পর বেড় হলো কক্ষ থেকে। হানিফ নিজের হাতেই খুলে দিয়েছিলো ঘরের দুয়ার।ফ্লোরেন্সা আগে খেয়াল করলো উঠানের অপরপ্রান্তে আরেকটি ঘরের দিকে।যেখানটায় খুটির মতো দাঁড়িয়ে আছে মালেকা।কেমন অদ্ভুত রহস্যময় ভাবে তাকিয়ে আছে তার দিকে।চোখে জল নেই, পুরো মুখ রসহীন, মনে হচ্ছে কাঁদতে কাঁদতে সব শুকিয়ে গিয়েছে,চৌচির হয়ে গিয়েছে তার অক্ষিপুট।
ফ্লোরেন্সা পা টিপে টিপে এগোলো,তবে বাথরুমে না গিয়ে সোজা গিয়ে দাড়ালো বেগম মালেকার সামনে।ফ্লোরেন্সা আসতেই বিদ্যুৎ স্পষ্টের ন্যায় কেপে উঠলো মালেকা।ফ্লোরেন্সাকে বহুগুণ অবাক করে দিয়ে দু’হাতে চেপে ধরলো ফ্লোরেন্সার দু হাত,ভয়ংকর আতংকিত কন্ঠে বললো,
“একা কেন তুমি? সত্য কই? আমার বাপজান কই?বাঁচাইতে পারো নাই তাই না বাঁচাইতে পারো নাই আমার সত্যরে?উনি কি মাইরা ফালাইছে?আমার সত্যরে কি সত্যিই মাইরা ফালাইছে উনি?”
আতংকে কলিজা কেঁপে উঠে ফ্লোরেন্সার।এই মহিলার ব্যাবহারে মনে হচ্ছে মহিলা চেনে তাকে।অথচ তার মনে হচ্ছে না এই মহিলাকে কোথাও কখনো দেখেছে।আর উনার এসব কথা,তাকেই বা কেন জিজ্ঞেস করছে?কোন কিছুর হিসেব মেলাতে পারলো না ফ্লোরেন্সা,ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু বলতেই যাবে বিস্মিত দৃষ্টিজোড়া স্থির হয়ে যায় ঘরের ভেতরে।
ফ্লোরেন্সা মালেকাকে ঠেলে পা বাড়ায় ঘরের ভেতর।চোখের সামনে পচে গলে যাওয়া এক বৃদ্ধার লাশ।এমন এক বিভৎস দৃশ্যের মুখোমুখি হতেই অতর্কিত বোমি করে দেয় ফ্লোরেন্সা।প্রবল আতংকিত হয়ে পেছাতে পেছাতে প্রকোম্পিত স্বরে বিরবিরালো,
“এসব,, এসব কি?”
ততক্ষণে ঘরে এসে উপস্থিত হয়েছে হানিফ।ফ্লোরেন্সা ভয়ে পেছোতে পেছোতে এসে ধাক্কা খায় হানিফের নিটোল বুকের সাথে।মূহুর্তেই ছলকে উঠে তার আত্মা।চোখ খিচে বন্ধ করে ভেঙে যাওয়া জড়োসড়ো কন্ঠে হ্যাসহ্যাসিয়ে বললো,
“আমি সহ্য করতে পারছি না, কিছুতেই পারছি না।”
আব্দুল হানিফ আলতো করে ধরে ফেললো ফ্লোরেন্সার হাত,গা হীম করা স্পর্শে পুনরায় ভয়ে সিটিয়ে গেলো ফ্লোরেন্সা,অথচ সেসব্দ বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করলো না হানিফ,তার পূর্ণ দৃষ্টি তার মায়ের পচে গলে পড়ে থাকা লাশের দিকে রেখে নির্বিকার ভঙিতে বললো,
“শান্ত হও রুপাঞ্জেল।তেমন কিছু হয়নি।দুঃখিত,খুব দুঃখিত আমি।আসলে তুমি চলে যাওয়ার পর তোমাকে খুজতে গিয়ে আম্মার লাশ টা দাফন করার সময় পাই নি বিশ্বাস কর।”
হানিফের কথা শুনে আধো আধো চোখ খুলে তাকালো ফ্লোরেন্সা।আনিফের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ভেঙে কেদে দিয়ে হাত জোর করলো, ফুফিয়ে ফুফিয়ে বললো,
“ছেড়ে দিন আমায়,আমি আপনার কি ক্ষতি করেছি,দয়া করে যেতে দিন আমাকে।”
হানিফ ভয়ংকরভাবে নিজের বৃদ্ধাঙুল রাখে ফ্লোরেন্সার ঠোঁটের কুর্নিশে,হিম শীতল কন্ঠে বলে,
“হুশশ,,,আর একবারও আমাকে ফেলে চলে যাওয়ার কথা বলো না রুপ,নয়তো আমি আরও বেশি পাগলামি করে ফেলবো।”
আতংকে বুকের উপর হাত চেপে ধরে হাপরের মতো হাফাচ্ছে ফ্লোরেন্সা,রুদ্ধশ্বাস কন্ঠে হানিফের কথার প্রতিবাদ করতে চায় জীবন বাঁচানোর তাগিদে,
“আমাকে এখান থেকে যেতে সিন,নয়তো আমি চিৎকার করবো,ফাস করে দিবো আপনি মানসিকভাবে বিকৃত একটা পাগল।”
হানিফ এবার ভিষন চটে গেলো,প্রচন্ড আক্রোশে এক থাবায় গলা চেপে ধরলো ফ্লোরেন্সার, ক্ষেপা কন্ঠে বললো,
“আমি পাগল,আমি তোমার পাগল রুপাঞ্জেল।ধিক্কার কেন করছো?তোমার তো গর্ব হওয়া উচিত, তোমাকে বিবি বানানোর জন্য একটা পুরুষ পাগল হয়ে গিয়েছে।খুশি হওয়া উচিত, খুশি হও, খুশি হও রুপাঞ্জেল।হাসো একটু হাসো,আমি প্রান ভরে দেখি তোমার হাসি।”
শক্ত হাতের জাতাকলে শেষ নিঃশ্বাস টুকু ফুরিয়ে আসছে ফ্লোরেন্সার,চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে যন্ত্রনার লাভার মতো উত্তপ্ত অশ্রু।সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছে,কণ্ঠনালীতে আটকে আসছে প্রান, এই বুঝি মৃত্যু ঘনিয়ে এসেছে তার।
ঠিক সে মূহুর্তে পেছন থেকে বটি দা দিয়ে হানিফের পিঠে জোড়ালো এক কোপ বসিয়ে দিলো বেগম মালেকা।মুহূর্তেই মুখ থেকে রক্ত বোমি শুরু হলো হানিফের,ফ্লোরেন্সার গলায় চেপে রাখা হাতটা হালকে হয়ে এলো,ছাড়া পাওয়া মাত্রই মুখ হা করে শ্বাস নিলো ফ্লোরেন্সা,পরমুহূর্তেই হানিফের পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পেরে ঔষ্ঠাদর ফাঁক হয়ে গেলো ফ্লোরেন্সার।কম্পিত দুহাত মুখের উপর চলে গেলো আপনা আপনি। বিস্ময়ে হতহ্বিবল হয়ে দুই ঠোঁট ফুড়ে বেরিয়ে এলো রুদ্ধশ্বাস,
“কি করলেন?কি করলেন এটা আপনি?”
নির্জিব রোবটের ন্যায় রুগ্ন মানবি বাক হারিয়েছে,অতিরিক্ত যন্ত্রণায় পাথর হয়ে গিয়েছে তার কণ্ঠনালী,লোপ পেয়েছে বিবেক বুদ্ধি,নিঃসারের মতো হাতের বটিটা এগিয়ে ধরলো ফ্লোরেন্সার দিকে,নিস্প্রান কন্ঠে বললো,
“উনি আমার সোহাগ।উনাকে ভালোবেসে নিকাহ করেছি আমি।উনাকে মারতে আমার হাত কাঁপবে,তোমাকে একটা অনুরোধ করি শোন,আঘাত কর, এই জানোয়ার টার শেষ নিঃশ্বাস বেড়িয়ে না যাওয়া পর্যন্ত আঘাত যেন স্থগিত না হয়।”
ফ্লোরেন্সা সচকিত দৃষ্টিতে তাকায় আব্দুল হানিফের দিকে, তার রক্তাক্ত শরীর টা মেঝেতে থুবড়ে পড়ে আছে,অথচ সেই চেনা হিংস্র দৃষ্টিতে এখনো নমনীয়তা আসে নি,সেই একই ভাবে লোকটা তাকিয়ে আছে ফ্লোরেন্সার দিকে।
ফ্লোরেন্সার রাগ হলো, খুব রাগ হলো,কন্ঠতালু শুকিয়ে কাঠ,শুস্ক একটা ঢোক গিলে হাতটা এগিয়ে দিলো, নিয়ে নিলো মালেকার হাতের বটি।তাতপর চোখ বন্ধ করে অতর্কিত ঝাপিয়ে পড়লো হানিফের উপর।টানা ছয়মাসের জুলুম অত্যাচার, অবিচারের প্রতিশোধ নিলো হানিফের উপর। একের পর এক কোপে ক্ষতবিক্ষত করলো হানিফের শরীর খানা।রটালো এক ভয়ংকর ইতিহাস,লিপিবদ্ধ করলো এক অসহায় সহজ সরল মেয়ের রুদ্রাণী হয়ে উঠার কাব্য।
____________
ব্রিটিশ মহলের চারপাশে দাউদাউ আগুন।আর সেই আগুন থেকে বুক ফুলিয়ে বেড়িয়ে এলো ইমরান।তার কোলে নাজুক শিশুর মতো লুটিয়ে আছে নাবহা।শেষ রাতের দিকে যখন পুনরায় মহলে ফিরে এসেছিলো ইমরান, তখন মহলের অর্ধভাগ প্রায় পুড়ে গিয়েছে,বেড়োনোর সুযোগ হয়তো কেউই পায় নি।
ইমরান হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গিয়েছিলো নাবহার বলে দেওয়া সেই বা পাশের নিচু দেয়ালটার দিকে।সেখান দিয়েই খুব দ্রুত নাবহার ঘরে পৌঁছে গিয়েছিলো ইমরান,মেয়েটা তখন ভয়ে গুটিশুটি মেরে বসেছিলো ঘরের এক কোনে,হয়তো মৃত্যুকে কবুল করে নিয়েই প্রহর গুনছিলো সে,এমন দূর্বধ্য মূহুর্তেও মেয়েটার ভীত চোখ দেখে হেসে ফেললো ইমরান,নাবহার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“যেতে পারলাম না মেয়ে, ফিরে আসতে হলো আবার।তোমাকে রেখে যেতে পারলাম না।”
সে মূহুর্তে নাবহা হ্যালুশিনেশন করছিলো আইরিশকে, তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো আইরিশের সেই স্নিগ্ধ মায়াভরা মুখটা,ঝাপসা চোখ মুগ্ধ হয়ে দেখলো,অসহায় হাতটা বাড়িয়ে দিলো ইমরানের দিকে,নিস্প্রভ স্বরে আওড়াল,
“আমি জানতাম আপনি ফিরবেন,আমাকে ফেলে কোথাও যেতে পারেন না আপনি।খুব ভালোবাসি, খুব বেশি ভালোবাসি আপনাকে।”
_________
গঞ্জের নির্জন পথ ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে ফ্লোরেন্সা। ঘুমহীন রাতের ক্লান্তি আর ভেতরের যন্ত্রণার ভারে ঝাপসা তার দু চোখ। নিয়তির নিষ্ঠুর ছোবলে সে নিঃসঙ্গ, একাকী এক দীর্ঘ প্রহরের যাত্রী এখন।
হেঁটে যাওয়ার প্রতিটি ছন্দে বুকের ভেতরে কম্পন উঠছে ফ্লোরেন্সার।ব্যথার সাথে তাল মিলিয়ে কাঁপছে তার হৃদয়ের প্রতিটি কোণা।নিঃশব্দ পথ প্রতিধ্বনি তুলছে তার ব্যাথাতুর নিঃশ্বাসের ভারে।
হটাৎই চোখ কুচকে থমকে দাঁড়ায় মেয়েটা,অদূরে এক অস্বচ্ছ এক চেনা মুখ।বুকের ভেতরটা গুলিয়ে ওঠে মুহূর্তেই। দুহাতে চোখ কচলে আবার তাকায় সে, আবারও দেখতে পায় স্পষ্ট চেনা সেই মুখ, চেনা সেই মানুষটাকে।
মাত্র এক ঝলক দেখেই ধড়ফড়িয়ে ওঠে ফ্লোরেন্সার বুকগহ্বর। নিঃশ্বাস আটকে যায় মাঝপথে। কিছু বলতে চেয়েও শব্দগুলো জমাট বেঁধে যায় কণ্ঠনালিতে। চোখ ভরে ওঠে বেদনার জলে।
অন্ধকারের মাঝে এক মুঠো আলো ধরে রাখার আকাঙ্খায় কন্ঠ ফাটিয়ে চিৎকার করে ডাকে,
“আইরিশ ভাই।”
আইরিশ শুনতে পায়, থামিয়ে নেয় পা,গ্রিবা বাকিয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে ফের হাঁটতে শুরু করে সোজা পথে।ফ্লোরেন্সা উন্মাদের মতো দিশেহারা হয়ে দৌড়াতে শুরু করে,তার দীঘল কালো চুল গুলো উড়তে শুরু করে হাওয়ার দাপটে,অসার পা ভেঙে আসে,রোধ করে তার গতি,অথচ মেয়েটা এই ভেঙে আসা পা জোড়া টেনে টুনে এগোলো চিৎকার করে ডাকলো পুনরায়,
“আইরিশ ভাই।”
খুব কাছ থেকে পরিচিত কন্ঠস্বরটা কানে পৌছাতেই দাঁড়িয়ে গেলো আইরিশ।পেছন ফিরে তাকালো স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, অথচ অস্বাভাবিক ভাবেই মাথায় বাজ পড়লো তার,চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হুবহু ফ্লোরেন্সার মতো দেখতে শিরদাঁড়া দিয়ে গড়িয়ে নামলো ঠান্ডা স্রোত।হিতাহিত জ্ঞানশুন্য হয়ে আওড়ায়,
“কে? কে তুমি?”
আইরিশের এহেন কন্ঠে কিছু মূহুর্তের জন্য ভড়কায় ফ্লোরেন্সা,তবে খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে উত্তর দেয় হৃদয়ের তাড়নায়,
“আমি ফ্লোরেন্সা আইরিশ ভাই।আমি আপনার আলেকজান্দ্রা।”
আইরিশের পায়ের নিচের মাটি ফাঁক হয়ে যায়,সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানবির মুখ থেকে বেড়িয়ে আসা এমন বাক্যে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকে কেবল,হতহ্বিবল কন্ঠে শুধায়,
“তুই ফ্লোরেন্সা তাহলে ও কে?”
ফ্লোরেন্সা ভ্রু কুচকায়, কৌতুহলি কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“ও কে মানে?”
আইরিশ ভনিতা করলো না,নীল শাড়িটা দেখিয়ে ছাপ ছাপ বললো,
“বাড়িতে যে আরেকটা ফ্লোরেন্সাকে রেখে এলাম?যাকে বিয়ে করার জন্য আমি এই নীল শাড়ি কিনলাম সে কে?”
আঁতকে উঠল ফ্লোরেন্সা,আইরিশের মুখে বিয়ের কথা শুনে খেই হারালো মস্তিষ্ক,ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলো ভগ্ন হৃদয়,
“কি বলছেন আইরিশ ভাই?আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না,আপনি কাকে বিয়ে করবেন?কার জন্য শাড়ি কিনেছেন?আপনি তো বলেছিলেন আপনি আমাকে ভালোবাসেন।”
আইরিশ দ্বিধাদ্বন্দিত,কি বলবে ভাষা খুঁজে পেলো না,অবশ কন্ঠে বললো,
“বলেছিলাম?কিন্তু কাকে বলেছিলাম?কে আসল ফ্লোরেন্সা?”
ফ্লোরেন্সা স্বদ্যোগে এগিয়ে আসে আইরিশের কাছে,কন্ঠ জোড়ালো করে বলে,
“আমি, আমি ফ্লোরেন্সা। আইরিশ ভাই আমাকে ক্ষমা করে দিন,আমি বুঝতে পারি নি, আমি না বুঝে চলে গিয়েছিলাম ওই জালিম প্রিন্সের সাথে,ওই প্রিন্স আমাকে সম্মোহন করেছিলো।আমাকে রানী বানানোর জন্য নয় নিয়ে গিয়েছিলো তার মায়ের দাসী বানানোর জন্য।”
একটু থামে,একটা ঢোক গিলে আবার বলে,
“ওই প্রিন্স আমাকে অনেক টর্চার করেছে আইরিশ ভাই।ওই জালিমের ছুড়ে দেওয়া এক একটা চাবুকের আঘাতে আমার পিঠের মাংস পচে গিয়েছে।”
ফ্লোরেন্সা উন্মাদের মতো কিঞ্চিৎ উল্টে ধরলো নিজের পড়নের ফ্রক,তারপর নিজের পেটের পোড়া দাগটা দেখিয়ে বললো, কাদতে কাদতে বললো,
“এই দেখুন,এই দেখুন উনি আমার গর্ভের অংশ টুকুও ছাড় দেয়নি,ঝলসে দিয়েছে আমাকে একটু একটু করে।”
“তুই সত্যি বলছিস?”
“সত্যি বলছি, আল্লাহর কসম আমি সত্যি বলছি।বিশ্বাস না হয় আপনার বন্ধু ওই নিমোক হারাম আশিককে জিজ্ঞেস করুন।ওই জানোয়ার টা আমাকে মহল থেকে নিয়ে এসে বন্দী করে রেখেছিলো এতোদিন।ওকে আপনি ছাড়বেন না আইরিশ ভাই, ওকে আপনি একদম ছাড়বেন না, ও আপনার আলেকজান্দ্রাকে আপনার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছে।”
“তার মানে তুই সত্যি বলছিস,তুই ফ্লোরেন্সা?”
অবিন্যস্ত কন্ঠে কথাটা আওড়াল আইরিশ,তারপর হাতের নীল শাড়িটার দিকে তাকিয়ে বললো,
“কিন্তু আমার এই নীল শাড়ির কি হবে?যেই ফ্লোরেন্সার জন্য কিনলাম সে তো আসল নয়।”
ফ্লোরেন্সা নাক টানলো, ভঙ্গুর কন্ঠে বললো,
“হতে পারে সে বহুরূপী,মিথ্যা বলে আপনাকে পেতে চাইছে।”
আইরিশ অস্বীকার জানালো,স্পষ্ট গলায় বলল,
“কিন্তু সে তো মিথ্যা বলে নি।”
ফ্লোরেন্সা কথার অর্থ বুঝতে না পেরে অস্ফুটে বললো,
“মানে?”
“মানে সেতো সত্যি বলতে চেয়েছিলো আমিই শুনতে চাই নি।ভুলটা যে আমার হয়ে গেলো রে ফ্লোরেন্সা।”
“নিজেকে দোষারোপ করবেন না আইরিশ ভাই।আমাকে সাথে নিয়ে বাড়িতে চলুন, আমি সব ভুল ভেঙে দিবো।”
আইরিশ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,কঠিন কন্ঠে ফ্লোরেন্সার দিকে ছুড়ে দিলো কঠিন এক বাক্য,
“তুই ভুল ভাঙতে গেলে যে আমাদের বিয়েটাও ভেঙে যাবে ফ্লোরেন্সা।”
ফ্লোরেন্সা বাকরুদ্ধ, আইরিশের কাছে এমন কঠিন শব্দ আশা করে নি সে,যন্ত্রণায় বিবষ হয়ে আসা ধরা গলায় বললো,
“আইরিশ ভাই!”
আইরিশ এগিয়ে এসে আলতো করে ধরলো ফ্লোরেন্সার দুই হাত,কন্ঠ নরম করে মিনতি স্বরে বললো,
“আমার ভুলটাকে ভেঙে না দিয়ে তুই ভুলগুলো নিজের কাধে নিয়ে না ফ্লোরেন্সা।”
ফ্লোরেন্সার মস্তিষ্ক নিতে পারলো না এই প্রবল ধাক্কাটা,সে অবুঝের মতো বললো,
“আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না আইরিশ ভাই,কি বলতে চাইছেন আপনি?”
“ভুলটা তো সবচেয়ে বেশি তোরই ছিলো বল,তুই তো আমাকে প্রত্যাখ্যান করে চলে গেলি ওই ব্রিটিশ প্রিন্সের হাত ধরে।”
“কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন আমি আপনার পৃথিবী।আপনি আমাকে ভালোবাসবেন শেষ নিঃশ্বাস অব্দি।”
“জায়গাটা যে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে ফ্লোরেন্সা,তোর অবর্তমানে নতুন ফ্লোরেন্সাকেই ভালোবেসে ফেলেছি আমি।”
“কিন্তু আপনি বলেছিলেন আমি আপনার আলেকজান্দ্রা।”
“এখন তো তাকেও বলি।”
“আপনি আপনার সারাজীবনের উপার্যনের টাকায় কেনা আলেকজান্দ্রা খচিত আংটি টা আমাকে পড়িয়ে দিয়েছিলেন।”
“সেই একই আংটি তার আঙুলেও পড়িয়ে দিয়ে এলাম,বেশ মানিয়েছে।”
আইরিশের যুক্তিতে হার মানতে হলো ফ্লোরেন্সাকে,অবিশেষে হার মেনে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরলো ঠোঁট, ফুফিয়ে উঠে বললো,
“এতো নিষ্ঠুর হবেন না আইরিশ ভাই,আমার চোখের দিকে তাকান,ভালোবাসা খুঁজে পাবেন।”
আইরিশ তাকালো,খুব গভীর ভাবে তাকালো,ফ্লোরেন্সার নিস্প্রান নিস্প্রভ চোখের দিকে তাকিয়ে খুজতে আরাম্ভ করলো সেই আগের অনুভুতি, ভালোবাসার রাজ্যটক।অথচ দেখা মিললো না,হন্যে হয়ে খুঁজেও পেলো না কোন আকর্ষণ,সে বাধ্য হলো দৃষ্টি সরিয়ে নিতে বাধ্য হলো,অনুরাগী কন্ঠে বললো,
“কোথায়?আবেগ নেই, প্রলোভন নেই,কুচকুচে কালো মনি জোড়ার গভীরতা নেই,আকর্ষণ নেই।দেখছি কেবল শূন্যতা আর শূন্যতা।দগ্ধ এক বিষন্ন গহ্বর।”
ফ্লোরেন্সা পুনরায় আশাহত হলো,আইরিশের কথায় খানখান হলো হৃদয়,দগ্ধ কন্ঠে বললো,
“আপনি কখনো আমাকে ভালোবাসেন নি তাই না?”
আইরিশ নিস্পন্দিত স্বরে আওড়ায়,
“উত্তর দেওয়ার মতো শব্দ নেই।বিবষ শব্দগুলো এখন কেবল তার নামে স্পন্দিত হয়।”
যন্ত্রণায় বুকটা জ্বলে যাচ্ছে ফ্লোরেন্সার,পরপর এতোগুলো নিষ্ঠুর আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়েছে তার নাজুক হৃদয়,সে কেবল বিধ্বস্ত কন্ঠে বললো,
“আপনার এই নিষ্ঠুর দংশন আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে আইরিশ ভাই।”
আইরিশ নির্বিকার, নির্জিব পাথরের মতো স্বগোতক্তিতে বিরবিরালো,
“আমি সেটাও অনুভব করতে ব্যার্থ।”
“আমাকে এভাবে শাস্তি দিবেন না আইরিশ ভাই। ”
“শাস্তি না এটা নিয়তি।তুই নিজের নিয়তি নিজেই বেছে নিয়েছিলি।”
“ভুল ছিলো, সেটা ভুল ছিলো আইরিশ ভাই।স্বীকার করছি আমি।”
“ভুল করলে ভুলের মাশুল দিতে হয় সেটা নিশ্চয়ই জানিস?”
“আপনিও তো ভুল করেছেন আইরিশ ভাই?আপনিও তো ফ্লোরেন্সা ভেবে অন্য একটা বহুরূপী মেয়েকে ভালোবেসে ভুল করেছেনি।আমার যদি ভুলের মাশুল দিতে হয়,তবে আপনাকেও তো সেই ভুলের মাশুল দিতে হবে।”
“দিচ্ছি তো,আমি তোকে ছেড়ে অন্যকাউকে ভালোবেসে ফেলেছি এই অনুশোচনার দগ্ধতা আমাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।”
ফ্লোরেন্সা আর কোন তর্কে যেতে চাইলো না,তার লতানো রুগ্ন শরীর খান বিবষ যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠছে,আর এক মূহুর্ত এই তর্ক চালিয়ে যাওয়ার সাধ্য তার নেই।অসমাপ্ত যন্ত্রণার ইতি টেনে অভিমান্যপ্রায় কন্ঠে বললো,
“বাড়িতে চলুন আইরিশ ভাই, আমি ক্লান্ত। শরীর আর মন এতো আঘাত একসাথে নিতে পারছে না।”
ফ্লোরেন্সা হাঁটা শুরু করলো,যন্ত্রণায় ভারি হয়ে আসা পা টানতে শুরু করলো বাড়ির উদ্দেশ্যে, ঠিক সে মূহুর্তে তাকে অবাক করে দিয়ে করতালুর শক্ত বাধনে তার হাতের কব্জি আবদ্ধ করে নিলো আইরিশ।
ফ্লোরেন্সা থেমে গেলো,নিঃসার দৃষ্টি তুলে তাকালো আইরিশের দিকে, অসার কন্ঠে শুধালো,
“হাত ধরলেন যে?”
“আমার ভালো চাস তুই তাই না?”
“আপনাকেও তো চাইলাম,দিচ্ছেন কই?”
“আমার জন্য আরেকটা আঘাত শয়ে নিবি ফ্লোরেন্সা?”
ফ্লোরেন্সা কপাল কুচকে জিজ্ঞেসা সূচক দৃষ্টিতে তাকালো,আইরিশ সেই চোখে চোখ রেখে অনুরোধ করে বললো,
“তুই বাড়িতে যাস না।”
তরাগ করে অক্ষিপুট বড়বড় করে চাইলো ফ্লোরেন্সা,জিজ্ঞেস করলো,
“কেন?”
“তুই বাড়িতে গেলে,আমার প্রেমকে হেনস্তা হতে হবে, বহুরুপীর অপবাদ শুনতে হবে।”
“যে বহুরূপী সে অপবাদ শুনলেই কি? না শুনলেই কি?”
আইরিশ আরক্ত স্বরে প্রতিত্তোর করে,
“ও কষ্ট পাবে।”
বুকের ভেতর দহন চেপে রেখে ম্লান হাসলো ফ্লোরেন্সা,শুস্ক কন্ঠে শুধালো,
“ওর কষ্ট অনুভব করেন তাইনা?”
আইরিশ বুকে হাত রেখে চোখ বন্ধ করলো,মোহিত কন্ঠে উত্তর দিলো,
“এখান থেকে।”
এদিকে বুকের ঠিক একই যায়গাটায় ব্যাথার তীব্রতা বাড়লো ফ্লোরেন্সার, কেঁদে দিয়ে নিরুপায় কন্ঠে বললো,
“কিন্তু আমার যে সহ্য হচ্ছে না আইরিশ ভাই।একটা বহুরূপী মেয়ে হুট করে এসে আমার চেহারা আমার পরিচয় আমার ভালোবাসা আমার পরিবার সব কিছু কেড়ে নিবে আমি কি করে মেনে নেই বলুন?”
আইরিশ ফ্লোরেন্সার হাত ছেড়ে দিয়ে দুটো গাল আগলে ধরলো,অনুরোধি কন্ঠে ফের বললো,
“আমার জন্য মেনে নে।”
ফ্লোরেন্সা রাগে অভিমানে সরিয়ে দিলো আইরিশের হাত,শক্ত স্বরে বললো,
“যে আমাকে চায় না, তার ভালো চেয়ে আমি কেন নিজের শেষ টুকু বিসর্জন দেবো।আমাকে ক্ষমা কিরবেন আইরিশ ভাই।”
আইরিশ আবারও আঁকড়ে ধরলো ফ্লোরেন্সার হাত,মাথা নত করে নিরুপায় কন্ঠে বললো,
“দয়া কর ফ্লোরেন্সা।”
“হাত ছাড়ুন।আমাকে বাড়ি যেতে দিন আইরিশ ভাই।”
আইরিশ ছাড়লো না ফ্লোরেন্সার হাত,বরং আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে কঠিন কন্ঠে বললো,
“তোর বাড়ি ফেরা সম্ভব নয়।”
“মানে?”
“খুব সহজ।তুই বাড়ি ফিরবি না ফ্লোরেন্সা।”
“আমি তো বললাম আমি আপনার কথা রাখতে পারবো না।
“আমি তোকে অনুরোধ করছি না ফ্লোরেন্সা।”
“তাহলে?”
“আমি তোকে বাধ্য করছি,তুই আমাদের বিয়ের আগে বাড়ি ফিরতে পারবি না।”
ফ্লোরেন্সা নিজের হাত মুচড়াতে মুচড়াতে করুন কন্ঠে বললো,
“কেন এমন করছেন ভাইয়া?আমি এই মূহুর্তে অসম্ভব অসহায়।মায়ের কোলে মাথা রেখে কান্না করাটা জরুরি।”
“আমাকে ক্ষমা করে দে ফ্লোরেন্সা।আজকের জন্য স্বার্থপর হতে হলো।”
ফ্লোরেন্সা বুঝতে পারলো আর নরম হলে চলবে না,এবারে কঠিন হয়ে প্রতিহত করতে হবে আইরিশের ছেলেমানুষী কে,
“আমি আর এখন সেই সরল মেয়েটা নেই ভাইয়া,নিষ্ঠুর বাস্তব আমার সরলতা গ্রাস করে নিয়েছে,যেই হাতে কখনো কাউকে আঘাত করি নি, সেই হাতে মাত্রই একটা খুন করে এলাম।”
অথচ আইরিশ তোয়াক্কা করলো না ফ্লোরেন্সার কথা,ফ্লোরেন্সাকে টানতে টানতে নিয়ে যেতে শুরু করলো জঙ্গলের পথে,স্পষ্ট গলায় বললো,
“সে তুই যাই কর আজ তোর যাওয়া হবে না।”
ফ্লোরেন্সা ঘাবড়ালো,নিজের এতো কাছে মানুষটর বিশ্বাসঘাতকতা মেনে নিতে না পেরে আত্মবেদনায় ছটপট করতে করতে বললো,
“কি করছেন কি আপনি?ছাড়ুন আমাকে।”
“পুনরায় ক্ষমা চাইছি ফ্লোরেন্সা,আমার ভালোবাসাকে পেতে এইটুকু স্বার্থপর হতেই হলো।”
চলবে,,,,,,
(নুন্যতম 200 রেসপন্স পেলে কাল একটা বোনাস পার্ট পেলেও পেতে পারো।)

