#প্রিয়_নীলপদ্ম—০৫.
#মুশরাফা_মিরা
[কোনো ধরনের কপি নিষিদ্ধ]
সকাল সকাল নৌমি রান্নাঘরে এলো মিসেস তুলিকে রান্নায় সাহায্য করতে।সম্পা নেই বিধায় মিসেস তুলিকে এতবড় বাড়ির সবকাজ করতে হয়।এখন যদি নৌমিও ঘরে চুপচাপ বসে থাকে তাহলে কি তা ভালো দেখায়?রান্নাঘরে এসে দেখে তুলি সকালের নাশতা বানানোর কাজ শুরু করে দিয়েছে।
‘আম্মু বলুন আমায় কি কি করতে হবে?গতকাল থেকে একা-একা কাজ করছেন।’
নৌমির ডাকে তুলি পাশ ফিরে। ওড়না দিয়ে পুরো মাথা ঢাকা নৌমির।মুখে কোনো প্রকার প্রসাধনীর ছোঁয়া নেই।নৌমিকে দেখে তিনি একগাল হেঁসে বলে,
‘আমি তো একাই করে…’
‘হ্যা-হ্যা আপনি একাই সব করতে পারবেন তা আমি জানি তবে কেন করবেন? ঘরে বউ থাকতে আপনাকে কেন সব কাজ করতে হবে?’
নৌমির এমন কথায় শব্দ করে হেঁসে ফেলে তুলি।মেয়েটা তো এমনই এমনই এতো ভালোবাসে না।গুন আছে বলেই তো পরের মেয়েকে এতো ভালোবাসা দিচ্ছেন, কাছে টেনেছেন।
‘আচ্ছা বাবা কাজ কর।রুটি করবি তূর্যের জন্য আর বাকিদের জন্য পরোটা।’
নৌমি কাজে লেগে পরে। কথা মতো ময়দা মাখে রুটি-পরোটার জন্য।দু বউ – শাশুড়ী মিলে হেঁসে,কথা বলে কাজ করছে।
তূর্য জগিং-এ গিয়েছিলো।যেহেতু সেনাসদস্য তাই রেগুলার শরীর চর্চা অবশ্যই করনীয়।মানুষ অভ্যাসের দাস বলে একটা কথা আছে না?তাই তো বাড়ি ফিরে আরামে সুখনিদ্রায় না মজে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে চলে গেছে হাটতে। তবে জগিং শেষ করে ফিরে দেখে তার মা আর নৌমি মিলে কাজ করছে এবং হাসছে একে-অপরের কথায়।খানিকক্ষণের জন্য থমকে গেলো ও, পা দুটো অজান্তেই থেমে গেছে।কি সুন্দর লাগছে ওদের দুজনকে। হয়তো প্রতিটা পুরুষের ইচ্ছে এটাই যে মা-স্ত্রী এভাবে মিলেমিশে থাকবে।
নৌমি রুটি বেলছে যার দরুন মাথার কাপড় যে পরে গেছে তা উঠানো হয়নি।ঘামে শরীর চুপচুপে হয়ে আছে।তূর্য বেশখানিকটা সময় দাড়িয়ে চলে যায় নিজের রুমে।জগিং-স্যুট খুলে টিশার্ট,ট্রাউজার পরে নেয়।এরমধ্যে ফোন আসে স্ক্রিনে ‘মেজর স্যার’ নামটা ভেসে ওঠে।এই মানুষ তূর্যকে ভিষণ ভালোবাসে।এতোটাই ভালোবাসে যে নিজের মেয়ের সাথে ওর বিয়ে দিবেন বলে ঠিক করে। একথা মনে হতেই হেঁসে ফেলে ও।কল রিসিভ করে সালাম দিতেই মেজর জালাল উদ্দীন ভূঁইয়া অত্যন্ত গম্ভীর কন্ঠে বলে,
‘ ওয়ালাইকুম আসসালাম, ছুটি পেরেছেন বলে দায়িত্ব ভুলে গেলেন ক্যাপ্টেন তানজিম তূর্য?’
মেজরের কথায় তূর্য ভ্রুযুগল কুঁচকে ফেলে।দায়িত্ব? ও হ্যা বাসায় এসে একবারও ওদিকের খোঁজ নেওয়া হয়নি।ফোন দেওয়া হয়নি মেজরকে।তাই তো মেজর সাহেব রেগে গেছেন।এবার বুঝে আসে একথা তূর্যর।এপর্যায় ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলে ও।একহাতে কপাল চুলকে বলে,
‘আমি সত্যিই দুঃখিত স্যার।অনেক বছর পরে বাসায় আসায় ওদিকের খবর নেওয়া হয়ে ওঠে নি।পরিবারের মান ভাঙাতে ভাঙাতেই আমি শেষ!’
ফোনের ওপাশ থেকে উচ্চ স্বরে হাসার শব্দ এলো।তূর্য তা শুনে নিজেও অল্প হাসলো।মেজর সাহেব হাসি থামিয়ে বলে,
‘ইয়াংম্যান তা তো একটু কষ্ট করতেই হবে।তোমার যে অপরাধ সে তুলনায় তুমি অল্পতেই ক্ষমা পেরেছো,বুঝলে?’
বিপরীতে তূর্য নিরব থাকে।মেজর সাহেব ফের বলে,
‘যার রাগ ভাঙানো মূখ্য তার রাগ কি ভাঙাতে পেরেছো?’
‘না স্যার।ম্যাডামের রাগের যে পারদ আশেপাশে গেলেই ঝলসে যাচ্ছি। কথায় কথায় বিয়ে করার পরে চলে যাওয়ার খোঁটা দেয়।কিছু বলার সুযোগই পাচ্ছি না।’
‘লেগে থাকো!মেয়েরা খুব নরম স্বভাবের হয়। যাকে আকঁড়ে ধরতে চায় তার থেকে কষ্ট পেলে তারা এতো সহজে ভুলে না তানজিম।তুমি যা করেছো তোমার মিসেস-এর সঙ্গে তার রাগ,অভিমান এতো সহজে ভাঙার নয়।’
‘জ্বি স্যার!চেষ্টা করছি,দেখি ম্যাডাম কবে ক্ষমা করেন আমায়’
‘চেষ্টা নয় তোমাকে পারতেই হবে।মনে রেখো ছুটির একদিন কিন্তু মাইনাস হয়ে গেছে। যা করার এই কদিনের মাঝেই তোমায় করতে হবে।যুদ্ধের ময়দানে যেমন মনোবল রাখো তাকে মানানোর জন্যও ঠিক তেমন মনোবলই রাখবে,ঠিক আছে?’
‘জ্বি স্যার!’
‘আচ্ছা একটা ফাইল ই-মেইল করছি একটু চেক করে দেখো সব ঠিকঠাক আছে কিনা।’
‘ওখানে তো সাজ্জাদ আছে ওকেই তো আমি দায়িত্ব দিয়ে এসেছিলাম। ও দেখেনি?’
‘আহহায় তানজিম!সাজ্জাদ আর তুমি এক হলে নাকি?তোমার উপর যতটা বিশ্বাস আমি করি ততটা বিশ্বাস হয়তো আমার ভাইয়ের উপরও নেই’
তূর্যের বুকটা ফুলে উঠলো এমন প্রশংসায়,বিশ্বাসে।জালাল উদ্দিন ভূইঁয়া নামক মানুষটার ওর জীবনে অবদান অনস্বীকার্য।ফোনে আরো কিছু কথা বলে ই-মেইল চেক করলো।ইউনিট থেকে আনা ফাইল বের করতে গেলো আলমারি থেকে। বের করতে গিয়ে একটা ছবি উড়ে পড়লো নিচে।
ফাইলটা টেবিলের উপর রেখে হাঁটু গেড়ে নিচে বসে ছবিটা হাতে নিলো। একটা পনেরো-ষোলো বছরের মেয়ের ছবি।কেমন জানি চেনাচেনা ঠেকলো।একটু ভাবতেই মনে পরে গেলা এটা তো নৌমি!নৌমির ছবি ওর আলমারিতে কেন?তাও এতো বছর আগের, বাচ্চা নৌমির?মনে পরে গেলো কয়েকবছর আগের কথা যখন গরমের ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলো তখন হাফসা খাতুন ও তুলি ওর বিয়ের কথা তোলে।তূর্য অবাক হয়ে গেছিলো তখন।এতো তাড়াতাড়ি কিসের বিয়ে?ওর ক্যারিয়ার সবে শুরু তাছাড়া সেনাবাহিনীতে বিয়ে করার একটা নিয়ম থাকে।ওর পরিবার তো জানে তবুও, কেন?তবে সকল যুক্তি বৃথা যায় মা-দাদির কাছে।নানাভাবে ওকে ইমোশনাল ব্যাকমেইল শুরু করে।মা দিব্বি পর্যন্ত দেয়।শেষ ভরসা হিসেবে বাবার কাছে এবিষয়ে সব খুলে বলে।আশা ছিলো বাবা হয়তো তূর্যের পাশে থাকবে,বুঝবে তূর্যর অবস্থান। কেননা ওর বাবা আরিফুর রেহমান একজন পুলিশ! তিনি জানেন সেনাবাহিনীতে থাকা নিয়ম সম্পর্কে। তবে আশাহত হতে হয় তূর্যকে।তিনিও ওর মা-দাদির পক্ষ হতে বিয়ের জন্য প্রেশার দিতে থাকে।মেয়ের ছবি নিয়ে আসে তুলি কিন্তু তা ছুঁয়েও দেখেনি তূর্য অবহেলায় পড়ে ছিলো আলমারির এককোণে।
তূর্যর ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিলো একজন সেনাসদস্য হবে,দেশের জন্য কাজ করবে।বাবার মতো আদর্শে নিজেকে গড়ে তুলবে।সেই মোতাবেক নিজেকে ছোটবেলা থেকেই গড়ে তুলেছে।সেনাবাহিনী অফিসারদের যেখানে বিয়ে ২৮ বছরের আগে করার অনুমতি নেই সেখানে তূর্যর বয়স তখন বাইশ।সবে লেফটেন্যান্ট পদে মনোনীত হয়েছে।ওইসময় বিয়ে করলে চাকরি শেষ হওয়ার আশঙ্কা ছিলো!তবে পরিবারের জেদের কাছে পরাস্ত হতে হয় তূর্যকে।জোর করে বিয়ে পরিয়ে দেওয়া হয়।রাগে-দুঃখে বিবাহিত বউয়ের মুখ পর্যন্ত না দেখে বাড়ি ছাড়ে।ওর তখন বারবার মনে হচ্ছিল ওর পরিবারের কাছে বিয়েটাই মেইন তূর্যর থেকে। বিয়ে করে বউ এনে দিয়েছে এখন তূর্য থাকুক বা না থাকুক ওটা বিষয় নয়।সেই যে রাগ করে বাড়ি ছেড়েছে এরপর গতকাল ফিরলো!সব রাগ, অভিমান এবং নিজের করা ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে।রাগ করে বাড়ি ছাড়ার পরে যখন মাথা ঠান্ডা হলো তখন বুঝলো যে মেয়েটাকে বিয়ে করেছে সেই মেয়েটার তো কোনো দোষ ছিলো। ওর আর ওর পরিবারের যাঁতাকলে পৃষ্ঠ হয়েছে অকারণেই।তবে তবুও কেন জানি রাগ কমিয়ে নিজের খোলস থেকে বের হয়ে খোঁজ নিতে পারেনি বিবাহিত স্ত্রীর।ভাগ্যিস মেজর সাহেব ওকে বিয়ে নিয়ে ভাবতে বলেছিলো না হলে হয়তো এবছরও বাড়ি ফিরতো না।ওমন চুনাপুঁটির মুখদর্শন করা হতো না।
_____
রুটি ভাজা হয়ে গেছে নৌমির এখন শুধু পরোটা বানানো বাকি।আজকের বোধহয় গরমটা একটু বেশিই পড়েছে। বাহিরে রোদ না উঠলেও গরম লাগছে প্রচুর।সকলের ওঠার সময় হয়ে গেছে। তাই ভাবলো চা চুলোয় দেওয়া যাক।
‘আম্মু চায়ের পানি বসাই?সবাই একটু পরেই আসবে ড্রয়িং রুমে’
তুলি চুলায় মাংস নাড়তে নাড়তে ক্লান্ত কন্ঠে বলে,
‘হ্যা বসা,সবার জন্য চায়ের পানি দিলেও তূর্যের জন্য কফি বানাস তো মা।ছেলেটা চা একটুও খেতে পারে না’
নৌমি মুখে কিছু না বললেও মনে মনে ভেঙচি কাটে তূর্যকে।
‘এহহ আসছে লাটসাহেব! নবাবজাদা চা খায় না, হাহ’
‘আজকে বাড়িতে অনেক মেহমান আসবে, জানিস?’
‘কেন?…ওওও বুঝেছি’
নৌমি শুরুতে বুঝতে পারে না মেহমান আসার কারণ পরে বুঝে আসে তূর্যর জন্য আজকে বাড়িতে মানুষের মেলা বসবে।আদরের দুলাল বলে কথা পারে তো সবাই লাফিয়ে লাফিয়ে চলে আসে।ওর ভাবনার মাঝে কলিং বেল ভেজে ওঠে এতো সকালে আবার কে এলো?নৌমি তারাতাড়ি গিয়ে দরজা খুলতেই অবাক!চোখমুখে বিস্ময় রেখে অস্ফুটস্বরে বলে,
‘বাবা!’
আরিফুর রেহমান চমৎকার হাসলেন। ভিতরে প্রবেশ করে নৌমির মাথায় হাত রেখে বলে,
‘সারপ্রাইজ আম্মা!’
‘কিরে নৌমি কে এলো তো….ওমা তুমিই!কিছু না বলে এভাবে হূট করে!’
তুলি রান্না ঘরে বসে নৌমিকে জিজ্ঞেস করতে করতে বের হয় কে এলো। তবে বাহিরে এসে আরিফুর রেহমানকে দেখে চোখমুখে বিস্ময় ফুটে ওঠে। কদিন ধরে আরিফুর রেহমানকে ফোনে পাওয়া যায়নি।তবে এসব স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছে বাড়ির সবাই প্রোফেশনাল কাজে এমন ঘটনা বহুবার ঘটেছে। তবে কাউকে কিছু না বলে বাড়িতে ফেরাটা নতুন।
গিন্নীর মুখে বিস্মিতভাব দেখে হাসে আরিফুর রেহমান। হুটহাট এভাবে বাড়ির লোককে চমকে দেওয়ার মজাটা আজকে বুঝতে পারলো।ঠিক করে নিলো মাঝেমধ্যেই এরপর থেকে এমনটাই করবেন।হেঁসে হেঁসে বলে,
‘বহুদিন দেখা হয়নি তোমাদের।ওদিকের কাজ শেষ হয়েছে তাই ভাবলাম ঘুরে আসি কিছুদিন পরিবারের কাছ থেকে।আর…আর একটা কাজের জন্য ফেরা বিশেষ করে’
নৌমি,তুলি দুজনেই প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে চায় আরিফুর রেহমানের দিকে বিশেষ কাজ!কি তা?তুলি কৌতুহল দমাতে না পেরে প্রশ্নটি করেই ফেলে,
‘কি এমন জরুরি কাজ?’
আরিফুর রেহমান নৌমির দিকে চোখ রেখে গম্ভীর কন্ঠে বলে,
‘নৌমি আম্মা আর আমার গুনধর পুত্রের নামে মাত্র বিয়েটার শেষ করতে।’
চলবে….?
[অন্য পেইজেও গল্প আপলোড দেওয়া হয়েছে এটা সমস্যা নয় তবে আমি গল্পের অংশ লেখার আগে কেন লিখতে হবে?আমি যে পর্ব আপলোড করি নাই তা যদি আগে থেকে লেখা দেখি কেমনটা লাগতে পারে বলো?তোমরাই বলো?আমার গল্পের পাঠক যারা আছো তাদেরকে বলছি ভালো করে দেখে পড়িও পাখি।না হলে জিটিপি দিয়ে লেখা পর্ব পড়ে মেজাজ গরম হবে,হ্যাপি রিডিং]

