#প্রিয়_নীলপদ্ম —০৬.
#মুশরাফা_মিরা
[কোনো প্রকার কপি নিষিদ্ধ ]
‘মা..মানে!’
নৌমির শরীরটা হূট করেই কেঁপে ওঠে। সম্পর্ক শেষ মানে?ডিভোর্স!এতো বছরের অপেক্ষার ফল হিসেবে ডিভোর্স হবে?ও কি করে সইবে এটা?আরিফুর রেহমান নৌমির কালো হয়ে যাওয়া মুখটা ভালো করে দেখে নেয়।এরপর দীর্ষনিশ্বাস ছেড়ে বলে,
‘আম্মা অনেক তো হলো আর কত একা এই সম্পর্কে ভার টানবে?আর কত মানুষের কথা শুনবে আমার পুত্রের জন্য?বিশ্বাস করো আমি এই অপরাধের জন্য ভালো নেই আম্মা। বুকের মাঝে ব্যাথা হয় তোমার জীবনটা নষ্ট করার জন্য।কেন যে তানের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ের জন্য প্রেশার দিলাম! তোমার জীবনটা নষ্ট হয়েছে আমার,আমাদের জন্য। তাই তোমার জীবনটা গুছিয়ে দেওয়াও আমার দায়িত্ব আম্মা!’
‘তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে তূর্যের বাবা?কি বলছো?নৌমি এ বাড়ির বউ আর আজীবন এ বাড়ির বউ হয়েই থাকবে।’
‘এ বাড়ির বউ হয়ে থাকবে কিসের ভালো ভালো ভিত্তিতে তোমার ছেলের কোনো খবর আছে?যার উপর ভরসা রেখে মেয়েরা শ্বশুর বাড়ি আসে সেই মানুষটাই যদি না থাকে তাহলে সেই বউ হয়ে থাকার কি মানে?’
‘ দাদুভাই বাড়ি ফিরেছে আরিফ।এবার সব ঠিক হয়ে যাবে।তুই এমন অলক্ষুণে কথা বলিস না বাপ’
হাফসা খাতুনের কথায় আরিফুর রেহমান হাসলেন।মোটেও অবাক হলেন না ছেলে বাড়ি ফিরেছে এতে।তূর্য বাড়ি ফেরাতে তার যে কিছু আসে যায় না তা প্রমান পেলো তার এই হাসিতেই।নৌমি কিছু বলা কিংবা দাঁড়ানোর শক্তি খুয়িয়ে ফেলেছে। কানে বাজছে ওর ডিভোর্স হবে এই বাড়িতে আর থাকতে পারবে না ও।সংসার করা হবে না তূর্যের সাথে।পাশে থাকা সোফার হাতলে ঠেস দিয়ে দাড়ালো।রিমা খাতুন বেজায় খুশি হলেন আরিফুর রেহমানের কথায়।এমনিতেই নৌমিকে তার পছন্দ হয়নি।কত ইচ্ছে ছিলো নিজের কোনো এক নাতির সাথে তূর্যের হাত বাঁধবে।কিন্তু এই নৌমি?মাঝখানে ঢুকে সকল পরিকল্পনায় পানি ঠেলে দিলো।এখন যদি ডিভোর্স হয় তাহলে তো…ভেবে খুশি হওয়ার পরিমাণ আরো বেড়ে গেলো।আরিফুর রেহমানের কথায় সায় দিয়ে বলে,
‘ঠিক বলেছো আরিফ।এমন নামে মাত্র সংসার রাখার থেকে না রাখাই ভালো।তূর্য দাদুভাইয়ের চলনবলন দেখে মনে হচ্ছে এই বিয়ে নিয়ে তার কোনো পরিকল্পনা নেই।অনেক তো হলো মেয়েটার ও তো একটা গতি হওয়া দরকার। তাই তুমি ভেঙে ফেলো বিয়েটা।শেষ হোক এসব! লোকে হাসে এই বিয়ে নিয়ে।তুমি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছো বাবা!’
হাফসা খাতুনের মাথায় রাগ উঠে গেলো বোনের এমন তেলবাজিতে।একে তো ঝামেলার শেষ নেই তারমধ্যে আবার ফোড়ন কাটা,উফ!এতো অসহ্যকর কেন তার বড়বোনটা?নৌমি মনেমনে হাসলো শুধু। যে মানুষটা পাঁচবছরে একবারও দুটো ভালো করে কথা পর্যন্ত বললো না তিনি হুট করে ওর ভবিষ্যতের কথা ভাবছে!হাস্যকর নয়কি?
‘কি বলছো এসব বড়দিদা?ভেঙে ফেলবে কার বিয়ে?বাবা তুমি হঠাৎ কিছু না বলে?— কি হচ্ছে এখানে?’
চোখমুখে কৌতূহল নিয়ে ড্রয়িং রুমে পা রাখে তাসফি আর মেহেরবা।তাসফির কথার পিঠে মিসেস তুলি স্বামীর সম্পর্কে অভিযোগ তোলে,
‘তোমার গুনধর বাপ ফিরেছে তোমার ভাই-ভাবীর ডিভোর্স করাতে’
‘কিহ!’
‘কি বলছো মামা এসব? ডিভোর্স মানে!’
তাসফি মেহেরবা দুজনেই অবিশ্বাস্য নয়নে চেয়ে আছে আরিফুর রেহমানের দিকে।সকাল সকাল এমন কথা শুনে কারোই অবাক হওয়ার রেশ কাটছে না।আরিফুর রেহমান কয়েক মিনিটের মাঝেই শান্ত নিরিবিলি ‘কালকন্ঠ’ বাড়ির ড্রয়িং রুমটা অশান্ত করে ফেলেছে।আরিফুর রেহমান নড়েচড়ে বসে সোফায়। সবার মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে বলে,
‘ঠিকই শুনেছো সবাই আমি চাচ্ছি এই নামে মাত্র সম্পর্কটা ভেঙ্গে ফেলতে।কি হচ্ছে অযথা এভাবে সম্পর্কটা রেখে?তূর্যর তো কোনো ভূমিকাই নেই এ বিয়েতে।নৌমি মেয়েটা শুধু একা কেন এ বিয়ের ভাড় বহন করবে?আর কত অন্যের কটুকথা শুনবে দোষ ছাড়াই?ওর কি অপরাধ?বিয়েটা তো আমাদের জোড় করার কারনেই হয়েছিলো দোষ তো আমাদের অথচ নৌমি মেয়েটাকে কটুকথা শুনতে হয়।আর তোমারা কি যেনো বললে?তূর্য বাড়ি ফিরেছে এখন সব ঠিক হয়ে যাবে? ভুল! তোমারা ভুলের মাঝে আছো।যদি সব ঠিক করতেই ফেরাত হতো তাহলে সে অনেক আগেই আসতো।আসতে না পারলে ফোন করতো,খবর নিতো।কিন্তু করেছে এসব? করেনি।একবারও ক্ষমা চেয়েছে নৌমির কাছে?কথা বলেছে তোমার সাথে নৌমি আম্মু?’
নৌমি দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে মাথা নাড়িয়ে না বুঝায়।আরিফুর রেহমানের একটা কথাও তো মিথ্যা নয়।তূর্য ফিরেছে বলেই যে সব ঠিকঠাক হবে এগুলো ভাবাটাও এখন বোকামি ঠেকছে নৌমির কাছে।সব ঠিক করার হলে আগেই তো হতো। পুরোনো ঘা এবার নতুন করে সতেজ হচ্ছে শুধু!আরিফুর রেহমান ফের বলে,
‘তাহলে কিসের ভিত্তিতে বলছো সব ঠিক হবে?নিজেদের ভালোবাসার জালে এই মেয়েটাকে আর ক’দিন আঁটকে রাখবে তোমরা?যেখানে মেয়েটা এসেছে ওর স্বামীর ভরসায়?আর কতো অন্যায় করবে মেয়েটার সাথে তোমারা?কত?’
তুলি,হাফসা, তাসফি, মেহেরবা কারোই মুখ থেকে কথা বের হয় না। হবেই বা কিভাবে?আরিফুর রেহমান কথা বলার সুযোগটুকুই যে রাখে নি। উঠে নৌমিকে কাছে গিয়ে দাড়ালেন আরিফ। মাথায় হাত রেখে বলে,
‘অনেক অন্যায় করেছি আম্মু। এবার একটু ভালো কাজ করি না হয়। তোমার কি মতামত এবিষয়ে? তুমি যা বলবে তাই হবে এবার।আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলবে যা বলার,তাকাও!’
নৌমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলো। চোখে ওর পানি কিন্তু তা ও কাউকে দেখাতে চায়না।চোখের পানি কাউকে দেখাতে হয়না তাহলে মানুষ তাকে দূর্বল ভাবে।নৌমি বড়দের কথার অবাধ্য নয় বিধায় কোনোমতে নিজেকে সামলিয়ে চোখ রাখে আরিফুর রেহমানের চোখে।কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে কি যেনো বুঝে জোর গলায় বলে,
‘আমি আপনার সিদ্ধান্তে রাজি বাবা’
‘হোয়াট!’
তূর্য প্রায় চিৎকার করে উঠলো নৌমির কথায়।বাকিরাও অবাক হয় সবার আশা ছিলো হয়তো নৌমি আরিফুর রেহমানের কথায় বিপরীতে অমত পোষণ করবে।কিন্তু সে-ও আরিফুর রেহমানের কথা মেনে নিলো।এমন পরিস্থিতিতে তূর্যর চিৎকার অন্যদের গলার স্বর হয়ে বের হলো।তূর্যর ভরাট কন্ঠের চিৎকারে সকলের চোখ গিয়ে পরে দোতলার সিঁড়িতে।তূর্য সবকিছু মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো তবে নৌমির কথায় নিজেকে আর আঁটকে রাখতে পারেনি।স্থান ভুলে চিৎকার দিয়ে ওঠে।নৌমি একপলক তাকিয়ে দেখে তূর্যকে।তূর্যর চোখমুখে অবিশ্বাস্যের ঢেউ। তা-কি নৌমির মুখে ডিভোর্সের কথাটা শুনে? কিন্তু তা তো হওয়ার কথা নয়।হয়তো নিজের দিক থেকে ডিভোর্স দেওয়ার কথা তোলার আগে নৌমির দিক থেকে তোলায় অবাক হয়েছে। হ্যা,তাই হবে হয়তো!নৌমি বেশিকিছু ভাবলো না আর।ভাবতে ইচ্ছে করে না এখন আর।আরিফুর রেহমানের একটা কথাও ভুল মনে হয়নি ওর কাছে।এরপর যা হবে দেখা যাবে।
তূর্য চোখমুখে বিস্ময় রেখে ড্রয়িং রুমে আসে।নিজের বাবার সামনে দাঁড়ায় মুখোমুখি হয়ে। সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করে কেমন আছো। দুই বাবা – ছেলের দেখা পাঁচ বছর পরে।এরমাঝে কথা পর্যন্ত হয়নি।তূর্য চেষ্টা করেও বাবার সাথে কথা বলতে পারেনি। সেই সুযোগটুকু রাখেনি আরিফুর রেহমান।এতোটাই প্রখঢ় অভিমান তার। ছেলেকে এতোবছর পরে দেখেও তেমন প্রতিক্রিয়া দেখালেন না আরিফ।চোখমুখ শান্ত রেখে গম্ভীর কন্ঠে শুধু বলে,
‘ভালো!’
বাবার গাম্ভীর্যের ভরা কন্ঠে তূর্য বুঝলো বউয়ের পাশাপাশি বাবার রাগ ভাঙাতে বেশ কষ্ট হবে ওর।নিজ থেকেই বলে,
‘বিয়ে দিলেও তোমরা ডিভোর্সের কথাটাও তুললে তোমারা।এখন তো আমার কোনো ভুমিকাই দেখছি না।আমি কি এতোটাই মূলহীন বাবা?’
‘তোমাকে সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েই বিয়েটা করিয়েছিলাম।অনেক সপ্ন নিয়েই বিয়েটা করানো হয়েছিলো তোমায়।তবে সেই ইচ্ছের মূল্যটা তুমি কই রাখলে বাপ?বিয়ের আসরেই বউ ফেলে পালালে। হ্যা!ওটাকে পালানোই বলে বউয়ের মুখ না দেখে কারো সঙ্গে কোনো রকম কথা না বলে একা একাই চলে গেলে ইউনিটে।সমাজের বিষবাক্যের মুখে ছেড়ে গেলে তোমার সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে, বাবা-মাকে।তাই বিয়ে যেহেতু আমরাই দিয়েছিলাম তাই আমরাই ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।এতে তো তোমারই ভালো,তাই না?’
খোঁচানোর স্বভাব আরিফুর রেহমানের আগে থেকেই ছিলো।ঠান্ডা মাথায় বাঁশ দেওয়াটার কৌশল আরিফ বেশ ভালো করেই রপ্ত করেছে। সেখান থেকে হয়তো নৌমিও শিখেছে। তাই তো কথার মাথায় মাথায় একটা খোচামূলক বাক্য থাকবেই!সবার মাঝে টানটান উত্তেজনা। সবার আগ্রহ এবার বাবা-ছেলের কথপোকথনে।
‘আমি মানছি আমি ভুল করেছি কিন্তু…’
‘তোমার মানা কিংবা না মানায় কিছু আশে যায় না বাপ।যা করেছো তার মূল্য তুমি একযুগেও পরিশোধ করতে পারবে না।’
‘হয়তো পারবোনা তবে আমি চেষ্টা করতে চাই।এভাবে সমাধান হবে না আমারা এনিয়ে বসে কথা বলি?’
‘বসার সময় পেরিয়ে গেছে বহু আগে। এখন যা কথা হবে সব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আর কি বললে তুমি ভুল করেছো এখন তা মানার চেষ্টা করছো?হাহ্, করতে থাকো তবে পুরোপুরি বুঝতে তখন পারবে নিজের করা ভুল যখন নৌমি আম্মুর বিয়ে আমি অন্যকোথাও দিবো তার আগে নয়’
লে হালুয়া, বিয়ে-ডিভোর্স-বিয়ে এতো দেখি খাদ্য শৃঙ্খল!ডিভোর্স হবে কি-না তার ঠিক নেই অথচ আরিফুর রেহমান নৌমির বিয়ের কথা পর্যন্ত ভেবে ফেলেছে। সবাই আজ একের পর এক অবাক হতেই আছে।
নৌমির নিজেকে হাতের পুতুল মনে হচ্ছে সবাই ওকে সুতো ধরে নাচাচ্ছে। কিন্তু ও-যে এগুলোতে ক্লান্ত! শেষ দেখতে চায় এর,একটু শান্তি চায়।
‘কি বলছো তুমি বাবা নৌমির বিয়ে মানে? আমি ওর হাসবেন্ড!’
‘তোহ? আজ আছো কাল যে থাকবে এমন কোনো কথা তো নেই।’
তূর্যর শ্বাস বের গেলো আরিফুর রেহমানের কথায়।সোজা গিয়ে দাঁড়ায় নৌমির সামনে। বাবাকে না বোঝাতে পারুক বউই ভরসা।হাফসা খাতুন কিছু বলতে চাচ্ছিলেন তবে বাবা-ছেলের মাঝে আর বললো না।সবাই নিরব ভূমিকা পালন করছে এখন,কারো মুখে রা নেই।
‘নৌমি?’
‘আপনার সামনেই তো দাঁড়িয়ে আছি’
সোজাসাপ্টা জবাবে তূর্য দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ে। মেয়েটা এতো ঘাড়ত্যাড়ামি করে কেন ওর সাথে?একটা কথাও কি ভালো করে বলা যায় না?তবুও নিজেকে শান্ত রেখে ঠান্ডা গলায় বলে,
‘তুমি কি ডিভোর্স চাও নৌমি?’
কথা গলায় আটকে গেলো নৌমির।এভাবে হূট করে তূর্যর এমন কথার বিপরীতে ওর কি বলা উচিত?ও সত্যিই কি চায়?নিজেই নিজেকে বুঝতে পারলো না আজ-ও।
‘আমি এনিয়ে এখন কথা বলতে চাই না।বড়দের সিদ্ধান্ত যা হবে তাই মেনে নিবো।আর.. আর আমি একটু একা থাকতে চাই’
কোনো মতে কথাটা বলে ওখান থেকে সরে আসতে চেয়ে তূর্যর পাশ থেকে যাওয়ার সময় কানে আসে তূর্যর ঠান্ডা হুমকি,
‘যদি ডিভোর্স দেওয়ার কথা ভেবেছো নৌমি তাহলে এক চড়ে বৃন্দাবন দেখিয়ে আনবো’
নৌমি বিস্মিত হয়ে যায় তূর্যর হুমকিতে।এ কেমন স্বামী যে কথা নেই ভালো করে দুটো।এর মাঝেই চড় মারতে চায়!হাসি পায় তূর্যর হুমকিতে।তূর্যর হুমকিতে মোটেও ভয় পেলো না ও।দাঁতে দাঁত চেপে ধরে বলে,
‘যদি দ্বিতীয় বার আমায় অযথা মারার কথা মাথাতেও আনেন তাহলে আমি আপনার চাকরির পাঠ চুকিয়ে আপনাকে হিমালয় পাঠাবো’
চলবে….?
[বেশ ক’দিন বাদে লিখলাম। তাই কোথাও ভুল হলে ধরিয়ে দিও পাখি,হ্যাপি রিডিং]

