#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_১৫
#সমৃদ্ধি_রিধী
হাসনাহেনার কাঁদতে কাঁদতে চোখ পড়ে দরজার দিকে। ইসরাত শক্ত চোখে তাকিয়ে আছে। হাসনাহেনা তড়িঘড়ি করে চোখ মুছে নেয়। রিমিও ইসরাতকে দেখে সরে বসে। ইসরাত রুমে ঢুকে বলে,
“ভাইয়া এসেছে। তোদেরকে ডাকলো। যাহ”
জেরিন, জাইমা হাসনাহেনার দিকে তাকায়। হাসনাহেনা চোখ মুছে বলে, “যা।”
রুমঝুম, জেরিন, জাইমা চলে গেল। ইসরাত রিমির দিকে তাকিয়ে বলে, “তুই যাচ্ছিস না কেনো?”
“ভাইয়ার সাথে পরে কথা বলবো।”
ইসরাতের চোখ মুখ শক্ত। ও দরজা লাগিয়ে হাসনাহেনার মুখোমুখি বসে। শক্ত গলায় প্রশ্ন করে,
“আব্বু তোমার গায়ে হাত তোলে?”
হাসনাহেনা সে কথার জবাব দিলো না। ইসরাতের মুখে হাত বুলিয়ে বলে,
“তোর কি শরীর খারাপ লাগছে?”
“আমি তোমাকে আমার শরীর খারাপের কথা বলিনি। আব্বু তোমার গায়ে হাত তুলে কিনা সেটা বলো। হ্যাঁ অথবা না।”
হাসনাহেনা জবাব দেয় না। রিমি ক্ষীণ কণ্ঠে বলে,
“দেয়। একবার চড় মারতে দেখেছি আমি নিজে।”
ইসরাত দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “তুই চুপ থাক। আম্মু আমি কিছু জিজ্ঞাসা করছি। উত্তর দাও।”
হাসনাহেনা এগিয়ে এসে ইসরাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। “মাথা গরম করিস না। এমনিতেই শরীর ভালো না। বমি করায় চেহারার কি হাল হয়েছে। এই সময় এত উত্তেজিত হতে হয় না।”
মাথার উপর থেকে হাসনাহেনার হাত সরিয়ে দিয়ে বলে, “বাংলা উত্তর দাও। এত তালবাহনা করছো কেনো? কসম আম্মু তুমি যদি কিছু না বলো আমি আব্বুকে কল দিয়ে যা তা বলা আরম্ভ করে দিবো।”
“মাঝেমাঝে চড় থাপ্পড় মেরে বসে। গালিগালাজ করে। সহ্য হয়ে গিয়েছে আমার। তুই মাথা গরম করিস না। ঘামিয়ে যাচ্ছিস। এই রিমি পানি দে তো।”
ইসরাত রেগে যায়। “রাখো তোমার পানি। আমাকে সোজা উত্তর দাও। আব্বু যে তোমার গায়ে হাত তোলে, গালিগালাজ করে কখনো আমাকে এগুলো কখনো বলোনি কেনো?”
“সন্তানদের উপর খারাপ প্রভাব পড়ে আম্মা। সব কথা ছেলেমেয়েকে বলতে হয় না।”
“এই রাখো তোমার ভালোমানুষি। আব্বু কি শুরু থেকেই তোমার গায়ে হাত তোলে নাকি নতুন নুতন টাকা হওয়ার পর থেকে? আমি আর ভাইয়া যখন ছোট ছিলাম তখন থেকেই?”
“এইসব রাখ তো। আমার জীবন ফুরিয়েছে।”
“ভাইয়া জানে?”
হাসনাহেনা জবাব দিলো না। ইসরাত বলে, “আমি ভাইয়াকে বলতে যাচ্ছি।”
হাসনাহেনা ধমকে বলে, “আরিফকে বলবি না ইসরাত।”
“ভাইয়াও জানে না তার মানে?” ইসরাত শক্ত গলায় বলে।
হাসনাহেনা রিমির দিকে তাকিয়ে বলে, “বোঝা ওকে।”
“ও কি বোঝাবে হ্যাঁ? তুমি আমাকে বলো আমাদেরকে কিছু বলোনি কেনো? আব্বু তোমার সাথে অনেক জঘন্য ব্যবহার করে না?”
হাসনাহেনা উত্তর দিলো না। ইসরাত ফের বলে,
“এই এত খারাপ ব্যবহারের পরও কিসের আশায় পড়ে আছো?”
“সংসার, স্বামী খারাপ হলেই চলে যাবো এমনটা হয় না। আমার জীবন, সংসার তোদের জীবনের মতো নয়। আমি বড় মেয়ে। আমার উপর দায়িত্ব অনেক। আমাকে অনেক কিছু ভেবে চিন্তে থাকতে হয়েছে।”
“আগে জানাওনি বেশ, এখন কেনো বলছো না? এই তোমার ছেলে ইনকাম করে না? তোমাকে নিয়ে আলাদা হতে যেতে পারতো না? আল্লাহ! আই কান্ট বিলিভ আমাদের সামনে আমাদের আম্মুর গায়ে আব্বু হাত উঠাতো আর আমরা জানতেই পারিনি। এই জীবনে আমাদেরকে বলেছো কখনো আব্বু তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে? আমরা কিছু করতে পারতাম না?”
“ইসরাত এত মাথা গরম করিস না। এগুলো এইসময় ভালো না।”
“কথা ঘোরাবে না আম্মু। আব্বু তোমাকে অত্যাচার করে? তুমি ভালো নেই না? প্রতিবাদ করো না কেনো? খুব ভালো অভিনয় করতে পারো তুমি। বেস্ট! আমি ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি এমন। আব্বু মাঝেমধ্যে অনেক বাজে চেঁচামেচি করতো এটা আমরাও দেখেছি। কিন্তু ছোটলোক, ফকিন্নি এইসব বলে অপমান করে, তোমার গায়ে হাতও তোলে এগুলো তো জানতাম না।”
ইসরাতের চিকন ঘাম দেয়। ও বড় বড় শ্বাস ফেলে রিমিকে বলে,
“এসি চালু কর তো।”
হাসনাহেনা পানি এনে ইসরাতকে দেয়। ইসরাত পানি খেয়েও হাঁপাতে থাকে।
“বলেছিলাম এমন করিস না। তোর শরীরের জন্য ভালো না।”
ইসরাত বসা অবস্থায়ই হাসনাহেনাকে জড়িয়ে ধরে। “তোমার অনেক কষ্ট না আম্মু? তুমি রিমি, রুমঝুম, জেরিন, জাইমার সামনে নিজেকে হালকা করে কাঁদতে পারো তাহলে আমার সামনে পারো না কেনো? আমি মেয়ে হিসেবে অনেক খারাপ?”
“তোদের বাবার প্রতি তোদের শ্রদ্ধা যাতে নষ্ট না হয়ে যায় তাই।”
“তোমাকে অনেক বাজে কথা বলে না আম্মু? ফকিন্নি, যা তা বলে অনেক অপমান করে তাই না? নানাভাই, নানুমণি, খালামণিদের, মামকে নিয়েও বাজে কথা বলে না? মামা, খালামণিরা এইজন্যই আমাদের বাসায় আসে না তাই না?”
হাসনাহেনা কান্না চেপে রাখে। ইসরাত কেঁদে দেয়।
“তোমাকে এত কষ্ট দেওয়ার পরও কেনো বলোনি? কথার আঘাত সবচেয়ে বড় আঘাত। আমরা কখনো বুঝতেও পারিনি তোমার এত কষ্ট। ওনাকে সম্মান দিয়ে কি লাভ আম্মু? এত কষ্ট কাদের জন্য সহ্য করেছো? শুধু খেয়ে পড়ে থাকার জন্য এত কষ্ট করেছো? কখনো আমাকে বা ভাইয়াকে কেনো বলোনি আম্মু? আমরা শুরু থেকে প্রতিবাদ করলে তো এখনও এইসব করতো না। এত ভালো অভিনয় কেনো করেছো?”
“কষ্ট করে টিকে না থেকে কি করতাম? ছোট ভাই বোনদের দিকে তাকিয়ে টিকে ছিলাম। আম্মা আব্বার দিকে তাকিয়ে টিকে ছিলাম। নিজের ছোট ছোট ছেলে মেয়ের দিকে তাকিয়ে টিকে ছিলাম। আমি সংসার ছাড়লে তোরা কিভাবে বড় হতি? আমার কি কামাই করার ক্ষমতা ছিল? তোদেরকে পালতাম কিভাবে?”
“ভাইয়ার তো ইনকাম আছে এখন। মামা, খালামণিরাও ভালো আছে। তাহলে এখনও কথা শোনো কেনো? এখন তো পিছুটান নেই কোনো। প্রতিবার করতে পারো না? এখনও চড় থাপ্পড় মারে, সময়ে অসময়ে অপমান করে। ভাইয়ার বিয়ে নিয়েও কথা শুনিয়েছে তোমাকে। এখন কেনো টিকে আছো? শুনলাম তো তোমার কথা সব, শুনলাম তো তোমার কষ্ট। ভাইয়াকে বলো। ভাইয়াকে বললে ভাইয়া একটা ব্যবস্থা করতে পারব না? ভাইয়ার সেই ক্ষমতা নেই?”
“সংসারের প্রতি মায়া জন্মে গিয়েছে।”
“সে সংসারে সম্মান নেই সেই সংসারে টিকে থেকে লাভ কি?”
“লোকে অনেক কথা বলবে।”
“তোমাকে যখন আব্বু গালিগালাজ করে, তখন তোমার কষ্ট হয় না? সেই কষ্ট লোকে দেখতে আসে? আচ্ছা তোমাকে ভাইয়ার সাথে আলাদা হতে হবে না। তুমি আমার সাথে আমার বাসায় যাবে।”
“ইসরাত মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছে তোর। শোন মাথা ঠান্ডা কর। জীবন আমি কাটিয়ে দিয়েছি। বাকি জীবনও কাটিয়ে দিবো।”
“আম্মু?”
“আমি এই বিষয়ে কথা বলবো না ইসরাত।”
“আচ্ছা সব বাদ দিলাম। আব্বু ভাইয়ার জন্য যে মেয়ে ঠিক করে ওই মেয়েটা ভালো না?”
“না।”
“তুমি তো জানোই মেয়েটা ভালো না। তাহলে ভাইয়াকে ওই মেয়েকে বিয়ে করতে জোর করছো কেনো? তুমি না মা? জানো ভাইয়া ভালো থাকবে না তাও? তুমি জানো ভাইয়া রুমঝুমকে ভালোবাসে তারপরেও কি করে বলছো ভাইয়াকে আরেকটা মেয়েকে বিয়ে করতে?”
রিমি চমকে উঠে। “আরিফ ভাইয়া রুমঝুমকে ভালোবাসে?”
ইসরাত রিমির দিকে তাকিয়েও চোখ সরিয়ে নেয়। হাসনাহেনা বলে, “তোর বাপ রুমঝুমকেও কথা শোনাতে ছাড়েনি। আমাকে তো বলেই, যা মন চায় বলে। আমি জীবনে কিছু বলি নাই। আরিফের সাথে রুমঝুমের বিয়ে হলে রুমঝুম জীবনেও সুখী হবে না। জীবনেও না। মেয়েটা তিক্ত কথা শোনাতে শোনাতে মেরে ফেলবে। আরিফ ভালো, আমার ছেলে অনেক ভালো। কিন্তু তোর বাপ রুমঝুমকে সময়ে অসময়ে এমনভাবে কথা শোনাবে মেয়েটা চাইলেও সুখে সংসার করতে পারবে না। ঝামেলা লেগেই থাকবে। আমি ছেলের ভালো চেয়ে রুমঝুমের জীবন কিভাবে নষ্ট করবো?”
“তুমি পাগল আম্মু? ভাইয়া আর রুমঝুম আলাদা হয়ে যাবে। ভাইয়ার সামর্থ আছে বউ নিয়ে আলাদা থাকার মতো। ভাইয়া রুমঝুমকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবে? তুমি পাগল আম্মু? আব্বু বাজে কথা বলবে ভেবে তুমি ভাইয়াকে আরেকটা মেয়ের সাথে বিয়ে দিবে বলছো?”
হাসনাহেনা তো এইসব ভাবেনি। ইসরাত ফের বলে,
“আব্বু কি প্রতিদিন তোমার গায়ে হাত তোলে আম্মু?”
“না। মাথা গরম হলে আর তোর মামা, খালাদেরকে বাসায় দেখলেই…”
হাসনাহেনার কথা শেষ হতে পারলো না। তার আগেই ইসরাত বলে,
“তো তোমাকে একটা দিলে তুমি ঘুরিয়ে আরো দুটো দিতে পারো না? তুমি যে বেশরম মহিলা আমি বুঝো গিয়েছি। তুমি চড় থাপ্পড় খেয়েও এই লোকের সংসার করে যাবে সেটাও আমি বুঝেছি। নেক্সট টাইম একটা দিলে তুমি কানের নিচে আরো দুটো দিয়ে বসবে। তারপরও একটা দিলে দা, বটি দিয়ে একটা দিবে একদিনেই সোজা হয়ে যাবে।”
হাসনাহেনা হেসে ফেলে।
“একদম হাসবে না আম্মু। তোমাকে পরে একটা চড় মারলেই তুমি দুটো দিবে। বাকিটা আমি দেখবো।”
হাসনাহেনা আঁতকে উঠে বলে, “কি করবি তুই?”
“সেটা দেখতেই পাবে, কি করবো না করবো।”
হাসনাহেনা, রিমি একে অপরের দিকে তাকিয়ে আবার ইসরাতের দিকে তাকায়। ইসরাত শক্ত গলায় বলে,
“কালকে শুধু আব্বুকে ফিরতে দাও।”
—————–
রুমঝুম, জেরিন, জাইমা দুমিনিট ধরে আরিফের রুমে বসে আছে। আরিফ ওয়াশরুমে। রুমঝুম আরিফের রুমে চারদিকে চোখ বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জেরিন বলে,
“জাইমা তোর মনে হয় আরিফ ভাইয়া ওই কড়া মেকাপের মেয়ে বিয়ে করবে?”
“খালামণি তো বলেছে বিয়ে দিবে। যদি বিয়ে হয়ও তবে দেখবি আরিফ ভাইয়া ওই মেয়েকে সিধা বানিয়ে ফেলেছে।”
“যে মেয়ের সংসার করার নিয়তই থাকে না, তাকে দিয়ে সংসার করানো যায়?”
রুমঝুম বড় করে শ্বাস ফেলে। ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ হয়। আরিফ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ওদেরকে বিছানায় বসে থাকতে দেখে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। মুখ মুছে বিছানায় প্রান্তে বসে বলে,
“কি অবস্থা?”
“আলহামদুলিল্লাহ। তোমার কপালে কি হয়েছে? ব্যান্ডেজ কেনো?” জাইমা জানতে চায়।
“ক্রিমিনালের সাথে ধস্তাধস্তি হওয়ার সময় ব্যথা পেয়েছিলাম।”
“এমন উধাও হয়ে গিয়েছিলে কেনো?”
“চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবান যেতে হয়েছিল। বান্দরবানের যে এরিয়ায় গিয়েছিলাম ওখানে নেটওয়ার্ক থাকে না। আর আমার মোবাইলও নষ্ট হয়ে গিয়েছে।”
“বান্দরবানের কোথায় গিয়েছিলে?”
“একটা পাহাড়ে। ওই পাহাড় থেকে মায়ানমার দেখা যায়।”
“তাই?”
“হুম।”
“এবারের কেস কি নিয়ে ছিল ভাইয়া?” জেরিন বলে।
“তোদেরকে বলা যাবে না। তোরা ভয় পাবি।”
“সব কেসের কাহিনি শুনিয়েছো, এটা শোনাতে পারবে না?” জাইমা বলে।
“না।”
রুমঝুমের দিকে তাকিয়ে বলে, “কিরে তুই এমন চুপচাপ কেনো? তোর জামাই মরেছে?”
রুমঝুম মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলে, “ধূর! জামাই মরবে কেনো? আমি তো মনে মনে তোমার বিয়েতে কি কি করবো সেই প্ল্যানিং করছি।”
“আমার বিয়ে?” ভ্রু উঠিয়ে প্রশ্ন করে।
“তো? বয়স হলো না? বিয়ে করতে হবে না?”
“কি করবি বলে ঠিক করলি? লাল শাড়ি পড়বি আমার বিয়েতে? সেই প্ল্যানিং করছিস?”
“রুমঝুম আপু লাল পড়বে কেনো? লাল তো পড়বে শুধু তোমার বউ। তোমার বিয়ের সবকিছু ইউনিক হতে হবে। বিয়েতে বউ বাদে সবার লাল পড়া বারণ। কার্ডে লেখা থাকবে এটা। মেয়েটার নাম কি যেন আপু?”
রুমঝুম বলে, “তৌহিদা না?”
“হ্যাঁ তৌহিদাই। আরিফ ভাইয়ার সাথে কিন্তু হবু ভাবিকে দারুণ লাগবে।” জাইমা বলে।
“তা তো লাগবেই ভাইয়াও সুন্দর, আমাদের ভাবিও সুন্দর।” রুমঝুম বলে।
“তোরা কি নিয়ে কথা বলছিস?” আরিফ কপাল কুচকে রুমঝুমের দিকে তাকিয়ে বলে।
“লজ্জা পেয়ো না তো ভাইয়া। এই জেরিন, জাইমা ভাইয়াকে ভাইয়ার বিয়ের জন্য কংগ্র্যাচুলেট কর?”
জাইমা জেরিন একসাথে কনগ্রাচুলেশন বলে। আরিফ দাঁতে দাঁত চেপে রুমঝুমের দিকে তাকিয়ে বলে, “ঝেড়ে কাশ। পরিষ্কারভাবে বল সবটা।!
“আরেহ ওয়েট। আমিও কংগ্র্যাচুলেট করি আগে। কনগ্র্যাচুলেশন আরিফ ভাইয়া।”
“থাপ্পড় খাস না রুমঝুম।”
“ওকে ওকে; বড় খালামণি তোমার জন্য মেয়ে দেখেছে তা তো জানোই? নিশ্চয়ই ছবিও দেখেছো? মাশাআল্লাহ মেয়ে এত সুন্দর! ভাবি আমাদের সকলের অনেক পছন্দ হয়েছে তাই না জেরিন?”
জেরিনও রুমঝুমের সাথে তাল মিলিয়ে মেয়ের শ’খানেক সুনাম করলো। আরিফ রুমঝুমের হাসি মুখের দিকে দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে আছে। জাইমা বলে,
“ভাইয়া আমরা সব বোনেরা কিন্তু সেইম ড্রেস পড়বো। রুমঝুম আপু ডিজাইন করবে। রুমঝুম আপুর ফ্যাশন সেন্স ভালো। এন্ড প্লিজ তোমার ওই টক্সিক ফুপাতো, চাচাতো বোনদেরকে আমরা আমাদের আশেপাশে রাখবো না।”
রুমঝুম হাসতে হাসতে জাইমার সুরে সুর মিলিয়ে বলে,
“অবশ্যই। আমাদের সবার বড় ভাইয়ের বিয়ে। আর ভাইদের মধ্যেও তো প্রথম বিয়ে। আমরা মজা করবো না তো কে মজা করবে? আরিফ ভাইয়ার বিয়ের সব আমি ডিজাইন করবো। এত কষ্ট করে ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে পড়াশোনা করছি কেনো যদি খালাতো ভাইআআর বিয়েতে ডিজাইনই না করতে পারি?”
রুমঝুমের টান আরিফ বাদে কেউ বুঝলো না। আরিফের দিকে তাকিয়ে মুখে সর্বোচ্চ হাসি নিয়ে বলে,
“ভাইয়া তোমার আর ভাবির সব কস্টিউম কিন্তু আমি ডিজাইন করবো। কিছুই কিনবে না। সব আমার ডিজাইন করা ড্রেস বানাতে হবে তারপর ওগুলোই পড়তে হবে। একদম মেহেদী, হলুদ, বিয়ে, বা..”
বা বলেই থেমে গেল। মাথা দুদিকে নাড়িয়ে বলে,
“সরি সরি! রিসেপশন সবকিছুর ড্রেস আমার ডিজাইন করাটাই পড়তে হবে। আমি ভাবির হাতে মেহেদীও দিয়ে দিবো সমস্যা দিবো। মাঝে বড় বড় করে আরিফ লিখবো। আরিফ প্লাস আলিশা ওয়াও। চমৎকার। একদম পারফেক্ট নাম। এখনই শুনে মনে হচ্ছে মেইড ফর ইচ আদার।”
জাইমা রুমঝুমের কানে ফিসফিস করে বলে,
“বাসরও সাজিয়ে দিও।”
“কেনো সাজাবো না? অবশ্যই সাজাবো।”
আরিফ ওদের ফিসফিস করে বলা কথা শুনলো। রাগে ওর রক্ত গরম হয়ে যাচ্ছে। রুমঝুম বরাবরের মতো ফাজলামো করছে না সেটা আরিফ কথার টোনেই বুঝতে পারছে।
জেরিন বলে, “আসলেই অনেক ভালো হবে। আরিফ ভাইয়াকে তৌহিদা ভাবির সাথে যা লাগবে না!”
বলতে দেরী আরিফের বাজখাঁই ধমক দিতে দেরী হলো না। আরিফ চেঁচিয়ে বলে,
“বের হো। সবগুলো এখুনি চোখের সামনে থেকে যা। নইলে হাতের কাছে যা পাবো তা দিয়েই মাইর খাবি। বের হো।”
জাইমা, জেরিন সুরসুর করে বেরিয়ে গেল। ওদের সাথে অবশ্য রুমঝুমও বের হলো। জাইমা জেরিন বলে গেল,
“তোমাকে নাম্বার পাঠিয়ে দিবো ভাবির। ভাবির সাথে কথা বলো প্লিজ। সামনের শুক্রবারই তো বিয়ে। আগে থেকেই কথা বলে রাখা ভালো। নাহলে দেখা যাবে মামির মতো বিয়ের পর মরে মরে থাকবে।”
আরিফের গা জ্বলে গেল জাইমা জেরিনের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা রুমঝুমের হাসি মুখ দেখে। বাগে পেলে থাপ্পড়ে যদি ওই হাসি না ছুটিয়েছে তবে আরিফও মোঃ আরিফ হাসান নয়। বিছানার উপর থেকে মোবাইল নিয়ে হাসনাহেনার রুমে দিকে যায়। আরিফের মেজাজ ভীষণ খারাপ। পাঁচ বছর আগে আরিফ ওর আম্মুকে বলেছে ওনার বোনের মেয়েকে আরিফের পছন্দ, তাও ওর আম্মু কি করে সেই বোনের মেয়েকে কোন তৌহিদা, পৌহিদার ছবি দেখিয়ে বেড়াচ্ছে!
—————
রাত দশটা। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। নওশাদ ঘরের জানালা বন্ধ করে দেয়। জানালা বন্ধ না করলে পানি ছিটকে আসে এবং বই খাতা ভিজে যায়। আজ সাড়ে নয়টা নাগাদই পুনম আর নওশাদের রাতের খাওয়া শেষ। পুনম আজকাল ডিনারের পর এঁটো বাসনপত্র ধুয়ে রাখে, টেবিলে মুছে। কিছু কিছু পদও রান্না করা শিখে গিয়েছে।
হঠাৎ করেই কারেন্ট চলে গেল। নওশাদ ফোনের ফ্লাশলাইট অন করে রুম থেকে বের হয়। রান্নাঘরের দিকে যায়। পুনম মোমবাতি জ্বালিয়েছে সবে। নওশাদ পিছন থেকে ডাক দেয়,
“এই সময় লাগবে?”
“আল্লাহ গো!”
অন্ধকারে আচমকা পিছন থেকে নওশাদের কন্ঠস্বর শুনে পুনম আঁতকে উঠে। দু পা পিছিয়েও যায়। নওশাদ ভ্রু কুচকে তাকায়। পুনম তখনও বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে, বুকে হাত রেখে হাঁপাচ্ছে।
নওশাদ বিরুক্ত হয়ে বলে, “এমন বাজে রিয়েকশন দিচ্ছো কেনো?”
“ভয় পেয়েছি আমি। অন্ধকারে এভাবে হুট করে ডাকে মানুষ?”
নওশাদ ফোনের ফ্লাশলাইট অফ করে ফেলে। “কাজ শেষ?”
“হুম।”
“রুমে আসো।”
পুনম নওশাদের পিছন পিছন রুমে আসে। পুনম ওয়ারড্রবের উপর মোমবাতি রাখে। নওশাদ খাটে বসে বলে,
“সন্ধার পর পড়তে বসার কথা ছিল।”
“আমি তো বসতামই। কিন্তু ভাবি কল করেছে দেখেননি?”
“তুমি দু-ঘন্টা ধরে কি লাভের কথা বলেছো সেটা আমাকে বোঝাও। মা, ভাবির সাথে কোন কোন মহিলার সমালোচনাই তো করেছো। বিশ্রি কাজ-কারবার। এরথেকে দুঘন্টা পড়লেও তো কাজে দিতো।”
পুনম বিরক্তিতে মুখ কুচকে তাকিয়ে রইলো। নওশাদ বলে, “এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো?”
“বিশ্রি কথা বলিনি। কত ইন্টারেস্টিং কথা বলেছি। আমার আমাদের কথাগুলো একটুও মজা লাগেনি?”
“মন চেয়েছে কানের নিচে একটা দিয়ে বই নিয়ে পড়তে বসাই। সে আবার জিজ্ঞাসা করছে মজা পেয়েছি কিনা।”
“কানের নিচে একটা দিয়েই দেখুন কি করি।”
“কি করবে?”
“মামলা ঠুকে দিবো।”
“আমি দিলেই না তুমি মামলা ঠুকবে।”
পুনম মুখ কুচকে বলে, “আপনার মতো বোরিং মানুষ আমি জীবনে দুটো দেখিনি। নিজেও আমার সাথে অতটা কথা বলেন না, এখন আমি মা, ভাবির সাথে কথা বলেছি তাতেও সমস্যা?”
“ভালো কথা তো বলোনি। কার ছেলের বউ কার সাথে ভেগেছে, জরিনার মেয়ের চেহারা সকিনার মায়ের মতো হয়েছে, তোমার মামাতো বোনের কুদ্দুসের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে। এগুলো কি ধরনের কথা?”
“এগুলো গসিপিং।”
“টাইম ওয়েস্ট ছাড়া কিছুই না।”
“ভালো।”
“বই নিয়ে বসো এখন।”
“কারেন্ট নেই।”
“মোমবাতি আছে, টর্চ লাইট আছে, তোমার আমার দুজনেরই ফোন আছে। কারেন্ট না থাকার সাথে না পড়ার সম্পর্ক নেই।”
পুনম বুকে হাত গুঁজে মুখ কুচকে তাকিয়ে থাকে। নওশাদও উঠে দাঁড়ায়। পুনমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে,
“কি হয়েছে?”
পুনম ফট করে বলে ফেলে, “আপসে পেয়ার।”
নওশাদ শান্ত চোখে তাকায়। পুনম বলেও বেকুব হয়ে গিয়েছে। নওশাদ জানালা খুলে দেয়। বাতাস আসে ঘরে। বই খাতা যাতে পানি আসলেও না ভিজে তাই বইগুলো সরিয়ে দিলো। এদিকে পুনম নওশাদকে বই সরাতে দেখে ভেবেছে নওশাদ ওকে পড়তে বসাবে। পুনম মুখ কুচকে বলে,
“আমি আপনার মতো লোক জীবনে দুটো দেখি নাই। এমন আনরোমান্টিক মানুষ কি করে হয়? নতুন বউ আমি এখনও হিসেবে। আপনি আমাকে নিয়ে ঘুরতেও বের হন না, আমার সাথে রাত জেগে গল্পও করেন না, আমাকে খাইয়েও দেন নাই। মিষ্টি, মিষ্টি কথাও নেই। ফিল্মে কতকিছু দেখায়, হাসবেন্ড ওয়াইফ এটা করে, ওটা করে আপনি কিচ্ছু করেন না। জীবনে নায়িকা নায়িকা ফিলও পেলাম না আপনার জন্য। নায়কদের মতো কোলেও তুলেন না। খালি টিচার টিচার ভাব।”
নওশাদ ঘাড় ঘুরিয়ে পুনমের দিকে তাকায়। পুনম সঙ্গে সঙ্গে থতমত খায়। নওশাদ রাশভারি গলায় বলে, “নায়িকা হতে চাও?”
পুনম তড়িৎ বেগে মাথা দুদিকে নেড়ে বলে, “সরি, সরি। আমার আসলে ভুলভাল বলার বাতিক আছে। আবেগের বশে ভুলভাল বলে ফেলি।”
নওশাদ টাউজারের পকেটে হাত গুঁজে বলে,
“তোমার নায়িকা হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও আমি নায়ক নই পুনম। জীবনে খুব একটা ফিল্ম দেখি নি। তাই আমি জানিও না ফিল্মে নায়ক নায়িকা ঠিক কি করে।”
পুনম ফের বলে, “ধূর ভুলে বলেছি আমি।”
নওশাদ পুনমের দিকে এগিয়ে আসে। “ফিল্মি ওয়েতে কি করে না, করে সেগুলো পড়ে দেখছি। তবে পরের শুক্রবার ঘুরতে নিয়ে যাবো মাস্ট, আগামীকাল নিজ খায়ে খাইয়েও দিবো, কোনো একদিন রাত জেগে গল্পও করবো প্রমিস। আফটার অল আমার লাইফে তুমিই আছো যাকে আমি প্রায়োরিটি দিবো, যার অভিযোগ শুনে নিজেকে শোধরাবো, যাকে নিয়ে ভাবলে, যার জন্য করলে জীবনে লাভ হবে। এগুলো সব আগামী দিনগুলোকে করতে হবে। এখন, এই মুহুর্তে যেটা করতে পারি সেটা হলো নিজেকে আনরোমান্টিক প্রুভ করা।”
পুনমের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। দুপা পিছিয়ে যায়। নওশাদ এগিয়ে আসে। পুনম পিছাতে পিছাতে ওয়ারড্রব পর্যন্ত যাওয়ার পরই নওশাদ পুনমের হাত টেনে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়। নওশাদ হাস্কি টোনে বলে,
“হাইট কত?”
পুনম মিনমিন করে বলে, “পাঁচ ফুট দুই।”
“আমার ঘাড় আর ঘাড় থাকবে না।”
পুনম ঢোক গিলে। ওয়ারড্রবের উপরই মোমবাতি। পুনমের মুখ মোমবাতির আলোয় চিকচিক করছে। নওশাদ শান্তভঙ্গিতে পুনমের কোমরে হাত রেখে ওকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে। নওশাদ গভীর দৃষ্টিতে পুনমের দিকে তাকিয়ে আছে। এতটাই গভীর, তীক্ষ্ণ, সূক্ষ্ম সেই চাহনি পুনম নওশাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলো না। চোখে চোখ রাখা বড্ড বেশি দায় হয়ে যাচ্ছে। দৃষ্টি লুকালো, মুখ ঘুরিয়ে ফেললো।
নওশাদ পুনমের গালে হাত রাখে। সহসাই পুনমের মুখ ঘুরিয়ে, গাল আলতো করে চাপ সৃষ্টি করে পুনরায় দৃষ্টি মেলাতে বাধ্য করে। মোমবাতির কমলা আভায় নওশাদের চোখে পুনমকে মারাত্মক লাগছে। নওশাদ পুনমের কানের কাছে মুখ এগিয়ে নিলো। ফিসফিস করে বলে,
“আনরোমান্টিকের তকমাটা উঠিয়ে ফেলা উচিত। সময়, সুযোগ দুটোই মন্দ নয়। কি বলো?”
পুনম ওড়না চেপে ধরে। নওশাদ নিজের বউয়ের এই মর্মাহত পরিস্থিতি দেখে হাসে। শব্দহীন সেই হাসি। পুনমের হাত মুঠোয় নিয়ে কপালে কপাল ঠেকায়। পুনমের বাম হাত নিজের বুকে চেপে ধরে। লজ্জায় পুনমের শ্বাস পড়ে না, পুনম শ্বাস নেয়ও না। নওশাদ অবশ্য মিনিটখানেক পরেই পুনমকে শ্বাস নিতে সাহায্য করে।
নওশাদ ফের পুনমের কপালে কপাল ঠেকায়। নওশাদের বড় বড় শ্বাস পুনমের মুখে আঁচড়ে পড়ছে। পুনম নওশাদের দিকে তাকালো। চোখাচোখি হতেই নওশাদের বুকে জোরে ধাক্কা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেও পারলো না। নওশাদ পুনমের ওড়না টেনে ধরেছে। ওড়নার একপ্রান্ত নওশাদের হাতে, অন্যপ্রান্ত পুনম শক্ত করে ধরে রেখেছে। নওশাদ একপা দু’পা করে এগিয়ে এলো। পুনমের হাত কাঁপছে। সেকেন্ডের মাঝেই নওশাদ পুনমকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। কানের লতিতে ঠোঁট ছোঁয়ানোর সময়ই শব্দ করে মেঘ ডেকে উঠলো। পুনম মৃদু কেঁপে ওঠে। স্বামীর স্পর্শে নাকি বজ্রপাতে সেটা কেবল পুনমই জানে। নওশাদ পুনমের বেণী খুলে দিলো।
পুনম নওশাদের বাহুডোর থেকে নিজেকে ছাড়াতে ছটফট করছে। নওশাদ পুনমের চুলের ভাজে মুখ ডুবিয়ে পুনমকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ধীমে গলায় বলে,
“তোমার কথামতো ফিল্মি ওয়েতে রোমান্টিক হওয়ার চেষ্টা করছি, তাহলে এমন ছটফট করছো কেনো?”
পুনম অস্থির হয়ে বলে, “লাগবে না রোমান্টিক হওয়া।”
“আমার নামে কখনো কোনো অভিযোগ আসলে ওই অভিযোগ না খণ্ডানো অব্দি আমি থামি না। তুমি অভিযোগ করেই ফেলেছো; বাকিটা আমি করবো।”
পেট জড়িয়ে ধরে রাখা নওশাদের হাতের উপর হাত রেখে পুনম বলে,
“কি করবেন?”
পুনমকে ঝড়ের গতিতে নিজের দিকে ঘুরিয়ে পুনমের গালে হাত দিয়ে বলে, “রোমান্টিক হওয়ার ট্রাই করবো।”
সাথে সাথে পুনমকে ফিল্মি ওয়েতে কোলে তুলে নিলো। পুনম নওশাদের গলা জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ গুঁজে। বিছানায় পিঠ ঠেকলেও নওশাদ পুনমের গলা ছাড়ে না। নওশাদ পুনমের কানে ফিসফিস করে বলে,
“বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। ঘরে কারেন্ট নেই। শুধু মোমবাতির টিমটিম আলো। পারফেক্ট ওয়েদার ফর কাপল।”
পুনম নওশাদের গলা না ছেড়েই বলে, “আপনি এইসবও জানেন?”
“কি ভেবেছো শুধু ধমকাতেই পারি? উহু, অদ্বিতীয়া মাহনূরের স্বামী নওশাদ বিন নাসির সত্যি সত্যিই রাতের বেলা ভণ্ডামি করে। অদ্বিতীয়া মাহনূরের ভুলভাল কথা বলার বাতিক থাকলেও এই একটা ক্ষেত্রে সে খুব একটা ভুল কথা বলেনি।”
পুনম আর জবাব দিলো না, কেবল লজ্জাই পেলো বাকি সময়টা।
চলমান……
(মামার পৌষ মাস, ভাগিনার সর্বনাশ।)
(হ্যাপি রিডিং…)

