#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_২৭
#সমৃদ্ধি_রিধী
নওশাদ কলেজ থেকে সরাসরি পুনমদের বাসায় এসেছে। পুনম ঠান্ডা পানির গ্লাস নিয়ে রুমে আসে। নওশাদের হাতে দেয়। নওশাদ গ্লাস হাতে নিয়ে ভ্রু নাচায়। পুনম চোখ সরিয়ে ফেলে। নওশাদ পানি খেয়ে খালি গ্লাস পুনমের হাতে দিয়ে বলে,
“চলো চলে যাই। রাতে থাকতে হবে না।”
“আমি তো ভাইয়াদেরকে সকালে বলেছি আপনি আসবেন। বড় ভাই তাই অফিস করে চলে আসবে, ছোট ভাইয়াও তাড়াতাড়ি চলে আসবে বলেছে।”
“থাকতেই হবে?”
“হুম।”
নওশাদ উঠে দাঁড়ায়। আড়মোড়া ভাঙে। পুনম চেয়ার টেনে বসে। বলে,
“বেশি টায়ার্ড?”
“না। আজকে তো ক্লাসই নেইনি।”
“তো কি করেছেন?”
“কোচিং ক্লাসে পরীক্ষা নিয়েছি, ক্লাসে বুঝিয়েছি। এভাবেই দিন পার করে ফেললাম।”
“কামচোর খালি আমি না?”
“ডেফিনিটলি গাধা।”
নওশাদের শার্টের বোতাম খুলে বলে, “ড্রেস আছে না আমার?”
“হুম আছে।”
“দাও।”
পুনমের আলমারিতে নওশাদের এক সেট টিশার্ট, টাউজার আছে। ওটা বের করে দিলো। নওশাদ পুনমের তোয়ালে আর টিশার্ট, টাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। পুনম রুম থেকে বের হয়ে যায়। কিচেনে গিয়ে চায়ের পানি বসায়। নিশা তখন কিচেনে আসে।
“কি করছো?”
পুনম চা পাতার বৈয়াম হাতে নিয়ে বলে, “চা বানাই।”
নিশা অবাক হয়ে বলে, “পারো?”
“হুম।”
“নওশাদ শিখিয়েছে?”
“হুম।’
“তোমার না রান্না করতে ঘেন্না লাগে?”
পুনম বড় করে শ্বাস ফেলে বলে, “হ্যাঁ লাগে তো? তোমাদের জন্য রান্না করতে ঘেন্না লাগে, কিন্তু ওর জন্য রান্না করতে ঘেন্না লাগে না৷ হয়েছে?”
নিশা ছোট করে শ্বাস ফেলে বলে, “আমি বানিয়ে দেই?”
“তেল দিতে হবে না। আমি ভুলিনি তোমরা আমাকে জোর করে দিয়ে দিয়েছো।”
“তুমি কি আজীবন এটা বলেই যাবে? নওশাদ তো খারাপ না যে কষ্টে আছো!”
“বলেছি না রাজপ্রাসাদে থাকলেও আমি এটা সবসময় বলবো।”
“তোমাকে আম্মা ডাকে। নওশাদকে চা দিয়ে আম্মার কাছে যেও।”
“কেনো তার আদরের বউ থাকতে মেয়েকে কি দরকার?”
“একটু বউয়ের নামে বদনাম করবে। গিয়ে শুনে আসো তোমার বড় ভাইকে কিভাবে বড় ভাবি প্যারা দেয়?”
“এটা শুনতে পেলে তো হতোই। আমার মনের আশা পূরণ হতো। কিন্তু এইসব শোনার ভাগ্য নেই। চোখের সামনে তো দেখি মা, ছেলে কিভাবে বউকে সংসারের জাতাঁকলে পিষে। বউও হাসিমুখে সব মেনে নেয় তাই বউ ভালো।”
“তোমার ভাতিজাকে একটু তোমার সাথে রাখো। ঘুমাবো আমি একটু। শরীর ভালো লাগছে না।”
“তোমার স্বামীকে কল দাও। ছেলেকে রাখুক একটু। বাপ হওয়ার মতো কি কাজ করে টো টো করে ঘুরে বেড়ানো ছাড়া?”
“কাজই করে। অযথা তো ঘুরে না।”
“ঢং, কাজ করে না কি করে আমার জানা আছে৷ আমার ভাই আমি চিনবো না? তো তোমার শ্বাশুড়ির কাছে রেখে আসো। এত নাতি,নাতনি লাগবে বলে মাথা খেয়েছে, এখন নাতি হওয়ার পর পালতে পারছে না?”
“আম্মাকে অর্ক জ্বালায় অনেক। আম্মার আবার কোমরেও ব্যথা।”
“ওইটা তোমার ছাও দেখে কোমরে ব্যথা। আমি একটা পয়দা করে আম্মুর হাতে দেই? দেখবে কোমর ব্যাথা, মাথা ব্যথা কিছু নাই।”
নিশা কপাল কুঁচকে বলে, “তোমার বড় ভাই, মাকে নিয়ে এভাবে কথা বলছো কেনো? বেয়াদবি হয়ে যাচ্ছে পুনম।”
পুনম নিশার দিকে ফিরে বলে, “তোমার এত গায়ে লাগে কেনো? মিথ্যা বলেছি? আম্মুর হিসেব বাদ দিলাম। সে আদি চিরায়ত শ্বাশুড়ি। কিন্তু ভাইয়া? ভাইয়া তো মনে হয় না বিয়ের পর একদিনও গ্লাসে পানি ঢেলে খেয়েছে, না তোমাকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়েছে খাওয়ার জন্য। তুমি জানো আমাকে ও কত হেল্প করে? আর তুমি অসুস্থ হয়ে পড়লেও তো তোমাকে হেল্প করে না। না মা করে, না ছেলে করে। তোমাদের ওই লাভ ম্যারেজ থেকে আমার অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ হাজার গুণে ভালো।”
“তুমি সুখী হলেই হবে। তোমার বড় ভাইয়া এটাই চেয়েছে।”
পুনম বিরক্ত হয়ে বলে, “আবার জামাইয়ের গুণগান করা শুরু করেছে।”
“ওইযে লাভ ম্যারেজের গুণাবলি? শত হোক তোমার ভাইকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি। অর্ককে নিয়ে যেও।”
নিশা চলে গেল। পুনম বিরক্ত বোধ করে ভীষণ। লাভ ম্যারেজগুলোর এই হাল কেনো? টক্সিক লাগে পুনমের কাছে। লাভ ম্যারেজে মুখে মুখেই লাভ, কামে কোনো লাভ টাভ নেই।
পুনম চা বানিয়ে অর্ককে নিয়ে রুমে যায়। নওশাদের হাতে চায়ের কাপ দেয়। অর্ক নওশাদকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে ফেলে। নওশাদ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে,
“ও কি শান্ত সবসময়ই?”
“মোটামুটি শান্তই বলা যায়।”
পুনম অর্কর দুগালে ফটাফট চুমু খায়। অর্ক পুনমের গালে হাত দিয়ে বলে, “যাইও না।”
পুনম আহ্লাদ জড়িয়ে ধরে বলে, “যাবো না।”
“না, যায় না।”
“তোমার সাথে থাকতে পছন্দ করে।” নওশাদ বলে।
পুনম ভাব নিয়ে বলে, “আমার সাথে থাকতে সবাই পছন্দ করে।”
“ট্রু।” নওশাদ চায়ের কাপ রেখে বলে।
পুনম চোখ বড় বড় করে তাকায়। নওশাদ হাসে। পুনম বলে, “আমাকে সকালে আম্মু একটা কথা বলেছে।”
“কি?”
“বলছিলো আপনাকে সব কথা না বলতে।”
“মানে?”
“মানে আমার গোপন সব কথা আপনাকে বলতে নিষেধ করেছে। স্বামীকে সব বললে নাকি স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক ভালো থাকে না।”
“তুমি আবার এটা আমাকে বলছো কেনো গাধা? তোমাকে তো বলেছেই আমাকে সব কথা না বলতে।”
“বলে দিলাম। পেটে রেখে কি করতাম?”
নওশাদ বিড়বিড় করে ‘গাধা’ বলে। মুখে জোরে বলে,
“কালকের শাড়িটা কোথায়?”
“কোনটা?”
“যেটা পড়ে ছবি তুলেছো।”
“আছে তো। কেনো?”
“আবার একটু পড়িও।”
পুনমের চ্যাটের কথা মনে পড়ে। অর্ককে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“কেনো?”
“সুন্দর লাগছিলো। পড়ো আবার প্লিজ।”
“আজকেই?”
“হুম।”
“রাতে।”
“ঠিক আছে।”
নওশাদ হাসে। পুনম সেই হাসি দেখে ভীষণ লজ্জায় পড়ে। অর্ককে রুম থেকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। প্রতীক, প্রিতম আসলে নওশাদ ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসে। তখন পুনম আবার রুমে চলে আসে। নওশাদ মনে মনে হাসে। পুনমের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিলো পুনম নওশাদের সাথে লুকোচুরি খেলছে। খাওয়ার টেবিলে মুখোমুখি খেতে বসে। নওশাদ শয়তানি করে খাওয়ার মাঝে পুনমকে চোখ টিপ দেয়। পুনমের হেঁচকি উঠে যায়। পুনমকে নওশাদ শেষমেশ বাগে পায় বারোটার পরে।
____________________
পুনম গতকালকের শাড়িটা পড়ে বিছানায় এসে বসে। নওশাদ হাসনাহেনার সাথে কথা বলতে বলতে বারান্দা থেকে রুমে আসে। পুনমের চোখে চোখ পড়তেই নওশাদ বলে,
“আইচ্ছা কাইল্লা কল দিমু।”
নওশাদ কেটে দেয়। মোবাইল রেখে পুনমের পাশে এসে বসে। পুনমের হাতে হাত রেখে বলে,
“শাড়ি পড়লে তোমাকে সুন্দর লাগে।”
“আপনার ভালো লাগে?”
“তোমাকে শাড়ি পরিহিত অবস্থায় দেখতে ভালো লাগে।”
পুনম ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বসে থাকে। নওশাদ বলে,
“এপ্রেশিয়েট করবো?”
“ইচ্ছে।”
“নায়কদের মতো?”
“ইচ্ছে।”
নওশাদ মিটিমিটি হেসে বলে, “এই মুভির নায়কের মতো?”
পুনম চোখ বড় বড় তাকায়। আবারও কালকের মুভির নাম বললো! নওশাদ আবারও বলে,
“নাকি আরো রোমান্টিক মুভির নামের মতো?”
“ওগুলো রোমান্টিক মুভি না। ওগুলো ডার্ক রোমান্টিক মুভি। আমি ডার্ক রোমান্টিক মুভি ঘেন্না করি।”
“কেনো? নায়কদের বডি না কড়া? আর আমি আনরোমান্টিক? আমি তো রোমান্টিক হওয়ার চেষ্টা করছি।”
“লাগবে না।”
নওশাদ পূর্বের দুটো মুভির নাম নিয়ে বলে, “আমি এই মুভি দুটোর নায়কদের মতো রোমান্টিক হয়ে দেখাবো।”
“ছিহ!”
“তাহলে অন্য কোনো কিছু মুভির নায়কের মতো হবো? কড়া কড়া মুভির নায়ক?”
“কিসব বলছেন? আপনার লজ্জা লাগছে না?”
“না। লাগছে না। তুমি তো লজ্জা লজ্জা মুভি পছন্দ করো। আমি তোমাকে কিছু লজ্জা লজ্জা মুভির নাম বলি যাদের নায়ক অনেক কড়া।”
“চুউউউপ।” পুনম চাপা স্বরে চেঁচিয়ে উঠে।
“না, তোমাকে আমি আরো মুভির নাম বলি শোনো।”
পুনম কান চেপে ধরে। নওশাদ ওর হাত টেনে পুনমের দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে ফটাফট আরো তিন, চারটা মুভির নাম বললো। ওগুলো মুভি না ছাই! পুনমের মুখ লাল হয়ে গিয়েছে। ছটফট করে বলে,
“চুপ থাকবেন কিনা বলুন?”
“আরো নাম জানি। বলি শুনো না?”
“আপনি না মুভি দেখেন না? কি আজব! এইসব খাচ্চোর মার্কা মুভির নাম তো ঠিকই জানেন। এগুলো কোনো সুস্থ মানুষ দেখে না। এগুলো তো মুভি না, এগুলো তো…”
নওশাদ হাসে। “ওগুলো কি?”
“ছিহ ছিহ আমি আপনার মতো বেলাজ না। ছিহ ছিহ। স্টকে সব বিশ্রি বিশ্রি মুভির নাম। এজন্যই তো পুরুষ মানুষ ঘেন্না করি।”
নওশাদ পুনমকে জড়িয়ে ধরে বলে, “আচ্ছা আমি পুরুষ মানুষ, আমার ছুঁকছুঁক স্বভাব। তাই বাজে বাজে মুভির নাম জানি। কিন্তু তুমি কি করে জানো এইসব মুভির নাম? শোনা মাত্রই চিনে ফেলছো? নিশ্চয়ই কাহিনিও জানো?”
পুনম থতমত খায়। নওশাদ বলে, “বলো? তুমি কি করে জানো?”
পুনম আমতাআমতা করতে থাকে। নওশাদ পুনমের চোয়াল আলতো করে ধরে বলে,
“স্বীকার করো গাধা। তুমি যতটা ইনোসেন্ট হওয়ার ভাব দেখাও তুমি ততটা ইনোসেন্ট নও।”
“আমি ইনোসেন্টই। আপনার মতো ভোগলামি করি না।”
নওশাদ পুনমের গালে শক্তপোক্ত চুমু খায়। পুনম বলে,
“আপনি খুব বাজে বাজে মুভির নাম জানেন। ছিহ!”
“পুরুষ মানুষ কিনা!”
পুনম দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলে। “কি লজ্জা! কি লজ্জা!”
নওশাদ পুনমের মুখ থেকে হাত সরিয়ে ফেলে। গালে গাল ঘষে বলে, “কি গাধা এই মেয়ে।”
নওশাদ আরো আরো অনেক লজ্জা লজ্জা কথা বলে। পুনম বড় বড় করে শ্বাস ফেলে। ছটফট করতে করতে বলে, “আপনি প্লিজ এইসব বাজে বাজে কথা আর বলবেন না।”
নওশাদ মজা করে বলে, “যদি বলি কি করবে? লজ্জায় লাল হয়ে যাবে? আমার ভালো লাগে তুমি লাল হয়ে গেলে।”
পুনম ছটফট করা থামিয়ে দেয়। অনুরোধ করে বলে,
“প্লিজ বলবেন না। আমি লজ্জা পাই আপনার সফ্ট রোমান্টিক ভয়েসে, আপনার কেয়ারিং এ, আপনার সফ্ট রোমান্সে। এইসব কন্ট্রোললেস কথায় লজ্জা পাই না আমি। একটুও পাই না। আমার অস্বস্তিবোধ হয়। একটুও নিতে পারি না। এতটাই অস্বস্তি লাগে যে শ্বাস আটকে আসে।”
নওশাদ পুনমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। পুনম নওশাদের হাত ওর চোখের সামনে নিয়ে বলে,
“দেখুন আমার চোখে পানি চলে এসেছে। সহ্য হয় না এগুলো আমার। আপনি যেমন সফ্ট, তেমনই থাকুন। এত কড়া হতে হবে না। আপনার সাথেও এইসব যায় না, আমিও নিতে পারি না। প্রমিস করছি গতকালকের মতো মজা আর করবো না।”
নওশাদ পুনমের চোখ মুছে দেয়। গালে চুমু খেয়ে বলে,
“আর করবো না এইসব প্রমিস। তোমাকে জ্বালাতে গুগল থেকে এডাল্ট মুভির নাম সার্চ দিয়ে সবগুলোর জাস্ট ট্রেইলার দেখেছিলাম কালরাতে। আমি মুভিগুলো দেখিওনি। ভালো ভালো মুভিই দেখিনি, ওগুলো দেখবো?”
পুনম নওশাদের হাত জড়িয়ে ধরে। “আমি ডার্ক রোমান্স, এইসব ওয়াইল্ড, বোল্ড জিনিসপত্র পছন্দ করি না। গা গুলায়। তাই ওইসব মুভি দেখিনি। কিন্তু আপনি যেসব মুভির নাম বলেছেন সবগুলোরই কাহিনি জানি।”
“কি করে?”
“মেঘলা, সিরাত ডার্ক রোমান্স পছন্দ করে অনেক। ওরা ওইসব মুভিগুলো দেখে, ডার্ক রোমান্টিক গল্প পড়ে, দ্যান আমার সামনেই দুজনে মিলে আলোচনা করে। আমি শুনেছি, ওভাবেই জানি।”
নওশাদ পুনমের গালে চুমু খায়। পুনম নওশাদকে জড়িয়ে ধরে। “এমনই থাকুন। কড়া ফড়া সব ফাউল।”
নওশাদ পুনমের গালে গাল ঘষে।
________________________
মাঝে কেটে গিয়েছে দেড়সপ্তাহেরও বেশি সময়। কলিংবেল বেজে উঠলো। পুনম ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির বোতল বের করে বড় বড় পা ফেলে ড্রয়িংরুমে যায়। সোফার উপর থেকে ওড়না নিয়ে গায়ে জড়িয়ে দরজা খুলে।
“আসসালামু আলাইকুম।”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
নওশাদ জুতা খুলে জুতার বক্সের ভিতর জুতা রাখে। ফ্যান ছেড়ে বলে,
“এক গ্লাস পানি দিও তো।”
পুনম কিচেনে চলে যায়। নওশাদ ওর অফিস ব্যাগ সোফায় রেখে শার্টের হাত গুটিয়ে বেসিনে হাত মুখ ধোঁয়। ভেজা হাতেই চুলে হাত গলিয়ে ফের সোফায় বসে। পুনম লেবু, চিনি দিয়ে শরবত বানিয়ে নিয়ে আসে। নওশাদের দিকে শরবতের গ্লাস বাড়িয়ে দেয়। নওশাদ তখনই গ্লাস নেয় না, পুনমের ওড়না দিয়ে মুখ, হাত মুছে তারপর গ্লাস নেয়। একটানে পুরো গ্লাস খালি করে ফেলে। সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলে,
“যে গরম পড়েছে আজকে!”
পুনম নওশাদের চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, “বেশি ক্লান্ত লাগছে?”
“কিছুটা।”
“গোসল করবেন?”
“না করলে পাগল হয়ে যাবো।”
পুনম খালি গ্লাস নিয়ে কিচেনের দিকে পা বাড়িয়ে বলে,
“আচ্ছা যান।”
নওশাদ বড় করে শ্বাস ফেলে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে রুমের দিকে পা বাড়ায়। পুনমও মিনিটের মধ্যে রুমে আসে। ওয়ারড্রবে নওশাদের ড্রয়ার খুলে নওশাদের টিশার্ট, টাউজার বের করে। বারান্দার দরজা বন্ধ করতে গিয়ে দেখে নওশাদ তোয়ালে নেয়নি। পুনম নওশাদের তোয়ালে নিয়েও বিছানার উপর রাখে। নওশাদ ওয়াশরুমের দরজা খুলে পুনমকে ডাক দেয়। পুনমকে আর কিছু বলতে হলো না। ও নওশাদের হাতে তোয়ালে আর টাউজার দেয়। নওশাদ বের হতেই পুনম বলে,
“আপনার জন্য একটা দুঃখজনক খবর আছে।”
নওশাদ বিছানায় বসে চুল মুছতে মুছতে বলে, “কি?”
পুনম নওশাদের দিকে এগিয়ে আসে। নওশাদের হাত থেকে তোয়ালে নিয়ে ওর চুল মুছে দিতে দিতে বলে,
“আমার কিন্তু রেজাল্ট দিয়েছে।”
“কেমন এসেছে রেজাল্ট?”
“আমার সাথে বসে একটানা বিবাহ মুভি দেখার মতো ভালো রেজাল্ট এসেছে।”
নওশাদ পুনমের হাত ধরে হেঁচকা টান মারে। একগুচ্ছ চুল পুনমের মুখের সামনে এসে পড়ে। নওশাদ ওগুলোকে সন্তপর্ণে কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে বলে,
“আমাকে জ্বালাতে খুব মজা না?”
পুনম হাসি আটকে রেখে উপর নিচে মাথা নাড়ে। নওশাদ পুনমকে ছেড়ে দেয়। বিড়বিড়িয়ে বলে,
“ফাজিল একটা।”
পুনম আঙুল তাক করে বলে, “দেখতে হবে কিন্তু।”
“সেটা দেখা যাবে। সোফার উপর থেকে আমার ব্যাগটা নিয়ে আসো তো।”
পুনম নিয়ে আসে। নওশাদ ব্যাগের চেইন খুলতে খুলতে বলে, “খাতা, কলম আনো তো।”
“বেতন পেয়েছেন?”
“জ্বি।”
পুনম কথা মতো তাই আনলো। নওশাদ বলে,
“লিখো বাসা ভাড়া সাড়ে বারো হাজার, পানি বিল দুইশো ষাট, ইলেক্ট্রনিক বিল সাতশো পঞ্চাশ, আর গ্যাস বিল এগারোশো আশি।”
পুনম লিখলো। নওশাদ যোগ করে বলে, “চৌদ্দ হাজার ছয়শো নব্বই না?”
পুনম মাথা উপরে নিচে নাড়ে। নওশাদ ব্যাগের ভিতর থেকে সাড়ে চৌদ্দ হাজার টাকা বের করে। মানিব্যাগ থেকে দুটো একশো টাকার নোট বের করে। পুনমের দিকে তাকিয়ে বলে,
“একশো টাকা খুচরো হবে?”
পুনম নিজের পার্স নিয়ে আসে। দেখে বলে, “হুম, হবে।”
“দাও।”
পুনম নওশাদের দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনি আমাকে বরাবর পনেরো হাজার টাকা দিন।”
“কেনো?”
“দিন না!”
নওশাদ আরো পাঁচশো টাকা বের করে মোট পনেরো হাজার টাকা পুনমের হাতে দিলো। পুনম হাত বাড়িয়ে বলে,
“খাম দিন।”
নওশাদ ব্যাগ থেকে খাম বের করে দিলো। পুনম পাঁচশো টাকা পার্সে রেখে একশো নব্বই টাকা বের করে। খামে চৌদ্দ হাজার পাঁচশো, সাথে একশো নব্বই টাকা রাখে। খামের মুখে ভালোমতো আটকে নওশাদের দিকে টাকা ভর্তি খাম বাড়িয়ে দেয়।
নওশাদ চোখ ছোট ছোট করে পুনমের দিকে তাকায়। পুনম ভ্রু নাচিয়ে বলে, “কি?”
নওশাদ মানিব্যাগে একশো টাকার নোটগুলো রেখে বলে, “ইনকাম হ্যাঁ?”
“জ্বি।”
“জবা আপাকে কালকে দিয়ে দিও।”
পুনম মাথা নাড়ে। নওশাদ বলে, “ওয়াইফাই বিল পাঁচশো, ময়লাওয়ালার বিল দুইশো। মোট সাতশো।”
পুনম হাত বাড়িয়ে বলে, “একহাজার টাকা দিন।”
নওশাদ ঠোঁট কামড়ে পুনমের দিকে তাকায়। পুনম তাগাদা দিয়ে বলে,
“এভাবে তাকিয়ে লাভ নেই। এইসব গৃহিণীদের ইনকাম।”
নওশাদ দিলো খুচরো একহাজার টাকা। পুনম তিনশো টাকা আলাদা করে রেখে দেয়। বাকি টাকা পার্সে রাখে ওয়াইফাই বিল, ময়লাওয়ালার বিল দেওয়ার জন্য।
“লিস্ট বানাও। রান্নাঘরের কি লাগবে?”
পুনম মাথা দুলাায়। “মুদি বাজার সবই লাগবে।”
“লিখো, লিখো। আমি কিচেনের কাজ থেকে পদত্যাগ করেছি।”
পুনম সময় নিয়ে ভেবে ভেবে লম্বা লিস্ট বানালো।
কলমের ঢাকনা আটকে বলে,
“মুদি, সবজি, মাছ, মাংস সব লিস্টে রেখেছি। কালকেই বাজার করে আনবেন।”
“কালকেই শুক্রবার, সো কালকেই যাবো।”
পুনম লিস্টে চোখ বুলিয়ে বলে, “আর কিছু মনে হয় না বাকি আছে।”
নওশাদ একটু ভেবে বলে, “এ ফোর সাইজ পেপার, এক দিস্তা খাতা, মেটাডোর অল টাইম কলম, লাল কলম, লাল নীল কালো মার্কারও লিখে রাখো তো। কিনা লাগবে।”
পুনম বাজারের কাগজ ছিঁড়ে পাশে রাখলো। আরেকটা কাগল ছিঁড়ে তাতে এগুলো লিখলো। লিখতে লিখতে বলে,
“পিন, গ্লু, হাইলাইটার লাগবে আমার।”
“যা যা লাগবে লিখে রাখো।”
পুনম লিখলো। নওশাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আর কিছু?”
“আপাতত না।”
“আরেহ সাবান, শ্যাম্পু লিখতে ভুলে গিয়েছি।”
“ওহ হ্যাঁ লিখো।”
লিখে বলে, “আর মনে হয় না কিছু লিখা বাকি আছে বলে।”
“আচ্ছা পরে লাগলে দেখবো। আপাতত কালকে এগুলোই কিনবো।”
“হুম।”
“তোমার টিভি এই মাসে কিনবে?”
পুনম উচ্ছ্বাস নিয়ে বলে, “হুম, হুম।”
“আচ্ছা দেখি শনিবারে কিনবো।”
“ওকে।”
“তেল বাড়িয়ে কিনবো। যাতে তুমি পরে কিপ্টামি না করো।”
“এটাকে কিপ্টা বলে না, এটাকে সঞ্চয়ী বলে।”
“ওরে বাবারে।”
“এখন আপনি আমার সাথে বিবাহ মুভি দেখবেন।”
“এখন না। পরে।”
পুনম গো ধরে বলে, “পরে কখন?”
“ডিনার করে।”
“দেরী হয়ে যাবে।”
“রান্না হয়েছে তোমার?”
“কখন শেষ।”
“তাহলে বই নিয়ে এসো। পড়ে নাও, আমারও কাজ আছে। ডিনার করে দেখবো।”
“ডিনারের পর আপনি ঘুমিয়ে পড়বেন ইচ্ছে করে।”
“বৃহস্পতিবার রাতে আমি এত জলদি ঘুমাই না, সেটা তুমি জানো।”
“সত্যি তো?”
“তিন সত্যি।”
নওশাদ টেবিলের গিয়ে বসে। পুনম বিছানায় বই নিয়ে বসে। ভালো ভালো রেজাল্ট করে নওশাদকে নাকানিচুবানি খাওয়ানোই এখন পুনমের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
_______________
রাতে খাওয়ার পর নওশাদ আর কোনো উছিলা দিতে পারে নি। পুনম মোবাইলে বিবাহ মুভি চালিয়ে শুয়ে আছে। নওশাদ লাইট অফ করে পুনমের পাশে গিয়ে শোয়। পুনম বলে,
“ওইদিন এই পর্যন্ত না দেখেছিলাম?”
“হুম।”
পুনম নওশাদের বুকে মাথা রেখে নওশাদের পেটের উপর মোবাইল ধরে রেখে বলে, “এভাবে মুভি দেখি?”
“হুম।”
“আপনি এভাবে ঘুমিয়ে পড়বেন না তো?”
“না, ঘুমাবো না।”
“শিওর তো?”
“একশো ভাগ।”
দুজনে ওভাবে মুভিটা দেখে। নওশাদ কিছুক্ষণ পর পর বিড়বিড় করে বলে, “কি বাজে মুভি! একটুও ভালো প্লট না।”
“আপনার মাথা আমার মণ্ডু।”
ওভাবেই পুরোটা মুভি দেখে। মুভি শেষ হতেই পুনম মোবাইল একপাশে রেখে দেয়। নওশাদের বুকে হাত রাখে। হাতের উপর থুতনি ঠেকিয়ে বলে,
“কেমন? ভালো না?”
“না।”
“মুভির কাহিনি?”
“বিশ্রি।”
“মুভির কাহিনি ভালোই, স্বীকার করুন আপনি আসলে প্রেম-পুনম নামেই জেলাস ফিল করেন।”
নওশাদ পুনমকে উল্টো করে ঘুরিয়ে ফেলে। পিছন থেকে পেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরে। পুনম আকস্মিক এহেন কাজে হকচকিয়ে যায়। নওশাদ পুনমের কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে বলে,
“তোমার ইচ্ছে অনুযায়ী দেখলাম তো পুরো বিবাহ মুভি। এবার আমার ইচ্ছে পূরণ করো।”
পুনম ঢোক গিলে। “কি ইচ্ছে?”
নওশাদ পুনমের আঙুলের ভাঁজে আঙুল রেখে পুনমকে নিজের দিকে ফিরায়। গালে গাল ঘষে, পুনমের দিকে গাল বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
“বিবাহ মুভির এপিসোড মোট চৌদ্দটা। এখন আমার গালে চৌদ্দ দ্বিগুণে আটাশটা চুমু খাও।”
পুনম পিটপিট করে তাকিয়ে আছে। নওশাদ পুনমের গাল আলতো করে চেপে ধরে বলে,
“বেশি কঠিন কাজ দিলাম নাকি? এমন বিড়ালের মতো তাকিয়ে আছো কেনো?”
পুনম নিজের হাত ছাড়িয়ে একহাতে নওশাদের গলা জড়িয়ে ধরে। অন্য হাত নওশাদের গালে রাখে। টপাটপ পাঁচ ছয়টা চুমু খেয়ে বলে,
“এটা কি এমন কঠিন কাজ? আমি তো এমন করে আপনার গালে সারারাত চুমু খেতে পারবো।”
নওশাদ বাঁকা হাসলো। পুনমের হাতে টান দিয়ে পুনমকে চারপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে বাহুডোরে বন্দী বানিয়ে ফেললো। পুনমের কপালে কপাল ঠেকিয়ে, পুনমের হাত নিজের বুকের বা পাশে রেখে ধীমে গলায় বলে,
“বউ আমার ভীষণ লাজুক ভেবে অল্প চুমুতেই কাজ সারিয়ে ফেলবো ভেবেছিলাম। যেহেতু লজ্জা কেটে যাচ্ছে এবং প্রায় কেটেই গিয়েছে সেহেতু এখন খাও সারারাত চুমু। কোনো থামাথামি করা যাবে না। থামলেই আবার রি-স্টার্ট। কালকে শুক্রবার, কলেজ বন্ধ, তাড়াতাড়ি ঘুমানোর তাড়া নেই, আমার কোনো অসুবিধাও নেই।”
চলমান……
(হ্যাপি রিডিং…)

