‘বিয়ের পাঁচ বছর হলেও আমি আজও আমার স্বামীকে দেখিনি সরাসরি।’
কফির কাপে ঠোঁট ডুবিয়ে স্বাভাবিক গলাতেই কথাটা বলে নৌমি।তবে স্বাভাবিক থাকতে পারলো না ওর বান্ধবী আয়রা।চোখদুটো বড়বড় করে চিৎকার করে ওঠে স্থান ভুলে,
‘কি বলছো এসব?বিয়ে করেছো অথচ স্বামী দেখোনি?এ কেমন বিয়ে! আমার সবকিছু কল্পনা মনে হচ্ছে’
আয়রার উদ্বিগ্নতা লক্ষ্য করে হাসে নৌমি।যখনই ও ওর বিয়ে নিয়ে কাউকে কিছু বলে তখন সবার আয়রার মতোই রিয়াকশন হয়।এগুলো ওর কাছে নতুন কিছু না।বিয়ে নিয়ে কিছু ভাবলেও বুক চিঁড়ে দীর্ঘনিশ্বাস বের হয়ে আসে।এমন তো ওর সাথে হওয়ার কথা ছিলো না,তবুও কেন হলো?
‘কি হলো নৌমি বলছো না কেন? প্লিজ সাসপেন্স রেখো না। আমার মন আকুপাকু করছে তোমার ঐতিহাসিক বিয়ের ঘটনা শোনার জন্য।বলো না’
নৌমির হাত ঝাঁকিয়ে চঞ্চল কন্ঠে কথাটা বলে আয়রা।নৌমি হেঁসে ফেললো ওর কান্ডে।শুকনো ঢোক গিলে তথাকথিত ঐতিহাসিক বিয়ের ইতিহাস বলে,
‘আমার বয়স তখন পনেরো।সেইসময়টায় মেয়েরা যখন পড়াশোনা আর কল্পনা জগতে বসবাস করে তখন আমার পরিবার বিশেষ করে আমার দাদু আমার বিয়ের জন্য উঠে পরে লাগে।গ্রামের মানুষ তারউপর আগেরকার দিনের চিন্তাভাবনা তার।তাই নাতনীর বিয়ের জন্য পনেরো বছর বয়সটাই অনেক বেশি। যাইহোক দাদুর ইমোশনাল ব্যাকমেইলে বাবাও রাজি হলেন। দেখতে শুরু করে আমার জন্য পাত্র। এরপর আমার স্বামীর খোঁজ পায়।তখন তিনি সেনাসদস্য ছিলেন। সদ্য লেফট্যানান্ট হয়েছেন বুঝতেই পারছো ওই মূহুর্তে বিয়ে করাটা চাকরির ক্ষেত্রে ক্ষতিকর।দাদাশ্বশুরের কাছ থেকে জেনেছি তাকে শাশুড়ীমা দিব্বি দিয়ে রাজি করিয়েছিলেন। তার নাকি আমাকে খুব পছন্দ হয়েছিলো তখন বিয়ে না করালে যদি আমার অন্যকোথাও বিয়ে হয়ে যায় এই ভয়ে ছেলের মতের বিরুদ্ধে আমায় তার ঘরের পুত্রবধূ করে আনেন।বিয়ে নিয়ে একটু হলেও ধারণা আমার ছিলো। দাদু সবসময়ই বিয়ে নিয়ে নানান কথা তুলতো আমার কানে।তাই স্বামী হিসেবে যাকে পেয়েছি তাকে নিয়ে নানান কল্পনা সাজিয়েছিলাম মনে।অথচ ভাগ্য দেখো জোর করে বিয়ে দেওয়ার জন্য আমার মুখ পর্যন্ত দেখলো না আমার স্বামী আর না আমায় তার মুখ দেখিয়েছে। বিয়ের রাতেই আমায় ফেলে চলে গেলো কোয়ার্টারে,আর ফেরেনি! তাই আমারও তার তার মুখ দেখার সৌভাগ্য হয়নি’
চোখে পানি অথচ মুখে হাসি রেখে একনিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামে নৌমি।আয়রা চমকিত নয়নে দেখছে সামনের অসম্ভব সুন্দরী মেয়েটাকে।বিয়ে হওয়ার পরেও স্বামীর মুখ দেখতে না পাওয়া নিশ্চয়ই অনেক কষ্টের। বিয়ের পরে তো স্বামীই সব হয় মেয়েদের। নানান সপ্ন থাকে সংসার নিয়ে নৌমিরও নিশ্চয়ই ছিলো অথচ কি হলো?
‘কি হলো আয়ু খাচ্ছো না কেন? হট কফি তো এবার কোল্ড কফিতে পরিনত হয়েছে’
নৌমির মুখ থেকে হাসে সরছে না মোটেই।বুকে কষ্ট চেপে হাসার এক অলৌকিক ক্ষমতা বোধহয় নারী সমাজেরই রয়েছে। আয়রার মুখ কেমন কালো হয়ে গেলো নৌমির কথাগুলো শুনে।তাই তো কফির কাপে চুমুক দিতেও মন চাচ্ছে না।ওর শুনেই এতো খারাপ লাগছে তাহলে নৌমি?সে তো এসবের ভুক্তভোগী!
‘তুমি এতোকিছুর পরেও হাসছো নৌমি?কিভাবে?’
‘এতো প্রায় পাঁচবছর আগের ঘটনা। তাই এখন আর কষ্ট লাগে না শুধু নিজের ভাগ্যের উপর আফসোস হয় এইযা’
‘তুমি এখন কোথায় থাকো?শ্বশুর বাড়ি?তারা কেমন?’
আয়রার একসাথের প্রশ্নগুলো শুনে নৌমি শেষ বারের মতো কফির কাপে চুমুক দেয়।
‘শ্বশুর বাড়িতেই থাকি।ওনারা আমায় এতো ভালোবাসে যা বলার মতো না।বাবার বাড়ি খুব কম যাই। আমি যেতে চাইলেও সহজে আমায় ছাড়ে না আম্মু মানে শাশুড়ী মা।একদম মেয়ের তো সকলে আমায় ট্রিট করে’
‘তোমার ওই রামছাগল হাসবেন্ড কি একবারের জন্যও বাড়ি আসে নি?কথাও হয়নি তারসাথে?তার পিক দেখেছো?’
রামছাগল! শুনে নৌমি শব্দ করে হেসে ফেললো।হাসতে হাসতেই বললো,
‘ওমন ভালো মানুষের সাথে রামছাগল নামটা বেমানান আয়ু। তার পরিস্থিতিও একবার ভেবে দেখো।তিনি খুবই জেদি তাইতো পাঁচবছরে একবারও আসেনি বাড়িতে।পরিবারের সবার সাথেই কথা বলেছে বিয়ের প্রায় একবছর পরে।আমার কথাতো বোধহয় তিনি মনেও করে না।আম্মু একবার আমার কথা বলেছিলো তার কাছে রেগে তিনি তিনদিন ফোনই দেয়নি।পরে অবশ্য অনেক মানিয়ে কথা বলতে পেরেছে আম্মু।এরপর আর আমার কথা তোলেনি তার কাছে।পিক দেখেছি তার তবে তাতে কি আর বাস্তবে থাকা মানুষটাকে বোঝা যায় বলো?’
‘তোমার খুব রাগ না তার উপর? আমারই তো প্রচুর রাগ হচ্ছে।আরে ভাই জোর করে বিয়ে দিয়েছে মানলাম তাই বলে বউয়ের মুখ দেখবি না?’
‘ঠিক রাগ না তবে অভিমান বলতে পারো।তিনি তো আমায় বিয়ে করতে চায় নি জোর করে তার ঘাড়ে আমায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।শুধু চাই একবার তিনি আমার সামনে আসুক অনেক প্রশ্ন জমে আছে আমার, অনেক!’
‘যে মানুষটা তোমার খোঁজ নেয় না কিছুনা তাকে ডিভোর্স দাও।কেন পরে আছো মরীচিকার পেছনে?’
ঠোঁট কামড়ে দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ে নৌমি।বুকে ব্যাথাটা আবারও বেড়েছে। হয়তো স্বামী নামক পুরুষটার কথা মনে করাতে!এতো রোজই হচ্ছে।তবে ডিভোর্স! একথা মনে আনলেও শরীরে কম্পন জাগে।যতই হোক স্বামী তো।না হোক দেখা মায়া তো জন্মেছে।
‘ওসব নিয়ে আমি কিছু ভাবিনি,ভাবতেই পারিনা’
‘ওহ আচ্ছা! তা তোমার হাসবেন্ডের নাম কি?এতো কথা বললাম অথচ তার নামই জানা হলো না।’
এই পর্যায় এতে নৌমির গলা শুখিয়ে গেলো।পুরুষটার নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে কেমন একটা জড়তা কাজ করছে। তিনবার শুঁখনো ঢোক গিলে বলে,
‘তানজিম তূ..তূর্য!’
‘নামটা অনেক চেনা চেনা লাগছে..’
আয়রা কথাটা শেষ করবে তার আগে নৌমি ওকে থামায়।নিজ থেকেই বলে,
‘ আমিই বলছি, কদিন আগে জঙ্গিদের হাত থেকে যে সোমাপাড়ার মানুষের বাঁচিয়ে দেশে আলোড়ন তৈরি করলো সেই মানুষটাই আমার স্বামী, বুঝলে?’
আয়রার মুখটা হা হয়ে গেলো। অধিকাংশ রমনীর কল্প পুরুষই কিনা শেষমেশ নৌমির হাসবেন্ড?ওর ক্রাশ শেষমেশ ওর বন্ধুর স্বামী!একি হলো?নৌমি বেশ মজা পেলো আয়রার মুখটা দেখে আহারে বেচারি। একটু আগে যাকে রামছাগল বললো সেই ওর ক্রাশ হয়ে বের হলো।
‘অবাক হয়ে লাভ নেই আয়ু, এটাই সত্যি!’
‘ভাই আমার ক্রাশ ছিলো তিনি।তার প্রতিটা পিক আমার গ্যালারিতে অথচ দেখো সেই কিনা তোমার হাসবেন্ড, হায়হায়!’
অসহায় মুখ করে আয়রা কথাটা বলে।তূর্যকে নিয়ে কেউ একটু কৌতূহল হলে কিংবা প্রশংসা করলে ওর খুব ভালো লাগে। কারণটা হয়তো পবিত্র বন্ধনের জোরে।হাতঘড়ির টাইম এখন প্রায় সাড়ে বারোটা। আয়রার সাথে এতোদিন ফোনালাপের পর আজকে এই প্রথম মিট করতে আসছে।ফেইসবুক থেকে পরিচয় হয় আয়রার সাথে সেখানে থেকেই ভালো বন্ধুত্ব।তবে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এ-র আগে বলা হয়নি।নৌমি সরাসরিই এবিষয়ে কথা বলতে চেয়েছিলো।দেখতে চেয়েছিলো আয়রার চমকিত মুখখানা। ও আগে থেকেই জানতো তূর্য যে আয়রার ক্রাশ। তাই তো এতো আলাপ।ওর ভাবনার মাঝেই ফোনটা বেজে ওঠে শব্দ করে। স্ক্রিনে তাসফি নামটা দেখে হেঁসে ফেলে।তূর্য বাদে মোটামুটি সবাই ওকে ভালোবাসে। তার মধ্যে তাসফি অন্যতম।ফোন কানে তুলতেই তাসফির উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ ভেসে আসে,
‘হ্যালো ভাবি মনি কই তুমি?একটা খুশির সংবাদ আছে। শুনলে তুমি পাগল হয়ে যাবে আই’ম নিশ্চিত!’
নৌমির ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেলো।ওতো দশটার দিকে বাড়ি থেকে বের হলো এরমাঝে কি এমন খুশির সংবাদ হতে পারে?বুঝে আসলো না ওর।তাই না ভেবে প্রশ্নটা করেই ফেললো,
‘কি বলতো?’
‘আসলে হয়েছে কি জানো!’
‘হুম বলো শুনছি’
‘ তান’দা আজকে বাড়ি ফিরবে’
চলবে…?
#প্রিয়_নীলপদ্ম—০১.
#মুশরাফা_মিরা
[প্রিয়রা আমার, হূট করে লিখতে মন চাইলো।জানি না কি লিখেছি তোমাদের পছন্দ হবে কিনা,আশঙ্কায় আছি!যাইহোক নতুন গল্প এসেছে পড়ে নাওওও জলদি। আর লেখার কোথাও ভুল হলে কিংবা কোনো অশালীন কিছু থাকলে আমায় জানাবে মনে সংশয় না রেখে, হ্যাপি রিডিং]

