বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~ #পর্ব_২০

0
61

#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_২০
#সমৃদ্ধি_রিধী

হাসনাহেনা ছেলের দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে। আরিফ পায়চারি করে বলে,

“আমি লুলা? আমি অক্ষম? নাকি আমি বাকশক্তিহীন?”

হাসনাহেনা জবাব দেয় না। আরিফ ফের বলে,

“কথা বলো তুমি। আব্বুর এইসব ব্যবহারের কথা আমাকে বলোনি কেনো তুমি? কি ভেবে আমাকে বলোনি, বলো আমাকে?”

“তোর আর তোর আব্বুর সম্পর্ক খারাপ হোক তা চাইনি।”

“আচ্ছা বুঝলাম অনেক ভালো সম্পর্ক রেখেছো আমাকে আব্বুর কথা না বলে। আব্বুর সাথে ছয় মাসে ছশ সেকেন্ডও কথা হয় না। অনেক ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কিন্তু আমি যে রুমঝুমকে ভালোবাসি তা বলিনি তোমাকে? তাও তুমি ওকে কি করে বলেছো আমাকে তৌহিদাকে বিয়ের করার জন্য বোঝাতে?”

“আব্বা আমি..”

হাসনাহেনার কথা শেষ করার আগেই আরিফ বলে,

“রুমঝুম যখন বিয়ে করতে রাজি হচ্ছিলো না তখন ভেবেছি কারন অন্য। সমস্যা ওর৷ ওর কিছু একটা হয়েছে যার জন্য ও বিয়ে করতে রাজি হচ্ছে না। বারবার জিজ্ঞাসা করার পরও একই কথা। বিয়ে করবে না, বিয়ে করবে না, করবে না। কেনো করবে না তার জবাব নেই। কিন্তু বুঝিনি শস্যের মধ্যেই ভূত। আমার বাপ মার মধ্যেই ভেজাল। আমার তো মাথায়ও আসেনি তুমি ওকে নিষেধ করতে পারো। তাহলে রুমঝুমকে না ধরে আমি অবশ্যই তোমাকে ধরতাম।”

“আমি রুমঝুমের সাথে আর কথা বলার সুযোগই পাচ্ছি না। আমি ওকে কল দিয়ে বোঝাবো আব্বা।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি একবার বোঝাবে বিয়ে না কার জন্য আরেকবার বোঝাবে বিয়ে করার জন্য। আমার সাথে ক্লিয়ারলি কথা বললে কি হতো আম্মু? আমি পাগল? আমি ভেড়া? না অন্যকিছু? আমি কোনো পদক্ষেপ নিতে পারতাম না?”

“আব্বা মাথা কাজ করেনি।”

“তোমার বয়স কত আম্মু? আটচল্লিশ বয়স মাত্র। বয়স তো আহামরি বেশি নয় যে মাথা কাজ করে না, মাথায় কিছু ধরে না, সব ভুলে যাওয়ার রোগ হয়েছে। তোমার মনের রোগ হয়েছে। তোমার মনে সবসময় ঘুরে আমি বড় মেয়ে, আমার মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে, আমার ছেলে উপযুক্ত। তোমার বয়স ওভাবে বেড়েছে। আমার সাথে তোমরা সবাই মজা পেয়েছো না?”

“আব্বা আমি রুমঝুমের সাথে কথা বলবো। তোর তৌহিদাকে বিয়ে করতে হবে না।”

“আম্মু আমার রুম থেকে যাও। একা থাকতে দাও।”

“আব্বা শোন?”

“আমি একা থাকতে চাচ্ছি আম্মু। আমার কিছু ভালো লাগছে না।”

হাসনাহেনা বের হয়ে গেল। আরিফ চুল খামচে ধরে বসে থাকে। রুমঝুম তো পারতো সবটা ওকে খুলে বলতে? আরিফ যদি সবটা জানতো তবে তো রুমঝুমকে আঘাত করতো না। রুমঝুমকে ওভাবে আঘাত করে আরিফ তো ওর বাপের স্বভাবেরই পরিচয় দিলো। আরিফের এত রাগ উঠলো ও দেয়ালে পরপর কয়েকটা ঘুষি দিয়ে বসে। আরিফ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে রুমঝুমের সাথে একবার বিয়ে হয়ে গেলে ও বেস্ট হাসবেন্ড হবে। একদম বেস্ট বেস্ট বেস্ট হাসবেন্ড হবে। হাসনাহেনাকে বলে আগামীকালই বকুলের সাথে সরাসরি কথা বলার ব্যবস্থা করে।
_________________

সাড়ে আটটা বাজে। বেলীর বাসার ড্রয়িংরুমে হাসনাহেনা, আরিফ, বেলী, বকুল, রিমি, জবা, নওশাদ বসা। আরিফ মাত্রই ব্যুরো থেকে ফিরেছে। পানি পান করে ধাতস্থ হয়ে বলে,

“আমি রুমঝুমকে বিয়ে করতে চাই।”

বকুল কাটকাট গলায় বলে, “আমি চাই না আমার মেয়ের তোর সাথে বিয়ে হোক।”

“কেনো?”

“বড় আপা সারাজীবন কষ্ট করেছে। আমি চাই না তোর সাথে বিয়ে হওয়ার পর আমার মেয়েও সারাজীবন সেই কষ্ট সহ্য করুক।”

“আম্মু কষ্ট করেছে তাই রুমঝুমও করবে?”

“তুই তোর আব্বুর মতো না তার কি গ্যারান্টি?” নওশাদ বলে।

“আমি আব্বুর মতো?”

“ছেলেরা বাবার মতো হয়।”

“নানুমণির পর পর পাঁচ মেয়ে হওয়ার পর নানাভাই নানুমণিকে ছেলের জন্য কথা শোনাতো। এটা আমাকে আম্মু বলেছে। ছেলেরা যেহেতু বাবার মতো হয় তাহলে তুমিও মামিকে ছেলের জন্য একইভাবে পিঞ্চ মারবে?”

বকুল ধমক দিয়ে বলে, “বেয়াদবি করবি না আরিফ। তোর বাপ আমাদেরকে অনেক ছোট করেছে। দুবছর আগে তোর খালুর ব্যবসায় লস হওয়ার পর তোর আব্বু মন মতো কথা শুনিয়েছে। যে তোর খালুকে অসম্মান করে, তার কাছে তো আমি মেয়ে বিয়ে দিবো না। তোর খালু এতকিছু জানেও না। তোর খালু জানলে তোর খালুও তোর হাতে রুমঝুমকে জীবনেও তুলে দিবে না।”

“আব্বু খারাপ ব্যবহার করে তোমাদের সাথে সেটা কখনো আমাকে বলেছো?”

বেলী বলে, “আপাই চাইতো না বলতে। তাছাড়া তুই ছেলে, তোকে বললে তুই কি করতি?”

“আমি কিছুই করতে পারতাম না?”

“সোজা কথা শোন আরিফ। রুমঝুম বলেছে তোদের অনেকদিনের সম্পর্ক। কতদিনের আমি জানি না। আমার মেয়ে যে লুকিয়ে এভাবে প্রেম করেছে আমাদের চোখের সামনেই তাও আমি বুঝিনি। বুঝলে অনেক আগেই সম্পর্ক ভেঙে যেতো। এখন যা হয়েছে ভুলে যা। তোদের বিয়ে হয়নি, জীবনও শেষ হয়ে যায়নি। ধুকে ধুকে মরার চাইতে বিয়ের আগেই ওকে বিষ খাইয়ে মারবো আমি।

পাগলামি করিস না। রুমঝুম তোকে বিয়ে করবে না সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছে। রুমঝুম এতদিন বুঝেনি, এখন পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছে তাই ও পিছিয়ে এসেছে। ও বুঝেছে তোর সাথে ওর বিয়ে হলে কেউ-ই সুখী হবে না। তাছাড়া আমরা বড়রা যেখানে চাই না, সেখানে বিয়েটা না হওয়াই উচিত।”

হাসনাহেনা বলে, “আমার ছেলে তো খারাপ না।”

“খারাপ হওয়ার কথা না। এমনিতেই দুলাভাই আমাদেরকে ছোট করে দেখে, এখন ওদের বিয়ে হলে ভাববে দুলাভাইয়ের টাকার জন্য আমি মেয়ে গছিয়ে দিয়েছি। আমার মেয়ে এত ফেলনা? বিয়ে দিয়ে মেয়েকে তো জাহান্নামে পাঠাবো না।”

বেলী বলে, “তুই ওকে আগে প্রস্তাব দিয়েছিস নাকি রুমঝুম?”

আরিফ মিথ্যা বললো। “আমি।”

“আমি বলছি তো আপা। রুমঝুম বুঝতে পারেনি। সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়েছে। এখন আমরা যখন সবাই মিলে বুঝালাম, ঠিকই বুঝেছে। আরিফের সাথে ওর বিয়ে হলে ও সুখী হবেই না।”

আরিফ ক্লান্ত গলায় বলে, “তোমরা আমার সমস্যা বলো।”

বকুল রেগেমেগে বলে, “সমস্যা তোর বাপের। হয়েছে? তোর বাপ জীবনে অনেক কথা শুনিয়েছে। অনেক। আমি চাই না আবেগের বশে ভবিষ্যতে আরো সমস্যা ফেস করতে। তোর খালুর পছন্দের ছেলে আছে একটা। ওর সাথে রুমঝুমের বিয়ে দিবো। ওর সাথে না হলেও আমরা ভালো পরিবারের ছেলে খুঁজবো।”

“সমস্যা আমার বাপের হলে আমার দোষ কি? আমি রুমঝুমকে ভালোবাসি।”

বকুল কাঠকাঠ গলায় নলে, “শুধু ভালোবাসার মানুষ পাশে থাকলেই হয় না। পরিবেশ, পরিবার ম্যাটার করে। আমার মেয়ের সাথে তোর বিয়ে হলে আমার মেয়ে সুখী হবে না।”

“আমার বাপ খারাপ, আমার বাপের গুষ্টি খারাপ এটা আমার দোষ?”

বেলী বলে, “বাবা মার ধারা, বংশের ধারা সন্তানরা পায়।”

“তোমরা চাও না রুমঝুমের সাথে আমার বিয়ে হোক?”

“তুই দুলাভাইয়ের মতো হবি না, আগে সেই নিশ্চয়তা দে।” নওশাদ ফের একই প্রশ্ন করে।

আরিফ তাকালো সবার দিকে। নওশাদের দিকে ফের তাকিয়ে বলে,

“তোমার আমাকে কোনোকালেই পছন্দ না তাই না মামা?”

নওশাদ শীতল চোখে তাকালো। আরিফ বসা থেকে উঠে গেল। নওশাদের দিকে তাকিয়ে বলে,

“তোমার অনেক ইগো মামা। সেই ইগোর জন্য তুমি আমাকে পছন্দ করো না। আমাদের বয়সের তারতম্য বেশি না, আমাদের সম্পর্ক অনেকটা বন্ধুর মতো হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু হয়নি। কেনো জানো? ইগো। ছোটবেলায় তুমি আমার সাথে রিমোট কন্ট্রোল কার খেলতে চাইতে, রিমোট কন্ট্রোল প্লেইন উড়াতে চাইতে। কিন্তু আব্বু শিখিয়ে দিতো তোমাকে না দিতে। আমি আব্বুর শিখিয়ে দেওয়া অনুযায়ী দিতামও না। তুমি আমার সাথে খেলতে চাইতে, আমি তোমার ধারের কাছে আসতাম না। সেইজন্য তোমার অনেক রাগ হতো। পরে পরে তুমি আমার সাথে কখনোই খেলতে চাইতে না। কিন্তু যখন থেকে আমার বোধ হলো তখন ভাবতাম আব্বু এইসব বলে কি! আব্বুকে জেরা করেছিলাম। আব্বু উত্তর দিতে পারেনি। তারপর থেকে আমি নিজ থেকে তোমার কাছে যেতাম, তোমার সাথে মিশতে চাইতাম কিন্তু তুমি তোমার ইগোর জন্য আমার সাথে মিশতে না। বোনের ছেলে হিসেবে যতটুকু কথা বলতে হয় ততটুকুই বলতে। ইভেন এখনও পর্যন্ত তুমি তোমার ইগো ধরে রেখেছো। তোমার ইগোর জন্য তোমার মনে হয় আমিও আব্বুর মতো এমন, আমিও খারাপ, আমার সাথে মানুষ থাকতে পারবে না।

হোয়াটএভার রুমঝুমের সাথে দীর্ঘদিন ধরে আমার একটা সম্পর্ক ছিল। আমি এই সম্পর্কটাকে বিয়ে পর্যন্ত নিতে চাচ্ছিলাম। এখন তোমরা গার্ডিয়ান, তোমরা চাচ্ছো না বিয়েটা হোক। আর রুমঝুমও চায় না বিয়েটা হোক। এইক্ষেত্রে আমার একার ইচ্ছায় কিছু হবে না। এটা তো কোনো সিনেমা না যে জোর করে উঠিয়ে নিয়ে বিয়ে করবো। যাই হোক আব্বু পছন্দের মেয়ের সাথে আমি এই শুক্রবার বিয়ে করছি।”

বকুলের দিকে তাকিয়ে বলে, “রুমঝুমকে যোগ্য, ভালো, ভদ্র পরিবারের একটা শিক্ষিত ছেলের সাথে বিয়ে দিও। শুধু ভালো পরিবারের শিক্ষিত ছেলেই দেখো না অবশ্যই এমন ছেলে খুঁজবে যে রুমঝুমের ইনার চাইল্ডকে মেরে ফেলবে না। রুমঝুম ম্যাচিউর না। এখানেও আমার দোষ, রুমঝুমের যে সময় ম্যাচিউর হওয়ার কথা ছিল ওইসময় আমি ওকে ম্যাচিউর হতে দেইনি। ওর বাচ্চামোকে প্রশয় দিয়ে গিয়েছি। ভাবনা ছিল এমন – সমস্যা কি? আমিই তো দেখবো ভবিষ্যতে। যাই হোক আমার জন্য, আমাদের সম্পর্কের জন্য যাতে রুমঝুমের ভবিষ্যতে কোনো প্রকার সমস্যা না হয় সেই ওয়াদা আমার। শুধু খালামণি একটাই কথা বলবো আমাদের এই সাময়িক সম্পর্কের জন্য যাতে তোমাদের বোনদের মধ্যে সম্পর্ক শেষ না হয়। কোনো প্রকার মনমালিন্য, মন খারাপ, রাগারাগি না হয়। এতদিন আম্মুর সাথে যেভাবে ছিলে, আগের মতো সেভাবেই থাকবে।”

আরিফ হাসনাহেনার দিকে তাকিয়ে বলে, “এইযে এতকিছু কেনো হচ্ছে জানো আম্মু? তোমার জন্য। কথাটা শুনতে খারাপ লাগলেও তোমার জন্য। আমি খালামণিদের, মামার কথা বাদই দিলাম। তারা জানায়নি, ভালো করেছে, তাদের মন চায়নি তারা বলেনি। তুমি যদি একবার আমাকে বা ইসরাতকে আব্বুর ব্যবহার সম্পর্কে অবগত করতে তাহলে এতকিছু হতোই না। আব্বু তোমার সাথে, তোমার পরিবারের সাথে কেমন ব্যবহার করে তা যদি জানাতে তাহলে অনেক আগেই আব্বুকে আমরা শুধতে দিতে পারতাম। আব্বুর তাহলে এতগুলো বছর ধরে এমন করতে পারতো না। খালামণিদের, মামারও আমাদের প্রতি এত বিতৃষ্ণা হয়তো থাকতো না। আমার পনেরো ষোলো বছর থেকেই ভালো মুখ চলে। আব্বুকে ঝাড়া বিশাল ব্যাপার না। আব্বু আর যাই হোক আমার আর ইসরাতের প্রতি ভীষণ দুর্বল। এটা যদি মুখের কথা না, কথাটা তুমিও জানো আম্মু। অবশ্য আব্বু ঠিক হলেও না কি! দোষ তো আমার জন্মের।”

আরিফ আর কোনোদিকে না তাকিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেল। রুমঝুমের পেজের, আইডির পাসওয়ার্ড আরিফ ওকে রাস্তায়ই পাঠিয়ে দিলো। রুমঝুমকে সব সাইট থেকে ব্লক না মেরে আনফ্রেন্ড করে দিলো।

_________________

আরিফ হাঁটতে হাঁটতেই বাসায় চলে আসে। টানা কলিং বেল বাজাতে থাকে। ইসরাত বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে।

“এতবার কলিংবেল দিচ্ছো কেনো?”

আরিফ কিছু না বলে রুমের দিকে হাঁটা দেয়। ইসরাত দরজা লাগিয়ে পিছন পিছন আসতে আসতে বলে,

“কি কথা হলো? আম্মু কোথায়?”

আরিফ খাটে বসে। ইসরাত বলে, “কিছু বলছো না কেনো? কি কথা হলো?”

“রুম থেকে বের হো।”

“বিয়ের ডেট ঠিক করেনি?”

আরিফ রেগে চেঁচিয়ে উঠে। “রুম থেকে বের হো।”

ইসরাত ঠান্ডা গলায় বলে, “কিছু হয়েছে? রাজি হয়নি কেউ?”

“কেনো হবে? আব্বু খারাপ, আব্বুর মুখ ঠিক নেই, আব্বুর ছেলে না আমি? আমিও তাই খারাপ হবো। আমার মতো ছেলের সাথে কেনো বিয়ে দিবে? আমার ফুফুরা খারাপ। আমার সাথে রুমঝুমের বিয়ে হলে ফুফুরা রুমঝুমকে দিনে চার বেলা থাপ্পড়াবে। আমার সাথে কেনো মেয়ের বিয়ে দিবে?”

ইসরাত আরিফের পাশে এসে বসে। “মামা, খালামণি কেউ-ই রাজি না?”

“সবার কথা বাদ দিলাম আমি। সব বাদ। মামা, খালামণি সব বাদ। রুমঝুম আমাকে বিয়ে করতে চায় না। রুমঝুমই চায় না আমার কি বলার আছে?”

ইসরাত তাকিয়ে থাকে আরিফের দিকে। আরিফ বলে,

“আমরা আব্বুর ব্যবহার সম্পর্কে জানতাম না। তোকে আর আমাকে আব্বুর ব্যবহার সম্পর্কে জানানো হয়নি। আব্বুও আমাদের সামনে কখনো বাজে ব্যবহার করেনি। কিন্তু রুমঝুম তো জানতো? রুমঝুম তো জানতো আমার বাবা কেমন। আমার বাবা আমার মার সাথে কেমন ব্যবহার করে সব জানতো। ও সব জেনে বুঝে আমাকে ফেইক আইডি থেকে মেসেজ দিয়েছিল। ও আমার বাপ সম্পর্কেও জানতো, ও আমার সম্পর্কেও জানতো। আমি তখন তোকে, কাজিন মহলের সবাইকে উড়াধুরা থাপ্পড়ও মারতাম, সবই জানতো ও। তো কিছুদিন পরই ধরা খাওয়ার পর বলেছিল ও আমাকে ভালোবাসে। তাই ওকে আমি প্রোপোজ করেছিলাম। আমি ওকে জোর করে আমার সাথে সম্পর্কে জড়াইনি। ষোলো, সতেরো বছরের একটা মেয়ের তখন মনে হয়নি আমার পরিবার খারাপ? এতটা অবুঝ ও?

ছয় বছর রিলেশনে ছিলাম। সিক্স ইয়ারস। নট এ্যা শর্ট টাইম। এই ছয় বছরে একদিনও আমি ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করিনি। ও ফ্যাশন ডিজাইন নিয়েই পড়বে। তখন একটা মানুষ ওকে সাপোর্ট করেছে? করেনি। আমি করেছি। প্রেমিক, প্রেমিকা কম আমরা বন্ধুর মতো মেশার চেষ্টা করেছি। সরি আমি বন্ধুর মতো মেশার চেষ্টা করেছি, আমি ওকে নিজের সব সিক্রেট বলেছি। ও আমাকে সামান্য আমার ফ্যামিলির কথা বলতে পারেনি। এত বছর ওর আমাকে খুব ভালো লেগেছে। এত বছর মনে হয়নি আরিফ ওর বাপের মতো। যখন বিয়ের কথা উঠলো তখন মনে হলো আরিফ খারাপ, আরিফ ওর বাবার মতো। রুমঝুমের হঠাৎ করে বুঝ এলো আরিফের সাথে সংসার করা যাবে না। ও খারাপ, ও কীট।”

“রুমঝুম সরাসরি তোমাকে বলেছে?”

আরিফ হাসলো। তাচ্ছিল্যের হাসি। “ওর বুঝ হয়েছে তাই ও আর আমার সাথে কথা বলবে না। শুক্রবারে ও আসলো না? তখন থেকেই তো আমাদের ঝামেলা শুরু। ও আমাকে তৌহিদাকে বিয়ে করার জন্য বোঝানো শুরু করলো? আমি বারবার মেসেজ দিয়েছি সেদিনই, জানতে চেয়েছি সমস্যা কি? বলেনি। দুইটা আড়াইটার দিকে কলও করেছি বল কেনো বিয়ে করতে চাস না? বলেনি। সেই রাতেই ওকে সাড়ে চারটার দিকে জোর করে ছাদে নিয়ে যাই। ক্যান ইউ বিলিভ বারবার জিজ্ঞাসা করেছি, বলেনি। শেষে আমি ওর পা ধরেছি বল আমাকে সমস্যা কি? আই লাভ ইউ, আমি তোকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করতে পারবো না। আমার সুন্দর একটা সংসার করার ইচ্ছে, সেটা তোকে না পেলে সম্ভব না। আমি আমার বউয়ের জায়গায় তুই ছাড়া অন্য কাউকে বসাতে পারবো না। যেই সমস্যা হোক আমি সমাধান করবো। যেটাই হোক আমি আছি তোর সাথে। বলেনি।

পরেরদিন সারা সকাল, দুপুর কলের উপর কল করেছি, মেসেজের উপর মেসেজ দিয়েছি। জবাব পাইনি। বাতিঘরে গিয়ে শেষপর্যন্ত গান দেখিয়ে ভয়ও দেখিয়েছি। লাভ হলো না। ওর ইমোশন ওর আইডি, পেজের পাসওয়ার্ড পাল্টে দিয়েছি। যাতে আমাকে পেজ, আইডির জন্য হলেও বলে যে সমস্যা কোথায়। বলেনি। উল্টো গে লিখে আমার আইডি থেকে পোস্ট করলো। তোর শ্বশুরবাড়ির মানুষজনকেও রাখলো। শাওন ভাই কল না দিলে আমি তখনও দেখতাম না। তোর দূরসম্পর্কের দেবর একটা আমার সাথে, সেইম ব্যুরোতে। ও পুরো ব্যুরোতে জানিয়ে দিলো। এসআই আমাকে বলে আমার নাকি মেডিকেল ট্রিটমেন্ট দরকার। আমার সমস্যা থাকলে তো আমাকে সিআইডিতে রাখা যাবে না। আমাকে চেক করা হবে। যদি এমন কিছু পায় সিআইডি থেকে বহিষ্কার করা হবে।

আমার মেজাজ এতো ভালো না, আমি এত ভালো মানুষ না। কোনো কারণ ছাড়া ব্রেকআপ করে ফেলবে। উল্টাপাল্টা লিখে পোস্ট করবে। আর আমি গুড বয়? যদিও মানুষের মেয়েকে মারা আমার ঠিক হয়নি। কিন্তু আমার এত রাগ উঠেছিল। রুমঝুমকে দুবার জিজ্ঞাসা করেছি কেনো এমন পোস্ট করেছে। বলেছে তবে শলার ঝাড়ু দিয়ে বাড়ি মারার পর বলেছে। মার খেয়ে তারপর ও আমাকে এতদিনের সব বলেছ। ছোটবেলায় যেভাবে মার খেয়ে আকাম কুকামের কথা স্বীকার করতো ঠিক সেভাবে।

ও মেইনলি আমাকে আমার আব্বুর জন্য বিয়ে করতে চায় না। ও সংসার আমার সাথে না ও আসলে আমার আব্বা, ফুফু, চাচা ওদের সাথে সংসার করবে। তাই আমাকে ও বিয়ে করতে চায় না। আমার আব্বু খারাপ, আমার আব্বু খালুকে কথা শোনায়। রুমঝুম এইসব ন্যাকামি না করে যদি আমাকে আগেই ইনফর্ম করতো আব্বু এমন করে, তাহলে হয়তোবা অনেক আগেই আমি সব ঠিক করার চেষ্টা করতাম।

আমার মাথায় এটা আসেনি রুমঝুমকে আমি নিজের সাথে ফ্রি করতে পারিনি। ওর আমার প্রতি জাস্ট একটা মোহ ছিল। আর কিছুই না। ভালোবাসা, টালোবাসা কিছুই না। ভোকাস। আসলেই ভোকাস। রিলেশনে আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকা লাগে। আমি ওর সাথে সেই বন্ডিং বিল্ড করতে পারিনি। আম্মু ওকে বুঝিয়েছে আমাকে বিয়েতে রাজি করানোর জন্য। ও তাই সেই চেষ্টা করেছে। অনেক ভালো। আমি এই শুক্রবারে তৌহিদাকে বিয়ে করবো। যদি সত্যিই ভালোবাসতো তাহলে কি পারতো আমাকে আরেকটা মেয়েকে বিয়ে করার জন্য বলতে? আমি এখন তৌহিদাকেই বিয়ে করবো।”

“ভাইয়া রাগ করে সিদ্ধান্ত নিও না।”

“আমি রেগে নেই। একটুও রেগে নেই। আমার দোষ আমি এই বাপের ছেলে। আমার দোষ আমি ওকে ভালোবেসেছি। এটাই। আর কিছুই না। ওকে খালামণি ভালো পরিবারের ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিবে। দিক। মেয়ের সুখ কে না চায়?”

ইসরাত চোখে পানি আসে। আরিফ উঠে দাঁড়ায়। ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার খুলে ঘড়ির বক্স, বেল্ট, আলমারি খুলে কয়েকটা পাঞ্জাবি, শার্ট বের। ইসরাত বলে,

“কি করছো?”

আরিফ একটা ব্যাগে সব ঢুকালো। ব্যাগটা ইসরাতের হাতে দিয়ে বলে,

“তোর খালাতো বোনকে দিয়ে দিস। ও লুকিয়ে টাকা জমিয়ে এইসব গিফট দিতো সময় পেলেই। আর বলিস ওর পেট থেকে কথা বের করার জন্য যে ওকে আমি মেরেছি ও যাতে আমাকে ব্যুরোতে এসে সবার সামনে দুটো থাপ্পড় দিয়ে যায়। আমার মান সম্মান ওখানে যা ছিল তা তো এমনিতেই নেই, আর থাকাও লাগবে না। আমার আর সিআইডিতেও থাকা হবে না। ভালোবাসার ভালোই মূল্য দিলাম।”

ইসরাত আরিফকে জড়িয়ে ধরে। কেঁদে দেয়।

“তোমার কষ্ট হচ্ছে না ভাইয়া?”

আরিফ হো হো করে হাসে। “কিসের কষ্ট পাবো? ধূর। আমি তো মানুষকে কষ্ট দিবো। আমার কি কষ্ট আছে নাকি?”

“আমি রুমঝুমের সাথে কথা বলবো।”

“তুই বলবি না। এই ব্যাপারে আর কেউ কোনো কথা তুলবে না। আমি শুক্রবারে তৌহিদাকে বিয়ে করবো।”

“ভুল করছো ভাইয়া। রুমঝুমকে তুমি ভুলবে পারবে?”

“ওকে ভুলে আমি ভালোভাবে সংসার করেও দেখাবো। দেখাবো মোঃ আরিফ হাসান হাসবেন্ড হিসেবে বেস্ট। এত ভয় না সবার? আমি বেস্ট হাসবেন্ড হয়ে দেখাবো।”

“ভাইয়া জেদ করো না।”

“রুমঝুম যদি আমার সাথে থাকতো, রুমঝুম যদি শুরু থেকেই আমাকে সব বলতো তাহলে হাজারটা মানুষের কথা উপেক্ষা করে আমি সুন্দর একটা সংসার করে দেখিয়ে দিতাম। শ্লা ছয় বছর অযথাই ইফোর্ট দিলাম। এখন সব হারাবো। পুরো মুখে জুতা মেরে দিলো। আমি তৌহিদাকে বিয়েও করবো, আমি তৌহিদার সাথে সংসারও করবো, আমি ভালো স্বামী হয়েও দেখাবো। ফিকশনাল ম্যান হয়ে দেখাবো আমি। আমি আমার বাপের মতো হবো না? দেখাবো আমি। আর আমার বাপকেও দেখে নিবো।

চলমান…

(হ্যাপি রিডিং)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here