শূন্য_অর্থ_পূর্নতা(২২)

0
36

#শূন্য_অর্থ_পূর্নতা(২২)


নিজের স্বামীর সাথে আর্থার কে দেখে চমকে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো ইয়াসমিনা চৌধুরী,মুখটা হা হয়ে গেলো ,এটা কিকরে সম্ভব,এই ছেলে তো দেখি বিয়ে করার জন্য এতোদূর অবধি চলে এসেছে ।

সাদিক সবে অফিস থেকে এসেছে ,কিছু ফাইল নিতে,সে নওশাদ কে দেখে সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়লো । হচ্ছে টা কি আসলে ?

রেয়ান চৌধুরী – আরে তোমরা এভাবে তাকিয়ে আছো কেন ? , ইন্সপেক্টর নওশাদ ও ,একটা মিশনেই ছিলো বাংলাদেশে ,যদিও ওর নাম আর্থার তবে ও মুসলিম হয়েছে তাই নামটা এটাই রেখেছি আমি ।

সাদিক – এ্যহ!
ইয়াসমিনা চৌধুরী – সব ঠিক আছে এ এখানে কি করছে?

রেয়ান চৌধুরী – ও আমার বিজনেস পার্টনার,আর মিশরে নতুন এসেছে তাই এখানে কয়েকদিন থাকবে ।

সাদিক এর চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম।পেটে কথা চেপে রাখতে না পেরে বলেই ফেললো- বনুকে নওশাদ ভাইয়ের সাথে আবার বিয়ে দিবে? তাহলে তো ভালোই হবে ,উনি তো আর খারাপ না ।

সাদিক কথাটা বলে বুঝতে পারলো খুব বড়োসড়ো ভুল করে ফেলেছে, ইয়াসমিনা চৌধুরী আর রেয়ান চৌধুরী সাদিক এর এমন কথা শুনে সাদিকের দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে ।
নওশাদ মুখ টিপে হাসলো ,মনের মতো শালা তার , নওশাদ জানে রেয়ান চৌধুরী কাজের লোকের সাথে বিয়ে দিতে রাজি আছে তবে কোনো মাফিয়ার সাথে তো না ,আর ইয়াসমিনা চৌধুরীর ব্যাপার হলো ,সে কিছুতেই চায় না নওশাদ হুরকে বিয়ে করুক কারন নওশাদ ই তো জানে যে অতীতে ইয়াসমিনা চৌধুরী ইন্টেলিজেন্স অফিসারদের হেড ছিল আর সে মাফিয়া রেয়ান চৌধুরী কে মারতে এসে প্রেমে পড়ে গিয়েছে আর মাফিয়ার পিএ হয়ে গিয়েছে।

ইয়াসমিনা তো সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে সংসার আর ব্যাবসা সামলাচ্ছে, কিন্তু তার ভয় নওশাদ যদি রেয়ান চৌধুরী কে বলে দেয়? রেয়ান চৌধুরী তো ইয়াসমিনা চৌধুরী কে প্রতারক ভাববে ।

নওশাদ হাসলো সকলকে উদ্দেশ্য করে বললো – চিল গাইস ,ওটা তো মিশনের একটা অংশ ছিলো, প্রথমবার তো আমি তোমার বোনকে বাঁচিয়ে ছিলাম,ওটা একটা কোয়েনসিডেন্স ছিলো ,আমি তখন তাকে চিনতাম না , পরেরবার বিয়ের নাটক টা করা হয় আমাকে পরীক্ষা করতে যে আমি তোমার বাবার কোনো শত্রু কিনা!
তাই সেসব ভুলে যাও , অতীত তো অতীত।

সাদিক ফোস করে শ্বাস ছাড়লো, সবাইকে এক্সকিউজ করে বাহিরে চলে এলো ,রেয়ান চৌধুরী আর ইয়াসমিনা চৌধুরী নওশাদ এর কথায় হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে । এতোক্ষণ কি ভুজংভাজুং বুঝালো ও ?

নওশাদ বাঁকা হেসে বললো- আমাকে রুম দেখিয়ে দিবেন না?আমি খুব ক্লান্ত।
রুম দেখিয়ে দিতেই নওশাদ সেখানে গিয়ে আরামসে একটা ঘুম দিলো , এরপর সে তাঁর ব্উ খুঁজতে বের হবে ।

তার আগে কাউকে একটা ফোন করলো – হ্যালো **** মাফিয়ার লোকেশন পেয়ে গিয়েছি,তার ঐ সাম্রাজ্যে সবকিছু পুড়িয়ে ছাই করে দাও‌।হ্যাঁ আর কোনো কিছুই দরকার নেই ।এবার সব শেষ। চ্যাপ্টার‌ ক্লোজ করে ফেলবো আমি দু একদিন এর মধ্যেই।

হুর আর তার মামাতো বোন একসাথে বাগানে বসেছিল , রুকাইয়া ফুলগাছে পানি দিচ্ছিল আর হুর ফুল গাছ গুলোর নাম জিজ্ঞেস করছিল ।হুর সবসময় পর্দায় থাকে , সে তার নানাবাড়ির লোকদের স্বভাব পেয়েছে , রুকাইয়াও সেইম।
দুই রমনী কে দেখছে দোতালার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন যুবক আর একজন মহিলা।
ইরফান মায়ের দিকে তাকালো , তিনি এতোক্ষণ বিয়ে নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছিলেন ।

ইরফান এবার তাকে থামতে ইশারা করলো , এরপর বললো- বুঝতে পেরেছি , বিয়ে দিতেই এনেছো ।সবটা ক্লিয়ার করো নাহলে আমি এখুনি চলে যাব ।
অনামিকা ফিচলে হাসলেন – ঐ যে ঐ মেয়েটা ডান পাশের জন ।ওর সাথেই তোর বিয়ে ঠিক করেছি আরোও ছয় বছর আগে ।

হুর আর রুকাইয়া পাশাপাশি ছিলো রুকাইয়া কে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলেন , কিন্তু হুর পায়ের কাছে একটা কেঁচো দেখে লাফ দিয়ে রুকাইয়ার ডান দিকে চলে গিয়েছিল যার কারনে ইরফান হুরকে দেখলো ।
দৃষ্টি সেখানেই থেমে গেলো , অনামিকা ছেলের এমন দৃষ্টি দেখে আনন্দে আত্মহারা হলেন – ইরফান তুই কি বিয়েতে রাজি?

ইরফান ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো – আম্মিজান কাল পরশুর মধ্যে অকাদের ব্যাবস্থা করুন।নাহলে আপনার ছেলে হার্ট অ্যাটাক করবে ।

অনামিকা খুশির খবর সবাইকে বলতে গেলো ।অকাদ এর ব্যাবস্থা করতে হবে দ্রুত, নাহলে কখন আবার ছেলের মত বদলে যায় কে জানে ?

…..
সাদিক হন্তদন্ত হয়ে আল হাদাদ প্যালেস এর সামনে এসে দাঁড়ালো, ভেতরে যেতেই বাগানে দুই রমনীর দিকে চোখ গেলো । রুকাইয়া থাকায় সাদিক আর গেলো না সেখানে। রুকাইয়া অপ্রস্তুত হতে পারে তাই ।
সাদিক প্যালেস এর সিংহদ্বার পার হতেই দেখলো সবাই কে , সবাই অবাক হলো না , কারন সাদিকের ও আসার কথা ছিলো দু একদিন এর মধ্যে । সাদিক সবার সাথে কুশল বিনিময় করলো।

সাদিক অনামিকা কে উদ্দেশ্য করে বললো – মনি ইরফান কোথায়?

অনামিকা ইরফান এর রুমের ঠিকানা দিতেই সাদিক আবার উল্টে দৌড়।
সবাই ভাবলো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার জন্য উতলা । কিন্তু ঘটনা তো অন্যকিছু।

ইরফান এর রুমের সামনে যেতেই দড়জা দুহাতে ধাক্কা দিলো , সাদিক এখন নিজের মধ্যে নেই তাই খেয়াল ও করলো না যে তার ধাক্কা দেওয়ার আগে দড়জা টা খোলার শব্দ হলো ।
ইরফান – কে রে এমন দড়জা ভেঙ্গেচুরে ফেলছে?

দড়জা খোলার সাথে সাথে সাদিক ভুলক্রমে ইরফান এর উপর উল্টে পড়লো দুজনেই নিচে পড়ে গেলো , নিচে ইরফান উপরে সাদিক ।( কি রোমান্টিক দৃশ্য 😒)
ইরফান ও অবস্থাতেই সাদিক কে বললো – আরে আমার বউ এর ভাই ,এমন গন্ডার এর মতো আমার গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লি কি করে ? তোর বোন পড়লেও কথা ছিলো

সাদিক দাঁত কটমট করে বললো- আমার বোনের দিকে চোখ তুলে তাকালে চোখ উবরে ফেলবো ।

মানহা সাদিকের মতো সুন্দর পুরুষ এর আগে দেখেনি ,বলা যায় এক দেখাতেই প্রেমে পড়ে গিয়েছে । ষোড়শী কিশোরী ওড়না উড়িয়ে ধীরে ধীরে আসছিল, কিন্তু ভাইয়ের রুমে ধপ করে কিছু পড়ার শব্দে সেদিকে গেলো ।
গিয়ে যা দেখলো তাতে ওর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো ।

চিকন পাতলা ঠোট দিয়ে বিড়বিড় করে বললো – ভাই আমার না হওয়া সংসার ভেঙে দিলো।

মানহার দিকে সাদিকের নজর যেতেই থতমত খেলো ওর দৃষ্টি দেখে , এরপর নিজের অবস্থান দেখে ঠাস করে উঠে দাড়ালো। ইরফান সামনে বোনকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সেও থতমত খেলো ।

সাদিক তরিঘরি করে বললো – মানহা তুমি যা ভাবছো তার কিছুই না , দড়জা ধাক্কা দিতে গিয়ে পা বেজে পড়ে গিয়েছি ।
মানহা ভেবেছিল হাত পা ছড়িয়ে কান্না করবে সংসার ভাঙার দুঃখে , কিন্তু সাদিকের কথা শুনে সব ভুলে সাদিক কেই দেখতে লাগলো ।

ইরফান – তুই এখানে কি করছিস? যা সর এখানে থেকে ।

ইরফান এর ধমকে মানহা দৌড়ে পালালো ।

সাদিক কে দেখে ইরফান বারান্দার দিকে পা বাড়ালো ,সাদিক ও সেদিকে গেলো ।
ইরফান বুকে হাত গুটিয়ে গম্ভীর গলায় বললো – দেখ সাদিক তোর বোনকে আমার লাগবে।
নাহলে ঐ যে দেখছিস তোর বোন ,ওকে আমি তুলে নিয়ে যাব ,তখন বিষয়টা ভালো হবে না ।
সাদিক যখন তাকালো হুর একটু অন্যদিকে চলে গিয়েছিল, সেখানে শুধু রুকাইয়া ছিলো , ইরফান তা খেয়াল করলো না।
সাদিক তো মহাখুশি, রুকাইয়া কে নিয়ে যাক ,তার বোনকে না নিলেই হবে ।

সাদিক ভাবলো সে যদি এখন খুশি হয়ে বলে – হ্যাঁ হ্যাঁ বিয়ে কর ,কোনো সমস্যা নেই ।
তাহলে ইরফান সন্দেহ করবে , তারচেয়ে বরং বিয়ে শেষেই মিসাইল টা ব্লাস্ট করবে সাদিক । অবশ্য এতে সাদিকের প্রয়োজন হবে না,ভ্রু বদল দেখে ইরফান নিজেই ব্লাস্ট হয়ে যাবে ।

সাদিক গম্ভীর হয়ে বললো- আমার বোনকে দেখেছিস?

ইরফান – না দেখিনি,শুধু চোখ দেখেছি ।
সাদিক আরোও খুশি হলো কারন রুকাইয়ার চোখটাও হালকা সবুজ তবে নীলাভ সবুজ না ।
ইরফান – আচ্ছা তোদের তো বিয়ে ঠিক হয়েই আছে ,আমি আর কি বলবো ,মজা করছিলাম হা হা ।

ইরফান সাদিকের কথায় বাঁকা হাসলো,হুরকে নিজের করার স্বপ্ন দেখতে লাগলো ।

সাদিক ছাদে বসে ছিলো,হাতে কফির মগ , বিয়ের খবর শুনে ইয়াসমিনা চৌধুরী এসে পড়েছেন আজ সন্ধ্যায় অকাদ হবে ।
সাদিক চায় তার বোনকে কোনো ভোলা ভালা মানুষের সাথে বিয়ে দিতে ,যেন বেশি বুদ্ধিমান হয়ে হুরকে যেন কেউ কষ্ট না দেয় ‌।
ইরফান মাথা গরম মানুষ, নওশাদ কে তার ঠান্ডা মাথার মানুষ মনে হয়েছে , জেন্টেলম্যান যাকে বলে , হুটহাট কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না ।হুরের জন্য নওশাদ কেই ভালো লেগেছিল।এখন কি হয় দেখার বিষয়।

কিছুক্ষন পর পা টিপে টিপে মানহা সেখানে আসলো ,হাতে বাগান থেকে নেওয়া কিছু বাগান বিলাস ফুল । উদ্দেশ্যে সাদিক কে প্রোপোজ করা।রাজি হলে ডিরেক্ট বিয়ে ।

দুহিত পেছনে রেখে মানহা গুটি গুটি পায়ে সাদির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো -সাদ ভাইয়া !

সাদিক ফোনের দিকে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মানহার দিকে তাকালো ,ভ্রু নাচিয়ে বললো- কি হয়েছে?

মানহা তো সেই আবার হা করে তাকিয়ে আছে ,কালো শার্ট ফর্সা শরীর এ দারুন মানিয়েছে । সরল নীলাভ সবুজ চোখজোড়া দেখে মানহার ছোট মনটা ছট্ফট করে উঠলো ।
দুহাতে ফুল সামনে এগিয়ে দিয়ে বললো – এটা আপনার জন্য।

সাদিক মুচকি হেসে সেটা নিলো ,মানহার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো – মানহা মনি কি উপলক্ষে এই ফুল?

মানহা কোনোমতে হাসার চেষ্টা করলো, -ক,ক,কিছুনা ভাইয়া ,এমনি ।

মানহা চোখ বন্ধ করে বলতে শুরু করলো – ভাইয়া আমি আপনাকে পছন্দ করি ,আপনি প্লিজ আমাকে বিয়ে করুন , আপনাকে প্রথম দেখায় আমি পছন্দ করে ফেলেছিলাম, গতকাল আপনাকে আবার দেখে প্রেমে পড়ে গিয়েছি ।

সাদিক সবে একচুমুক কফি মুখে নিয়েছিল, দূর্ভাগ্যবসত তার ছিটকে বেরিয়ে এলো ,আর সব গিয়ে মানহার মুখের উপর পড়লো।

মানহা ফট করে চোখ মেললো ,ওড়না দিয়ে মুখটা মুছে সাদিকের দিকে তাকালো।
সাদিক লাল লাল চোখ করে তাকিয়ে আছে ,মানহা ভয় পেয়ে গেলো – বয়স কতো বোন তোর?

মানহা – ষোলো ।
আমার টা জানিস?মানহা দুদিকে মাথা নাড়ালো, অর্থাৎ সে জানে না।

সাদিক – প্রায় ঊনত্রিশ,তোর আব্বার বয়সী আমি , দূর্ভাগ্যজনক ভাবে খালাতো ভাই ,সঠিক সময় বিয়ে করলে তোর মতো একটা ল্যাদা থাকতো আমার।সর বেয়াদব।

মানহা মুখটা বাংলার পাঁচ করে বললো – মাত্র কয়টা বছর ই তো ।

সাদিক – লক্ষী বোন আমার তোর এখন ফিডার খাওয়ার বয়স বিয়ে করার না ,তোকে সুন্দর একটা ছেলে দেখে বিয়ে দেব চিন্তা করিস না ।

মানহাকে একটু চিন্তামুক্ত দেখালো , তারপর মাথা চুলকে আবার বললো – কিন্তু আপনার মতো সুন্দর জামাই তো পাবো না।

সাদিক কিছুক্ষন ভাবলো কি করে এই বলদটাকে বোঝাবে , তারপর বললো – আচ্ছা ঠিক আছে আমার নাতির সাথে তোর বিয়ে দেব ,ঠিকাছে?সেও আমার মতো দেখতে হবে।

মানহা খুশি হলো – নাতি কোথায় ? কবে করবো বিয়ে ?

সাদিক হুমায়রার কথা চিন্তা করলো, এরপর বললো – তার জন্য আমাকে আগে বিয়ে করতে হবে ।

মানহা গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে বললো – তাহলে তাড়াতাড়ি করো বিয়ে ।

সাদিক এবার পড়লো মহা জালায় – তুই যা তো বোন ,আমি তোকে আমার নাতির ব্উ করবো কথা দিলাম।যা তো এখন।

মানহা খুশি হয়ে দৌড়ে চলে গেলো ।
সাদিক ফোস করে শ্বাস ছাড়লো,কি একটা অবস্থা, সুন্দর হয়েও বিপদে ,ছ্যাহ।

….
পুরো বাড়িটায় তীক্ষ্ণ নজরে দেখছে নওশাদ, ইয়াসমিনা চৌধুরী তাকে হুঁশিয়ারি দিয়ে গিয়েছে যেন কোনো তালগোল না পাকায়।বাড়িতে থাকা সকল গার্ড দের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো নওশাদ। ইতিমধ্যেই জেনে গিয়েছে হুর এ বাড়িতে নেই ।
রেয়ান চৌধুরী হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে ঢুকলো তাকে খুব চিন্তিত লাগছে , নওশাদ বাঁকা হেসে এগিয়ে গেলো – কি হয়েছে আঙ্কেল।

রেয়ান চৌধুরী চরম আক্রোশে ফেটে পড়লেন – কে যেন আমার মাফিয়া রাজ্য ধ্বংস করে দিয়েছে , চিন্হ পর্যন্ত নেই । কীভাবে কি হলো বুঝতে পারছিনা।

নওশাদ ভয়ঙ্কর ভাবে তাকালো – এখনো বুঝতে পারছেননা রেয়ান চৌধুরী!
বয়সের সাথে সাথে সেই তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মানুষ টা কি মরে যাচ্ছে?
রেয়ান চৌধুরী আঁতকে উঠলো – মানে ? কি বলতে চাইছো?

নওশাদ – আমাকে আপনি হয়তো চিনতে পারেন নি এখনোও। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হন মিষ্টার চৌধুরী।

রেয়ান চৌধুরীর ফর্সা মুখ রাগে লাল হয়ে গেলো ,রাগে কাঁপতে কাঁপতে গার্ড দের ডাকতে লাগলো , নওশাদ বাঁকা হেসে বলল – লাভ নেই শশুর আব্বা ,তারা কেউই আপনার লোক না ।
রেয়ান চৌধুরীর চোয়াল শক্ত হয়ে এলো – কি চাইছো তুমি?
নওশাদ – আপনার প্রান।

রেয়ান চৌধুরী – কি পাগলামি করছো ,তুমি কে তোমার পরিচয় কি? আমার সাথে কিসের শত্রুতা?

নওশাদ – আমার পরিচয় আর্থার ছিলো আপনি নওশাদ নাম রেখেছেন, এতোটুকুই।আর এরিকা ,ইথান কে মনে আছে?

রেয়ান চৌধুরী চমকে তাকালো – মানে?

নওশাদ – কোনো মানে টানে বলবো না আমি , তাদের তুই মেরেছিস ,সেই মৃত্যুর বদলে তোর প্রান নেব আমি । মৃত্যুর বদলে মৃত্যু।

নে তুই সাসপেন্স নিয়েই মর।

কথাগুলো বলে বুক বরাবর শ্যুট করে দিলো নওশাদ। রক্তগুলো ছিটে আসলো মুখে ।
রক্তগুলো মুখ থেকে মুছতে মুছতে বললো – মম ড্যাড আমি তোমাদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিয়ে নিলাম।

নওশাদ তার অতীত এ হারিয়ে গেলো ,,,
ইথান ছিল রেয়ান চৌধুরীর বিজনেস পার্টনার, ইতালি ছিলো ঘাঁটি । আর্থার সাত বছরের বাচ্চা ছেলে ছিলো ।
বিজনেস নিয়ে ঝামেলা থাকায় আর ইথান জেনে গিয়েছিল যে রেয়ান চৌধুরী মাফিয়া,এর জন্য লোক দিয়ে রেয়ান চৌধুরী আর্থার এর পুরো পরিবার কে শেষ করে দেয় ।
এই কথাগুলো তার বাবার সেক্রেটারি বলেছিল আর্থার কে , প্রমাণ সহ ।
প্রতিশোধ এর আগুনে জ্বলতে থাকা আর্থার কে সেক্রেটারী জিয়ান রেয়ান চৌধুরীর কাছে পনেরো বছর বয়সে মাফিয়া ট্রেনিং এ পাঠিয়ে দেয় ।পাঁচ বছর ট্রেনিং নিয়েছিল আর্থার, বয়স তখন বিশ , এখন সে পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য।

কিন্তু একদিন একটা ঝড়ের রাতে ভয়াবহ একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয় আর্থার এর ,তাকে বাঁচায় রাফিয়া নামের একটা মেয়ে ।মেয়েটা মুসলিম ছিলো ।

আর্থার কে হাসপাতালে রেখে সেও কোথায় যেন হারিয়ে গেলো । আর্থার কে সেখানে থেকে একদল কালো পোশাক পড়া লোক নিয়ে যায় ।তারা হলো ইয়াসমিনার লোক , ইন্টেলিজেন্স অফিসার রা আর্থার কে নিয়ে যায় , ইয়াসমিনা চোধুরীর কথায় , ইয়াসমিনা চোধুরী তাকে অফার করলো তাদের যাতে যোগ দিতে ,ঐ মাফিয়া রাজ্যে যেতে চাইলে ইয়াসমিনা তাকে মেরে ফেলবে ।

আর্থার জানতে পারলো ইয়াসমিনা চোধুরী রেয়ান চৌধুরীর স্ত্রী , ইয়াসমিনা কেন এমন করছে জানতে চাইলে ইয়াসমিনা বললো ,তার স্বামী মাফিয়া থাকুক এটা সে চায় না ,তাই সে ঐ রাজ্য ধ্বংস করে দিতে চায় ।রেয়ান চৌধুরীর কোনো ক্ষতি সে করতে পারবে না তাই মাফিয়া রাজ্য থেকে দূরে রাখতে চায় ।
এতে আর্থার রাজি হলো ।

একদিন হঠাৎ রাফিয়ার সাথে দেখা হলো ,মেয়েটাকে তার সৎ মা অত্যাচার করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল।
আর্থার তাকে বোনের মতো আগলে রেখেছিল নিজের কাছে ,তার কাছেই মুসলিম ধর্ম সম্পর্কে জেনে ইসলাম ধর্ম গ্ৰহন করে ।

মেয়েটা তাকে একেবারে মায়ের মতো শাষন যত্ন করতো ,সেই রাফিয়ার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে নওশাদ মির্জা কে মারতে বাংলাদেশ এ পাড়ি জমায় ।
হুরের সাথে একেবারে ভুলক্রমে তার দেখাটা হয়ে যায় ।

সবকিছু মনে করে নওশাদ বেরিয়ে পড়লো বাড়ি থেকে , সুন্দর করে রেডি হয়ে মুখে মাস্ক লাগিয়ে আল হাদাদ প্যালেস এর দিকে রওনা দিলো ।

…..
ছোটোখাটো আয়োজন করা হয়েছে ,হুর রুকাইয়ার কাছে আসলো ,হুর আজ কালো রঙের আবায়া পড়েছে । রুকাইয়া কে টকটকে লাল রঙের একটা ভারী গাউন পড়ানো হয়েছে ।
নিচে সবাই অপেক্ষা করছে ,হুর রুকাইয়া কে নিয়ে নিচে যেতে লাগলো , ইরফান এর সাথে রুকাইয়ার বিয়ে ঠিক অনেক আগে থেকেই সবাই সেটা জানে ।হুর ইরফান এর ঐদিনের ঐ রকম ব্যাবহার টা আমলে নেয়নি ,আসলে সে বুঝতেই পারেনি ইরফান এর কথার অর্থ। ইরফান সাদা স্যুট পড়েছে ,লাল শার্ট। সুঠামদেহী ইরফান কে আজ মারাক্তক সুন্দর লাগছে ।
সাদিকের ইরফান এর পাশে বসে আল্লাহ আল্লাহ করছে ।

ইরফান সাদিকের কানে ফিসফিস করে বললো- সাদা তোর বোন কি তোর মতোই এতো সুন্দর।
সাদিক ভ্রু কুঁচকে তাকালো, ইরফান ফিচলে হেসে বললো- আরেহ তোর প্রসংশা করিনি ,আমি সেরকম না ।

সাদিক – কেন সুন্দর না হলে কি করবি?

ইরফান হতাশ হয়ে চুপ করে গেলো ,সাদিক বরাবরই শান্ত, কখনোই কারোর সাথে মজা করবেনা ,কোনো ফাজলামিও করবে না।

ইরফান হুরকে এক দেখায় চিনে ফেললো , রুকাইয়ার দিকে ফিরে তাকানোর ও প্রয়োজন বোধ করলো না ।তাহলে বুঝতে পারতো আসলে কনে কে ।

ইরফান যখন দেখলো হুর‌ তার সামনের সোফায় বসেছে তখন খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলো । ইরফান হুরকে দেখতেই এতো ব্যস্ত যে তার পাশে লাল টুকটুকে বউ মাথা নিচু করে বসে আছে সেটা দেখলো না ।

বিয়ে পড়ানো শুরু হলো ,হুর তাকিয়ে দেখলো ওর মা অন্যদিকে দাঁড়িয়ে আছে , ইয়াসমিনা চোধুরী আজ খয়েরি রঙের জামদানি শাড়ি পড়েছেন সাথে ম্যাচিং হিজাব। খুব সুন্দর লাগছে তাকে বাঙালি সাজে ।
এখানে একমাত্র তিনিই বাঙালি সাজে আছেন ।

হুর প্রায় ছয় ঘণ্টা পর মাকে দেখলো ,তাই সোফা থেকে উঠে গিয়ে মায়ের কাছ ঘেঁষে দাঁড়ালো বিড়াল ছানার মতো ।
মেয়েকে নিজের সাথে রেখে অনুষ্ঠান দেখতে লাগলো ।
এদিকে ইরফানের টনক নড়লো হুরকে উঠে যেতে দেখে । আশেপাশের তাকিয়ে দেখলো তার পাশে অন্য একজন যাকে কাজি কবুল বলতে বলেছে।

ইরফান হতবাক হয়ে হুরের দিকে তাকালো, এরপর সাদিকের দিকে, সাদিকে ইরফান এর দিকে একনজরে তাকিয়ে যা বোঝার বুঝে গেলো , ইরফান আসলে তার বোনকেই বিয়ে করতে চায় ।
মনে মনে যেটা ভয় পাচ্ছিল সেটাই হলো । ইরফান ধপ করে উঠে দাড়ালো।

ইরফান – এই বিয়ে হবেনা।
সবাই অবাক হয়ে গেলো , রুকাইয়া ঘোমটা উঠিয়ে তাকালো ইরফান এর দিকে।কি হচ্ছে কেউই বুঝতে পারছেনা।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে ইরফান – আপনারা কার সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছেন ।

অনামিকা উঠে এলো ,ছেলের এমন ব্যবহার এ তিনি বেশ অবাক হয়েছেন – কি হচ্ছে ইরফান? রুকাইয়ার সাথে তোমার বিয়ে ঠিক করেছি ,তার সাথেই হচ্ছে বিয়েটা ।

ইরফান হুঙ্কার দিয়ে উঠলো- মানে কি ? তুমি বলোনি যে হুর কে বিয়ে করতে হবে? ঐ যে কালো বোরকা পরে যে দাঁড়িয়ে আছে ।তাকে ভেবেই আমি বিয়েতে রাজি হয়েছি ।
সবাই অবাক হয়ে গেলো ,হুর ভয়ে মায়ের পেছনে লুকিয়ে গেলো ,পেছনে থেকে মায়ের শাড়ির আঁচল খামচে ধরে আছে ।

ইরফান – আমি হুরকেই বিয়ে করবো ।

বলেই ইয়াসমিনা চোধুরীর দিকে দুপা এগোলো ,সাদিক ইরফান এর হাত ধরে ফেললো – ইরফান তুই রুকাইয়া কে এভাবে অপমান করতে পারিস না ,ওকেই বিয়ে করতে হবে । ওদিকে আর এক পাও আগাবি না ।

ইরফান হাত ছাড়িয়ে নিলো – অপমান মাই ফুট ,কোনো রুকাইয়া কে আমি বিয়ে করবো না,হুরকেই বিয়ে করবো ।তোর বোনকেই লাগবে ।

হুর ফুঁপিয়ে কাদতে লাগলো ইয়াসমিনা চোধুরী রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো বোনের দিকে । অনামিকা আল হাদাদ খান ছেলের কান্ডে লজ্জিত হলেন – ইরফান পাগলামি বাদ দাও ।

ইরফান ইয়াসমিনা চোধুরীর দিকে এগিয়ে এসে বললো- আন্টি আপনার মেয়েকে আমাকে দিয়ে দিন ।নাহলে ভালো হবে না ,আমি ওকেই চাই ।

ইয়াসমিনা চৌধুরী গম্ভীর হয়ে বললো- তুমি কার সাথে কথা বলছো জানো ? আমার বোনের ছেলে দেখে চুপ করে আছি ।কোনো বিয়ে হবেনা, রুকাইয়া কেও তোমার সাথে বিয়ে দেব না ,চলে যাও ।

ইরফান বাঁকা হেসে বললো- যাব তো ,তবে আপনার মেয়েকে নিয়েই যাব ।

কথাগুলো বলে ইয়াসমিনা চোধুরী পেছনে লুকিয়ে থাকা হুরের হাত খপ করে ধরলো – চলো জানেমান ।

হুরকে টেনে নিয়ে কাজির সামনে বসালো । গার্ড রা সবাই কে বন্ধুক দিয়ে ঘিরে রেখেছে ।সবাই খুব বিরক্ত ইরফান এর কাজে। রুকাইয়া চোখের পানি ফেলতে এককোনে দাঁড়িয়ে।তার ভালোবাসা অন্যকাউকে ভালোবাসে?

সাদিক নিজেকে ছাড়াতে ব্যার্থ চেষ্টা করে হুঙ্কার দিয়ে উঠলো – ইরফান আমার বোনের থেকে দূরে সরে যা ।নাহলে ভুলে যাব তুই আমার বন্ধু ছিলি ।

ইরফান – ভুলে যা , তবুও তোর বোন কে আমার লাগবে মানে লাগবে ।কাজি বিয়ে পড়ানো শুরু করেন ।

হুর এবার উচ্চস্বরে কাঁদতে শুরু করলো ,তার তো বিয়ে হয়ে গিয়েছে নওশাদ নামের লোকটার সাথে ।
এটা একদমই উচিত হচ্ছে না , সবাইকে আটকে রেখেছে দেখে হুরের আরোও ভয় লাগতে শুরু করলো।

সমাপ্ত,,,,,,,,
❤️❤️❤️❤️❤️❤️

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here