#শেহরোজ – ২১
#ইসরাত_জাহান_দ্যুতি
***
মেজাজটা শেহরোজের বিগড়ে গেল আবারও। কঠিন এক ধমকের সঙ্গে বলে উঠল খালিদ উসমানকে‚ “কীভাবে আপনি এমন একটা ইনফরমেশন দিতে ভুলে গেলেন আমাকে? আপনি জানেন কতখানি টাইম ওয়েস্ট করেছেন আমার?”
ফোনের ওপাশে অপরাধবোধে ন্যুব্জ হয়ে আছেন খালিদ৷ আসলেই সময়টা নষ্ট হয়েছে তারই জন্য। বারবার করে বলা হয়েছিল তাকে‚ শাজের ব্যাপারে খুটিনাটি সকল তথ্যই যেন ‘অপারেশন বাংলাদেশ’ ফাইলের অন্তর্ভুক্ত থাকে। তারপরও তিনি কী করে ভুলে গেলেন? অনুচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করলেন শেহরোজকে‚ “প্ল্যান কি তবে পুরোপুরি চেইঞ্জ করতে হবে আপনাদের?”
“চেইঞ্জ করতে হবে না?” রাগে মাথা দপদপ করছে শেহরোজের‚ “আপনার এবং মেজর শেহনানের রেমার্ক কী ছিল? ব্রিগেডিয়ার ওমর ফারুক সরকার পক্ষের বিরুদ্ধে যে এভিডেন্স পেয়েছিলেন তা তিনি এমন কোনো জায়গাতে হাইড করেছেন যেটা কেবল শাজকেই জানিয়ে গেছেন তিনি। গুম হওয়ার আগ মুহূর্তে শেহনানকে এই ইঙ্গিতই তো দিয়েছিলেন‚ তাই না? আপনিও এমনটাই বলেছিলেন যে সিক্রেট কোথাও একটা আছে৷ আমিও এতদিন সেভাবেই এগিয়েছি। ভেবেছি‚ শাজের বিশ্বস্ত হওয়ার পর ওকে ম্যানিপুলেট করে সেই জায়গাটির কথা ওর থেকে জেনে নেব। যদি সেটা কোনো ব্যাঙ্ক লকার হয় অথবা এমন কোনো সিক্রেট প্লেস‚ যেটা অবধি পৌঁছনোর জন্য চাবি কিংবা শাজের ফিঙ্গারপ্রিন্ট‚ রেটিনা স্ক্যান ব্লা ব্লা লাগতে পারে। কত অলটারনেটিভ সিস্টেমকে মাথায় রেখে আমাকে এভরি ডে শাজকে ইমপ্রেস করার পেছনে সময় ঢালতে হলো। অথচ শাজ চাইল্ড প্রডিজি‚ এই মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট ইনফরমেশন আপনি যদি বলতে না ভুলে যেতেন তাহলে ওই এভিডেন্স ওর থেকে বের করার জন্য অলটারনেটিভ ওয়ে ছিল আমার।”
“বুঝতে পারছি। দোষটা আমারই। আমি আসলে নিজের সারাজীবনের সাধনাকে নিয়ে যা ভেবে রেখেছিলাম‚ তা হঠাৎ করেই ভিন্ন পরিকল্পনার অংশ হয়ে যাওয়াতে ব্যাপারটার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিলাম না। আবার ওদিকে আমার একমাত্র ভাতিজির বিপদ। দুটো বিষয় মিলিয়েই আমার মানসিক অবস্থা ছিল বিশৃঙ্খল।”
একটু দমল শেহরোজ৷ উপলব্ধি করল খালিদ উসমানের মানসিক দূরাবস্থার কথা৷ ষাটোর্ধ লোকটা নিজের পুরো জীবনই কাটিয়ে দিয়েছেন অভিনব এক গ্যাজেট তৈরির পেছনে। সফলও হলেন তাতে৷ কিন্তু তা বিশ্বের দরবারে উপস্থাপনের সুযোগ পেলেন না৷ দেশের কল্যাণে আর ভাতিজির জীবন রক্ষার জন্য চুক্তিবদ্ধ হলেন তার গ্যাজেটের বিনিময়ে৷ ব্যাপারটা মেনে নেওয়া আসলেই কষ্টকর আর সময়সাপেক্ষেরও বিষয়।
“তাহলে আপনি বলছেন”‚ খালিদ সাহেব কিছুটা সন্দিহান‚ “ওই ডকুমেন্টস শাজ অন্য কোথাও না‚ নিজের ব্রেইনে সেইভ রেখেছে?”
“স্যার”‚ খালিদ উসামনের বোকামিতে না চাইতেও বিদ্রুপূর্ণ হাসল শেহরোজ। “পৃথিবীর বিরলতম মানুষের একজন চাইল্ড প্রডিজি। যারা অল্প বয়সেই অসাধারণ মেধার অধিকারী হয়। তো মেয়ের এমন একটা ব্রেইন থাকতে ওমর ফারুকের মতো একজন ফায়ারি সেনা অফিসার কি এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করবে ডকুমেন্টস হাইড করার জন্য? আপনিই বলুন। আপনার ভাইকে আমার থেকে আপনার বেশি জানার কথা।”
লজ্জায় লাগছে নিজের বোকামির কথা ভেবে খালিদ সাহেবের৷ ঠিকই তো! রাঙামাটি থেকে ফিরে যেদিন ওমর মাত্র আধা ঘণ্টার জন্য বাসাতে আসতে পেরেছিলেন‚ ওই আধা ঘণ্টার মাঝে মূল তথ্য-প্রমাণ এমন গুপ্ত কোথায়ই বা লুকিয়ে রাখা সম্ভব—একমাত্র শাজের অসাধারণ মস্তিষ্ক ছাড়া! শাজের এই অসাধারণ মেধার কথা ওমর কোথাও প্রকাশও করেননি। এমনকি তিনি নিজেও করেননি। কারণ‚ ওমর চাননি তার মেয়েকে নিয়ে তোলপাড় শুরু হোক‚ মেয়েটার আশেপাশে কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমা হোক। আইরিনকে হারানোর পর শাজকে তিনি কখনো দূরে পাঠানোর কথা চিন্তাও করতে পারতেন না। তাই তো খালিদ সাহেবও কখনো শাজকে রাজি করাতে পারেননি—তার কাছে চলে আসার জন্য। বাবাকে ভালোবেসে বাবার বাড়িটাকে ছেড়ে কোথাও গিয়ে থাকতে চায় না মেয়েটাও।
“তাহলে এখন?” জিজ্ঞেস করলেন খালিদ।
“আগামীকাল জানতে পারবেন”‚ জবাব দিলো শেহরোজ বেশ কিছুক্ষণ পর।
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন খালিদ। হতাশ সুরে বলে উঠলেন‚ “মেয়েটা যদি আমাকে একটাবার ভরসা করে ব্যাপারটা বলত! ও আসলে ভয় পেয়ে আছে খুব। আমাকে জানালে আমার ওপর আরও বিপদ নামবে‚ এই ভয়েই আমার থেকে লুকিয়ে নিজে জীবন ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। আর ও যদি জানত ওমর ওর থেকে শেষ বিদায় নেওয়ার পর সুযোগ পেয়ে মেজর শেহনানকেও ক্লু দিয়ে গেছে‚ তাহলেই সব জানাত আমাকে।”
খুব জটিল এক পরিস্থিতির মাঝে পড়ে শাজ দুটো বছরে বহুবার ভেঙে পড়েছে আবার একা একাই নিজেকে সামলে নিয়েছে৷ কাউকে বিশ্বাস করতে না পারার মতো যন্ত্রণা আর অসহায়ত্ব তারাই উপলব্ধি করতে পারে—কেবল যারা এই সমস্যাতে ভোগে।
শেহরোজ ফোনটা কেটে দিয়ে শাজকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে বসল এসে বিছানাতে৷ যখন সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই দেশদ্রোহী কিংবা বিশ্বাসঘাতক‚ দেশের নিরাপত্তা সংস্থার শীর্ষেও একই হাল৷ তখন মেয়েটা কোথায়ই বা সাহায্যের আশা করবে আর কাকেই বা বিশ্বাস করবে? উলটে শেহনান যদি হাজির হতও ওর সামনে প্রমাণগুলো চাইতে। তাকেও শাজ বিশ্বাস করতে পারত না। বরং করাটাই নির্বুদ্ধিতা দেখাত। সেক্ষেত্রে সহজভাবে ওর থেকে তথ্যগুলো আদায় করার সুযোগই নেই৷ আর ওর বিশ্বাস বা ভরসা অর্জনটা যতটা সহজ ভেবেছিল সে আসলে ততটাও সহজ নয়৷ ভেতরটা শাজের যতই আবেগী হোক‚ ততটাই আবার দৃঢ়ও। তবে তার প্রতি শাজ খুব দ্রুতই দুর্বল হয়ে পড়ছে‚ তাকে নিজেরই অজান্তে বিশ্বাসও করছে আর আস্থাও করছে৷ কিন্তু ওই তথ্যগুলো তাকে জানিয়ে দেওয়ার মতো তাকে ভরসাযোগ্য ভাবতে বহু দেরি। যেটা আজ ভালোভাবেই বুঝেছে শেহরোজ ওর সঙ্গে কথা বলে। আবেগের বশে তখন বাবা-মায়ের ব্যাপারে মনোবেদনা প্রকাশ করে দিয়েছে বটে। কিন্তু যখনই ওমরের নিখোঁজ আর চাচা এবং ভাইয়ের প্রসঙ্গে গিয়েছে সে‚ তখনই শাজ কৌশলে প্রসঙ্গ পালটে ফেলেছে। বেশ রাগই হয়েছিল সে সময়৷ কিন্তু আজ তার কী হচ্ছে কে জানে! শাজের মুখটাতে চোখদুটো আটকালেই কারণে‚ অকারণে আকৃষ্ট হচ্ছে সে। পেছনে মাতোয়ারা সুবাস ছড়িয়ে মেয়েটা যখন চলে গেল রাতের খাবারের বাহানায়‚ তখন অপ্রতিরোধ্য এক ঝোঁক তার চেপে বসেছিল ওকে কোনো এক উপায়ে নিজের কাছে ধরে রাখার৷
গাল ফুলিয়ে বাতাস বের করে শেহরোজ মাথাটা ঝাঁকাল আর নিজেকে বোঝাল‚ “দ্য সাইনস আর নট গুড‚ ম্যান। বি কেয়ারফুল‚ শেহরোজ শায়েগান। শেষমেশ বঙ্গললনার জালে জড়িয়ো না। নয়ত ইরাজ শায়েগানের মতোই দমবন্ধ হয়ে মরবে।”
বিশাল এক হাই ছেড়ে সে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই সেন্টারটেবিলে রাখা ফাইটার ফিশের অ্যাকোয়ারিয়ামে চোখ পড়ল। শাজের ফেরত দেওয়ার কারণটা মাথায় খেলতেই হাসল ঠোঁটের কোন বাঁকিয়ে৷ কয়েক পল পরই হঠাৎ লাফিয়ে বিছানা থেকে নেমে অ্যাকোয়ারিয়ামটা হাতে নিলো। ঘড়িতে সময় দেখল রাত বারোটা বিশ। তোয়াক্কা করল না। একটা বাহানা মিলেছে শাজের ঘরে যাওয়ার। সুযোগটা হাতছাড়া করার প্রশ্নই আসে না৷
ঘর থেকে বেরিয়ে করডির ধরে এগোলো শেহরোজ৷ মাস্টার বেডরুম পার করে এসে থামল শাজের ঘরের দরজায়—দু বার ঠকঠক করল।
শাজ ঘুমায়নি তখনো ইনসমনিয়ার সমস্যা আছে বিধায়৷ আশ্চর্যভাবে শেহরোজের কথা ভাবতেই মগ্ন ছিল সে৷ এত রাতে দরজায় শব্দ পেয়ে চমকাল একটু। শুয়ে থেকেই জিজ্ঞেস করল‚ “কে? দাদী?”
“দাদীর ফিউচার গ্র্যান্ডসন-ইন-ল”‚ বলে মৃদু হাসল শেহরোজ।
তড়াক করে উঠে বসল শাজ। শেহরোজের উপস্থিতি আর কথাটা শুনে হৃৎস্পন্দনের গতি বেড়ে গেল আচমকাই। রাত-বিরেতেও এসে এভাবে জ্বালাবে না-কি এই ছেলে? চিন্তাতেই পড়ল যেন। শিথান থেকে ওড়নাটা নিয়ে গায়ে জড়াতে জড়াতে বিছানা থেকে নেমে এলো৷ দরজার কাছে এসে কপট ভারীস্বরে জিজ্ঞেস করল‚ “কী চাই?”
“তুমি কী দিতে চাও?” ওপাশ থেকে ভেসে এলো শেহরোজের দুষ্টুমি কণ্ঠ‚ “সেটাই নেবো।”
“ইয়া আল্লাহ!” বিড়বিড়িয়ে বলে উঠল শাজ‚ “তার ফ্লার্টিং মোড অন।” দরজাটা খুলতেই শেহরোজের হাতে অ্যাকোরিয়াম দেখে সে ভ্রু কুঁচকাল আর শেহরোজ মুচকি হাসল। ওকে বলল‚ “ইট’স নট গুড টু রিফিউজ সামওয়ান’স গিফট। সে তাতে দুঃখ পায়‚ শেহজাদি খানাম।”
“এখন আবার শেহজাদি হয়ে গেলাম?” কৃত্রিম বিস্মিতভাব দেখাল শাজ।
শেহরোজ মুচকি হাসি ঠোঁটে মেখেই বাড়িয়ে দিলো অ্যাকোয়ারিয়ামটা। শাজ না নিয়ে বলল‚ “ফেরত যেহেতু দিয়েছিই আপনার কাছেই রাখুন।”
“শাজ”‚ হাসিটা গায়েব হয়ে গেল শেহরোজের। শীতল গলায় জানাল‚ “আমি অপমানবোধ করছি।”
“তো এটা কাল সকালে দিলেও তো হত”‚ বলতে বলতে সে নিয়ে নিলো ওটা।
“কিন্তু এখন তো আসা হত না।”
ঝট করে চাইলো শাজ ফাইটার ফিশ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে। নিশ্চুপ শেহরোজের চোখে চোখ রাখতেই মনে হলো ওর‚ কিছু বলছে ওকে চোখদুটো। জিজ্ঞেস করল তাকে‚ “এখন আসতে পেরে কী হলো?”
জবাবে আরও কিছুক্ষণ নীরবে নিষ্পলক চেয়ে রইল শেহরোজ। তারপর হঠাৎ শাজকে চমকে দিলো হাত বাড়িয়ে ওর মধু বাদামী রঙা চুলের মাঝে গুঁজে থাকা বুস্তানির পালক তুলে নিয়ে। ওকে আরও চমকে দিয়ে কাছে এসে দাঁড়াল সে। ওর মসৃণ গালের পাশ ছুঁয়িয়ে পালককে ধীরে ধীরে নামিয়ে আনল কামুকতাপূর্ণ পুরু অধরে… চিবুকে… চিবুক ছুঁয়িয়ে গলায়। গলা থেকে বুকের কাছে যাওয়ার পূর্বেই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসা শাজ চকিতেই পালকটা ধরে ফেলল শক্তভাবে৷ তখনই শেহরোজ মুখটা নামিয়ে এনে কোমল গালের সঙ্গে তার গালটা মেশাল আর মৃদুস্বরে বলল‚ “আই বিলিভ‚ ইউ হ্যাভ নেভার সিন দ্য মোস্ট এক্সপেনসিভ রোজ ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। বাট আই অ্যাম লসিং মাইসেল্ফ টু হার ফ্রেগ্রেন্স এভরি মোমেন্ট। শাজ‚ উইল ইউ অ্যাডমিট ইউ আর মাই জুলিয়েট রোজ?”
“জুলিয়েট রোজ?” সম্মোহিতার মতো আওড়াল শাজ।
“মাই জুলিয়েট রোজ”‚ কর্তৃত্বের সুরে শেহরোজ ফিসফিসিয়ে আকস্মিক আলতো চুমু খেল শাজের গালের মাঝে৷
সম্বিৎ পেলো যেন শাজ এই উষ্ণ স্পর্শেই। তবে ওর প্রতিক্রিয়ার পূর্বে শেহরোজই নিজ দায়িত্বে দূরত্বে চলে এলো। ওর বিস্ময়াবিষ্ট মুখপানে একটুক্ষণ দৃষ্টি বুলাল। তারপর প্রস্থান করল সে নীরবেই। আর তার যাত্রাপথে জড়ী-ভূত শাজ চেয়ে রইল বিস্ফারিত চোখে।
#নোট__ আজকের পর্ব ছোটো হলেও অনেক কিছু ভাবার মতো ক্লু রেখেছি৷ সেগুলো নিয়ে ভাবার অবকাশ দিলাম। ভেবে যা মনে হয় জানাবেন কমেন্টবক্সে৷ আমি দেখার অপেক্ষায় থাকব কিন্তু।

