ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ #পর্ব____________২২

0
20

#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব____________২২

ফালাক সাদের বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, সাদের নিস্তেজ শরীরটা একবার কেঁপে উঠে। স্যালাইন চলছে হাতে।শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও বড় এক বিষাক্ত যন্ত্রণা মনের ভেতরে বিষের মতো ছড়িয়ে আছে। ফালাকের কান্নায় সাদের শার্ট ভিজে একাকার।
সাদ খুব ধীরলয়ে চোখ খুলল। ঝাপসা দৃষ্টিতে সামনে দেখল ফালাককে। চোখের কাজল ধুয়ে যাওয়া এক বিধ্বস্ত মুখ। ফালাকের ছোঁয়া পেতেই সাদের মনের ভেতর দাউদাউ করে জ্বলা আগ্নেয়গিরি আবার জেগে উঠল। কাল রাতের সেই দৃশ্যটা মনের পর্দায় ভেসে উঠতেই হিতাহিত জ্ঞান হারালো সাদ।
সাদ ফালাককে জড়িয়ে ধরা তো দূর, হঠাত এক হাত দিয়ে ফালাকের ফর্সা গলাটা চেপে ধরল। স্পর্শে ছিল এক পৈশাচিক আক্রোশ আর চরম ঘৃণা। সাদের চোখ দুটো রাগে একদম লাল হয়ে আছে। হিসহিসিয়ে বলতে লাগল—

“এসেছিস কেন এখন? বল! কেন এসেছিস? ওই আরিয়ানের কাছে ফিরে যা! ওই তো তোকে সম্মান দেয়, তাই না? ওই তো তোকে রাজরানি করে রাখবে!”

সাদের আঙুলের চাপ ফালাকের গলায় জেঁকে বসছে। ফালাক ব্যথায় আর বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে সাদের দিকে তাকিয়ে আছে। সাদ থামল না, গলার স্বর আরও রুক্ষ আর কর্কশ হয়ে উঠল—

“আমি তো তোকে শুধু কষ্টই দিয়েছি ফালাক। আমি তো একটা জানোয়ার, তাই না? ওই আরিয়ানের সাথে এনগেজমেন্ট সেরে এখন এখানে এসে মায়াকান্না করছিস? কার জন্য এই নাটক?”

ফালাক যেন আকাশ থেকে পড়ল। কিছুতেই বুঝতে পারছে না এই লোকটা কী বলছে! এনগেজমেন্ট? কার সাথে? ফালাক শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে অস্ফুট স্বরে বলল—

… কী বলছেন এসব? আমি… আমি কারো সাথে এনগেজমেন্ট করিনি। আপনি ভুল বুঝছেন…

সাদ এক ঝটকায় ফালাককে নিজের ওপর থেকে সরিয়ে দিল। ওর শরীরে তখনো স্যালাইনের পাইপ লাগানো, কিন্তু রাগের চোটে ও সব ভুলে গেছে।

“Don’t lie to me, Falak! I saw it with my own eyes! You were standing there with him like a bride! You looked happy! And now you’re here to show me how much you care? Get out! Just get out from my sight!”

সাদ আবার চোখ বুজে ফেলল, হাত দুটো এখনো মুঠো করা। ফালাক মেঝেতে পড়ে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। বুঝতে পারছে না, এই লোক কি বলছে সাদ ছাড়া সে কারো সাথে নিজেকে ভাবতে পারে না। সাদ কে ফালাক ভালোবাসে কিনা জানে না তবে সাদ এর সংসার ফালাক করবে। সাদ কে ছেড়ে কখনোই যাবে না।। সাদ যতোই মারুক কাটুক সে সাদ কে ছাড়া অন্য কারো সাথে নিজেকে কল্পনা ও করতে পারে না।

সাদের মা রুমে ঢুকেই দেখলেন ফালাক মেঝেতে পড়ে অঝোরে কাঁদছে, সাদের রাগে লাল হয়ে যাওয়া চোখ আর ফ্যাকাশে মুখ দেখে সবাই শিউরে উঠল।

সাদের বাবা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সাদের পাশে দাঁড়ালেন। চাচাদের মুখটাও গম্ভীর। ফারদিন আর আয়ান ফালাককে মেঝে থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করল, কিন্তু সাদ গর্জে উঠল।

“ওকে এখনই আমার চোখের সামনে থেকে সরাও। এই মুহূর্তে ও যেন এই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়!”

সাদের মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “সাদ, ও তোর বউ! তুই জ্ঞান ফিরেই ওকে ওভাবে বের করে দিচ্ছিস?”
সাদ এক মুহূর্তের জন্য মায়ের দিকে তাকাল, কিন্তু পরক্ষণেই ওর মনের ভেতর আরিয়ানের পাশে কনে সাজে দাঁড়ানো ফালাকের ছবিটা ভেসে উঠল। মনে হলো ফালাক তাকে ঠকিয়েছে, তাকে অপমান করেছে।

সাদের এই রাগটা নতুন কিছু নয়। তারা জানে সাদের স্বভাবই এমন—উগ্র, একগুঁয়ে আর বদমেজাজি। তাই কেন সে রেগেছে, তা জানার চেয়েও তারা বেশি চিন্তিত সাদের শরীরের অবস্থা নিয়ে।
সাদ আবারও চিৎকার করে বলল

“মা! আমি বলেছি ওকে নিয়ে যাও! ও এখানে থাকলে আমার শরীর আরও খারাপ হবে। I don’t want to see her face! Just leave!”

ফালাক বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে উঠে দাঁড়াল। একবার সাদের দিকে তাকাল, সেই চোখে আজ আর ভয় নেই, আছে এক গভীর অভিমান। শাড়ির আঁচলটা মুখে চেপে দৌড়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। ফারদিন আর সাদের মা পেছন থেকে ডাকল, কিন্তু ফালাক কারো কথা শুনল না।
করিডোরের এক কোণে থাকা চেয়ারে গিয়ে ও ধপ করে বসে পড়ল। দুচোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল গড়িয়ে পড়ছে।
কেবিনের ভেতরে তখন সাদের শরীরের অবনতি নিয়ে ডাক্তাররা ব্যস্ত। সাদের চাচা নিচু স্বরে বললেন

“মদ খেয়ে রাস্তায় ওভাবে পড়ে থাকার কোনো মানে হয়? ওর এই স্বভাব কি কোনোদিন বদলাবে না? সামান্য কারণে মেজাজ হারিয়ে ও এখন জীবনটাকে বাজি ধরছে।”
সাদের বাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ওর মেজাজটাই ওর কাল। ও কাউকে বিশ্বাস করে না, কারো কথা শোনে না। আরিয়ান মেহমান ছিল, ওকে মেরে এখন নিজে হাসপাতালে পড়ে আছে। বাড়ির সম্মানের বারোটা বাজিয়ে দিল ও।”
সাদ পাথরের মতো বিছানায় শুয়ে রইল। ফালাক যে অন্য কারো হয়ে যাওয়ার আয়োজন করেছিল, তা কেন কেউ বলছে না? কিন্তু বাড়ির বড়দের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে তারা এ বিষয়ে কিছুই জানে না। সাদও ইগোর কারণে মুখ ফুটে কিছু বলল না। শুধু মনে মনে ঘৃণা ছড়াতে লাগল— মনে হলো ফালাক সবার সামনে নিজেকে ধোয়া তুলসী পাতা প্রমাণ করে রেখেছে।
এদিকে করিডোরে বসে ফালাক ভাবছে সাদের সেই নিষ্ঠুর স্পর্শের কথা। গলায় এখনো সাদের আঙুলের দাগ বসে আছে। হাসপাতালের সাদা করিডোরে রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা আনাগোনা করছে। নার্সরা ট্রলি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ফালাকের চারপাশটা যেন একদম শূন্য হয়ে গেছে।

__________
হাসপাতাল থেকে ফেরার পর মির্জা বাড়িতে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা জেঁকে বসেছে। সাদ এখন নিজ রুমে বিছানায় শুয়ে থাকে। শরীরের চোট হয়তো ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসছে, কিন্তু মনের ভেতর যে বিষাক্ত।

সাদ বিছানায় আধশোয়া হয়ে জানলার বাইরের আকাশটার দিকে তাকিয়ে থাকে। শরীরটা বেশ দুর্বল। ফালাক সারাদিন এই রুমেই থাকে। সময়মতো সাদের ওষুধ এগিয়ে দেয়, কপালে জলপট্টি দেয়, খাবার নিয়ে আসে—কিন্তু একটিবারের জন্যও সাদের চোখের দিকে তাকায় না। সাদের সাথে ফালাকের কোনো কথা হয় না, এমনকি সাদও কোনো উচ্চবাচ্য করে না। সাদ মনে মনে ভেবেছে একবার সুস্থ হোক ত শিক্ষা দেবে। সাদ কে রেখে অন্য কাউকে বিয়ে বুঝিয়ে দিবে।

ফালাক যখন সাদের ওষুধের ট্রে-টা টিপয়ের ওপর রাখল, তখন সাদ একবার আড়চোখে ফালাকের ফর্সা গলার দিকে তাকাল। সেখানে এখনো হালকা কালশিটে দাগটা রয়ে গেছে—যেটা সাদের আঙুলের চাপে হয়েছিল। ওই দাগটা দেখে সাদের বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই মাথায় সাজগোজ করা ফালাকের ছবিটা ভেসে ওঠে, যাকে সে আরিয়ানের পাশে দেখেছিল। রাগে আর অভিমানে সাদ আবার মুখ ফিরিয়ে নেয়।

____________

আয়ান ধীরপায়ে বিছানার পাশে এসে বসল। সাদের ফ্যাকাশে চেহারার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সাদের মেজাজ এমনিতে সবসময় গরম থাকে, তাই আয়ান একটু সাবধানেই কথা বলা শুরু করল।

আয়ান: “ভাইয়া, এখন কেমন আছ? শরীরটা কি একটু হালকা লাগছে?”

সাদ কোনো উত্তর দিল না, শুধু জানলার দিকে তাকিয়ে একটা ছোট হুঁশ শব্দ করল। আয়ান ইতস্তত করে আবার বলতে শুরু করল—

আয়ান: “ভাইয়া, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? ওইদিন তুমি হুট করে ওভাবে চলে গেলে কেন? আর রাস্তায় কেন ওভাবে পড়ে ছিলে? বাড়ি ফিরলে না কেন? আমরা সবাই কত অপেক্ষা করেছিলাম।”
সাদ এবার ভ্রু কুঁচকে আয়ানের দিকে তাকাল। চোয়াল শক্ত হয়ে এল। আয়ান থামল না—

“ভাইয়া, ওইদিন তো ছোট চাচু আর চাচির ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি ছিল। তুমি তো জানো ওনারা কত্ত রোমান্টিক! ওনারা চেয়েছিলেন পুরনো দিনের মতো করে আবার বিয়ে বিয়ে সাজতে। বাড়ির সবাই থিম অনুযায়ী সেজেছিল। ফালাক ভাবিকেও ওনারাই জোর করে কনে সাজিয়েছিলেন। পুরো বাড়িটা কী সুন্দর করে সাজানো হয়েছিল,
সাদের কানে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল— “অ্যানিভার্সারি ছিল… থিম অনুযায়ী সেজেছিল… কনে সাজিয়েছিল…”
সাদ মনে মনে চরম অবাক হলো। বুকটা হঠাতই ধক করে উঠল। নিজের মনেই বিড়বিড় করল—

“What?! ওটা অ্যানিভার্সারি ছিল? এনগেজমেন্ট না? (Is this some kind of joke? It was an anniversary theme? My God, what have I done?!)”

সাদের চোখের সামনে দৃশ্যটা ভেসে উঠল। ফালাক আর আরিয়ান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল ঠিকই, কিন্তু ওটা ছিল স্রেফ একটা অনুষ্ঠানের অংশ। আর সাদ? সাদ না বুঝেই ফালাকের চরিত্রে কালি লেপে দিয়েছে। তাকে জঘন্য অপবাদ দিয়েছে। এমনকি হাসপাতালের বেডে শুয়েও গলা টিপে ধরেছিল।
বুঝতে পারল, ও কত বড় একটা ভুল করে ফেলেছে।

আয়ান সাদের অস্থিরতা দেখে অবাক হয়ে বলল, “ভাইয়া? কী হয়েছে তোমার? তুমি কি কিছু বলতে চাও?”
সাদ আয়ানের কোনো কথার উত্তর দিল না।
সাদ বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করল, কিন্তু শরীর সায় দিল না। দরজার দিকে তাকাল, যেখানে ফালাক কিছুক্ষণ আগে দাঁড়িয়ে ছিল। সাদের চোখে এখন রাগের বদলে ফুটে উঠেছে এক নিদারুণ হাহাকার আর তীব্র অনুশোচনা।

আয়ান চলে যাওয়ার পর সাদ বিছানায় অস্থির হয়ে ছটফট করতে লাগল। বুকের ভেতরটা হঠাতই খালি হয়ে গেছে। ফালাকের কান্নাভেজা মুখ আর ওর গলার কালশিটে দাগটা সাদের চোখের সামনে বারবার ভাসছে।
ঠিক তখন ফালাক দরজার কাছে আসতেই সাদ একটা লম্বা নিশ্বাস নিল। ফালাক ট্রে হাতে রুমে ঢুকলে সাদ হুট করেই কাশতে শুরু করল, যেন ওর খুব কষ্ট হচ্ছে।

“পানি… ফালাক পানি দাও!”

ফালাক তড়িঘড়ি করে গ্লাসটা এগিয়ে দিল। সাদ ইচ্ছা করেই গ্লাসটা ঠিকমতো ধরল না। অর্ধেক পানি উপচে সাদের বুকে আর বিছানায় পড়ে গেল।
সাদ বিরক্তির ভান করে বলে”কী করছিস এসব? দেখছিস আমি ঠিকমতো বসতে পারছি না, আর তুই ওভাবে পানি দিচ্ছিস? আমার শার্ট ভিজে গেছে। এটা পাল্টে দে।”
ফালাক নিঃশব্দে আলমারি থেকে একটা টি-শার্ট বের করে আনল। যখন সাদের খুব কাছে এসে শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করল, সাদ স্থির হয়ে ফালাকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ফালাকের নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। সাদের খুব ইচ্ছা করল ফালাককে জাপটে ধরে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিতে, কিন্তু কোথাও একটা দম্ভ আটকে দিল।
সাদ ফালাকের হাতটা হুট করে ধরে ফেলল। ফালাক চমকে তাকাল।

“আমার মাথাটা খুব যন্ত্রণা করছে। মাথা টিপে দিয়ে দে। আর কোথাও যাবি না, এই রুমেই থাকবি। আমার কখন কী লাগে তার ঠিক নেই।”

ফালাক কিছু না বলে মাথা নিচু করে matha টিপে দিতে লাগল।
সাদ ফালাকের হাতের আঙুলগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। দেখল ফালাকের হাতে কোনো আংটি নেই—। সাদের মনে হলো বুকের ওপর থেকে বিশাল একটা পাথর নেমে গেছে। কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলল না। শুধু চোখ বুজে ফালাকের হাতের সেই শীতল স্পর্শটা অনুভব করতে লাগল।

মনে মনে বলল “Stay here, Falak. Don’t go away. I may be a monster, but I’m your monster. And I won’t let anyone else have you, even if it was just a theme.”

রুমে এক অদ্ভুত নীরবতা। সাদ শুয়ে আছে আর ফালাক যান্ত্রিকভাবে সেবা করে যাচ্ছে। কেউ কারো মনের কথা বলছে না, অথচ দুজনই দুজনের সান্নিধ্যের জন্য ভেতরে ভেতরে হাহাকার করছে।

চলবে —
( ফলো দিয়েন সবাই কষ্ট করে গল্প লিখি মূল্য নাই 😢)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here