প্রিয়_নীলপদ্ম —০৮. #মুশরাফা_মিরা

0
48

##প্রিয়_নীলপদ্ম —০৮.
#মুশরাফা_মিরা
[কোনো প্রকার কপি নিষিদ্ধ]

‘কয়েকবছর হলো দেখে নেই তাই তোমার খবর নিতে এসেছি বউউউ’

তূর্য ওর সাথে মশকরা করছে?এসব খাঁটে তূর্যের?নৌমির ভালো লাগলো না এই মশকরা। মনমেজাজ ভালো না থাকলে সোনার গহনাকেও ফিকে মনে হয়।নৌমির বেলাতেও তেমনই।নাকমুখ কুঁচকে গায়ে ভালোভাবে ওড়না জড়িয়ে বলে,

‘এভাবে হূট করে একজন মেয়ের রুমে ঢোকা কোন ধরনের সভ্যতা?’

‘সভ্যতা-অসভ্যতা আমি জানি না তোমার ক্ষেত্রে।’

‘কেন?আমি কি মানুষ নই না-কি?পুতুল মনে হয় আমাকে?যখন যেভাবে ইচ্ছে নাচানো যায় যাকে।’

আবার! আবার ঘুরিয়ে ফিরয়ে খোঁচা। তূর্যের জীবনটাই যাবে বোধহয় বাবা-বউয়ের খোঁচাখুঁচিতে।

‘তুমি মানুষ পুতুল যাকে ইশারায় নয়,যে অন্যকে ইশারায় নাচায়—লাইক মি!’

নৌমি বাকহারা হয়ে গেলো।তূর্যের এমন কথায়।মুখের কথা মুখেই আঁটকে গেলো ওর।স্তম্ভিত নৌমিকে দেখে তূর্য ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলে।হুশ আসলে নৌমি নিজেকে সামলায়।না নৌমি এই পুরুষের কথায় গলা যাবে না, কোনো মতেই না!

‘তা এমন ফ্লার্ট করেছেন কতজনার সাথে ক্যাপ্টেন মহাশয়?’

‘মানে?তুমি কি ভেবেছো আমি তোমার সাথে ফ্লার্ট করছি?’

নৌমি ভাবলেশহীনভাবে উত্তর দিলো,

‘অসম্ভব তো কিছু নয়,করতেই পারেন’

তূর্য ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়ে। কথায় কথা বাড়ে,কি দরকার তর্কে জড়ানোর?তাই প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,

‘নৌমি আমি ডিভোর্স চাই না!’

হঠাৎ সুবুদ্ধি উদয় হওয়ার কারণ পেলো না নৌমি।তবে খুশি হলো এই ভেবে যে তূর্য ওকে চায়,ওর সাথে সংসার বাধতে চায়।তবে খুশিকে চেপে বলে,

‘কিন্তু আমি চাই।বিশ্বাস করুন আমি হাঁপিয়ে উঠেছি এই সংসারের মিথ্যা জালে।এবার মুক্তি চাই, আপনার সাথে ডিভোর্স হলে বাবার পছন্দের ছেলের সাথে বিয়েটা করে ফেলবো!’

শেষ কথাটা তূর্যের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য ছিলো।নৌমির পুরোটা কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলো তবে শেষ কথায় মেজাজ হারালো।ওর বউ হয়ে অন্যকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করছে?দু কদম এগিয়ে নৌমির দুকাধ ধরলো শক্ত হাতে।দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে,

‘তাই বিয়ে করবে অন্যকে?তা এতোদিন করো নি কেন মিসেস?কেন ছিলে আমার ফেরার অপেক্ষায়?কেন?’

শক্ত বন্ধনে নৌমি ব্যাথা পেলো।তবে চোখমুখ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো,চোখ রাখলো তূর্যর কুচকুচে কালো চোখের মণিতে।তেজস্বী কন্ঠে বলে,

‘কেন করি নি জানেন?একবার দেখতে চেয়েছিলাম সামনাসামনি আমার সাথে জুটি বাঁধা পুরুষটিকে।আপনার ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম কবে ফিরবেন আর আমি আপনার সামনে ছুঁড়ে মারবো ডিভোর্সের কাগজটা।’

তূর্যের বাঁধন আগলা হয়ে এলো।চোখমুখে ভর করলো অসহায়ত্ব।নৌমি কি ওর থাকবে না?তীরে এসে তরি ডুবতে দেখতে হবে ওকে?ওতো নিজের ভুল বুঝতে পেরেই ফিরেছে।হয়তো দেরিতে তবুও ফিরেছে।তবে কেন এমন করছে নৌমি?শক্ত হাতদুটো স্থান পরিবর্তন করলো। নৌমির তুলতুলে ফোলা গালে হাত রাখলো।শক্ত হাতের নরম ছোঁয়া পেয়ে কেঁপে উঠল নৌমি।স্বামীর থেকে এই প্রথম ছোঁয়া পেলো ও! তিরতির করে কেঁপে উঠল ঠোঁট, চোখের পাতা।কান্না আসছে ওর বুঝতে পেরে চোখ খিঁচে বন্ধ করলো।ও চোখের পানি কাউকে দেখাতে চায় না।তূর্য যথাসম্ভব কন্ঠে নমনীয়তা এনে বলে,

‘বউ ও-বউ,একটি বার ক্ষমা করা যায় না তোমার এই অধম স্বামীকে?একটু ক্ষমা করো না বউ!চলো না সব ভুলে আমরা সংসার শুরু করি।বিশ্বাস করো আর কাঁদাবো না,প্লিজ ডিভোর্সের কথা মুখে এনো না।’

এমন নরম কন্ঠে আরো কান্না পেলো নৌমির।ধূরছাই!চোখের পানিগুলো বেইমানি করে কেন? না চাইতেও গড়িয়ে পরে।না না, ওকে মোটেও নরম হলে চলবে না।ও যতটা পুড়েছে তূর্য না হয় তার অর্ধেকটা পুড়ুক।নিজেকে যথাসম্ভব শক্ত করে চোখ দুটো খোলে।চোখভর্তি পানি নিয়ে তূর্যর কথার বিপরীতে হাসলো।

‘সব ভুলতে বলছেন তূর্য?কিভাবে ভুলি বলুন? আমিও তো চাই এই পাঁচটা বছরে লোকের যতকথা শুনেছি সবটা ভুলে যেতে কিন্তু পারিনি, বিশ্বাস করুন আমি পারিনি।জানেন তো শারীরিক আঘাতের থেকে কথার আঘাত বেশি কষ্টের।শরীরের আঘাত তো দেখা যায় তবে মনের আঘাত?তাতো অদৃশ্য! কিছু কথার আঘাত রুহু পর্যন্ত পৌঁছে গেছে আমার। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি তা ভুলবো না।জানেন? একটা মেয়ে তার স্বামীর প্রতি অগাত ভয়সায়,ভালোবাসার আশায় শ্বশুর বাড়ি আসে অথচ আমি এসেছি মানুষের কথা শুনতে শুনতে। কত কথা শুনেছি আমি অপয়া,অলক্ষী,বেহায়া,বেশ্যা আরো.. আরো কতকিছু! রোজরোজ বাহিরের মানুষ এসে শুনিয়ে গেছে আমায়।তবে স্বামী ভাগ্য ভালো না হলেও শ্বশুর বাড়ির ভাগ্য ভালো। কত আদরে রেখেই আমায়!বিন্দুমাত্র বাজে কথা বলে নি।এতোবছর ধরে আমি যা-যা সহ্য করেছি এগুলো কি এতো সহজে ভোলা সোজা?বলা যতটা সোজা করা ততটা নয়।স্বামীর অবর্তমানে একজন স্ত্রী ঠিক কতটা অসহায় সেই ধারনা আছে আপনার? আপনি পুরুষ মানুষ তাই কোনো কথা আপনাকে শুনতে হয়নি,হবে না।কিন্তু মেয়েদের? তাঁরা এখনও সবজায়গায় কথা শুনে দোষ থাকুক বা না থাকুক।ক্ষমা বললেই কি করা যায়?কোথায় ছিলো আপনার এই সুন্দর মনোভাব?হূট করে আমার প্রতি এতো টান আসলো কিভাবে? যা এতো বছরেও আসেনি। কি দেখে মন টানলো আমার দিকে?এই রূপ? যদি অসুন্দর হতাম তাহলে নিশ্চয়ই আমাকে নিজ থেকে ডিভোর্স দিতেন তাই না?আমি সবকিছু এতো সহজে ভুলতে পারবোনা তূর্য!আমাকে একা ছেড়ে দিন।বাবা যে সিদ্ধান্ত নিবেন আমি তাই করবো। এতবছর তো তার ছায়াস্থলেই ছিলাম।তার কথা অস্বীকার করি কিভাবে বলুন?’

তূর্য চুপ হয়ে গেলো। মুখে কোনো কথা এলো না নৌমির কথার পিঠে।মেয়েটাকে ওর জন্য অনেক সহ্য করতে হয়েছে।তবে ওতো নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে।না জানি কি হয় ভবিষ্যতে।আদোও ক্ষমা পাবে কি নৌমির কাছে?মেয়েটা এতো কঠোর হলো কেন ওর সাথে?

‘বউমনি মামনি… স্যরি স্যরি’

মেহেরবা এসেছিলো নৌমিকে ডাকতে তবে দরজা খুলতেই একসাথে দেখলো নৌমি-তূর্যকে।লজ্জা পেয়ে উল্টো দিকে দৌড়ালো।এদিকে তূর্য হকচকিয়ে ছিটকে দূরে সরে গেলো নৌমির কাছ থেকে। নৌমি লজ্জা পেলো, না জানি মেহেরবা কিনা-কি ভেবেছে,ইশ!তূর্য নৌমির লজ্জা রাঙা মুখের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে নিঃশব্দে রুম ছারলো নৌমির।কিছু বলার নেই, সেই মুখ নেই। এই অভিমানীনির অভিমান ভাঙার লক্ষণ দেখতে পাচ্ছে না ও।তূর্যের যাওয়ার পানে চাইতে চাইতেই কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পরলো ওর চোখ বেয়ে।মনের ব্যাথায় যে কেন চোখে পানি আসে সেই হিসেবটা আজ-ও মিললো না নৌমির।

__________

‘শুনছো?ছেলেটা এতো বছর পরে ফিরেছে।এখন সংসারে মনোযোগ তো দিতেও পারে তাই-না? আমি ওর চোখে নৌমির প্রতি ভালোবাসা দেখেছি তূর্যর বাবা।ছেলেটা অন্যায় করেছে মানলাম কিন্তু এক জিনিস ধরে বসে থাকলে চলবে বলো?বলি-কি ডিভোর্সের কথাটা দয়া করে মনে এনো না।এই শব্দে আমার ভিষণ ভয় করে’

আরিফুর রেহমান রকিং চেয়ারে চোখ বুঁজে বসে ছিলেন।বেশ কিছু সময় ধরেই স্ত্রীর উপস্থিতি অনুভব করছিলেন তবে নিজ থেকে কিছুই বলেন নি।তুলি কথা বলতেই চোখ খুললেন চেয়ে দেখলেন নরম মনের মানুষটিকে।যাকে শত আঘাত দিলেও হাসিমুখে বলবে ‘আমি কিছু মনে করিনি তোমার কথায়’। তুলি শাড়ির আঁচলটার এককোনা নিজের হাতের আঙুলে প্যাচাঁচ্ছে ঠিক যেনো এক কিশোরী দাঁড়িয়ে আরিফুর রেহমানের সামনে দাড়িয়ে।স্ত্রীর ভয়ভয়ে বলা কথাগুলো শুনে তিনি উঠে দাঁড়ান মুখোমুখি হয় তুলির চোখমুখে দুষ্টুমির রেখা ফুটিয়ে বললেন,

‘তোমাকে বাচ্চা বাচ্চা লাগছে গিন্নি।বিয়ের পর আমাকে দেখলে যেভাবে মায়ের আঁচলের তলায় লুকাতে, ভয়ভয়ে দেখতে আমায়।এখন সেইরকম লাগছে তোমার।নতুন করে প্রেমে পড়েছি তোমার! লক্ষণ তো ভালো ঠেকছে না!’

স্বামীর এমন কথায় বেশ লজ্জায় পড়লেন তুলি।মানুষটা যে কি!বয়স বাড়লেও তাকে লজ্জা দিতে ভোলে না কখনো।

‘বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে তোমায় তাই না?কি সব বলছো,ধূর!’

‘সত্যি বলছি ডার্লিং।আর..আর কিসের বুড়ো হ্যা?আমি যথেষ্ট ইয়াং!বয়স বাড়লেই, চামড়া কুচকালেই কেউ বুড়ো হয় না। মনের দিক থেকে আমি এখনো ইয়াং, হাহ্’

বেশ ভাব নিয়ে কথাগুলো বললেন আরিফুর রেহমান। তুলি মুখ বাঁকিয়ে চিমটি কাটে তাঁর পেটে।কিঞ্চিৎ ব্যাথা পেয়ে মুখ কুঁচকালেন আরিফ।তুলি লজ্জা কাটিয়ে বলে,

‘এসব ঢংচং-এর কথা ছাড়ো তো।আমার কথার জবাব দাও তুমি।ওদের ডিভোর্সের কথা ভুলে ঢ়াও তুমি। বিশ্বাস করো তূর্য-নৌমির ডিভোর্স হলে কিন্তু আমি তোমায় ছাড়বো না।’

আরিফুর রেহমান ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়ে। তাকে যে সবাই কি মনে করে আল্লাহ মালুম। তিনি কি এতোটাই খারাপ যে নিজ হাতে ছেলের সংসার নষ্ট করবে?তবে নিজের ছেলের বলে যে সাতখুন মাপ তাতো হয়না।স্ত্রীর কাঁধ জড়িয়ে বলে,

‘আহা গিন্নী সবঠিক হয়ে যাবে।শুধু তোমার ছেলেকে শিক্ষা দিতে হবে এই-যা।আমার ছেলে হয়ে এমন কাজ করছে ভাবতেও খারাপ লাগছে। ইচ্ছে করছে ছোটবেলার মতো ওর পাছার উপর সপাৎসপাৎ করে কয়েকটা বারি মারি, মফিজ একটা।’

চলবে….?

[পাখিদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞত। ভালোবাসা ও ভালোবাসা,হ্যাপি রিডিং]
[কোনো প্রকার কপি নিষিদ্ধ]

‘কয়েকবছর হলো দেখে নেই তাই তোমার খবর নিতে এসেছি বউউউ’

তূর্য ওর সাথে মশকরা করছে?এসব খাঁটে তূর্যের?নৌমির ভালো লাগলো না এই মশকরা। মনমেজাজ ভালো না থাকলে সোনার গহনাকেও ফিকে মনে হয়।নৌমির বেলাতেও তেমনই।নাকমুখ কুঁচকে গায়ে ভালোভাবে ওড়না জড়িয়ে বলে,

‘এভাবে হূট করে একজন মেয়ের রুমে ঢোকা কোন ধরনের সভ্যতা?’

‘সভ্যতা-অসভ্যতা আমি জানি না তোমার ক্ষেত্রে।’

‘কেন?আমি কি মানুষ নই না-কি?পুতুল মনে হয় আমাকে?যখন যেভাবে ইচ্ছে নাচানো যায় যাকে।’

আবার! আবার ঘুরিয়ে ফিরয়ে খোঁচা। তূর্যের জীবনটাই যাবে বোধহয় বাবা-বউয়ের খোঁচাখুঁচিতে।

‘তুমি মানুষ পুতুল যাকে ইশারায় নয়,যে অন্যকে ইশারায় নাচায়—লাইক মি!’

নৌমি বাকহারা হয়ে গেলো।তূর্যের এমন কথায়।মুখের কথা মুখেই আঁটকে গেলো ওর।স্তম্ভিত নৌমিকে দেখে তূর্য ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলে।হুশ আসলে নৌমি নিজেকে সামলায়।না নৌমি এই পুরুষের কথায় গলা যাবে না, কোনো মতেই না!

‘তা এমন ফ্লার্ট করেছেন কতজনার সাথে ক্যাপ্টেন মহাশয়?’

‘মানে?তুমি কি ভেবেছো আমি তোমার সাথে ফ্লার্ট করছি?’

নৌমি ভাবলেশহীনভাবে উত্তর দিলো,

‘অসম্ভব তো কিছু নয়,করতেই পারেন’

তূর্য ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়ে। কথায় কথা বাড়ে,কি দরকার তর্কে জড়ানোর?তাই প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,

‘নৌমি আমি ডিভোর্স চাই না!’

হঠাৎ সুবুদ্ধি উদয় হওয়ার কারণ পেলো না নৌমি।তবে খুশি হলো এই ভেবে যে তূর্য ওকে চায়,ওর সাথে সংসার বাধতে চায়।তবে খুশিকে চেপে বলে,

‘কিন্তু আমি চাই।বিশ্বাস করুন আমি হাঁপিয়ে উঠেছি এই সংসারের মিথ্যা জালে।এবার মুক্তি চাই, আপনার সাথে ডিভোর্স হলে বাবার পছন্দের ছেলের সাথে বিয়েটা করে ফেলবো!’

শেষ কথাটা তূর্যের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য ছিলো।নৌমির পুরোটা কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলো তবে শেষ কথায় মেজাজ হারালো।ওর বউ হয়ে অন্যকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করছে?দু কদম এগিয়ে নৌমির দুকাধ ধরলো শক্ত হাতে।দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে,

‘তাই বিয়ে করবে অন্যকে?তা এতোদিন করো নি কেন মিসেস?কেন ছিলে আমার ফেরার অপেক্ষায়?কেন?’

শক্ত বন্ধনে নৌমি ব্যাথা পেলো।তবে চোখমুখ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো,চোখ রাখলো তূর্যর কুচকুচে কালো চোখের মণিতে।তেজস্বী কন্ঠে বলে,

‘কেন করি নি জানেন?একবার দেখতে চেয়েছিলাম সামনাসামনি আমার সাথে জুটি বাঁধা পুরুষটিকে।আপনার ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম কবে ফিরবেন আর আমি আপনার সামনে ছুঁড়ে মারবো ডিভোর্সের কাগজটা।’

তূর্যের বাঁধন আগলা হয়ে এলো।চোখমুখে ভর করলো অসহায়ত্ব।নৌমি কি ওর থাকবে না?তীরে এসে তরি ডুবতে দেখতে হবে ওকে?ওতো নিজের ভুল বুঝতে পেরেই ফিরেছে।হয়তো দেরিতে তবুও ফিরেছে।তবে কেন এমন করছে নৌমি?শক্ত হাতদুটো স্থান পরিবর্তন করলো। নৌমির তুলতুলে ফোলা গালে হাত রাখলো।শক্ত হাতের নরম ছোঁয়া পেয়ে কেঁপে উঠল নৌমি।স্বামীর থেকে এই প্রথম ছোঁয়া পেলো ও! তিরতির করে কেঁপে উঠল ঠোঁট, চোখের পাতা।কান্না আসছে ওর বুঝতে পেরে চোখ খিঁচে বন্ধ করলো।ও চোখের পানি কাউকে দেখাতে চায় না।তূর্য যথাসম্ভব কন্ঠে নমনীয়তা এনে বলে,

‘বউ ও-বউ,একটি বার ক্ষমা করা যায় না তোমার এই অধম স্বামীকে?একটু ক্ষমা করো না বউ!চলো না সব ভুলে আমরা সংসার শুরু করি।বিশ্বাস করো আর কাঁদাবো না,প্লিজ ডিভোর্সের কথা মুখে এনো না।’

এমন নরম কন্ঠে আরো কান্না পেলো নৌমির।ধূরছাই!চোখের পানিগুলো বেইমানি করে কেন? না চাইতেও গড়িয়ে পরে।না না, ওকে মোটেও নরম হলে চলবে না।ও যতটা পুড়েছে তূর্য না হয় তার অর্ধেকটা পুড়ুক।নিজেকে যথাসম্ভব শক্ত করে চোখ দুটো খোলে।চোখভর্তি পানি নিয়ে তূর্যর কথার বিপরীতে হাসলো।

‘সব ভুলতে বলছেন তূর্য?কিভাবে ভুলি বলুন? আমিও তো চাই এই পাঁচটা বছরে লোকের যতকথা শুনেছি সবটা ভুলে যেতে কিন্তু পারিনি, বিশ্বাস করুন আমি পারিনি।জানেন তো শারীরিক আঘাতের থেকে কথার আঘাত বেশি কষ্টের।শরীরের আঘাত তো দেখা যায় তবে মনের আঘাত?তাতো অদৃশ্য! কিছু কথার আঘাত রুহু পর্যন্ত পৌঁছে গেছে আমার। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি তা ভুলবো না।জানেন? একটা মেয়ে তার স্বামীর প্রতি অগাত ভয়সায়,ভালোবাসার আশায় শ্বশুর বাড়ি আসে অথচ আমি এসেছি মানুষের কথা শুনতে শুনতে। কত কথা শুনেছি আমি অপয়া,অলক্ষী,বেহায়া,বেশ্যা আরো.. আরো কতকিছু! রোজরোজ বাহিরের মানুষ এসে শুনিয়ে গেছে আমায়।তবে স্বামী ভাগ্য ভালো না হলেও শ্বশুর বাড়ির ভাগ্য ভালো। কত আদরে রেখেই আমায়!বিন্দুমাত্র বাজে কথা বলে নি।এতোবছর ধরে আমি যা-যা সহ্য করেছি এগুলো কি এতো সহজে ভোলা সোজা?বলা যতটা সোজা করা ততটা নয়।স্বামীর অবর্তমানে একজন স্ত্রী ঠিক কতটা অসহায় সেই ধারনা আছে আপনার? আপনি পুরুষ মানুষ তাই কোনো কথা আপনাকে শুনতে হয়নি,হবে না।কিন্তু মেয়েদের? তাঁরা এখনও সবজায়গায় কথা শুনে দোষ থাকুক বা না থাকুক।ক্ষমা বললেই কি করা যায়?কোথায় ছিলো আপনার এই সুন্দর মনোভাব?হূট করে আমার প্রতি এতো টান আসলো কিভাবে? যা এতো বছরেও আসেনি। কি দেখে মন টানলো আমার দিকে?এই রূপ? যদি অসুন্দর হতাম তাহলে নিশ্চয়ই আমাকে নিজ থেকে ডিভোর্স দিতেন তাই না?আমি সবকিছু এতো সহজে ভুলতে পারবোনা তূর্য!আমাকে একা ছেড়ে দিন।বাবা যে সিদ্ধান্ত নিবেন আমি তাই করবো। এতবছর তো তার ছায়াস্থলেই ছিলাম।তার কথা অস্বীকার করি কিভাবে বলুন?’

তূর্য চুপ হয়ে গেলো। মুখে কোনো কথা এলো না নৌমির কথার পিঠে।মেয়েটাকে ওর জন্য অনেক সহ্য করতে হয়েছে।তবে ওতো নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে।না জানি কি হয় ভবিষ্যতে।আদোও ক্ষমা পাবে কি নৌমির কাছে?মেয়েটা এতো কঠোর হলো কেন ওর সাথে?

‘বউমনি মামনি… স্যরি স্যরি’

মেহেরবা এসেছিলো নৌমিকে ডাকতে তবে দরজা খুলতেই একসাথে দেখলো নৌমি-তূর্যকে।লজ্জা পেয়ে উল্টো দিকে দৌড়ালো।এদিকে তূর্য হকচকিয়ে ছিটকে দূরে সরে গেলো নৌমির কাছ থেকে। নৌমি লজ্জা পেলো, না জানি মেহেরবা কিনা-কি ভেবেছে,ইশ!তূর্য নৌমির লজ্জা রাঙা মুখের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে নিঃশব্দে রুম ছারলো নৌমির।কিছু বলার নেই, সেই মুখ নেই। এই অভিমানীনির অভিমান ভাঙার লক্ষণ দেখতে পাচ্ছে না ও।তূর্যের যাওয়ার পানে চাইতে চাইতেই কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পরলো ওর চোখ বেয়ে।মনের ব্যাথায় যে কেন চোখে পানি আসে সেই হিসেবটা আজ-ও মিললো না নৌমির।

__________

‘শুনছো?ছেলেটা এতো বছর পরে ফিরেছে।এখন সংসারে মনোযোগ তো দিতেও পারে তাই-না? আমি ওর চোখে নৌমির প্রতি ভালোবাসা দেখেছি তূর্যর বাবা।ছেলেটা অন্যায় করেছে মানলাম কিন্তু এক জিনিস ধরে বসে থাকলে চলবে বলো?বলি-কি ডিভোর্সের কথাটা দয়া করে মনে এনো না।এই শব্দে আমার ভিষণ ভয় করে’

আরিফুর রেহমান রকিং চেয়ারে চোখ বুঁজে বসে ছিলেন।বেশ কিছু সময় ধরেই স্ত্রীর উপস্থিতি অনুভব করছিলেন তবে নিজ থেকে কিছুই বলেন নি।তুলি কথা বলতেই চোখ খুললেন চেয়ে দেখলেন নরম মনের মানুষটিকে।যাকে শত আঘাত দিলেও হাসিমুখে বলবে ‘আমি কিছু মনে করিনি তোমার কথায়’। তুলি শাড়ির আঁচলটার এককোনা নিজের হাতের আঙুলে প্যাচাঁচ্ছে ঠিক যেনো এক কিশোরী দাঁড়িয়ে আরিফুর রেহমানের সামনে দাড়িয়ে।স্ত্রীর ভয়ভয়ে বলা কথাগুলো শুনে তিনি উঠে দাঁড়ান মুখোমুখি হয় তুলির চোখমুখে দুষ্টুমির রেখা ফুটিয়ে বললেন,

‘তোমাকে বাচ্চা বাচ্চা লাগছে গিন্নি।বিয়ের পর আমাকে দেখলে যেভাবে মায়ের আঁচলের তলায় লুকাতে, ভয়ভয়ে দেখতে আমায়।এখন সেইরকম লাগছে তোমার।নতুন করে প্রেমে পড়েছি তোমার! লক্ষণ তো ভালো ঠেকছে না!’

স্বামীর এমন কথায় বেশ লজ্জায় পড়লেন তুলি।মানুষটা যে কি!বয়স বাড়লেও তাকে লজ্জা দিতে ভোলে না কখনো।

‘বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে তোমায় তাই না?কি সব বলছো,ধূর!’

‘সত্যি বলছি ডার্লিং।আর..আর কিসের বুড়ো হ্যা?আমি যথেষ্ট ইয়াং!বয়স বাড়লেই, চামড়া কুচকালেই কেউ বুড়ো হয় না। মনের দিক থেকে আমি এখনো ইয়াং, হাহ্’

বেশ ভাব নিয়ে কথাগুলো বললেন আরিফুর রেহমান। তুলি মুখ বাঁকিয়ে চিমটি কাটে তাঁর পেটে।কিঞ্চিৎ ব্যাথা পেয়ে মুখ কুঁচকালেন আরিফ।তুলি লজ্জা কাটিয়ে বলে,

‘এসব ঢংচং-এর কথা ছাড়ো তো।আমার কথার জবাব দাও তুমি।ওদের ডিভোর্সের কথা ভুলে ঢ়াও তুমি। বিশ্বাস করো তূর্য-নৌমির ডিভোর্স হলে কিন্তু আমি তোমায় ছাড়বো না।’

আরিফুর রেহমান ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়ে। তাকে যে সবাই কি মনে করে আল্লাহ মালুম। তিনি কি এতোটাই খারাপ যে নিজ হাতে ছেলের সংসার নষ্ট করবে?তবে নিজের ছেলের বলে যে সাতখুন মাপ তাতো হয়না।স্ত্রীর কাঁধ জড়িয়ে বলে,

‘আহা গিন্নী সবঠিক হয়ে যাবে।শুধু তোমার ছেলেকে শিক্ষা দিতে হবে এই-যা।আমার ছেলে হয়ে এমন কাজ করছে ভাবতেও খারাপ লাগছে। ইচ্ছে করছে ছোটবেলার মতো ওর পাছার উপর সপাৎসপাৎ করে কয়েকটা বারি মারি, মফিজ একটা।’

চলবে….?

[পাখিদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞত। ভালোবাসা ও ভালোবাসা,হ্যাপি রিডিং]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here