#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_১৬
#সমৃদ্ধি_রিধী
রিমি রুমঝুমকে বারান্দায় নিয়ে অনেকক্ষণ যাবৎ ঝেড়েছে। রুমঝুম মাথা নিচু করে অনেক কষ্টে কান্না আটকে রেখেছে। রিমি রুমঝুমের বাহু ধরে ওকে ঝাঁকিয়ে বলে,
“কি বলছি তোকে এতক্ষণ ধরে?”
“আরিফ ভাইয়াকে তোরও ভালো লাগে? নাকি আরিফ ভাইয়ার একপাক্ষিক?”
রুমঝুম দুদিকে মাথা নাড়ে। রিমি রেগে বলে,
“আমার দিকে তাকা তুই। বাংলা ভাষায় কথা বল। এত ইশারা উশারা বুঝি না আমি।”
“আমারও ভালো লাগে।”
“রিলেশনে আছিস তোরা?”
“জ্বি।”
“কতবছর?”
রুমঝুম নাক টেনে বলে, “আমার এসএসসি পরীক্ষার পর থেকেই।”
“আল্লাহ! আমি টেরই পেলাম না। তুই তো সাংঘাতিক মেয়ে। মানুষ মেরে গুম করে ফেলতে পারবি।”
রুমঝুম রিমির দিকে তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করে ফেলে।
“ইসরাত আপু কিভাবে জানে?”
“আমি জানি না আপু কি করে জানে। মনে হয় আরিফ ভাইয়াই খালামণি আর আপুকে বলেছে।”
“ভালোই তো। খুব ভালো।”
রুমঝুম ঠোঁট কামড়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকে। রিমি রুমঝুমের কাঁধে ধাক্কা মেরে বলে,
“এই আমাকে বল দুনিয়াতে আর ছেলে ছিল না ভালোবাসার মতো? আরিফ ভাইয়াকেই ভালোবাসতে হলো? বড় খালামণির জীবন দেখে শিক্ষা হয়নি?”
“হয়ে গিয়েছে। ভালোবেসে ফেলেছি। এতকিছু বিচার করিনি।”
“ভালোবাসা হয়ে গিয়েছে না? থাপ্পড় দিয়ে গালের দাঁত ফেলে দিবো বেয়াদব।”
“তুমিও তো ফারহান ভাইয়াকে ভালোবাসতে। তোমরাও তো বিয়ে করেছো।”
“ফারহান আর আরিফ ভাইয়া এক? আরিফ ভাইয়া মাঝেমধ্যে কেমন ব্যবহার করে দেখিস না? আরিফ ভাইয়া ভালো, স্বীকার করছি। কিন্তু বাপের রক্ত ফেলে দিতে পারবে? তাছাড়া আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে বিয়ে হলেও সুখী হওয়া যায় না।”
রুমঝুম ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর প্রয়াশ করছে। রিমি আবারও বলে,
“খালামণি কি বলছিলো তখন খালু তোকে সেদিন কি বলেছিলো না কি যেন? কোনদিনের কথা বলেছে?”
“ওই একদিন আসলাম না মাঝে? আরিফ ভাইয়া মিশনে থাকাকালীন?”
“হ্যাঁ?”
“খালু আমাকে খাওয়ার টেবিলে অপমান করেছে।”
“কি বলেছে?”
রুমঝুম বলতে চায় না। পরে রিমির ধমক খেয়ে বলতে শুরু করে,
“গোশত খেতে চলে এসেছি নাকি। আরিফ ভাইয়ার খোঁজ নেই তাও আমাদেরকে খেতে চলে আসতে হবে। আব্বুর ইনকাম কত-ই-বা যে আমাকে প্রাইভেটে পড়াচ্ছে। ব্যবসায় বড় একটা লস হলো না একবার? সেটা নিয়েও কথা তুলেছে। ব্যবসা করা জানতে হয়। আব্বুর নাকি ব্যবসা করার মতো ব্রেইন নেই। আবার বলেছে নিশ্চয়ই তোমার সব খরচ ফারহান ভাইয়া চালায়। সংসারও চালায় বোধহয়। নাহলে আব্বুর ক্ষমতা নেই আমার পড়াশোনার খরচ চালিয়ে আবার তোমারটা চালানোর। আব্বুর কি লজ্জা লাগে না মেয়েকে তুলে না দেওয়ার আগেই জামাই কাছ থেকে সংসার চালানোর খরচ নিতে। তোমার বিয়েও নাকি টাকার অভাবে দিতে পারছে না। এইসব আরো অনেক কথা বলেছে।”
রুমঝুম সব কথা বললোও না। ওকে যত খারাপ কথা বলেছে সব চেপে গিয়েছে।
“তোর মন চাইবে যে তোর বাবাকে এভাবে অপমান করেছে তার ছেলেকে বিয়ে করতে?”
রুমঝুম দুদিকে মাথা নাড়ায়। রিমি বলে, “করিস না আরিফ ভাইয়াকে বিয়ে। ভালো থাকবি না। আরিফ ভাইয়ার ফুল ফ্যামিলি কেমন ভাব। আরিফ ভাইয়ার ফুপি, চাচারা, আরিফ ভাইয়ার আব্বু কেমন ভাব। খালামণি অনেক ভুগেছে। খালামণি পিছাতে পারেনি। তুই তোর নিজের জীবন নিজের হাতে এভাবে নষ্ট করিস না। সময় আছে পিছিয়ে আয়। সবাই নিষেধ করবে দেখিস। মামা, খালামণিরা কেউ রাজি হবে না। পিছিয়ে আয়, ভালো থাকবি।”
রুমঝুম নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে।
“সব বাদ দে। ভালোবাসা দিয়ে চিড়া ভিজে না। তোর মনে হবে আরিফ ভাইয়াকে ছাড়া বাঁচবি না। এইসব ভুয়া। আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে শিখ। আমাকে ফারহান কখনো যদি আব্বুকে নিয়ে এভাবে কথা বলে আমি ফারহানকে জীবনেও মাফ করবো না। আমার জীবনে সবার আগে আমার বাবা। আমার জীবনে বাবা-মা আগে। কোনো ভালোবাসার জন্য আমি আমার বাবা-মাকে ছোট করবো না। ভালো আমিও বেসেছি, তাতে নিজের আত্মসম্মান, বাবার মার সম্মান বির্সজন দিয়ে নয়।
যে উঠতে বসতে তোর বাবাকে অপমান করে, তার ছেলেকে বিয়ে করতে তোর বিবেকে মানবে? মন চাইবে বাবাকে আরো ছোট করি? ইসরাত আপুর কথা অনুযায়ী আরিফ ভাইয়ার সাথে যদি তোর বিয়েও হয়, তাহলে ভাব পরে কি হবে। এখন খালু শালিকার মেয়ে, শালিকার স্বামীকে এভাবে অপমান করে। তোদের বিয়ে হলে আব্বুকে, আম্মুকে ঠিক কিভাবে অপমান করবে সেটা ভাব। তুই জানিস লোকটা কেমন। তুই-ই ভাব পরে পরে কি হবে। আমি আর কিছু বলবো না। যদি মন চায় তাহলে করিস বিয়ে। নিজের বাবাকে আরো ছোট করিস।”
রিমি বারান্দা থেকে রুম চলে আসে। রুমঝুম বারান্দায় বসে পড়ে। মুখে হাত চেপে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে যায়।
—————–
আড়াইটা বাজে। ইসরাত, রিমি, জেরিন খাটে শুয়ে আছে। ফ্লোরে বিছানা করে রুমঝুম, তাহিয়া, জাইমা শুয়ে আছে। পঁচিশতম বার রুমঝুমের মোবাইলে কল আসে। রুমঝুমের চোখ বেয়ে পানি পড়ে। ও চোখ মুছে কল রিসিভ করে এবার।
“থাপ্পড় দিবো যে কানে শুনবি না।”
রুমঝুম ঢোক গিলে, বড় করে শ্বাস ফেলে। “কিছু বলবে?”
“তুই বলবি। কি হয়েছে আমাকে বল।”
“কিছু হয়নি।”
“রুমঝুমি?”
“বলো?”
আরিফ শান্ত গলায় বলে, “কি হয়েছে বল আমাকে? কেউ কিছু বলেছে?”
“না।”
“তো? শরীর খারাপ? এক্সাম প্রেশার?”
“না।”
“তাহলে কি হয়েছে?”
“কিছু হয়নি বলেছি না?”
“আব্বু-আম্মু কিসব মেয়ে দেখেছে। আমার বিরক্ত লেগে উঠেছে। আমি আমাদের কথা জানিয়ে দিবো।”
“ইসরাত আপু আর খালামণি তো জানেই। আর কি জানাবে?”
“আম্মু, ইসরাত ছাড়া কেউ জানে না। বাকিদের জানাবো।”
“খালুর পছন্দের মেয়ে বিয়ে করে নাও। কাউকে এত জানাতে হবে না।”
“মানে?”
“যা শুনেছো তাই।”
“খুব শান্ত ভঙ্গিতে কথা বলছি। মেজাজ খারাপ হলে কিন্তু খবর আছে তোর।”
“কল কেটে দাও। মেজাজ খারাপ করতে হবে না।”
“রুমঝুমি?”
“আমার নাম রুমঝুম।”
আরিফের নাকের পাটা ফুলে গেল। “পরিষ্কারভাবে কথা বলি আয়।”
“পরিষ্কারভাবেই বলছি।”
“নেক্সট শুক্রবার বিয়ের প্ল্যান করেছে। শুক্রবারই আমার বিয়ে হবে তবে তোর সাথে।”
“আমি তো বিয়ে করবো না।”
“তোর টাইম লাগবে? তাহলে শুধু আক্দ করবো নাহয়?”
“আমি তোমার সাথে আক্দ, বিয়ে কিছুই করবো না।”
“তথাকথিত ক্রিঞ্জ ব্রেকআপ করতে চাচ্ছিস?”
“থ্যাংকস বোঝার জন্য।”
আরিফ বড় বড় শ্বাস ফেলে বলে, “তোর সমস্যা বল না রে? আমি সমাধান করার চেষ্টা করবো তো।”
“কোনো সমস্যা নেই। আমি তোমাকে বিয়ে করবো না।”
“করবি না?”
“না।”
“কারণ?”
“তোমাকে বিয়ে করার ইচ্ছে নেই।”
“আবারও জিজ্ঞাসা করছি রুমঝুমি বিয়ে করবি নাকি করবি না?”
রুমঝুম কান্না আটকে শক্ত গলায় বলে, “না।”
“কারণ বল।”
“কারণ নেই। তোমাকে বিয়ে করবো না।”
আরিফ দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “ওকে মিস মুনতাহা বিনতে রহমান রুমঝুম। আগামী শুক্রবার আমার বিয়ে। আমার বিয়েতে আমি আপনাকে সশরীরে উপস্থিত দেখতে চাই। আপনার সামনেই আমি কবুল বলবো। আই হোপ বড় ভাইয়ের বিয়েতে আপনি আসবেন।”
“জ্বি।”
আরিফের আর কিছু বলার রুচি হলো না। ও কল কেটে দিলো। রাগে নাকের পাটা ফুলে উঠছে। ড্রয়ার থেকে বন্দুক বের করে পাশের রুমে গিয়ে রুমঝুমের মাথার খুলি উড়িয়ে দিতে মন চাচ্ছে, এমন রাগ উঠেছে। কালকে ওই মেয়েকে ধরা লাগবে। থাপ্পড় দিয়ে মতিগতি ঠিক করবে।
আরিফ গায়ের উপর থেকে মাহতাবের হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিলো। আরিফ এতটাই জোরে মাহতাবের হাত ঝাড়া মেরেছে যে মাহতাবের ঘুম আলগা হয়ে যায়।
মাহতাব ঘুমঘুম গলায় বলে, “কিছু হয়েছে?”
আরিফের চোখে ঘুম নেই আর মাহতাব দিব্যি ঘুমাচ্ছে? আরিফের মেজাজ চওড়া। চেঁচিয়ে বলে,
“আমার রুম থেকে বের হো।”
মাহতাব উঠে বসে। চোখ কচলে সময় দেখে।
“আড়াইটা বাজে। তোমার রুম থেকে বেরিয়ে কোথায় যাবো?”
“যেখানে ইচ্ছা সেখানে যা। আমার সামনে থেকে দূর হো।”
মাহতাব হামি দিয়ে বলে, “তোমার কি…মানে বলতে চাচ্ছি কিছুমিছু ফিল হচ্ছে? লাইক রাত বিরাতে বউয়ের প্রয়োজনীয়তা বোধ করছো? সমস্যা নেই। নেক্সট শুক্রবার এইসময় তুমি বাসরঘরে থাকবে। এক সপ্তাহ কষ্ট করো শুধু। আমি কিছু করতে পারবো না। আমাকে ঘুম থেকে না উঠালেও পারতে।”
এমনিতে হুকমি ধমকি দিলেও এইসব বলায় মাহতাবকে থাপ্পড় চোপ্পড় দিয়ে সত্যিই রুম থেকে বের করে দিলো। মাহতাব ড্রয়িংরুমের বড় সোফায় শুয়ে পড়ে।
“শালা বাপের মতো শুয়োর হয়েছে। বাপে বাসা থেকে বের করে, ছেলে রুম থেকে বের করে। পুরোপুরি ডাক্তার হয়ে চেম্বার দিয়ে নেই খালি। আমাকে রুম থেকে মাঝরাতে বের করার শাস্তি তখন দিবো। শালা!”
—————–
রোদের তাপ কমার নামগন্ধ নেই। শীত শেষ হলো না তার থেকেই গরম এসে হাজির। পুনম ক্লাসের শেষ দেড়ঘন্টা হবে। এখন দুপুর একটা বাইশ। পুনম, সিরাত, মেঘলা গ্যালারিতে গোল হয়ে বসে আছে। মেঘলার কালকে কাজিনের বিয়ে। তাই ক্লাস শেষে পুনমকে চেপে ধরেছে ওকে মেহেদী দিয়ে দেওয়ার জন্য। পুনমও নাচক করেনি। জীবনে একটাই কাজ পারে খুব ভালো। মেঘলার বাম হাতের এপিঠ, ওপিঠে মেহেদী দেওয়া শেষ। ডান হাতের উল্টে পিঠে দিচ্ছে। ডান হাতের তালুতে দিলে মেহেদি দেওয়া শেষ হয়ে যাবে। সিরাত বিরক্ত হয়ে বলে,
“এই পুনম?”
“বল?”
“ছোট করে ডিজাইন করে ছেড়ে দে তো। বিরক্ত লাগছে আমার।”
মেঘলা খেঁকিয়ে উঠে, “আমার মেহেদী যদি তাড়াহুড়ো করে দিয়ে নষ্ট করেছিস তো দেখিস।”
“মাগনা করছিস আবার কত কথা?”
মেঘলা বলে, “এই পুনম তোর টাকা লাগবে?”
“লাগবে। এই পর্যন্ত যা দিলাম পাঁচশো করে নিলেও দেড় হাজার টাকা দে।”
“চাল হাট।”
সিরাত পা দুলাতে দুলাতে বলে, “পুনম?”
“বল।”
“বিয়ে করেছিস দুইমাস হয়ে যাচ্ছে। দুলাভাইয়ের সাথে একবারও দেখা করালি না। এটা কেমন কথা?”
“ওর সময় নেই। সকালে বের হয় সাতটায়। বাসায় ঢুকতে ঢুকতে ছয়টা, সাড়ে ছয়টা বেজে যায়। ও একদিন সময় পেলে দেখা করাবো।”
“হানিমুনে যাবি না?”
পুনম সিরাতের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে আবার মেঘলার হাতে মেহেদি দেওয়ায় মন দেয়। সিরাত বলে,
“উত্তর দিচ্ছিস না কেনো? কোথায় যাবি?”
“প্ল্যান করিনি। রিটেক এক্সামের পর প্ল্যান করবো।”
“আমাদের পুনম টিচার বিয়ে করে পড়াশোনায় ভীষণ সিরিয়াস হয়ে গিয়েছে।” মেঘলা টিটকারি মেরে বলে।
“সেটাই তো দেখতে পাচ্ছি। আগে সন্ধ্যার পর অনলাইনে দেখতাম, এখন সন্ধ্যার পর তো দূরে থাক, বিকালেও এক্টিভ দেখি না। ঘটনা কি?”
“বুঝো না ঘটনা?”
পুনম ফোঁস করে শ্বাস ফেলে। ও বিকালে ঘুমায় আর নওশাদ যে বাসায় ফিরে ওর মোবাইল জব্দ করে রেখে পুনমকে পড়তে বসায়, সেই কথা ওদেরকে বলা যাবে না। সিরাত, মেঘলা আরো কিছুক্ষণ টিটকারি মারতে থাকে। পুনমের ফোনে কল আসে। পুনম সিরাতকে বলে,
“ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে আমার কানে ধর তো।”
সিরাত পুনমের ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে স্ক্রিনের নাম দেখেই ভ্যাবাচ্যাকা খায়।
“এটা কার নাম্বার দোস্ত? ফেনীর…”
সিরাতের কথা শেষ হলো না। পুনম সিরাতের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নেয়। নওশাদ কল করেছে। পুনম রিসিভ করে। নওশাদকে সালাম দেয়। নওশাদও সালামের উত্তর দিয়ে বলে,
“কোথায়?”
সিরাত মেঘলাকে বিস্ময়ের সাথে বলে, “ভাই পুনম এখন যার সাথে কথা বলছে তার নাম্বার পুনম কি নামে সেভ করেছে জানিস?”
পুনম ধমক দিয়ে বসে। ওদের মাঝ থেকে উঠে দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। নওশাদ বলে, “ভার্সিটিতেই এখনও?”
“জ্বি।”
“এতক্ষণ ক্লাস?”
“না আসলে আমার ফ্রেন্ডের কাজিনের বিয়ে কালকে। ওকে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছি।”
“ওহ, কতক্ষণ লাগবে?”
“লাগবে একটু সময়। ডান হাতের তালু পুরো বাকি।”
“আমি আসছি তোমার ভার্সিটিতে।”
অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে, “এখন আসবেন কিভাবে? ক্লাস নেই?”
“এসে বলবো।”
“সত্যিই আসবেন??”
“হুম। ওয়েট করো। আমি এসে কল দিবো। গেটের সামনে এসো।”
“ওকে।”
পুনম খুশি খুশি মনে ওদের সামনে যায়। নওশাদের নাম্বার ওই নামে কেনো সেভ করেছে তার কৈফিয়ত দিলো। সিরাত, মেঘলা ইচ্ছে মতো পুনমকে পচিয়েছেও। মেঘলার ডান হাতের উল্টোপিঠে মেহেদী দিয়ে হাতের তালুতেও দিয়ে দেয়। যেই টানটান হয়ে দাঁড়ালো তখনই নওশাদ কল দেয়। পুনম নওশাদের সাথে কথা বলে সিরাতকে বলে,
“ও এসেছে। দেখা করতে চেয়েছিলি না? চল।”
সিরাত দুদিকে মাথা নেড়ে বলে, “না ভাই। লাগবে না। তোমার জামাই তুমিই দেখা করো।”
“তোরা না দেখা করবি?”
মেঘলা বলে, “আমরা পরপুরুষের সাথে দেখা করিনা।”
পুনম ব্যাগ কাঁধে তুলে নেয়। “আমি গেলাম তাহলে?”
মেঘলা হাত নাড়িয়ে বলে, “বাই বাই।”
সিরাত বলে, “আল্লাহ হাফেজ।”
পুনম মেঘলাকে “বাই” আর সিরাতকে “আল্লাহ হাফেজ।” বলে গেটের সামনে আসে। নওশাদ পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। পুনম পা চালিয়ে নওশাদের সামনে আসে।
নওশাদ পুনমের কাঁধ থেকে ব্যাগ নিয়ে নিজের বা কাঁধে নেয়। পকেটে হাত গুঁজে বলে, “তুমি এখনও স্কুল ব্যাগ ক্যারি করো কেনো? তোমার বয়সী মেয়েরা সবাই সাইড ব্যাগ ক্যারি করে।”
“নস্টালজিক ফিল পাই।”
“হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি আসো।”
পুনম নওশাদের পাশে পাশে হাঁটে। নওশাদ বলে,
“ভার্সিটির স্টুডেন্ট হয়েও স্কুল ব্যাগ ক্যারি করার মধ্যে নস্টালজিক ফিল পাওয়া যায়?”
“যায়। ধরুন আমি দুটো বেণী করে, স্কুল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছি। কেউ বলবে আমি ভার্সিটির স্টুডেন্ট?”
“উহু।”
“আপনি হঠাৎ এদিকে?”
“কেনো আসতে পারি না?”
“আপনার না এইসময় কলেজ থাকে? আমার ফোনও রিসিভ করেন না এইসময়।”
“আজকে শুধু মর্নিং শিফটের ক্লাস হয়েছে।”
“ডে শিফটের ক্লাস হয়নি?”
“উহু।”
“কেনো?”
“গতকাল ওদের পিকনিক ছিল। পিকনিকের পরদিন অফ থাকে।”
“ওহ।”
নওশাদ পুনমের হাত ধরে রাস্তা পার হয়। রাস্তা পার করার জন্য হাত ধরলেও নওশাদ ওর হাত ছাড়ে না। পুনম নওশাদের শার্টের হাতায় টান মারে। নওশাদ ভ্রু কুচকে বলে,
“কি?”
“ভার্সিটি এরিয়ায় এভাবে হাত ধরে হাঁটছেন কেনো? মানুষ মনে করবে আমরা কাপল।”
চরম বিস্ময় নিয়ে নওশাদ বলে, “আমরা তো কাপলই।”
“আই মিন মানুষ ভাববে আমরা গার্লফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ড।”
“তুমি কি আমাকে ইনডিরেক্টলি তোমার হাত ছেড়ে দিতে বলছো?”
“জ্বি।”
নওশাদ শান্ত চোখে তাকিয়ে বলে, “এখন ছাড়লে কিন্তু আমি আর কখনোই তোমার হাত ধরবো না। ইভেন অলসো তুমি চাইলেও না।”
পুনম তো হাত ছাড়ালোই না, বরং নওশাদের বাহু জড়িয়ে ধরে। নওশাদের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। ঠেস মেরে বলে,
“এখন মানুষ গার্লফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ড ভাববে না?”
“না। এভাবে অধিকারের সাথে ওয়াইফই হাসবেন্ডের হাত ধরে। মানুষ কিছু ভাববে না।”
“সেয়ানা।”
“কোথায় যাবেন?”
“আপাতত রেস্টুরেন্টে।”
“টাকা আছে? সেদিন না বললেন হাতে টাকা নেই? গতকালও তো আবার এক হাজারের মতো খরচ হয়েছে।”
“এক হাজার?”
“রুমঝুমের হাতে দিলেন পাঁচশো, পরোটা কিনলেন দুইশো। রাতে আবার পেস্ট, ময়দা আর কি যেন কিনলেন ওখানেও তো খরচ হয়েছে।”
নওশাদ পুনমের মুখের দিকে তাকায়। মৃদু হেসে বলে,
“বউকে খাওয়ানোর মতো টাকা আছে।”
“লাগবে না খাওয়া। দুজনের বিরিয়ানি খেতে গেলেই আবার পাঁচশো, ছয়শো টাকা নেই। এর থেকে ভালো চলুন একটা মুরগি কিনি, বাসায় বিরিয়ানি বানালে একবেলার জায়গায় তিনবেলা খাওয়া যাবে। বাসায় চলুন।”
নওশাদ পুনমের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। “ভাবতে হবে না এতো।”
“টাকা খরচ করার কি দরকার? আপনার বেতন পেতে আরো দশ, বারো দিন লাগবে। এখন না খেয়ে ওই টাকা রেখে দেই চলুন। অপচয় করার দরকার নেই। পরে দরকারে খরচ করা যাবে।”
“আম্মাকে টাকার অভাবে খাওয়াতে পারিনি। তখন না পারলেও এখন বউকে ঠিকই খাওয়াতে পারবো। আম্মার মতো তোমাকেও টাকার হিসেব করতে হবে না, এটা আমি দেখে নিবো। নিজে ইনকাম করলে তখন কিপ্টেমি করো।”
পুনম আবার মুখ খুলে নিলে নওশাদ ধমক দিয়ে বলে,
“মুখ বেশি চলছে। তোমার অভিযোগ তোমার হাসবেন্ড নায়কদের মতো কিছু করে না। রুড হাসবেন্ডের জন্য তুমিও নায়িকা হতে পারো না। অভিযোগ মাথা পেতে গ্রহণ করে আমি এখন নায়কদের মতো বউকে বাইরে খাওয়াতে চাচ্ছি, চুপচাপ খাও।”
“আমি তো আপনার ভালোর জন্যই বলছিলাম।”
“লাগবে না আপনার এত ভালো করা। যেমন আছেন তেমনই থাকুন।”
পুনম ভেংচি কাটে। নওশাদ পুনমকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে ঢোকে। কর্ণারের সিটে বসে। পুনম নওশাদের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে,
“আপনার মোবাইল দিন। ছবি তুলবো।”
নওশাদ পকেট থেকে মোবাইল বের করে পুনমের হাতে দেয়। পুনম কয়েকটা সেল্ফি তুললো। মুখ কুচকে বলে,
“ভালো করে হাসুন। নতুন বউয়ের সাথে থাকলে হাসবেন্ডরা যেভাবে হাসে, ওইভাবে হাসুন।”
“তুমি মুখোমুখি না বসে পাশে এসে বসো।”
পুনম তাই করলো। নওশাদের পাশের চেয়ারে এসে বসলো। ওয়েটার আসতেই নওশাদ দু প্লেট সেট ম্যানু অর্ডার দিলো। ওয়েটার যেতেই পুনম কপালে হাত দেয়। নওশাদ ভ্রু কুচকে বলে,
“কি?”
“আল্লাহ! আপনি সেট ম্যানু অর্ডার দিয়েছেন কেনো? সাড়ে তিনশো একটা প্লেট। সাতশো টাকা শেষ। আবার কোল ড্রিংকসও অর্ডার দিয়েছে। ওওও আল্লাহ গো!”
নওশাদ পুনমের হাত থেকে মোবাইল নিয়ে বলে,
“তুমি আমার থেকেও কিপ্টে। এখন হাসো ছবি তুলে দেই।”
“আপনি বেতন পেলে আমার হাতে টাকা দিবেন। আপনি অনেক খরচ করেন। আপনাকে আর বিশ্বাস করতে পারছি না আমি।”
“বেতন পেলে দেখা যাবে। এখন হাসো, ছবি তুলে দেই।”
“আপনার কাজে হাসি আসছে না আমার।”
নওশাদ সিরাতের কথা শুনেছিলো। তখনই হুট করে মনে পড়ে সিরাতের কথা। নওশাদ হাত বাড়িয়ে বলে,
“তোমার মোবাইলটা দাও তো একটু।”
পুনম বিনা বাক্য ব্যয়ে দিলো। নওশাদ পুনমের মোবাইল বাম হাতে নিয়ে নিজের ফোন থেকে পুনমের নাম্বারে কল দিলো। পুনম ভ্রু কুচকে নওশাদের দিকে তাকিয়ে আছে। পুনমের মোবাইলে কল আসে। নওশাদের চোখেমুখে বিষ্ময়। পুনমের বিষয়টা ধরতে সময় লাগে। তবে যখনই বুঝে নওশাদের হাত থেকে টান মেরে মোবাইল নিয়ে নেয়। নওশাদ অবাক হয়ে বলে,
“তুমি আমার নাম্বার কি নামে সেভ করেছো?”
পুনম মোবাইল ব্যাগে ঢুকিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে মুখ দুহাতে ঢেকে ফেলে। নওশাদ বলে,
“এই মেয়ে এদিকে তাকাও।”
পুনম দুহাতে আরো শক্ত করে মুখ ঢেকে ফেলে। নওশাদ পুনমের হাত টেনে বলে,
“এই তাকাও আমার দিকে। ফেনীর মধু মানে কি? তুমি আমার নাম্বার ফেনীর মধু নামে সেভ করেছো কেনো?”
চলমান…..
(হ্যাপি রিডিং।)

