#প্রিয়_নীলপদ্ম—০২.
#মুশরাফা_মিরা
[কোনো প্রকার কপি নিষিদ্ধ]
‘ তান’দা আজকে বাড়ি ফিরবে’
তান মানে তো তানজিম!তূর্য বাড়ি ফিরবে তাহলে?এতো বছর পরে,আসলেই কি! নৌমি কি ভুল শুনলো? তাসফির কন্ঠে উচ্ছ্বাস নৌমিকে ঠিক রাখতে পারলো না।টেবিলের একপাশে আঁকড়ে ধরলো বাঁহাতে। কেমন জানি শক্তি ফুরিয়ে গেছে মনে হচ্ছে ওর।এমন তো হওয়ার কথা নয় তবে কেন?
‘ভাবিমনি শুনছো?হ্যালো!’
‘শু..শুনছি, কি বললে? আবার বলো শুনিনি ঠিকঠাক’
ভুল শুনলো কিনা তা যাচাই করতে আবারও প্রশ্নটি করা।তাসফি হেঁসে হেঁসে বলে,
‘তানদা আজকে বাড়ি আসবে বলেছে।আম্মু তো শোনার পর থেকেই রান্নাবান্না শুরু করে দিয়েছে। আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না তানদা বাড়ি ফেরার জন্য রাজি হয়েছে।তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি আসো সাথে তোমার বান্ধবীকেও নিয়ে এসো, ঠিক আছে?তাড়াতাড়ি ফিরবে’
বলেই কল কাটলো তাসফি।নৌমি হাসফাস করতে লাগলো।এতোদিন তো ও চাইতো মানুষটা বাড়ি ফিরুক অথচ আজ ফিরছে তাহলে এমন লাগছে কেন?আয়রা নৌমিকে খেয়াল করছিলো এতক্ষণ। ওর গতিবিধি লক্ষ করে বলে,
‘কি হয়েছে নৌমি?হূট করে এমন লাগছে কেন তোমায়?’
‘তূ..র্য বাড়ি ফিরছে আজ’
বহুকষ্টে কাথাগুলো আওড়ালো নৌমি।আয়রা আজকে অবাকের পর অবাক হচ্ছে খালি।ও খানিকটা বুঝতে পারলো নৌমির মনের অবস্থাটা।একহাতে নৌমির ডানহাত পুঁরে নিয়ে বলে,
‘রিল্যাক্স নৌমি এতো হাইপার হওয়ার প্রয়োজন নেই। তোমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পারছি। তার তো আসারই ছিলো একদিন না একদিন।তোমারই তো ভালো হলো তাই না?পাঁচটা বছর সম্পর্কের ভাড় তুমি একা টেনেছো এখন তোমার হাসবেন্ডের কাছে অভিযোগ তোলার সুযোগ পাবে।নিজেকে সামলাও নৌমি।একদম দূর্বল হবে না তার সামনে।বি স্ট্রং!’
আয়রার কথায় হয়তো কাজ হলো,নৌমি খানিকটা শান্ত হয়।নিজেকে সামলানোর চেষ্টা চালায়।পাশ থেকে পানি উঠিয়ে মুখে ঢেলে বলে,
‘আমি ঠিক আছি।এখন বাসায় যাবো।তুমিও চলো আম্মু যেতে বলেছে তোমায়’
আয়রা হাসলো, রাজি হলো না যেতে। এমন একটা মূহুর্তে ও গিয়ে কি করবে ওখানে? তারউপর বান্ধবীর বরের উপর ও ক্রাশ খেয়েছে এরজন্য তো শোক পালন করতে হবে একটু।যতই হোক অনেকদিনের ক্রাশ ছিলো একটু মন খারাপ লাগছে।আয়রা কোনো মতেই যখন রাজি হলো না তখন নৌমি হাল ছেড়ে দেয়।একাই রওনা হয় বাড়ির পথে। যেতেযেতে নিজেই নিজেকে বুঝ দেয় যাতে নিজের ভাঙ্গুর সত্তা প্রকাশ না হয় তূর্যর সামনে। ওকে কঠোর হতে হবে,হবেই।
বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে ওর আড়াইটা বেজে গেছে। এতো জ্যাম রাস্তায়। ঘন্টার পর ঘন্টা জ্যামে বসে থেকে ভিষণ দূর্বল হয়ে পরেছে ওর শরীরটা।ড্রয়িং রুমে আসতেই তাসফির দেখা মেলে বসে বসে টিভি দেখছে। ও তাসফির দিকেই এগিয়ে যায়।সোফায় বসতেই তাসফির চোখ পরে ওর দিকে।
‘অবশেষে আসলে তাহলে। কতক্ষন ধরে ওয়েট করছি তোমার আমি। তোমার বান্ধবী আসে নি?’
‘রাস্তায় প্রচুর জ্যাম তাসু।তোমার ফোন পেয়েই রওনা দিয়েছি।আয়ুর জরুরী কাজ আছে তাই আসেনি,বলেছে পরে একসময় আসবে’
‘ওহ্ দাড়াও শরবত নিয়ে আসি নিশ্চয়ই তেষ্টা পেরেছে’
বলেই চলে যার রান্নাঘরে।নৌমি কিছু বলে না। ও বাড়ির বউ হতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হচ্ছে ওর।তবে এ বাড়ির ছেলের স্ত্রী হিসেবে নয়!মাথায় মমতাময়ী স্পর্শ পেয়েই ভাবনার অবসান ঘটায় ওর।মিসেস তুলি দাড়িয়ে আছে ওর পাশে হাতে লেবুর শরবত। ইশারা করলো গ্লাসটি নিতে।বাধ্য মেয়ের মতো গ্লাসটি নিয়ে শরবতটুকু খেলো।যা গরম বাহিরে!শরবতটুকুর প্রয়োজন ছিলো ভিষণ। মিসেস তুলি নৌমির পাশে বসে,
‘তাসফির কাছে নিশ্চয়ই শুনেছিস যে তূর্য ফিরবে?’
নৌমি মাথা নাড়িয়ে হ্যা বুঝাইতে তিনি আবার বললেন,
‘সময় এসেছে মা সবকিছু ঠিক করে নেওয়ার।অনেক তো হলো এবার এটার একটা গতি হোক।তূর্যর সাথে কথা বলে সব ঠিকঠাক করে নিস।আমি তোর বাবা সবাই বলবো।অনেক তো হলো!’
নৌমি হাসলো এতো সহজে কি সবকিছু ঠিক হবে?যে পুরুষটা বিয়ে করেই চলে গেছে, খোঁজ নেয়নি বিবাহিত স্ত্রীর।সেকি এখন মানবে ওকে?নৌমি নিজেও কি সবকিছু মেনে নিতে পারবে?এসব কথা চেপে মিসেস তুলির হাত ধরে বলে,
‘আম্মু, এতোটাই কি সোজা সব ঠিক করা?পাঁচ বছরে যার সমীকরণ মেলেনি তা এক কথায় কিভাবে মিলবে?আপনার ছেলে তো আমার নাম পর্যন্ত শুনতে চায়না।আমি কিভাবে ঠিক করবো সবটা?আপনিই তো বলেন, একটা সম্পর্ক তখনই সুন্দর যখন দুজনের প্রতি দু’জনার বিশ্বাস, ভালোবাসা থাকে।অথচ দেখুন আপনার ছেলে আর আমার সম্পর্ক শুধু বিয়ে নামক বন্ধনেই আঁটকে আছে। সেখানে ভালোবাসা তো দূর সাক্ষাৎ পর্যন্ত নেই। কিভাবে ঠিক হবে আমাদের সংসার?’
মিসেস তুলি চট করে উত্তর দিতে পারলো না নৌমির কথার।কি-ই বা দিবে?সে মুখ রেখেছে তার ছেলে?মেয়েটার সাথে তো তারা কম অন্যায় করেনি!নিজের ছেলের জন্য মেয়েটাকে তো কম অপমান সহ্য করতে হয়নি,হচ্চেনা।তবুও আশা সবঠিক হয়ে যাবে।ছেলেটা ঘরে ফিরলেই এনিয়ে বৈঠক করতে হবে।অনেক হয়েছে এর শেষ দেখেই ছাড়বেন এবার।
নৌমি বসা থেকে উঠে দাড়ায়।মিসেস তুলির থেকে উত্তরের আশা ওর নেই।তিনি উত্তর দিতে পারনে না ওর প্রশ্নের একথা ওর জানা।তাই বসে থাকার মানে নেই কোনো।
‘কোনো রান্না বাকি আছে আম্মু?একা হাতে সব করতে হলো আপনাকে।আসলে রাস্তায় এতো জ্যাম যা বলার মতো না।’
নৌমি যে প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাচ্ছে তা মিসেস তুলি বুঝতে পারলো।মেয়েটা এসব কথা সহজে বলতে চায়না। পুরনো ঘা সতেজ করতে কে-ই বা চায়?
‘তুই ফ্রেশ হয়ে আয়।সেই কখন বের হয়েছিলি।আমার সব করা শেষ।’
‘আম্মু একটা অনুরোধ আমার খাবারটা ঘরে পাঠাবেন। খুব ক্লান্ত লাগছে আমার। নিচে নেমে খাওয়ার মতো এনার্জি নেই’
নৌমির অজুহাত শুনো মিসেস তুলি হাসলো।মেয়েটা যে তূর্যর সামনে পরতে চায়না তা তিনি ভালোই বুঝতে পারছেন।তবে মেনে নিলেন নৌমির কথা।নৌমি গুটিগুটি পায়ে সিঁড়ি বেয়ে চলে গেলো দোতালায়,নিজের বরাদ্দ রুমে। মিসেস তুলি শুধু চেয়ে দেখলেন ওর যাওয়া। এই অসম্ভব সুন্দরী মেয়েটার সাথে তারা খুব অন্যায় করেছে তার ক্ষমা কিভাবে মেলাবেন তারা?
‘আম্মু ডাল হয়ে এসেছে এদিকে আসো’
তাসফির ডাকে মিসেস তুলি ছুটলো রান্নাঘরে।কত কাজ তার বাকি এখনও। কত বছর পরে ছেলেকে খাওয়াতে পারবেন নিজ হাতের রান্না!
______________
নৌমির ঘুম ভাঙলো মাগরিবের পরে।সারাদিনের ক্লান্ত শরীর বিছানা পেতেই গভীর ঘুম দিয়েছিলো যার ফলে সন্ধ্যা ঠেকিয়ে ঘুম ভাঙলো ওর।আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছাড়তেই নিচ থেকে হইচই এর আওয়াজ আসলো।সকালে পুরো বাড়ি নিরব ছিলো তার এখন কোলাহলপূর্ন।কারণ? ওহহো তূর্য!একমুহূর্তের জন্য ভুলেই গেছিলো আজ তূর্যের ফেরার কথা।তারমানে কি তিনি এসে গেছে?ভাবতেই শরীর হিম হয়ে গেলো।গলা শুখিয়ে গেলো ওর।জোড়ে শ্বাস টেনে নিজেকে সামলিয়ে একা-একাই বলে,
‘নৌমি নিজেকে সামলাও।এতো হাসফাস করার কি আছে? তুমি তো এমন নও,বি স্ট্রং!’
একা-একা বিরবিরিয়ে নিজেকে শান্ত করে ফ্রেশ হয়ে নামাজ আদায় করে নেয়।সঙ্গে আসরের নামাজ কাজা পড়ে নেয়।ঘড়ির দেয়ালে তখন ছয়টা পয়তাল্লিশ।না এখন রুম থেকে বের হওয়া উচিত এভাবে তো আর ঘরবন্দী হয়ে থাকা যাবে না।যত যাই হোক ও এবাড়ির বউ বলে কথা!এভাবে ঘরে বসে থাকাটা নিশ্চয়ই দৃষ্টিকটু লাগছে! পুরো মাথায় ওড়না ভালো করে পেঁচিয়ে রুম থেকে বের হলো।ওকে যে ঘরটি দেওয়া হয়েছে তার একঘর পরের ঘরখানাই তূর্যর।সিঁড়ি দিয়ে নামতে গেলো ওই ঘরের সামনে দিয়ে যেতে হয়।তাই আস্তে ধীরে আশপাশে চোখ বুলিয়ে সিঁড়ির দিকে আগালো।মনেমনে আল্লাহকে ডাকলো যাতে তূর্যর সামনে না পড়তে হয় ওকে।
তবে খোদা বোধহয় এ যাত্রায় ওর ডাক শুনলো না।তূর্যর ঘর পাস করার সময়ই তূর্য বাবাজির সম্মুখে পরতে হলো ওকে।আর দু কদম আগালেই ধাক্কা কনফার্ম ছিলো।লাস্ট মূহুর্তে নৌমি নিজের ব্রেক কষলো পেরেছিলো বিধায় ধাক্কা লাগেনি। তূর্য ফোনের পানে চেয়ে কিছু একটা দেখছিলো বিধায় আশপাশ খেয়াল করেনি প্রথম।পরে নিজের পাশে কোনো মানুষের উপস্থিত টের পেয়ে ফোন থেকে মাথা তোলে।ঘাড় ঘুরিয়ে চায় বামপাশে। ওর বুক বরাবর একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে চোখ বুঁজে। হয়তো ধাক্কা হওয়ার আশঙ্কায় এমন রিয়েকশন। তূর্য বুঝলো!কিন্তু কে এই রমনী?আগে তো দেখেনি।ওড়না দিয়ে পুরো মাথা কভার করা প্রসাধনী বিহীন স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে তূর্য মুগ্ধ হলো।নৌমি ধপ করে বুঁজে থাকা চোখ দু’টো মেললো।চোখাচোখি হলো তূর্য-নৌমির।একজনের চোখে মুগ্ধতা আর আরেকজনের চোখে অস্বস্তি।তূর্য চোখ অন্যত্র ঘুড়িয়ে নেয়।এভাবে অচেনা একটা মেয়ের দিকে হাবার মতো তাকিয়ে থাকা তো ওর রুলসের বাইরে।নিজেকে শান্ত করে বলে,
‘আপনি কে?’
‘আমি মানুষ!’
চলবে….?
[নাও পাখি গল্প আপলোড করলুম পড়ে নিয়ে সময় করে, হ্যাপি রিডিং]

