#গুপ্ত_প্রেমের_সুপ্ত_পিয়াসা” 🖤|৩৯|
#শার্লিন_হাসান
টানা চারদিন জয়, ইনান শেখকে বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকি-ধমকি দিয়েই চলছে। একেকদিন একেক নাম্বার থেকে কল আসতেই থাকে। ইনান শেখ ভীষণ বিরক্ত জয়ের কাজকর্মে।
যেখানে আদনানের মতো ছেলেকে,মেয়ের পিছু ছাড়াতে কয়েক মূহুর্ত সময় লেগেছে। সেখানে জয় কোথাকার কে? জয়ের একটা ব্যবস্থা করবেন বলে ঠিক করেন ইনান শেখ।
শুক্রবার দিন। সকাল থেকে শেখ পরিবারের রান্নাবান্নার আয়োজন চলছে। আজকে ফাতিহা, ফারিশ শেখ নিবাসে আসবে। ফারিশ আসবে শুনে, ইনান শেখের মনটা ভালো হয়ে গেছে। ভাগিনার সাথে বসে দুই মিনিট আড্ডা দিলে এমনিতেই মন খুশি হয়ে যায়। ইনান শেখের কাছে ফারিশ ভীষণ ভালো লাগার একজন মানুষ। নম্র-ভদ্র, গুরুজনদের সন্মান করে চলা ছেলে ফারিশ।
ঠিক দুপুরে ফারিশ এবং ফাতিহা আসে শেখ নিবাসে। সবার সাথে কুশলাদি বিনিময় করে সোফায় বসে মা-ছেলে দু’জন। সাথে আছে, ইনান শেখ এবং ফরিদা পারভীন।
তাঁদের খোশ গল্পের মাঝে আদনান এবং তারেক মাহমুদ মসজিদ থেকে বাসায় এসেছে। আদনান ফারিশকে দেখে বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে নেয়। ইনান শেখের দিকে তাকাতে দেখে উনি বেশ মনোযোগ সহকারে ফারিশের কথা শোনছেন।
আদনান এসে দাদীর পাশে বসে। ফাতিহা আদনানকে দেখে বলে, “কী খবর বাবা আদনান?”
আদনান মুচকি হেঁসে বলে, “ভালো। আপনার?”
“ভালো।”
আদনান কিচেনের দিকে তাকায়। তৃপ্তি এবং ইলমা খাবার টেবিল সাজানোর কাজে ব্যস্ত। সেজন্য কিচেনে আসা যাওয়ার ভেতরে আছে।
সূক্ষ্ম দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে সবার সাথে খেতে বসে আদনান। ইলমা,তৃপ্তি, ফাতিহা শেখ পাশাপাশি বসা। আদনান কিছুক্ষণ পরপর ইলমাকে পরখ করছে। মাঝেমধ্যে ইনান শেখের দিকেও আঁড়চোখে তাকাচ্ছে।
খাওয়া শেষ হতে সবাই সোফায় বোসে। তারেক মাহমুদ ফাতিহাকে বলেন, “এখনি, ফারিশের বিয়ে-শাদি নিয়ে ভাবছ। এখনো তো, বাড়ির কাজ ধরোনি বা নিজস্ব ফ্লাট কিনোনি। বিয়ের পর তো খরচ বাড়বে, তখন কোনটা রেখে কোনটা করবে?”
ইনান শেখ ভাইয়ের কথায় ফারিশের দিকে তাকায়। ফাতিহা চটজলদি বলে, “এতো চিন্তা কিসের? ওই বিল্ডিংয়ের ফ্লাট তো আমিও পাই। এছাড়া ভাইঝি নিচ্ছি, আরো আগে ফ্লাট পাব।”
তারেক মাহমুদ ফাতিহার কথায় খুশি হোননি। জবাব দেন, “সেটা ইনান বুঝবে। নিজের মেয়ের হবু বরকে বিয়েতে ফ্লাট গিফট করবে নাকী গাড়ি। তুমি নিজের কথা ভাবো।”
আদনান মুখে হাত দিয়ে মিটমিট হাসছে। যখন ফাতিহা ফ্লাটের কথা তুলেছিল, ইনান শেখের চেহারা দেখার মতো ছিলো। আদনান আর বসে থাকতে পারেনি। উঠে দাঁড়ায়। হেলেদুলে হেঁটে, ইনান শেখের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বলে, “যৌতুক বিরোধী বাবা,মেয়েকে যৌতুক দিয়ে বিয়ে দিবে।”
তখন ফাতিহা আদনানের কথায় বলে, “যৌতুক কী? আমিও তো ফ্লাট পাই, আবার ইলমাও পায়।”
ফাতিহার কথায় ফারিশ ধমকে বলে, “কিসের ফ্লাট? তুমি চুপ থাকো। মেয়ে দিবে এটা কম কী? আমার ইলমা হলেই চলবে। আর কিছু লাগবেনা।”
ফারিশের কথায় ইনান শেখ খুশি হোন। ফাতিহা আর কিছু বলেনি। তারেক মাহমুদ উঠে যান সেখান থেকে। ইনান শেখ,ফারিশের সাথে গল্পগুজবে মেতে উঠেন।
★★★
তৃপ্তি, ইলমা আড়ংয়ে যাবে। সাথে ফাতিহা এবং ফারিশও আসবে। এনগেজমেন্টের জন্য টুকটাক কেনাকাটা করার জন্য।
বাইরে বেশ গরম। সেজন্য ইলমা হিজাব সেভাবে বাঁধেনি। মাথা ঢেকে মুখ খোলা রেখেছে। তৈরি হয়ে, তৃপ্তির সাথে বেরিয়ে আসে। তাদের দু’জনকে বেরুতে দেখে আদনান নিজেও পেছন দিয়ে আসে। ইলমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। ইলমার নজরে আদনানের হাসি আসলেও ভালো করে দেখেনা। আদনান ইলমার সামান্য এড়িয়ে চলাটাও উপলব্ধি করছে। খুব নিরবতা নেমেছে তিনজনের মাঝে। এরমাঝে নিরবতা ভে’ঙে ইলমা রিকশা দাঁড় করায়। তৃপ্তি সহ উঠে চলে যায়। আদনানও আরেকটা রিকশা দাঁড় করায়। সে বেমালুম ভুলে গিয়েছিলো, তার যে বদইক আছে। আর সে,বাইক নিয়েই বাইরে বেরহয়।
তৃপ্তি, ইলমা এসেই দেখে ফারিশ আগে থেকে অপেক্ষা করে আছে। দু’জনে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। ইলমা ফারিশকে জিজ্ঞেস করে, “ফুফু আসেনি?”
‘একটু অসুস্থ।”
ইলমা সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকায় ফারিশের দিকে। একনজর পরখ করে। কানে ব্লু টুথ গুঁজে রেখেছে। ফারিশ মুচকি হেঁসে ইলমাকে বলে, “চলো ভেতরে যাই।”
তৃপ্তি সহ তারা তিনজন ভেতরে যায়। দোকান ঘুরে,ঘুরে শাড়ি পছন্দ করে। অনেকক্ষণ সময় ঘুরাঘুরি করে, তিনজনই ক্লান্ত। সেজন্য আইসক্রিমের দোকানে গিয়ে বসে। ফারিশ আইসক্রিম অর্ডার দেয়। কলে কাকে জেনো বলছে, “আইসক্রিমের স্টলে এসেছি। এরপর বেরিয়ে যাচ্ছি। আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো।”
তিনজন খাওয়া শেষ করে বেরিয়ে যায়। ফারিশ বাইরে এসে ইলমা-তৃপ্তিকে একটা রিকশায় তুলে দিয়ে হাত নাড়ায়। বাঁকা হেঁসে আওড়ায়, “সুন্দর শাড়িটা আজকে তোমার গায়ে যেভাবে স্যুট করেছে, আগামীতে আর করবে না।”
তৃপ্তি, ইলমার রিকশা শহর পেরিয়ে মোড় নেয়। সেদিকের রাস্তাঘাট কিছুটা সুনশান নিরব। শহর থেকে কিছুটা সাইডে তাঁদের বাড়ি। সামনের প্লট গুলো এখনো খালি। তেমন কেউ বাড়ি করেনি। সেই নিরব-নিস্তব্ধ জায়গাটাই ইনান শেখ, বেছে নিয়েছেন বাড়ির জন্য। শহরের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে থাকবে।
রিকশার সামনে দাঁড়ানো মাইক্রো। মাইক্রোর সামনে দাঁড়ানো জয় আবরণ এবং তার কিছু সাঙ্গপাঙ্গরা। জয়কে দেখে ইলমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। তৃপ্তির হাত খামচে ধরে। জয় কিছুটা তেড়ে আসে। এসেই ইলমার হাত খপ করে ধরে টান দিয়ে রিকশা থেকে নামায়। যার দরুন ইলমা হাত-পায়ে ভীষণ ব্যাথা পায়। জয় তৃপ্তির দিকে তাকায়। পুনরায় ইলমার দিকে তাকিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “তোর বাপ তো ত্যাড়া মাগীরপুত। কী মনে করেছে, এতো সহজে তোকে ছেড়ে দেব? অনেককষ্টে তোর সন্ধান পেয়েছি। চল, তোর ইজ্জত নিয়ে লুডু খেলা যাক।”
ইলমা হাত মোচড়ামুচড়ি শুরু করে দেয়। রিকশাওয়ালা এগিয়ে আসতে গেলে তাকে সরিয়ে দেয় জয়ের লোকেরা। মারধর শুরু করে দেয়। তৃপ্তি তড়িঘড়ি আসে ইলমার কাছে। ইলমার হাত শক্ত করে টেনে ধরে। ইলমার হাত ধরায় জয় বিরক্ত হয়। বা হাতে ঠাস করে থাপ্পড় মারে তৃপ্তির গালে। পুরুষালি হাতের থাপ্পড় খেয়ে তৃপ্তির জেনো পৃথিবী দুলছে। নিজের তাল সামলাতে পারেনি। সোজা রিকশার হাতলের সাথে কপালে বা’রি খেয়ে নিচে পড়ে যায়।
ইলমা জয়ের দিকে তাকিয়ে, থুতু ছুঁড়ে মারে। জয়ের সাথে না পেরে, হাতে কামড় বসিয়ে দেয়। কিন্তু জয় তাতেও হেলদোল করেনা। চোখ দিয়ে ইশারা করলে, একজন ফোন হাতে ভিডিও ধরে। সাথে,সাথে জয়
অন্য হাত দিয়ে ইলমার হিজাব টেনে খুলে ফেলে। ইলমা বাকরুদ্ধ হয়ে শুধু তাকিয়ে রয়। জয় মূহুর্তে ইলমার গলা চেপে ধরতে ইলমা, জয়ের হাতে চখের আঁচড় কাটে। মূহুর্তে জয় ইলমার হাত ছেড়ে দেয়। জয়ের থেকে ছাড়া পেয়ে ইলমা চিৎকার করতে যাবে, তখনি তারদিকে ছোট্ট কাঁচের বোতল থেকে তরল পদার্থ ছুঁড়ে মারা হয়। ইলমা মুখ ঘুরিয়ে হাত দিয়ে ঢেকে নিলে তার হাতে এবং গালের একপাশে এসে তরল পদার্থ পড়ে। জয় হো হো করে হেঁসে উঠে। ইলমার তলপেট বরাবর লাথি মেরে তাকে নিচে ফেলে দেয়। খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে, “ভেবেছিলাম, তোর ভার্জিনিটি নষ্ট করতে,করতে ভিডিও মেক করব। সেটাতে ঠিক মন ভরবেনা আমার। এখন কে বিয়ে করবে তোকে? ওই ফারিশ? নাকী আদনান?”
কথাটা বলে জয় গাড়িতে বসে। রিকশাওয়ালাকে মেরেছে তার সাঙ্গপাঙ্গরা। তৃপ্তিও একপাশে অচেতন প্রায়। ইলমার চোখ এবং গালের একসাইড ঝলসে যাচ্ছে। যন্ত্রণায় সে, হৃদয়বিদারক চিৎকার করেই যাচ্ছে। তৃপ্তি ইলমার দিকে এগিয়ে আসে। তার অবস্থা দেখে কেঁদে ফেলে তৃপ্তি। মেয়েটা পিচ ঢালা রাস্তায় পড়ে আর্তনাদ করছে। তৃপ্তি ফোন হাতে, ইনান শেখকে কল দেয়। কিন্তু কল তোলে না। তৃপ্তি আদনানকে কল দেয়।বার কয়েক রিং হতে আদনান ফোন তোলে।
আদনান “হ্যালো” বলতেই, তৃপ্তির ভেজা কন্ঠস্বর কামে আসে। আদনানের বুকটা ধক করে উঠে। তড়িঘড়ি জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে তৃপ্তি?”
“ইলমা! প্লিজ তাড়াতাড়ি আসো।”
“কী হয়েছে মেলিচার?”
“আসো না।”
চিৎকার করে বলে তৃপ্তি। আদনান আর একমুহূর্তও দাঁড়ায়নি। তড়িঘড়ি রিকশা ধরে বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হয়। শহর পেরিয়ে, সুনশান নিরব নিস্তব্ধ রাস্তায় আসে। আদনানের মনে হচ্ছে, আজকের পথ ফুরাচ্ছেনা। ঘড়িতে সময় দেখছে আর রিকশাওয়ালাকে তাড়া দিচ্ছে।
আদনান মাঝরাস্তায় তৃপ্তিকে বসে থাকতে দেখে রিকশা থেকে নেমে যায়। কাঁপা কাঁপা পায়ে, সামনে এগোতে দেখে ইলমা আর্তনাদ করছে। পাশে রিকশাওয়ালা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তৃপ্তি কেঁদেই চলেছে।
আদনান কাঁপা কাঁপা হাতে নির্মাণকে কল দেয়। মুখ দিয়ে কথা বেরুচ্ছেনা তার। নির্মাণ কল রিসিভ করতে আদনান শুধু বলে, “একটা এম্বুলেন্স নিয়ে, বাড়িতে আয়।”
কল কেটে ইলমার পাশে বোসে। ঝলসানো হাতটা, নিজের কাঁপা কাঁপা হাত দিয়ে স্পর্শ করে। পাশে তাকিয়ে ইলমার হিজাবটা হাতে নিয়ে বুকের উপর রাখে। নিজের বৃদ্ধাঙুল দিয়ে, ইলমার চোখের পানি মুছে দেয়।
আদনান একপলকে ইলমাকে দেখছে। তৃপ্তিকে কোনরকম প্রশ্ন করছেনা।
নির্মাণ আসতে, ইলমাকে এম্বুলেন্সে তোলা হয়। সাথে রিকশাওয়ালা মামাকেও ধরাধরি করে এম্বুলেন্সে উঠানো হয়। তৃপ্তি, আদনান,নির্মাণ তিনজন সাথে যাচ্ছে।
খুব দ্রুত গতিতে হসপিটালে নিয়ে আসা হয়। ইলমাকে ইমার্জেন্সিতে পাঠানো হয়। আদনান কল নিয়ে ব্যস্ত। তৃপ্তির মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। সামনের সব ঝাপসা মনে হচ্ছে। করিডোরের সামনে নির্মাণের পাশে দাঁড়ানো ছিলো সে। তৃপ্তি ঠাস করে নিচে পড়তে যাবে, নির্মাণের
নজরে আসলো তড়িঘড়ি তৃপ্তির হাত ধরে। আদনানকে ডাক দিলে, সে কথা কানে তোলেনা। কলে কথা বলছে। নির্মাণ, তৃপ্তির হাত ধরে তাকে একটা কেবিনে নিয়ে আসে। এনেই শুইয়ে দেয়। নার্সকে ডেকে ট্রিটমেন্ট করতে বলে।
করিডোরের চেয়ারে বসেছে আদনান। চিন্তায় মস্তিষ্ক শূন্য প্রায়। মিনিট দশেকের মাঝে হসপিটালে উপস্থিত হয় শেখ পরিবারের সবাই। মূহুর্তে হাউকাউ শুরু হয়ে যায়। ফরিদা পারভীন কান্না করছেন।
তারেক মাহমুদ এসেই ইনান শেখকে বকা শুরু করেন। ইলমা-তৃপ্তিকে কেনো একা ছেড়েছে ফারিশ? আর ফাতিহা যায়নি কেন? ফারিশের জ্ঞানবুদ্ধি কী সব লোপ পেয়েছে?
আদনান তারেক মাহমুদের দিকে তাকিয়ে, চোখ দিয়ে ইশারা করে থামার জন্য। ইনান শেখ মেয়ের চিন্তায় চোখের পানি ছেড়ে দেন। নিজের অতিরিক্ত ইগো আর রাগের ভুক্তভোগী তার মেয়ে ইলমা।
তৃপ্তির কাছে আসে ঈশিতা এবং ফাইজা। পাশে সোফায় বসে আছে নির্মাণ। ঈশিতা তৃপ্তির পাশে বসে। নিজের হাতের মুঠোয় মেয়ের হাত নিয়ে তাতে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মুচকি হেঁসে বলেন, “সাহস রাখো। একদম কিছু হবেনা।”
ফাইজা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়প রয় মা মেয়ের দিকে। মূহুর্তে ইলমার কথা স্মরণ হয়। সেই মেয়েটাও তো বিপদের মূহুর্তে তার মায়ের একটুখানি ছায়া,আদরমাখা ভালোবাসা চায়। আর একটু খানি সাহস!
ফাইজা কখনো ইলমার প্রতি মায়ের দায়িত্ব পালন করেনি। না মায়ের মমতা দিয়েছি। না কখনো স্নেহময় চোখে তাকিয়ে, আদুরে ভঙ্গিতে ইলমাবলে ডেকেছে। কখনো ইলমার নাম মুখে তুলেছে কীনা সন্দেহ। ফাইজার চোখে ইলমা, সবসময় বিষাক্ত কীট ছিলো।
আজকের জেনো তার মাতৃত্ব জেগে উঠেছে। ইলমার জন্য হৃদয় কাঁদছে। খারাপ লাগছে। মেয়েটার কিছু হয়ে যাবে না তো? ফাইজা ইলমাকে যতই, নিন্দে করুক কিন্তু কখনো খারাপ কিছু হোক সেটা চায়না, মৃত্যু কামনা করেনা। তার হিংসেটা এক জায়গায়, সেটা ইনান শেখ মেয়েকে বেশী আদর স্নেহ করেন। কিন্তু মায়ের ভালোবাসা না পাওয়া মেয়ের জনঢ় এতোটুকু করা যায়ই।
ইলমার জন্মদাত্রী মায়ের কথা মনে করে ফাইজা। সে তো আরেক স্বার্থপর ছিলো। সেজন্য ছোট্ট মেয়ে এবং সংসারের কথা ভাবলো না। চলে গেলো, প্রেমিকের হাত ধরে।
আহত রিকশাওয়ালা মামাকেও চিকিৎসা প্রদান করা হয়। আদনান নিজেই তার পুরো খরচ বহন করবে। সেজন্য তার চিকিৎসা ঠিকঠাক করছে কীনা সেদিকে বেশ ভালোই নজর দেওয়া হচ্ছে।
ইলমাকে কেবিনে নিয়ে আসা হয়। ভাগ্যিস তার উপর ছুঁড়ে মারা এসিড হাতে পড়েছে এবং গালের সামান্য অংশে লেগেছে। যদি পুরো মুখ, চোখ এবং গলায় পড়ত তাহলে তার বেঁচে থাকাও রিস্ক হয়ে যেত। ইলমার কপাল কিছুটা হলেও ভালো, সেজন্য অল্পের জন্য বেঁচে গেছে।
ইলমাকে দু’টো দিন হসপিটালে রাখার কথা জানানো হয়। ইনান শেখ না করে দিয়েছেন। হসপিটালে রাখবেন না তিনি। বাড়িতে নিয়ে যাবেন। ইলমা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত একজন নার্স রাখা হবে। এছাড়া যেকোন প্রয়োজনে ডাক্তারকে কল করা হবে।
প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র নেওয়া হয়েছে। রাত সাড়ে আটটার দিকে ইলমাকে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হয় সবাই।
আদনান এবং নির্মাণ যায়নি। তারা রিকশাওয়ালা মামাকে নিয়ে তার বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসবে। যেকয়দিন অসুস্থ থাকবে, কাজে যেতে পারবেনা, কাজের টাকা দেওয়া হবে। যাওয়ার সময় তারেক মাহমুদ আদনানকে কিছু টাকা দিয়ে গেছে রিকশাওয়ালাকে দেওয়ার জন্য। আদনান ঔষধপত্র নিয়েছে। সাথে কিছু ফ্রুটস, টুকটাক খাবার। ওভারকল করে দুই বন্ধু রওনা হয়েছে রিকশাওয়ালার বাসার উদ্দেশ্যে।
আদনান বেশ গুরুগম্ভীর ভাব করে বসে আছে। নির্মাণ রিকশাওয়ালা মামাকে জিজ্ঞেস করে, “মামা আপনার নাম কী?”
লোকটা অস্পষ্ট স্বরে বলে, “ফারুক।”
তখন আদনান বলে উঠে, “মামা চিন্তা করবেন না, তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবেন। আপনি সুস্থ হওয়ার পর আবারো, আপনার সাথে দেখা করব আমি।”
লোকটা মাথা নাড়ায়। নির্মাণ সূক্ষ্ম দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলে, “আজকের ঘটনাগুলো নিয়ে ভেবেছিস?”
আদনান আওড়ায়, “অনেকবার ভেবেছি।”
“কী মনে হয়?”
“সবটাই প্ল্যানিং করে। কিন্তু ফারিশের সাথে তো আমাদের পরিবারের কোন শত্রুতা নেই। তাহলে ও নিজের বিয়ের জন্য ঠিক করা মেয়েের বিরুদ্ধে কেন ষড়যন্ত্র করবে? মেলিচার সাথে ওর শত্রুতা নেই।”
“ও তো নিজেই সেঁধেসেঁধে সম্মন্ধ পাকা করেছে।”
“হু।”
“তাহলে?”
“সেটার উত্তর পাব, আজকের পুরো ঘটনা তৃপ্তির থেকে শোনার পর।”
“তোর বোনকে বিয়েশাদি দিবি?”
আদনান ভ্রু কুঁচকে তাকায়। নির্মাণকে উপরনিচ পরখ করতে নির্মাণ চেঁচিয়ে বলে, “খারাপ নজর দিবিনা।”
“থুঃ! বেডা মানুষের দিকে নজর দেব কেন? আমি তোর মুখ দেখছি, পরিবর্তন হয়েছে কীনা। আগে তো দেখলেই বুঝা যেতো, বারোব্যাটারী।”
“তোর বোনকে দেখার পর সব ছেড়ে দিয়েছি।”
“তোকে ভরসা করিনা।”
“আমাকে নিজের দুলাভাই হওয়ার সুযোগ দে।”
“পরে। ভালো লাগছেনা কিছু।”
আদনান সীটে হেলান দিয়ে বসে। মাথাটা প্রচুর ব্যথা করছে। ফারুক মামাকে তার বাসায় পৌঁছে দিয়ে, টাকা পয়সা দিয়ে দু’জন আবারো ব্যাক করে নির্মাণদের বাসার উদ্দেশ্যে।
আদনান আজকে আর বাড়ি যাচ্ছেনা। নির্মাণ একটা সিগারেট ধরায়। একটান দিয়ে, আদনানের দিকে বাড়িয়ে দেয়। আদনান জলন্ত সিগারেটটা নিজের হাতে নেয়। সেটার দিকে তাকা চোখের সামনে ভেসে উঠে, মসজিদের সামনের দৃশ্য। পবিত্র নারীর হাত ধরেই তো সব খারাপ ত্যাগ করেছিলো। আজকে তার অনুপস্থিততে সেই খারাপটা নিজের মাঝে নিয়ে আসার মানে হয়না।
আদনান চুপচাপ সিগারেটটা নিচে ফেলে দেয়। পা দিয়ে পিষে নির্মাণের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেঁসে আওড়ায়, “যার হাত ধরে সিগারেট খাওয়ার বাজে অভ্যাস ত্যাগ করেছি, তার অনুপস্থিততে সেই সিগারেট কেন গ্রহণ করব?”
“বোকা! সিগারেট খেলে মন হালকা হয়ে যায়। এটা একটা নেশা।”
“কিন্তু আমার নেশা তো প্রেমিকনারী ওই দু’টি চোখে। আমার ভালো থাকা ওই একটা মায়াবী মুখে। মন হালকা করার জন্য, ওই একটা মায়াবী মুখের চাহনি যথেষ্ট।”
“তাহলে তার বিয়ের ব্যপারটা হাসিমুখে উড়িয়ে দিচ্ছিস কেন? ও অন্য কারোর হয়ে যাবে।”
“অন্য কারোর হয়ে যাবে, তবে এখনো হয়নি।”
“মানে?”
“তোর কী মনে হয়, আমি আমার প্রেমিকনারীকে অন্য কারোর হতে দেব?”
“তাহলে এরকম চুপচাপ যে?”
আদনান দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। এবং বলতে শুরু করে,
সেদিন জয়ের সাথে আদনানের মারামারি, ঝামেলা হয়েছিলো ইলমার সামনে। সেখানে ইলমাকে বকাঝকা করে, রাগ দেখিয়ে চলে এসেছিল আদনান। সেদিন আর কেউ কারোর সাথে কথা বলেনি। ইলমার সাথে ইনান শেখ ব্যালকনিতে কফি খেতে বসেছিলো। ভুলবশত, আদনান ইলমাকে ডাক দিয়েছিল। সেদিন ইলমা রুমে চলে যাওয়ার পর, ইনান শেখ ব্যালকনির গ্রিলে হাত রেখে আদনানের দিকে তাকিয়ে ছিলেন কিছুক্ষণ। এরপর আদনানকে বলেন, “ব্যালকনিটা পাশাপাশি হওয়ায় খুব সুবিধা হয়েছে তাইনা?”
আদনান খুব অবাক হয়েছে। জবাব দেয়, “কিসের সুবিধা?”
“সেটা আমার থেকে ভালো, তুমি জানো।”
“বা’জে কথা বলবেন না।”
“আমার কাছে প্রমাণ আছে।”
“কিসের?”
“আমি জানি তুমি ইলমাকে পছন্দ করো। হয়ত আমার মেয়েও তোমার জালে ফেঁসে গেছে। আমি যখন চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম, তখন দু’জন রাতে বাইরে ঘুরাঘুরি করেছ। অ্যাম রাইট?”
আদনান সবিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রয়। তারা দু’জন রাতে বেরিয়েছে সেটা ইনান শেখ কী করে জানলো? বাসার কেউই তো টের পায়নি, সেখানে ইনান শেখ চট্টগ্রাম থেকে কী করে টের পেলো? আদনানকে ভাবনায় তলানো দেখে ইনান শেখ মৃদু হেঁসে বলেন, “অবাক হচ্ছো? হবারই কথা! আমি নিজেও ভীষণ অবাক হয়েছিলাম, আমার ঘরকুনো বাবা ভক্ত মেয়ে কী করে তোমার মতো বাজে ছেলের সাথো সম্পর্কে জড়িয়েছে। যাকে তার বাবা পছন্দ করেনা। সে কী করে ভাবলো, আদনানের মতো বাজে ছেলেকে তার বাবা মেয়ের জামাই হিসাবে মেনে নিবে।”
ইনান শেখের কথায় আদনান বিরক্ত হয়ে জবাব দেয়, “বিয়ে আপনি না মেলিচা করবে। সংসারও সেই করবে। বিয়ে এবং সংসার যেহেতু মেলিচার সেক্ষেত্রে নিজের পছন্দে বিয়ে করা দোষের কিছুনা। আপনার মেয়ের আমাকে নিয়ে সমস্যা নেই আপনার এতো সমস্যা কোথা থেকে আসলো? এছাড়া আপনি আমার বালের শ্বশুর যে,আপনার মেনে নেওয়া না নেওয়াতে আমরা সারাক্ষণ চিন্তা করে মরব।”
“আদনান…
চোখ রাঙিয়ে বলেন ইনান শেখ। আদনান ভাবলেশহীন। ইনান শেখ চোয়াল শক্ত করে বলেন, ” অনেক বলেছ। তুমি হয়ত ভুলে গেছো, আমার মেয়ে আমার কথায় সব করতে রাজী। ওর থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে নেও মঙ্গল হবে।”
“সেটা আপনার মেয়েকে বলেন। যদি দূরত্ব বাড়াতে পারে, আমার তরফ থেকে আলহামদুলিল্লাহ।”
“আমার মেয়েকে আমি কিছু বলবনা। তুমি ওর জীবন থেকে সরে যাও।”
“সরব না। কী করবেন?”
“ইলমাকে তোমার থেকে অনেকদূরে নিয়ে যাব।”
“কতটুকু দূরে?”
“যতটুকু দূরে নিলে তুমি চাইলেও ওর সাথে কথা বলতে পারবেনা। ওকে একপলক দেখতেও পারবেনা।”
“আপনার কনফিডেন্স ভালো। আমার মতো বাজে ছেলের কলিজায় হাত দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন।”
“ও আমার মেয়ে।”
“তো ওকে বলুন দূরত্ব বাড়িয়ে নিতে। আমি পারব না।”
“একবার বলেছিলাম, সে মেনেছে। তবে দ্বিতীয় বার একই ভুল করেছে। এবারও দূরত্ব বাড়াবে, তবে তৃতীয় বার একই ভুল করবে।”
“সেটা আপনার মেয়ের সমস্যা।”
“ঠিক আছে। তুমি যেহেতু সরবে না, আমি নিজেই ওকে দূরে নেব।”
“নিয়ে দেখান।”
“আদনান… তোমার সাহস একটু বেশীইই।”
“আমার সাহসের তারিফ করার জন্য ধন্যবাদ।”
“বেয়াদব। তোমার মতো অসভ্য দু’টো দেখিনি আমি। আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকবে।”
আদনান প্রচন্ড বিরক্ত হয়। বিরক্তি নিয়ে জবাব দেয়, “এই বালের এক ছেলেমেয়ে নিয়ে ঢঙ করবেন না। করলাম না প্রেম। তাতে আমার কিছুই হবেনা। আপনি নিজে নিজের হীরে দিয়ে মোড়ানো মেয়ে নিয়ে আমার থেকে দূরে থাকবেন। দেখব না, কোন চাঁদের সাথে মেয়ে বিয়ে দেন।”
“তোমার থেকেও বেটার ছেলের সাথে আমি আমার মেয়ের বিয়ে দেব।”
“এখন কী এই খবর প্রচার করার জন্য মাইক এনে দেব?”
“বেয়াদব।”
আদনান রুমে চলে আসে। ইনান শেখ আদনানের যাওয়ার দিকে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকায়।
বর্তমান,
আদনানের কথা শেষ হতে নির্মাণ হো হো করে হেঁসে উঠে। আদনানের পিঠে চাপড় মেরে বলে, “দুইদিন প্রেম করে তৃতীয় দিন শ্বশুরের সাথে প্রেম বিষয়ক ঝামেলা করে, তার মেয়ের সাথে প্রেম করাই ছেড়ে দেওয়া ইভটিজার ভাই শাহরিয়ার আদনান শেখ।”
“সর! এই শালা ইনান কী ভেবেছে, আমি দূরে সরেছি ওর মেয়েকে ছেড়ে দিয়েছি? আমার পরিকল্পনা আছে, ওর বিয়েশাদির দিন ম্যালিকে কিডন্যাপ করে, বিয়েশাদি সেরে নেব।”
“ছিঃ!”
“কী ছিঃ! ম্যালি বড় শালী। তার ইগো বেশি। আমি দূরত্ব বাড়িয়েছি, তিনিও সরে গেছেন।”
“আমার তো ভাবতেও অবাক লাগে, ইলমার মতো মেয়েও তোর প্রেমে মজেছে।”
“কিসের প্রেম? দেখ গিয়ে মায়ায় পড়েছে। এখন তো মায়া কাটিয়ে নিয়েছে হয়ত।”
“ভালো। এখন তো ওর মায়াবীমুখের অবস্থা তেরোটা বেজে গেছে।”
“তাতে কী?”
“তুই তো মিডিয়াতে পরিচিত মুখ। কত সুন্দর মেয়ে আছে বিয়ের জন্য। কিন্তু ইলমাকে বিয়ে করলে, তোর বউ আহামরি সুন্দরী হবেনা।”
“আমি ওর সৌন্দর্যের প্রেমে পড়িনি, ব্যক্তিত্বের প্রেমে পড়েছি। এখন ভালোবাসি তাকে। এখন কার চোখে সে কেমন জানি না, তবে আমার চোখে আমার ভালোবাসার মানুষ শ্রেষ্ঠ সুন্দর।”
আদনানের কথায় নির্মাণ মৃদু হাসে। জবাব দেয়, “ভেবেছিলাম, তুই আগের মতো রয়ে গেছিস। কিন্তু ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। দোয়া করি, তোর প্রেমিকনারী তোর হোক।”
#চলবে
শব্দসংখ্যা:( ২৭১৬) প্রায় দু’টো পার্টের সমান।🙎♀️
আদনান-ইলমাকে নিয়ে লেখা বই ❝বুকপকেটের মায়াবিনী❞ প্রি বুকিং করতে ম্যাসেজ দিন,
https://www.facebook.com/share/1AKGvBibLx/
আমার গ্রুপ লিংক,
https://m.facebook.com/groups/582123563029858/?ref=share&mibextid=NSMWBT

