“বউ সাজিয়ে রাখার জিনিস না,ভোগ করার জিনিস। ইউ নো, একটা ছেলে বিয়ে করে কেন? অবশ্যই ফিজিক্যাল সম্পর্কের জন্য। আমিও তার ব্যতিক্রমে যাব না।”
সিগরেটের ধোঁয়া উড়াতে উড়াতে বন্ধুমহলে কথাটা বলে শাহরিয়ার আদনান শেখ। তার সামনে বোসে থাকা তার বন্ধুমহলের সদস্য শেজান মুহিত জবাব দেয়, ‘নারী হলো কোমলমতি শিশুদের ন্যায়। যত্নে আর আদরে রাখলে তোকে দেবতার মতো মাথায় তুলে রাখবে। ভোগ করা,খুব বিশ্রী শোনায় বাক্যটা।’
শেজানের কথায় বাকীরাও হেঁসে মজা নেয়। তাঁদের মাঝে নির্মাণ জবাব দেয়, ‘আরেহ ভদ্র ছেলে। এতো ভদ্র হয়ে কী করবি সোনা? আদনান যা বলেছে সেটা শোন। তোর বউকে কী তুই সাজিয়ো সাজিয়ে দেখবি নাকী শ্লা?’
মূহুর্তে হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠে তিনজন যুবক এবং দুইজন যুবতী। তাঁদের বন্ধুমহলের সদস্য সংখ্যা পাঁচ। এর মাঝে শেজান কিছুটা নম্র ভদ্র ছেলে হলেও বাকীরা সম্পূর্ণ উল্টো। মেয়ে বাজি করা,নেশা করা,র্যাগ দেওয়া,ইভটিজিং তো আছেই বটে। সেই সাথে মাসে মাসে প্রেমিকা চেঞ্জ করা এই তো তাঁদের কাজ।
আদনান হাতের সিগরেটটা মাঠে বিস্তৃত সবুজ রঙের ঘাসের উপর ছুঁড়ে ফেলে। সিলভার রঙের ঘড়িটায় সময় দেখে। বাকীরা কথা বলছে একটা টপিক নিয়ে। আদনান সবার উদ্দেশ্য বলে, ‘আমি গেলাম এখন।’
আদনানের কথায় নিশাত বলে উঠে, ‘এতো তাড়াতাড়ি কোথায় যাচ্ছিস?’
তাড়া দেখিয়ে আদনান জবাব দেয়,
‘কাজ আছে।’
তখন নির্মাণ জবাব দেয়, “নতুন পাখি পেয়েছিস নাকী?”
আদনান হেলমেট পড়তে পড়তে বাইক স্টার্ট দেয়। নির্মাণের কথা কানে নেয়নি সে। ভার্সিটির গেট পেরিয়ে নিজ গন্তব্য রওনা হয় সে।
————————————-
মাঘের শেষের দিক, ফাল্গুনের ধরিয়ায়। তপ্ত দুপুরে অবসন্ন দেহ এবং উদাসীন মন নিয়ে কলেজ গেটের বাইরে পা রাখে একজন অষ্টাদশী রমণী। এখন চারপাশ ধূলাবালিতে পরিপূর্ণ। রাতে মৃদু শীত পড়লেও দিনের বেলায় তার ব্যতিক্রম। চারদিকে তপ্ত রোদে খাঁ খাঁ করে উঠে। সেই সাথে ধূলা-বালি তো আছেই বটে। এই সময়টা তার ভীষণ অপছন্দ। সে অপেক্ষায় কবে তার প্রিয় বসন্ত আসবে। ফাল্গুন মাসে প্রকৃতি যেভাবে রুপ বদলে রম্য হয়ে উঠে একবারে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার মতো। বসন্তের প্রকৃতি স্নিগ্ধ ও পবিত্রতার মোহনীয় আবেশে পরিপূর্ণ থাকে। রিক্ততার দৈন্য বেশভূষা পরিধান করে প্রকৃতি বসন্তের ছোঁয়ায় সিক্ত হওয়ার প্রতীক্ষায় বিভোর থাকে। কেননা, বসন্তের আগমনের ধরাতলে ফুল ফোটে, পাখি গান গায়। বাতাসে আমের মূকুলের গন্ধ চারদিকে ম-ম করে উঠে। নব প্রল্লবে সুশোভিত হয় বৃক্ষরাজি। প্রকৃতি জেনো ফাল্গুনের প্রেমে পড়ে বারবার। কী যে এক সুপ্ত অনুভূতি।
শুভ্র রাঙা কলেজ ড্রেসটাও কেমন ধূসর রঙ ধারণ করেছে। উদাসীন মন। কিন্তু একটা গাড়িও পাচ্ছেনা দেখে মহাবিরক্তি চোখেমুখে এসে ভর করে। ছুটির সময় সবসময় এরকম হয়। সব স্টুডেন্টের উপচে পড়া ভীড় গাড়ির জন্য। একে,একে যে যেভাবে পারে গাড়িতে উঠে চলে যায়। মাঝেমধ্যে তাড়াতাড়ি গাড়ি পায়,মাঝেমধ্যে অনেক দেরিও হয়।
অন্যদিকে পেছন থেকে দৌড়ে আসছে আরেকজন রমণী। হাতে দু’টো মোটাসোটা বই। খুব সম্ভবত জীবনবিজ্ঞান এবং রসায়ন বই। পরিশ্রান্ত শুষ্ক গোলাপী রাঙা ওষ্ঠ নাড়িয়ে মেয়েটা ডাক দেয়, “ইলমা— এই ইলমা।”
নিজের নামের উচ্চস্বরের উচ্চারণ শোনে গাড় ঘুরিয়ে তাকায় ইলমা। চোখমুখে থাকা বিরক্তি লুকিয়ে ফেলার বৃথা চেষ্টা করে সে। কিন্তু লুকাতে অক্ষম হয়। তখন হাঁফাতে হাঁফাতে ইলমার পাশে এসে দাঁড়ায় প্রীতি। প্রীতিকে দেখে ইলমা অনাবিষ্ট ভঙ্গিতে বলে, “একটাও খালি গাড়ি পাচ্ছিনা। কী যে একটা ঝামেলায় আছি ।”
ইলমার কথায় প্রীতি রসিকতার স্বরে জবাব দেয়,
“তোর ভাইকে বল বাইক নিয়ে আসতে। তাহলেই তো অপেক্ষা করতে হয়না।”
সাথে,সাথে ধুম করে কিল পড়ে প্রীতির পিঠে। ইলমা চিবিয়ে চিবিয়ে জবাব দেয়, “কতবার বলেছি ওই অসভ্যের কথা মুখে এনে, মুখটা নষ্ট করবি না। কোন ভালো মেয়ে তার বাইকের পেছনে বোসা তো দূরে থাক ওর মুখটাও দেখতে চাইবে না।”
কিছুটা বিরক্তি নিয়ে জবাব দেয় ইলমা। ইলমার বিরক্তি দেখে প্রীতি মলিন হাসে। সেই মলিন হাসি ইলমার চোখ এড়ায়নি। দু’জনের চোখেমুখে নিষ্ক্রিয়তা জমেছে। ইলমা একটা খালি অটো দেখতেই থামায়। দু’জনে পাশাপাশি বোসে রওনা হয় বাড়ির উদ্দেশ্য। যেতে,যেতে তেমন আলোচনা না হলেও টুকটাক কথা হয়েছে। প্রীতির বাসা কলেজ থেকে খানিক দূরে। ইলমার বাসা কাছাকাছিতেই। সেজন্য প্রীতির আগে তাকেই অটো থেকে নামতে হয়। ভাড়া মিটিয়ে ত্রস্ত পায়ে হাঁটা ধরে ইলমা। মেইন রাস্তা থেকে আরেকটা সরু পিচ ঢালা রাস্তা দিয়েই বাড়িতে প্রবেশ করতে হয়।
চার তলা বিশিষ্ট রঙিন দালান দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির প্রবেশদ্বারের সরু রাস্তার শেষে। সেই চার তলা বিশিষ্ট দালানটি ইলমাদের। তার বাবা এবং জেঠু সম্মিলিত ভাবেই বাড়িটি তৈরি করেছে। যৌথ পরিবার তাদের। জমিজমা, ব্যবসা সবই একসাথে এখনো। ইলমা নিচতলায় প্রবেশ করে। উপরের বাকী তিন তলা ভাড়া দেওয়া হয়েছে। নিচতলায় তাঁদের পুরো পরিবার থাকে। ইলমাকে দেখে তার দাদী ফরিদা পারভীন আওয়াজ তুলে বলে, “জেরা তাড়াতাড়ি গোসল দিয়া আয়। তোর পছন্দের খাওন বানাইছি আইজকা। তৃপ্তি হেই কোনসময় আইয়া পরছে তোর এতো দেরী অইলো কেরে?”
ইলমা খানিক বিরক্তি নিয়ে জবাব দেয়, “এই দাদী,জেরা কী? জেহেরা বলতে পারো না? নাহলে ইলমা ডাকবা।”
“তাড়াতাড়ি আয় তো জেরা। এতো কথা কইস না।”
ইলমা হতাশ ভঙ্গিতে নিজের কক্ষে প্রবেশ করে। কাঁধের ব্যাগ এবং হাতের বই দুটো টেবিলের উপর রেখে চেঞ্জ করে গোসল করতে চলে যায়। ভেজা চুলগুলো গামছা দিয়ে পিটিয়ে, খাটের একপাশে বোসে। রুমের দিকে চোখ বোলাতেই একরাশ বিরক্তি এসে ভীড় করে। কী অগোছালো হয়ে আছে তার রুমটা। কেউ একটু গুছিয়েও রাখে না।
ভাবনা প্রকাশ করার আগে, পেটের ক্ষুধা অনুভব হয়। তড়িঘড়ি লিভিং রুমটায় আসে। তার দাদী ফরিদা খাবার রেডি করে বোসে আছে তার জন্য। ইলমা মলিন হাসি দিয়ে চেয়ার টেনে পা উঠিয়ে বোসে। খাবার শেষ করতে ফরিদা পারভীন পায়েশের বাটিটা এগিয়ে দেয়। পায়েশ দেখে সব বিরক্তি জেনো নিমিষেই উদাও। ইলমা বেশ তৃপ্তি সহকারে পায়েস খাচ্ছে। ফরিদা পারভীন মুগ্ধ হয়ে তার খাওয়া দেখছে।
খাওয়া শেষ পর্যায়ে আসতে ফরিদা পারভীন বলেন, “হে রে জেরা কিরুম হইছে পায়েশ?”
“দাদী অনেক মজা হয়েছে।”
ফরিদা পারভীন চিন্তিত ভঙ্গিতে বলেন,
“আদনান টা এহনো আইলো না। সারাদিন বাইরে, বাইরে কী খায় কে জানি।”
সাথে সাথে ইলমার মুখশ্রীর রঙ পরিবর্তন হয়ে যায়। ফরিদা পারভীন এঁটো প্লেট নিয়ে কিচেনে যায়। ইলমা অলস ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াতে আগমন ঘটে পরিবারে কুপুত্র শাহরিয়ার আদনান শেখের। হাতের চাবির গোছা ঘুরাতে,ঘুরাতে এগোচ্ছে সে। আদনানকে আসতে দেখে বিরক্ত হয় ইলমা। এই লোক যেদিকে যাবে সব মুখে করে তুলবে। ইলমাকে দেখে চোখমুখের ভাব পরিবর্তন করে আদনান। ক্লান্ত মুখশ্রীতে এক চিলতে হাসির আগমন ঘটে। ইলমা আদনানের হাসির দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকায়। আদনানের দৃষ্টিতে আসে সেই মুখ বাঁকানো। হাত উঁচিয়ে বলে, “এই মেলিচার বাচ্চা, আর একবার মুখ বাঁকা করলে স্কচটেপ লাগিয়ে দেব।”
সবার থেকে নিজের নামের এমন বিকৃতি ইলমার ধৈর্য বাঁধ ভে’ঙে যায়। তেজী স্বরে জবাব দেয়, “ওটা মেলিচা না ম্যালিসা।”
“তোর নামটা তোর মতোই কঠিন।”
মুখ ফসকে কথাটা বলে আদনান। ইলমা আরেকটু চিবিয়ে,চিবিয়ে বলে, “আজকে কোন দুনিয়া উদ্ধার করে এসেছ শুনি? নিশ্চয়ই ভার্সিটিতে কোন মেয়েকে র্যাগ দিয়েছ। নাকী রাস্তায় কাকে ইভটিজিং করেছ?”
ইলমার কথায় আদনানের মুখভঙ্গির পরিবর্তন আসে। বাইকের হ্যালমেট নিয়ে সামনে এগোয় কোন প্রতিত্তোর না দিয়ে। ইলমা তার যাওয়া দেখে বলে, “লজ্জাও করেনা।”
সাথে,সাথে তেড়ে আসে আদনান। তাতে খানিকটা ভয় পায় ইলমা। কিন্তু নিজের ভয় প্রকাশ করেনা। আদনানও তার গায়ে হাত তোলতে গিয়েও তোলে না। বাজখাঁই কন্ঠে শুধায়, “মেলিচার বাচ্চা, আজে বাজে কথা বললে খবর আছে বলে দিলাম।”
তখন সেখানে উপস্থিত হয় তৃপ্তি। রাগী,ঝাঁঝালো কন্ঠে শুধায়,
“ইলমা আজেবাজে কিছুই বলেনি। তুমি তো পাড়ার বখাটে ছেলে। এটা সবাই জানে। মেয়েদের ইভটিজিং করা,র্যাগ করা তোমার নিত্যদিনের কাজ। বাপের নাম বেছে, পাতি নেতা সাজা। তোমারও বোন আছে ভুলে গেছ?”
কথাটা শেষ হতে না হতে আদনান হাতে থাকা চাবির গোছা তৃপ্তির দিকে ছুঁড়ে মারে। তৃপ্তি ইলমা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলো। আদনানের রাগ দেখে দ্রুত সরে গেলে, ছুঁড়ে মা-রা চাবির গোছা গিয়ে ইলমার কপালে ঘেঁষে। সাথে,সাথে ইলমার দু-হাত চলে যায় কপালে। আদনান এখনো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তৃপ্তির পাণে। তার মাঝে কোন রকমের পরিবর্তন নেই। তৃপ্তি ইলমার হাত সরাতে দেখে কপাল লাল হয়ে গেছে। তখন চিৎকার করে সবাইকে ডাকে তৃপ্তি। ছুটে আসে ফরিদা পারভীন এবং মধ্যবয়স্ক দু’জন মহিলা। আদনানকে দেখে বিরক্ত হয় দু’জন মহিলা। তখন ইলমা রাগে ক্ষোভে জবাব দেয়, “দিনদুপুরে মাতাল হয়ে এসেছে তোমাদের বাড়ির গুনধর পুত্র। দেখো আমার কপালে চাবির গোছা ছুঁড়ে মেরেছে।”
তখন আদনান চেঁচিয়ে বলে, ” এই মেলিচার বাচ্চা, যতবড় মুখ নয় ততোবড় কথা। ওকে আর তৃপ্তিকে , মুখ বন্ধ রাখতে বলবে। এসব প্যানপ্যানে আমি বিরক্ত হই।
দম নিয়ে,
মেলিচা তোর ধারণাও নেই তোর সাথে আমি ঠিক কী কী করতে পারি। মুড নষ্ট।”
ক্রমশ~~
#গুপ্ত_প্রেমের_সুপ্ত_পিয়াসা” 🖤
#শার্লিন_হাসান
|১|
আদনান-ইলমাকে নিয়ে লেখা বই ❝বুকপকেটের মায়াবিনী ❞ অর্ডার করুন আপনার পছন্দের যেকোন বুকশপে।
বুকলেট কম লিংক,
https://www.facebook.com/share/153ciYupU5/
(ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে রেসপন্স করার অনুরোধ রইলো।
পরবর্তী পার্ট পেতে পেজ ফলো দিয়ে রাখবেন। হ্যাপি রিডিং)❤
পার্ট-২
https://www.facebook.com/share/p/19xVguxEHk/
গ্রুপ লিংক
https://m.facebook.com/groups/582123563029858/?ref=share&mibextid=NSMWBT

