#প্রিয়_নীলপদ্ম —০৪.
#মুশরাফা_মিরা
[কোনো প্রকার কপি নিষিদ্ধ]
নৌমি ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে তার পাশেই বসে পরে। কান্না পাচ্ছে প্রচুর।ওই মানুষটার জন্য আর কত সহ্য করতে হবে ওকে?কি ছিলো ওর অপরাধ?মেয়ে হয়ে জন্মানো?বোধহয় তাই!না হলে ওর পরিবার কেন বিয়ের জন্য এতো উতলা হয়েছিলো?
তবে এটুকুই শান্তি,যাক কিছু তো বলতে পেরেছে তূর্যকে এটাই বা কম কিসের?নিজেকে মোটেই নরম বানানো যাবে না।নরম মানুষের দুঃখ কমে না।তাই কঠোর হতে হবে ওকে।সংসার করলেও ওই ব্যাটা তূর্যকে পাঁচ বছরে নৌমি যে কষ্ট পেয়েছে তার জন্য মাশুল গুনতে হবে।
‘আমি নৌরিন নৌমি।ক্যাপ্টেন মহাশয় আপনাকে তো নাকে দড়ি দিয়ে ঘুড়াবো আমি।অকারণে আমি কষ্ট পেরেছি আপনার জন্য,এতো সহজে তো ছাড়ছি না’
নিজের সাথে বোঝাপড়া করে উঠে পরে বসা থেকে। চোখমুখে পানি দিয়ে পড়ার টেবিলে বসে।এসব ঝামেলার চক্করে পড়াশোনা হচ্ছে না ঠিকঠাক।অথচ ক’দিন পরে ওর সেমিস্টার!যেই না পড়ায় মনোযোগ দিবে এরমধ্যে ফোন বাবাজী নেচে-কুঁদে ওঠে।বিরক্ত হয় হঠাৎ ফোন বেজে ওঠায়।তবে ‘আয়ু’ নামটা দেখে বিরক্তি উবে যায়।মুচকি হেসে ফোন রিসিভ করে,
‘হ্যালো নৌমি,কি খবর তোমার? তূ..মানে দুলাভাই এসেছে? কথা হয়েছে দু’জনার? তোমায় দেখে তার কি রিয়াকশন হয়েছে?বলো বলো।আমি এসব চিন্তায় ঠিকমতো খেতে পর্যন্ত পারি নি।কি হয়েছে?’
আয়রার এতো-এতো প্রশ্নে নৌমি না হেঁসে পারে না।একটু আগের কষ্ট ভুলে হেঁসে বলে,
‘আস্তে আস্তে আয়ু এতো প্রশ্ন একসাথে করলে কোনটা রেখে কোনটার উত্তর দি বলো?’
‘না বাবা আমার এতো ধৈর্য নেই। তুমি চটপট খুলে বলো তো কি হয়েছে ওখানে’
নৌমি সব খুলে বলে আয়রাকে।ওদিকে আয়রা নৌমির কথাগুলো শুনে তো বেজায় খুশি।কিছু মানুষ থাকে না যারা অন্যের খুশিতে আনন্দ খুজে পায় আয়রাও তাদের একজন। নৌমির এমন কঠোরতায় বেশ খুশি হয়েছে ও।
‘ভাইরে ভাই তুমি তো ফাটিয়ে দিয়েছো নৌমি।সত্যি বলছি এখন যদি আমার কাছে তুমি থাকতে না দুগাল লাল করে ফেলতাম তোমার চুম্মা দিয়ে। ঠিকই আছে বউ রেখে চলে যাওয়া,একটুও ছাড় দিবে না।’
‘আময় চুম্মা দিতে হবে না তোমায়।তোমার প্রিয়তমকে দিও তিনি মহা খুশি হবে’
এযাত্রায় একটু লজ্জা পেলো আয়রা।কল্পনা করলো তার ভালোবাসার মানুষটিকে সে নিজ থেকে চুমু দিচ্ছে, আয়হায় কি লজ্জা!ইশ, কল্পনার মতো যদি পারতো।তবে সে কপাল তো আর ওর নেই।
‘কি হলো আয়ু?কল্পনাতেই চুমু দিলে নাকি?কথা বলছো না কেন হু?’
নৌমি ইচ্ছে করে লজ্জায় ফেলছে আয়রাকে।ভালোই লাগছে ওর।
‘ধূর তুমিও না,আমার কথা বাদ দাও তো।তোমার কথা বলো সবকিছু ঠিক করে নিবে,ভেবেছো কিছু?’
ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়ে নৌমি।ঘুরেফিরে সেই তূর্যতে গিয়েই কথা আঁটকায়। তা ওর হোক কিংবা অন্যদের।
‘সে ফিরেছে বলেই কি সবকিছু ঠিক হবে?হয়তো নামে মাত্র সংসার থেকে মু..মুক্তি পেতে ফিরেছে’
মুক্তি শব্দটা উচ্চারণ করতে কষ্ট হচ্ছে কেন ওর?তূর্য তো চাইলেই ওকে ডিভোর্স দিতেই পারে।জোর করে রাজি করা হয়েছিলো বিয়েতে তূর্যকে।চাইলেও তো আটকানো যাবে না তাকে, তাইনা?
‘আহ-হা নৌমি আগে থেকে এসব ভাবছো কেন বলতো?দুলাভাই হয়তো সবকিছু ঠিক করতেই ফিরেছে।ভালো কিছু ভাবো তো!’
‘পারছি না ভাবতে আমি, বিশ্বাস করো পারছিনা। আমি কাউকে নি..জের অবস্থান বুঝাতে পারছিনা আয়ু।যাকগে এসব কথা ছাড়তো ভালো লাগছে না তূর্যকে নিয়ে ভাবতে, কথা বলতে।তোমার খবর বলতো এবার।কেমন চলছে প্রেমময় জীবন?’
আয়রা নৌমির কথা এড়ানো বুঝলো তবে ঘাটলো না।মেয়েটার মনে তো এমনিতেই কষ্টের শেষ নেই। লোকে বলে সুন্দর মানুষের ভাগ্যও সুন্দর হয়।তবে আয়রা বুঝলো সুন্দর-অসুন্দর কিছুই না মানুষের ভাগ্যটাই হলো আসল।নানান ধরনের কথা বলে হাসাতে লাগলো নৌমিকে।ওর একটা গুন আছে মানুষ হাসানোর এগুন সবার থাকে না,আয়রার আছে।
আয়রার সাথে কথা শেষ প্রায় সাড়ে আটটা বেজে গেলো নৌমির।নিচে নামতে ইচ্ছে হলো না এখন যদি তূর্যর মুখোমুখি হতে হয়।অবশ্য ওকে কথা শোনানোর মানুষ বলতে ওই রিমা খাতুন। সে তো অতিথি কদিনের। এছাড়া সকলেই কমবেশি ভালো বাসে ওকে।
সব চিন্তা বাদ দিয়ে পড়ায় মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলো ও।অনেক গ্যাপ পরেছে পড়াশোনায়।রাতে খাবার খাওয়ার ডাক আসলেও গেলো না নিচে।খিদে নেই বলে চালিয়ে দিয়েছে।
_____________
পড়া শেষ করতে প্রায় বারোটা বেজে গেলো।খিদে পেয়েছে এখন, পেট ক্ষুধায় চুচু করেছে।সেই কখন খেয়েছে।কিছু খাওয়ার উদ্দেশ্য ঘর ছাড়লো।পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে আছে অবশ্য সবাই তারাতাড়িই ঘুমিয়ে পরে।সিঁড়ির কাছে আসতেই চোখ গেলো তূর্যর ঘরের বন্ধ দরজার দিকে।দু’মিনিট তাকিয়ে নিচে নেমে গেলো।বাকিসব পরে হবে আগে পেট ঠান্ডা করা ফরজ। ফ্রিজ খুলেতেই ডাকা খাবারের দিকে চোখ গেলো অজান্তেই হেসে ফেলে ও।মিসেস তুলির দায়িত্বশীলতার ঝুলি মেলা ভার।তিনি জানতেন খিদে পেলে নৌমি খাবার খুঁজবে তাই আগে থেকেই সাজিয়ে রেখেছে ওর খাবার।তারাতাড়ি ওভেনে দিলো গরম করতে।
‘রান্না ঘরে কি করছো তুমি?’
নিস্তব্ধ পরিবেশে তূর্যর গম্ভীর স্বর নৌমির অন্তর কাপিয়ে দিলো।ঝাঁকি দিয়ে ওঠে ওর পুরো শরীর।পিছনে ফিরে দেখে দরজার হেলান দিয়ে তূর্য দাঁড়িয়ে আছে বুকে হাত বেঁধে ওর দিকে চেয়ে ঘুম ধরে নি ওর।বেশিরভাগ সময়ই রাতে জেগে থাকতে হয়,পেশাটাই যে এমন। তাই বাগানে হাঁটাচলা করছিলো।যখন ঘরে যাওয়ার উদ্দেশ্য আসলো তখন দেখে এক বেনীওয়ালী ফ্রিজ খুলছে।ওটা যে নৌমি তা বুঝতেই দাড়িয়ে যায়।সন্ধ্যায় এক রূপ দেখলো আর এখন অন্য রূপ।মেয়েটাকে যেনো সব রূপেই মানিয়ে যায়।
একটু মজা নেওয়া যাক, একথা ভেবে হূট করে ডেকে বসে।তবে এমন ভুতের মতো উদয় হয়ে নৌমিকে ভয় পাওয়ানোতে মেজাজ চড়ে গেলো নৌমির।দাঁত কিড়মিড়য়ে বলে,
‘রান্না ঘরে নাচতে এসেছি’
‘নাচতে এসেছে?তবে আমি যে দেখলাম ফ্রিজ খুলে খাবার চুরি করছো!’
চুরি!মানে নৌমি চোর!এতো বড় অপবাদ। রাগে নাকের ডগা লাল হয়ে এলো।ওদিকে নৌমির রাগ উপভোগ করছে তূর্য।রাগলে যে মেয়েদের সুন্দর লাগে তা আজ বুঝলো নৌমিকে দেখে।বেশ ভালোই তো লাগছে ওকে রাগিয়ে।নৌমি আঙুল উঁচিয়ে বলে,
‘আমি..আমি’
রাগে বলতে পারলো না পুরো কথা ও।তূর্য তা বুঝে হেয়ালি করে,
‘তুমি?’
‘তুমি’ বাবাহ এক সন্ধ্যাতেই আপনি থেকে তুমিতে নেমেছে ডাক!রাগের বশে এসব কিছু খেয়ালে এলো না তেমন।নৌমি এবার কিছুটা ধাতস্থ হয়ে বলে,
‘আমি চুরি করতে যাবো কেন?এতোটাও খারাপ দিন আসেনি আমার যে খাবার চুরি করতে হবে।আপনার বাড়ির খাবার খেয়েছি বলে চোর বানাবেন?লোক জড়ো করবেন এতে?’
মজাও দেখি বোঝেনা এই মেয়ে।তূর্য সোজা হয়ে দাঁড়ায় দুহাত পকেটে পুরে হেঁসে বলে,
‘যদি করি?’
‘আপনার দ্বারা অসম্ভব নয় জোর করে বিয়ে দিয়েছে বলে যে পুরুষ পাঁচ বছর বাড়ি ছেড়ে থাকতে পারে তার পক্ষে সামান্য খাবার খাওয়ায় জন্য লোক জড়ো করা অসম্ভব নয়।আচ্ছা বেশ খাবো না আমার খাবার’
বলেই খাবার তুলে রাখতে নেয় ফ্রিজে।তূর্য নৌমির কথার খোঁটা বুঝে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে। সবে তো শুরু, না জানি এই মেয়ে ওকে দিনে ক’বার বিয়ে নিয়ে খোঁটা দেয়।নৌমি ওকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে তা দেখে তূর্য তরিগরি করে বলে,
‘পালাচ্ছো?’
‘কেন পালাবো?’
‘হয়তো আমার ভয়ে!’
‘কে আপনি যে আপনাকে ভয় পেতে হবে?’
‘পা-ও না বলছো,জানো তো আমি কোন পেশায় আছি!’
‘তো?’
নৌমি ভ্রু কুঁচকে সামনাসামনি হয় তূর্যের।ও আসলে জানতে যায় কেন তূর্যকে ভয় পাবে।ভয় পাওয়ার মতো কিছু ঘটেছে?
‘যদি আমি তোমায় বেয়াদবির অপরাধে জেলে পুরে দি?তবে?’
নৌমি হাসলো তূর্যকের কথায়।মাথা উঁচু করে চোখ রাখে তূর্যর চোখে।নৌমি মোটেও ছাড়ার পাত্র নয়।
‘আমি যদি আপনার অফিসে গিয়ে কমপ্লেইন করি যে আপনি আমায় নির্যাতন করেন তবে কেমন হয়?’
তূর্য কেশে ওঠে, নৌমি একদম সঠিক জায়গায় হাত দিয়েছে।তূর্য নিজেকে সামলিয়ে বলে,
‘এতোদিনই করো না আর এখন করবে তর নিশ্চিয়তা কি?’
‘এতোদিন তো জানতামই না আমার হাসবেন্ড কে আজ জেনেছি তাই এখন করতেই পারি’
‘আমায় ভয় দেখাচ্ছো?’
কিছুটা ঝুঁকে বলে নৌমিকে।তূর্যকে নিজের এতো কাছে দেখে মাথা সড়িয়ে নেয় পিছনের দিকে ভ্রু কুঁচকে বলে,
‘উঁহু, আমি যে আপনাকে ভয় পাই না তার প্রমান দিচ্ছি’
‘পাবে পাবে ভয়ও পাবে.. ভালোও বাসবে’
শেষের কথাটা এতোটাই আস্তে বললো যে মুখ নড়েছে কিনা তাও ভালো করে বোঝা যায়নি।নৌমির ইচ্ছে হলো না আর তূর্যের সাথে তর্কে জড়াতে।এমনিতেই অনেক বলে ফেলেছে।তাই ঘুরে রান্না ঘর থেকে বের হতে নেয় তখন তূর্য আবারও ডাকে,
‘যদি তুমি খাবার না খাও তাহলে বুঝবো আমার ভয়ে খাচ্ছো না।ধরে নিবো তুমি আমায় ভয় পাও’
নৌমি কটমটিয়ে চায় তূর্যের দিকে।কোনো কথা ছাড়াই খাবার নিয়ে ডাইনিং টেবিলের বসে।এমনিতেও খিদে পেয়েছে তাছাড়া ও প্রমান করতে চায় তূর্য কেন এমন শ’খানেক তূর্যকেও নৌমি বুড়ো আঙুল দেখাতে পারে,হুহ্!
নৌমির মনের কথাটা যেন ধরে ফেললো তূর্য।চেয়ে দেখতে থাকে নৌমির খাওয়া।একমনে খেয়ে চলেছে কোনো দিকে তার নজর নেই। সামনের ছোট ছোট বাধনহারা চুলগুলো গালে আচঁড়ে পড়ে বেজায় বিরক্ত করছে নৌমিকে।তূর্য ওর দিকে চোখ রেখে ঠোঁট চেপে হেসে বলে,
‘মেয়েটা নিজেকে চালাক প্রমান করতে যেয়ে বলদ হয়ে বের হলো!’
চলবে….?
[আরেকটু লেখার ইচ্ছে ছিলো তবে কালকে রাত্রে বেশিক্ষন জেগে থাকতে গিয়ে ঘুম ভেঙেছে একটু আগে।তাই আর লেখা হয়নি, হ্যাপি রিডিং]

