#প্রিয়_নীলপদ্ম —০৩.
#মুশরাফা_মিরা
[কোনো প্রকার কপি নিষিদ্ধ]
‘আপনি কে?’
‘আমি মানুষ!’
নৌমির ত্যাড়া উত্তরে তূর্যর চোয়াল শক্ত হলো।চুনাপুঁটি মেয়ে হয়ে তূর্যের সাথে মশকরা?নৌমিও কথাটা বলে থতমত খেয়ে গেলো ভুল করে মুখ ফসকে বের হয়ে গেছে।তূর্য এবার গম্ভীর কন্ঠে বলে,
‘আপনি আমার সাথে মশকারি করছেন?’
‘কেন আপনি কি আমায় বেয়াই?আপনার সাথে কি আমার মশকরার কোনো সম্পর্ক আছে?আপনি জিজ্ঞেস করেছেন আমি কে তাই আমি বলেছি আমি মানুষ।’
নৌমি নিজের ভুলটা ধরা দিতে চায়নি।তবে তূর্যর ছাড়ার পাবলিক নয়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
‘আপনি যে মানুষ তা তো দেখতেই পাচ্ছি। নিশ্চয়ই গরু-ছাগল হলে এখানে থাকতে না গোয়াল ঘরেই থাকতেন’
অপমান!তবে সয়ে নিও নৌমি।যেহেতু ওমন ফাজলামো মার্কা কথাটা বলেছে তাই অপমান না হয় একটু সয়ে নিলো।মাঝেমধ্যে নিরব থাকাও শ্রেয়।চুপচাপ পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্ধত হলে তূর্য ফের বলে,
‘নাম কি আপনার?আপনাকে চিনি বলে তো মনে হচ্ছে না।কে আপনি?’
নৌমির হাসি পেলো তূর্যর কথায়।বলতে ইচ্ছে করলো আমি আপনার সেই স্ত্রী যাকে বিয়ের আসরে ফেলে চলে এসেছিলেন।যাকে ভরা সমাজে অপমানের সম্মুখীন করেছিলেন আমি সেই। তবে এসব বলার ইচ্ছে হলো না।ও এখান থেকে চলে যেতে পারলেই বাঁচে। তাই ছোট্টো করে বলে,
‘নৌমি… নৌরিন নৌমি’
বলে আর দাঁড়ায় না।বড়বড় কদম ফেলে চলে যায় ওখান থেকে। তবে তূর্য দাঁড়িয়ে রয় একই জায়গায়।আজব মেয়েতো পরিচয় দিলে কি এমন হতো?শুধু নাম বলেই ও চিনবে নাকি!ঠোঁট কামড়ে ভাবে নৌমি?কে উনি? কি করছে তার বাড়িতে?
_____________
‘ঘরের বউ যদি এতোটা দায়িত্বজ্ঞানহীন হয় তাহলে তো কোনো পুরুষই ঘর মানবে না।একে তো ছেলেটা এই মেয়েকে বিয়ের জন্য রাজিই ছিলো না।তবুও জোর করে বিয়ে দিলে ছোটবউ।ছেলেটাকে ঘর ছাড়া করলে।এখন স্বামী ফিরেছে কই একটু স্বামীর আশেপাশে থাকবে না তা-না তিনি ঘরে বসে আছে।ঢং!’
বসার ঘর থেকে এমন কথায় নৌমি সিঁড়িতেই থমকে দাঁড়ায়।সব দোষ ওর ঘাড়ে এখন।আদোও কি এখানে ওর দোষ আছে?তূর্যর সামনে গিয়ে বেহায়ার মতো যদি বলতো ‘সোয়ামি আমি আপনার ইস্তিরি’এমন বললে ভালো হতো বোধহয় ভালো লাগতো ওনার। দাদি শাশুড়ীর বোন বরাবরই ওকে অপছন্দ করে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে।তবে তা সয়ে যায় ও কিন্তু তূর্যর চলে যাওয়াতে ওকে দায়ী বানানোর অপবাদ মানতে পারে না। কিছু না করেও কথা শুনতে হয় ওকে বারবার।
‘আপনি পথ আঁটকে দাড়িয়ে আছেন কেন?নিজেও নামবেন না আর অন্যকেও না নামতে দেওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে নাকি?’
তূর্যর কথায় চমকে ওঠে নৌমি।ভাবনার সমাপ্তি ঘটিয়ে পাশে সড়ে দাঁড়ায়। নিচে নামার ইচ্ছেটুকু হারিয়ে ফেলেছে তবে না নেমেও তো উপায় নেই। তূর্য ঘাড় বাঁকা করে একবার দেখে নেয় নৌমিকে।এতো কথা ও বললো অথচ মেয়েটা কিছুই বলছে না,কেন?
মিসেস তুলির চোখ যায় সিঁড়ির পানে।তূর্য আর নৌমিকে একসাথে দেখে অবাক হয় সাথে খুশিও।ইশ কি সুন্দর লাগছে দু’জনকে একসাথে।এবার সব ঠিক হলেই তার শান্তি। নৌমি এবার তূর্যকে অনুকরণ করে বলে,
‘আপনি এখন পথ আঁটকে দাড়িয়ে আছেন কেন?নামতে মন না চাইলে ঘরে গিয়ে বসে থাকুন তবুও অন্যকে নিচে যাওয়ার পথ ছেড়ে দিন’
তূর্য বেশ অবাক হয়। এই মেয়ে ওকে এভাবে বলছে?একজন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেনের সাথে এমন ব্যবহার?যার কথায় বাকিরা কাঁপে তারে এভাবে ব্যঙ্গ করছে এই চুনাপুঁটি? ও জানে তূর্যের পাওয়ার সম্পর্কে?জানলে নিশ্চয়ই এমন ব্যবহার করার সাহস পেতো না।মনের কথা মনেই থাকে তূর্যর।নৌমি পাশ কাটিয়ে নিচে নেমে যায়।পিছন থেকে তূর্য একা একা বিরবিরায়, ‘বেয়াদব মেয়ে’
নৌমি বসার ঘরে আসতেই ওর দাদীশাশুড়ি ডাকে দেয় ওকে,
‘নৌমি তোর চোখমুখের অবস্থা এমন কেন বোন?দুদিনেই কেমন হয়ে গেছিস।এতো শুখিয়ে গেছিস কেন?বউমা তুমি ওকে খাওয়াও নি ঠিক করে?আমি দুদিন বাড়িতে ছিলাম না এর মধ্যেই মেয়েটা এতো শুখিয়ে গেছে!’
হাফসা খাতুনের কথায় তাসফি,মেহেরবা মিটিমিটি হাসে আর নৌমির চোখজোড়া বড়সড় হয়ে যায়।এ শুখিয়ে গেছে? নিজেকে তো হাতি হাতি মনে হয় ওর হাফসা খাতুন ওকে এতো খাওয়ায়।বোনের আদিখ্যেতায় মুখ বাঁকায় হাফসা খাতুনের বোন রিমা খাতুন। নৌমিকে তার মোটেই সহ্য হয়না।
‘না দাদু আমি তো একদম ফিটফাট আছি। কদিন পর দেখছো তো তাই এমন লাগছে।’
হাফসা নিজের পাশে টেনে বসায় ওকে।কানের কাছে ফিসফিস করে,
‘দাদু ভাইয়ে সাথে দেখা হয়েছে?কথা বলেছিস ওর সাথে?’
নৌমি মাথা নাড়িয়ে হ্যা বুঝাতেই হাফসার মুখে হাসি ফোটে।কিছু বলবে তার আগে পায়ের শব্দ পিছনে ফেরে।তূর্য এতক্ষণ সিঁড়িতেই দাঁড়িয়ে ছিলো।এখন নামছে তারই শব্দ হচ্ছে। নৌমিও পিছনে ফেরে।আগাগোড়া কালো পোশাকে সুদর্শন পুরুষটির দিকে না চাইতেও চোখ যায় ওর।মনে হয় এই পুরুষটি তো ওর!কিন্তু না সবকিছু এতো তাড়াতাড়ি ঠিক করলে হবে না,অনেক বোঝাপড়া বাকি যে।
তূর্য সোফায় এসে বসে নৌমির সামনের সোফায়। ওকে দেখে মিসেস তুলি ছুটলো রান্না ঘরে ছেলের পছন্দের কফি করতে।হাফসা তূর্যের পানে চেয়ে আফসোসের স্বরে বলে,
‘এতো অভিমান তোমার দাদুভাই!নিজের দাদার মৃত্যুর সময় পর্যন্ত আসলে না’
‘তখন একটা মিশনে ছিলাম দাদিমা।সেটা তো জানোই।বাড়ি না ফেরার কারন আলাদা করে বলতে হবে আবারও?’
নৌমি মাথা নিচু করে বসে থাকে।তূর্যের কথায় এবার নিজেকে দায়ী মনে হচ্ছে ওর জন্য এবাড়ির ছেলে ঘর ছাড়া হয়েছিলো।অজান্তেই একজনের বাড়ি, পরিবারের থেকে দূরে সরার কারন হলো।মিসেস তুলি কফি করে এনে দিলো তূর্যকে।নৌমিকে বলে
‘কিছু খাবি মা?ভাতটাও তো খেলি না ঠিকঠাক।কিছু বানিয়ে দেবো?’
‘ওকি ছোট খুকি যে ওকে সবকিছু তৈরি করে দিতে হবে?হাত নেই ওর?বউমা ওকে তোমরা মাথায় তুলো না তো।’
রিমা খাতুনের কথায় নৌমি ঠোঁট চেপে নিজেকে শান্ত রাখে।ও চায় না মুখ ফসকে কিছু বলে বৃদ্ধার অসম্মান করতে।তবে চুপ থাকে না হাফসা খাতুন।নৌমিকে সে খুব ভালোবাসে,ভালোবেসেই তো নিজের নাতির জন্য বউ হিসেবে পছন্দ করেছে।
‘আপা তোমার নৌমিকে নিয়ে সমস্যা কেন এতো বলতো?কি ক্ষতি করেছে ও?সবসময় ওকে কেন এতো কথা শোনাও তুমি?’
‘কারণ ওর জন্যই তূর্য বাড়ি ছাড়া হয়েছিলো।কিভাবে পারিস এই মেয়েটাকে এতো মাথায় তুলতে?ওকে দেখলেই মেজাজ গরম হয়ে যায় আমার।’
তূর্য নৌমি কে হতে পারে এনিয়েই ভাবছিলো তবে বড়দাদির কথায় টনকনড়ে।নৌমির জন্য বাড়ি ছেড়েছিলো ও?তাহলে কি এই মেয়ের সাথেই ওর বিয়ে…!গম্ভীর চোখে নৌমিকে দেখে সংশয় দূর করতে মায়ের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করে,
‘আম্মু নৌমি কে হয় আমাদের পরিবারের?বড়দাদি এসব কি বলছে?’
নৌমির এবার কান্না পাচ্ছে। নিজেকে নিয়ে এতো ঝামেলা সহ্য হচ্ছে না ওর।পালিয়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে কোথাও।হাফসা খাতুন দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলে,
‘তোমার বউ হয় ও।নৌমির সাথে তোমার বিয়ে হয়েছিলো পাঁচবছর আগে’
তূর্য কিছুটা ধাক্কা খেলেও নিজেকে সামলিয়ে নেয়।নৌমি তাহলে ওর বিবাহিত স্ত্রী!এই চুনাপুঁটির সাথেই ওর বিয়ে দিয়েছিলো ওর পরিবার।এবার ভালো করে পরখ করে নৌমিকে।দেখতে মাশা-আল্লাহ।তবে ত্যাড়া স্বভাবের কিছুটা।না পরিবারের পছন্দ আছে বলতে হয়।ভালো করে দেখে নেয় পাচঁ বছরের আগের বউকে যাকে এর আগে ওর দেখা হয়নি ভালো করে।
নৌমি আড় চোখে তূর্যকে একপলক দেখতে গিয়ে চোখাচোখি হয় ওদের আবারও! তৎক্ষনাৎ চোখ সরিয়ে নেয় নৌমি।ঢং যেই শুনলো ও ওনার বিয়ে করা বউ সেই কেমন করে তাকিয়ে আছে দেখো।রাগে-দুঃখে ভেঙচি দেখায় তূর্যকে।নৌমির পানে চেয়ে চেয়েই কফির কাপে চুমুক দিচ্চিলো তূর্য।হঠাৎ ভেঙচি কাঁটায় ওর কাশি উঠে যায়।সকলে ব্যস্ত হয়ে পরে তূর্যকে নিয়ে।এ সুযোগে নৌমি উঠে পরে ওখান থেকে। নিজের রুমের দিকে পা বাড়াতেই তূর্য নিজেকে সামলিয়ে ডেকে ওঠে,
‘এই মেয়ে দাঁড়াও’
নৌমি দাঁড়ায় তবে পিছে ফেরে না।পুরুষটার কন্ঠ এমন কেন?নৌমিকে কেমন এলোমেলো করে দেয়।তূর্য নিজ থেকেই এগিয়ে আসে।এক হাত দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ায় নৌমির পাশে।বাকিরা ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে।বর্তমানে তূর্য-নৌমিকে নিয়েই যত উৎকন্ঠা।
‘তোমার সাথেই তাহলে আমার বিয়ে হয়েছিলো!’
নৌমি হাসে,তাচ্ছিল্যের হাসি।অবশেষে জানার ইচ্ছে হলো নিজের বউকে নিয়ে তবে।কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে পিছু ফিরে সরাসরি চোখ রাখে তূর্যর চোখে।কিছুটা তেজমিশ্রিত কন্ঠে বলে,
‘আপনার স্ত্রী হতে যাবো কেন?আমি তো সেই পুরুষটার স্ত্রী যে বিয়ের আসরে বউ ফেলে পালায়।সেই পুরুষের স্ত্রী আমি যে তার সদ্য বিবাহিত বউয়ের মুখ পর্যন্ত দেখেনা,নাম পর্যন্ত জানেনা।ছোট মেয়েটার উপর চড়াও হওয়া মানুষের মাঝে ফেলে চলে আসা পুরুষটির স্ত্রী আমি।পাঁচ বছরের একবারও খোঁজ না নেওয়া, বেঁচে আছি না মরে গেছি এসব বিষয় বিন্দু মাত্র আগ্রহ না দেখানো পুরুষটির স্ত্রী আমি।আপনি কি সেই পুরুষ?তাহলে হ্যা আমি আপনার স্ত্রী!’
এতোদিনের জমানো কষ্টগুলো উগ্রে দিতে ইচ্ছে হলো ওর।তবে তা কি হয় সামান্য কটা বাক্যে?কিছুটা হলেও এবার অভিযোগগুলো ছুড়তে পেরেছে ও তূর্যের দিকে।নৌমি কথাগুলো বলে আর দাঁড়ায় না।একটুও ভাবেনা ওর কথাগুলো কে কিভাবে নিবে।সোজা চলে যায় বরাদ্দকৃত রুমের দিকে। এদিকে উপস্থিত রিমা খাতুন বাদে সকলেই কিছুটা হলেও নৌমির কষ্ট বুঝলো।কম তো সহ্য করেনি এ যাবত। রিমা খাতুন দাঁত কিড়মিড়িয়ে নৌমির উদ্দেশ্যে বলে,
‘কি বেয়াদব মেয়েরে বাবা।এমন চ্যাটাংচ্যাটাং কথা বললে কি আর সংসার হয়?ঢং দেখে বাঁচি না’
মেহেরবা নিজের নানির উপর বেজায় বিরক্ত।তাই তার উদ্দেশ্য বলে,
‘বেঁচে যখন আছো তাহলে তো দেখতেই হবে এমন ঢং।বলি কি নানিমা নানার কাছে চলে যা-ও তাহলে আর ঢং দেখতে হবে না তোমায়’
নিজের নাতনির কথায় রিমা খাতুন রেগে গেলেন। যে নাতনিকে এতো ভালোবাসে সেই কিনা তাকে মরতে বলছে?এদের তিনি এতো ভালোবাসে।
‘মেহু মুখ সামলে কথা বল’
মেহেরবা পাত্তা দিলে তো সে ব্যস্ত হয়ে পরে তাসফির সাথে কথায়।মিসেস তুলি হেঁসে চলে গেলেন রান্না ঘরে আর হাফসা সোফায় বসে নৌমি-তূর্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় ডুবলেন।
তূর্য পকেটে হাত গুঁজে চেয়ে রইলো নৌমির গমন পথে।নিজের করা ভুলের জন্য এতো বছর ধরে যতটা না অনুতপ্ত হচ্ছিল এখন নৌমির অল্প ক’টা কথায় তার চেয়ে দিগুণ অপরাধবোধ জাগ্রত হলো মনে।ফোঁস করে নিশ্বাস ছেড়ে একা-একাই বলে,
‘এমনে মিশনের থেকে বউ মানানোর মিশন বেশি জটিল হবে’
চলবে…..?
📍[পছন্দ হচ্ছে তো পাখি?আর কমেন্ট বক্স চেক করার অনুরোধ রইলো, হ্যাপি রিডিং]

