শূন্য_অর্থ_পূর্নতা(২১)

0
24

#শূন্য_অর্থ_পূর্নতা(২১)


আশেপাশের করতালির শব্দে রেয়ান চৌধুরী কিছু শুনতে পেলেন না , আর্থার এর দিকে তাকাতেই আর্থার মুখ ঘুরিয়ে নিলো, এরপর দুজনেই বেরিয়ে এলো জায়গাটা থেকে ।

অন্ধকার রাত জঙ্গলের এর সুরঙ্গ হতে দুজন পুরুষ বেরিয়ে এলো , সামনে একটা কালো বাংলো , দুজন জঙ্গলকে পেছনে ফেলে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো , মেইন রোডের কাছে , একটা গাড়ি , নিস্তব্ধ রাত , আশপাশ শান্ত।
আর্থার রেয়ান চৌধুরী দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল -আঙ্কেল আমি মিশরে এর আগে কখনো আসেনি, এখন থাকার ব্যবস্থা কি করে করব? ভাষাও তো জানিনা আমি শুধু ইতালিয়ান ,ইংরেজি, বাংলা তিনটাই জানি .
রেয়ান চৌধুরী মুচকি হাসলেন আর্থার তাকে দেখলো তা বাঙালি লোকটা মারাত্মক সুন্দর আর্থারের থেকেও সুন্দর বলা যায়। মাঝে মাঝে আর্থারের মনে হয় রিয়ান চৌধুরী তার সমবয়সী অথচ রিয়া চৌধুরী তার চেয়ে বহু বছরের বড়।

আর্থার তার মনে মনে ভাবল -এরা পুরো গোষ্ঠীর সহ সুন্দর নাকি?
কিন্তু আফসোস এই সুন্দর রেয়ান চৌধুরীকে মারতে আর্থারের কিঞ্চিৎ পরিমাণ হলেও কষ্ট লাগবে।
আর্থার এসবই ভাবছিল হঠাৎ রিয়াণ চৌধুরীর কথায় তার ধ্যান ভাঙল-তুমি দশ দিন আমার বাড়িতে থাকতে পারবে , আমি ভেবে চিন্তে কথাটা বললাম চলো গাড়িতে উঠো।
প্রতিউত্তরে আর্থার মাথা নাড়ালো রিয়ান চৌধুরীর ড্রাইভ করতে লাগলেন আর তার পাশে বসে চুপ করে বসে ছিল মনে প্রশ্ন উঠছিল হুর কোথায়? সেখানে গেলে কি হুরকে দেখতে পাবে? আচ্ছা হুরের সামনে পড়লে হুরের রিঅ্যাকশন কি হবে? ভয় পাবে ?পালাবে? আর্থার বাঁকা হাসলো?! ভালোবাসা দরকার নেই তার পুতুলের মত সাজিয়ে রাখবে সে হুর কে। এসব ভালোবাসা তো তির নিজের মধ্যেও নেই ,ঘরে সাজানোর মতো বস্তু হিসেবে হুরকে তার চাই মানে চাই ।

রিয়াদ চৌধুরী থেকে তাকে ভাবল ,এমন একটা লোকের ঘরে এমন একটা মেয়ে ভাবা যায়!
রেয়ান চৌধুরী-শুনেছি তুমি মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেছ আরো অনেক বছর আগে তাহলে তোমার নামটা আর্থার কেন? পরিবর্তন করা উচিত নয় কি? আর মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেছে এর কারণটাই বা কি?

কথাটা শুনে চোখের সামনে ভেসে উঠলে এক ভয়ংকর ঝরে রাতের ঘটনা তার জীবন বাঁচিয়ে ছিল এক মায়াবতী যার কাছে তো আর্থার মায়া ভালোবাসা সম্পর্কে অবগত হয়েছিল সময়ের ব্যবধানে মেয়েটা তার হৃদয় রেখাংশে পরিণত হয়েছিল।
মুখে বললো-সৃষ্টিকর্তার জন্য তাকে ভালোবেসে এতোটুকু উত্তরে কি যথেষ্ট নয়?
রেয়ান চৌধুরী-অবশ্যই যথেষ্ট তবে তোমার নাম নিয়ে আমার সমস্যা হচ্ছে কোন মুসলিম সন্তানের নাম মুসলিম নামই হওয়া উচিত অর্থাৎ ভাল্লুক শক্তিশালী এরকম অর্থ বোঝায় নির্দিষ্ট সুন্দর অর্থ বহন করে না।

আর্থার চমকে তো নয়নে দেখল রিয়ান চৌধুরী দিকে এই লোকটাকে যত জানতে পারছে ততই অবাক হচ্ছে ভয়ংকর অথচ কোমল সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে জ্ঞান, ধর্ম সম্পর্কে সচেতন এমন মানুষ কি করে নির্দোষকে মারতে পারে?

আর্থার তার নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো মুখে বলল -না আমি নাম সম্পর্কে তেমন জ্ঞান রাখিনা তবে আপনি কি কোন নাম দিতে ইচ্ছুক আপনার কাছে কোনো ভালো নাম থাকলে দিতে পারেন।

রেয়ান চৌধুরীর ভালো লাগলো কথাটা – নওশাদ নামটাই ঠিক আছে ভাগ্যবান তুমি নামের সাথে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য মিল থাকা উচিত ভাগ্য কতটা ভালো হলে আমার মত লোকের সাথে থাকতে পারছো বলো? মাফিয়ার কিং হয়ে গিয়েছো আসলেই ভাগ্যবান তুমি। ওই নওশাদ এর এই নাম পাওয়ার কোন যোগ্যতাই ছিল না ,একদম পারফেক্ট ছিল না ওর জন্য। চরম দুর্ভাগ্য ওর। আমি তোমাকে নওশাদ দিকে অভ্যস্ত তুমি নওশাদ আজ থেকে।

আর্থার কথাগুলো শুনলো বাঁকা হেসে মনে মনে বলল যদি জানতেন আমি কেমন তাহলে এই নাম রাখার আগে ১০০ বার ভাবতেন । এমনিতেও নওশাদ নামটা শুনে আমি অভ্যস্ত ,আমার নিজের নামটাই তো ভুলে গিয়েছিলাম।

মুখে বললো-হ্যাঁ হ্যাঁ ভাগ্যবান আমি আঙ্কেল ,আপনার মত লোকের সাথে কাজ করতে পারছি মাফিয়া কিং হয়ে গেছি। ধন্যবাদ আপনাকে।

তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেও রেয়ান চৌধুরী তার বুঝলেন না , প্রতিউত্তরে মুচকি হাসলেন শুধু ।
এদিকে আর্থার ভাবছে , ইয়াসমিনা চৌধুরীর কথা ,কি রিঅ্যাকশন দিবেন উনি তার স্বামীর পাশে নওশাদ নামের এই আর্থার কে দেখে!


তিনজন মেইড চোখে সাদা কাপর বেঁধে নিলো , এরপর বাথটবে পানিতে গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে দিলো সুগন্ধি সহ । সেখানে সুন্দরী এক রমনী প্রবেশ করলো , সদ্য ফোটা ফুলের মতো কোমল ত্বক তার , হলদেটে , চকচকে ফর্সা শরীর, লালচে সোনালী চুল গুলো ফ্লোরে ছড়িয়ে আছে, ধীর পায়ে বাথটবের কাছে গেলো , উষ্ণ পানির ছোঁয়া নরম কোমল ত্বকে লাগলো ।মেইড রা হুরের চুলগুলো সুগন্ধি শ্যাম্পু ব্যাবহার করে পরিস্কার করে দিলো ।

গোসল শেষে হুর ধূসর রঙের ফ্রক পরিধান করলো , মাথায় বরাবরের মতো হিজাব, জোহরের নামাজ শেষ , করলো , তার খালামনির আসার সময় হয়ে গিয়েছে, হুর মুখ ঢেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো , গাড়ি আসার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।
ছটফটে পায়ে এসে দাঁড়াতেই কালো বোরকায় আবৃত অনামিকাকে চোখে পড়লো , দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো ।
অনামিকা – আমার মিষ্টি পাখি , এভাবে দৌড়ে আসলে কেন , যদি পড়ে যেতে ?
হুর নিকাব এর আড়ালে শব্দ করে হেসে ফেললো , অনামিকা আল হাদাদ খান এর স্বামী ইসহাক খান তার শশুর ইউসুফ আল হাদাদ এর সাথে কথা বলতে বলতে অন্যদিকে চলে গিয়েছে ‌।

অন্যদিকে, গাড়িতে বসে থাকা ইরফান কে দুহাতে ধরে টেনে বের করার চেষ্টা করছে ষোড়শী কিশোরী মানহা। ইরফান এর এক কথা সে বাড়ির ভেতরে যাবেনা মানে যাবেনা।
মানহা- ভাইয়া , তুমি এতোদূর আসতে পারলে , আর এখন বাড়িতে যেতে পারবে না ? নাটক কম করো।চলো ।
ইরফান চুপ করে বসে রইল, সে কীভাবে বলবে যে তাকে সবাই জোড় করে টেনেটুনে এই কায়রো শহরে নিয়ে এসে এখন বাড়ির সামনে রেখে পাত্তা না দিয়ে নিজেরা চলে গিয়েছে তাই ইরফান ভেতরে যাবেনা?

মানহা কে বললো- তুই ভেতরে যা তো , দুমাস আগে এসেও বেড়িয়ে গেলি , এখন আবার এতো শখ । ডোন্ট ডিস্টার্ব মি।
মানহা ইরফান এর কোনো কথা শুনলো না , ইরফান কে টেনেটুনে ভেতরে নিয়ে যেতে লাগলো । ইরফান কঠোর চোখে তাকাতেই মানহা ইরফান কে ছেড়ে দিলো ভয়ে , কিছুক্ষন এর জন্য ভুলেই গিয়েছিল যে ও ভাইকে ভয় পায় ।
মাথা নিচু করে দৌড়ে গিয়ে মায়ের পেছনে লুকিয়ে গেলো ।

ইরফান খান ঝাড়া দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো , গম্ভীর মুখ , নিজের গম্ভীর উপস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা, ভবিষ্যত কাশ্মীরের মন্ত্রী সে । বলিষ্ঠ ছয় ফুট এক ইঞ্চির ইরফান ভারী বুটের শব্দ করে কয়েক কদম এগিয়ে গেলো ।
কালো সিল্কি চুল গুলো কপালে পড়ে আছে ,দেখতে সিনেমার হিরোদের থেকে কম না ।

সামনে তাকাতেই চোখজোড়া সেখানে কিছুক্ষণ এর জন্যে থমকালো , নিজের সাতাশ বছরের জীবনে এই প্রথম এমন কিছু ঘটলো। কিন্তু সামনে থাকা অদ্ভুত আকর্ষণীয় চোখ দুটি ইরফান কে দেখা মাত্রই স্থান ত্যাগ করলো।


হুর ভ্রু কুঁচকে সামনে থাকা রমনীকে দেখছে , লজ্জায় মেয়ে চোখ তুলতে পারছেনা।এতো লজ্জা পাওয়ার কি আছে? বুঝতে পারছেনা হুর । মেহমান দের সাথেই তো কথা বলবে এতে লজ্জার কি?
হুরের মামাতো বোন রুকাইয়া,হুরের চেয়ে ছয় মাসের বড় ,বিশ বছর বয়স চলে ।দেখতে মিষ্টি তবে বুদ্ধিমতী ।
হুর উঠে চলে গেলো রুমে ।

কিছুক্ষন পর আবার ঘুরতে ফিরতে লাগলো ,একা একা ,পুরো বাড়ি । পাখির মতো উড়তে লাগলো ।
লম্বা করিডোর হতে উপর নিচ তাকিয়ে হাটতে লাগলো , উদ্দেশ্যে হলো মানহার সাথে দেখা করা ।

তখনই একটা গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এলো – এই মেয়ে দাঁড়াও।

হুর ভ্রু কুঁচকে তাকালো ,এমন খাটাশ মার্কা শব্দ সে আগেও শুনেছিল, নওশাদ এর কাছে । পৃথিবীর সব মানুষের কন্ঠ কি এমন খাটাশ মার্কা?হুর ছোট ছোট চোখ করে তাকালো লোকটার দিকে।

একজন পুরুষ,যিনি কিনা তার মামাতো ভাই ,তবে মুখোমুখি কথা বলতে সংকোচ বোধ করলো । যেহেতু দাঁড়াতে বলেছে মাথা নিচু করে দাঁড়ালো যেন তার চোখে চোখ না পড়ে ।
ইরফান হুরের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো – বিয়ে যদি করতেই হয় আমি এই মেয়েকেই করবো আম্মা।

দুপা এগিয়ে এসে বললো- তোমার নাম ?

হুর সেভাবেই উত্তর দিল – মেহবুবা চৌধুরী হুর ভাইয়া ।

ইরফান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে হাসলো ,সামনের রেলিং এ কতগুলো সবুজ গোলাপ ঝুলছে গাছের ডালে , ইরফান সেদিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললো- হুর,বাহ খুব সুন্দর নাম , মাসাআল্লাহ্,জানো তো সবুজ গোলাপ আমি এর আগে কখনোই দেখিনি।

হুর ইরফান সরে গিয়েছে বুঝতে পেরে মাথা তুলে বললো- আরে ভাইয়া,ঐ যে রেলিং এর সাথে কতগুলো গাছ আছে ,আপনি চাইলে দেখতে পারেন।

তবে কথাগুলো বলে তাকিয়ে দেখতে পেলো , ইরফান হাতে তিনটা সবুজ রঙের গোলাপ নিয়ে ওর দিকেই এগিয়ে আসছে ।হুর বুঝলো না কিছু, ইরফান ঘোর লাগা দৃষ্টিতে পর্দায় আবৃত রমনীর দিকে তাকিয়ে এগোতে লাগলো ।
হুরকে না ছুঁয়ে এমন ভাবে হুরের হাতে দিলো ফুলগুলো যেন ইরফান এর বিন্দুমাত্র ছোঁয়া টাও যেন লাগা ঠিক হবে না ।
হুর বোকা বোকা চোখে তাকালো ইরফান এর দিকে, ইরফান বুকের বাঁ দিকে হাত দিয়ে বললো – এভাবে তাকিও না পরি ।এই ইরফান সেকেন্ড এ হাজার বার খুন হচ্ছে তোমার ঐ দৃষ্টিতে।

হুর পাশ কাটিয়ে চলে যেতে যেতে বললো – ভাইয়া আপনি হয়তো অসুস্থ বোধ করছেন, বিশ্রাম নিন ।

ইরফান সেদিকে চেয়ে গুনগুন করে বললো- গোলাপ পরি তোমাকে দেখে আমি বারে বারে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি।

এরপর ইরফান কাউকে একটা ফোন করলো , ঠোঁটের কোনে রহস্যময় হাসি , ওপাশ হতে রিসিভ হতেই ইরফান বলে উঠলো- বন্ধু তোমার পাখিকে দেখে আমি শূন্যতা অনুভব করছি ,চলে আসো বন্ধু, তাকে আমার না হতে দিলে আমি তাকে কারোর হতে দেব না।

ইরফান একদৃষ্টিতে সবুজ গোলাপ গুলিকে দেখে বললো
“তাকে দেখিনি ,অথচ মায়ায় পড়ে গেলাম
অদ্ভুত বিষাক্ত বিশ যা সবুজ গোলাপে পেলাম”

চলবে কি?

রেসপন্স না করলে আমি আর লিখবো না ,আগের পর্ব গুলোতে যারা রিয়েক্ট করেননি করে আসবেন। ধন্যবাদ।আপনারাও হয়তো আর পড়তে চান না ।

#মিহিকা_রোজা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here