প্রিয়_নীলপদ্ম —০৭. #মুশরাফা_মিরা

0
46

#প্রিয়_নীলপদ্ম —০৭.
#মুশরাফা_মিরা
[কোনো প্রকার কপি করা নিষিদ্ধ]

তূর্য নৌমির পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় হতভম্ব, বাকহারা হয়ে পরে। বুঝে আসে না নৌমি মেয়েটা সবার সামনে এতো ভদ্র অথচ ওর সামনে?ধানিলঙ্কা!মুখ খুললেই শুধু বোমা বের হয়।তূর্যর ওই হতভম্ব চেহারা দেখে নৌমির ভিষণ হাসি পেলো তবে হাসে না।পাশ কাটিয়ে সোজা চলে যায় রান্নাঘরে।

আজকে কত মানুষ আসবে এভাবে ডিভোর্সের চক্করে দিন কাটালে হবে?রান্নাবান্নারও তো আয়োজন করতে হবে ওকে।তূর্য কিছু বলার সুযোগ পায় না আর শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে যায় ঝাঁঝওয়ালা তার চুনাপুঁটি বউকে।

আরিফুর রেহমান বেশ গভীর চোখে পর্যবেক্ষন করলেন নিজ পুত্রকে।তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করে কিছু একটা বুঝে নেয়।মিটিমিটি হেঁসে একা একা বিরবির করে,

‘বাগে এসেছো তাহলে বাছাধন, তবে এতো তারাতাড়ি তো আমি ছাড়ছি না।’

‘এই..এই যে ঝামেলার মেশিন তোমাকে একগাদা সমস্যা নিয়ে আসতে বলেছে কে হ্যা?ছেলেটা এতোদিন পরে বাড়ি ফিরলো কই বসে দুটো বুঝের কথা বলবে,নৌমিকে মেনে নিতে বলবে তা-না উনি এসেছেন অশান্তি করতে।আর কত?আর কত সহ্য করবো বলো তো?এবার সবাই একটু শান্তি দাও আমায়!’

মিসেস তুলির ঝাঁঝালো স্বরে বলা কথাগুলোতে আরিফুর রেহমানের মুখের হাসি সরে যায়।চোখমুখ যথেষ্ট গম্ভীর করে বলে,

‘তোমার পুত্রকে বিকালে একটা ফিডার কিনে এনে দিবো।সে-তো কচি খোকা কিচ্ছুটি বোঝে না তাই না?’

‘বাবা!’

তূর্যের হতাশায় ভরা কন্ঠস্বরে বেজায় বিরক্ত হলো আরিফুর রেহমান।চোখ তুলে সরাসরি চাইলেন ছেলের দিকে,

‘ভুল বলেছি আমি?তুমি না বলতে — ‘আমার আদর্শ আমার বাবা’ কিন্তু আমার তো এমন কোনো রেকর্ড নেই যে বউকে বিয়ের আসরে ফেলে এসেছি।বরং বিয়ে করার পর থেকে তোমার মায়ের হাতটা বগলদাবা করে হেঁটেছি।ছোট বেলা থেকে তো দেখেছো কিভাবে তোমার মায়ের যত্ন করেছি আমি। কিন্তু তুমি কি করলে?আমার ছেলে হয়ে এমন একটা বাজে কাজ করলে কিভাবে তূর্য?মানলাম বাধ্য করেছি তোমায় বিয়ে করতে তাই বলে ভরা আসরে আমায়,আমাদের এভাবে অপমানের মুখে ফেলবে?এতো রাগ,জেদ তোমার?বাড়ি ছাড়লে একটা বার-ও নিজ থেকে ফোন নিয়ে খবর নিয়েছো?আরে যাইহোক জোর করে বিয়ে দি আর যাই করি তবে মেয়েটা তো তোমার স্ত্রী তখন! একটা বার-ও খোঁজ নিয়েছো ওর?বাড়ির মানুষের সাথে পর্যন্ত যোগাযোগ রাখো নি একবছর। তোমার মা তোমার জন্য কত কেঁদেছে অসুস্থ হয়েছে তোমার কোনো খোঁজ না পেয়ে। কই একটা বার-ও তো ফোন দিয়ে জানতে চাও নি তার খবর।তুমি জানতে না তোমার মা কতোটা দুশ্চিন্তা করে তোমায় নিয়ে?আব্বা মারা গেলেন যখন তখন না হয় তোমার মিশন ছিলো কিন্তু পরে? আসা যেত না তূর্য?এই তূর্যকে আমি তো গড়িনি!তুমি চলে যাওয়ার এক বছর পরে তোমার সাথে যোগাযোগ করতে পেরেছে ওরা।এসব কি ভোলা এতো সোজা তূর্য?তোমার মা,দাদি নরম মনের মানুষ তারা এসব ভুলতে পারলেও আমি পারিনি,চাইলেও পারিনা।আর না ওই নৌমি মেয়েটা পেরেছে। ধুঁকে ধুঁকে কেঁদে মরেছে ও।এখনও প্রতিনিয়ত কাঁদে।ওর বাবা-দাদির সাথে কথা বলে না তেমন।সবকিছুর পিছনে দায়ী কে তূর্য?কে দায়ী?প্রশ্ন করো নিজেকে উত্তর পাবে।’

ড্রয়িং রুমে জুড়ে নিরবতা ছেয়ে গেলো।আরিফুর রেহমান আর দাঁড়ালেন না ওখানে চলে গেলেন নিজ রুমে।পিছনে ছুটলো মিসেস তুলি, যাই হোক না কেন কর্তা এতমাস পরে বাড়ি ফিরেছে বউয়ের দায়িত্ব পালন তো করা আবশ্যক!তাসফি আর মেহেরবা এগিয়ে এলো তূর্যর দিকে।দুজনে দুদিক থেকে ঝাপটে ধরে বলে,

‘সব ঠিক হয়ে যাবে তান’দা মন খারাপ করো না’

তূর্য বিপরীতে কিছু বলে না। ও এতোটা খারাপ হতে পারলো কিভাবে?ক্যাপ্টেন তানজিম তূর্য যাকে কি-না অনেকে আদর্শ মানে সেই ও-ই কিনা এতোটা বাজে কাজ করে ফেললো রাগের বশে?কোন মুখে দাঁড়াবে বাবার সামনে নৌমির সামনে?নিজের করা অন্যায়ের ক্ষমা পাবে কিভাবে ও?কিভাবে?

হাফসা খাতুন সোফায় হিসাব মিলাতে বসলেন এই সম্পর্কের শেষটা কেমন হবে?সব ঠিক হয়ে যাবে তো?রিমা খাতুন মুখ বাকায় এসব দেখে এগুলো তার কাছে নিতান্তই নাটক বলে মনে হচ্ছে। হবে নাই বা কেন?মানুষটা যে ভালো না,স্বার্থবাজ!

_______

বেলা গড়াতেই কালকন্ঠ বাড়িটা মানুষে ভড়ে উঠলো।তূর্যর ফুপি, কাজিনসহ আরো আত্মীয়ে ভরে গেলো পুরো ড্রয়িং রুমটা।মিসেস তুলি আর নৌমি মিলে সকলের জন্য স্ন্যাক্স বানালেন কিছু।মাথায় ঘোমটা টেনে এক ট্রে ভর্তি স্ন্যাক্স নিয়ে হাজির হয় সবার সামনে নৌমি।ওকে দেখে তূর্যের একমাত্র ফুপি রুখসানা আমিন হেঁসে টেনে বসালো নিজের পাশে।

‘কিরে মা ভুলেই গেছো আমাদের? একবারও তো আমার বাড়ি যাস না।মনে পরে না এই ফুপিমার কথা?’

‘না না ফুপিমা এভাবে বলবেন না।মনে তো পড়ে তবে যাওয়ার সময় কই বলুন?এই ভার্সিটি-টু-বাড়ি করতে করতেই দিন যায়।কোথাও যাওয়ার সময় হয়না।এমনকি বাবার বাড়িও যাওয়া হয়না।সব ঝামেলা শেষ হোক তারপর যাবো আপনার কাছে অনেক দিনের জন্য’

রুখসানা আমিন মেনে নিলেন নৌমির কথা।এই মেয়েটাকে তার এতো পছন্দ যা বলার মতো না।এমন ফুটফুটে একটা মেয়েরই তো আশা ছিলো তার তবে আল্লাহ ঘরে একজন রাজপুত্র পাঠালেন।তাসফি আর নৌমিকেই নিজের মেয়ে বানিয়ে ফেলেছেন তিনি।
রিমা খাতুনের বড় মেয়ে হুজাইফা রহমান এসেছে তূর্য আসার খবর শুনে। তিনি আবার তার মায়ের মতোই নৌমিকে পছন্দ করে না।এবাড়ির সবার নৌমিকে নিয়ে এতো আদিখ্যেতা তার পছন্দ নয়।

‘তা আর কতদিন এভাবে এখানে থাকবে বউমা?ছেলে তো তোমাকে মানে না। তবুও কিসের আশায় আছো এখানে?’

শুরু হয়ে গেলো বাজে বকা।মা-মেয়ে দুজনেই সেইম মনমানসিকতার মানুষ। নৌমিকে কথা শোনানোর একটা সুযোগও ছাড়ে না।রুখসানাসহ অনেকই বেশ বিরক্তি নিয়ে তাকালো তার দিকে। মেহেরবা মায়ের কথায় চট করে বলে ফেললো,

‘আম্মু এটা তান’দা আর ভাবির পারসোনাল ম্যাটার এবিষয়ে কথা না বললেই হয় তোমাদের।’

‘দিনদিন বেয়াদব হচ্ছো মেহু।মায়ের মুখে মুখে কথা বলার সাহস হয়েছে তোমার দেখছি!’

বেশ রুক্ষ কন্ঠে মেয়ের উদ্দেশ্য কথা ছোড়ে হুজাইফা।মেহেরবাও উত্তর দিতে চাইলো আবারও তবে ওকে মাঝপথে থামিয়ে দেয় আরিফুর রেহমান সোফায় বসতে বসতে,

‘আহা মেহুমা মায়ের সাথে এভাবে কেউ কথা বলে?জানো তো তোমার আম্মুর খোঁচানো স্বভাব আছে তাই বলে এভাবে সত্যি কথা বলবে,মা?’

মিটিমিটি হাসি ছড়িয়ে গেলো সবার মাঝে। আরিফুর রেহমান মানুষটা এমন কেন? কাউকে সত্য কথা বলতে ছাড়ে না।হুজাইফা নিজের হয়ে কিছু বলবে তবে তাঁকে ইশারায় চুপ থাকতে বলে রিমা খাতুন।কথায় কথা বাড়ে তাছাড়া আরিফুর রেহমানের কথার প্যাচ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না হুজাউফার নিকট।তাই কথা না বলাই ভালো বলে মনে করে রিমা।মায়ের ইশারায় মুখে কুলুপ আটেঁ হুজাইফা।
রুখসানা আমিনের ছেলে সামিদ নিজ আসন ছেড়ে গিয়ে বসে আরিফুর রেহমানের পাশে।কাঁধ জড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,

‘গুরুউ কত দিন পরে দেখা আমাদের। কেমন আছো বলো?’

‘ভালো আছি শিষ্য! তুই কেমন আছিস?কেমন কাটে দিনকাল? লাইন সেটআপ?’

সামিদের পিঠ চাপের হাসিমুখে কথাগুলো বলে আরিফুর রেহমান। সামিদ মাথা নাড়িয়ে হেঁসে হেঁসে বলে,

‘বিন্দাস কাটছে দিনকাল। যে দোয়া দিয়েছিলে সেটআপ না হয়ে উপায় আছে গুরুউ?!’

গা দুলিয়ে শব্দ করে হেঁসে ওঠে আরিফুর রেহমান। বাকিরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলো।মামা-ভাগ্নের সম্পর্কটা বেশ জমজমাট এদের। বলা চলে বয়সকে ছাপিয়ে বন্ধু দু’জন দু’জনার।

ড্রয়িং রুমে এসে তূর্য এসব দেখে মন খারাপ করে ফেললো।ওর সাথে তো ওর বাবার বন্ডিংটা বেশ সুন্দর ছিলো।কতবছর হলো বাবার সাথে আড্ডা দেওয়া হয়নি,কথাটাও পর্যন্ত বলেনি ওর সাথে।সব নিজ হাতে শেষ করে ফেললো সবটা।

সবকথার মাঝে নৌমি-তূর্যের বিয়ে নিয়ে কথাটা চাপা পরলো। এতে নৌমি হাফ ছেড়ে বাঁচে।এখান থেকে কেটে পরতে পারলেই বাঁচে ও।সবাই যখন কথা বলতে ব্যস্ত তখন নৌমি সরে গেলো ওখান থেকে। গোসলের অজুহাতে চলে এলো নিজ রুমে।

তূর্য দেখলো তা।ডিভোর্স নিয়ে কথা বলতে হবে নৌমির সাথে এভাবে তো আর যা ইচ্ছে তাই করা যায় না তাই-না? বিহিত দরকার এর,তাই নিজেও উঠে চলে গেলো নৌমির পিছনে।
______

নৌমি রুমে ঢুকে মাথা থেকে ওড়না সরিয়ে ফ্যানের নিচে বসে চোখ বন্ধ করে।এতো গরম! সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রায় ও।রান্না ঘরে চুলার আগুনে গাল দুটো লাল পাকা টমেটো হয়ে গেছে।

দরজা চাপানো ছিলো তাই তূর্য কথা ছাড়াই নৌমির রুমে ঢোকে।নক করলে নিশ্চয়ই ঢুকতে বাঁধা দিবে নৌমি,যা মেয়ে!রুমে ঢুকে ক্লান্ত সুন্দরী বউটাকে দেখে আবারও মুগ্ধ হলো।মেয়েটা আর কতরূপে ধরা দিবে ওর সামনে?দরজা লাগানোর শব্দে নৌমি চোখ খোলে। সামনে তূর্যকে দেখে বিস্মিত হয়ে পরে।ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারে নি তূর্য ওর রুমে আসবে।তা-ও নিজ থেকে!

‘আপনি… আপনি এখানে কেন?’

‘কয়েকবছর হলো দেখে নেই তাই তোমার খবর নিতে এসেছি বউউউ’

চলবে….?

[নৌমি-তূর্যের মিল নিয়ে উৎকন্ঠা সবার তাই না?তবে এতো তারাতাড়ি তূর্যের ভুলের ক্ষমা করা কি উচিত?নৌমির এইটুকু আত্মসম্মান থাকা কি উচিত নয় পাখিরা?, হ্যাপি রিডিং]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here