হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পর্বঃ 68

0
32

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্বঃ 68

কেটেছে গোটা একটি মাস।সম্পর্ক বদলেছে, মানুষের চাহিদা বদলেছে,বদলেছে রুচিও।ভালোবাসা না পাওয়া মেয়েটিও এখন সংসার বেধেছে,প্রতিটি রাতে দেখছে স্বর্গের স্বপ্ন।

সকাল তখন অনেক।জরুরি কাজের দোহাই দিয়ে কাল সারা রাত বাড়ির বাইরে ছিলো কিয়ান।মাত্রই ফিরলো বাসায়।কিয়ান ফিরতেই পাখির মতো ডানা জাপ্টে তার বুকের উপর এসে আছড়ে পড়লো অনু।

স্বভাবত এই একমাসে কখনোই নিজ থেকে এতো কাছে আসে না অনু,বা এভাবে হুট করে জড়িয়েও ধরেনি, তাই অনুর হটাৎ এমন ব্যাবরে অবাক হলো কিয়ান,কৌতুহলি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“কি হলো এতো খুশি দেখাচ্ছে কেন?”

অনু আলগোছে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো কিয়ানের বলিষ্ট বাহু।তারপর চুপটি করে লজ্জায় রাঙা মুখ লুকালো কিয়ানের প্রসস্থ বুকে, গুনগুনিয়ে বললো,

“খুশির সংবাদ আছে তাই।”

কিয়ানের কপাল কুচকে এলো, সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“কি?”

অনু আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো কিয়ানকে,লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে কিয়ানের বুকে নাক ঘষলো কেবল।কিয়ান বেশ বিরক্ত হলো, অনুর মতিগতি ভালো লাগছে না তার, না জানি কোন গড়বড় হয়ে যায়।শেষ পর্যায়ে এসে এতো টেনশন নিতে পারছে না কিয়ান, তাই নিজের বুক থেকে অনুর মাথাটা ঠেলে সরিয়ে আগে জিজ্ঞেস করলো,

“এসব থার্ডক্লাস কাজ না করে কি খবর সেটা বল।”

কিয়ানের চোখমুখের বিভ্রান্তিকর অবস্থা এখনো খেয়াল করে নি অনু,সে ঠোঁট কামড়ে মুচকি হেসে বললো,

“আপনি বাবা হতে চলেছেন।”

অনুর কথায় বড়সড় একটা বিস্ফোরণ হলো বোধহয়।কিয়ান তেমন করেই বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালো অনুর দিকে,বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে বেড়িয়ে এলো ভেতরের সমস্ত উৎকন্ঠা,

“হোয়াট দ্যা থার্ডক্লাস কথাবার্তা।আর ইউ শিউর?”

অনু তার হাতের প্রেগ্ন্যাসি কিট টা ধরলো কিয়ানের সামনে,
“এইযে দেখুন।”

কিয়ান থ বনে গেলো, এটা হয়তো সে আশা করে নি।যেই মেয়েটাকে বিক্রি করে দিয়ে আসার সমস্ত পরিকল্পনা শেষ করে বাসায় ফিরলো সে, সেই মেয়েটা কিনা তার বাচ্চার মা হতে চলেছে।এই ভয়ংকর খবর টা তাকে ভেতর থেকে স্তব্ধ করে দিয়েছে কিছু মূহুর্তের জন্য।

অনু প্রায় অনেকটা সময় কিয়ানের মুখ থেকে কমপ্লিমেন্ট শোনার অপেক্ষায় মূক হয়ে থেকে যখন কোন উত্তর পেলো না। তখন নিজের ঠান্ডা হাতটা নিয়ে রাখলো কিয়ানের গালে, উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললো,

“কি হলো আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?আপনি খুশি হন নি?”

“হু!”

কিয়ান নড়েচড়ে উঠতেই অনু আবার জিজ্ঞেস করলো,

“খুশি হন নি আপনি?”

“কেন?”

“আপনি যে বাবা হতে চলেছেন?”

কিয়ান কি বলবে খুঁজে পেলো না,অনুকে সামলে নিতে তড়িঘড়ি বলে উঠলো,

“হু,হু।খুশি।খুশি হয়েছি।”

কিয়ানের এমন খাপছাড়া উত্তরে খুশি হতে পারলো না অনু,চুপসানো কন্ঠে বললো,

“আপনাকে দেখে তো বোঝা যাচ্ছে না।একটা কথাও তো বলছেন না।”

কিয়ান ভেতরকার অস্থিরতা চেপে গেলো কিছু মূহুর্তের জন্য,ফিরে এলো নিজের চিরাচরিত রুপে, কন্ঠে মিথ্যা অনুভূতি টেনে বললো,

“খুশি হয়েছি যে তাই।খুশিতে কথা হারিয়েছে।বুঝে নেও কতটা খুশি হয়েছি।”

এবারে সন্তুষ্ট হলো অনু।মনের সমস্ত সংকোচ দূরে ঠেলে দিয়ে স্বগোতক্তিতে বললো,

“আমিও খুশি, খুব খুশি।”

“আচ্ছা তুমি থাকো আমি আসছি।”

“কোথায় যাচ্ছেন?ফিরলেনই তো মাত্র।”

“ভুলে একটা কাজ ফেলে এসেছি, সেটাই মনে পড়লো।যাচ্ছি আমি।”

“সাবধানে যাবেন।”

“হুম।”

কিয়ান আর দাড়ালো না।বড্ড তাড়া দেখিয়ে হনহনিয়ে বেড় হলো বাড়ি থেকে।একঘেয়ে কদম ফেলে সোজা এসে দাড়ালো মাঝরাস্তায়।টেনশনে মাথা ফেটে যাচ্ছে তার,সবার প্রথম পকেট থেকে একটা সিগারেট বেড় করে ধরালো, তারপর কয়েক টানেই সিগারেট টা শেষ করে ধরায় আরেকটা সিগারেট।বা হাতে ফোন স্ক্রল করে ডায়াল করে একটি নাম্বার।

একবার রিং হতেই কলটি রিসিভ করে কেউ একজন,কিয়ান অস্পষ্ট আওড়ায়,

“হ্যালো।”

ওপাশ থেকে তড়িৎ ভেসে আসে উত্তর,

“হ্যাঁ স্যার।সব ব্যাবস্থা হয়ে গিয়েছে।আপনি মেয়েটাকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত নিয়ে আসুন।বাকিটা আমরা সামলে নিবো।”

কিয়ান কয়েক টানে তার দ্বিতীয় সিগারেট টাও শেষ করলো, চাপা স্বরে বললো,

” সন্ধ্যার মধ্যেই ওকে হ্যান্ড ওভার করবো আমি।তারপর তোমাদের দায়িত্ব।বাট কোন ক্ষতি যেন না হয়।”

“চিন্তা করবেন না ডক্টর কিয়ান।মেয়েটার কোন ক্ষতি হবে না।এখানে আরও অনেক মেয়ে আছে যাদেরকে সারোগেট মাদার বানানো হচ্ছে, বিদেশি ক্লাইন্ডদের কাছে এদের অনেক ডিমান্ড।আর সবচেয়ে ভালো ফেসিলিটি হচ্ছে এখানে মেয়েদের ভালো খাবার পোশাক আশাক সব সারবারহ করা হয় তাদের বেবির যত্নের জন্য।একটা অনাথ মেয়ে যে ছোট থেকে অভাব অনটনে বড়ো হয়েছে তাদের জন্য ভালো থাকার এটাই সবচেয়ে ভালো উপায়।অন্যের বেবিকে গর্ভে লালন পালন করার বিনিময়ে এট লিস্ট ভালো খাবার-দাবার থেকে শুরু করে সব রকম সুবিধা ভোগ করতে পারবে।”

কিয়ানের চোখের সামনে ভেসে উঠলো অনুর সহজ সরল মুখটা,কানে বেজে উঠলো তখনকার বলা সেই কথা টুকু ‘আপনি বাবা হতে চলেছেন।’ শব্দ গুলো ভেঙে ভেঙে কানে বাজতেই ধড়ফড়িয়ে উঠলো কিয়ান।কানে জ্বলন্ত শিশা ঢেলে দেওয়ার মতো উপলব্ধি হলো তার।সে চোখ বন্ধ করে জিজ্ঞেস করলো,

“আর যদি মেয়েটা আগে থেকে প্রেগন্যান্ট থাকে?”

অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো ছোট্ট উত্তর,

“তাহলে তো অবশ্যই সবার আগে তার গর্ভপাত করাতে হবে।”

“কেন?”

“এটা তো ক্লাইন্টদের ডিমান্ড থাকে স্যার।সবাই তো নিজেদের শুক্রাণু ও ডিম্বানু দ্বারা তৈরি ভ্রুন থেকে সন্তান লাভের জন্যই আসে।তাছাড়া এই পদ্ধতিতে সারোগেট মায়ের নিজস্ব ডিম্বাণুও ব্যবহৃত হয় না। IVF-এর মাধ্যমে তৈরি ভ্রূণ প্রতিস্থাপন করা হয়। এখানে সারোগেট মায়ের সাথে শিশুর কোনো জেনেটিক সম্পর্ক থাকে না।তাই তাদের গর্ভে কোন সন্তান থাকলে আমরা আগে এবরশন করাই।আর আম,,,

“হয়েছে আর বলতে হবে না।আমি সন্ধ্যায় মেয়েটাকে নিয়ে দেখা করছি।”

লোকটার কথা শেষ হওয়ার আগেই কিয়ান থামিয়ে দিলো তাকে।নিজের সংক্ষিপ্ত উত্তরে ফোনালাপ শেষ করলো কিয়ান।পরপরই ধরালো আরেকটা সিগারেট।

_____

হাসপাতালে গত হয়েছে প্রায় এক সপ্তাহ। নিজের অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার জন্য আজ কয়েকটা দিন পাগলের মতো হাসপাতালের গন্ডিতে ঘুরছে চিত্রা।নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে নির্ঘুম দিন পার করছে অসুস্থ মায়ের শিয়রে।অথচ অবস্থার উন্নতি নেই,আজ বরং আরো বেশি অবনতির দিকে গিয়েছে।ডক্টর বলেছে এক্ষুনি দেশের বাইরে পাঠিয়ে অপারেশন করতে হবে,নয়তো বাঁচানো যাবে না কিছুতেই।কিন্তু অপারশনের জন্য মোটা অংকের টাকা লাগবে, প্রায় কোটি টাকার মতো তো লাগবেই।কিন্তু এতো টাকা কিভাবে মেনেজ করবে ভেবেই পেলো না চিত্রা, দিকভ্রান্ত হয়ে ফোন করলো তাকরিমের মাজেস্মিন বেগমের নাম্বারে,

“ম্যাম আমার মায়ের অবস্থা খুব খারাপ।তিনদিনের মধ্যে অপারেশন না করালে আমার খারাপ কিছু হয়ে যাবে।”

ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো জেসমিন বেগমের কর্কষ কন্ঠ,

“তাতে আমার কি?”

চিত্রা ফুপিয়ে উঠলো, ভেজা কন্ঠে বললো,

“ম্যাম এভাবে বলবেন না প্লিজ।আমার মা ছাড়া পৃথিবীতে আপন বলতে কেউ নেই।”

জেসমিন বেগম কটাক্ষ মিশ্রিত স্বরে প্রত্যুত্তর করলো,

“মানুষ পৃথিবীতে আসে মরার জন্যই।”

অসহায় চিত্রার কান্নার বেগ বাড়লো।একমাস যাবৎ তাকরিমেরও কোন পাত্তা নেই।উনি থাকলে নিশ্চয়ই তার মায়ের চিকিৎসা নিয়ে চিন্তা করতে হতো না।কিন্তু এখন যে এমপি মশাইয়ের সাথেও কোনরকম যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে না।

চিত্রা কাঁদতে কাঁদতে আবারও অনুরোধ করে বললো,

“ম্যাম আপনি স্যারের সাথে আমার একটু কথা বলিয়ে দিন প্লিজ।উনি কোথায় আছে ঠিকানা টা অন্তত দিন।”

“কেন?এই ন্যাকা কান্না করে টাকা আদায় করার জন্য?”

“ম্যাম!”

“তোমাকে যে কাজটা দিয়েছি করেছ?”

চিত্রা এবার স্থির হয়ে গেলো,জড়বস্তুর মতো ভগ্ন কন্ঠে আওড়াল,

“এতো ভালো একটা মানুষের সাথে এমন জঘন্য কাজ আমি কি করে করবো ম্যাম।”

“যে করে নিজের মায়ের জীবন বাঁচাতে চাও।”

জেসমিনের কাঠকাঠ জবাবে নিঃশ্বাস আঁটকে এলো চিত্রার।চোখের সামনে ভেসে উঠলো ইভানের মুখটা, আর টসটসে লাল দুটো ঠোঁটের প্রসস্থ হাসি।লোকটা বোধহয় স্মোকিংও করতো না, অথচ সে কিনা তাকে দিয়ে ওমন জঘন্য কাজ করাবে সেটা কিভাবে সম্ভব।এই ভয়ংকর কাজ করা তার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব না।

চিত্রা নাক টেনে হেচকি আটকালো, খুব কষ্ট করে বললো,

“আমি ওই মানুষটাকে এমনিতেই ভালোবাসি ম্যাম।ওনাকে আমি এতো নোংরা ফাঁদে ফেলি কি করে।”

জেসমিন বেগমের ভ্রু বেঁকে এলো,চিত্রার কথায় যে বেশ অনেকটা চমকেছে চেহারার ফুটে উঠেছে সেই ছাপ,তবুও শিউর হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলো,

“কি বললে?ভালোবাসো?”

চিত্রা ঠোঁট কামড়ে অস্পষ্ট বললো,

“হু ম্যাম।”

জেসমিন বেগম কুটিল হাসলো, ক্রুর কন্ঠে বললো,

“তাহলে তো ভালোই হলো, ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করতে পারবে।”

চিত্রা অসম্মতি জানিয়ে বললো,

“কিন্তু আমি এভাবে ভালোবাসা পেতে চাই না ম্যাম।”

“তাহলে নিজের মায়ের সুস্থতাও চেয়ো না।”

চিত্রা গুমরে উঠলো, রোধ হয়ে এলো কন্ঠস্বর,আর একটা শব্দও বের হলো না মুখ থেকে,যেনো কোন অদৃশ্য শক্তি গলা টিপে ধরে রেখেছে তার।

জেসমিন চিত্রার কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে তাড়া দেখালো,কন্ঠে কঠোরতা টেনে বললো,

“রাখছি আমি।”

জেসমিন৷ ফোন কাটতেই যাবে তার আগেই বাধা দিয়ে আকুতি করে ডেকে উঠলো চিত্রা,

“ম্যাম! ম্যাম! ”

“আমার সময় নষ্ট হচ্ছে।”

জেসমিন বেগমের কড়া কন্ঠে আর টিকতে পারলো না চিত্রা,অবশেষে নিজের মায়ের চিকিৎসার জন্য অসহায়ের মতো সম্মতি দিয়ে বললো,

“আমি, আমি রাজি ম্যাম।”

চিত্রার সম্মতি পেতেই একটা শয়তানি হাসি দিলো জেসমিন, কৌশলি ভঙিমায় বললো,

“ওকে ডিল ডান।তুমি একদিকে বউ সাজবে আরেকদিকে তোমার মায়ের অপারেশন শুরু হবে।”

_______

জেসমিনের ফোনটা কেটে দিতেই হাসপাতালের বারান্দায় হাত পা ছুড়ে ছোট বাচ্চার মতো কাঁদতে শুরু করলো চিত্রা।সামনের সমস্ত পথ বন্ধ, তাই ইভানকে ঠকান ছাড়া দ্বিতীয় কোন অপশন নেই।
অনেক ভাবনা চিন্তা করে চিত্রা এবার ডায়াল করলো ইভানের নাম্বারে।

ইভান ঘুমোচ্ছে,বেলা হয়েছে কিন্তু উঠার নাম গন্ধ নেই।এমন সময়ই চিত্রার একের পর এক ফোন কলে ঘুম ছুটলো তার,বিছানা হাতড়ে কোনরকম ফোনটা কানে নিয়ে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললো,

“হ্যালো।”

চিত্রা কোন উত্তর দিলো না, ফোনটা হাতের মুঠোয় চেপে রেখে নিঃশ্বাস আঁটকে চোখ বন্ধ করে নিলো কেবল।ফোনের ওপাশ থেকে কোন উত্তর না আসায় ইভান আবার ডাকলো,

“হ্যালো।হ্যালো মিস চিত্রা।”

ইভানের ডাকে একটু নড়েচড়ে উঠলো চিত্রা,শ্বাসরুদ্ধকর কন্ঠে তাড়াহুড়োয় বললো,

“হ্যাঁ,, হ্যা,,হ্যালো।”

“হ্যাঁ ফোন করে কোথায় হারিয়ে গেলেন?”

ইভানের কথার বিপরীতে উত্তর দেওয়ার আগে নিজেকে শান্ত করে নিলো চিত্রা, তারপর কন্ঠে স্বাভাবিক গতি এনে বললো,

“কোথাও না।আসলে নেটওয়ার্ক সমস্যা দিচ্ছিলো।”

“ওহ আচ্ছা সেটাই বলো।”

“হু।”

“তো এতোদিন পর কি মনে করে ফোন দেওয়া?”

ইভানের প্রশ্নের বিপরীতে বলার জন্য সমস্ত উত্তর গুছিয়ে রেখেছে চিত্রা,তাই গলার টোন এদিক সেদিক হওয়ার আগেই বললো,

“একটা নিউজ দেওয়ার ছিলো।”

“হ্যাঁ বলো।”

চিত্রা কিছুক্ষণ দম ধরে রেখে একটা ছোট নিঃশ্বাসের সাথে চাপা স্বরে বললো,

“আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।”

চিত্রার বিয়ের খবর পেয়ে খুব স্বাভাবিক ভাবেই খুশি হলো ইভান,হাস্যজ্বল কন্ঠে অভিনন্দন জানিয়ে বললো,

“রিয়েলি!কংগ্রাচুলেশনস।”

“আপনি খুশি হয়েছে?”

“কেন হবো না বলো তো?অবশ্যই খুশি হয়েছি।”

অস্বস্তি আর দ্বিধাদ ভেতরটা নির্মম ভাবে ছিড়েখুঁড়ে যাচ্ছে চিত্রার, কিন্তু তার কিচ্ছু করার নেই,নিজের মাকে বাঁচাতে হলে তাকে যে এই ভালো মানুষ টাকে নির্মম ভাবেই ঠকাতে হবে।

ভেতরকার সমস্ত দ্বন্দ্ব একপাশে রেখে চিত্রা বললো,

“তাহলে এই খুশি উপলক্ষে আপনাকে একটা ট্রিট দেই চলুন।”

ইভান ঠোঁট উল্টে হাসলো,চিত্রার সাথে কয়েকদিনের পরিচয়ে ভালো একটা ফ্রেন্ডশিপ হয়েছে ইতমধ্যে, তাই চিত্রার ইনভিটেশনে খুব এক সন্দেহ প্রকাশ করলো না সে,সরল মনে রাজি হয়ে বললো,

“তাহলে তো ভালোই হয়।”

হাঁফ ছেড়ে বাচার মতো একটা চাপা শ্বাস ফেললো চিত্রা,বললো,

“আচ্ছা তাহলে আজ আমার বাসায় আপনার আমন্ত্রণ। আমি নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াবো আপনাকে।”

“তুমি রান্না করবে?তাহলে তো আসতেই হয়।এমপি মশাইয়ের পিএ এর হাতের রান্না টেস্ট করে দেখতে হবে।”

ইভানের এমন সহজ সরল কথাগুলোর মায়ায় পড়লো চিত্রা,সীদ্ধান্ত হীনতায় ভুগলো কিছু মূহুর্তের জন্য।কিন্তু যখনই নিজের অসুস্থ মুখটা ভেসে উঠলো চোখের সামনে তখনই স্বার্থপরের মতো বললো,

“আপনি আসবেন শুনে আমি খুব খুশি হলাম।অপেক্ষায় থাকবো।রাখছি তাহলে।”

“ওকে।বাই।”

ইভান কল কেঁটে দিয়ে বেড সাইড টেবিলের উপর রাখলো,তারপর আড়মোড়া ভেঙে দ্রুত ঢুকে গেলো ওয়াশ রুমে।
____

সন্ধ্যা ছয়টা। কিয়ান সেই যে বেড়িয়েছে মাত্রই ফিরলো বাড়িতে।এসেই সবার আগে ঢুকলো কিচেনে। খুব যত্ন করে নিজের হাতে এক বাটি সুপ বানালো অনুর জন্য। তারপর সাথে করে নিয়ে আসা একটা ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে নিলো সুপের সাথে।

খুব সুন্দর করে সুপটা চামুচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে পৌছালো ডাইনিং টেবিলের কাছে।কিয়ানের আসার শব্দ পেয়ে নিচে নেমে এসেছে অনু নিজেও।

তবে আজ একটু ভিন্ন রকম লাগছে তাকে।জীবনে কখনো না সাজা মেয়েটা আজ মনের মাধুরি মিশিয়ে সেজেছে।গায়ে জড়িয়েছে লাল শাড়ি।কিয়ানের চোখের সবটুকু মুগ্ধতা কেড়ে নিতে নিজেকে সাজিয়েছে অনন্যা।

কিয়ানও থমকেছে।অনুর সম্পূর্ণ এক নতুন রুপ থমকে যেতে বাধ্য করেছে তাকে।আবেশিত করেছে তার পৌরষ্য।কেড়ে নেয়েছে তার সমস্ত মনযোগ।

অনু ধিরে ধিরে এগিয়ে এসে দাড়ালো কিয়ানের সামনে,দুরুদুরু বুকে জিজ্ঞেস করলো,

“কেমন লাগছে আমাকে?”

কিয়ান মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে আছে অনুর দিকে।লাল শাড়িতে কি নিদারুণ সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে,নেশা ধরিয়ে দেওয়ার মতো রুপে ভালো না লেগে উপায় আছে নাকি।

কিয়ান এক মূহুর্তের মধ্যে লক্ষভ্রষ্ট হলো, ভুললো তার উদ্দেশ্য।কেমন দিকভ্রান্ত পথিকের ন্যায় এগিয়ে গেলো অনুর কাছে,খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে খাপছাড়া কন্ঠে বললো,

“লাল শাড়ি পড়েছ কেন?”

অনু লজ্জায় গুল্মলতার ন্যায় নেতিয়ে গেলো,লঘু স্বরে বললো,

“আপনাকে পাগল করার জন্য।”

কিয়ান ঝুকলো অনুর মুখের দিকে,তারপর দু’হাতে পেচিয়ে নিলো অনুর কোমর, তারপর চট করেই এক টানে অনুকে তুলে নিলো নিজের দু পায়ের উপর। অনু কিয়ানের পায়ের উপর ভর করে দু’হাতে আঁকড়ে ধরলো কিয়ানের গলা।

কিয়ান চোখে চোখ রেখে আওড়াল,

“সফল হয়েছ?”

অনু কিয়ানের চোখের গভীরে তাকিয়ে আত্মবিশ্বাসি কন্ঠে বললো,

“আপনার চোখ বলছে আমি অলরেডি সফল।”

কিয়ান পিচলে হাসলো,নিজের কপালের সাথে অনুর কপাল লাগিয়ে নাকে নাক ঘষলো,মাদকিয় কন্ঠে বললো,

“মারাত্মক লাগছে তোমায়।”

ভালোলাগা আর খুশিতে অনুর মনের ভেতর ধৈধৈ করে নৃত্য শুরু হলো,লাজে রাঙা কন্ঠে বললো,

“এভাবে কেউ বলে নি।”

কিয়ানের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস আছড়ে পরছে অনুর তনু ত্বকে,অনু দিশেহারা হচ্ছে,সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কিয়ানের পাগলপনা,কিয়ান উন্মাদের মতো একাধিক চুম্বন আঁকতে শুরু করলো অনুর চোখে মুখে। সেখানেই স্থির নয়,অনুর এমন পাগল করা রুপ ধ্বস নামালো তার পৌরষ্যে,সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে নিজের স্পর্শ আরও নিখুঁত আর গভীর করতে শুরু করলো।ধিরে ধিরে সে নেমে এলো অনুর ঘাড়ের কাছে, অনু হাত তুলে খামচে ধরলো কিয়ানের চুল,কিয়ান থেমে নেই তার ঠোঁটের স্পর্শে অনুকে উন্মাদ করতে করতে বললো,

“তুমি সুন্দর আমি বললাম।খুশি?”

অনু ধিরে ধিরে নিজের হাতটা নামিয়ে রাখলো কিয়ানের হাতের উপর,তারপর কিয়ানের হাতটা টেনে এনে আস্তে করে রাখলো নিজের পেটের উপর।কিয়ানের খসখসে হাতটা অনুর পাতলা শাড়ি ভেদ করে তার মসৃন পেট স্পর্শ করতেই রুদ্ধশ্বাসে থমকে গেলো অনুর রক্তচলাচল,অনু পরম আবেশে চোখ বন্ধ করে চুপিসারে আওড়াল,

“মা ছানা দুজনেই খুশি।”

অনুর কথা কান পর্যন্ত পৌছাতেই ছলকে উঠলো কিয়ান,কিছু মূহুর্ত ভ্রমে ডুবে থাকা মস্তিষ্ক টা সজাগ হতেই এলোমেলো লাগলো সব,সৎবিৎ ফিরে পেতেই সবার আগে এক ঝটকায় সরিয়ে ফেললো অনুর পেটের উপর রাখা নিজের হাত।

কিয়ানের এমন অদ্ভুত অস্থিরতা তেমন একটা খেয়াল করে নি অনু,সে ডুবে আছে স্বপ্নিল রাজ্যে, তার তৈরি করা কল্পনার গভীরে,সে চুপচাপ দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো কিয়ানকে,গভীর আবেগ মাখা স্বরে বললো,

“আমি আপনাকে ভীষণ রকম ভালোবেসে ফেলেছি কিয়ান।তারচেয়ে বেশি যেটা করেছি সেটা হলো বিশ্বাস। আমি আপনাকে নিজের চেয়েও বেশি ভরসা করতে শুরু করেছি।আপনিও কি ভালোবাসতে পেরেছেন আমায়?ভুলতে পেরেছেন পিছুটান?”

কিয়ানের জবানে কথা নেই,রা রু কিচ্ছু বের হচ্ছে না কন্ঠ থেকে।কি বলবে সে?কি বলার আছে তার?মেয়েটাকে তো সে ভালোবাসে নি না,কান কালে বাসতেও পারে নি।ডক্টর কিয়ান নিজ স্বার্থ ছাড়া কাউকে ভালোবাসতে পারে না,আর যদি কাউকে ভালো বেসেও থাকে তবে সেটা কেবল নিস্পা, তার রুপাঞ্জেলকে। নয়তো তার ভালোবাসা আর কারো জন্য নয়।

এই মেয়েটা তার স্বার্থ,ভুলে ভ্রান্তিতে যেভাবেই হোক স্ত্রী যখন হয়েছে তখন নিজের হক আদায় করাটা একজন পুরুষের অধিকার।সে কেবল ছলেবলে কৌশলে নিজের অধিকার টুকু আদায় করেছে।পুরুষ হয়ে নারী দেহের মোহ কি করে এড়িয়ে যেত সে।

কিন্তু এখন এই মেয়েটার সময় শেষ।কৌশলে একে নিজের জীবনের থেকে আজীবনের জন্য বের করে দিতে পারলেই মুক্তি।আর সেই ব্যাবস্থাও করে ফেলেছে কিয়ান।

কিয়ান তার সরু দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকালো টেবিলের উপর রাখা সুপের বাটিটার দিকে, ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে রেখেছে সে,একবার এই খাবারটা খাওয়াতে পারলেই অনু ঘুমিয়ে পড়বে,আর ঘুমে চলে যাবে বিদেশ।কথাগুলো ভেবে জ্বিভে ঠোঁট ভেজালো কিয়ান,খরখরে কন্ঠে বললো,

“হ্যাঁ।ভুলে গিয়েছি।সমস্ত পিছুটান।”

অনু মুচকি হেসে আবার বললো,

“জানেন আজ না আমি খুব খুশি।এতো বেশি খুশি আমি জীবনে কখনোই হইনি।হবোই বা কি করে বলুন? আমার জীবনে তো কখনো এতো বেশি সুখও আসে নি।এই সন্ধ্যা টাকে আমি স্মরণীয় করে রাখতে চাই,যদি কখনো দুঃখ আসে, যদি কখনো খুব বিপদ আসে বা যন্ত্রণায় দমবন্ধ লাগে তখন চোখ বন্ধ করে এই রাতটাকে স্মরণ করবো,এই রাত এই সন্ধ্যা আর এই গোটা একটি দিন আমার জীবনের সবটুকু প্রাপ্তি আমাকে লিখে দিয়েছে,আমাকে শুধু আমাকেই।”

কিয়ান অনুর সব কথা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বললো,

“হুম।খেতে এসো আগে, তারপর বাকি সব।”

অনু নাকোচ করে বললো,

“খাবার পরেও খাওয়া যাবে।আগে চলুন না এই সময়টুকু আরও বেশি স্পেশাল করি।”

কিয়ান শুনলো না,তার মাথায় অন্য চিন্তা।যেভাবেই হোক ঘুমের ঔষধ টা খাওয়াতে হবে অনুকে।সময়ের মধ্যে তাকে ঘুম পাড়িয়ে পপৌঁছে দিতে হবে এয়ারপোর্টে।তাই সে কৌশলে বললো,

“এসব পরেও করা যাবে।তোমার উচিত আগে খাবার খাওয়া।সন্ধ্যা সাতটা বাজতে চললো হাল্কা নাস্তা খেতে হবে এখন।টাইম টু টাইম খাবার না খেলে কি করে হবে।”

কিয়ানের এমন যত্ন দেখে অনু ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলো,মুগ্ধ হয়ে বললো,

“বাব্বাহ!এখন থেকেই যত্ন শুরু?”

কিয়ান একটা মিথ্যা হাসি টেনে বললো,

“হ্যাঁ এখন থেকে নিজের যত্ন নিতে হবে।”

“আপনি তো দেখছি বাচ্চা নিয়ে আমার থেকেও বেশি এক্সাইটেড।”

“হ্যাঁ।খুব।”

কিয়ান দু’হাতে কোলে তুলে নিলো অনুকে, তারপর দ্রুত নিয়ে বসিয়ে দিলো টেবিলের উপর।অনু খুব খুশি।এই অল্প সময়ে কিয়ানের এমন যত্ন ভালোবাসা পেয়ে সে বাকে বার মুগ্ধ হয়।

কিয়ান তুলে নিলো সুপের বাটিটা, তারপর চামুচে করে একটু সুপ নিয়ে এগিয়ে নিলো অনুর মুখের সামনে,
“হা কর।”

অনু হা করতেই কিয়ান নিজের হাতে খাইয়ে দিলো সেই ঘুমের ঔষধ মেশানো সুপ।অনু পরম তৃপ্তিতে সুপটা মুখে দিলেও গিলে নেওয়ার সাধ্য তার হলো না,একটা আষ্টে গন্ধ সোজা ঢুকে গেলো তার পেটের ভেতর,পেটটা মুচড়ে উঠতেই মুখে হাত চেপে ধরলো অনু,কিয়ানকে ঠেলে সরিয়ে দৌড়ে চলে গেলো বেসিনের দিকে।

গড়গড় করে মুখ ভরে বোমি করলো অনু,বোমির সাথে মাথাটাও ঘুরে উঠলো পুরো পৃথিবী হেলিয়ে দুলিয়ে।কিয়ান বুঝে উঠতে না পেরে এগিয়ে এলো, ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“কি হলো? আর ইউ ওকে?”

অনু অস্থির কন্ঠে বললো,

“খাবারে প্রচুর গন্ধ,মুখে তুলতে পারছি না আমি।”

ভেতর ভেতর কিয়ানের রাগ হলো প্রচুর,একরাশ বিরক্তি কোনপ্রকার ধামাচাপা দিয়ে বললো,

“এসময়ে এমন হবেই।চলো আবার খাবে।”

“উহু,আমি কিছুতেই আর খাবো না।”

“তোমাকে খেতে হবে।চল।”

অনু অনুরোধ করে বললো,

“প্লিজ প্লিজ,জোর করবেন না, আমি সত্যিই এই খাবারটা খেতে পারবো না।”

কিয়ান চুপ করে থেকে কিছু একটা ভাবলো,তারপর শান্ত কন্ঠে বললো,

“আচ্ছা এখানে দাড়াও আমি তোমার জন্য পানি নিয়ে আসছি।”

“হ্যাঁ সেটাই করুন।”

কিয়ান দ্রুত এগিয়ে গেলো টেবিলের কাছে,টেবিলের উপর থেকে একটা গ্লাস নিয়ে পানি ঢেলে নিলো,তারপর সতর্ক দৃষ্টিতে অনুর দিকে তাকিয়ে একটা ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে নিলো পানিতে।

পানির গ্লাসটা নিয়ে এসে বাড়িয়ে দিলো অনুর দিকে,
“নেও।”

অনু একটা মুচকি হাসি দিয়ে হাতে নিলো গ্লাসটা,তারপর ঢকঢক করে শেষ করলো গ্লাসের সবটুকু পানি।অনেক বড় একটা দায়িত্ব কাধ থেকে নামানোর মতো করে একটা শ্বাস ফেললো কিয়ান।অনু গ্লাসটা কিয়ানের হাতে দিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখটা মুছতে মুছতে বললো,

“এবার একটু ভালো লাগছে।”

কিয়ান কোন কথা না বলে পাজাকোলে তুলে নিলো অনুকে, তারপর সোফায় এনে বসিয়ে দিয়ে বললো,

“বোমি করেছ, বসে একটু রেস্ট কর।আমি আসছি।”

“কোথায় যাচ্ছেন?রেস্ট করতে হবে না, আমাকে নিয়ে একটু ছাদে চলুন না, আজ চাঁদ উঠেছে, আপনার কাঁধে মাথা রেখে সারা রাত চাঁদ দেখবো আমি।”

“নিয়ে যাবো।দু মিনিট চুপ করে বসে রেস্ট নেও।আমি আসছি।ওকে?”

“আচ্ছা।আসবেন কিন্তু। আজ কোত্থাও যাবেন না আপনি।”

“ওকে।”

অনুকে বসিয়ে রেখেই হনহনিয়ে ছাদে চলে গেলো কিয়ান,তারপর পকেট ঠেকে ফোন বের করে মেসেজ টাইপ করলো দ্রুত গতিতে,

“সব ঠিকঠাক?”

মেসেজ সেন্ড করা মাত্রই রিপ্লাই এলো সেকেন্ডের গতিতে,

“নয়টায় ফ্লাইট।আমাদের লোক এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছে।”

“ওকে আমি এক ঘন্টার মধ্যে আসছি।”

মেসেজটা সেন্ড করেই ফোন পকেটে ঢুকিয়ে নিলো কিয়ান।ঠিক যেভাবে ছাদে এসেছিলো, সেভাবেই নামলো হনহনিয়ে।

ততক্ষণে অনু ঘুমিয়ে পড়েছে।ঔষধ কাজ করা শুরু করে দিয়েছে।লাল শাড়ি পড়ে মেয়েটা আদুরে বাচ্চার মতো শুয়ে আছে,কি সুন্দর স্নিগ্ধ লাগছে দেখতে।কিয়ান কিছু মূহুর্ত ধ্যান দিয়ে তাকিয়ে থাকে অনুর ঘুমন্ত মুখের দিকে,তারপর চুপিসারে এসে শুখনো একটা চুমু খায় অনুর কপালে,বিরবির করে আওড়ায়,

“সরি বেইব।আই এম এক্সট্রেমলি সরি।”

________

সকাল নয়টা।ঘুমঘুম চোখ খুলে বিছানা থেকে উঠে বসলো ইভান।মাথাটা ঝিম ধরে আছে,ঘুম ঘুম একটা ভাব লেগে আছে চোখে মুখে।ভারি হয়ে আছে চোখের পাতা,ঘোর কাটে নি এখনো।

কাল রাতে চিত্রার বাড়িতে এসেছিলো সে,তারপর খাবার খেয়ে বেশ অনেক্ষন গল্পও জুড়েছিলো চিত্রার সাথে,কিন্তু আর কিছু মনে পড়ছে না,চিত্রার বাড়ি
বেড়িয়েছিলো কিনা তাও মনে পড়ছে না।

ভাবনার মাঝে কয়েকটা হাই তুললো ইভান,পরক্ষণেই চোখ গেলো ফ্লোরে হাটু মুড়ি দিয়ে বসে থাকা চিত্রার দিকে।

চিত্রার পড়নে একটা কালো ইনার আর সেলোয়ার।আর কিচ্ছু নেই শরীরে।মেয়েটা কাঁদছে,কান্নার তোপে ঝাকাচ্ছে তার অর্ধ উন্মুক্ত শরীর।চিত্রার এমন অবস্থা দেখে ইভানের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো, থরথর করে কেপে উঠলো তার শরীর। একটু খেয়াল করতেই দেখতে পেলো তার শরীরও নগ্ন।নগ্ন শরীরের উপর একটা চাঁদর ছাড়া কিচ্ছু নেই।ইভান ভাবতে পারলো না বেশি কিছু,ভয়ে গলবিল শুকিয়ে কাঠ হয়ে এলো তার,বিছানার চাদর টা লুঙ্গির মতো করে কোমরে বেধে নেমে এলো বিছানা থেকে,তোতলে তোতলে ডাকলো,

“চি,,চিত্রা!”

চিত্রা কাঁদছে,ইভানের ডাকে কোন সাড়াশব্দ করলো না সে,ইভানের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে দুশ্চিন্তায়, সে ভয়ে ভয়ে নিজের হাতটা এগিয়ে নিয়ে রাখলো চিত্রার কাঁধে,আতংকিত কন্ঠে আবার ডাকলো,

“চিত্রা?আর ইউ ওকে?ঠিক আছো তুমি?”

চিত্রা এবারেও টু শব্দ টি করলো না,না তো তাকালো ইভানের দিকে।অপরাধ বোধে ছাড়খাড় হয়ে যাচ্ছে সে।এই মিথ্যা নাটক আর কতক্ষণ চালাতে হবে ভাবতেই দম বন্ধ হয়ে আসছে তার।

ইভান আর তার মাঝে কিছুই হয় নি।এটা শুধু একটা সাজানো নাটক।জেসমিন বেগম যেমনটা শিখিয়ে দিয়েছে কলের পুতুলের মতো তেমনটাই করছে সে।কাল রাতে খাবারের সাথে ড্রা/গ মিশিয়ে ইভানকে ধরাশায়ী করতে সক্ষম হয়েছে কোনভাবে।

চিত্রার কোন উত্তর না পেয়ে ইভান কাঁপা স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

“কাঁদছো কেন চিত্রা?আর,আর উত্তর দিচ্ছো না কেন?”

এতোক্ষণে মাথা তুলে ইভানের দিকে তাকালো চিত্রা,অনুশোচনা, অপরাধবোধ গলা চেপে ধরলো তার,ইভানের বিভ্রান্ত সরল মুখটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠলো অসহায়ের মতো।

ইভান ভেতরকার উৎকন্ঠা চেপে রাখতে সক্ষম হলো না,আকুল কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“তোমার এই অবস্থা কেন? কি হয়েছে চিত্রা?কাল রাতে কি হয়েছিলো”আমার কিচ্ছু মনে পড়ছে না।”

চিত্রা দু’হাতে নিজের অপরাধী মুখটা আড়াল করার প্রচেষ্টা চালিয়ে বললো,

“সব শেষ।সব শেষ ইভান।”

ইভান দু’হাতে শক্ত করে চেপে ধরলো চিত্রার দুই গাল চিত্রার মুখটা নিজের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে বললো,

“আরে কেঁদেই যাচ্ছো তো কেঁদেই যাচ্ছো।কি হয়েছে সেটা তো বল।টেনশন হচ্ছে আমার।”

চিত্রা হেচকি তুলতে তুলতে বললো,

“আমাকে এ অবস্থায় দেখে কি আপনি কিচ্ছু বুঝতে পারছেন না?”

ইভান এক ঝটকায় চিত্রার গালের উপর থেকে সরিয়ে নিলো নিজের হাত,আহত কন্ঠে বললো,

“বুঝতে তো পারছি অনেক কিছু, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারছি না।”

“আপনি কাল রাতে এমন কেন করলেন ইভান?আমি তো সরল মনে আপনাকে ইনভাইট করেছিলাম,আপনি জোর করে,,,,,,,।”

এমন ভয়ংকর মিথ্যা কিছুতেই বের হলো না চিত্রার জবান থেকে, তাই সম্পূর্ণ শেষ না করেই কেঁদে উঠলো হাউমাউ করে।

এদিকে পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেলো ইভানের,শরীর টা কেঁপে উঠলো বিদ্যুৎস্পষ্টের ন্যায়।সে ছিটকে দূরে সরে বসলো চিত্রার কাছ থেকে কম্পিত কন্ঠে অনর্গল বিরবির করে আওড়াল,

“আমি,আমি কেন?কিভাবে? আমার কিচ্ছু মনে পড়ছে না কেন?”

চিত্রা নিজের কপাল মেঝেতে ঠুকতে ঠুকতে বললো,

“আমি জানিনা, কিচ্ছু জানিনা।”

চিত্রার এমন পাগলামি দেখে হামাগুড়ি দেওয়ার মতো করে এগিয়ে এলো ইভান,চিত্রার বাহু শক্ত করে ধরে বললো,

“কুল ডাউন। কুল ডাউন চিত্রা।শান্ত হও প্লিজ।”

“আমার সব শেষ ইভান।কি করে শান্ত হবো আমি?আমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো এতোকিছুর পর আমি কি করে বিয়ে করবো?কে করবে আমাকে বিয়ে?

পরিস্থিতি জটিল, মস্তিষ্কের সাথে সংঘর্ষ বেধে গিয়েছে ইতমধ্যে। ইভান ভেবে পেলো না কি করবে,এমন একটা মূহুর্তে দাঁড়িয়ে ভাবনা চিন্তা লোপ পেয়েছে তার।নিজের পাপের জন্য বড্ড গ্লানি হচ্ছে ভেতর ভেতর, তাই নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য শ্বাস আঁটকে অবরুদ্ধ কন্ঠে বললো,

” আমি, আমি। ডোন্ট ওয়ারি।আমি তোমাকে বিয়ে করবো।”

চিত্রা স্থবির হয়ে গেলো।অবশেষে তার মিথ্যা নাটকটা পুরো পুরি ভেঙে চুড়ে দিয়েছে মানুষটাকে।কিন্তু এটা তো চায় নি, কিছুতেই চায় নি মানুষ টাকে ছলনায় ফাসাতে।না চাইতেও করতে হলো,সে বলতে পারলো না সত্যটা।

অনু ইভানের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে কথাগুলো ভাবছে,ইভান নিরুপায়, উঠে গিয়ে একটা ওড়না এনে ঢেকে দিলো চিত্রার অর্ধ নগ্ন শরীর,অপরাধী কন্ঠে বললো,

“বিয়ে করবে?বিয়ে করবে আমাকে?”

বলার মতো আর কিচ্ছু রইলো না অনুর।একটু পর পর থেমে থেমে হেচকি তুলছে সে, আর দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে ইভানের মুখের দিকে।
____

সকাল সকাল ডাইনিং এ নাস্তা রেডি করছে সে।পনেরো দিন হলো এমপি মশাই এর বাড়ি থেকে ফুলমতিকে নিয়ে এসেছে সে।তাই প্রতিদিনই সকাল সকাল উঠে নাস্তা বানাতে হয় তার,বৃদ্ধ মানুষ নিশ্চয়ই ঘুম ভাঙলেই খিদে পেয়ে যায়।

নিস্পা মন দিয়ে নাস্তা বানাচ্ছে এমন সময় পেছন থেকে তার কোমরটা লতার মতো পেচিয়ে ধরলো ত্রিজয়,তারপর আদুরে নাক ঘষতে শুরু করলো নিস্পার ঘাড়ে,নিস্পা মুচড়া মুচড়ি শুরু করলো, ত্রিজয়ের হাত থেকে নিস্তার পেতে বললো,

“কি করছেন?ছাড়ুন।”

ত্রিজয় ছাড়লো না, বরং কায়দা করে নিস্পাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বললো,

“পিরিয়ড মিস করেছে এই মাসে?”

নিস্পা কপাল কুচকে জিজ্ঞেস করলো,

“কেন?”

ত্রিজয় একটা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললো

“দুমাস আগে থেকে ডাউনলোডের কাজ করছি এখনো কেন হচ্ছে না তাই টেনশনে আছি।”

“এতো টেনশনের কি আছে?”

“টেনশনের কি আছে মানে?সার্ভারে সমস্যা আছে কিনা চেক করতে হবে না?”

ত্রিজয়ের এমন বেশরম কথায় কটমট করে তাকালো নিস্পা,বিরক্তি প্রকাশ করে বললো,

“এতো আজাইরা কথা কোথায় পান আপনি?”

ত্রিজয় পাত্তাই দিলো না নিস্পার ওমন চোখ রাঙান, বরং আহ্লাদী কন্ঠে বললো

“প্রেগ্ন্যাসি কিট আনবো?টেস্ট করে দেখবে একবার?”

নিস্পা সরাসরি বারন করে বললো,

“উহু।”

“কেন?”

“এমপি মশাই ফিরেছেন?”

“না।”

“উনি ফিরলে টেস্ট করবো।”

“উনার সাথে আমাদের কি সম্পর্ক?”

নিস্পা থ মেরে গেলো, তারপর মুমূর্ষু কন্ঠে বললো,

“অপরাধবোধ। ভীষণ অপরাধবোধে মন মস্তিষ্ক পুড়ে যাচ্ছে,এই অবস্থায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় খুশির খবরটাও আমাকে খুশি করতে পারবে না।সব খুশি ফিকে হয়ে যাবে।”

রাগে ভেতর ভেতর ফুসে উঠলো ত্রিজয়, তবে প্রতিক্রিয়া দেখালো না, নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা চালিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“তাহলে কি চাইছো তুমি?”

“এমপি মশাই ফিরে আসুক।আমাকে ক্ষমা করুক।আর এই অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করুক।ততদিন পর্যন্ত না হয় সব খুশি জমা থাকুক।একসাথে উদযাপন করবো।”

ত্রিজয় উঠে দাড়ালো, নিস্পার মতামতকে সম্মান জানিয়ে অত্যন্ত সিরিয়াস ভঙিতে বললো,

“তবে তাই হোক।ততদিন পর্যন্ত আমারও ইয়োগা চলতে থাকুক।”

নিস্পা নাক কুচকে তাকালো,তপ্ত কন্ঠে বললো,

“সিরিয়াস কথার মধ্যে আপনি বেহায়ামি বন্ধ করবেন না তাইনা?”

ত্রিজয় এগিয়ে এসে চেপে ধরলো নিস্পার কটিদেশের উপরের অংশ,তারপর ঠোঁট উল্টে বললো,

“কি করলাম আমি আবার?”

নিস্পা চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“আপনার হাত কোথায় এডভোকেট ত্রিজয় তেজ?”

“আমার আঙুল যেখানে হাতও সেখানে।”

ত্রিজয়ের এমন এমন ভন্ডামি কথায় নিস্পা ভীষণ চটে গিয়ে বললো,

“আপনার সাথে শব্দ অপচয় করাই পাপ।”

“আমি সেই পাপ কাজ করেই হতে চাই বাপ।”

নিস্পার কথার প্রত্যুত্তরে ত্রিজয়ের এমন ছন্দ মেলানো নির্লজ্জ উত্তরে এরেকটু ক্ষেপলো নিস্পা, ক্ষোভ প্রকাশ করে বললো,

“আপনি শোধরাবেন না তাইনা?”

“শোধরাব, তার আগে চাই এক ডজন ছানা।”

নিস্পা তিক্ত বিরক্ত হয়ে গিজগিজিয়ে বললো,

“আমার মেজাজ খারাপ করে কি সুখ পান?”

“শরীর চর্চার সময় যেই সুখ দেয় তোমার আহ! উহ! গান।”

নিস্পা টেবিলের উপর থেকে একটা ফল কাটার ছুরি উঠিয়ে তেড়ে গেলো ত্রিজয়ের দিকে,অগ্নিশর্মা কন্ঠে বললো,
“আমি কিন্তু সত্যি রেগে গিয়েছি।”

“একটা চুমু দেও, তোমার রাগের উত্তাপ থেকে বাঁচি।”

“নির্লজ্জ বেহায়া বেডা।”

“কাপড় খুল,,,,

পুরো বাক্য টুকু সম্পূর্ণ করার আগেই কলিং বেলের শব্দ ভেসে এলো উচ্চস্বরে,পরমুহূর্তেই হাক ছেড়ে ডাকলো ইভান,

” স্যার আসবো?”

নিস্পাকে একটু বাগে আনতে চাওয়ার সুযোগ টা হাত ছাড়া হতেই বিরক্তি সূচক শব্দ করলো ত্রিজয়।নিস্পাকে টুপ করে একটা চুমু খেয়ে বললো,

“রাতে দেখে নিচ্ছি তোমায়।”

তারপর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ইভানের উদ্দেশ্যে গলা ছেড়ে বললো,

“হ্যাঁ হ্যাঁ ইভান।এসো।”

দ্রুত পায়ে ভেতরে এসে দাড়ালো ইভান।প্রতিবার আসলে নিস্পাকে ছোট্ট করে সালাম দিতো সে,কিন্তু আজ আর দিলো না,চুপসানো মুখটা নতজানু করে দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ।

নিস্পার উপস্থিতি যে ইভানকে কথা বলা থেকে রুখে দিচ্ছে সেটা বেশ৷ বুঝতে পেরেছে নিস্পা। তাই কৌশলে দুজনকে স্পেস দিয়ে চলে যেতে যেতে বললো,

“আপনারা কথা বলুন আমি চা করে আনছি।”

নিস্পা চলে যেতেই একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো ইভান।কিন্তু মুখ থেকে একটা কথাও বেড়োলো না তার।সারাক্ষণ এক লাইন বেশি বলা ছেলেটার হটাৎ এমন চুপ থাকাটা ভীষণ চোখে পড়লো ত্রিজয়ের,এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,

“কি ইভান?চোখ মুখের এই অবস্থা কেন?”

“স্যার আমার একটা কথা ছিলো।”

ইভান কয়েকবার শুখনো ঢোক গিলে ইনিয়েবিনিয়ে কথাটা বলতেই আগ বাড়িয়ে ত্রিজয় বলে উঠলো

“আগামী একবছরে ব্যাংক থেকে এক টাকাও উইথড্র করতে পারবো না ইভান।বাচ্চা গাচ্চার জন্য সঞ্চয় করছি।”

ইভানের মুখটা দপ করেই নিভে গেলো,ত্রিজয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নিশপিশ করতে করতে বিরবির করলো,

“শালা কিপ্টা আগে আমার কথাটা তো শুনবি।”

ইভানের বিরবিরানি শুনতে পেলো না ত্রিজয়,তাই নিজ থেকেই জিজ্ঞেস করলো,

“চুপ করে আছো যে?”

ইভান থমথমে কন্ঠে বললো,

“আপনি আমাকে বলার সুযোগ দিচ্ছেন না স্যার।”

“তুমি তো সুযোগের আগেই মুখ চালাও।আজ এতো চুপচাপ কেন?”

“আমি বিয়ে করবো স্যার।”

আচমকা ইভানের কথা শুনে মুখের রঙ পাল্টালো ত্রিজয়, হজম করতে না পেরে বললো,

“জোক্স!”

“আমি সিরিয়াস স্যার।”

ইভানের কথায় কি বলবে বুঝতে পারছে না ত্রিজয়,অনুকে যে সে পছন্দ করে সেটা আগে থেকেই যানে ত্রিজয়, কিন্তু ডক্টর কিয়ানের সাথে বিয়ে করার পর ঘটনাটা তো অন্যদিকে মোড় নিয়েছে,আর এখনও যদি ইভান অন্যের বউকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে তাহলে তো তার নাক কাটা যাবে।তাই ত্রিজয় ইভানকে উদ্দেশ্য করে বললো,

“আরেকজনের বউকে বিয়ে করার রুচি তুমি দেখাবে আমি ভাবতে পারি নি ইভান।তাও কিনা ডক্টর কিয়ানের ওয়াইফ।”

ইভানের দৃষ্টি তার পায়ের জুতোর দিকে,সে রোবটের মতো বললো,

“মেয়েটা অনু নয় স্যার।”

ত্রিজয়ের দুই ভ্রু কুচকে এলো,ভ্রুকুটি তুলে বললো,

“তাহলে?”

“চিত্রা।”

“হোয়াট!”

বিস্ফোরিত নয়নে ইভানের দিকে তাকালো ত্রিজয়।এমন একটা ধামাকা পাবে হয়তো আশাই করে নি সে।

ইভান চুপচাপ অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। ত্রিজয় সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“কিভাবে?”

ইভান ছোট্ট শব্দে প্রত্যুত্তর করলো,

“রুচি চেঞ্জ।”

ত্রিজয় ঠোঁট উল্টে বাহবা দিয়ে বললো,

“রুচি চেঞ্জের সাথে সাথে তো দেখি রুচি মানসম্মতও করে ফেলেছ ইভান।”

“মানে?”

“সোজা কিনা এমপির পিএ কে বিয়ে করবে?তারমানে তো তোমার বিয়ের সব খরচ এমপি মশাই-ই বহন করবে।নিজের পিএ বলে কথা।”

ত্রিজয়ের মহাকাশ জয়ি ভাবনাচিন্তায় রীতিমতো ভ্যাবাচেকা খেলো ইভান।এদিকে ত্রিজয় প্রসন্ন হয়ে নিশ্চিন্তে বললো,

“তুমি আমায় চিন্তামুক্ত করলে ইভান। বিয়ের জন্য কতগুলো টাকা খরচ করতে হতো বলতো।”

ইভান দাঁতে দাঁত পিষল,চিবিয়ে চিবিয়ে আওড়াল,

“শালা কিপ্টা তোর টাকা ইঁদুরে খাবে দেখিস।আমি মরে যাচ্ছি আমার চিন্তায় আর শালা পরে আছে টাকা নিয়ে।”

_____

সেদিনের আগুন লাগার পর বিদেশে চলে এসেছে তাকরিম।আর এক মূহুর্ত দেশে থাকতে ইচ্ছে করে নি তার।সেখানকার হাওয়ায় শুধু ব্যার্থতার গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছিলো, পাগল করে দিচ্ছিলো তাকে।বিষাক্ত গ্যাসে দগ্ধ করছিলো তার হৃদপিন্ড।
তাই নিরুপায় হয়ে দেশ ছেড়েছে সে,নিস্পার স্মৃতি থেকে পালিয়ে বাচার চেষ্টা চালাচ্ছে সর্বক্ষন।

পালিয়ে এসেও লাভ হলো কি? নিস্পার স্মৃতি তো শুধু বাতাসে নয় তার মস্তিষ্কে আর আত্মার অস্তিত্বে মিশে আছে, সব কিছু থেকে পালালেও এই দুটো থেকে কিভাবে পালাবে সে? কিভাবে ভুলে থাকবে নিস্পাকে?এই যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে একের পর এক সিগারেট টানতে টানতে অস্থির হয়ে আসা ঠোঁট দুটো এখনো জপছে একটি নাম, নিস্পা, নিস্পা, শুধু আলেকজান্দ্রা।

তাকরিমের ধ্যান ভাঙলো রুমের ভেতর থেকে ভেসে আসা উচ্চ শব্দের রিংটোনে,তাকরিম সিগারেট টা ফেলে দিয়ে ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরলো,

“হ্যালো।”

“কিরে বাবা কোথায় তুই?এতোগুলো দিন হয়ে গেলো এবার অন্তত ফিরে আয়।”

ওপাশ থেকে জেসমিন বেগমের ভেজা কন্ঠ কানে আসতেই বুকের ভেতর টা টনটন করে উঠলো তাকরিমের,নিস্প্রান কন্ঠে বললো,

“ভালো লাগছে না মা।সময় হলে আমি নিজেই চলে আসবো।”

“কিন্তু বাবা এখানে তোকে অনেক প্রয়োজন। তোর অবর্তমানে অনেক কিছু ঘটে গিয়েছে।”

“কি?”

“চিত্রা আর ত্রিজয় তেজের পিএ বিয়ে করছে।”

“হোয়াট! ”

খবরটায় বেশ অনেকটা চমকেছে তাকরিম।চমকের দরুন কণ্ঠনালী থেকে বেড়িয়ে এসেছে অস্পষ্ট শব্দ।
জেসমিন বেগম উদ্বেগ নিয়ে বললো,

“হ্যাঁ বাবা।তুই দেশে ফিরে আয়।তোকে আমি সব বুঝিয়ে বলবো।”

তাকরিম তেমন একটা প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে অভিব্যক্তি বিহীন বললো,

“ফেরার প্রয়োজন নেই।ওরা বিয়ে করবে আমার কি কাজ সেখানে?”

জেসমিন নাছোড়বান্দা, তাকরিমকে দেশে ফেরানোর জন্য নানাভাবে বোঝাতে শুরু করলো,

“তোর কি কাজ মানে? চিত্রা তোর পিএ।ওর বিয়ের এরেঞ্জমেন্ট তুইই তো করবি।মেয়েটার দুকূলে তুই ছাড়া তো কেউ নেই।”

“আমি জেসিকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।আর কত টাকা লাগবে খরচ করো।”

“তার মানে তুই আসবি না?”

“আরও কিছুদিন পর।”

“তোকে আমার কসম তাকরিম।তুই জেসিকে সাথে নিয়ে কালকের মধ্যেই দেশে ফিরবি।”

“ছেলেমানুষী করছো কেন?”

“তুই আসবি কিনা বল।”

তাকরিম ঠিকঠাক উত্তর খুঁজে পেলো না,বেশ অনেক্ষন চুপ করে থেকে গুমোট কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“আলেকজান্দ্রা এসেছিলো?”

“হ্যাঁ এসেছিলো, এসে ওর বুড়ো দাদিকে নিয়ে গিয়েছে।”

তাকরিম তার খসখসে জ্বিভের আগা দিয়ে গাল ঠেলে চাপা স্বরে বললো,

“কিছু বলেছিলো?আমার কথা?”

এতোক্ষণে টনক নড়লো জেসমিনের,শয়তানি বুদ্ধি এটে ইনিয়ে৷ বিনিয়ে বললো,

“হ্যাঁ, তোর খবরও জিজ্ঞেস করেছিলো,তোর সাথে যোগাযোগ করার জন্য তোর ফোন নাম্বার চেয়েছিলো আমি দেই নি।”

তাকরিমের ভেতরা বয়ে গেলো একরাশ প্রশান্তি।সে চোখ বন্ধ করে হারালো আলেকজান্দ্রার কল্পনায়।তাকরিমের উত্তর না পেয়ে তাড়া দেখালো জেসমিন শঙ্কিত কন্ঠে বললো,

“কিরে কথা বলছিস না যে?”

“আমি দেশে ফিরছি।”

অপরপাশ থেকে ভেসে এলো তাকরিমের রুদ্ধশ্বাস মিশ্রিত গমগমে স্বর।
____

পরের দিন।সময় গড়িয়ে দুপুরের শেষ ভাগ।সূর্য হেলে পড়েছে।গাছের নিচে রাজত্ব বিস্তার করেছে ছায়ারা।দুপুরের খাবার খেয়ে ভাত ঘুম দিয়েছে নিস্পা আর ত্রিজয়।যদিও ঘুমের ছিটেফোঁটাও নেই তাদের চোখে।বিছানায় শুয়েছে পর্যন্ত ত্রিজয় চোখ বোজার জো অব্দি দেয় নি নিস্পাকে।

দুপুরে গোসল সেরেই শুয়েছিলো মেয়েটা,অগত্যা এখন আবারও যেতে হয়েছে গোসলে।মাত্রই ওয়াশরুম থেকে বেড়োলো,বেড়িয়েই দেখতে পেলো ত্রিজয় তার দিকে তাকিয়ে বত্রিশ টা দাঁত বেড় করে হাসছে।ওমনি মেজাজ চটে গেলো নিস্পার ষাড়ের যেই না তেড়ে গেলো ত্রিজয়ের দিকে তক্ষুনি ভেসে এলো বাড়ির কলিং বেলের আওয়াজ।

একবার নয় দুবার নয় আওয়াজটা অনবরত বাজতেই লাগলো।নিচে কেউ এসেছে ভেবে নিস্পা তড়িঘড়ি ছুটলো নিচে।ব্যাস্ত হাতে দরজা খুলতেই অবাক হলো খুব।নিস্পার সামনে দাঁড়িয়ে আছে চল্লিশ পয়তাল্লিশ বছর বয়সী একজন মহিলা।বেশভূষা দেখে মনে হচ্ছে মহিলা প্রেগন্যান্ট।পেট প্রায় অনেকটাই ফুলো।এমন বয়সে কেউ বাচ্চা নেয় দেখে ভেতর ভেতর একটু হাসিই পেলো নিস্পার, পরক্ষণেই গভীর ভাবে তাকালো মহিলার মুখের দিকে,মনে হলো এর আগেও কোথাও একটা দেখেছে কিন্তু কোথায় দেখেছে মনে করতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো,

“কে?কে?আপনি?”

মহিলা উত্তর দেওয়ার আগেই পেছনে এসে দাড়ালো ত্রিজয়,

“কে এসেছে কলিজা?”

“কিজানি।দেখুন না চেনা লাগছে কিন্তু কোথায় দেখেছি মনে করতে পারছি না আমি।”

ত্রিজয় এগিয়ে এসে মুখোমুখি দাড়ালো এবার,স্পষ্ট দেখতে পেলো মহিলের মুখ,অবাক হয়ে আওড়াল,

“আপনি?”

(বৃদ্ধা কে হতে পারে গেস করুন।ফ্রি আছি কয়েকদিন। নূন্যতম 500 কমেন্ট আর এক হাজার রিয়েক্ট হলে আজকে রাতের মধ্যেই লেখা শুরু করবো)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here