হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পর্বঃ60

0
33

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্বঃ60

তাকরিমের মা জেসমিন বেগম এয়ারপোর্ট থেকে মাত্রই ফিরলো।তখন ত্রিজয় আর তাকরিমের মারামারি দেখে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে খিল এঁটেছিল নিস্পা।দুজনে যেভাবে তার দুটো হাত নিয়ে টানাটানি শুরু করেছিলো,তার হাত যে শরীর থেকে ছিড়ে আলাদা হয়ে যায় নি এটাই ঢের সৌভাগ্য।

তাই দুজনের কবল থেকে কোনরকমে নিজের দুহাত বাঁচিয়ে নিয়ে নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে বসেছে নিস্পা।ত্রিজয়ও চুপ হয়ে চলে গেছে নিজের কাজে।তাকরিমের আর কি করার। ভেবেছিলো নিস্পাকে সাথে নিয়ে এয়ারপোর্টে যাবে সে আশায় এক বালতি জল ঢেলে নিজে একাই চলে গিয়েছিলো জেসমিন বেগম কে আনতে।

জেসমিন ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়াতেই এক প্রকার পাখির মতো ছুটে এসে তাকে জাপ্টে ধরলো প্রভা,আদুরে কন্ঠে বললো,

“কেমন আছো জেঠিমা?”

জেসমিন প্রসন্ন হাসলো, প্রভার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,

“এইতো আছি ভালো। তুই কেমন আছিস মা?”

প্রভা মুখ তুলে তাকালো জেসমিনের দিকে,প্রত্যুত্তর করলো নরম স্বরে,

“যেমন দেখে গিয়েছ তেমনই।শুধু তোমাকে খুব মিস করছিলাম।”

জেসমিন মুচকি হেসে গাল টেনে দিলো প্রভার আহ্লাদী কন্ঠে বললো,

“এইতো এসে গেছি।আর মিস করতে হবে না।”

কথার মাঝেই খেয়াল করলো সিড়ির কাছে চিবুক নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিস্পা।অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটাকে একবার দেখতেই মুগ্ধ নয়ন সেখানেই আঁটকে গেলো জেসমিনের।তারপর ভ্রুকুটি তুলে ডাকলো তাকরিমকে,

“তাকরিম?”

তাকরিম ঠোঁট কামড়ে মুচকি হাসলো, মাথা চুলকে নাজুক স্বরে বললো,

“হ্যাঁ আম্মা।”

জেসমিন প্রভাকে পাশ কাটিয়ে ধিরে ধিরে এগিয়ে গেলো নিস্পার দিকে,নিস্পা অস্বস্তিতে উসখুস করছে দাঁড়িয়ে, জেসমিন কাছে আসায় উসখুসে ভাবটা আরেকটু বাড়লো মনে হয়।নাজুক দৃষ্টি তুলে একনজর তাকালো জেসমিন বেগমের দিকে।মহিলা নিঃসন্দেহে সুন্দরী,চোখ গুলো অদ্ভুত সুন্দর এক মূহুর্তের জন্য খুব পরিচিত মনে হলো নিস্পার,তবে খুব একটা ঠাওর করে উঠতে পারলো না সে।

জেসমিন বেগম নিজের মমতায় জড়ানো কোমল হাতটা নিয়ে রাখলো নিস্পার গালের পেলব ত্বকে, বিমুগ্ধ কন্ঠে বললো,

“মাশাল্লাহ!ভারী মিষ্টি দেখতে তো তুমি।আমার ছেলের পছন্দ আছে বলতে হবে।”

কথার পৃষ্ঠে কোন উত্তর খুঁজে পেলো না নিস্পা,দ্রুত চিবুক নামালো অগ্রভাগে।অথচ সবাইকে অবাক করে দিয়ে ভেসে এলো ত্রিজয়ের কন্ঠ থেকে ছুড়ির মতো ধারালো উত্তর,

“আপনার ছেলের পছন্দ থাকলেই কি লাভ খালা?বউ তো আমারই।”

জেসমিনের কপাল কুচকে এল,ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকালো বা পাশে,ত্রিজয় এসে পায়ের উপর পা তুলে বসলো সোফায়,তারপর ঝুকে গিয়ে টেবিলের উপর থেকে তুলে নিলো খবরের কাগজ,এমন ভাব করলো যেন আপাতত ওই উল্টো ধরে রাখা খবরের কাগজটা পড়াতেই সমস্ত মনযোগ নিবদ্ধ তার।

জেসমিন বেগম বিরক্তিমাখা দৃষ্টিতে তাকালো ত্রিজয়ের দিকে,কিঞ্চিৎ মেজাজি কন্ঠে বললো,

“এই ছেলেটা কে তাকরিম?এই বাড়িতে বাইরের মানুষ কি করছে?”

তাকরিম দাঁতে দাঁত পিষলো,চোয়াল শক্ত করে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকালো ত্রিজয়ের দিকে,ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে চাইলো,

“আসলে আম্মা,,,”

তাকরিমের কথা শেষ হওয়ার আগেই মুখের উপর থেকে খবরের কাগজ টা সরালো ত্রিজয়,ধূর্ত কন্ঠে বললো,

“আরেহ!আপনি কি নিউজ টিউজ দেখেন না?”

প্রশ্নটা করে জেসমিনের উত্তরের অপেক্ষা করলো না ত্রিজয়,কন্ঠে একই রকম ধূর্ততা বজায় রেখে বললো,

“একজন এমপির মা হয়ে নিউজ দেখেন না এটা ভিষণ লজ্জার বিষয়।হটাৎ করে কোনদিন আপনার ছেলের পদত্যাগের ঘোষণা হলেও তো জানতে পারবেন না।যাক ভালোই হলো স্ট্রক করে মৃত্যুর সম্ভাবনা নেই আপনার।”

তাকরিম রাগে ফেটে যাচ্ছে ভেতর ভেতর,অথচ নিজের মায়ের সামনে তেমন কিছু বলতে চাইলো না।এদিকে জেসমিন তো তাজ্জব,ত্রিজয়ের মুখ থেকে বেড়িয়ে আসা মিসাইলের মতো কথা গুলো সোজা তব্দা খাইয়ে দিয়েছে তাকে।

ত্রিজয় উঠে দাড়ালো,একটু আগে যেভাবে খবরের কাগজ টা হাতে নিয়ে ছিলো সেভাবেই রাখলো টেবিলের উপর। তারপর ঠাট্টামিশ্রিত কন্ঠে বললো,

“আপনি নিশ্চয়ই জি বাংলা, স্টার জলসা দেখেন তাই না?”

ত্রিজয়ের এবারকার প্রশ্নে বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে পৌছালো জেসমিন।চোখ গরম করে কিছু একটা বলতেই যাবে তার আগেই ত্রিজয়ে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলো নিস্পার দিকে।সতর্স্ফূত কন্ঠে বললো,

“দেখেছো কলিজা?তোমাকে বিয়ে করে আমি জোর বাঁচা বাঁচিয়ে দিলাম।এই খালাম্মা ভুল করেও যদি তোমার শাশুড়ী হয়ে যেত জি-বাংলার দজ্জাল শাশুড়ীদের মতো কূটনামি করে বেড়াতো তোমার সাথে।”

নিস্পা রাগে তিক্ত বিরক্ত হয়ে কটমট করে তাকালো ত্রিজয়ের দিকে,চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,

“মুখটা দু সেকেন্ডের জন্যেও মিউট রাখতে ইচ্ছে করে না তাইনা?”

“আমি মিউট থাকলে তোমাকে সঠিক পথ দেখাবে কে মিস চাটনি?”

এতোক্ষণ ধরে অনেক সহ্য করেছেন জেসমিন।কিন্তু এখন আর নেওয়া যাচ্ছে না।ত্রিজয়ের বেহ্লাপনা মাথা খারাপ করে দিচ্ছে তার।তারউপর তাকরিমের এমন চুপ থাকাটা মোটেও সহ্য হলো না,তিনি ভিষণ চটে গিয়ে ক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো,

“তাকরিম!এই বেয়াদব ছেলেটা কে?”

তাকরিম জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকালো ত্রিজয়ের দিকে, ইচ্ছে করছে দুটো ঘুষি মেরে দাঁত ভেঙে দিতে।যদিও জীবনে কোন এক দিন এই ইচ্ছে পূরণ করেই ছাড়বে তাকরিম,তবে এখন নিজের মায়ের সামনে জল ঘোলা করার প্রয়োজন মনে করলো না তাকরিম।মাকে শান্ত করার জন্য বললো,

“আম্মা আমি তোমাকে পরে বুঝিয়ে বলবো।এখন ঘরে চল।”

“তুই আমাকে বলবি কিনা সেটা বল।”

“আমি বলছি জেঠিমা।”

কথাটা বলেই এগিয়ে এলো প্রভা।তাকরিমের গরম দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে মিনমিনে কন্ঠে বললো,

“উনি আসলে নিস্পার হাসবেন্ড।”

প্রভার মুখে এমন কথা শুনে চোখ ছোট ছোট করে নিলো জেসমিন।কড়া কন্ঠে বললো,

“প্রভা এসব কি বলছে তাকরিম?তুই শেষে কিনা বিবাহিত মেয়েকে?”

ঘৃনায় কথাটুকু শেষ করতে পারলো না জেসমিন।তার আগেই নইজের বিগড়ে যাওয়া ছেলের পাগলামোর কথা চিন্তা করতেই গলা ধরে এলো তার।
অথচ তাকরিমের রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠলো,ভেতরের ক্রোধ ভেতরে চেপে রেখে চাপা গম্ভীর গলায় বলল,

“আমি ওর বিয়ের আরও এক জন্ম আগে থেকে ওকে ভালোবাসি আম্মা।তুমি প্লিজ আমার ব্যাপারে একদম নাক গলাবে না।নিজের ঘরে গিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকো।”

তাকরিমের কন্ঠে এমন ঝাঝালো কথা শুনে মুষড়ে এলো জেসমিনের মমতাময়ী হৃদয়টা,বেদনা মিশ্রিত কন্ঠে বললো,

“তুই বাইরের একটা ছেলের সামনে আমাকে অপমান করছিস তাকরিম?”

“এটা ইনসাল্ট নয় আম্মা এটা ওয়ার্নিং।”

“একটা মেয়ের জন্য তুই নিজের মাকে,,,

” ও একটা মেয়ে নয় আম্মা ও আমার বেঁচে থাকার ওনলি ওয়ান রিজন।”

তাকরিমের এমন কড়া কড়া কন্ঠের বিপরীতে আর কোন কথা খুঁজে পেলো না জেসমিন।মাথা নিচু করে শিরদাঁড়া শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকা প্রভার দিকে তাকিয়ে বিমূর্ষ কন্ঠে বললো,

“প্রভা মা আমাকে একটু ঘরে দিয়ে আয় তো।”

ঝড়ো হাওয়ায় প্রখর আলো নিভে গিয়ে যেমন সবকিছু আঁধারে নিমজ্জিত হয়ে থাকে,ঠিক তেমনি অন্ধকারে তলিয়ে ছিলো প্রভা।তাকরিমের ধারালো কথাগুলো হুড়মুড়ে কালো মেঘে আকাশের সমস্ত শুভ্রতা মুছে যাওয়ার মতোই ছিনিয়ে নিলো তার সবকিছু।বুক কাঁপছে,কাঁপছে গলার স্বর।নিস্পার প্রতি তাকরিমের এই ভালোবাসা নিবেদন তাকে নিঃশেষ করে দিয়েছে ভেতর থেকে।দলার মতো ফুসে উঠা বেদনার জোয়ার ছিড়েখুঁড়ে দিচ্ছে ভেতরটা, এখানে আর দাঁড়ানো সম্ভব না তার পক্ষে।শশ্যব্যাস্তের ন্যায় সে এগিয়ে এলো জেসমিনের দিকে,ধরা গলায় অস্ফুটে বললো,

“হ্যাঁ জেঠিমা আসুন।”

আর এক মূহুর্ত দাড়ালো না জেসমিন।ছেলের এমন ব্যাবহারে অসন্তুষ্ট হয়ে পা বাড়ালো প্রভার সাথে।
সিড়ি ধরে সোজা উপরে উঠে গেলো কোন টু শব্দ না করেই।

জেসমিন চলে যেতেই এগিয়ে এলো নিস্পা,তাকরিমের দিকে তাকিয়ে নিখাঁদ কন্ঠে বললো,

“আপনি নিজের মায়ের সাথে এমনটা কেন করলেন?”

তাকরিমের চোয়ালে চাপ ধরা,কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না তার,তারপরও ছোট্ট করে বললো,

“জানিনা।”

“তাই বলে একটা বাইরের মেয়ের জন্য নিজের মায়ের সাথে এমন করবেন?”

নিস্পার দ্বিতীয় বারের প্রশ্নে ক্ষুব্ধ হলো তাকরিম,রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সএই রাগ ঝাড়লো নিস্পার উপর,অকস্মাৎ নিস্পার গলা চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বললো,

“আমার কাছে একদম কৈফিয়ত চাইবে না বলে দিলাম।আমার দূর্বলতা হয়ে সাহস বেড়েছে তোমার।”

ত্রিজয় চোখ মুখ শক্ত করে এগিয়ে এলো তাদের মাঝে,দৃঢ় হাতে নিস্পার গলা থেকে সরিয়ে নিলো তাকরিমের হাত,তপ্ত কন্ঠে বললো,

“উহু এমপি মশাই। কথাটা একটু মিস্টেক হয়েছে,আপনার দূর্বলতা নয় বরং আমার বউ হিসেবে সাহস টা পারফেক্ট বেড়েছে।”

তাকরিম হাত ঝাড়া দিয়ে নিজের হাতের উপর থেকে ত্রিজয়ের হাত সরালো,অগ্নি কন্ঠে বললো,

“শালা সান অফ বিচ।”

ত্রিজয় বক্র হেসে ক্রুর কন্ঠে বললো,

“আমি তার চেয়ে বড় হারামি এমপি মশাই।”

_____

সন্ধ্যার রঙে ভিজে আছে চারপাশ।সময় ছয়টা হবে,শহরের আকাশে তখন লালচে-নীল আভা, উঁচু বিল্ডিংয়ের ফাঁক গলে হুটোপুটি খাচ্ছে সূর্যের শেষ রশ্মি।চিত্রা নিজের কিচেনে।নিজের অসুস্থ মায়ের জন্য খাবার তৈরি করছে ব্যাস্ত হাতে।
ঠিক তখনই ভেসে এলো কলিং বেলের শব্দ।চিত্রা হাতের কাজ ফেলে রেখে দ্রুত এগিয়ে এলো দরজার দিকে।তড়িঘড়ি করে দরজা খুলতেই ভ্যাবাচেকা খেলো একপ্রকার।

দরজার সামনে ইভান দাঁড়িয়ে আছে।পড়নে একটা কালো জিন্স আর একটা সাদা শার্ট।ফরমাল লুকে দাঁড়িয়ে থাকলেও লোকটাকে বেশ এলোমেলো লাগছে।কিন্তু লোকটা এখানে কি করছে?চিত্রা ভুল দেখছে না তো?আজ কাল লোকটাকে কল্পনাও করতে শুরু করেছে নাকি চিত্রা।

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে এক ধ্যানে ইভানের দিকে তাকিয়ে রইলো চিত্রা।মেনে নিলো চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইভান শুধুই তার কল্পনা।

চিত্রাকে কিছু বলতে না দেখে বেশ অবাক হলো ইভান,চিত্রার ধ্যানমগ্ন চোখের সামনে হাত নাড়িয়ে ডাকলো,

“হ্যালো মিস চিত্রা!আপনি পৃথিবীতে আছেন?”

চিত্রা আরেকদফা ভ্যাবাচেকা খেলো এবার,নড়েচড়ে উঠে দু হাতে চোখ কচলে ভালো করে তাকালো সামনে।নাহ!লোকটাকে এখনো দেখতে পাচ্ছে, স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে তার কন্ঠ, তার মানে ইভান সত্যিই এসেছে।ব্যাপার টা ধরে ফেলতেই ইভানের মুখের দিকে হতভম্ব হয়ে তাকালো চিত্রা, বিহ্বলিত কন্ঠে বললো,

“আপনি এখন?আমার কাছে এসেছেন নাকি ভুল করে মিস্টেক হয়ে গিয়েছে?”

ইভান ঠোঁট এলিয়ে মুচকি হেসে বললো,

“কোন ভুল হয়নি।একটা গুরুত্বপূর্ণ দরকারে এসেছি আমি।”

চিত্রা আরেকটু অবাক হলো, বিস্মিত কন্ঠে বললো,

“আমার কাছে আপনার দরকার?”

“কেন দরকার থাকতে পারে না নাকি?”

“নাহ! তেমন কিছু না।আসলে সেদিন যেভাবে রাস্তায় ফেলে রেখে গিয়েছিলেন ভেবে নিয়েছিলাম আমি তেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারি নি।”

“কিন্তু এখন তুমি আমার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।”

বিস্ময়ের উপর বিস্মিত হয়ে চোখ উল্টে এলো চিত্রার, ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে বললো,

“আপনি কি ডেট ওভার কিছু খেয়ে এসেছেন?”

ইভান মুখটা চুপসে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,

“আমি ভদ্র ছেলে আজেবাজে জিনিস খাই না।”

“তাহলে আজাবাজে কথা বলছেন কেন?”

“আমি আজেবাজে কথা বলছি না।সত্যিই এই মূহুর্তে তুমি আমার জন্য খুব ইমপরটেন্ট।”

“আমার বিশ্বাস হচ্ছে না আপনার কথা।”

“আমি তোমাকে একটা কথা বলার জন্য তোমার কাছে এসেছি।আই হোপ তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিবেন না।”

চিত্রার বুক ধ্বক করে উঠলো এবারে।ইভানের মুখের দিকে তাকিয়ে বিশাল উচ্ছ্বাসে ছেয়ে গেলো মন।প্রেমিকের সামনে দাড়ালে প্রেমিকার মনে যেভাবে সেঁতারা বেজে উঠে ঠিক তেমন করেই একটা সুর তৈরি হলো চিত্রার বুকের গভীরে।তার দুচোখে ফুটে উঠলো তৃপ্তির রেখা,লাজুক ঠোঁট নাড়িয়ে অস্ফুটে বললো,

“বলুন না।কি বলতে চান।”

ইভান চাইলো না বোধহয় তার দিকে,ইনিয়েবিনিয়ে বললো,

“আসলে আমি ঠিক কিভাবে বলবো বুঝতে পারছি না।প্লিজ তুমি আমার রিকুয়েষ্ট টা রেখো প্লিজ।”

ভেতর ভেতর ভালোলাগায় ফেঁপে উঠলো চিত্রা, অস্ফুটে বললো,

“হু।আগে বলুন না কি বলবেন।”

ইভান বুক ফুলিয়ে শ্বাস টেনে আচমকা বললো,

“তুমি একটু অনুর বান্ধবী সেজে ডক্টর কিয়ানের বাড়িতে যেতে পারবে?ওকে দেখার তৃষ্ণায় আমার ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে।”

চকিতে মাথা তুললো চিত্রা,ভ্রু কুচকে বললো,

“আপনি এটাই বলতে চেয়েছিলেন?”

ইভান জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো কন্ঠ চেপে বললো,

“হ্যাঁ।তুমি যে এমপি মশাই এর পিএ সেটাতো ডক্টর কিয়ান যানে না তাই না?”

চিত্রা থমকায়,একপল বিভ্রান্ত চোখে তাকায় ইভানের মুখের দিকে।পুনরায় কোন কথা কণ্ঠনালী থেকে বের করার পথ পেলো না।

ইভান অধৈর্য বেশ,

“কি হলো কিছু বলছো না যে?আমার কথাটা রাখবে না?”

চিত্রার বুকের ভেতর দুম করে লাগলো কিছু একটা। উদ্বেগ আর চিন্তায় মুখের রক্ত সড়ে গেলো,কন্ঠ জড়িয়ে জড়িয়ে ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠে জিজ্ঞেস করতে চাইলো,

“আপনি অনুকে,,,

ইভান হেসে ফেললো, হাত দিয়ে মাথা চুলকে বললো,

” ভালোবাসি।অনুকে খুব বেশি ভালোবাসি।”

এমন ভয়ংকর কথাটা শ্রবণ হতেই নিঃশ্বাস ফুরিয়ে এলো চিত্রার,পৃথিবীতা দুলে উঠলো তার।মাথার উপর খন্ড খন্ড হয়ে ভাঙলো বিশাল আকাশ।ভাগ্যের এই নির্মম সত্যটা ভূমিকম্পের মতো কাঁপিয়ে তুললো তার হৃদপিন্ডটা।
________

সন্ধ্যার শেষ লগ্ন।এক ঘর থেকে অন্য ঘর পাইচারি করছিলো অনু।ঘুরে ঘুরে দেখছিলো পুরো বাড়িটা।এতো বড় বাড়িতে একা একা করার মতো এর চেয়ে ভালো কাজ আর খুঁজে পেলো না সে।

হাঁটতে হাঁটতে হুট করেই নজর গেলো একটা ঘরের দিকে,দরজাটা হাল্কা করে চাপানো,ভেতরে আলো জ্বলছে,তার মানে নিশ্চয়ই কেউ আছে ভেতরে।কিন্তু এ বাড়িতে ওই খাচ্চোর ডক্টর আর সে ছাড়া আর কেউ থাকে বলে তো শুনে নি সে,পুরো বাড়িতে যাও একটা মেড ছিলো সে আসার পর তাকেও বের করে দিয়েছে কিয়ান।তাহলে এই ঘরে কে থাকতে পারে?ব্যাটা মজা মাস্তি করার জন্য কোন মেয়ে টেয়ে নিয়ে আসে নি তো?ভাবতেই শরীর জ্বলে উঠলো অনুর।পরপরই নিজেকে নিজে বললো ওনার বাড়ি উনি মেয়ে আনতেই পারে,তাতে তোর এতো কীসের জ্বালা রে ছেমরি।

মনে মনে কথাগুলো আওড়িয়ে ঘরের ভেতর উঁকি দিলো অনু।দেখতে পেলো কিয়ানের ফর্সা উন্মুক্ত পিঠ।সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু বেঁকে এলো অনুর,বুকের ভেতর তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়লো সে।তার মানে বেটা সত্যি সত্যি এখানে মেয়ে নিয়ে এখানে রোমান্স করছে?মানে আর যাই হোক সে তো তার বউ,ঘরে বউ রেখে মেয়ে ধরে নিয়ে আসতে একটুও লজ্জা করলো না লোকটার?এই চরিত্র নিয়ে আবার নিস্পাকেও ভালো বাসে,
“শালা তোর এটা মন নাকি লুডুঘর?”

কথাটা বিরবির করে সরে আসতে চাইলো অনু।কিন্তু অজানা একটা আকর্ষণ উপলব্ধি করে কেন যানি সরে আসতে পারলো না।বরং মেয়েটার চেহারাটা দেখার জন্য কৌতুহলি দু চোখ ঝাপটালো কয়েকবার,তারপর পা টিপে টিপে এগেলো একটু ভেতরের দিকে,উদ্দেশ্য মেয়েটার চেহারা একবার দেখেই বেড়িয়ে যাবে।

কিন্তু ভেতরে ঢুকে অনুর চক্ষু কপালে,ঘরে কোন মেয়ে নয়,বরং বিছানায় শুয়ে আছে জীর্ণশীর্ণ রোগা একজন থুলথুলে বুড়ি।বুড়ির দিকে তাকিয়ে চোখ ছোট করে নিলো অনু,পাশে কিয়ানকে এমন ঝুঁকে বসে থাকতে দেখে হতভম্ব হয়ে বললো,

“উনি কে?”

তড়াগ করে পিছু ফিরলো কিয়ান।অনুর বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেও থতমত খেলো কিছুটা।পরপরই মুখাবয়বে টানলো চিরচেনা গম্ভীরতা, কন্ঠে হম্ভিতম্বি দেখিয়ে বললো,

“তুমি এখানে কেন এলে?নিজের ঘর থেকে বেড়োতে বারন করেছিলাম আমি।”

অনু কিয়ানের কথার উত্তর দিলো না,তীক্ষ্ণ চাহনিতে তাকালো মালেকার দিকে,চটপটে পায়ে দু কদম এগিয়ে এসে টসটসে কন্ঠে বললো,

“এই বৃদ্ধা কে?আপনার কি হয় উনি?এতোদিন বাড়িতে আছি অথচ উনার কথা বলেন নি কেন আমায়?”

কিয়ান শক্ত অভিব্যাক্তিতে চিড় ধরার সুযোগ নেই,বরং অনুর প্রশ্নে ক্ষোভ প্রকাশ করলো ভিষণ, ঝাঝালো কন্ঠে মেপে মেপে বললো,

“তোমাকে কেন বলবো?”

“কারণ আমি এই বাড়িতে থাকি।আপনার আমাকে বলা উচিত ছিলো।”

“সো হোয়াট?উচিত অনুচিত আমাকে শেখাতে এসো না খারাপ হয়ে যাবে।”

“সত্যি করে বলুন তো এই বৃদ্ধা কি হয় আপনার?”

“আমি কারো কাছে জবাবদিহি করি না, তোমার কাছে তো নয়ই।”

অনু চোখ পাকিয়ে কিছু একটা চিন্তা করলো,তারপর চট করেই তুলে নিলো বেডসাইড টেবিলের উপর রাখা মেডিসিন বক্স। সেখানে একটা কেঁচি দেখতে পেয়েই হাতে নিয়েছিলো সেটা,তারপর কেঁচির চৌকল মাথাটা বৃদ্ধার দিকে তাক করে কিয়ানকে ভয় দেখাতে বললো,

“সত্যি করে বলুন নয়তো এই বৃদ্ধাকে মেরে ফেলবো আমি।”

“তো?মেরে ফেলো না।একে মারার জন্যই বাঁচিয়ে রেখেছি।”

কিয়ানের তরল কণ্ঠ থেকে ধেঁয়ে আসা শব্দগুলো শ্রবণ হতেই স্তব্ধ হয়ে গেলো অনু,হাতটা আলগা করে অস্পষ্ট আওড়াল,

“আপনি? ”

“আমি কি সেটা তোমার মতো থার্ডক্লাস মেয়ে বুঝবে না।”

কথাটা বলতে বলতেই কিয়ান হাত বাড়ালো পাশের দেয়ালে,সফেদ দেয়ালে একটা তেলাপোকা দৌড়ে যেতে দেখেই হাত বাড়িয়েছে সে।অনু নাক কুচকে তাকালো সেদিকে।কিয়ানের এমন অদ্ভুত কাজে বোমি চলে আসার উপক্রম তার।

কিয়ান কায়দা করে হাত দিয়েই ধরে ফেললো তেলাপোকা টা,তারপর আচমকা অনুকে অবাক করে দিয়ে পোকাটা ছেড়ে দিলো অনুর কাঁধের উপর।অনু ভয়ে লাফিয়ে উঠলো, গলা ফাটিয়ে চেচালো,

“আয়ায়ায়ায়া,,,,

নিজের শরীরে থাপড়া থাপড়ি করে তেলাপোকা টা ফেলতে চাইলো বটে, কিন্তু নির্দয় তেলাপোকা নির্মম ভাবে ঢুকে গেলো তার জামার ভিতর।

তেলাপোকার ভয়ে উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম সব ভুলেছে মেয়েটা।ছাগল ছানার মতো লাফাতে লাফাতে জামা টেনে খুলতে খুলতে পুনরায় চেচালো,

” থার্ড ক্লাসের বাচ্চা খোদা তোকে ভস্ম করুক।”

কিয়ানের শিরদাড়া শক্ত হয়ে এলো ততক্ষণে।অনুর ইনার পরা উন্মুক্ত শরীর চোখের সামনে দেখেই শুখনো ঢোক গিললো।শ্বাস আঁটকে গেলো বুকে।গম্ভীর অথচ তরল কন্ঠে আওড়াল,

“অসময়ে ড্রেস খুলে চোখ দুটো ভস্মই করে দিয়েছ মিসেস।”

_______

জেসমিন ফেরার কয়েক ঘন্টা পরেই তাকরিমের কিছু লোক গিয়ে ফুলমতিকে বাড়িতে নিয়ে এসেছে।
ফুলমতি এসেছ পর্যন্ত নিস্পা ঘর ছাড়ে নি তার।পৃথিবীতে সব অচেনা মানুষের ভিরে ফুলমতি একটুকরো সত্য,সে নিস্পার আপনজন।খুব আপনজন।যাকে চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়।যার কাছে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিতেও আশ্চর্য রকম শান্তি পাওয়া যায়।

“এতোদিন একা থাকতে অসুবিধা হয় নি তো দাদি?”

ফুলমতির কুচকানো চামড়ার হাতটা নিজের দুহাতের মুঠোয় ধরে রেখে শুধালো নিস্পা।বিনিময়ে এক গাল হাসলো ফুলমতি,বললো,

“না রে বইন।কোন অসুবিধা হয় নাই।”

নিস্পা ফুলমতির হাতটা একইভাবে চেপে ধরে একটু এগিয়ে এসে বসলো,স্নায়ুচাপা কন্ঠে বললো,

“তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো দাদি?”

“হ্যাঁ কর না।”

“তুমি তো ওই দিন বেঁচে ছিলে।তাহলে তুমি নিশ্চয়ই তার পরের ঘটনা যানো।তুমি কি যানো আমার লাশটা কলপাড় থেকে আইরিশ ভাই আর প্রিন্স জোসেফের মাঝখানে কিভাবে গেল?”

সন্ধিগ্ন কন্ঠে নিস্পার করা এমন কঠিন প্রশ্নে ভ্রু গোটালো ফুলমতি।নিস্পার প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“হটাৎ এই প্রশ্ন কেন করলি বইন?”

“দরকার আছে দাদি।সেদিন মৃত্যু খেলার পরেও হয়তো খেলা থামে নি,আরও নতুন খেলা শুরু হয়েছিলো।”

“কিজানি রে বইন।আমার ঘুম ভাঙার পর তোরে আমি দুইজনের মাঝখানেই দেখতে পাইছি,তুই কলপাড়ে ছিলি সেটা তো এহন তোর মুখে শুনলাম।”

ফুলমতির কাছ থেকে আশানুরূপ উত্তর না পেয়ে হতাশায় ছেয়ে গেলো নিস্পার মুখাবয়ব, চিন্তিত কন্ঠে বললো,

“তুমি তাহলে কিছু যানো না?”

ফুলমতি কিছু বলার আগেই নিস্পা বিছানা ছেড়ে উয়হে দাঁড়িয়ে বললো,

“আচ্ছা ঘুমাও তাহলে, আমি আসছি।”

“হুন বইন,, ”

নিস্পা চলে যেতে নিলেই ডেকে বসলো ফুলমতি,বিচলিত কন্ঠে বললো,

“হ্যাঁ দাদি বলো।”

ফুলমতি কাঁপা স্বরে প্রত্যুত্তর করলো তৎক্ষনাৎ,

“তহন তোগো দাপন কাপনের সময় তোগোরে আলাদা করা যায় নাই।হুজুর অনেক চেষ্টা কইরাও তোগো হাত ছুডাইতে পারে নাই।বাধ্য হইয়া তোগোরে এক লগে কবর দেওয়া হইছিলো।আর তহন হুজুর কইছিলো তোগো লাশের সাথে নাকি কেউ কালোযাদু করছে।”

“কালো যাদু!”

উৎকন্ঠিত স্বরে শব্দটা উচ্চারণ করতে গিয়ে গলা শুখিয়ে এলো নিস্পার।ফুলমতি টলমল কন্ঠে আবার বললো,

“হ রে বইন, এই কথাডা হুজুর কইছিলো।”

নিস্পা চিন্তায় পড়ে গেলো,তার ফর্সা কপালে সে ছাপ ফুটে উঠলো স্পষ্ট। স্নায়ু টানটান হয়ে গেলো তার,চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেদিনকের সেই নির্মম ভয়াবহ চিত্র।ভয়ার্ত স্বরে দিশেহারা হয়ে বিরবির করে আওড়াল ,

“তাহলে কি যে খাবারে বিষ মিশিয়েছিলো সেই কালোযাদু করেছিলো?আর কালো যাদু করলেও কেন করা হয়েছিলো?কি লাভ হয়েছিলো এই যাদু তে?তার মানে তো দাঁড়ায় প্রিন্স জোসেফ কাজটা করে নি।”

________

আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে একটা কালো অবয়য়।দূরে কোথাও নয়,বরং তাকরিমের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে অদ্ভুত ভঙিতে।হাতে ধরে রাখা আছে মোবাইল,বৃদ্ধাঙুল ডায়াললিস্টে স্ক্রল করতে করতে হটাৎ থামলো,আননোন একটা নাম্বারে ক্লিক করে কানে ধরলো সে।অপরপ্রান্ত থেকে রিসিভ করলো না কেউ।প্রায় বেশ কিছুক্ষণ একই ভাবে ট্রাই করার পর রিসিভ হলো ফোন,ওপাশ থেকে ভেসে এলো মেয়েলি কর্কষ স্বর,

“তোমাকে বলেছিনা যখন তখন ফোন করবে না?তারপরও কেন ফোন করছো এতোবার?”

লোকটা কোন রুপ প্রতিক্রিয়া দেখালো না,উল্টো তাচ্ছিল্য কন্ঠে বললো,

“আমি আপনার কথা শুনে চলবো নাকি?কোথাকার কে আপনি?”

“এই একদম ভদ্রভাবে কথা বল।নয়তো,,,

“নয়তো কি?কিছু করতে পারবেন না আপনি আমার।আপনার সব অপকর্মের কথা নয়তো লিক হয়ে যাবে নয়তো, একটু তো ভয় করুন।”

মহিলা থতমত খেলো বোধহয়, প্রসঙ্গ এড়িয়ে বললো,

“আসল কথায় আসো,কেন ফোন করেছ সেটা বল।”

অজ্ঞাত লোকটা গলা ঝেড়ে রহস্যময় কন্ঠে বললো,

“এডভোকেট সাহেব কিন্তু এখন এমপির বাড়িতেই।বুঝতে পারছেন?এমপিকে রাস্তা থেকে সরানোর মোক্ষম সুযোগ এটা।এমপিকে মারার দায়ে এডভোকেট ফেসে যাবে।জল ঘোলা হওয়ার আগেই কেচ্ছা খতম।আমি আপনি দুজনের একজনের নামও আসবে না।”

“কথাটা কিন্তু মন্দ বলো নি।”

“আমি মন্দ বলতে পারি বলুন?আপনি শুধু কাজটা করুন,কেস মামলার ব্যাপার আমি বুঝে নিবো।আপনি তো জানেনই ও ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা আছে ভালো।”

মহিলা কিছু বলার আগে লোকটা আবার বললো,

“আর হ্যাঁ যা করবেন সাবধানে।এডভোকেট কিন্তু ছয়টাকে টপকে দিয়েছে।”

মহিলা সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“তুমি কি করে যানলে?”

বিনিময়ে শ্লেষ হাসলো লোকটা,কুটিল কন্ঠে বললো,

“আমি ছাড়া আর কারো জানার ওয়ে আছে নাকি?”

“এখন কি করবে ভাবছো?”

“কি আর করবো,শিকারির শিকার কেড়ে নেবো।”

“মানে?”

“মানে আর কি?সাত নাম্বার খুনটা এবার আমার হাতে হতে চলেছে।শিকারি যখন তার সপ্তম শিকার খুঁজে পাবে না তখন কেমন লাগবে বলতো।”

লোকটার কথা প্রসন্ন হলো মহিলা,প্রফুল্ল কন্ঠে বললো,

“ইউ আর জিনিয়াস।”

লোকটা ফোন কেঁটে দিলো তক্ষুনি,ব্যাস্ত হাতে খুলে ফেললো মোবাইলের সিম কার্ড টা।তারপর ছোট্ট সিম টা মুখে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বিরবির করে আওড়াল,

“আই নো।”

_______

বাড়ির বাইরে বকুল গাছের বাগান টা থেকে উড়ছে সিগারেটের ধূসর ধোঁয়া।একটা বকুল গাছের নিচে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে একের পর এক সিগারেট টানছে ত্রিজয়।বাগানটা নিস্পার ঘরের সোজাসুজি, বিছানায় বসে সরাসরি তাকালেও খোলা বেলকনি থেকে বাগানটা স্পষ্ট দেখা যায়,সেই সুবাধে নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিছুক্ষণ পরপর নিস্পার আনমনা নয়ন ত্রিজয়ের উপর নিবদ্ধ হচ্ছে।

ত্রিজয়ের সেসবে খেয়াল নেই।আপাতত তার মস্তিষ্ক অন্য ভাবনায় নিমজ্জিত।মানুষটা এক বহুরূপী চরিত্র।একবার একেক রকম। কখনো মনে হয় এমন রসিক, প্রাণখোলা মানুষ বুঝি আর দুনিয়ায় নেই।আচরণের তীক্ষ্ণতায় কখনো মনে হয় এই পুরুষ নির্লজ্জতার জীবন্ত প্রতিমা।আবার কখনো কথার ধারে মনে হয় লোকটা নির্ঘাত ঠোঁট কাঁটা।আর এই যে এখন?এখন মনে হচ্ছে দুনিয়ার যত সিরিয়াস নেস তার মধ্যেই, গম্ভীর গুমোট দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ।

প্রায় অনেক্ষন ধরে সিগারেট টানার এক পর্যায়ে আঁধারের নৈঃশব্দতা ভাঙলো ফোন কলের আওয়াজ।
ত্রিজয় দু আঙুলের ভাজে সিগারেট টা চেপে রেখেই রিসিভ করলো ফোন।কানে ধরে কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো ইভানের উৎকন্ঠা মিশ্রিত স্বর,

“স্যার! কোথায় আপনি?”

ত্রিজয়ের চোয়াল কিঞ্চিৎ বেঁকে আসে,ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে ইভানের জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলার শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে,তবে তেমন একটা প্রতিক্রিয়া দেখালো না,ভরাট কন্ঠে প্রত্যুত্তর করলো,

“যেখানে থাকার কথা সেখানে,কেন?”

সঙ্গে সঙ্গে ভেসে এলো ইভানের শ্বাসরুদ্ধকর কন্ঠ,

“স্যার সাত নাম্বার যে লোকটাকে ধরতে পাঠিয়েছেন সেই লোকটাকে কেউ খুন করে দিয়েছে।”

খবরটা ছুটে আসা মাত্রই মস্তিষ্কে আগুন জ্বলে উঠলো ত্রিজয়ের, জ্বলন্ত সিগারেট টা হাতের মুঠোয় পিষে গর্জে উঠলো,

“হোয়াট!”

ইভান আতংকিত কন্ঠে বললো,

“জ্বি স্যার।এখন কি করবো? ”

জ্বলন্ত সিগারেট টা হাতের মুঠোয় পিষতে পিষতে ছাইয়ে রুপান্তর করলো ত্রিজয়,তার নীল চোখ ভয়ংকর রকমের লাল হয়ে গিয়েছে,চোখের ভেতর সুতোর মতো চিকন শিরা গুলোতে রক্তচাপ বেড়েছে অধিকমাত্রায়।সে ধিরে ধিরে তার মুঠো আলগা করলো,ফর্সা হাতের তালুতে লেগে থাকা ছাইয়ের দিকে তাকালো রক্তচোখে,হিসহিসিয়ে বললো,

“কিছু করতে হবে না।যা করার আমি করছি।সিংহের শিকার কেড়ে নিয়ে সিংহকে রাগানোর ফল এখন হারে হারে টের পাবে।”

তৎক্ষনাৎ ফোন কেঁটে পকেটে রাখলো ত্রিজয়।ভেতরকার সমস্ত রাগ উগ্রে দিতে একটা বকুল গাছের ছোট চাড়া উপরে ফেললো নৃসংশতায়। তারপর গাছটা ওভাবেই টানতে টানতে অন্ধকারে উধাও হয়ে গেলো কোথাও।

নিজের ঘর থেকে পুরো ঘটনাটা তাজ্জব হয়ে দেখছিলো নিস্পা।ত্রিজয়ের এমন অদ্ভুত রহস্যজনক আচরনে শরীর কাঁটা দিলো তার।কিন্তু কিছুতেই ত্রিজয়ের এই অদ্ভুত আচরণের সুরাহা করতে পারলো না।

ঘন্টাখানেকের মধ্যে আবার কোত্থেকে যেনো ফিরে এলো ত্রিজয়।তার চপল পায়ে ব্যাস্ততা,রূঢ়তা হাঁটার ভঙিতে।গ্যারেজের চাবি নিতে এসেছে সে।ভুল করে রুমে ফেলে গিয়েছিল বোধহয়।

তবে সবচেয়ে রহস্যজনক ব্যাপার ঘটলো তখন, যখন সে বাড়ির ভেতরে দিয়ে না ঢুকে নিজের ঘরের বেলকনি বেয়ে ঘরের ভেতর ঢুকলো।বিষয়টা পুনরায় নিজের ঘর থেকে খেয়াল করছিলো নিস্পা।তার চোখে মুখে খেলে গেলো কৌতুহল।কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে উঠে এসে দাঁড়ালো পর্দার আড়ালে,শঙ্কিত দু চোখ বেড় করে শুধু দেখলো ত্রিজয়ের কার্যক্রম।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে একই ভাবে হন্তদন্ত হয়ে বেড়িয়ে এলো ত্রিজয়।আশপাশ টা ভালো করে পর্যবেক্ষন করে দ্রুত বেড়িয়ে গেলো বাড়ি থেকে।

এদিকে কৌতুহল জেঁকে বসলো নিস্পার মাথায়।ত্রিজয়ের এমন রহস্যাবৃত আচরণের কারণ জানার জন্য মড়িয়া হয়ে উঠলো মস্তিষ্ক।কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে না পেরে ছুটে বেড়োলো ঘর থেকে।

পা টিপে টিপে ত্রিজয়ের পিছু নিতেই দেখলো গাড়িতে উঠে গিয়েছে ত্রিজয়।নিস্পাও আর বিলম্ব করলো না,দ্রুত হাতে একটা সি এন জি থামালো সে।অথচ ভাড়া নেই এক পয়সাও,তখনই মনে পড়লো তার নাকের ফুলের কথা।দ্রুত সেটা খুলে ধরিয়ে দিলো সি এন জি ড্রাইভারের হাতে,মিনতি জানিয়ে বললো,

“এটা রেখে সামনের ওই কালো গাড়িটা ফলো করুন প্লিজ।”

ড্রাইভার একটু দ্বিধায় পড়লো,নিস্পার সন্ত্রস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,

“এটা তো মনে হইতাছে ডায়মন্ডের নাকফুল।অনেক দাম।আপনি বরং আপনার জিনিস নিজের কাছে রাখেন,আমি আপনাকে এমনিতেই নিয়া যামু নি।”

নিস্পা প্রসন্ন হলো,তড়িঘড়ি গাড়িতে চড়ে বসতে বসতে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললো,

“ধন্যবাদ।অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।প্লিজ একটু তাড়াতাড়ি পিছু করুন।গাড়িটা হারিয়ে যাবে।”

ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে নিস্পাকে আস্বস্ত করে বললো,

“চিন্তা নাই আপা।আপনি চুপ কইরা বসেন।ওই গাড়ি আমি চোখের আড়াল হইতে দিমু না।”

____

সি এন জি টা সোজা ছুটে এসে থামলো ত্রিজয়ের গ্যারেজের সামনে।ত্রিজয়ের গাড়িও সেখানেই পার্ক করা।নিস্পা সি এন জি ড্রাইভারকে পুনরায় কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রবেশ করলো গ্যারেজের ভেতর।ড্রাইভার আর দাড়লো না,বিপদের আশঙ্কায় যেভাবে এসেছে সেভাবেই সি এন জি নিয়ে চলে গেলো।অচেনা অজানা একটা মেয়ের জন্য এর চেয়ে বেশি আর কিই বা করার থাকতে পারে তার?পাছে না বড় কোন বিপদে জড়িয়ে যায়।

নিস্পার বুক দুরুদুরু আকরে কাঁপছে। অজানা এক ভয়ের শীতল ছায়া জড়িয়ে ধরেছে তাকে। শরীর কেঁপে উঠছে হঠাৎ হাওয়ায় দোল খাওয়া পাতার মতো। ভেতর থেকে ধেয়ে আসছে ভারী চাপা দীর্ঘশ্বাস। মনে হচ্ছে অশরীরীরা নীরব শেকল পরিয়ে দিতে চাইছে তার পায়ে। মনটা কু-ডাকছে বারবার, অকারণ আতঙ্কে শাসন করছে তাকে,বারকে বার বারন করে বলছে ভেতরে না যেতে।

কে শোনে কার কথা?
নিস্পা থামলো না। বুকের ভেতর উথলে ওঠা অজস্র প্রশ্নের জবাব পাওয়ার তীব্র তাড়না সমস্ত ভয়কে মাটিচাপা দিলো। ঠোঁট শক্ত করে কামড়ে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গেলো ভেতরের দিকে।

গুনে গুনে মাত্র চার কদম এগোতেই চোখে পড়লো বেজমেন্টের একটি গোপন দরজা। যদিও গোপন বললেও এ মুহূর্তে আর সে গোপন নেই,দরজাটা হাট করে খোলা। ভেতর থেকে হলুদ বাল্বের আলো গ্যারেজের অন্ধকার ভেদ করে চোখে এসে বিধলো নিস্পার।

নিস্পার অনুসন্ধানী গভীর দুটো চোখে রহস্য জানার তৃষ্ণা আরও বেশি জোড়ালো হয়ে উঠলো।সে কয়েকবার শুখনো ঢোক গিলে পা বাড়ালো বেজমেন্টের সিড়িতে।গুটিশুটি পা টিপে টিপে ভেতরের দিকে নামতেই পিলে চমকে উঠলো তার,শরীর অসার হয়ে ভেঙে এলো পুরো শরীরের ভর ছেড়ে দেওয়া দুটো পা।

চোখের সামনে ত্রিজয়ের এমন নৃসংশতা দেখে থরথর করে কেঁপে উঠলো শরীর।ত্রিজয় এখনো খেয়াল করে নি তাকে,সে নির্দিধায় নির্বিগ্নে একের পর এক ছুড়ি চালাচ্ছে ক্ষতবিক্ষত একটা লাশের শরীর থেকে উপড়ে ফেলা হৃদপিন্ডটার মাঝে।

হাড় হীম করা আতংকে হৃদয় থমকে গেলো নিস্পার, গলাব্যথার মতো এক শীতল স্রোত ছড়িয়ে পড়লো রক্তে।শরীর জমে গেলো বরফের মতো,কন্ঠ নালী কেঁপে কেঁপে বললো,

“আপনি?খুনি।”

ত্রিজয়ের চক্ষু তখন শীতিল নিঃসঙ্গ, অমানবিক।সতেজ হৃদপিন্ডটায় উপর ছুড়ি বসানোর প্রতিটি মুহূর্তে এক অদ্ভুত তৃপ্তি পাচ্ছিলো সে,কিন্তু যখনই নিস্পার কন্ঠটা কানে এলো মস্তিষ্ক সংকেত পাঠালো ঝাপিয়ে,তীব্র ধুকপুকানিতে কলিজাটা ধরাক করে উঠলো তার।তড়াগ করে চোখ তুলে চাইলো সামনের দিকে,নিস্পাকে দেখেই অস্পষ্ট আওড়াল,

“তুমি?”

নিস্পা নিজের মধ্যে নেই।ভয়ে আতংকে ঠকঠক করে কাঁপছে এখনো।ত্রিজয়ের এমন নিষ্ঠুরতা পাথর করে দিয়েছে তাকে।এমন ভয়ংকর কৃৎকর্ম নিজ চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তার।

ত্রিজয় আবর্জনার মতো পায়ে ঠেলে লাশটা সরিয়ে নিলো নিস্পার চোখের সামনে থেকে, হৃদপিন্ড টা ছুড়ি সহই ছুড়ে ফেললো কোথাও।অথচ রক্ত?সেটা কি করে মুছবে?এমন শীতল তাজা রক্ত দেখেই তো দম আটকে যাওয়ার অবস্থা নিস্পার।

ত্রিজয় নিজের রক্তাক্ত হাতটা দ্রুত মোছার চেষ্টা করল নিজের প্যান্টে, নিস্পার এমন আশঙ্কাজনক কম্পনে তাকে শান্ত করার জন্য ছুটে এসে বলে,

“কেন এলে কলিজা?কেন এলে এখানে?”

নিস্পা হাপড়ের মতো শ্বাস নিচ্ছে,একেকটা শ্বাস প্রতিবারই পরিনত হচ্ছে দীর্ঘশ্বাসে।সে কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না,আতংক গলা চেপে ধরেছে তার,সে মুখে হাত রেখে ফুপিয়ে ফুপিয়ে বললো,

“আপনি খুনি।আপনি মানুষ হয়ে মানুষ খুন করেন।”

ত্রিজয় জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো,তড়িৎ দু-হাত বাড়িয়ে শক্ত করে জাপ্টে ধরলো নিস্পাকে,শান্ত কন্ঠে বললো,

“কলিজা! কলিজা!কুল ডাউন কলিজা!”

ত্রিজয়ের বুকের সংস্পর্শে আসতেই ঘৃনায় বোমি করার অবস্থা হলো নিস্পার,শরীরের সমস্ত ক্রোধ এক জোট করে ধাক্কা দিলো ত্রিজয়কে,কাঁদতে কাঁদতে চেচিয়ে বললো,

“ছোবেন না। ছোবেন না আমাকে।আপনি খুনি।কি জঘন্যতম খুনি আপনি।”

ত্রিজয় ফোস করে নিঃশ্বাস ফেললো,বুক ফুলিয়ে দম টেনে আবারও শান্ত করতে চাইলো নিস্পাকে,

“কলিজা! আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলছি শোন।আমার কথাটা শোন।”

“কি শুনবো? কি শুনবো হ্যাঁ? আমি নিজ চোখে দেখেছি আপনি মানুষ টাকে জঘন্যভাবে খুন করেছেন।”

নিস্পার কথায় চোখের ভঙি পরিবর্তন করলো ত্রিজয়,ভয়ংকর ভাবে বিকৃত করলো মুখাবয়ব,দু দিকে দু’বার ঘাড় কাত করে হিমশীতল কন্ঠে বললো,

“দেখেছিস?সবটা দেখে নিয়েছিস?”

নিস্পা বুকফাটা নিঃশ্বাস টেনে বললো,

“হ্যাঁ আমি সব দেখেছি।”

ত্রিজয় ক্ষুব্ধ হয়ে হটাৎ চেপে ধরলো নিস্পার গলা,এমনভাবে চেপে ধরলো যে আর কিছুক্ষণ থাকলে নিশ্চয়ই দম বন্ধ হয়ে মরে যাবে নিস্পা,শ্বাসকষ্টে জ্বিভ বেড়িয়ে এলো নিস্পার,চোখের মনি বেড়িয়ে আসতে চাইলো কোটর ছিড়ে।অথচ তোয়াক্কা করলো না ত্রিজয়,বরং আরেক হাতে ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো নিস্পার গালে,চেচিয়ে বললো,

“কেন দেখলি হ্যাঁ?কেন দেখলি?কুত্তার বাচ্চা তোর চোখ আজকে আমি তুলে ফেলবো।”

ভয়ে সিটিয়ে গেলো নিস্পা,থাপ্পড়ের তোপে থুবড়ে পড়লো ফ্লোরে,কম্পিত স্বরে উচ্চারণ করলো,

“আ,,আপ,,আপনি এটা করতে পারেন না।”

ত্রিজয় একটা ছুরি নিয়ে ছুটে এলো নিস্পার কাছে,তারপর নিস্পা চুলের মুঠি চেপে ধরে ছুড়িটা তাক করলো নিস্পার চোখের ঠিক দুই ইঞ্চি দূরত্বে,ক্রোধ দাঁতে পিষে বললো,

“পারবো না কেন?একশো বার পারবো।তুই দেখতে চাস আমি পারি কিনা?”

নিস্পা চোখ খিচে বন্ধ করে চোখের পানি ছেড়ে দিলো,হেচকি তুলে কাঁদলো কয়েকবার।ত্রিজয় চোখ গরম করে তাকালো, ছুরিটা ছুড়ে ফেলে দিতেই ঝনঝনিয়ে শব্দ হলো বদ্ধ ঘরে,উন্মাদের প্রলাপের মতো বললো,

“সারাদিন যে ভালোবাসা দেখানোর জন্য পিছন পিছন ঘুরি তখন কোথায় থাকে এই চোখ?দেখতে পাস না?দেখতে পাস না আমার বুকের ভেতর পুষে রাখা ভালোবাসা।এখন আমি যেটা চাই না সেটাই দেখে নিলি?কেন রে?তোর শরিরে এতো চুলকানি কেন?”

নিস্পা ঠোঁট কামড়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো,যন্ত্রণা গিলে নিয়ে বললো,

“আপনি এসব কি বলছেন?”

ত্রিজয় খপ করে মুচড়ে ধরলো নিস্পার কনুই,তারপর নিস্পাকে টানতে টানতে ক্রোধিত কন্ঠে বললো,

“যা বলছি একদম ঠিক বলছি।চুলকানি বেড়েছে বলেই তো আমার পেছন পেছন এতোদূর এসেছিস।আয় আজকে তোর শরীরের সব চুলকানি কমিয়ে দেবো।”

ভয় খামচে ধরলো নিস্পার বুক গহ্বর,নিজের হাত ছাড়ানোর জন্য মড়িয়া হয়ে বললো,

“আ,আপনার হাতে রক্ত।আমার ঘৃনা লাগছে।আমার হাত ছাড়ুন।”

ত্রিজয় বাঁকা হাসলো,হাত ছেড়ে দিলো আপোষে।নিস্পা একটু সস্তির নিঃশ্বাস ছাড়তে না ছাড়তেই ত্রিজয় খপ করে চেপে ধরলো নিস্পার গলায় ঝুলে থাকা ওড়না টা।নিস্পার পিলে চমকে উঠলো,চোখ বড় বড় করে চেপে ধরার চেষ্টা করলো ওড়নাটা।কিন্তু সম্ভব হলো না।তার এই নগন্য শক্তি দ্বারা একদমই সম্ভব হলো না ত্রিজয়কে প্রতিহত করা।

ত্রিজয় নিস্পার ওড়নাটা টেনে ছুড়ে ফেললো অদুরে, তারপর নেশাগ্রস্তের ন্যায় নিজের দুই ঠোঁট দ্বারা চেপে ধরলো নিস্পার ঠোঁট।সেখানেই ক্ষান্ত হলো না।নিজের বেহায়া হাতের নির্মম বিচরণ ঘটাতে লাগলো নিস্পার শরীরের বাঁকে।

নিস্পা ঘৃনায় যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলো,ঘুষি বসাতে শুরু করলো ত্রিজয়ের বুকের উপর।অথচ ত্রিজয় বেপরোয়া। তীব্র দংশনে শেষমেষ ঠোঁট কেঁটে রক্ত বেড় করে ফেললো মেয়েটার।

মূহুর্তটার আরেকটু স্বকীয়তা আনতে নিস্পাকে ধাক্কা দিয়ে ছুড়ে ফেললো নিজের বড়সড় কাউচের উপর।নিস্পা ধাক্কা খেয়ে গিয়ে থুবড়ে পড়লো সেখানে।অসহায়ত্বে শরীর কেঁপে উঠছে তার।ত্রিজয় সেদিকে তাকিয়ে শ্লেষ হাসলো,অদ্ভুত ভাবে পা দুলিয়ে দুলিয়ে নিস্পার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললো,

“সামান্য হাত ধরাতে ঘৃনা লাগছে?আজ তো সব যায়গায় ধরবো কলিজা। তার চেয়ে বরং ঘৃনা গিলে নেওয়ার চেষ্টা করো। আমি যখন তোমাকে গিলে নেবো তখন কিন্তু শরীরের ব্যাথায় খাবার গেলার মতোও উপযুক্ত থাকবে না।”

নিস্পা কিছু বলার সুযোগ পেলো না।ত্রিজয় হিংস্র নেকড়ের মতো পুনরায় ঝাপিয়ে পড়লো নিস্পার উপর।প্রতিহত করলো নিস্পার সমস্ত প্রতিরোধ।গভীর থেকে গভীরতম স্পর্শে দিশেহারা করলো নিস্পার সর্বাঙ্গ।

ঘন ঘন নিঃশ্বাস ছাড়া ছাড়া টু শব্দটি করার উপায় নেই নিস্পার। ত্রিজয় নিজের দন্তপাটি দ্বারা কব্জা করে রেখেছে তার ঠোঁট।কিছুক্ষণ পরপর নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিয়ে পুনরায় করছে একই কাজ।

ত্রিজয়ের হাত তখন অবিন্যস্ত।নিস্পার শরীরের কোথায় যাচ্ছে না সে হাত?যেখানেই যাচ্ছে সেখানেই বিষধর সাপের মতো বিষিয়ে দিচ্ছে নিস্পার তুলতুলে নরম মসৃন ত্বক।

নিস্পা যখন পুরোপুরি নিস্তেজ ঠিক তখনই নিস্পার অধর ছেড়ে দিয়ে নিচের দিকে নামলো ত্রিজয়।বাঘের থাবার ন্যায় ছিড়ে ফেললো নিস্পার জামা।উন্মাদের মতো বাইট দিতে শুরু করলো নিস্পার উন্মুক্ত শরীরের সর্বত্র।

নিস্পা রাগে দুঃখে তিক্ততায় চেচিয়ে উঠলো,ত্রিজয়কে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গলা ফাটিয়ে বললো,

“দূরে সরুন অসহ্য লাগছে আমার।”

ত্রিজয় ভারসাম্য রাখতে না পেরে পড়ে গেলো ফ্লোরে। বাড়লো তার হৃদয়ের তৃষ্ণা।নিস্পার অর্ধ উন্মুক্ত শরীর তাকে আকর্ষিত করলো চুম্বকের মতো।সে চোখ বন্ধ করে আওড়াল,

“ন্যাক্সোরা!!ন্যাক্সোরা ডার্লিং। কোথায় তুমি?কাম হেয়ার।”

ত্রিজয়ের ডাকা মাত্রই হনহনিয়ে কাউচের নিচ থেকে বেড়িয়ে এলো ন্যাক্সোরা সাপ।অনুগত প্রহরীর মতো এসে স্থির হলো ত্রিজয়ের সামনে।ত্রিজয় বক্র হাসলো।হাত বাড়িয়ে তুলে নিলো কালো কুচকুচে সাপটা।তারপর নিস্পার হাতটা ধরে হেচকা টান দিতেই ফ্লোরে এসে পড়লো নিস্পা।ত্রিজয় দুই হাটু নিস্পার দুদিকে রেখে নিস্পার তলপেট বরাবর বসলো,তারপর কালো কুচকুচে সাপটা নিস্পার ফর্সা ত্বকের উপর ছেড়ে দিয়ে ডেবিল কন্ঠে আওড়াল,

“ডিসাইড কর, আমার কামড় খেয়ে বংশের বাতি জ্বালাবে? নাকি সাপের কামড় খেয়ে জীবনের বাতি নেভাবে?”

কালো রঙের ভয়ংকর দেখতে সাপটা নিজের লকলকে জ্বিভ বের করে ফনা তুলে হিসহিস করছে নিস্পার মুখের উপর।ভয়ে আতংকে কলিজা খানি এক রত্তি হয়ে গেলো নিস্পার।মেরুদণ্ড মেড়মেড় করে ভেঙে যাওয়ার শব্দ হলো বোধহয়।সমস্ত স্নায়ুর রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলো নিমিষেই।হাড়হীম করা ভয়াতুর চোখে সাপটার দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে নিলো সে।যতটা সম্ভব কন্ঠ খাদে নামিয়ে ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠে বললো,

“মরে যাবো কিন্তু আপনাকে স্বীকার করবো না।”

“তোর স্বীকারের মায়রে বাপ।ধৈর্য শেষ তুই শুধু চুপ করে থাক।”

কথাটা বলেই সাপটাকে মুঠোয় নিয়ে নিজের দিকে ফেরালো ত্রিজয়।সম্মোহনী নীল অক্ষিদ্বয় সাপটার দিকে নিবদ্ধ করে ইশারা করলো কিছু একটা,ক্রর কন্ঠে বললো,

“ন্যাক্সোরা।নিজের কাজ শুরু কর।এক ইঞ্চিও যেন নড়তে না পারে।”

আদেশ পাওয়া মাত্রই ত্রিজয়ের হাত বেয়ে নিস্পার শরীরে পুনরায় নেমে এলো সাপটা।তারপর ধিরে ধিরে নিজের বিশাল লম্বা শরীর দিয়ে পেচিয়ে নিলো নিস্পার মুখ।

মৃত্যুর ভয় আর আতংক এক না।মানুষ বেঁচে থাকা অব্দি মৃত্যুর ভয় বুকে লালিত করে।কিন্তু সেই ভয় যখন আতংকে পরিণত হয় তখন মৃত্যুও কেঁপে উঠে প্রতি মূহুর্তে।
নিস্পা আজ হারে হারে টের পাচ্ছে সে কথা।সাপটা তার মুখ পেচিয়ে রেখেছে, আতংকে নড়ার উপায় নেই।তারউপর শরীরের জিম্মিদার ত্রিজয়।কিছু মূহুর্ত হলো শরীরে শেষ বস্ত্র টুকুও কেড়ে নিয়ে করে তাকে দিয়েছে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।

ত্রিজয় তার দখল দারিত্ব ফলাচ্ছে।একজন স্বামী হিসেবে নিজের বউকে পাওয়ার পিপাসা মেটাচ্ছে নিস্পার শরীরের গভীর সমুদ্রে।নিস্পা ঘনঘন শ্বাস ফেলে দুই হাতে খামচে ধরে আছে ত্রিজয়ের চুল।বিদ্যুৎস্পষ্টের ন্যায় শরীরে প্রত্যেকটি ঝাকুনির বিপরীতে কণ্ঠনালী থেকে নির্গত হচ্ছে অস্পষ্ট মধুর গুঞ্জন,

“উম!উম!উম!

নিস্পা স্থিরতায় এসেছে,তার শরীর ডুবে গিয়েছে নারী চাহিদায়,বশ্যতা স্বীকার করেছে ত্রিজয়ের আলিঙ্গনে।ত্রিজয় ধিরে ধিরে হাত বাড়িয়ে সরিয়ে দিলো নিস্পার মুখ পেচিয়ে ধরে রাখা সাপটা।তারপর আবারও ডুব দিলো গভীর আলিঙ্গনে।

নিস্পা ছাড়া পেয়ে চোখ উল্টে মুখ হা করে হাঁপালো,অসহায়, অসন্তোষ কন্ঠে আওড়াল,

“আপনি আমাকে নিঃশেষ করে দিলেন।”

ত্রিজয় তার নিজ কর্মে ব্যাস্ত।নিস্পার সর্বাঙ্গে কলঙ্ক লেপে দিতে দিতে হাস্কি টোনে বললো,

“উমম,আরেকটু বাকি।”

নিস্পা নিস্প্রান রোবটের মতো মেঝেতে শুয়ে আছে কেবল।তার এক হাত ত্রিজয়ের চুলে আরেক হাত খামচে ধরে আছে ত্রিজয়ের ফর্সা নগ্ন পিঠ।

ত্রিজয় নিস্পার শরীরে আরও এক দফা যুদ্ধ চালিয়ে থামলো।মুখ তুলে তাকালো নিস্পার বিধ্বস্ত মুখের দিকে।ঠোঁট কেটে ফুলে উঠেছে মেয়েটার,অতিরিক্ত লাল হয়ে আছে।চুল গুলো ছড়িয়ে আছে,কিছু চুল লেপ্টে আছে ঘামে ভেজা মুখের উপর,কি আবেদনময়ী সুন্দরী লাগছে নিস্পাকে,তাকালেই মাথা নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম।ত্রিজয় মাদকিয় কন্ঠে ডাকলো নিস্পাকে,

“কলিজা!”

নিস্পার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে অবিরত,তার হাতের খামচাখামচি তে ত্রিজয়ের নগ্ন পিঠের চামড়া ছিলে যাওয়া অবস্থা।নারীত্বের প্রথম ভাঙন ছিলো এটা,বিপরীত পক্ষের মানুষ টা আহত হবে এটা তো স্বাভাবিক।

নিস্পার সাড়া শব্দ না পেয়ে ত্রিজয় আবার কামুক কন্ঠে ডাকলো,

“কলিজা!”

নিস্পা পিটপিট করে চোখের পাতা নাড়ালো,তাকালো ত্রিজয়ের চোখের দিকে।অস্পষ্ট আওড়াল,

“হু?”

ত্রিজয় আলতো চুমু খেলো নিস্পার কপালে। তারপর চুমু খেলো নিস্পার ভেজা চোখের পাতায়, আস্তে আস্তে আরও দুটো উষ্ণ চুমু খেলো নিস্পার কানের লতিকাতে,নেশাধরা কন্ঠে ফিসফিসালো,

“হালাল ফিল পাচ্ছো তো জান?”

⭕নোটঃগল্পের আসল স্বাদ এখন থেকে শুরু হবে।প্রতিটি পর্বে একটা করে রহস্য উন্মোচন করা হবে।পাঁচ হাজার শব্দ লিখেও হেলিকপ্টারের পর্বটা আনতে পারি নি।তবে খুব শীঘ্রই আসবে।লাইক কমেন্ট কমে গিয়েছে নূন্যতম 1k রিয়েক্ট এবং 200 কমেন্ট হলেই পরবর্তী পার্ট লিখতে বসবো।

চলবে,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here