#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_২৯
#সমৃদ্ধি_রিধী
নওশাদ পুনমের পছন্দ মতো বড় টিভি কিনেছে। লোক ডেকে ঠিকঠাক করেছে, ডিশের লাইন লাগিয়েছে। কারেন্টের লোক যেতেই নওশাদ দরজা লাগিয়ে পুনমকে ডাক দেয়। পুনম রুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে আসে। নওশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলে,
“আবার আমার টিশার্ট পড়েছো?”
“তাতে আপনার সমস্যা কি?”
পুনমের দিকে রিমোট বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “নাও।”
পুনম টিভি চালু করে। “ওয়াইফাই কানেক্ট করে ফেলেছেন?”
নওশাদ সোফায় বসে বলে, “দেখছো না?”
পুনম একটা গান চালায়। “May this is called love”
নওশাদ বলে, “এইসব শুনতে টিভি কিনেছো?”
“গানটা সুন্দর।”
নওশাদ টিভির স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকে। একটু পর বলে,
“কথা মতো টিভি কিনে দিয়েছি। তাই বলে সারাদিন টিভির সামনে বসে থাকলে খবর আছে। ফাঁকে ফাঁকে টিভি দেখবে। তোমাকে পড়াশোনাও করতে হবে, মাথায় রেখো।”
পুনম নওশাদের পিছনে দাঁড়িয়ে ওর গলা জড়িয়ে ধরে। নওশাদের গালের সাথে গাল লাগিয়ে বলে,
“আপনি খুব ভালো। আমার সব কথা রাখেন।”
“এখন আমার কথা না শুনলে খবর আছে।”
“আচ্ছা।”
নওশাদ টিভির স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। গানটা শেষ হতেই “Die with a smile” গান চালু হয়। গলা জড়িয়ে ধরে রাখা পুনমের হাতের উপর হাত রেখে নওশাদ বলে,
“দেখো তো সব রোমান্টিক মুভি, রোমান্টিক গান, তাও এত লাজুক কেনো?”
পুনম উত্তর দিলো না। নওশাদের গালে চুমু খেলো। নওশাদ অবাক হয়ে তাকায়। পুনম লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলে,
“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো?”
“হুহ? ঢং না সব?”
পুনম নওশাদের গালের সাথে গাল লাগিয়ে রেখে বলে,
“একটা সত্যি কথা বলবেন?”
“মিথ্যে বলেছি কখন?”
“আপনার বিয়ের দিনের অনুভূতি জানতে চাই।”
নওশাদ ভাবলেশহীন গলায় বলে, “কি আর অনুভূতি?”
“কিছু তো একটা অনুভূতি থাকারই কথা।”
“বিয়ে করবো, এক্সাইটেড ছিলাম।”
“বিয়ের জন্য এক্সাইটেড ছিলেন?”
“জ্বি।”
“নাকি ভোগলামি করার জন্য?”
নওশাদ চোখ রাঙিয়ে পুনমের দিকে তাকালো। পুনম আমতাআমতা করে বলে,
“কেমন অনুভতি ছিল বললেন না তো।”
“যেই অনুভূতিই ছিল না কেনো! বাসরঘরে ঢোকার পর তোমার আলতু ফালতু কথা শুনে মাথা এত গরম হয়েছিল যে..”
“কি করতে মন চাচ্ছিলো?”
“থাপ্পড়ে গাল দুটো লাল বানিয়ে ফেলতে মন চাচ্ছিলো। শুধু বউ দেখে কিছু বলিনি।”
“এইজন্যই তো আমি পুরুষ মানুষ ঘেন্নাআআআআ করি। কিন্তু হাসবেন্ডকে ঘেন্না করি না।”
“পাগল।”
“আচ্ছা আমি যদি এইসব কিছু না করতাম, আমি যদি মন থেকে বিয়ে করতাম, বিয়ের আগে আপনার সাথে একবার কথাও বলতাম আপনি কি করতেন?”
“অবশ্যই একটা ভালো সময় কাটাতাম।”
“জানতাম, জানতাম আমি। আপনি শিওর ভোগলামি করতেন।”
নওশাদ পুনমের হাত ধরে ওকে ঘুরিয়ে নিজের কোলে বসায়। আলতো করে ওর গাল চেপে ধরে বলে,
“কি ভোগলামি করতাম? কি বুঝিয়েছো এটা দিয়ে?”
গাল থেকে নওশাদের হাত সরিয়ে দিয়ে বলে, “এইযে ছোঁয়াছুঁয়ি।”
পুনমকে পেঁচিয়ে ধরে বলে, “করতাম না ছোঁয়াছুঁয়ি। তোমাকে তখন কতটুকু জানতাম? তোমার মন না বুঝেই শরীর ছুঁতাম নাকি?”
নওশাদের গাল টেনে দিয়ে পুনম বলে, “ওরে বাবারে! সিনেমাটিক ডায়ালগ। সিনেমা না দেখেই যেসব ডায়ালগ মারেন, সিনেমা দেখলে না জানি কি হতো!”
পুনমের হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বলে, “সিনেমাটিক ডায়ালগ না। পুরুষ হয়েছি বলে শুধু শরীরই ছোঁবো নাকি? এগুলো জেন্টালম্যান টাইপ কথাবার্তা। আমি লুইচ্চা না।”
পুনম মজা করে বলে, “শুধু একটু ছুঁকছুঁক স্বভাব এই যা।”
নওশাদ পুনমের গাল চেপে ধরে গালে গাল ঘষতেই পুনম হাত ছোঁড়া শুরু করে। “বাজে লোক। গাল জ্বালিয়ে দেয় প্রতিবার আমার।”
“নালিশ করো।”
“কি বলবো? আমার রুমমেট আমার গাল জ্বালিয়ে দেয়? কি লজ্জার কথা।”
নওশাদ পুনমের চুল ঠিকঠাক করে দেয়। “আমার টিশার্ট পড়তে খুব মজা না?”
“অনেক।”
“এগুলো কিন্তু গুলিস্তানের টিশার্ট।”
“তো কি? আমার রুমমেটের টিশার্ট, এটাই যথেষ্ট।”
“মুখে রুমমেট, ফেনীর মধু আর অন্তরে নওশাইদ্দা। জানি তো আমি।”
পুনম হাসে। নওশাদ পুনমের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। পুনম বলে,
“আপনার সাথে বিয়ে না দিয়ে একটা আলতু ফালতু ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলে কি হতো?”
“তোমার পরিবার অবশ্যই তোমার সাথে ভালো কারোই বিয়ে দিতো।”
“বাইরে থেকে ভালো হলেও ভিতর ভালো না হলে?”
“হতো কিছু একটা। আমার বউ হয়েছো খুশি থাকো। আবার অন্য কারো বউ হলে কি হতো সেটা ভাবার কি দরকার?”
“আপনার বউ ভালো না হলে?”
“বলেছিলাম না থাপড়ে ঠিক করতাম?”
“জানা আছে কি করতেন। সব ভাব উপরে উপরে।”
পুনম নওশাদের চুলে হাত গলিয়ে চুল ঠিক করে দেয়। টিভিতে গান বেজে উঠে,
“এখন তো সময় ভালোবাসার, এ দুটি হৃদয় কাছে আসার।”
নওশাদ পুনমের কাঁধের উপর থেকে চুল সরিয়ে দেয়। কানের পিছনে চুল গুঁজে ওর গালে হাত রাখে। একটু এগিয়ে আসতেই পুনম নওশাদের চোখে চোখ রাখে। নওশাদ পুনমের গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে আরেকটু এগিয়ে আসতেই পুনম মাথা দুদিকে নেড়ে নিষেধ করতে চায়। নওশাদ শোনার পাত্র? পুনমের কোমরে হাত রেখে আরো কাছে আনে। পুনম আর নওশাদের চোখে চোখ রাখতে পারে না। চোখ নামিয়ে নেয়। নওশাদ ক্রুর হাসে। পুনম নওশাদের টিশার্ট ধমচে ধরে। পুনমের চুলের ভাজে হাত গলাতেই কলিংবেল বেজে উঠে। পুনম নওশাদের বুকে ধাক্কা দিয়ে লাফিয়ে নওশাদ কোল থেকে নেমে যায়। বড় বড় পা ফেলে রুমে চলে যায়।
নওশাদ টিশার্ট টেনেটুনে উঠে দাঁড়ায়। টিভি বন্ধ করে। বড় করে, লম্বা দুবার শ্বাস ছেড়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। নওশাদ দরজা খোলে। আরিফ দাঁড়ানো। নওশাদ কিছুক্ষণের জন্য অবাক হয়। পরক্ষণেই দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো। রাশভারি গলায় বলে,
“কেমন আছিস?”
আরিফ পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকে। “আপনার ওয়াইফকে ডেকে দিলে খুশি হবো।”
নওশাদ আরিফের মুখের দিকে তাকায়। আরিফ সোজা তাকিয়ে আছে। নওশাদ ছোট করে শ্বাস ফেলে বলে,
“বাসায় আয়।”
“আপনার ওয়াইফকে পাঁচ মিনিটের জন্য আসতে বলুন।”
“পুনমের সাথে কি?”
“আপনাকে বলতে বাধ্য নই।”
“আরিফ?”
“বেয়াদব বাবার ছেলে বেয়াদবই হয়। এত অবাক হওয়ার কি আছে? জানেন না যেন?”
“বাসায় আয়। বাসায় এসে কথা বল।”
“বেয়াদব বাসায় ঢুকলে আপনার বাসা অপবিত্র হয়ে যাবে।”
“বেয়াদবি করছিস কিন্তু।”
“শিক্ষক হয়েও বাংলা ভাষা বোঝেন না? আপনার ওয়াইফকে ডেকে দিতে বলেছি আমি। আপনার বাসায় দাওয়াত খাওয়ার জন্য আসিনি যে বসবো, বসে গল্পগুজব করবো।”
“আমি এখন তোর মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিবো।”
“আপনি ভদ্র মানুষ, আপনার বংশ ভদ্র। আমার বাপ খারাপ, আমার বংশ খারাপ, আমি খারাপ, আপনি শুধু শুধু আমার মতো বেয়াদবি করছেন কেনো?”
নওশাদের এত রাগ লাগলো আরিফের কলার টেনে ধরে ওকে বাসার ভিতরে টেনে আনে। আরিফের হাতে একটা শপিং ব্যাগ। আরিফ বিরক্ত হয়ে বলে,
“আজব এগুলো কি ধরনের ব্যবহার?”
নওশাদ আরিফের পিঠে জোরেশোরে একটা থাপ্পড় দিয়ে বসে। ব্যাগটা সোফায় ছুঁড়ে মেরে আরিফ কোমর থেকে বন্দুক বের করে পিছনে ফিরে নওশাদের কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে বলে,
“আপনি একজন সিআইডি অফিসারের গায়ে হাত তুলতে পারেন না মিস্টার নওশাদ বিন নাসির।”
নওশাদ ভ্রু উঠিয়ে তাকায়। নওশাদ আরিফকে আরো জোরে শব্দ করে চড় মারে। তবে এবার পিঠে না, গালে।
“সিআইডি হওয়ার আগে তুই আমার বড় বোনের ছেলে এবং আমি তোর মামা। এইসব বন্দুকের ভয় আমাকে দেখিয়ে লাভ নেই বেয়াদব।”
আরিফ বন্দুক নামিয়ে ফেলে। নওশাদ দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “তোকে সিআইডি বানিয়েছে কে? বহিষ্কার করে না কেনো তোকে? মাথায় তো বুদ্ধির ‘ব’ও নেই গু ছাড়া।”
কোমরে বন্দুক গুঁজে আরিফ বলে, “তো আপনার মতো সব জায়গায় ভাব দেখাবো? আমি ফ্যামিলি এনগেজড মানুষ। এত সব জায়গায় ভাব দেখাই না। কাজের জায়গায় সিরিয়াস, বাসায় পরিবারের সাথে ফ্রি। আপনার মতো আমার এত ভাব ধরার ইচ্ছে নেই।”
নওশাদের এত রাগ লাগছে! একে তো এসেছে কখন? দুই: আসার পর আবার কি করছে। ইচ্ছে করছে ঠাটিয়ে কানের নিচে দুটো দিতে। আরিফ পায়ের উপর পা তুলে বসে। চারদিকে চোখ বুলিয়ে বলে,
“টিভি কিনেছেন?”
নওশাদ দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “না চুরি করেছি।”
“তা মিস্টার নওশাদ আপনি না টিভি দেখা পছন্দ করেন না? তো অপছন্দের জিনিস চুরি করলেন কেনো? বিয়ে করে আপনার এতোটাই অধঃপতন হলো যে শিক্ষক হয়েও শেষমেশ চুরি করতে হলো?”
নওশাদ হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। আরিফ বলে,
“হোয়াটএভার আপনার ওয়াইফকে ডেকে দিন।”
নওশাদ বড় বড় পা ফেলে বেডরুমে চলে গেল। আরিফ ডাকছে বলে পুনমকে সালোয়ার কামিজ পড়ে যেতে বললো। পুনম ওয়ারড্রব থেকে কামিজ বের করতে করতে বলে,
“ওকে কিছু খেতে দিন।”
নওশাদ রাগে গজগজ করতে করতে বলে, “আমার বাসার এক গ্লাস পানিও যাতে ওকে না দেওয়া হয়।”
ধরাম করে ওয়াশরুমের দরজা লাগিয়ে দিলো। পুনম দরজা লাগিয়ে জামা পাল্টে মাথা, শরীর ভালো করে ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে ড্রয়িংরুমে বের গেল। নওশাদ ওয়াশরুম থেকে বেরুলেও আর ড্রয়িংরুমে যায় না। মাথা গরম করে দিয়েছে পুরো। পুনম কিছুক্ষণ পর চলে আসে। হাতে সেই শপিংব্যাগ। নওশাদ পুনমকে জিজ্ঞাসা করে,
“বেয়াদবটা কোথায়?”
“চলে গিয়েছে।”
“কি দিয়ে গেল?”
“একটা শাড়ি, অর্নামেন্টস দিয়ে গেল। একহাজার টাকাও দিয়ে গেল ম্যাচিং করে ব্লাউজ, পেটিকোট, মেহেদী কিনার জন্য”
“কার জন্য?”
“আর কার জন্য? বুঝেন না?”
“তুমি কিনবেও?”
“হুম। কালকে ভার্সিটিতে গেলে শাড়িটা নিয়ে যাবো। লাল রেডিমেট পেটিকোট কিনবো, শাড়ি থেকে ব্লাউজের পিস কাটিয়ে বানাতেও দিয়ে আসবো।”
“কেনো বেয়াদবটা কিনতে পারে না?”
“এভাবে বলছেন কেনো?”
“তুমি কিনবে না ওর কিছু। হডক থাকলে নিজে কিনুক।”
“হডক মানে কি?”
নওশাদ পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো। “পারবো না এত ট্রান্সলেশন করতে।”
পুনম বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। শপিং ব্যাগটা আলমারিতে রাখতেই নওশাদ গম্ভীর গলায় বলে,
“এইসবের পিছনে সময় এক ফোঁটাও নষ্ট করলে আমি টিভিতে হাতুড়ি মেরে টিভি ভেঙে ফেলবো বলে দিলাম।”
পুনম আলমারির দরজা লাগিয়ে নওশাদের পিছনে শুয়ে ওর পিঠে গাল ঘষে বলে, “মেজাজ গরম কেনো?”
নওশাদ উত্তর দিলো না। পুনমও ওভাবে শুয়ে রইলো। নিজের মতো বলতে লাগলো, “আরিফ বললো বিয়ে করবে আবার বললো নাচাবে। বুঝলাম না আমাকে ধরেছে কেনো মাঝখানে?”
নওশাদ দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “তুমি যে বোকাচন্দ্র, গাধা, বেকুব, ছাগল সেইজন্য।”
_____________________
জাইমা, জেরিন রাত সাড়ে দশটা নাগাদ নওশাদের বাসায় এসে আবদার করেছে আজ পুনমের সাথে ঘুমাবে। পুনমও নিষেধ করেনি। নওশাদ শুয়ে পড়েছে। আরিফ এমনিতেই মাথা গরম করে দিয়েছে, মন মেজাজ ভালো নেই। বেডরুমের লাইট অফ করে দরজা চাপিয়ে দিয়ে পুনম বালিশ, কাঁথা নিয়ে হোসনেআরার ঘরে আসে। জাইমা, জেরিন ফিসফিস করছিল, পুনমকে দেখেই চুপ করে গেল। পুনম কাঁথা, বালিশ বিছানায় রেখে একটা কয়েল জ্বালালো। বারান্দার দরজা বন্ধ করে বিছানার পাশে এসে বসতেই জেরিন বলে,
“মামি মাঝখানে শোও তুমি।”
পুনম চোখ ছোট ছোট করে বলে, “কেনো?”
“গল্প করবো তোমার সাথে তাই।”
পুনম মোবাইলের ফ্লাশ লাইট অন করে রুমের লাইট নিভিয়ে মাঝে গিয়ে শোয়। জাইমা, জেরিন দুইপাশে। জাইমা পুনমকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“মামি তোমার ভাইকে বলো না প্লিজ।”
পুনম মুখ কুচকে জাইমার দিকে তাকায়। জেরিনও পাশ থেকে বলে,
“তোমার ভাইকে বিয়ে করতে না পারলে জাইমা পাগল হয়ে যাবে বলেছে।”
পুনম অসহায় কণ্ঠে বলে, “তোমরা আমাকে এইসব বলার জন্য ডেকেছো?”
“তো? মামা কি করতো? ভোস-ভোস করে ঘুমাতোই। এরথেকে ভালো না আমরা এখন সারারাত গল্প করবো।”
পুনম মনে মনে বলে, “খুব তোমাদের মামা ভোস-ভোস করে ঘুমায়!”
কিন্তু একরাশ বিরক্ত প্রকাশ করে মুখে বলে,
“এগুলো গল্প না ছাই?”
জাইমা বলে, “তুমি আমার ব্যাপারটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছো না!”
“এটা সিরিয়াসলি নেওয়ার মতো বিষয়ও না। কি বাজে দেখাবে বিষয়টা ছিহ!”
“বেশি ছিহ ছিহ করো তুমি। আমার অনুভূতিকে তুমি এভাবে ছিহ ছিহ করতে পারো না। এটা অন্যায়।”
পুনম অতিষ্ট হয়ে বলে, “কিসের ব্যাঙের অনুভূতি! মামার সুমুন্ধি মানে তোমার কাইন্ড অফ মামা হয়। তোমার সাথে ভাইয়ার আল্লাহ মাফ করুক কিছু হলেও তুমি আমার ভাইয়ের বউ হবে, আমি আবার তোমার মামি, তোমার মামা তো তোমার মামাই, তোমার মামা তাহলে আবার তোমার নন্দাই হবে। আমার বাচ্চা হলে ওইটা তোমার কাজিন হবে। মানে তুমি বড় আপু, কিন্তু তোমার সাথে ভাইয়ার আল্লাহ মাফ করুক কিছু-মিছু হলে তুমি আমার বাচ্চার মামি হয়ে যাবে। আল্লাহ! পাকিস্তানি ড্রামা পেয়েছো?”
“কি হবে! ভালোবাসাই মেইন।”
“আল্লাহ! ওই খেচ্চরের গার্লফ্রেন্ড আছে। লাল চুলের একটা মেয়ে। ওর রুচি কেমন খারাপ ভাবো তাহলে?”
“থাক আমি আমার কালো চুল দিয়ে বশ করে ফেলবো।”
জাইমার এই কথা শুনে জেরিন নিজেকে আটকাতে পারে না। হো হো করে হেসে উঠে। পুনম মুখ কুচকে বলে, “হাসছো কেনো?”
“তুমি কি বোকা মামি!”
জাইমা ধমক দিয়ে বলে, “গাধা হাসলি কেনো?”
পুনম দুপাশে দুজনের দিকে মাথা ঘুরিয়ে বলে,
“তোমরা মজা করেছো?”
জেরিন হাসতেই থাকে। “তো? জাইমা তোমার ভাইকে দেখেওনি। সেদিন তুমি রুমঝুম আপুর সাথে আরিফ ভাইয়ার রিলেশনের খবর শুনে যে রিয়েকশন দিচ্ছিলে তখনই আমরা প্ল্যান করেছিলাম তোমাকে ক্ষেপানোর। এবার কাকে দিয়ে ক্ষেপানো যায়? দ্যান তোমার মেসেঞ্জার ঘেটে এটা বের করেছি দুজনে।”
পুনম মুখ কুচকে বলে, “বদমাশ কতগুলো।”
জাইমা পাশ ফিরে হাতের তালুতে মাথা ঠেকিয়ে বলে,
“তুমি কি সিরিয়াসলি ভেবেছিলে?”
“তোমরা সবাই যে হারের পাগল সত্যি ভাববো না?”
“মজা করছিলাম গো। জেরিনটা না হাসলেই হয়ে যেতো। আমার এইসব কিছু নেই।”
জেরিন বলে, “দেখো মামি হিসেবে আমরা দেড় বছরের বড় ছোট। তুমি তোমার মধ্যে কেমন একটা মামি, মামি ভাইব পাই। মনে হয় মামি শাসন করছে এমন।”
জাইমা বলে, “বুঝিস না মামার সংস্পর্শে থাকতে থাকতে হয়ে গিয়েছে?”
পুনম বলে, “তোমাদের মামার কাছে বিচার দিচ্ছি দাঁড়াও।”
“তুমি কত ভালো মামি। এইসব লাগানি পাড়ানির কাজ তোমাকে করতে হবে না।”
“দাঁড়াও না! মামার বদনাম মামির কাছে এসে করো। না বলেছি আমি?”
জাইমা, জেরিন পুনমকে জড়িয়ে ধরে দুগালে ঠেসে চুমু খায়। পুনম ‘আল্লাহ গো’ বলে চেঁচিয়ে উঠে। জাইমা, জেরিন হাসতে হাসতে থাকে। জেরিন বলে,
“এমন ভাব করছো কেনো? মামা চুমু খায় না এমন? এভাবে জড়িয়ে ধরে না?”
পুনম কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলে, “তোমরা কিন্তু তোমাদের মামাকে নিয়ে কথাবার্তা বলছো। লাগামের বাইরে গেলে কিন্তু মাইর দিবো।”
জাইমা, জেরিন দুপাশ থেকে পুনমকে জাপ্টে জড়িয়ে ধরে। পুনম গাইগুই করে বলে,
“আমাকে চ্যাপ্টা বানিয়ে ফেলছো তোমরা।”
জাইমা বলে, “এটলিস্ট আমরা মামার মতো লম্বাচওড়া, বড়সড় না। মরে যাবে না তুমি।”
জেরিন আফসোস করে বলে, “দেখেছিস জাইমা মামার সাথে থাকতে থাকতে মামি কেমন হয়ে গিয়েছে? প্রথম প্রথম এমন মোটেই ছিল না। দুই মাসেই এমন অবস্থা। দুই যুগ পরে কি হবে বল?”
“মামার ফটোকপি হবে।”
পুনম মুখ কুচকে বলে, “বেশি বেশি হচ্ছে। সত্যি সত্যিই বিচার দিবো বলে দিলাম।”
জেরিন বলে, “ফাঁপর কম মারো বেডি। জানি কিছু বলবে না।”
জাইমা বলে, “জানো মামার বিয়ের আগে আম্মু, খালামণিরা অনেক টেনশনে ছিল।”
পুনম বলে, “কেনো?”
জেরিন সোজা হয়ে শুয়ে বলে, “কেমন না কেমন বউ পায়, মামা ভালো থাকবে কিনা! এইসব নিয়েই।”
“এখন আর টেনশন করে না?”
জাইমা পুনমের গাল টেনে বলে, “না গো, এখন আর করে না। আম্মুরাও করে না, আমরাও করি না। খাসা সহজ সরল একখান বউ পেয়েছি আমরা ছেলের জন্য। তাই এখন ছেলেকে নিয়ে চিন্তা করি না। কিন্তু এখন ছেলের বউকে নিয়ে চিন্তা হয়। মেয়েটা যে সহজ সরল ছেলেটা না জানি মেয়েটার সাথে কি কি করে।”
“তোমরাও টেনশন করতে?”
জেরিন বলে, “সত্যি বলতে করতাম তো! মামি কেমন হয়? আমাদেরকে যদি দূরছাই করে? এই যে নানুমণির ঘরে আমাদের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে জানো? দেখো না কেউ আসলেই আমরা এই ঘরে আসি? মামা বাসায় না থাকলেও তোমাদের বেডরুমে খুব কম গিয়ে বসি। নানুমণির সাথে কত গল্প করেছি সবাই এখানে।”
জাইমা বলে, “নানুমণি অনেক ভালো ছিল জানো? বেস্ট বেস্ট ছিল।”
“উনি কিভাবে মারা গিয়েছেন? আমি কখনো তোমাদের মামাকে জিজ্ঞাসা করিনি।”
জেরিন বলে, “কত সমস্যা ছিল! কোমরের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গিয়েছিল, হাড় ক্ষয়, জরায়ুতে টিউমার, এটা সেটা।”
জাইমা বলে, “বাচ্চা যে জন্ম দিয়েছে দেখতে মনে হয় যে ছয়টা। কতগুলো মারা গিয়েছে জানো? বড় খালামণির আগে দুটো মারা গিয়েছে। কলপাড়ে পড়ে গিয়ে এইসব আকাম ঘটিয়েছে। মামার আগে একটা মেয়ে হয়ে মারা গিয়েছে। তারপর মানুষ তো বিরতি দেয়, তা না। কদিন পর পর বাচ্চা জন্ম দিয়েছে আর বৃদ্ধ বয়সে রোগে ভুগেছে।”
জেরিন বলে, “নানুমণি শেষ বয়সে অনেক কষ্ট করেছে। এমনও হয়েছিল উঠে বাথরুমে যেতে পারতো না। আম্মু, মামা দেখভাল করতো।”
জাইমা বলে, “জানো নানুমণি কি সুন্দর ছিল? পুরো বড় খালামণির মতো।”
“তোমাদের নানাভাই?”
“আমরা দেখিনি তো। মামার সাত নাকি আট বছরে মারা গিয়েছিল। আরিফ ভাইয়া, ইসরাত আপু, মাহতাব ভাইয়া দেখেছে। তাও ওদের মনে থাকার কথা না।”
“হুহ।”
জাইমা জেরিনের মাথায় ঠুয়া দিয়ে বলে, “তোর জন্য মামির সাথে মজা করতে পারলাম না।”
“ভালো হয়েছে। ওটা মজা করার কোনো টপিক হলো? আজাইরা জিনিসপত্র।”
জেরিন আবারও হেসে দেয়। “তোমার রিয়েকশনগুলো মারাত্মক।”
জাইমা বলে, “তুই ভাব শুধু মামা যদি মামিকে বিয়ে করতে রাজি না হতো তাহলে কি হতো?”
“মামা তো মামিকে দেখে বিয়ে করতে রাজি হয়নি। বড় খালামণি বলেছে মেয়ে একটা দেখেছি, নাম এটা। এটায় পড়ে। বিয়ে করে ফেল। মামা বলেছে বড় খালামণির ভালো লাগলে বিয়ের কথা এগোতে।”
পুনম বলে, “তোমাদের মামা যে বলেছিল বিয়ের আগে ছবি দেখেছিল?”
“দেখেছিল বলতে যেদিন মেইনলি হলুদ হয় সেদিন দেখেছিল। পরদিন তো বিয়েই।”
“মামার নাকি একটা মেয়ে হলেই হতো।”
“তোমার আফসোস হয় না মামি?”
“কেনো?”
“আমাদের নিরামিষ ঘণ্ট মামাকে বিয়ে করার জন্য?”
পুনম ঠোঁটে ঠোঁট চেপে চুপ করে থাকে। ওরা যদি জানতো নওশাদ ঠিক কেমন তাহলে ওদের রিয়েকশন কি হতো? পুরো ফাআআআআআহ?
চলমান…….
(হ্যাপি রিডিং)

