হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পর্বঃ69

0
34

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্বঃ69

“আমি রেহানা স্যার। মনে আছে আমি আমার স্বামীর হত্যার বিচার চাওয়ার জন্য কত আইছিলাম।”

মহিলাকে খুব ভালোই মনে আছে ত্রিজয়ের,অথচ চেহারার গম্ভীর্যতায় একটুও বুঝতে দিলো না সে কথা,বরং খুব কষ্ট করে মনে করার ভঙিমায় বললো,

“হ্যাঁ। হ্যাঁ।এমপি মশাইয়ের কেসটাই তো?”

মহিলার চোখ টলমল করে উঠলো, উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে দ্রুত কন্ঠে বললো,

“হ স্যার।আমি সেই।”

তারপর নিজের পেছন থেকে একটা অন্তঃসত্তা রুগ্ন দেখতে মেয়েকে টেনে এনে বললো,

“আর, আর এই যে এটা আমার মাইয়া।”

নিস্পা আর ত্রিজয় দুজনেই কৌতুহলি দৃষ্টিতে তাকালো মেয়েটির দিকে।ছিপছিপে গৌর বর্ণের মেয়েটার চোখের নিচে পড়েছে কালসিটে দাগ,ফুলে থাকা পেট টা শীর্ণ দু’হাতে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে।

নিস্পা প্রায় বেশ কিছুক্ষন মেয়েটার পানে তাকিয়ে থেকে কৌতুহলি নয়ন ঘোরালো ত্রিজয়ের দিকে।ত্রিজয়ের চোখেমুখে এখনও গম্ভীরতা,সে মহিলাকে উদ্দেশ্য করে বললো,

“আপনি এখন কোত্থেকে এসেছেন?আপনাকে যখন দরকার পড়েছিল তখন আপনাকে খুঁজে না পেয়ে কেস ফাইল বন্ধ করে দিয়েছি আমি।”

ত্রিজয় কথাটা বলতেই কাপড়ের আঁচল মুখে চেপে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো মহিলা,চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বললো,

“আমি আইতেই লইছিলাম স্যার।কিন্তু আসার পথে কয়েকটা পোলা আমার রাস্তা আটকাইয়া আমার মাইয়ারে,,,,,,,, ”

মহিলার কান্নার সাথে সাথে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে ডুকরে উঠলো পাশে দাড়ানো মেয়েটিও।এক দূর্ধর্ষ খারাপ স্মৃতি মনে আসতেই প্যানিক এট্যাক হলো বোধহয়।বুকে হাত চেপে কেমন যেন অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করলো মেয়েটা,চোখ উল্টে মুখ হা করে নিঃশ্বাস নিতেই কুচকে এলো নিস্পার মুখ,ঘটনা সম্পর্কে আন্দাজ করতে পেরে ধড়ফড়িয়ে বলে উঠলো,

“থামুন থামুন।আপনার মেয়ের অবস্থা তো সুবিধার নয় দেখছি।

কথাটা বলতে বলতেই নিস্পা এগিয়ে গিয়ে দু’হাতে আগলে নিলো মেয়েটাকে,ত্রিজয়কে উদ্দেশ্য করে তাড়াহুড়ো গলায় বললো,

“হেল্প করুন,বিছানায় শোয়াতে হবে মনে হচ্ছে। ”

মেয়েটার অবস্থা বেগতিক দেখে চুপ থাকতে পারলো না ত্রিজয়ও,নিস্পার কথামতো দু’হাতে পাজাকোলে তুলে নিলো মেয়েটাকে,তারপর দ্রুত পায়ে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলো নিস্পার আগের ঘরটায়,বিয়ের পর নিস্পা যে ঘরে প্রথম থেকেছিল আপাতত সে ঘরেই শোয়ানো হলো।

মেয়েটাকে ট্রমা থেকে বের করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বেশ বেগ পোহাতে হলো সবার,উপায়ন্তর না পেয়ে ডক্টর ডেকে দেওয়া হলো ঘুমের ইঞ্জেকশন।

ভয়, উদ্বেগ আর আতংকে হাসফাস করতে থাকা মেয়েটা শান্তিতে চোখ বন্ধ করলো কিছুক্ষণ হয়েছে।মেয়েটির মা রেহানা কেঁদেই যাচ্ছে তখন থেকে।

মেয়েটাকে একা ঘুম পাড়িয়ে রেখে ত্রিজয় আর নিস্পা রেহানাকে নিয়ে নেমে এসেছে নিচতলায়।রেহানাকে সোফায় বসিয়ে ত্রিজয় এক গ্লাস পানি খেতে দিলো প্রথম, তারপর ধীরেসুস্থে জিজ্ঞেস করলো,

“হ্যাঁ এবার বলুন,আপনি এতোদিন কোথায় ছিলেন?”

চোখের পানি শুকিয়ে গিয়েছে রেহানার,নাক টানছে কিছুক্ষণ পরপর,হেচকিও তুলছে মাঝে মাঝে,ত্রিজয়ের প্রশ্নের ঠিকঠাক জবাব গুছিয়ে বলতে পারলো না সে,এলোমেলো জবাবে বললো,

“আমার এই ছোট্ট মাইয়াডা ধ/র্ষ/নে র শিকার হইছে স্যার।লোক লজ্জার ভয়ে কয়দিন বাইরে বাইড়াইতে পারি নাই।আর তার কয়দিন পর বুঝতাম পারি আমার মাইয়ার পেটে বাচ্চাও আইয়া পড়ছে।”

ঘটনা আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিলো নিস্পা,তাই এসব বিষয় নিয়ে কথা আগাতে চাইলো না সে,সাবলীল কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“কতমাস চলছে এখন?”

মহিলা কাপড়ের আঁচলে নাক মুছতে মুছতে বললো,

“জানিনা মা।তয় ডেলিভারির সময় মনে হয় ঘনিয়া আইছে।”

নিস্পা একবার তাকালো ত্রিজয়ের মুখের দিকে,তারপর সাতপাঁচ না ভেবে বললো,

“আচ্ছা আপনারা বরং ততদিন এখানেই থাকুন।আমি আপনার মেয়ের দেখাশোনা করবো।”

নিস্পার সীদ্ধান্তে রাগী দৃষ্টিতে তাকালো ত্রিজয়,মেয়েটাকে নিয়ে এতোক্ষণ ঝামেলা পুহিয়েছে এটাতেই সে বিরক্ত প্রায় আর এখন এই ঝামেলা পার্মানেন্টলি নিজের বাড়িতে রেখে দেওয়ার কথা কিছুতেই মানতে পারলো না সে, উত্তেজিত স্বরে বললো,

“আর ইউ কিডিং?তুমি নিশ্চয়ই সিরিয়াস মুডে নেই।”

নিস্পা রেহানার কাছ থেকে উঠে গিয়ে বসলো ত্রিজয়ের পাশে,তারপর ত্রিজয়ের হাতের উপর নিজের কোমল হাতটা রেখে মিনমিনিয়ে বললো,

“উনার দিকে তাকান একবার।সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব উনি।আমার মা বাবা মারা গিয়েছে শুধুমাত্র ওনাকে ন্যায় বিচার পাইয়ে দিতে।আর এখন যখন ওনাকে সাহায্য করার মতো আমিও একটা সুযোগ পেলাম তখন কি করে মুখ ফিরিয়ে নেই বলুন?”

ত্রিজয় রেগে তাকালো ফের, অগ্নিঝরা কন্ঠে বললো,

“এনাকে সাহায্য করতে গিয়ে বাবা মা দুজনে মরেছে এখন তুমি মরবে নাকি?”

নিস্পা মুচকি হেসে ফেললো, ত্রিজয়ের কাধের উপর নিজের মাথাটা রেখে ধীরে ধীরে বললো,

“কাউকে সাহায্য করার উছিলায় মরাও ভালো।”

নিস্পার মুখে মরার কথা শুনতেই ফুসে উঠলো ত্রিজয়,নিস্পার মাথাটা নিজের কাঁধের উপর থেকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ক্ষুব্ধ কন্ঠে আওড়াল,

“যা ইচ্ছে কর।”

____

একটা যন্ত্রণা দায়ক নির্ঘুম রাতের পর ভোর রাতের দিকে না চাইতেও ঘুম চলে এসেছিলো অনুর।কাল কিয়ান অনুর গ্লাসে ঘুমের ঔষধ টা মিশিয়েছিল ঠিক কিন্তু পুরো পুরি মেশাতে পারে নি।তাড়াহুড়োর কারনে সম্পূর্ণ ঔষধ টা মিশেই নি পানিতে।বিশ্রাম নেওয়ার জন্য সে কেবল চোখ বন্ধ করে ঝিম ধরে ছিলো,কিন্তু পুরোপুরি ঘুমোয় নি।

ফোনে কথা শেষ করে কিয়ান যখন ফিরে এসেছিলো, যখন পাজাকোলে তুলে নিয়েছিলো তাকে, সে ইচ্ছে করেই বন্ধ করে রেখেছিলো চোখ,ভেবেছিলো কিয়ান তাকে নিয়ে ছাদে যাবে, কিন্তু পরমুহূর্তেই কিয়ানের বলা সরি শব্দটা সবকিছু উলটপালট করে দিলো,অনু বুঝে গেলো তার বিশ্বাস টা হয়তো এবারেও ভেঙে গুড়িয়ে যেতে চলেছে, যন্ত্রণারা গলাটা চেপে ধরে শ্বাস রোধ করে দিলো তার,চোখ খুলবে বলেও আর খোলা হলো না,চরমভাবে প্রতারিত হওয়ার ভয়ে সেই চোখের পাতা ইচ্ছে করেই বন্ধ করে রেখেছিলো সে।

কিন্তু শেষে আর কিছু মনে নেই, ঘুমের অভিনয় করতে করতে সত্যিই ঘুম এসে পড়েছিল বোধহয়।কিন্তু এখন চোখ খুলতে ভয় হচ্ছে,বন্ধ চোখের পাতা থেকেই গড়িয়ে পড়ছে অজস্র অশ্রু, ভিজছে বালিশ।নিশ্চয়ই এখন চোখ খুললেই তার দুনিয়াটা অন্ধকার হয়ে যাবে, নিশ্চয়ই চোখ খুললে বিশ্বাসঘাতক প্রমাণ হবে শেষ বারের মতো ভালোবেসে ভরসা করা লোকটা।

অনুর কলিজাটা খন্ড বিখন্ড হওয়ার মতো অনুভূতি হলো,তার পুরো শরীর অবশ লাগলো ভয়ে,বারবার বিশ্বাস ভাঙার ভয় তাকে পিষে দিচ্ছিলো ভীষণ ভাবে,সে শুখনো ঢোক গিলে ধীরে ধীরে চোখ খুললো।চোখের পাতা যত আলগা হতে শুরু করলো, ততই যেন বিস্মিত হলো তার অক্ষিপুট,চেনা দেয়াল, চেনা ঘর আর চেনা বিছানায় আবিষ্কার করেই বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে উঠে বসলো সে,বিহ্বলিত কন্ঠে আওড়াল,

“একি! আমি ঘরে কি করছি!”

পাশেই বসা ছিলো কিয়ান,কাল রাতের বিষয় নিয়েই ভাবছিলো সে,হটাৎ অনুর এমন প্রশ্নে মনেমনে ঘাবড়ে গিয়েছে খুব,তবে অনুকে সেটা বুঝতে না দিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,

“কেন?অন্য কোথাও থাকার কথা ছিলো নাকি?”

অনু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো কিয়ানের দিকে।তেড়ে আসা কান্নার দলা বুকে চেপে থমথমে গলায় বললো,

“না।তেমন কিছু না।”

কিয়ান ভেতর ভেতর ফেটে যাচ্ছে অপরাধবোধে।কাল প্ল্যান মতোই ঘটেছিলো সব,অনুকে নিয়ে গাড়িতে তুলে রওনাও করেছিলো বিমানবন্দরের দিকে,কিন্তু কি থেকে যেন কি হয়ে গেলো,সে স্পষ্ট দেখলো অনুর বন্ধ চোখের পাতা চিকচিক করছে,একটু পরখ করার জন্য ঝুঁকেও৷ হিলো,যা ভেবেছিল তাই,মেয়েটা কান্না করছে,চোখের পানিতে ভিজে উঠেছে চোখের পাতা।

কিয়ান নিজেকে সামলাতে পারলো না আর।অনুর চোখের পানি ভেস্তে দিতে শুরু করলো সব,এলোমেলো করে দিলো মস্তিষ্কের সাজানো গোছানো পরিকল্পনা গুলোকে।সে গাড়ির স্প্রিড বাড়ালো, কিছুতেই লক্ষভ্রষ্ট হতে চাইলো না,কিছুতেই সামান্য চোখের পানির কাছে হারিয়ে দিতে পারলো না তার ডেবিল স্বত্ত্বাকে।ঠিক তক্ষুনি অলৌকিক কিছু ঘটলো, একটা সাদা রঙের পাখি উড়ে এসে ধাক্কা খেলো তার গাড়ির সাথে।

কিয়ান পথভ্রষ্ট হলো,গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে দেখলো পাখিটা,কি অদ্ভুত ব্যাপার, পাখিটির প্রথম সাক্ষ্যাতেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো একটা স্পষ্ট মুখ,মস্তিষ্কে খেলে গেলো একটা নাম।সত্য।

সে আর কোন কথা চিন্তা না করব দৌড়ে গেলো পাখিটির কাছে।পাখিটা আঘাত পেয়েছে, সাদা পালকের ডানা ভেঙে গিয়েছে বাজে ভাবে,একটা পা পিষে গিয়েছে চাকার সাথে,রক্তে লাল হয়ে গিয়েছে তার শরীর।

সামান্য পাখিই তো,তাই অতো গায়ে মাখলো না কিয়ান,পাখিটাকে তুলে নিয়ে নির্দয়ভাবে ছুড়ে মারতে নিলো পাশের নর্দমায়,ঠিক তক্ষুনি শুনতে পেলো একটা আদুরে কন্ঠ,

“পাপ করো না বাবা,পাপ তার বাপকে ছাড়ে না।”

ব্যাস এইটুকুই যথেষ্ট।পাখিটি আর কোন দ্বিরুক্তি করলো না,নিজের ভাঙা দুটো পাখা দিয়েই কোনরকম উড়তে উড়তে চলে গেলো দূরের কোন ডালে।হয়তো কিয়ানের সান্নিধ্য সে চায় না,মরার আগেও চায় না তার শরীরে কিয়ানের পাপের নিঃশ্বাস পরুক।সত্যবীনা পাখির কাজ শেষ, অবশেষে ইতি ঘটলো তার,অতৃপ্ত আত্মাটা অবশেষে আটঁকাতে পারলো তার বাবার করা সর্ব নিকৃষ্টতম পাপ।তার বাবার দ্বারা এজন্মে আর কোন পাপ হলো না, এবার তার আত্মার মুক্তি।আজ উল্লাস করবে সে,মৃত্যু আর মুক্তির উল্লাস।

কিয়ান হা করে তাকিয়ে রইলো, গড়বড় শুরু হলো তার সমস্ত হিসেবে,কেবল একপল চাইলো গাড়ির ভেতর ঘুমিয়ে থাকা অনুর মুখের দিকে, তার চোখের জল ইতিমধ্যে গড়িয়ে নেমে এসেছে গালে।কেন যানি ব্যাথায় চিনচিন করে উঠলো কিয়ানের বুকের বাপাশ,একটা সুক্ষ্ম যন্ত্রণা কাবু করে তার সমস্ত অনূভুতি, তার ভোতা হৃদয় ধ্বকধ্বক করা বন্ধ করে দিলো,সে বুঝে গেলো তাকে কি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে,সে আর এক মূহুর্তও দাড়ালো না,সমস্ত পরিকল্পনা নশ্চাৎ করে গাড়ি ঘোরালো বাড়ির দিকে।

কাল রাতের কথাগুলো ভেবেই একটা তেতো ঢোক গিললো কিয়ান,অনুর ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের খসখসে হাতটা বাড়িয়ে দিলো তার গালে,শ্রুতিমধুর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?”

“কেমন?”

অনু ভারাক্রান্ত কন্ঠে আনমনা উত্তর দিতেই কিয়ান বলে উঠলো,

“সারা রাত ঘুমালে অথচ দেখে মনে হচ্ছে একটুও ঘুমাও নি।”

বিনিময়ে ম্লান হাসলো অনু,মুমূর্ষু কন্ঠে বললো,

“চোখ বন্ধ থাকলেই ঘুমোনো হয় বুঝি?তাহলে তো,,

“ওয়েট ওয়েট।তুমি বলতে চাইছো তুমি ঘুমাও নি, চোখ বন্ধ করে ছিলে?”

অনুর কথায় ভীষণ রকম ঘাবড়ে গিয়ে প্রশ্নটা করলো কিয়ান,অথচ অনু নীর্লিপ্ত,প্রতিক্রিয়া নেই তার মাঝে,সে ভাবুক হয়ে কি যেন ভাবছে।

অনুর সাড়াশব্দ না পেয়ে কিয়ান হাত দিয়ে কাঁধ ঝাকালো তার,

“অনু,কি ভাবছো?”

অনু নড়েচড়ে উঠলো,হতচকিত হয়ে আওড়াল,

“উহু।নাহ! তেমন বিশেষ কিছু নয়।”

কিয়ান চোখ ছোটো ছোট করে সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“তুমি কাল রাতে ঘুমাওনি?”

হৃদপিন্ড বরাবর গুলিবর্ষণ হলে যতটা রক্তক্ষরণ হয়, ঠিক ততটাই এক অদৃশ্য রক্তক্ষরণ শুরু হলো অনুর বুকের ভেতর,কন্ঠটা চেপে আসছে তার,কান্নার কারণে জ্বলছে নাকের তালু, সে কোনরকম একটা হাসি টেনে বললো,

“হ্যাঁ। ঘুমিয়েছি।শান্তির ঘুম ঘুমিয়েছি।মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে যখন হটাৎ করে রুহ টা বেড়িয়ে যায়,যখন দুটো চোখ বন্ধ হয়ে যায় মৃত্যু নিদ্রায় তেমন একটা ঘুম হয়েছে কাল।”

কিয়ানের পকেটে ফোন বাজছে,তাই অনুর বলা কথাগুলো তেমন একটা গুরত্ব দিয়ে শুনেনি সে,যদি শুনতে পেতো হয়তো আরেকটু গভীর ভাবে ভাবতো সব,কিন্তু একের পর এক ফোনকলে অনুর কথায় মনযোগ দিতে পারলো না সে,তাড়াহুড়ো করে পকেট থেকে ফোনটা বের করে বললো,

“আচ্ছা তুমি রেস্ট নেও, আমি কল টা এটেন্ড করে আসছি।”

কিয়ান চলে যেতে নিলেই পেছন থেকে করুন কন্ঠে ডেকে উঠলো,

“শুনুন।”

কিয়ানের পা দুটো অবশ হয়ে এলো, অনুর ওমন আকুতি ভরা ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারলো না সে,

“হু?”

অনু অসহায়ের মতো ডুকরে উঠলো,ভেতরকার চাপা রাগ অভিমান, দুঃখ-যন্ত্রনা উগড়ে দিয়ে কেন যানি হামলে পড়লো কিয়ানের উপর,বিছানায় বসে থেকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো কিয়ানের কোমরের অংশ,তারপর কিয়ানের তলপটে মুখ গুজে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললো,

“যদি হারিয়ে যেতাম আফসোস হতো না?”

কিয়ান নিজের কাঁপতে থাকা হাতটা রাখতে চাইলো অনুর মাথায়,কিনতি হলো না,ভেতর ভেতর অনুশোচনা আর অপরাধ বোধের আগুনে ঝলসে যেতে শুরু করলো সে,একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঠান্ডা কন্ঠে প্রত্যুত্তর করলো কেবল,

“হারাতে দিলো তো আফসোস।”

অনু কাঁদতে কাঁদতে আবার বললো,

“আপনার অনাগত সন্তান আমার গর্ভে।”

কিয়ান দাড়ানো থেকে বসলো এবার,সযত্নে অনুর পেটে হাত বুলালো কিছুক্ষণ, তারপর ঝুকে গিয়ে একটা চুমু খেয়ে বললো,

“যে আসবে তার নাম সত্য রাখবো।”

চমকে তাকালো অনু,কাল রাতের কিয়ান আর আজকের কিয়ানের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ, মানুষ টাকি সুধরে গেলো নাকি এটাও অভিনয়, হতেই পারে,মানুষ চিনতে বরাবরই ভুল হয় তার,হয়তো এবারেও ভুল হচ্ছে,ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে আছে সে,

“নাম ঠিক করে নিয়েছেন?তাহলে,,

” তাহলে?”

কিয়ান ভ্রুকুটি তুলে জিজ্ঞেস করতেই একটা ফ্যাকাসে হাসি টানলো অনু,নিস্পল কন্ঠে বললো,

“তাহলে, তাহলে আর কি কিছুই না।একটা কথা বলতে চাইছিলাম,,

“কি?”

অনু দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরলো,রোধ করলো ধেয়ে আসা কান্নার দলা,ফুফিয়ে উঠে মর্মাহত কন্ঠে বললো,

“বাচ্চাটা আমি রাখবো না।গর্ভপাত করালে আপনার মনে হয় অসুবিধা হবে না।”

“পাগল হয়েছ তুমি।”

স্বাভাবিক ভাবেই ভড়কে গেলো কিয়ান,অথচ অনুর নিস্পৃহ অভিব্যাক্তিতে প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না কোনরকম, কান্নায় তার ঠোঁট ভেঙে আসছে,সে দুটো চোখ খিচে নিয়ে জড়িয়ে আসা গলায় বলল,

“মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে আসুন প্লিজ।আমি সুস্থ হতে চাই।”

কিয়ানের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আঁচ করতে পারলো কিছু একটা, তড়িৎ এর গতিতে অনুকে শক্ত করে আঁকড়ে নিলো বুকের ভেতর, উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললো,

“কি হয়েছে তোমার?এমন কেন করছো?”

অনু তখনও কাঁদছে,চোখের পানিতে জোয়ার নেমেছে তার,ভেঙেছে সমস্ত বাধ,

“আমি বোধহয় পাগল হয়ে যাবো।এতো যন্ত্রণা এতো কষ্ট এতো প্রতারণা আমি নিতে পারছি না বিশ্বাস করুন।”

অনু যে কাল রাতে জেগেই ছিলো এবার পুরোপুরি শিউর হলো সে,তবুও না বোঝার ভান করে বললো,

“কিসব বলছো তুমি?কুল ডাউন।আমি আছি তো।আমি থাকতে কীসের যন্ত্রণা তোমার?”

অতিরিক্ত যন্ত্রণা আর আঘাতে সত্যিই পাগলের মতো হয়ে গেলো মেয়েটা,উন্মাদের প্রলাপ বকার মতো করে বললো,

“হু,হু।আপনি তো আছেন।আপনি থাকতে কীসের আর যন্ত্রণা।”

তারপর থেমে থেমে আবার বললো,

“ঠিক। ঠিক বলেছেন।কোন যন্ত্রণা নেই আমার।”

কিয়ান অনুর মাথায় অনবরত চুমু খেতে খেতে বললো,
“হুম।আমি আছি।আমি থাকতে কোন যন্ত্রণা ছুতে পারবে না তোমায়।”

“আপনি আছেন?সত্যি?তাহলে আমাকে একটু বিষ এনে দিন না।”

কিয়ান জানে অনু কেন এমন করছে,বারবার ভালোবাসার কাছে ঠকে যাওয়া মেয়েটা আর কিই বা চাইবে,তাও না জানার ভঙিমা করে বললো,

“কি বলছো এসব।কেন বলছো?”

“সরাসরি বিষ দিতে সমস্যা হলে এক থালা ভাতের সাথে মিশিয়ে আনুন প্লিজ।আমি পেট ভরে খাবো।আর অপূর্ণ কোন ইচ্ছে রাখবো না মনে।আর চাইবো না এমন অভিশপ্ত জীবন।”

অনুর পাগলপনা মাথাচাড়া দিয়ে বাড়লো,কিয়ানের ছলনা আর প্রতারণা তাকে পুরোপুরি নিঃশ্বেস করে দিয়েছে,এই নির্মম পৃথিবীতে এমন নিষ্ঠুর নিয়তি নিয়ে আর বেঁচে থাকতে চায় না সে,প্রতিটি সেকেন্ড বেঁচে থাকাটাই তার সবচেয়ে পীড়াদায়ক মনে হচ্ছে।

কিয়ান অনুকে সামলাতে হিমসিম খেলো,উপায়ন্তর না পেয়ে ঠোঁটে ঠোঁট ডোবালো হটাৎ,শুষে নিতে শুরু করলো অনুর সমস্ত যন্ত্রণা,

“শান্ত হও। প্লিজ শান্ত হও অনু।এই চোখের পানি আর ফেলো না।কাল রাত থেকে এটা অনেক জ্বালাচ্ছে আমায়।ভেতরটা ছারখার করে দিচ্ছে তোমার এক ফোটা চোখের পানি।”

।অনু পাথরের মতো স্থির হয়ে গেলো,অবশ হয়ে এলো তার পুরো শরীর,সে টলমল চোখে চাইলো কিয়ানের চোখের গভীরে,খুব নীরিক্ষ ভাবে খুঁজে পেতে চাইলো ছলনার পাহাড়, দিশাহারা হয়ে খুজলোও বটে,তবে পেলো না,কোথাও নেই, কোথাও আর এক বিন্দু ছলনা নেই।তবুও আর বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করলো না কিয়েনকে,বিমূঢ় কন্ঠে আওড়াল,

“আমার নিয়তিতে পূর্ণতা নেই,চোখের পানিই শেষ আশ্রয়।কান্না ছাড়া গতি নেই।”

কিয়ান দু’হাতে অনুর চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বললো,

“কেঁদো না মেয়ে।চোখের পানির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত না করে একেবারে খুন করে দেও।আমি হাসতে হাসতে বুক পেতে দেবো।”

অনুর এবারেও বিশ্বাস হলো না,চরম ঠকবাজ লোকটার দিকে তাকিয়ে অনর্গল আওড়াল,

“আপনি নিষ্টুর। আমার দেখা চরম নিকৃষ্ট লোক।”

কিয়ান এক টানে অনুকে ঢুকিয়ে নিলো নিজের বক্ষস্থলে,নিখাঁদ কন্ঠে বললো,

“উপর ওয়ালা সবাইকে ভালো বানায় না এতে আমার কি দোষ।”

তখন থেকে একের এক ফোনকলে এবার তিক্ত বিরক্ত কিয়ান,এদিকে অনুকে সামলাতে হিমসিম, ওদিকে ফোনের রিংটোন মাথা ধরাচ্ছে ঝিম।কিয়ান ফোনটা বিছানা থেকে তুলে নিয়ে স্ক্রিনে চোখ বুলালো,অনুর কানের কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,

“কল টা এটেন্ড করি?”

অনু আর গললো না,হিমালয়ের মতো নিটোল কন্ঠে বললো,

“আমার সামনে কথা বলতে অসুবিধা হবে আপনার।”

“আমি বুঝে নেবো।”

বলেই কিয়ান রিসিভ করলো ফোন,

“হ্যাঁ। হ্যালো কে বলছেন?”

ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত কন্ঠ,

“হ্যালো মিস্টার কিয়ান।চিনতে পেরেছেন?”

কিয়ান ঠোঁট উল্টোলো অভিভূত কন্ঠে বললো,

“মিস্টার ইভান!”

“চিনতে পারার জন্য থ্যাংক ইউ দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও দিলাম না।আপনার মতো মানুষকে।”

কিয়ান তাচ্ছিল্য স্বরে বললো,

“নাথিং মেটারস।কিচ্ছু যায় আসে না আমার।কেন ফোন করেছেন সেটা বলুন।”

ইভান ঠান্ডা স্বরে বললো,

“রিল্যাক্স। আপনার বউ কেড়ে নেওয়ার জন্য ফোন করি নি।”

“কেড়ে নেওয়া সহজও নয়।”

“পঁচা শামুকে পা দিয়ে পা নষ্ট করি না আমি।বাই দ্যা ওয়ে,জানুয়ারির দুই তারিখ আমি বিয়ে করছি।আপনার আর আপনার ওয়াইফের দাওয়াত রইলো।আসবেন কিন্তু।”

“বাহ!কংগ্রেস।আপনার বিয়েতে আমার বাচ্চার মাকে নিয়ে অবশ্যই আসবো।কব্জি ডুবিয়ে খেতে হবে, ফর মাই চাইল্ড গ্রোথ।”

ইভান একটা শয়তানি মার্কা হাসি দিয়ে বললো,

“কব্জি টা আয়ত্তে রাখবেন। বলা তো যায় না শত্রুদের মাঝে এসে কব্জি টাই না হারিয়ে ফেলেন।”

“ডোন্ট ওয়ারি মিস্টার ইভান,আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখার মতো আমার ওয়াইফ আছে।শত্রু পক্ষ আমার ওয়াইফ কে বড্ড ভয় পায়।”

কিয়ানের কথায় ওপাশ থেকে হো হো করে হেসে উঠলো ইভান,ব্যাঙ্গ করে বললো,

“বাহ! ফার্স্টক্লাস ডক্টর শেষে কিনা বউয়ের উপর ডিপেন্ড করছে?টু মাচ থার্ডক্লাস কাজকর্ম।”

কিয়ানও কম যায় না, সে পাল্টা জবাবে বললো,

“আফসোস এই থার্ডক্লাস অপশন টাও আপনার ভাগ্যে জুটলো না।”

“তর্কে জরাচ্ছি না।বিয়েতে আসার মতো মুডটা দুই তারিখ অব্দি ধরে রাখুন।”

“ডোন্ট ওয়ারি।প্রেগন্যান্ট আমার বউ, আমি নই যে মুড সুইং হবে।আমরা আসবো।”

“সি ইউ সুন।যদিও আই এম নট ইন্টারেস্টেড।”

“বাট আই এম ভেরি ইন্টারেস্টেড।”

_____

রাত প্রায় দুটো বেজে পনেরো মিনিট।পুরো বাড়ি ডুবে আছে নৈঃশব্দ্যে।বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে নিস্পা। কিন্তু ত্রিজয়ের চোখে ঘুম নেই,সকালের ঘটনাটা নিয়ে ঘুম আসছে না তার।কেন যানি চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠছে ওই অন্তঃসত্তা মেয়েটার মলিন মুখ।মেয়েটা তাকে ডাকছে,বড্ড আদুরে সেই ডাক।কিন্তু মেয়েটা তাকে কেন ডাকছে?তার সাথে কীসের সম্পর্ক এই মেয়ের?কথাগুলো ভেবেই আর চোখ বন্ধ করেনি ত্রিজয়, পাছে না ওই মেয়েটা আবারও তার স্বপ্নে হানা দেয়।

মেয়েটার সম্পর্কে সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই ড্রয়িং রুমে এদিক সেদিক পাইচারি করছে ত্রিজয়,বার কয়েকবার উঁকিও দিয়েছে মেয়েটার ঘরে,কিন্তু মেয়েটার সাথে আগের কোন সাক্ষাৎ মনে করতে পারছে না সে।এর মাঝেই কলিং বেলের আওয়াজ ভেসে এলো কানে,ত্রিজয় মোবাইলের স্ক্রিন অন করতেই দেখলো দুটো বিশ বেজে গিয়েছে,এতো রাতে কে এসেছে ভাবতেই কপালে পড়লো গভীর ভাজ।

ত্রিজয় তড়িঘড়ি গিয়ে দরজা খুললো,বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাক্তিকে প্রথম দেখেই অপ্রস্তুত হলো বেশ,অবাক হয়ে বললো,

“আপনি!কি উদ্দেশ্যে?”

“ভেতরে ঢুকি?”

ওপাশে সাদা পাঞ্জাবির উপর একটা অফ হোয়াইট রঙের শাল জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে এমপি তাওসিফ তাকরিম।এতো রাতে এমপিকে নিজের দরজার সামনে দেখেও তেমন একটা ধার ধারলো না ত্রিজয়,ট্রিট করলো ভিক্ষুকের ন্যায়,

“এতো রাতে অতিথি আপ্যায়নের মুড নেই আমার।”

ত্রিজয়ের ঠান্ডা মাথার অপমান একদমই গায়ে মাখলো না তাকরিম,পাল্টা জবাবে বললো,

“কিন্তু আমি ফুল মুডে আছি।”

ত্রিজয় ভ্রুকুটি তুলে বলল,

“শীতের রাত বিয়ে করে আপনার সব মুড কম্বল গরম করার কাজে এপ্লাই করুন লাভ হবে।”

তাকরিম শ্লেষ হেসে বক্র কন্ঠে বললো,

“কম্বল গরম করার মুড থাকলে আপনার বউয়ের কাছেই যেতাম, আপনার কাছে যেহেতু এসেছি তার মানে আপনার মাথা গরম করার মুড নিয়েই এসেছি।”

“আপনার আক্কাসের মতো চেহারা দেখলে আমার মাথা এমনিতেই গরম হয়ে যায়।”

“চেহারা দেখেই যদি এতো গরম হয়ে যান তাহলে তো আমার কথা শুনলে আপনার হিরো আলমের মতো চেহারাটা ব্লা/স্ট করবে।”

ত্রিজয় তিক্ত বিরক্ত, তবে তর্কে হার মানার পাত্র সে নয়, তাই তাকরিমকে ঘোল খাওয়াতে বললো,

“রাত দুটো।আপনি বোধহয় ভুলে গিয়েছেন এটা ঘুমের সময়।আপনার বউ নেই ঘুম নাও আসতে পারে,কিন্তু আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন আমার কিন্তু বউ আছে, শরীর আর কম্বল দুটোই গরম হবে, কড়া ঘুমও আসবে।”

“ঘরে শত্রু রেখে ঘুমাচ্ছেন সাহস আছে বলতে হবে।বাট ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন আপনার শত্রু আপনার গরম কম্বলে আগুন লাগিয়ে আপনাকে সারাজীবনের জন্য ঘুম পারানোর প্ল্যান করছে।”

ত্রিজয় ঠোঁট উল্টে বললো,

“শত্রু!আর আমার?আমি তো জানি আমার একমাত্র শত্রু আপনি।”

তাকরিম পিচলে হেসে বললো,

“আমি শত্রু?হাসালেন।আপনার মতো নোংরা কীটকে আমি মানুষই মনে করি না, শত্রু তো দূরের ব্যাপার।”

“মনে করেন নি বলেই হেরে গেলেন।নয়তো আমার বউ আপনার থাকলেও থাকতে পারতো।যদিও আমি হতে দিতাম না।”

“আপনি উকিল মানুষ, তর্কে যুক্তি দেখাতে ওস্তাদ।কিন্তু একটা কথা নিশ্চয়ই জানেন উকিল যতই তর্ক বিতর্ক করুক না কেন আসল কালপ্রিট কে ধরতে না পারলে সে কখনোই জিততে পারে না,গো হারা হেরে যায়।”

তাকরিমের কথাটা এবার সিরিয়াসলি নিলো ত্রিজয়,কপাল কুচকে বললো,

“ঘুরেফিরে এক কথাতেই থামছেন।আচ্ছা বলুন দেখি আমার শত্রু কে?”

তাকরিম প্রত্যুত্তর করলো না,ত্রিজয়ের নাকের ডগা ঘেঁষে ঢুকলো ঘরের ভেতর,তারপর পায়ের উপর পা তুলে আরাম করে বসলো সোফায়।ত্রিজয়ও দরজা বন্ধ করে পেছন পেছন এসে বসলো মুখোমুখি।

তাকরিম টু শব্দটি না করে নিজের ফোন এগিয়ে দিলো ত্রিজয়ের দিকে,স্ক্রিনে প্লে করে রাখা একটা ভিডিও ফুটেজ,

“সত্যি করে বল প্রভা কে সেই কালো জাদুকর।কে আসল মাস্টারমাইন্ড।”

প্রভা কাঁদতে কাঁদতে বললো,

“সে মারা গেছে, আরও অনেক আগে মারা গেছে আমি তো বললাম আপনাকে।”

তাকরিম কেরোসিন ঢালতে শুরু করলো প্রভার গায়ে,হুমকি দিয়ে বললো,

“তুই মিথ্যা বলছিস।সত্যিটা বল নয়তো আমি তোকে পুড়িয়ে দিতে বাধ্য হবো।”

মৃত্যু মুখে দাঁড়িয়েও প্রভা রোবটের মতো আওড়াল একই কথা,

“আমি যেটা বলছি সেটেই সত্য।আমি বারবার এই একটা কথাই বলবো।”

“আমার হাতে তুই খুন হয়ে যাবি প্রভা।”

মৃত্যুকে ভয় পায় না প্রভা,ভালোবাসার মানুষের নিষ্ঠুর রুপ এমনিতেই তাকে খুন করে দিয়েছে ভেতর থেকে,তাই নিস্পল কন্ঠে বললো,

“অবশিষ্ট কেরসিন ভালো করে আমার গায়ে ঢেলে দিন,তাড়াতাড়ি পুড়ে যাবো আপনার ঝামেলাও শেষ হবে।”

“তুই মরবি তাও বলবি না তাইতো?”

প্রভার দূর্বলতা বেশ ভালো করেই জানে তাকরিম,তাই এবার প্রভার গায়ে কেরসিন না ঢেলে অবশিষ্ট কেরসিন নিজের গায়েই ঢালতে শুরু করলো সে,মোক্ষম জায়গায় আঘাত করে বললো,

“এবার বল।কে সে? নয়তো এবার আমি নিজেকে নিজে পুড়িয়ে দেবো।”

“আপনি পাগল হয়ে গিয়েছেন।আমি তো বলছি,,,”

তাকরিম নিজের ঠোঁটের উপর হাত রেখে হিসহিসিয়ে উঠলো,

“চুপপ,,,!আমার হুমকি ফাঁকা আওয়াজ ভাবিস না প্রভা, আমি কিন্তু আলেকজান্দ্রার জন্য আরও ভয়ংকর কিছু করতে পারি,এই আগুন মামুলি বাত।”

প্রভা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,

“আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন।”

তাকরিম ধার ধারলো না,বরং পকেট থেকে লাইটারটা বেড় করেই আগুন ধরিয়ে বললো,

“তাহলে আরেকটু ভয় পা।”

এপর্যায়ে ভীষণ ভয় পেলো প্রভা, ভয়ের দাপটে লোপ পেলো স্বাভাবিক চিন্তাধারা,আতংকিত কন্ঠে বললো,

“থামুন থামুন।আগুন টা নেভান প্লিজ।”

তাকরিম আগুন নেভালো না,বরং প্রভাকে আরেকটু ভয় পাইয়ে দিতে বললো,

“আমার জীবনের এমনিতেও কোন মূল্য নেই প্রভা।আমার আলেকজান্দ্রাকে ছাড়া বেঁচে থাকা মৃত্যুর চেয়েও বেশি ভয়ংকর।তার চেয়ে বরং মরেই যাই কি বল?আর আমার মৃত্যুর দ্বায় কাঁধে নিয়ে তুই আজীবন আফসোস করে মরার মতো বেঁচে থাক।”

“অসম্ভব!অসম্ভব!কিছুতেই পারবো না।আপনার মৃত্যুর দ্বায় কাঁধে নেওয়ার মতো শক্তি আমার শরীরে নেই।”

মুখে হাত চেপে ফুফিয়ে উঠলো প্রভা।তাকরিম আবারও জিজ্ঞেস করলো,

“তাহলে বলে দে। কে সে?”

“আমি জা,,”

“মিথ্যা বলছিস,,”

প্রচন্ড ক্ষোভে ধমকে উঠলো তাকরিম,লাইটারটা নিয়ে গেলো নিজের শরীরের খুব কাছে,প্রভা দিকদিশা না পেয়ে চেচিয়ে উঠলো, চোখ মুখ খিচে উচ্চারণ করলো একটি শব্দ,

“দাদি।নিস্পার দাদি ফুলমতি।”

“হোয়াট?”

ভিডিও এবং বর্তমান তালগোল পাকালো মূহুর্তেই,ঘটনার আকস্মিকতায় চমকেছে দুজনেই,ভিডিও তে তাকরিমের রিয়েকশনের সাথে সাথে একই রকম রিয়েকশনে বসা থেকে উঠে দাড়ালো ত্রিজয়।তাকরিম বাঁকা কন্ঠে বললো,

“তখন বললেন দুজন দুজনের চরম শত্রু অথচ দুজনের রিয়েকশন টা সেম হয়ে গেলো না?”

ত্রিজয়ের চোখ ছানাবড়া, নিস্পার দাদির কথাটা বিশ্বাসে ঠেকছে না তার,সে অবিশ্বাস্য কন্ঠে আওড়াল,

“নিস্পার দাদি কীভাবে সম্ভব?”

তাকরিম খোশামেজে বললো,

“রিল্যাক্স। আগে ভিডিও টা সম্পূর্ণ শেষ করুন।”

ত্রিজয় দম বন্ধ করে আবারও বসে পড়লো নিজের যায়গায়,নীলাক্ষি নয়নজোড়া পুনরায় নিবদ্ধ করলো মোবাইলের স্ক্রিনে।

প্রভার কথা শুনে বিস্ময়ে এক মূহুর্তের জন্য বুলি হারিয়েছে তাকরিম,

“নিস্পার দাদি কীভাবে সম্ভব?”

“সম্ভব। কারণ নিস্পার দাদিই সে যার প্রতিশোধ নেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো।”

“মানে?”

“নিস্পার দাদি হুজুর আব্দুল খালেকের ছোট মেয়ে।যার জন্মের সময় হুজুর আব্দুল খালেকের বিবি মারা যায়।আর মা হারা নবজাতকের লালন পালনের দায়িত্ব সপে দেয় পালক মায়ের হাতে।সেই ছোট মেয়েটাই বড় হয়ে উঠার পর যখন যানতে পারে ফ্লোরেন্সার বাবা লতিফ খানের জন্য তার বাবা বোন সহ পুরো পরিবার নির্মম ভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো তখনই তার মাঝে জেগে উঠে ভয়ংকর প্রতিশোধ স্পৃহা।সে কৌশলে খান বাড়ির বউ হয়ে সবার সাথে মিশে যায়।পুরো গ্রামবাসীর উপর তার রাগ ক্ষো/ভ ছিলো। কারণ তার বাবা আর বোনের মৃ/ত্যুর সময় গঞ্জের একজনও সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে নি।তাই সে গোপনে কালো জাদু শুরু করে,আর এই কালো জাদুর মাধ্যমেই সে গ্রামের লোকজনকে একা পেলেই নিজের আয়ত্বে নিয়ে আসতো, এবং পরবর্তীতে গ/লা কে/টে ঝু/লিয়ে রাখতো বটগাছের ডালে।গঞ্জের সবাইকে আতংকে রাখতো গঞ্জের সবচেয়ে বড় বাড়ির বউ হয়ে।

প্রথমদিকে আমিও ওনাকে চিনতাম না।তারপর যেদিন আশিক ভাই আমার উপর আক্রমণ করলো সেদিন উনি আমাকে প্রাণে বাঁচালো, আমার চোখের সামনে হ/ত্যা করলো আশিক ভাইকে।আর সেদিনই আমি জানতে পারি উনি আমার ফুফি।

সেখান থেকেই একজোট হই আমরা দুজন।উনার খু/ন খারাবির পক্ষে আমি ছিলাম না।কিন্তু আমি মনে প্রাণে খান বাড়ির সবাইকে শাস্তি দিতে চাইছিলাম।আবার অপরদিকে বেহায়ার মতো ভালোও বেসে ফেলেছিলাম আপনাকে।

আপনাকে ভালোবেসে ভুলে গিয়েছিলাম এই বাড়ি আর এই পরিবারটা আমার শত্রু, আমার মায়ের শত্রু।আপনাকে পাওয়ার স্বপ্ন বুকে লালন করে দিন পার করছিলাম।আর আপনি ফ্লোরেন্সার ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে বসেছিলেন।একটা সর্বস্ব হারা মেয়ে যে আপনাকে ভালোবেসে একটা সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখছিলো সেটা আপনি দেখেও না দেখার ভান ধরে ছিলেন।

তখন থেকেই ফ্লোরেন্সার প্রতি রাগ হতে শুরু করে আমার,আমার মনে হতে থাকে ফ্লোরেন্সার জন্যই আমার ভাগ্য খারাপ হয়েছে।ফ্লোরেন্সা যদি না জন্মাতো তাহলে বাবা আমাকেই নিজের মেয়ের স্বীকৃতি দিত,আর আপনিও আমাকেই ভালোবাসতেন।তাই আমি ফ্লোরেন্সাকে সবার চোখে খারাপ বানানোর জন্য প্রিন্স জোসেফের সত্য প্রকাশ করে দেই।

প্রিন্স জোসেফ যে ছদ্মবেশে আমাদের বাড়িতে আছে সেটা চিরকূটে লিখে আমিই আপনার দরজার সামনে রেখেছিলাম।আর অবশেষে আমার প্ল্যান মতোই সব হলো ফ্লোরেন্সাকে ব্রেইন ওয়াশ করিয়ে আমিই প্রিন্স জোসেফের সাথে চলে যেতে উস্কে দিয়েছিলাম।

ফ্লোরেন্সা চলে যাওয়ায় আমার পথ পরিস্কার হয়ে গেলো। আমি ভেবেছিলাম এবার অন্তত আপনি আমার দিকে তাকাবেন,বুঝবেন আমার ভালোবাসা।কিন্তু আপনি আমার ভালোবাসাকে পায়ে পিষে দিয়ে চলে গেলেন,সাথে করে নিয়ে এলেন ফ্লোরেন্সাকে।

আপনাদের দুজনের বিয়ে ঠিক হওয়ার কথা শুনে আমার মাথার উপর আকাশ টা দু ভাগ হয়ে গেলো। আমি পাগলের মতো তড়পাতে শুরু করলাম,মনে হচ্ছিলো কেউ আমাকে জোর করে বিষ খাইয়ে দিয়েছে।যন্ত্রণায় গলা কাটা মুরগির মতো ছটফট করতে শুরু করেছিলাম আমি।সীদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ফ্লোরেন্সাকে মেরে ফেলবো।

তারপরই ফুল জানতে পারে আপনার সাথে যে আছে সে ছদ্মবেশী, ভবিষ্যৎ থেকে আসা ফ্লোরেন্সা।আর আসল ফ্লোরেন্সাকে আপনি চালের গুদামঘরে লুকিয়ে রেখেছেন।ফুল সবটা এসে আমাকে জানায়।তারপর আমরা দুজন মিলে প্ল্যান করি দু ফ্লোরেন্সাকে মারার।যেহেতু আপনি ফ্লোরেন্সা আর নিস্পার মাঝে ছোট খাটো একটা দ্বন্দ্ব তৈরি করে রেখেছিলেন, সেহেতু সেই দ্বন্দ্ব টাকে বড় করতে খুব একটা অসুবিধা আমাদের হয় নি।ফুল ফ্লোরেন্সাকে খাবার দেওয়ার নাম করে আরও ভালো করে উস্কে দিতে শুরু করলো ফ্লোরেন্সাকে,অতঃপর বিয়ের দিন আমরাই প্ল্যান করে গুদাম ঘরের দরজা খুলে ফ্লোরেন্সা কে মুক্ত করে দেই।আমরা ভেবেছিলাম দুই ফ্লোরেন্সা একে অপরের সাথে লড়াই ক মরে গেলে আমাদের প্রতিশোধ পূরণ হবে। পরিবারের একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে নেমে আসবে শোকের ছায়া,মেয়ের শোকে ফ্লোরেন্সার শয্যাশায়ী বাবাও হয়তো মরে যাবে।

কিন্তু আমাদের এই সব প্ল্যান ভেস্তে গেলো।ফুল চেয়েছিলো এই পরিবারের সকলকে একেবারে শেষ করে দিতে,তাই সে গোপনে অন্যকারো সাথে নতুন পরিকল্পনা করে,এবং খাবারে বিশ দিয়ে সবাইকে মেরে ফেলে।কিন্তু সে আমাকে মারতে চায়নি, আর তাই সে কালো জাদু করে আমাকে বাচিঁয়ে তুলেছে।আর আমার জানের বিনিময়ে মাথা কেঁটে বলি দিয়েছে ইমরান ভাইকে।তখনও বিপত্তি কাটে নি,ফ্লোরেন্সকে পড়িয়ে দেওয়া আলেকজান্দ্রা খচিত আংটি টি কুড়িয়ে পেয়ে আঙুলে পড়েছিলাম আমি,আর সেকারণে ওই আংটি সমেত আমার আঙুলটাকেও সমাধি দিতে হয় আপনাদের লাশের সাথে।

পুরো ঘটনা শুনে স্তম্ভ বনে গেলো তাকরিম,

“তার মানে দাঁড়ায় ফুলের সাথে আরেকজন ছিলো, যার সাথে মিলে সে খাবারে বিষ মিশিয়েছে।”

“হয়তো।”

“কে সে?”

“যানিনা।কারণ খাবারে বিষ মেশানোর পরিকল্পনার কথাও আমি জানতাম না।হয়তো মাস্টারমাইন্ড আরও একজন ছিলো, আর সে একজন কে সেটা শুধুমাত্র ফুলই জানে।”

পুরো ভিডিও দেখে ত্রিজয় কি রিয়েকশন দেবে ভেবে পেলো না।হতবুদ্ধি হয়ে আওড়াল,

” মাই গড।তাহলে এই বুড়ি আমার খেয়ে আমার পড়ে আমার বউয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।”

তাকরিম তাচ্ছিল্য করে বললো,

“কথায় বলে না অতি চালাকের গলায় দড়ি।”

ত্রিজয় ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,

“তাহলে স্বীকার করছেন আমি চালাক?”

“চালাকি করে কার বাল ফালাইতে পারছেন?সেই তো বাল ফালানোর জন্য আমাকেই আসতে হলো।”

“কোদাল নিয়ে এসেছেন তো? চলুন আজকে আমার দাদি শাশুড়ীর বাল দিয়েই শুরু করি।”

“কি শুরু করবো?”

“মিশন।”

______

ত্রিজয় তাকরিমকে নিয়ে সরাসরি চলে গেলো ফুলমতির ঘরে।ফুলমতি তখন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে,নাক ডাকার শব্দ কেমন বিদঘুটে শোনাচ্ছে নৈঃশব্দ্যে।

ত্রিজয় চোখ বন্ধ করে ঠোঁট গোল করলো,তৈরি করলো চিরাচরিত চেনা সেই বিশেষ সম্মোহনী সুর,শীতল ঠান্ডা কন্ঠে ডাকলো,

“ন্যাক্সোরা,,,”

এক ডাকেই থামলো না,কন্ঠকে আরও চওড়া করে সম্মোহনী স্বরে আবার ডাকলো,

“ন্যাক্সোরা মাই ডার্লিং, কাম হেয়ার ন্যাক্সোরা।”

ত্রিজয়কে এমন অদ্ভুত নামে ডাকতে দেখে ভ্রু গোটালো তাকরিম,বিভ্রান্ত কন্ঠে বললো,

“ওয়েট ওয়েট।ন্যাক্সোরা কে?”

ত্রিজয় রসিকতা করে বললো,
“কে আবার আপনার শাশুড়ী হবে হয়তো।”

তাকরিম ক্ষুব্ধ হয়ে চেপে ধরলো ত্রিজয়ের টিশার্টের কলার,দাঁতে দাঁত পিষে গিজগিজিয়ে বললো,
“সময়ের মূল্য জানিস?তামাশা করছিস আমার সাথে।

ত্রিজয় প্রতিক্রিয়া দেখালো না,নিজের কলার থেকে সরালোও না তাকরিমের হাত।কেমন অদ্ভুত ভাবে হাসলো কেবল,দুই ঠোঁট গোল করে ধরলো সেই চিরপরিচিত সম্মোহনী সুর।

সঙ্গে সঙ্গে কালো কুচকুচে দেখতে সাপটা সাই-সাই করে ঘরে ঢুকলো,সুরের নির্দেশ মতো উঠে গেলো ফুলমতির শরীরে।চোখের সামনে এমন অবাঞ্চনীয়, অলৌকিক দৃশ্য দেখে হা হয়ে গেলো তাকরিমের পুরু দুই ঠোঁট, বাকরুদ্ধ হয়ে রুদ্ধশ্বাসে আওড়াল,

” হোয়াট দ্যা!”

ত্রিজয় ঠোঁট টিপে হেসে ফিসফিসিয়ে বললো,

“ফা/ক”

সাপটা ততক্ষণে ফুলমতির গা বেয়ে চলে গেলো মুখের কাছে,কৌশলে পেচিয়ে নিলো ফুলমতির গলা।শরীরে ঠান্ডা স্পর্শ পেতেই নড়েচড়ে উঠলো ফুলমতি, ঘুমঘুম চোখের পাতা খুলে তাকাতেই দেখতে পেলো সাপ।

কি ভয়ংকর কালো কলকলে সাপ।তার লকলকে জ্বিভ বের করে ফোসফাস করছে ফুলমতির মুখের উপর, আতংকে ঘুম ছুটে গেলো ফুলমতির,বৃদ্ধ মানুষ, তাই লাফিয়ে উঠতে পারলো না দ্রুত,যতটা সম্ভব বাঁচার চেষ্টা চালালো প্রানপন, ভয়ে জবান ফেটে বের হলো অস্পষ্ট শীৎকার,

” সা,,,,সা,,,,সাপ,,,,সাপপ।”

ত্রিজয় প্রফুল্ল হেসে বললো,

“আসসালামু আলাইকুম দাদি।আপনার নাতিজামাইর পক্ষ থেকে আপনাকে একটা লাল সালাম।”

ত্রিজয়ের হাবভাব অদ্ভুত রকমের বেগতিক,ফুলমতি চিনেও চিনলো না যেন আজ,ভয়ে তার কলিজা থরথর করে কাঁপছে,ত্রিজয়ের কাছ থেকে সাহায্যের আশায় অস্পষ্ট বলতে চাইলো,

“ভা,,ভাই।সা,,সা,,”

ত্রিজয় ঠোঁট গোল করে সুর তৈরি করলো,গুমোট কন্ঠে বললো,

“”উঁহু উঁহু।একদম নিঃশ্বাস ফেলবেন না, নয়তো ওর বিষ ফুরুৎ করে আপনার ফুসফুসে ঢুকে যাবে।”

আতংকে নাজেহাল অবস্থা ফুলমতির,ভয়ে গলবিল শুকিয়ে কাঠ, গলায় পেচিয়ে থাকা সাপটার দিকে তাকালেই জ্ঞান হারানোর উপক্রম।

ত্রিজয় সেই ভয় টাকেই কাজে লাগিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“বলুন আপনার সাথের সঙ্গী কে?”

ফুলমতি ঝটকা খেলো বোধহয়, ত্রিজয়ের কাছ থেকে এমন প্রশ্ন আশা করে নি সে,বিহ্বলিতায় চোখ বড়ো বড়ো হয়ে এলো তার,ভয়ে ভয়ে আওড়াল,

“কি,,,কি,,,”

“আরে বলুন বলুন।নিঃশ্বাস চেপে রেখে নাকটা বন্ধ করে মুখটা হা করে নামটা বলে দিলেই হলো।”

“তোমরা এসব কি কতাছো?”

অনেক কষ্টে মুখ খুললো ফুলমতি,তবে কাজের কথা কিছুই বললো না বলে রাগ হলো ত্রিজয়ের চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,

“আরে ঢংগি বুড়ি ঢং না করে লাইনে আসো।তাড়াতাড়ি কও আরও একজন কে?এমনিতেই প্রেসারে আছি, তোমার ঢংগের নাতি ঘুম থেকে উঠে ঢংগের কান্না শুরু কইরা দিলেই বিপদ।”

“আমি জানিনা,,তোমরা কি কইতাছো আমি সত্যিই যানিনা।আমারে ছাইড়া দেও।”

“উপর ওয়ালা আপনাকে এতোবছর কেন বাচিঁয়ে রাখছে যানেন?সত্যটা বলার জন্য। কিন্তু আপনি তো সত্যটা বলবেন না তাহলে আর বেঁচে থেকে অক্সিজেন নষ্ট করে কি করবেন?আপনি মরে যান সেটাই ভালো।”

কথাটা বলেই ত্রিজয় আবারও তৈরি করলো সেই সম্মোহিত সুর,সাপটাকে আদেশ করে বললো,

“ন্যাক্সোরা ডার্লিং ওনাকে একটা চুম্মা দিয়ে দেও তো।”

“নাহ!”

আতংকে রুহ্ শুদ্ধ কেঁপে উঠলো ফুলমতির,মৃত্যু ভয়ে বললো,

“বলছি।আমি সব বলছি।”

ত্রিজয় শয়তানি হাসলো,সাপটাকে বললো,

“স্টপ ন্যাক্সোরা।তোমার কাজ শেষ। নেমে আসো।”

অদ্ভুত!বড়ই অদ্ভুত ভাবে সাপটা নামলো না,মানলো না ত্রিজয়ের আদেশ, বড়ং তার লকলকে জিহ্বা টা লোলুপ ভঙিমায় এগিয়ে নিলো ফুলমতির মুখের ঘনিষ্ঠে।

ত্রিজয়ের কপাল বেঁকে এলো, সে আস্তে করে ডাকলো,
“ন্যাক্সোরা!”

এদিকে ঘটনার মোড় পাল্টেছে দেখেই চোয়াল ঝুলেছে তাকরিমের,সে উত্তেজিত দৃষ্টিতে তাকালো ত্রিজয়ের দিকে,যখন তখন যে কোন কিছু হয়ে যাওয়া মানেই মেইন কালপ্রিট হাত ফস্কে বেরিয়ে যাওয়া,এতো কাছে এসেও তাকরিম কিছুতেই সেই মুখোশধারীকে ফস্কে যেতে দিতে পারবে না।তাই বুকে উদ্বেগ নিয়ে সে এগোতে চাইলো ফুলমতির দিকে।

কিন্তু তার আগেই বাধা প্রয়োগ করলো ত্রিজয়,ন্যাক্সোরা এখন আর তার কন্ট্রোলে নেই,তাকে আর সম্মোহন করা যাচ্ছে না, কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না,এখন সামনে এগোনো মানেই বিপদ।ত্রিজয় নিচু স্বরে ডাকলো,

“ন্যাক্সোরা আমাকে শুনতে পাচ্ছো তুমি?আমি তোমাকে নেমে আসতে বলেছি।”

সাপটা শুনলো না,নাতো এবারেও নামলো বরং আরও একটা প্যাচ দিলো ফুলমতির গলায়,ফুলমতি শ্বাসকষ্টে জ্বিভ বের করে ফেললো,ত্রিজয় ধিরে ধিরে এক দুপা করে এগোতে লাগলো সাপটার দিকে,

“স্টপ!”

“স্টপ ন্যাক্সোরা।

ত্রিজয় এগিয়ে গিয়ে যেই না থাবা মেরে সাপটাকে ধরতে যাবে ঠিক সেই সময় সাপটা কামড় বসিয়ে দিলো ফুলমতির কপালের মাঝখান বরাবর।

চলবে,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here