#গুপ্ত_প্রেমের_সুপ্ত_পিয়াসা” 🖤|১১|
#শার্লিন_হাসান
সকাল বেলা জিম থেকে ফেরার পথে একটা ছোট ছেলের সাথে দেখা হয় আদনানের। যার হাত ভর্তি তাজা ফুল।
তাকে দেখা মাত্রই বাইক থামায় আদনান। কাছে ডেকে নাম জিজ্ঞেস করে। ছেলেটা জানায় তার নাম, “সায়ান”। আদনান সায়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে, ” স্কুলে যাওনা কেন?”
সায়ান মৃদু হেঁসে জবাব দেয়, “বাবা ছাইড়া গেছেগা। পরিচয় দেয়না। আম্মা আর আমি থাহি। আম্মার অসুখ এরলাইগা ফুল বেচতে বেরইছি।”
আদনান একটা সূক্ষ্ম দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। সায়ানকে জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে মায়ের?”
“জ্বর অইছে।”
“ঔষধ নিয়েছ?”
“আইজকা ফুল বিক্রি কইরা নিমুনে।”
আদনান ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে বলে, “কত করে ফুলগুলো?”
“বেলির মালা দশ টাকা কইরা।”
“সকালে নাশতা করেছ?”
“না। ফুল কিন্না আনছি।”
আদনান সায়ানকে বাইকের পেছনে উঠতে বলে। সায়ান নাকচ করে দেয়। সে যাবেনা কোথাও। আদনান আশ্বাস দিতে,সায়ান উঠে বসে। নাশতা করার জন্য পাশের একটা রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করে দু’জন। আদনান সকালে বেরিয়েছে,এখনো নাশতা করা হয়নি। সেজন্য সায়ানকে নিয়ে, সকালের নাশতা সারে। সাথে নাশতা পার্সেল করে নেয় সায়ানের মায়ের জন্য।
ঔষধের দোকান থেকে ঔষধ নেয় সায়ানের অসুস্থ মায়ের জন্য। সেই সাথে কিছু টাকা সায়ানের হাতে ধরিয়ে দেয় আদনান। বিনিময়ে ফুল উপহার দেয় সায়ান। আদনান গোলাপ হাতে নিলে,সায়ান বেলির মালা এগিয়ে দিয়ে বলে, “ভাবিকে দিয়েন। খুশি হইবো।”
আদনান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলে, “তোকে কে বলেছে আমি বিয়ে করেছি?”
“ওমা বিয়ে করেননাই?”
“নাহ্।”
সায়ান আদনানের বাইকটার দিকে তাকায়। কী সুন্দর লাগছে বাইকটা। আদনান সায়ানের দৃষ্টি পরখ করে। সায়ান বলে, “একদিন আমিও টাকা কামামু,আপনের মতো বাইক কিনমু।”
“ইনশাআল্লাহ।”
আদনান কথাটা বলে কিছুটা থামে। তার কথায় সায়ান জবাব দেয়, “দোয়া করবেন ভাই।”
“আচ্ছা।”
আদনান ফুল হাতে বাইক স্টার্ট দেয়। একটা বউ থাকলে তো ফুলগুলো দিতে পারত। ভেবে মুচকি হেঁসে বাসায় ফিরে সে। তৃপ্তি, ইলমা দু’জনেই কলেজ গিয়েছে। সেজন্য বাসা ফাঁকা। আদনান নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ফোনটা হাতে নেয়। সবার আগে জেভিনকে আনফ্রেন্ড সাথে ব্লক মারে। ফেসবুক,হোয়াটসঅ্যাপ, ইন্সটাগ্রাম সবকিছু থেকে। শুয়ে,শুয়ে ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে মেয়েদের আনফ্রেন্ড করতে থাকে। কিছুক্ষণ আনফ্রেন্ড করে বিরক্ত হয় আদনান। এতো মেয়েমানুষ কেন যে লিস্টে নিয়েছিলো সে! নিজের প্রতি নিজেরই রাগ লাগছে।
ফাইজা, ফরিদা পারভীনের সাথে ইলমা বিষয়ে আলোচনা করছে। মূলত ইলমার বিয়ে-শাদির কথা তোলে ফাইজা। ফরিদা পারভীন বিরক্ত হয়ে বলেন, “আগে তৃপ্তির বিয়া দেমু, এরপর জেরার বিয়া। আমার নাতনির বয়স অইছে নাকী বিয়ার?”
“আঠারো হয়ে গেছে। আর কত বয়স চান আপনি?”
“তুমি কোন কথা কইবা না জেরার বিষয়ে। কয়দিন দায়িত্ব পালন করছিলা, যে বিয়ের জন্য লাফাইতাছো? আমার নাতনি ডারে মারো নাই? কম মারছো? কম খারাপ ব্যবহার করছো? এহন কম ঝামেলা করো নাকী ইনানের লগে।”
ফাইজা অপমান বোধ করে। মূহুর্তে মনের ভেতর একরাশ হিংস্রতা জন্ম নেয়। এই মূহুর্তে ইলমাকে পেলে কী যে করতেন তিনি। ফরিদা পারভীনের উপর কিছুটা চটে বলেন, “যখন মান-সন্মান নিয়ে টানাটানি পড়বে তখন বুঝবেন আমার কথার মানে।”
ফাইজা উঁচু গলায় কথা বলায় ফরিদা পারভীন কাঠকাঠ গলায় জবাব দেন, “জেরার বিষয়ে নাক গলাইবা না।”
তাঁদের চিৎকার শোনে আদনান রুম থেকে বেরিয়ে আসে। ফাইজাকে দেখে মেজাজ চড়ে যায়। বিরক্তি নিয়ে ফরিদা পারভীনকে বলে, “দাদীন কী হয়েছে? চিৎকার করছ কেন?”
“দেখ নাতি,ফাইজা কইতাছে,জেরার বিয়ের কথা। আমার নাতনি নাকী মান সন্মান খোয়াইবো। জেরা কী এমন? তুই বল?”
তখন ফাইজা জবাব দেয়, “ইলমা কী দূধের ধোঁয়া তুলসীপাতা নাকী? কম গুন গান গাইবেন। এখনকার মেয়েমানুষ সুবিধার হয়না।”
“আপনার সমস্যা টা কী?”
গলা উঁচু করে বলে আদনান। ফাইজা জবাব দেয়, “আমি শেখ পরিবারের সন্মানের কথা ভাবছি।”
“রাখেন আপনার সন্মান। মেলিচার ব্যপারে দশ হাত দূরে থাকবেন। ওর বিয়ে কখন দিবে না দিবে বাবা-চাচ্চু ভাববে। তারচেয়ে চেষ্টা করেন মনের হিংসা কমিয়ে ব্যবহারটা ভালো করতে পারেন কি-না।”
“আদনান বেয়াদবের মতো আচরণ করছ কেন?”
“এই শোনেন, মেলিচাকে নিয়ে উল্টাপাল্টা বললে, আমি আপনাকে নমস্কার করতে পারব না। আমাকে ক্ষেপাবেন না পরে পস্তাতে হবে।”
“চরম বেয়াদব তুমি। মেলিচার জন্য এতো দরদ প্রকাশ করছ যে, সুবিধার লাগছেনা। ইনান আসুক আজকে।”
“উল্টাপাল্টা কিছু বললে আগুন জ্বলবে আপনার সংসারে সাথে এই বাড়িতে। মাইন্ড ইট।”
চিৎকার করে কথাটা বলে আদনান। ফাইজা চুপসে যায়। ফরিদা পারভীন আদনানকে বলেন, “রুমে যাও নাতি। কথা বাড়াইয়ো না।”
আদনান অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ফাইজার দিকে। ফাইজা ঈশিতাকে ডেকে আনে। আদনানকে নিয়ে অভিযোগ করে। বেয়াদব হয়েছে। বড়দের সন্মান দিতে জানে না। কীভাবে কথা বলতে হয় শেখেনি।
ফরিদা পারভীন পুরো ঘটনাই বলেন। তাতে ঈশিতা আদনানকে বকা-ঝকা করেন। ফাইজাকে তেমন কিছুই বলেননি তিনি।
আদনান রুমে এসে ইলমার আসল মা’কে বকতে থাকে। প্রেমের জোয়ার এতো বেশি ছিলো যে, চলেই যেতে হয়েছে। কী পাষাণ হৃদয়ের ছিলেন তিনি। ইলমার কথা কী সত্যি মনে পড়ে না?
★★★
বিকেলে ইলমা বাসায় আসলে সব নিরব নিস্তব্ধ পায়। নিজের রুমে প্রবেশ করে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। অগোছালো রুমটা দেখে নাক-মুখ কুঁচকে নেয়। কাঁধের ব্যাগ ফেলে চেঞ্জ করে,শাওয়ার নেয়। এরই মাঝে ফরিদা পারভীন ডাকতে থাকেন, খাবার খাওয়ার জন্য। ইলমা বেশি দেরি করেনা,খিদে লাগায়, তাড়াতাড়ি খেতে বসে।
ফরিদা পারভীন সামনের চেয়ারে বসে ইলমার খাওয়া দেখছেন। বেশি করে খাওয়ার জন্য বকাঝকাও করছেন। এতো কম করে কেউ খায় নাকী?
ফরিদা পারভীনের বকা শোনে ফাইজা রুম থেকে বেরিয়ে আসে। ইলমা বেশি খেতে পারেনি। সেজন্য এঁটো ভাতে পানি ঢালে। তখন ফাইজা সুযোগ বুঝে খোঁচা মে’রে বলেন, “আরো কত অন্ন ধ্বংস দেখতে হবে। একবারে গাড়ের উপরে বসে অন্ন ধ্বংস করছে। নিজে রান্না করলে আর টাকা ইনকাম করলে বুঝতো ভাতের দাম।”
ফাইজার কথায় ফরিদা পারভীন জবাব দেন, “ইনান আসুক আজকে। তোমার সাহস বেশি বাড়ছে ফাইজা। জেরারে নিয়ে এতো সমস্যা তোমার।”
ইলমা ফরিদা পারভীনকে থামিয়ে বলেন, “কিছু বলতে হবেনা দাদী। ঝামেলা দেখতে ভালো লাগেনা।”
ফাইজা সেসব কানে তোলেনি। সোজা নিজের রুমে চলে গেছে। ইলমা বেশীক্ষণ দাঁড়ায়নি। নিজের রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। কথার আঘাত মারাত্মক হয়। যা তীরের আঘাতের থেকেও বেশি ক্ষত সৃষ্টি করে। তীরের আঘাতের ক্ষত একটা সময় শুকিয়ে যায় কিন্তু কথার আঘাতে ক্ষত,জনম ভর অক্ষত থাকে।
মূহুর্তে ইলমার সবকিছু জেনো এলোমেলো হয়ে যায়। ক্লান্ত দেহ,অবসন্ন মন, বিষাক্ত কথার আঘাত সব মিলিয়ে নিজেকে অস্বাভাবিক লাগছে। চোখ বেয়ে অশ্রু ঝড়ছে আপন গতিতে। ইলমা ফ্লোরে ধপ করে বোসে পড়ে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি যতবার মুছছে ততোবারই তা অবাধ্য হয়ে নতুন করে চোখ বেয়ে গড়িয়ে পরছে। বারবার নিজের ভাগ্যকে নিয়ে অভিযোগ আসে। এই যে এতো সুন্দর দেখতে মানুষগুলো, তার পরিবার অথচ কারোর মনেই দুদণ্ড শান্তি নেই। সব বিষয়ে একটা না একটা কোলাহল, অশান্তি রয়েছে।
ইলমা বুঝতে পারছেনা, ভাগ্যকে দোষ দিবে নাকী সময়কে? মাত্র ছয়বছর বয়সে বাবা মায়ের বিচ্ছেদ দেখেছে সে। মানসিক ভাবে ধাক্কা খেয়েছে । যেটার শোক এখনো মনের মাঝে রয়ে গেছে। বাবার নতুন বিয়ে,সৎ মায়ের অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহার মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে। কত না খেয়ে স্কুল যেতে হয়েছে। কলেজেও তার ব্যতিক্রম হয়না।তাকে নিয়ে বাবা এবং মায়ের মাঝে ঝামেলা, দূরত্ব, মান-অভিমানও দেখেছে। এইটুকু জীবনে অনেক কিছুর সাধ পেয়েছে সে।
শুধু দাদী আর বাবার সাপোর্টে এখনো হাসিমুখে রয়েছে সে। তবুও নিশির আগমন হলে, চারপাশ যখন তমসায় ডুবে যায় তখন চোখ এবং মন দুটোই নিরব আর্তনাদের প্রতিযোগিতায় নামে।
অনেক্ক্ষণ নিরব অশ্রু বিসর্জন দেওয়ার ফলে ইলমার মাথায় অসম্ভব যন্ত্রণা শুরু হয়। ইলমা উঠে চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে নেয়। ব্যালকনিতে গিয়ে ঠান্ডা বাতাসের আশা করে। কিন্তু তার বদলে সিগারেটের বাজে গন্ধ নাকে ঠেকে। ইলমার বুঝতে বাকী নেই গন্ধটা কোথা থেকে এসছে। পাশে ফিরতে আদনানকে দেখে। তাঁদের ব্যালকনি পাশাপাশি হওয়ায় গন্ধটা সহজেই চলে এসেছে। ইলমাকে তাকাতে দেখে আদনান সিগারেটটা আড়াল করে। ইলমা একনজর আদনানের দিকে তাকিয়ে রুমে চলে আসে। আদনান পুনরায় সিগারেটটা ঠোঁটে চেপে ধরে তার ধোঁয়া নেয়। পুনরায় সেগুলো শূন্যে ছেড়ে দিয়ে, দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। বুকের বা পাশে হাত রাখতে সেখানে চিনচিন ব্যাথা অনুভব করে।
#চলবে
যারা আদনান -ইলমাকে মিস করবেন তারা চাইলে “বুকপকেটের মায়াবিনী” বইটা কিনতে পারেন। যখন খুশি তখন বইটায় আদনান-ইলমাকে পড়তে পারবেন। তারা সবসময় আপনার সাথেই থাকবে। বইটা অর্ডার করতে ম্যাসেজ
https://www.facebook.com/boiprangon1
আমার গ্রুপ লিংক,
https://m.facebook.com/groups/582123563029858/?ref=share&mibextid=NSMWBT

