হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পর্বঃ59

0
37

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্বঃ59

ঢাকা স্কয়ার হাসপাতালের নিচতলার পরিবেশ আজ ভিন্ন,চারদিকে বিরাজ করেছে অন্যরকম চাপা উত্তেজনা। প্রতিদিনের স্বাভাবিক ভিড়ের চেয়ে মানুষের ভিড় আজ অনেক বেশি। হাতে ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন নিয়ে হাসপাতালের সামনে ভিড় জমিয়েছে কয়েক দল সাংবাদিক। পাশে দাঁড়িয়ে আছে স্থানীয় কৌতূহলী মানুষজন,এমনকি
সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ঘটনাস্থলে এসেছেন এসিপি ভুইয়া নিজে।উপস্থিত সবার মুখে শঙ্কা আর উৎকন্ঠা,সবাই চিবুক তুলে আতংকিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হসপিটালের ছাদের দিকে।

হাসপাতালের মূল ভবনের একদম ছাদের কর্নারে দাঁড়িয়ে আছে ত্রিজয়। নিচে উপস্থিত শত শত মানুষের হৃদস্পন্দন আটকে আছে সেই স্থানে।সবাই চিৎকার করছে আর বলছে,

“প্লিজ নেমে আসুন।সুইসাইড করার সিদ্ধান্ত বাতিল করুন।জীবনের মায়া করুন।প্লিজ নিচে নামুন।”

ত্রিজয়ের হাতে মাইক,সমস্ত বন্দবস্ত করেই ছাদে উঠেছে সে।নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলছে তার সুইসাইড করার কারণ,

“এমপি তাওসিফ তাকরিমের বোন আমার একমাত্র বউ। উনি আমার সাথে ব্যাক্তিগত শত্রুতা মেটাতে আমার বউকে উনার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আমার কাছ থেকে আলাদা করতে চাইছে।কিন্তু আমার বউকে আমার চাইই।এমপি মশাই বউকে ফিরিয়ে না দিলে আমি সুইসাইড করবো এখান থেকে।”

এসিপি ভুইয়া রীতিমতো ঘেমেনেয়ে একাকার,সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে তার জান ঝুলে আছে গলায়।তিনি কন্সট্রেবলের হাত থেকে মাইক টা নিয়ে ত্রিজয়ের উদ্দেশ্যে বললো,

“কুল ডাউন মিস্টার তেজ।আপনি একটু শান্ত হোন,প্লিজ এমন কোন কাজ করবেন না,আমরা এমপি মশাইকে খবর দিয়েছি।”

বিপরীতে ত্রিজয় তাড়া দেখিয়ে বললো,

“যা করার দ্রুত করুন,আমি আমার বউকে ফেরত না পেলে সুইসাইড করবো।”

সাংবাদিক রা মাইক্রোফোন হাতে করছে লাইভ টেলিকাস্ট,ক্যামেরার লেন্স একবার ফোকাস করছে ত্রিজয়কে আরেকবার মাইক্রোফোন ধরে থাকা সাংবাদিককে,তিনি ঘটনাকে আরেকটু তেল মসলা মিক্স করে বলছে কন্ঠে গভীর উত্তেজনা নিয়ে,

“এই মূহুর্তে আমরা দাঁড়িয়ে আছি ঢাকা স্কয়ার হাসপাতালের সামনে।সুনামধন্য এডভোকেট ত্রিজয় তেজ হসপিটালের ছাদ থেকে সুইসাইড করার চেষ্টা করছেন,যার সম্পূর্ণ দায়ভার দেশের এমপি তাওসিফ তাকরিম এর।ত্রিজয় তেজের কাছ থেকে নিজের বোনকে ছিনিয়ে এনে হয়তো ব্যাক্তিগত ক্ষোভ মেটাচ্ছেন তিনি।”

পাশে আরেকজন সাংবাদিকেরও একই অবস্থা।কার আগে কে সংবাদ প্রচার করবে তার জন্য প্রতিযোগিতা লেগে গিয়েছে,

“সাধারণ ভাবে ভাবলে এটাকে সুইসাইড কেস মনে হবে, কিন্তু একটু গভীর ভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় এটা কিন্তু একটা মার্ডার কেস হতে চলেছে।কারণ এমপি তাওসিফ তাকরিম এডভোকেট ত্রিজয় তেজের ওয়াইফকে কেড়ে নিয়ে উনাকে মানসঠিকভাবে ভেঙে দিয়ে বাঁচার সব পথ বন্ধ করে দিয়েছেন।”

ইভান পাশে দাঁড়িয়ে একটা বোতলের সিপি খুললো,ত্রিজয়ের দিকে তাকিয়ে মুখ হা করে পানি খেলো কয়েক ঢোক, গলা ভিজিয়ে বিরবির করে বললো,

“বাহ! স্যার বাহ!আপনি ব্রিটিশের বাপ সেটা আরেকবার প্রমানিত।লা জবাব।”

এমন উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশকে আরেকটু উত্তেজিত করলো গাড়ির টায়ারের হুইসল ধ্বনি।সাই-সাই করে একসাথে তিনটি কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামলো হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে। সামনের আর পেছনের গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে এলো কয়েকজন গার্ড। সবার বেশভূসা এক,কালো সানগ্লাস, আর কালো ব্লেজারে সজ্জিত, চোখেমুখে টানটান সতর্কতা নিয়েই হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলো মাঝখানের গাড়িটির দিকে,তারপর দ্রুত হস্তে খুলে দিলো গাড়ির দরজা।

চোখে মুখে একরাশ দৃঢ়তা আর গম্ভীরতা নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে দাড়ালো এমপি তাওসিফ তাকরিম। ঠিক তাঁর পেছনেই ভীতসন্ত্রস্ত মুখাবয়ব নিয়ে নামলো নিস্পা।তাকরিম গাড়ি থেকে নামতেই ছুটে এলেন এসিপি ভুইয়া,তাকরিম তার তটস্থ মুখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“কি হয়েছে?”

এসিপি ভুইয়া উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে বললো,

“স্যার আপনার বোনকে নিয়ে এসেছেন?”

বোনের কথা শুনেই চোখের সানগ্লাস খুলে হাতে নিলো তাকরিম,কপাল কুচকে আওড়াল,

“বোন?”

এসিপি ভুইয়া কথাটা আরেকটু সহজভাবে বললেন,

“ত্রিজয় তেজের ওয়াইফ তো আপনার বোন?”

দাঁতে দাঁত চাপলো তাকরিম।ত্রিজয় ঠিক কি প্ল্যান করেছে বোঝা হয়ে গিয়েছে তার।এখানে বেফাঁস কিছু বলা মানেই নিজের পায়ে কুড়াল মারা।তাই এসিপি ভুইয়ার কথায় সম্মতি জানিয়ে তাকরিম চাপা গলায় বলল,

“হ্যাঁ।”

এদিকে সাংবাদিকরা হামলে পড়া অবস্থা।তাকরিম আসতেই ঘিরে ধরেছে সবাই,মোবাইল ক্যামেরা নিয়ে যে যেভাবে পারছে নিউজ তৈরি করার জন্য ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে,করছে নানা রকম প্রশ্ন,

“স্যার,, স্যার,,,এডভোকেট ত্রিজয় তেজের এই সীদ্ধান্তের ব্যাপারে কি বলতে চান আপনি?”

তাকরিম রা রু করে না।বিরক্ত আর চাপা রাগে ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে তার,ইচ্ছে করছে ওই শালা ত্রিজয়কে এখান থেকেই শুট করে মেরে দিতে।

“স্যার আপনি কি সত্যিই আপনার বোনকে এডভোকেট তেজের কাছ থেকে আলাদা করার চেষ্টা করছেন?কিন্তু উনারা তো স্বামী স্ত্রী।নিজের ব্যাক্তিগত আক্রোশ মেটাতে নিজের বোনের সংসার ভাঙার প্রয়োজন কেন পরলো আপনার?”

সাংবাদিকদের একের পর এক প্রশ্ন রুখে দিচ্ছে গার্ডরা।তাকরিমের থেকে সবার একটা নির্দিষ্ট দুরত্ব তৈরি করার জন্য একপ্রকার সুরক্ষা বেষ্টনি দিয়ে তাকরিমের সাথে সাথেই এগিয়ে যাচ্ছে সবাই।

“স্যার উনার সাথে কি সত্যিই আপনার ব্যাক্তিগত কোন ক্ষোভ আছে?আর সে কারনেই কি?আর আপনার সাথের ম্যাডামই কি আপনার বোন?”

তাকরিম আর নিতে পারলো না কিছুতেই,রাগে ক্ষোভে গর্জে উঠে হটাৎ চেপে ধরলো একজন সাংবাদিকের কলার,ক্রোধিত কন্ঠে চেচালো,

“স্টপ! আই সে স্টপ।”

পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেলো এসিপি ভুইয়া,সাংবাদিকের কলার থেকে তাকরিমের হাত ছাড়াতে ছাড়াতে ভয়াতুর কন্ঠে বললো,

“শান্ত হন স্যার, মাথা ঠান্ডা রাখুন পরিস্থিতি কিন্তু নিয়ন্ত্রণের বাইরে।”

তাকরিম অনেক কষ্টে শান্ত হলো,দমে গিয়ে ছেড়ে দিলো লোকটার কলার,কোনরুপ বাক্যব্যয় না করে সোজা হাঁটা ধরলো সামনের দিকে।

এদিকে একের পর এক নিউজ তৈরি হতে শুরু করলো,প্রত্যেকটা ঘটনা সম্প্রচার হলো সরাসরি লাইভে,

“প্রিয় দর্শক আপনারা দেখলেন ঘটনাস্থলে এই মূহুর্তে এমপি তাওসিফ তাকরিম উপস্থিত হয়েছেন,কিন্তু তিনি কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে চান না,,,ঘটনার শেষ পর্যন্ত জানতে আমাদের সাথেই থাকুন।”

তাকরিম নির্দিষ্ট স্থানে পা রাখতেই হন্তদন্ত করে মাইক হাতে নিলো এসিপি ভুইয়া,শত হোক এটা তার চাকরির প্রশ্ন,তার উপস্থিতিতে ত্রিজয়ের কিছু হওয়া মানেই তার চাকরির আয়ু ফুরাবে,তাই এমন মামুলি কেসে এতো মাথাব্যথা তার,ত্রিজয় তো আর যে সে মানুষ নয়,শহরের নাম করা উকিল সে।তার মৃত্যুতে দেশ কাঁপবে এটা স্বাভাবিক ।ভুইয়া মাইক হাতে ত্রিজয়ের উদ্দেশ্যে চেচিয়ে বললো,

“এডভোকেট ত্রিজয় তেজ।এমপি মশাই এবং আপনার স্ত্রী দুজনেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছে,আপনি নিচে নেমে আসুন।”

ছাদের উপর দাঁড়িয়ে হাঁক ছুড়লো ত্রিজয়,

“এমপি মশাইকে জিজ্ঞেস করুন আমার বউ ফিরিয়ে দিবে কিনা।”

তাকরিম দাঁতে দাঁত পিষলো,মেজাজ ইতোমধ্যে যথেষ্ট বিগড়ে গিয়েছে তার,এরমধ্যে ত্রিজয়ের কথা শুনে ভেতরে জ্বলে উঠলো, হাত নিশপিশ করে চাপা কন্ঠে বললো,

“এটা কি সার্কাস হচ্ছে ভুইয়া সাহেব?আমার বোনকে আমি নিয়ে এসেছি কারণ ওরা একসাথে থাকতে চায় না।”

“এটা বললে কি জনতা মানবে স্যার? উনি যদি লাফ দিয়ে দেয় আপনার কেরিয়ার তো শেষ আমার চাকরিটাও হারাতে হবে।”

“দিক লাফ আই ডোন্ট কেয়ার।”

“স্যার মিডিয়ার সামনে আপনি ডোন্ট কেয়ার বলে পরিস্থিতি এড়াতে পারেন না,বরং আরও বেশি গরম হয়ে যাবে আপনার উচিত ডিসিশনে আসা।”

পরিস্থিতির জাতাকলে পুনরায় দমে যেতে বাধ্য হলো তাকরিম,তপ্ত কন্ঠে বললো,

“আমি কিছু বলতে পারবো না, আপনি নিস্পার কাছ থেকেই শুনে নিন ও কি চায়।”

এসিপি ভুইয়া ঘুরে তাকালো নিস্পার দিকে,তটস্থ কন্ঠে বললো,

“মেডাম আপনি বলুন আপনি কি চান?”

নিস্পা একবার তাকালো ছাদের কর্নারে দাঁড়ানো ত্রিজয়ের দিকে,তারপর ভুইয়ার হাতের মাইকটা নইজের হাতে তুলে নিয়ে সুস্পষ্ট কন্ঠে বললো,

“ডিভোর্স চাই।এই লোকের কাছ থেকে ডিভোর্স চাই আমার।”

“কিন্তু আমি তোমাকে ডিভোর্স দিতে চাই না কলিজা,আই লাভ ইউ।”

উপর থেকে ধেয়ে এলো ত্রিজয়ের উত্তর।নিস্পা তাতেও সিদ্ধান্ত বদলালো না, কঠোর কন্ঠে বললো,

“আপনার মরে যাওয়া উচিত। আপনি প্লিজ ঝাপ দিয়ে শুভ কাজটা শেষ করুন।আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছি না।”

“আমি কিন্তু সত্যিই ঝাপ দেবো কলিজা।ট্রুলি।”

তারপর নিচে দাঁড়ানো সবার উদ্দেশ্যে বললো,

“তোমরা সবাই শুনে রাখো আমার মৃত্যুর জন্য দায়ি এমপি তাওসিফ তাকরিম। উনি উনার বোনকে কেড়ে নিয়ে আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছে।”

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করেই ছাদের বাইরে এক পা বাড়িয়ে দিলো ত্রিজয়,কাউন্ট ডাউন করে উচ্চারণ করলো,

“ওয়ান।”

এসিপি ভুইয়া বিব্রত হলো,ত্রিজয়ের মতিগতি বুঝে রিকুয়েষ্ট করলো নিস্পাকে,

“প্লিজ মেডাম সিদ্ধান্ত পাল্টান,ডিভোর্স নাকোচ করুন।”

নিস্পা নিশ্চুপ।নিশ্চুপতার মাঝেই ভেসে এলো ত্রিজয়ের দ্বিতীয় কাউন্ট,

“টু।”

তাকরিম ঠোঁট বাঁকিয়ে বিদ্রুপ হাসলো,একহাত বাড়িয়ে সযত্নে আঁকড়ে ধরলো নিস্পার বাহু,ক্ষীন স্বরে বললো,

“ভয় পাওয়ার কারন নেই আলেকজান্দ্রা,আমি সব সামলে নেবো,তুমি কিছুতেই ডিভোর্স নাকোজ করবে না।আই এম শিউর এই শালা নাটক করছে।”

অথচ অযথাই ঘাবড়ে উঠছে ভুইয়া।ত্রিজয়ের লাফের সাথে সাথেই তার চাকরিটাও লাফ দিয়ে চলে যাবে এই দুশ্চিন্তায় আবারও অনুরোধ করলো নিস্পাকে,

“প্লিজ মেডাম,এখনো আর দেরি করবেন না।”

এর মাঝেই ভেসে এলো ত্রিজয়ে লাস্ট কাউন্ট ডাউন,

“তি,,,,

নিস্পা জানে ত্রিজয় লাফ দিবে না,কিন্তু যদি লাফিয়ে পরে তাহলে?এই আশঙ্কায় ছটপটিয়ে উঠলো ভেতরটা।গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো হটাৎ।মস্তিষ্কে খেলে গেলো এক চতুর পরিকল্পনা।সে খরখর জ্বিভের আগা ভিজিয়ে চেচিয়ে উঠলো,

” রাজি আমি রাজি।”

সঙ্গে সঙ্গে কপাল বেঁকে এলো তাকরিমের,রাগান্বিত কন্ঠে বললো,

“রাজি?হোয়াট ননসেন্স নিস্পা?তোমার মনে হয় ও এখান থেকে ঝাপ দিবে?”

নিস্পা চোখের ইশারায় শান্ত থাকতে বললো তাকরিমকে,তারপর ত্রিজয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,

“কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।”

“কি শর্ত?”

“শর্ত হলো আগামী এক মাসের মধ্যে আপনি যদি আমার মন জয় করে নিতে পারেন তাহলে আমি ডিভোর্স এর কথা ভাববো না,আর নয়তো এক মাস পর আমাদের ডিভোর্স হবে।”

“তাহলে তোমাকে আমার বাড়িতে আমার কাছে থাকতে হবে।”

“না।আমি আপনার বাড়িতে থাকতে পারবো না।”

ত্রিজয় এবার এসিপি ভুইয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো,

“এসিপি ভুইয়া এটা আমার প্রতি একধরনের জুলুম করা হচ্ছে,বউ যদি আমার বাড়িতে না থাকে তাহলে আমি ওর মন জয় কীভাবে করবো?”

ভুইয়া কি করবে ভেবে পেলো না,উপায়ন্তর না পেয়ে বললো,

“বউ আপনার বাড়িতে না যেতে চাইলে আপনি বউয়ের বাড়িতে চলে যান তাহলেই তো হলো।”

“তাহলে এমপি মশাই কে বলুন তার বাড়িতে আমাকে সাথে নিয়ে যেতে।”

তাকরিম হাত মুষ্টিবদ্ধ করে চেচিয়ে উঠলো,

“অসম্ভব!আমি ওকে কিছুতেই নিজের বাড়িতে নিয়ে যাবো না।”

ত্রিজয় ঝাপ দেওয়ার এক্টিং করে বললো,

“তাহলে আমিও ঝাপ দেই।”

ভুইয়া বিপাকে পরে থামালো ত্রিজয়কে,বললো,

“আরে থামুন ত্রিজয় সাহেব, আর দু’মিনিট সময় দিন।”

তারপর তাকরিমকে বোঝানোর জন্য বললো,

“রাজি হয়ে যান স্যার, একটা মাসেরই তো ব্যাপার। কেন জল ঘোলা করছেন,আজকের নিউজটা তেল মসলা মেরে আরও চারদিন চলবে,টিভির পর্দায় আমজনতার সামনে ত্রিজয় হবে নায়ক আপনি হবেন ভিলেন,আপনার কেরিয়ারে কতটা ইফেক্ট আসবে বুঝতে পারছেন?রাজি হয়ে যান প্লিজ স্যার।”

তাকরিম ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখলো বিষয় টা, একটা ভুল সিদ্ধান্ত যে তার ক্যারিয়ারে ইফেক্ট করবে সেটা সে হারে হারে টের পাচ্ছে মিডিয়ার লোকদের দিকে তাকিয়ে।তাই এক প্রকার বাধ্য হয়ে ক্ষোভ ঝাড়া কন্ঠে বললো,

“ওকে আমি রাজি। নিচে নামতে বল।”

অবশেষে তাকরিমকে বোঝাতে পেরে খুশিতে চিকচিক করে উঠলো ভুইয়া,হাফ ছেড়ে ত্রিজয়কে বললো,

“এডভোকেট তেজ আপনি নিচে নামুন।এমপি তাওসিফ তাকরিম আপনাকে উনার বাড়িতে নিতে রাজি হয়ে গিয়েছেন।”

ত্রিজয় আরও একধাপ এগিয়ে,সে কিছুতেই নিচে নামবে না সঠিক ফয়সালা না হওয়া অব্দি,তাই এসিপি কে বললো,

“উঁহু।এতো সহজে তো নামবো না এসিপি ভুইয়া,আগে এগ্রিমেন্ট তৈরি করুন,আমি ওনার মুখের কথায় বিশ্বাস করি না।”

তাকরিম ক্ষুব্ধ হয়ে চেপে ধরলো এসিপি ভুইয়ার কলার,দাঁতে দাঁত চেপে অগ্নি কন্ঠে বললো,

“জানোয়ারের বাচ্চাটাকে এবার আমি খুন করে ফেলবো,শালা কত বড় চালবাজ।”

এপর্যায়ে নিস্পাও চুপ থাকতে পারলো না আর,সহ্য সীমার বাইরে গিয়ে চেচালো,

“”এই কি সমস্যা আপনার?আপনি চাইছেন টা কি বলুন তো?”

“আমি আমার বডি তোমাকে হ্যান্ডওভার করতে চাইছি কলিজা।”

ত্রিজয়ের পক্ষ থেকে উত্তর ভেসে আসতেই কটমট করে আশেপাশে তাকালো নিস্পা,চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,

“বেহায়া নির্লজ্জ কোথাকার, তোর মরে যাওয়াই উচিত।”

এসিপি ভুইয়া তাকরিমের হাত থেকে নিজের ঝুলে থাকা জানটা উদ্ধার করে হাঁপালো,বড়বড় নিঃশ্বাস টেনে বললো,

“আরে থামুন আপনারা,আমি দেখছি, ”

তারপর ত্রিজয়কে বললো,

“তেজ সাহেব আপনি প্লিজ নেমে আসুন,কোন এগ্রিমেন্টের প্রয়োজন নেই,এমপি মশাই কখনো কথার খেলাপ করে না।”

ত্রিজয় ছাপ ছাপ উত্তরে বললো,

“কারো মুখের কথায় বিশ্বাস করি না আমি, দ্রুত এগ্রিমেন্টে সাইন করতে বলুন।”

ত্রিজয় ইভানকে চেচিয়ে বললো,
“ইভান উনাদেরকে এগ্রিমেন্ট প্রেপার টা দেও।”

ইভান ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেললো,পকেট থেকে এগ্রিমেন্ট প্রেপার টা বের করে এগিয়ে গেলো তাকরিমের কাছে।
তাকরিম প্রেপারটা দেখেই ইভানের হাত থেকে টেনে নিয়ে ছুড়ে মারলো ভুইয়ার মুখের উপর,আগুনঝরা কন্ঠে বললো,

“কুত্তার বাচ্চা প্রেপার রেডি করে এসেছে,কত বড় ড্রামা বাজ।শালা কুত্তা।”

ভুইয়া কুড়িয়ে নিলো প্রেপার গুলো,অসহায় কন্ঠে বললো,
“প্রেপার যখন আছে সাইনটা করে দিন স্যার।”

তাকরিম শক্ত কন্ঠে বললো,

“এই জানোয়ার টা মরলে মরুক,কিন্তু আমি কোন সাইন করতে পারবো না।”

এদিকে ত্রিজয় তাড়া দেখিয়ে বললো,

“এসিপি ভুইয়া আমি ঝাপ দিলাম,কারো ড্রামা দেখে নিজের সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছি না আমি।”

নিস্পা জ্বালাধরা কন্ঠে বিরবিরালো,

“মানে কি পরিমাণ ব্রিটিশ হলে এতোক্ষণ ধরে নিজে ড্রামা করার পর বলছে ড্রামা দেখার সময় নেই।”

ভুইয়া প্রেপারটা তাকরিমের হাতে ধরিয়ে দিয়ে ইভানের বুক পকেট থেকে কলমটা নিয়ে নিলো,মিনতি স্বরে বললো,
“স্যার স্যার। প্লিজ এগ্রিমেন্টে সাইন করে দিন।একটা মাসেরই তো ব্যাপার।”

তাকরিম তির্যক দৃষ্টিতে তাকালো আশপাশে,সবাই মূক নয়নে দেখছে তাকে,সাংবাদিকদের হাতে ধরে রাখা ক্যামেরা গুলো বন্ধুকের নলের মতো তাক করা তার দিকেই।এখান থেকে বেড়োনোর উপায় নেই,এই এগ্রিমেন্টে সাইন করলে আগামী একমাসেও মুক্তি পাবে না সে,ত্রিজয় যে তার জীবনটা তেজ পাতা করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই চাল চেলেছে হারে হারে টের পাচ্ছে সে।কিন্তু এখন কিছু করার নেই,ত্রিজয়কে না হয় নিজের বাড়িতে নিয়েই উচিত শিক্ষা দিয়ে দিবে তাকরিম।আজকের প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বে সে,কথাগুলো ভাবতে ভাবতে প্রেপারে কলম চালালো তাকরিম,সাইন করে একপ্রকার ছুড়ে মারলো ভুইয়ার দিকে।

ভুইয়া দ্রুত প্রেপার গুলো কেচ করে ত্রিজয়কে বললো,

“এমপি মশাই এগ্রিমেন্টে সাইন করে দিয়েছে এডভোকেট তেজ।আপনি এখন নিচে নেমে আসুন।”

ত্রিজয় তপ্ত শ্বাস ফেলে বক্র হাসলো। হাত বুলালো থুতনিতে।তারপর নিশ্চিন্ত মনে হেলেদুলে নেমে এলো নিচে।

ত্রিজয়কে নামতে দেখে দ্রুত এগিয়ে এলো ইভান।ইভানের মুখে হাসি দেখে ভ্রু নাচালো ত্রিজয়,বললো,

“কি ইভান?কেমন দিলাম বল?”

ইভান বাহবা জানিয়ে বললো,

“ইউ আর জিনিয়াস স্যার। পাক্কা ব্রিটিশ।”

ইভানের মুখে ব্রিটিশ শব্দটা শুনেই চোখ গরম করে তাকালো ত্রিজয়,তপ্ত কন্ঠে বললো,

“এক মাসের সেলারি কাঁটা।”

ত্রিজয়ের হুমকিতে মুখটা চুপসে ফেললো ইভান,মিইয়ে যাওয়া কন্ঠে বললো,

“স্যার! আপনি এমন ব্রিটিশের মতো কেন করছেন,,

” শব্দটা আবার উচ্চারণ করেছ?তার মানে দু মাসের সেলারি নট।”

কথাটা বলেই ইভানকে রেখে সামনে এগোলো ত্রিজয়।ইভান পেছন থেকে দৌড়ে এসে বললো,

“স্যার আমি কিন্তু আপনার লাগেজ গুছিয়ে এনেছি।”

“লাগবে না,এগুলো নিয়ে সুন্দর করে কাবার্ডে ঢুকিয়ে রাখো।এমপির টাকা দিয়ে যা কেনার কিনবো।পাক্কা চার পাঁচ বছর যেন আর কেনা না লাগে।”

ত্রিজয়ের কথা শুনে তব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে গেলো ইভান,মনে মনে বিরবির করে বললো,

“শালা কিপ্টা তোর এই জামাকাপড় ইদুরে কাঁটবে দেখিস।”

ত্রিজয় পেছনে ঘুরে তাকিয়ে বললো,

“কিছু বললে?”

“না মানে স্যার,ড্রেস গুলো আমাকে দিয়ে দিলে আমারও দু বছর আরামছে কেঁটে যেত।”

“ব্যাংকের ভেতর তোমার টাকা গুলো পঁচে যাচ্ছে ইভান।কিপ্টেমি বাদ দিয়ে টাকা গুলোর প্রান বাঁচাও।”

কথাটা বলেই হনহনিয়ে প্রস্থান করলো ত্রিজয়।ইভান সেখানে দাঁড়িয়েই নিসপিস করে আওড়াল,

“শালা কিপ্টার মাদারবোর্ড।অভিশাপ দিলাম ব্যাংক তোর সমস্ত টাকা নিয়ে দেউলিয়া হয়ে যাক।তোর বাচ্চারা ছেড়া জামাও পাবে না দেখিস।”

________________

সকালের ঘটনাটা মাত্রই টিভিতে দেখেছে কিয়ান।হয়তো সেজন্যই কড়া দুপুরে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাড়ি থেকে বেড়োবে একবার।নিস্পা দিনকে দিন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে,ত্রিজয় আর তাকরিম এমন করতে থাকলে নিস্পাকে পাওয়ার চান্স জিরোতে নেমে আসবে শিউর।তার আগেই যা করার করতে হবে,যেকোনো মূল্যে এমপির বাড়িতে ঢুকতে হবে তার।কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই শরীরে সফট একটা ব্লু রঙের শার্ট জড়ালো কিয়ান।তখনই শুনতে পেলো অনুর নরম স্বর,

“কোথাও যাচ্ছেন?”

কিয়ানের অভিব্যক্তি পাথরের ন্যায় শক্ত,অনুর কথার উত্তর তো দিলোই না,বরং শার্ট এর বোতাম লাগাতে লাগাতে বললো,

“কৈফিয়ত চাইছো?”

অনু দাঁতে দাঁত পিষে চোখ রাঙিয়ে তাকালো কিয়ানের দিকে,টসটসে কন্ঠে বললো,

“এক লাইন বেশি বুঝেন নাকি ঘাড়ের রগ একটা ত্যারা দেখে সব কথা ত্যারা ভাবেই ভেতরে ঢোকান?”

কিয়ান শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে থেমে গেলো,অনু যে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মিররে,সে শক্ত কন্ঠে বললো,

“যদি বলি ঘাড়ের রগ একটা কাঁটা তখন?”

অনু টিপ্পনী কেঁটে দ্রুত কন্ঠে বললো,

“আমার তো মনে হয় আপনার ঘাড়ে রগই নেই,সাথে মাথাও পুরো খালি।”

কিয়ান ঘুরে তাকালো, চুপচাপ নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে রাখলো অনুর মাথায়,অনু চোখ উল্টে বোঝার চেষ্টা করলো কিয়ানের মতিগতি,কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলো না।এদিকে কিয়ান আলতো করে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে তরল কন্ঠে বললো,

“আর তোমার ঘাড়ে যদি মাথাটা না থাকে?তখন?তখন কি হবে?”

অনু ঘাবড়ে গেলো,একপ্রকার লাফিয়ে সরে দাড়ালো কিয়ানের কাছ থেকে,কর্কষ কন্ঠে বললো,

“মাথা কাঁটার হুমকি দেওয়া ছাড়া আপনি আর কিছু জানেন না তাই না?”

“শুধু হুমকি নয়,মাথাকাঁটা ছাড়া আমি সত্যিই খুন করার কোন কৌশল জানি না।একটা মানুষের মুখ বন্ধ করতে শরীরের অন্য কোন যায়গায় ছুড়ি চালানোর চেয়ে মাথাটা কেঁটে ফেলাই বেস্ট কাজ।না থাকবে মাথা না থাকবে কথা।”

“যেভাবে বলছেন মনে হচ্ছে আপনি আগে পরে খুন করেছেন ?”

“তো?এতোক্ষণ ধরে আমার কথাগুলো কি তুমি নিছক ফান হিসেবে নিয়েছ নাকি?”

অনু চোখ বড়সড় করে তাকালো এবার,কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে বললো,

“আপনি সত্যিই খুনি।”

কিয়ান ধিম কন্ঠে প্রত্যুত্তর করলো,

“তোমাকে খুন করে প্রমাণ দেবো?”

সঙ্গে সঙ্গে আরো দু’হাত দুরত্ব নিয়ে দাঁড়ালো অনু,চোখ খিচে বন্ধ করে বললো,

“না থাক।আমার মাথা তার জায়গাতেই ঠিক আছে।”

কিয়ান আর লাগালো না শার্ট এর বাকি দুটো বোতাম,সে ধিরে ধিরে এগিয়ে এলো অনুর কাছে,অনুর নাকটা এসে যতক্ষণ না তার বক্ষপট স্পর্শ করলো ততক্ষণ এগোলো সে,স্তিমিত কন্ঠে বললো,

“কিন্তু তুমি তোমার জায়গায় ঠিক নেই,লিমিট ক্রশ করে ফেলেছ।যা ফিউচারে তোমার মাথা হারিয়ে ফেলার কারণ হবে।”

অনু তরাগ করে চিবুক তুলতে গিয়ে বোচা নাকটা ধাক্কা খেলো কিয়ানের শক্ত বুকের মাঝে,সে এক হাত তুলে নাক ঘষতে ঘষতে চোখ পাকিয়ে বললো,

“যেভাবে বলছেন মাথা হারিয়ে যাওয়ার পর মনে হয় আমি জিন্দা থেকে মাথা খুঁজে বেরাবো।”

“এতো ষ্টুপিড কথাবার্তা কি করে আসে তোমার মাথায়?”

“যেভাবে আপনার মাথায় আমার মাথা কাটার চিন্তা আসে।”

কিয়ান রাগে ভস্মীভূত দৃষ্টিতে তাকালো অনুর দিকে,বিদ্ধ কন্ঠে বললো,

“গেট আউট চোখের সামনে থেকে যাও আমার।”

অনু গেলো না,বরং শুখনো একটা ঢোক গিলে বললো,

“যেটা বলতে এসেছি সেটা না বলে চলে যাব?”

কিয়ান সরু চোখে তাকয়ে তিক্ত কন্ঠে বললো,

“যেটা বলতে এসেছ সেটা না বলে অতিরিক্ত দশ লাইন কেন বলেছ?”

অনু বরাবরই চঞ্চল, কিয়ানের কঠিন প্রশ্নগুলোর ফানুসের মতো হাল্কা করে নিয়ে চমকে উঠার ভঙিতে জিজ্ঞেস করলো,

“আপনি গুনেও রেখেছেন?বাহ!কয় লাইন বলেছি সেটা মনে থাকবে তো দূর আমি কি বলেছি সেটাই ভুলে গিয়েছি।”

কিয়ান বৃদ্ধাঙুল ঘষলো নিজের কপালে, রাগ নিয়ন্ত্রণ করে,বিরক্ত মিশ্রিত কন্ঠে বললো,

“ফালতু কথা না বলে যা বলার কুইক বল।”

অনু নখ খুটে চিবুক নামিয়ে আইঢাই করে বললো,

“না আসলে বলতে চাইছিলাম, যতই হোক আমাদের তো বিয়েটা হয়েছে তাই,,,,,”

কথাটা শেষ করার ফুসরত পেলো না অনু,তার আগেই কিয়ান তার হাত বাড়িয়ে চেপে ধরলো অনুর কুন্তলরাশি,চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,

“তাই আমার মতো হ্যান্ডসাম পুরুষের সাথে বাসর না করে থাকতে পারছো না তাইতো?”

কিয়ান নিজের মুখটা আরেকটু এগিয়ে নিয়ে হিসহিসিয়ে বললো,

“এটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দেও,তোমার মতো থার্ডক্লাস মেয়েকে বাড়িতে যায়গা দিয়েছি এটাই এনাফ,বিছানায় নিয়ে যাওয়ার মতো রুচি নেই।”

অনু রাগে দুঃখে ক্ষোভে নিজের চুলের উপর থেকে সরানোর চেষ্টা করলো কিয়ানের হাত,উত্তপ্ত কন্ঠে বললো,

“এই থার্ডক্লাসের বাচ্চা থামুন।আমার মাথায় ঠাডা পরে নাই যে আমি আপনার সাথে বাসর করার জন্য বেহায়া হতে আসবো।”

চেচিয়ে কথাগুলো বলেই থামলো অনু,তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে ক্ষীণ স্বরে বললো,

“অসভ্য কোথাকার আমি বলতে এসেছি আমি ডিভোর্স নিতে চাই।”

কিয়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওভাবেই তাকিয়ে রইলো অনুর শ্যামবর্ণা মুখের দিকে,তারপর কিয়ৎক্ষন চুপ থেকে ছেড়ে দিলো অনুর চুল,নিঃশেষিত কন্ঠে বললো,

“বাসর আর বিচ্ছেদ যাই বলতে আসো না কেন,শোনার মতো রুচি নেই আমার।বিকজ এই থার্ডক্লাস বিয়েকে বিয়েই মানি না আমি।”

ছাড়া পেয়ে আরেক দফা হাঁপালো অনু,পাশের টেবিল থেকে একটা ওয়াটার বোতল তুলে ঢকঢক করে খেলো পানি,তারপর কন্ঠে শক্তি সঞ্চার করে পুনরায় চেচিয়ে উঠলো,

“থার্ডক্লাসের বাচ্চা আর একবার থার্ডক্লাস বললে এই থার্ডক্লাসকে পানি দিয়ে গুলিয়ে খাইয়ে দেবো।”

কিয়ান নাক ছিটকে বিদ্রুপ কন্ঠে বললো,

“তোমাকে খাওয়ার রুচি নেই আমার।গলায় আঙুল দিয়ে বোমি করে দেবো।”

অনু ঠাস করে আছাড় দিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখলো পানির বোতল টা,উত্তপ্ত কন্ঠে বললো,

“আমি আমাকে খেতে বলিনি বেয়াদ্দব বেডা।আপনার বোমির কারণ হওয়ার ইচ্ছে নেই আমার।”

কিয়ান শানিত দৃষ্টিতে তাকালো অনুর দিকে,বিদ্রুপাত্মক কন্ঠে বললো,

“তাহলে কি আমাকে তোমার বোমির কারণ বানানোর জন্য ইচ্ছুক ?”

অনু ঘৃনায় মুখ চেপে ধরলো তার,রাগচটা কন্ঠে বললো,

“ওয়াক ছিঃ, আপনার কথা শুনেই আমার বোমি চলে আসছে।”

________

শেষ রাত। চারপাশের অন্ধকার যেন শ্বাসরোধ করে দিচ্ছে নিস্পার।অন্ধকারের নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে সে,চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই। মাথা ভারী হয়ে আসছে তার, তবুও চোখের পাতা নামাতে সাহস পাচ্ছে না সে। যতবারই চোখ বন্ধ করে ততবারই ভেসে ওঠে রক্ত হীম করা অতীতের দৃশ্যগুলো।দৃশ্যগুলো এতটাই জীবন্ত যে নিস্পা শিউরে ওঠে প্রতিবার। মনে হয়, অন্ধকার ফুঁড়ে সেসব ছায়া এখনই বেরিয়ে এসে তার বুকের ওপর চেপে বসবে। দীর্ঘ রাত্রি অনন্ত হওয়ার পথে অথচ সে এক ফোঁটা চিৎকারও করতে পারছে না।যন্ত্রণায় ভেতরটা হাহাকার করে উঠছে তার।

“ঘুমাও নি?”

সাত পাঁচ ভাবনার মাঝেই ত্রিজয়ের কন্ঠ কর্নপাত হতে হুড়মুড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো নিস্পা,পেছন ঘুরে তাকাতেই দেখলো তার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ত্রিজয়।অতি পরিচিত আর অসহনীয় চেহারাটা দেখেই গা জ্বলে উঠলো নিস্পার, তিরিক্ষি কন্ঠে বললো,

“আপনি এতো রাতে আমার ঘরে কেন এলেন?”

ত্রিজয় ধির পায়ে এগিয়ে এসে দাড়ালো নিস্পার কাছে,ঠান্ডা কন্ঠে বললো,

“রাত জাগলে শরীর খারাপ করবে,ঘুমানো উচিত তোমার।”

নিস্পা চোখ ঘুরিয়ে তাকালো দেয়াল সেট ঘরিটার দিকে,ঘড়ির কাটা তখন তিনটের ঘরে,একটু পড়ে ভোর হয়ে যাবে, আর এইসময় এই লোক নিজের ঘুম বাদ দিয়ে এসেছে তার ঘুমানোর কথা বলতে?এই লজিক লেস কথাটা হজম করতে কষ্ট হলো নিস্পার,খিটখিটে কন্ঠে বললো,

“রাত তিনটায় এটা বলার জন্য এসেছেন?”

“যদি বলি হ্যাঁ।”

ত্রিজয়ের ভাবলেশহীন উত্তরে কিঞ্চিৎ চটে গেলো নিস্পা,কর্কশ কন্ঠে বললো,

“খেয়েদেয়ে কাজ নেই আপনার?”

“কাজই তো করতে এলাম।বউকে পাহারা দেওয়ার চেয়ে ইমপরটেন্ট কাজ আর কি হতে পারে।”

“রাত বিরেতে কেন জ্বালাচ্ছেন বলুনতো?আমি রিকুয়েষ্ট করছি প্লিজ আপনি এই বাড়ি থেকে চলে যান।প্লিজ।”

কথাটা বলতে বলতে দুই হাত জোর করে কপালে ঠেকালো নিস্পা,অথচ কন্ঠে রুক্ষতা ছাড়া পাওয়া গেলো না এক রত্তি মিনতির আভাস।ত্রিজয় নিস্পার এমন আচরণে মুচকি হাসলো,নিস্পাকে আরেকটু রাগিয়ে দিতে বললো,

” এতো সহজে যাচ্ছি না কলিজা।এমপির কালো টাকা পেট ভরে খাবো,নিজের পেটে না হলে সেই খাবারের প্রোটিন তোমার পেটে দেবো, বংশবৃদ্ধি করবো।তারপর বাচ্চাগাচ্ছা নিয়ে একসাথে বসে খাবো।সরকারি কোষাগার খালি না হওয়া পর্যন্ত কিছুতেই যাবো না।”

দাঁতে দাঁত পিষলো নিস্পা,জ্বলন্ত দৃষ্টিতে ত্রিজয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,

“আপনি শোধরাবেন না তাই না?”

“আমি শুধরে গেলে শুখ পাবে কোথায় কলিজা?”

ত্রিজয়ের এমন নিস্পৃহ উত্তরে আরেকটু ফুসে উঠলো নিস্পা,কন্ঠে একই রকম ক্ষোভ অবিচল রেখে আবার বললো,

“আপনি বেহায়াগিরি থামাবেন না তাইতো?আমার কথাও মানবেন না?”

ত্রিজয় চঞ্চল ভঙিতে এসে বসলো নিস্পার বিছানায়,পায়ের উপর পা তুলে তির্যক কন্ঠে বললো,

” আমার না খাওয়া চাটনির প্যাকেট না খেয়েই সন্যাস নেওয়ার কথা বললে কি করে মানবো মিস চাটনি?”

নিস্পার রাগ শুয়োঁপোকার মতো কিলবিল শুরু করলো মস্তিষ্কে,নিজেকে খুব কষ্ট করে সংযত করে বললো,

“আচ্ছা কি করলে আপনি এই বাড়ি থেকে বের হবেন বলুন।”

ত্রিজয় ভ্রুকুটি তুলে বললো,

“যা বলি তা করবে?”

“আপনাকে বের করার জন্য সব করতে প্রস্তুত।কিন্তু শর্ত হলো 18+ কাজকর্ম করতে দেওয়া যাবে না।”

ত্রিজয় হাত বাড়িয়ে অকস্মাৎ আঁকড়ে ধরলো নিস্পার কোমড়,নিস্পা কিছু বুঝে উঠার আগেই হেচকা টানে মেয়েটার নাজুক শরীরখান আবদ্ধ করলো নিজের বাহুতলে,কায়দা করে নিজের উরুর উপর বসিয়ে নিয়ে মোহিত কন্ঠে বললো,

“বয়স বত্রিশে পৌঁছে 18+কাজকর্ম আমার পোষাবে না কলিজা,আমার তো 81+ কাজকর্ম করতে ইচ্ছে করছে।”

ত্রিজয় ধিরে ধিরে নিজের নিরেট ঔষ্ঠদ্বয় এগিয়ে নিলো নিস্পারে ঘাড়ের দিকে।নিস্পা ভড়কালো,তার নাজুক অস্তিত্বখানি মিইয়ে এলো অস্বস্তিতে।ত্রিজয় নেশাতুর প্রানীর মতো গন্ধ শুকলো নিস্পার তনু ত্বকের,তারপর উন্মাদের ন্যায় ঠোঁট দাবিয়ে দিলো নিস্পার ঘাড়ে,নিস্পা ছটপটিয়ে উঠলো, নিঃশ্বাস আটকে গেলো বুকের মধ্যখানে।অথচ ত্রিজয় লাগামহিন একের পর এক বাইট দিতে শুরু করলো নিস্পার ঘাড়ে।ত্রিজয়ের অবাধ্য বিচরণ সমস্ত সীমানা অতিক্রম করে নিস্পার বুকের সংবেদনশীল অংশে পৌছানো মাত্রই আঁতকে কেঁপে উঠলো নিস্পা।শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ত্রিজয়কে ধাক্কা মেরে সড়ে এলো দ্রুত।

নিস্পা ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলে শুখনো ঢোক গিললো কয়েকবার,ত্রিজয়ের নেশাধরা চাহনির দিকে তাকিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টালো দ্রুত।কন্ঠে রূঢ়তা টেনে বললো,

“বাজে বকা বন্ধ করে কি করলে যাবেন সেটা বলুন।”

ত্রিজয় হাঁপালো।দু’হাতে মাথার চুল খামচে চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ।প্রায় অনেকটা সময় কাটলো নৈঃশ্বব্দে।একটু আগের অপ্রিতিকর ঘটনাটা নিয়ে নিস্পা নিজেও বিব্রত ভিষণ।ঘরটা নিজের না হলে ছুটে বেড়িয়ে যেতো তক্ষুনি, কিন্তু যেহেতু ঘর নিজের তাই এই মূহুর্তে লজ্জা আর অস্বস্তি থেকে পালানো পথ বন্ধ।

“কান ধরে আপ এন্ড ডাউন করো দশ বার।”

ভাবনার মাঝেই ভেসে এলো ত্রিজয়ের ঠান্ডা স্বর।নিস্পা তাজ্জব হয়ে তাকালো,চোখ উল্টে বিহ্বলিত কন্ঠে বললো,

“সামান্য এই কাজটা করলে যাবেন?”

“হ্যাঁ।”

“ওকে আমি এক্ষুনি করছি।”

নিস্পা ঝটপট কান ধরে উঠবস করা শুরু করলো।গুনে গুনে দশবার কানধরে আপ ডাউন করার পর।উৎকন্ঠিত স্বরে বললো,

“হয়েছে,এবার আপনি আপনার কথা রাখুন।এই বাড়ি থেকে বেড় হন।”

ডেবিল হাসলো ত্রিজয়,বেডসাইড টেবিলের উপর থেকে পানির গ্লাস টা তুলে প্রতিক্রিয়া বিহীন গ্লাসের সবটুকু পানি ঢেলে দিলো নিস্পার মাথায়, চটুল কন্ঠে বললো,

“সরি কলিজা,তোমার আপ ডাউন টা আমার পছন্দ হয় নি।আরেকটু ভালো পারফরম্যান্স দরকার।নয়তো আমাকে সেটিস্ফাইড করতে পারবে না।”

নিস্পা বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ।ত্রিজয়ের এমন কান্ডে রাগে ফেটে গেলো ভেতরটা,হিংস্র বাঘিনীর ন্যায় ফুসে উঠে আঙুল তুললো ত্রিজয়ের দিকে,গুজগিজ বললো,

“ইউউ,,,আপনি আমার গায়ে পানি কেন ঢাললেন?”

ত্রিজয় ঠোঁট কামড়ে কুটিল কন্ঠে বললো,

“শাওয়ার নিয়ে নিও। শরীর থেকে ইলিশ মাছের গন্ধ আসছে।ইউ নো ইলিশ মাছ খাওয়ার লোভ আবার আমি সামলাতে পারি না।”

_______

সকাল সকাল ফ্রেশ হয়ে নিজের ঘরে তাড়াহুড়ো করে রেডি হচ্ছে তাকরিম।সবে মাত্র সকাল হলো, বেশিরভাগ সময় এই সময়টাতে ঘুমিয়ে থাকে তাকরিম,অথচ আজ তাড়াতাড়ি তো উঠলোই, তারউপর কাজকর্মে কেমন একটা তাড়াহুড়ো ভাব।

তাকরিমের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কথাগুলো নিশ্চুপে ভাবলো নিস্পা।তারপর তাকরিমের মনযোগ আকর্ষন করতে গলা খাঁকিয়ে বললো,

“আসবো?”

তাকরিম হাতঘড়ি টা হাতে লাগাতে লাগাতে একবার তাকালো নিস্পার স্নিগ্ধ মুখের দিকে,তারপর উদাসীন হেসে বললো,

“তোমাকে আবার কবে বলেছি আমার ঘরে আসার জন্য অনুমতি নিতে হবে।”

“বলেন নি কিন্তু কারো ঘরে অনুমতি ব্যাতিত ঢুকা পছন্দ নয় আমার।”

ঠোঁট টিপে মলিন কন্ঠে জবাব দিলো নিস্পা।তারপর তাকরিমের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“কোথাও যাচ্ছেন?”

হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো তাকরিম,প্রত্যুত্তরে বললো,

“হুম।আম্মাকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করতে যাচ্ছি।”

“উনি চলে এসেছেন?”

“হ্যাঁ।কিছুক্ষণের মধ্যেই এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করবে।”

“ওহ।”

তাকরিম ঘড়িতে সময় দেখলো।সকাল নয়টা বাজতে চলেছে,নিস্পা এতো সকালে তার ঘরে এসেছে, তারমানে নিশ্চয়ই কিছু বলার জন্যই এসেছে।মনে মনে কথাটা ভেবেই তাকরিম প্রশ্ন করলো দ্রুত,

“এতো সকালে এলে, কিছু বলবে?”

নিস্পা একটু আমত আমতা করে ইনিয়েবিনিয়ে বললো,

“না আসলে একটা দরকারে এসেছিলাম।”

“হ্যাঁ বলনা কি দরকার।”

“আসলে আমার দাদি তো ত্রিজয়ের বাড়িতে।একেবারে একা।আমি যতদিন এই বাড়িতে আছি ওনাকে এখানে নিয়ে আসলে কি অসুবিধা হবে?এক মাস পর ডিভোর্স টা হয়ে গেলেই আমি আমাদের বাড়িতে চলে যাবো।”

নিস্পার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো তাকরিম,নরম কন্ঠে বললো,

“এই সামান্য কথার জন্য এতো নারভাস কেন হচ্ছো?ইটস ওকে।তোমার দাদিকে নিয়ে আসার জন্য লোক পাঠাচ্ছি আমি।তোমার যতদিন মন চায় তুমি ততদিন থাকবে,চাইলে সারাজীবন।”

নিস্পা হাপ ছেড়ে বাঁচলো,মনে মনে প্রসন্ন হয়ে বললো,

“থ্যাংক ইউ।”

তাকরিম নিজের খরখরে হাত ছোয়ালো নিস্পার পেলব নরম গালে।ঠিক তক্ষুনি হাতের সংস্পর্শে এলো নিস্পার ভেজা চুল।সঙ্গে সঙ্গে কপাল কুচকালো তাকরিম।নিজের হাতটা এগিয়ে নিয়ে রাখলো নিস্পার চুলের উপর,সন্দিগ্ধ কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“কালরাতে নিজের ঘরে ছিলে ?

নিস্পা ঠিক বুঝে উঠতে পারলা না তাকরিমের প্রশ্নের মানে,সে আনমনেই উত্তর দিলো,

“হ্যাঁ।”

তাকরিম আঙুল দিয়ে হাল্কা নেড়ে চেড়ে দেখলো নিস্পার ভেজা চুল,কন্ঠে উদ্বেগ টেনে জিজ্ঞেস করলো,

“সকালে গোসল করেছিলে?চুল ভেজা যে?”

নিস্পা এবার একটু বুঝতে পারলো, তাকরিমের প্রশ্নের মানে ধরে ফেললো চুটকিতে,দ্রুত নিজের চুলের উপর থেকে তাকরিমের হাতটা সরিয়ে নিয়ে আইঢাই করে জিবাব দিতে চাইলো,

“ওই আস,,,,,

তাকরিমের রুমের দরজার সাথে এসে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো ত্রিজয়,কন্ঠে তীক্ষ্ণতা টেনে নাজুক ভঙিতে বললো,

“কারণ রাতে আমি ওর ঘরে ছিলাম এমপি মশাই।সামান্য আপ এন্ড ডাউন করেই বউ আমার হাঁপিয়ে গিয়েছে।”

কথা মাঝে ফোড়ন কাঁটায় মেজাজ খারাপ হলো নিস্পার। চটে গিয়ে পেছনে তাকিতে দেখতে পেলো ত্রিজয়ের চেহারাটা,রাগে গা পিত্তি জ্বলে উঠলো তার,বিরুপ কন্ঠে বললো,

” এই আপনি একদম বাজে কথা বলবেন না। আপনার জন্যই তো সাজ সকালে গোসল করতে হলো আমার।”

নিস্পার কথায় ঠোঁট কামড়ে পিক করে হেসে দিলো ত্রিজয়,বাঁকা স্বরে বললো,

“তো আমি কখন বললাম আমার জন্য গোসল করো নি তুমি?প্রতিটি মেয়ের সকালে গোসল করার কারণ তার হাসবেন্ডই থাকে।”

নিজের মূর্খ কথায় নিজেই রেগে গেলো নিস্পা,বরসিতে টোপ ফেলার পর সেই টোপ গিলে ফেলে মাছ যেমন ছটপট করে উঠে তেমন করেই হাসফাস করে উঠলো সে,ক্ষেপে গিয়ে চেপে ধরলো ত্রিজয়ের কলার,ক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো,

“এই লিমিট ক্রশ করবেন না বলে দিলাম,নোংরা কথা বন্ধ করুন।আমাদের মাঝখানে কেন কথা বলতে এসেছেন আপনি?”

ত্রিজয় ভাবলেশহীন একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে,চোখে মুখে কোন প্রতিক্রিয়া নেই, দৃষ্টি শুন্য নির্জিব,অথচ মুখ থেকে বেড় হওয়া একেকটা কথা এটমবোম থেকেও ডেঞ্জারাস,

“মাঝখানে কোথায় আমি?আমিতো সাইডে দাঁড়িয়ে আছি।”

চোয়াল শক্ত করে পিলারের মতো সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তাকরিম।চোখ দুটো জ্বলছে ক্রোধে,মুষ্টিবদ্ধ হাতের শিরা গুলো ফুলে উঠেছে টানটান করে।চোখ বন্ধ করে বুক ফুলিয়ে শ্বাস টানলো সে,তারপর সেই শ্বাস নিটোল বুকে আটকে রেখেই এগিয়ে এলো নিস্পা আর ত্রিজয়ের দিকে।

ত্রিজয় একই রকম নিরাবেগ, নির্লিপ্ত ভঙিতে ঠোঁটে ঝুলিয়ে রেখেছে বাঁকা হাসি।তাকরিম এসেই ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে নিস্পার হাতটা চেপে ধরলো নিস্পার হাত,স্তিমিত রূঢ় কন্ঠে বললো,

“চল। তোমাকে সাথে নিয়ে এয়ারপোর্টে যাবো আমি।”

তাকরিমের এমন রুক্ষ স্পর্শে হকচকালো নিস্পা,তাকরিমের ভেতরে জ্বলে উঠা আগুনের ভয়াবহতা টের পেলো স্পষ্ট, অবিন্যস্ত কন্ঠে বললো,

“কিন্তু,,,,”

তাকরিম নিস্পাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই টান বসালো নিস্পার হাতে,ত্রিজয়ের চোখের সামনে দিয়ে নিস্পার হাত ধরে বেড়িয়ে গেলো ঘর থেকে।ত্রিজয় সেদিকে তাকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো,ঘাড় কাঁত করলো দুদিকে,তারপর শ্লেষ হেসে এগিয়ে গেলো তাদের কাছে।তারপর আস্তে করে নিস্পার বা হাতটা মুঠোবন্দী করে বললো,

“চল আমিও সেদিকেই যাচ্ছি,তোমাদের এগিয়ে দিয়ে আসি।”

নিস্পার হাত ধরায় রাগে ব্লাস্ট করলো তাকরিম,বেড়িয়ে এলো ভেতরে ধামাচাপা দিয়ে রাখা আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত,নিস্পাকে ছেড়ে দিয়ে ক্ষুব্ধ দু’হাতে চেপে ধরলো ত্রিজয়ের কলার,অগ্নিশিখা মিশ্রিত কন্ঠে চেচিয়ে উঠলো,

“ইউ বাস্টার্ড।”

ত্রিজয় নির্লিপ্ত,চোখমুখ শান্ত,ঠোঁটের কোনে ঝুলে আছে বিদ্রুপ হাসির ঝলক,নীল চোখের দৃষ্টি শার্টে বোতামের দিকে।তার দৃষ্টি অনুসরণ করে কপাল কুচকে এলো তাকরিমের,তীব্র আক্রোশ ফেটে পড়া অভিব্যক্তিতে নামে ধ্বস,রূঢ় হাতের মুঠো আলগা হয়ে আসে নিমিষেই।
ত্রিজয় নিজের শার্টের বোতামে সেট করা হিডেন ক্যামেরাটায় চুমু খেয়ে কটাক্ষ করে আওড়ায়,

“আই এম বাস্টার্ড প্রো ম্যাক্স।”

______

কালকের ঘটনার লাইভ সম্প্রচার এখনো দেখছে আয়মান।একবার নয় বরং বারকে বার একই সম্প্রচার দেখে চোখ লাল করে ফেলেছে ক্ষোভে আর হিংস্রতায়।
শিকারি নেকড়ের ন্যায় ফোসফাস করছে সে,তার উত্তপ্ত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে আগুনের হুল্কার মতো।রাগে থরথর করে কাঁপছে তার সমস্ত শরীর।
একমাত্র বিশ্বস্ত বন্ধু রোহান পাশেই বসে তার।কাল সকাল থেকে আজ সন্ধ্যা হতে চললো অথচ কোনরুপ হেলদোল দেখা গেলো না আয়মানের।একই ভঙিতে টিভির বড় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চোখ রক্তলাল করে ফেলেছে।
এপর্যায়ে বেশ অধৈর্য হলো রোহান,বন্ধুর এমন পরিস্থিতিতে কিভাবে সাহায্য করবে ভেবে পেলো না সে।তাই ঠান্ডা শীতল কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“কিরে?কি ভাবছিস?”

আয়মান ভূমিকম্পের ন্যায় ঝাকুনি দিয়ে উঠলো হটাৎ, নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে পাশ থেকে একটা ফুলদানি তুলে নিয়ে ছুড়ে মারলো টিভির স্ক্রিনে।মূহুর্তেই টিভির রঙিন পর্দা কালো হয়ে গেলো,ফুলদানির আঘাতে স্ক্রিন ফেটে গেলো অনেকটা।অথচ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করলো না আয়মান, চুল খামচে ধরে চেচিয়ে উঠলো ,

“সব ভাবনা গোলমেলে হয়ে গিয়েছে রোহান।ওই ত্রিজয় তো ছক্কা মেরে দিলো।”

রোহান বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ভাঙাচোড়া টিভিটার দিকে,তারপর বিদ্রুপ মিশ্রিত কন্ঠে বললো,

“শালা এমনি এমনি এডভোকেট হয় নি, আর এমনি এমনি কোন কেস জিতে নি,মাথায় শয়তানি বুদ্ধির গোডাউন তৈরি করে রেখেছে।ডিরেক্ট এমপিকে নাকানিচুবানি খাওয়ানোটা মামুলি কাজ ছিলো না।”

আয়মান উঠে দাড়ালো,তপ্ত শ্বাস ফেলে অনুসন্ধানী গলায় বললো,

“এখন কি করবো কিছু মাথায় আসছে না রোহান,কিন্তু যেকোনো মূল্যে নিস্পাকে আমার চাই।হার মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না।”

“এমপির পাওয়ার আর ত্রিজয়ের বুদ্ধির কাছে তোর হার না মানা ছাড়া উপায় নেই দোস্ত।”

রোহানের কন্ঠে পরাজয়ের কথা শুনতেই দপদপ করে জ্বলে উঠলো আয়মানের মস্তিষ্ক, রাগে ক্ষোভে হাতের পাঁচ আঙুল মুস্টিবদ্ধ করে পান্স পারলো কংক্রিটের শক্ত দেয়ালে,ক্রোধিত কন্ঠে ক্ষোভ ঝেড়ে বললো,

“অসম্ভব। আমি হার মানবো না।কিছুতেই না।দরকার পড়লে অতীতের পুনরাবৃত্তি ঘটাবো নতুন করে।”

আয়মানের কন্ঠ থেকে ধেয়ে আসা শেষ বাক্যে রহিস্যের গন্ধ পেলো রোহান,সে সংশয়ি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“কি করতে চাইছিস তুই?”

বক্র হাসিতে মত্ত হলো আয়মান,ধিরে ধিরে এগিয়ে গেলো বা দিকের টেবিলের কাছে,সন্তপর্ণে একটা ছুড়ি তুলে নিয়ে এগিয়ে এলো রোহানের কাছে।আয়মানের এমন তীক্ষ্ণ তির্যক বাঁকা চাহনির দিকে তাকিয়ে সামান্য ভড়কালো রোহান, তবে ভয় পেলো না।

আয়মান শ্লেষ হাসলো,কাঁধে হাত রাখলো রোহানের তারপর অকস্মাৎ রোহানের গলায় ছুড়ি চালিয়ে দিয়ে আওড়াল,

“কিডন্যাপ।নিস্পাকে কিডন্যাপ করবো আমি।”

ছুরির তীক্ষ্ণ আঘাতে চিরচির করে কেঁটে গেলো রোহানের গলার চামড়া। রক্তধারার উষ্ণ স্রোত ছিটকে বেড়িয়ে রঞ্জিত হলো আয়মানের মুখ,অথচ তার হিংস্র অভিব্যক্তিতে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না নাতো ছুরির ধারাল অংশ সেখানেই থামলো, বরং একটু চাপ বাড়তেই ধাতব ফলাটি ডেবে গেলো গভীরতরভাবে,সোজা গিয়ে বিধলো রোহানের কণ্ঠনালীতে।

ঘটনার আকস্মিকতায় চোখ বড়বড় করে তাকালো রোহান,কাঁপা দুই হাতে গলার কাঁটা অংশে চেপে ধরে অবিশ্বাস্য চাহনিতে তাকালো বন্ধু বনাম বিশ্বাসঘাতকের দিকে,কন্ঠনালী থেকে নির্গত হওয়া গোঙানির শব্দ থেমে গিয়ে গলার ভেতর থেকে উঠে এলো কর্কশ গড়গড়ানি,মৃত্যুযন্ত্রনায় হাসফাস করতে করতে অস্পষ্ট আওড়াল,

“দোস্ত!”

আয়মান হাসলো বিদঘুটে ভঙিতে,রক্তহিম করা কন্ঠে বললো,

“সরি দোস্ত।আমার কাজের কোন প্রকার সাক্ষী থাকুক আমি একদমই চাই না।হোক সে পিপড়ে নয়তো মানুষ।”

চলবে,,,,,,

⭕রিচেক করার সময় পাইনি ভুলত্রুটি মার্জমা করবেন।⭕

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here