বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~ #পর্ব_১৪

0
57

#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_১৪
#সমৃদ্ধি_রিধী

কলিংবেলের শব্দে নওশাদের ঘুম হালকা হয়ে এলো। মুখ কুচকে ঘাড় বাঁকায়। পুনম নওশাদের বুকে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। নওশাদ হাত বাড়িয়ে পুনমের মুখের উপরে থাকা চুল সরিয়ে দিলো। নওশাদ পুনমের কপালে চুমু খেলো। পুনমের হুশ নেই, ঘুমে বিভোর পুরো। ফের কলিংবেল বেজে উঠতেই নওশাদের মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে ওঠে। পুনমকে সন্তপর্ণে বালিশে শুইয়ে দিয়ে পাশ থেকে খুলে রাখা টিশার্ট পড়ে নেয়। পুনমকে কাঁথা দিয়ে ভালো করে ঢেকে দিয়ে দরজা চাপিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।

দরজা খুলে অপরপ্রান্তে রুমঝুম, জেরিন, জাইমাকে দেখে অবাক হলো। নওশাদ অবাক হয়েই বলে,

“তোরা এখন?”

“রুমঝুম আপু একটু আগে এসেছে, আমরা একটু পর বড় খালামণির বাসায় যাবো। ইসরাত আপুও ওই বাসায়। মামি কোথায়?”

নওশাদ জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে, “গোসল করে।”

নওশাদ দরজার সামনে থেকে সরে না৷ ওরাও বাসায় ঢুকতে পারছে না। জেরিন আমতাআমতা করে বলে,

“আমরা নানুমণির রুমে গিয়ে বসি?”

নওশাদ দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়ালো। রুমঝুম, জেরিন, জাইমা লাইন ধরে হোসনেআরার রুমে চলে গেল। নওশাদ দরজা লাগিয়ে রুম আসে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে। এগারোটা বাজে? ও দরজা লাগিয়ে পুনমকে ডাকে। পুনম মুখ কুচকে তাকায়। নওশাদ পুনমের এলোমেলো চুল হাত দিয়ে গুছিয়ে দেয়। কোমল স্বরে বলে,

“উঠো। অনেক ঘুমিয়েছো।”

পুনম নওশাদের গলা জড়িয়ে ধরে। নওশাদের বুকে কপাল ঠেকিয়ে বলে,

“আরেকটু ঘুমাই? আপনিও ঘুমান না? আমি তাকাতে পারছি না।”

“রুমঝুম, জেরিন, জাইমা এসেছে। আম্মার ঘরে ওরা। তোমাকে খুঁজেছে। আমি বলেছি তুমি গোসল করছো। তাড়াতাড়ি গোসল করে ওইরুমে যাও।”

পুনম বিরক্ত হয়ে নওশাদের গলা ছেড়ে দেয়। “ধূর!”

নওশাদ পুনমকে টেনে তোলে। পুনম গাইগুই করে বলে, “আগে আপনি গোসলে যান। আপনি বের হলেই আমি গোসলে যাবে।”

“আমি বলেছি তুমি গোসল করছো। এখন আমার পরে তুমি গোসলে গেলে দেরী হয়ে যাবে।”

“প্লিজ প্লিজ প্লিজ।”

নওশাদ আর কিছু বললো না। তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। পুনম বিছানায় বসে ঝিমাচ্ছে। পুনম নওশাদের মোবাইল নিলো। নওশাদের মোবাইলের ক্যামেরা ভালো। পুনম এখন আর নিজের ফোনে ছবি তোলে না। নওশাদের ফোনে, নওশাদকে দিয়ে ছবি তোলায়। নওশাদ অবশ্য বিরক্তও হয় না। পুনম নওশাদের গ্যালারি ঘাটতে লাগলো। এখানে শ্বাশুড়ির বেশ কিছু ছবিও আছে। পুনম অবাক হয়, অসুস্থ অবস্থায়ও কতটা সুন্দর ছিলেন। যৌবনে নিশ্চয়ই আরো সুন্দর ছিলেন? পুনম স্বীকার করতে বাধ্য ওর পাঁচ ননাস, স্বামী সবাই হোসনেআরার মতোই সুন্দর হয়েছে। তবে হাসনাহেনা আর জুঁই ছাড়া কারো চেহারাই হোসনেআরার সাথে মিলে না। নিশ্চয়ই ওনারা বাবার মতো হয়েছে? শ্বশুরকে তো দেখেনি তাই পুনম বলতে পারছে না।

নওশাদকে পুনম একবার কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করেছিলো। নওশাদ কেবল ম্লান হেসে বলেছিল, ওর আম্মুর হাসিখুশি মুখ নাকি নওশাদের মনে পড়ে না। হোসনেআরার সবসময় একটাই চাওয়া ছিল মেয়েদের তো একটা গতি হয়েছে এবার ছেলে যেন সুখে থাকে। ছেলের ইনকাম হোক, ছেলে ভালো খেয়ে পড়ে থাকুক। জীবনে অনেক কষ্ট করেছে। এটাই।

পুনম নওশাদের ফেসবুকে ঢোকে। রাজনৈতিক জিনিসপত্র ভরা। নওশাদ কখনো প্রয়োজন ছাড়া পুনমের মোবাইল ধরে না। অন্যদিকে নওশাদের ফোনের নাড়িনক্ষত্র পুনমের মুখস্ত হয়ে গিয়েছে। কলেজের কয়েকটা মেয়ে নওশাদকে অযথাই মেসেজ দেয়। পুনমের এত রাগ লাগে! গ্রুপ আছে, ওখানেও তো পড়া জিজ্ঞাসা করা যায় নাকি? পার্সোনালি কেনো মেসেজ দিতে হবে? পুনম বোঝে না এইসব? অবশ্য এইসব নিয়ে পুনম নওশাদের সাথে ঝামেলা করে না। কেনো করবে? পুনম তো দেখছে যে নওশাদ মেসেজের উত্তর দেয় না। উত্তর দেওয়া দূরে থাক, মেসেজ সিনও করে না মাঝেমধ্যে। পুনম মনে মনে এত বকা দেয় মেয়েগুলোকে! কলেজে তো ও নিজেও পড়েছে, কোনদিন তো কোনো টিচারকে ন্যাকামি করে মেসেজ দেওয়ার সাহস পায়নি! অদ্ভুত!

পুনমের হাজারো ভাবনার মাঝে খট করে দরজা খোলার শব্দ হয়। নওশাদ কোমরে তোয়ালে পেঁচিয়ে বের হয়েছে। নওশাদ চুল ঝাড়তে ঝাড়তে বলে,

“যাও গোসল করে এসো।”

পুনম মোবাইল রেখে উঠে দাঁড়ায়। তোয়ালে, জামাকাপড় কিছু না নিয়েই ওয়াশরুমে চলে যায়। নওশাদ ঘাড় বাঁকিয়ে তাকিয়ে ছোট করে শ্বাস ফেলে। ওয়ারড্রবের প্রথম ড্রয়ার থেকে নিজের জামাকাপড় বের করে দ্বিতীয় ড্রয়ার থেকে পুনমের জামাকাপড়ও বের করে। টাউজার পড়ে বারান্দায় যায়। নিজের তোয়ালে মেলে দিয়ে পুনমের তোয়ালে নেয়। বিছানা গোছায়। পুনমের মোবাইলে চার্জ নেই। পুনমের মোবাইল চার্জে দেয়। পুনরায় ঘড়ির দিকে তাকায়। কপাল চুলকে নিজের অধঃপতনের হিসেব কষতে থাকে।

পুনম আরো বিশ মিনিট পর দরজা খোলে। কেবল মাথা বের করে নওশাদকে ডাক দেয়। নওশাদ বিছানার উপর থেকে নিয়ে পুনমের জামাকাপড়, তোয়ালে দেয়। পুনম পাঁচ মিনিট পর বের হয়। জামা গায়ের সাথে লেপ্টে আছে।

নওশাদ বিরক্ত হয়ে বলে, “গা মুছে ড্রেস পড়লে কি হয়? এগুলো কি ধরনের বদঅভ্যাস?”

পুনম আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছতে থাকে। বিড়বিড় করে বলে,

“শুরু হয়ে গিয়েছে জ্ঞান দেওয়া। সকাল হতে দেরী, জ্ঞান দিতে দেরী হলো না।”

নওশাদ শুনতে পায় না। ভ্রু কুচকে বলে, “কিছু বলেছো?”

“জ্বি বলেছি আপনার কথা শুনে চলবো এখন থেকে।”

“তোমার এইসব কথা গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশ্বাস হতো। খাতায় যা সব লেখা দেখেছি, এখন থেকে আর বিশ্বাস করা হবে না। নিশ্চয়ই মনে মনে পিন্ডি চটকে এখন ভালো মানুষির ভোল ধরেছো।”

ধরা খেয়ে পুনম পালিয়ে বাঁচতে চাইলো। তড়িঘড়ি করে রুম থেকে বের হবে তার আগেই নওশাদ ধমকে বলে,

“ওড়না নিচ্ছো না কেনো?”

পুনম জিভে কামড় দেয়। “ভুলে।”

রুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে আবার আসলো। নওশাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলে,

“বলছিলাম কি কিছু নিয়ে আসুন না?”

“কি আনবো?”

“ওই মোড়ের দোকানের পরোটা, ভাজি জাইমা, জেরিনের খুব পছন্দ। নিয়ে আসুন।”

“বাসায় বানাও।”

পুনম মুখ ছোট করে বলে, “প্লিজ?”

নওশাদ ভ্রু উঁচু করে তাকায়। পুনম নওশাদের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলে, “প্লিজ?”

“কয়টা আনবো?”

“আন্দাজ মতো আনবেন। আমি জানি না।”

“যাচ্ছি।”

পুনম যেভাবে ঝড়ের গতিতে এসেছিল, ওভাবেই ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেল। নওশাদ ড্রয়ার থেকে মানিব্যাগ বের করে। দুইশো টাকা নিয়ে নিজেও বেরিয়ে গেল।

——————

পুনম নওশাদের আনা পরোটা, ভাজি, ডাল প্লেটে নিয়ে রুমে নিয়ে আসে। জাইমা, জেরিন অবাক হলো বেশ। জেরিন বলে,

“পরোটা কে এনেছে?”

“তোমাদের মামা।”

জাইমা অবাক হয়ে বলে, “মামা? সত্যি?”

“হুম। এত অবাক হচ্ছো কেনো?”

রুমঝুম বলে, “মামা বাইরের পরোটা, ডাল খাওয়া পছন্দ করে না। আমরা আগে দু-একবার বলেছিলাম। ধমকে ধামকে অবস্থা খারাপ করে ফেলেছিল। আর আজকে এগুলো মামা নিয়ে এসেছে? সত্যি বলছো?”

পুনম উপর নিচে মাথা ঝাঁকায়। জেরিন বলে,

“আরেহ আপু খেয়ে নাও, মামা এনেছে। জীবনে আবার কবে সুযোগ পাও কে জানে? খাও আগে।”

ওরা খেতে থাকে। পুনম পরোটা চিবোতে চিবোতে ভাবছে নওশাদ যে বাইরের পরোটা ভাজি খাওয়া পছন্দ করে না এটা পুনম জানতো না। পছন্দ না হলে পুনম বলা মাত্রই যে নিয়ে এলো কেনো? তাছাড়া এর আগেও তো অনেকবার এনেছে। পুনম সকালবেলা খাওয়ার আর্জি জানাতো, নওশাদ মোড়ের দোকান থেকে পরোটা ভাজি এনে দিয়ে তারপর কলেজে যেতো। পুনমকেও নিষেধ করতো, কিন্তু পুনম এমনভাবে প্লিজ প্লিজ করতো যে শেষে নওশাদ হার মেনে নিয়ে আসতো। কখনো তো ধমকে চুপ করিয়ে দেয়নি! দুটো ধমক দিলে পুনম পরোটা কেনো আর কিছুই খাওয়ার আর্জি জানাতো না।

জাইমা বলে, “আরিফ ভাইয়া গতকালকে ফিরেছে জানো?”

“মিশন থেকে? এতদিন খোঁজ খবর ছিলো না কেনো? কোথায় ছিল?”

জেরিন পানি খেয়ে বলে, “সেই কাহিনি শুনবো আজকে গিয়ে।”

“যাবে আজকে?”

জাইমা বলে, “আরিফ ভাইয়ার আব্বু আজকে বাসায় থাকবে না। ব্যবসার কাজে ভোলা গিয়েছে। তাই আজকে যাবে। আবার কালকে সকালে চলে আসবো, কারণ উনি দুপুরে ঢাকা ব্যাক করবে। মামি লোকটার ব্যবহার যে কতটা বাজে সেটা তুমি তো জানো না। বড় খালামণি দেখে এতবছর সংসার করছে। আমি হলে কবের দিনে ওই লোকের সংসারে লাথি মারতাম।”

রুমঝুম বলে, “এভাবে বলিস না। খালামণির কষ্ট শুধু খালামণিই জানে। খালামণি সংসার করতো না তো কি করতো বল? নানাভাইয়ের অবস্থা ভালো ছিলো না। দুই খালামণির বিয়ে দেওয়া হয়নি তখনও। মামা ছোট। খালামণি চাইলেই তালাক নিয়ে চলে আসতে পারতো। কিন্তু বড় খালামণির তালাক হলে জবা খালামণি, জুঁই খালামণির বিয়ে দিতে কত সমস্যা হতো বল?”

জেরিন বলে, “একদিন রিমি আপু দেখেছে খালু বড় খালামণির গালে চড় মেরেছে। মামাও দেখেছে জানো। ইভেন খালামণিকে চড় মেরেছে মামার প্রসঙ্গে। সেদিনের পর থেকে মামা বড় খালামণির বাসায় যায় না। লাস্ট গিয়েছিল মনে হয় ইসরাত আপুর বিয়ের সময়।”

পুনম ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে থাকে। নওশাদ ওকে যদি খুলে বলতো তাহলে পুনম জীবনেও হাসনাহেনার বাসায় যাওয়ার জন্য জেদ করতো না।

জাইমা বলে, “আমরা সহজে যেতে চাই না বড় খালামণির বাসায়। কিন্তু খালামণি এমনভাবে জোর করে নাও করতে পারি না। আরিফ ভাইয়া, ইসরাত আপুও ভালো। কিন্তু মাঝেমধ্যে এমনভাবে কথা বলে ফেলে পুরো খালুর মতো লাগে। বাবার জিন তো আর ফেলে দেওয়া যাবে না।”

রুমঝুম বলে, “বাদ দে। আজকে আমরা দেখা করে আসবো। ইসরাত আপুও জোর করছে, আবার আরিফ ভাইয়াও এতদিন পরে এসেছে। আমরা ভাই-বোনেরা আমাদের মাঝে সম্পর্ক ঠিক রাখলেই হয়।”

জাইমা বলে, “মামি আমি, জেরিন, রুমঝুম আপু তো এখান থেকেই একটু পর যাবো বড় খালামণির বাসায়। রিমি আপু ভার্সিটি থেকে যাবে বললো। তাহিয়াকে ছোট খালু দিয়ে আসবে। মাহতাব ভাইয়া, মুমিত ভাইয়া, মাহাদী ভাইয়াও যাবে। তুমিও চলো প্লিজ। মজা হবে অনেক।”

পুনমের আলামীনের করা সেদিনের ব্যবহার মনে পড়ে। যেখানে নওশাদের সম্মান নেই, সেখানে পুনম যাবেই না। ও মেকি হাসি দিয়ে বলে, “না জাইমা। আমার কালকে একটা এক্সাম আছে। যাওয়া হবে না, অন্যদিন যাবো।”

“বড় খালামণি বলেছে তোমাকে নিয়ে আসার জন্য।”

“আমি আপার সাথে কথা বলবো। অন্যদিন যাবো।”

“রুমঝুম আপুও যেতে চাচ্ছিলো না। পরে ইসরাত আপু অনেক জোর করায় রাজি হলো।”

পুনম হেসে বলে, “আমাকে জোর করার কিছু নেই। আমার সত্যিই পরীক্ষা।”

রুমঝুম হাত ধুয়ে এসে পুনমকে বলে, “একটা খবর জানো?”

“কি খবর?”

“ইসরাত আপু কনসিভ করেছে।”

“তাই?”

“হুম। আমাকে কালকে বলেছে। তাই তো যাচ্ছি। নাহলে আমি যেতাম না এখন।”

“আলহামদুলিল্লাহ।”

“তো আমরা আবার আপু হচ্ছি কবে?”

পুনম ধরতে পারেনি প্রথমে। “আপু হবে কেনো…”

বলতে বলতেই থেমে গেল। মুখ লালও হলো। লজ্জা আড়াল করে বলে, “আরো পরে।”

“আমরা কিন্তু কিছুমিছু ধরতে পেরেছি হুহ? মামা এগারোটা পর্যন্ত ঘুমিয়েছে। মামার মতো মানুষ কেনো ঘুমাবে এতক্ষণ? কেনো? হুহ?”

“তোমাদের মামা কালকে অনেক রাত পর্যন্ত পরীক্ষার খাতা কেটেছে তাই।”

“তুমি কেনো এতক্ষণ ঘুমালে? তুমি মামাকে খাতা কাটতে সাহায্য করেছো?”

পুনম চোখ রাঙিয়ে বলে, “তোমরা কিন্তু তোমাদের মামা,মামিকে নিয়ে কথা বলছো। সম্মান করবে তা না! এমন করলে আমি আর কথা বলবো না কিন্তু।”

রুমঝুম বলে, “বুঝি বুঝি। তুমি নাহয় জুনে হয়েছো আর আমি আগষ্টে হয়েছি। বছরটা তো একই।”

“রুমঝুম?”

“আচ্ছা আচ্ছা সরি! আর মজা করছি না।”

জেরিন, জাইমা হেসে উঠে। আরো ঘন্টাখানেক গল্প করার পর রিমি রুমঝুমকে কল দেয়। রুমঝুম রিমির সাথে কথা বলে। কল কেটে পুনমকে বলে,

“মামি আপ্পি কল দিয়েছে। এখন বের হবে বললো। তাহলে বের হই?”

“এখনই চলে যাবে? আরেকটু থাকো? আমাকে আবার একা একা থাকতে হবে।”

“কালকে আসবো নাহয়। আমার এক্সাম শেষ, ফ্রি আছি। এখন না বের হলে জ্যাম পাবো এখন।”

পুনম উঠে দাঁড়ায়। “তোমাদের মামাকে বলছি এগিয়ে দিবে।”

“লাগবে না।”

পুনম রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে বলে,

“দাঁড়াও। বলি আগে। তারপর দেখা যাবে লাগবে নাকি লাগবে না।”

নওশাদ তখন খাতা কাটছিলো। কালকে সাবমিট করতে হবে। পুনম নওশাদের পিছনে দাঁড়িয়ে বলে,

“ওরা চলে যাচ্ছে।”

নওশাদ ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, “এখন?”

“হুম।”

নওশাদ উঠে দাঁড়ায়। পুনম বলে, “মাসের তো শেষ দিক। আপনার হাতে টাকা আছে?”

“কেনো?”

“ওদেরকে ভাড়া দিয়ে দিন। এখন বড় আপার বাসায় যাবে বললো।”

নওশাদ মানিব্যাগ থেকে পাঁচশো টাকার নোট বের করে পুনমকে দেয়। “দিয়ে আসো।”

“আপনি দিন। আমি দিলে নাও নিতে পারে।”

নওশাদ রুম থেকে বের হলো। পুনমও পিছন পিছন আসে। রুমঝুমের হাতে টাকা দেয়। রুমঝুম একটু ইতিউতি করছিলো অবশ্য। পরে নওশাদের ধমক খেয়ে ঠিকই নিয়েছে। ওদের বিদায় দিয়ে নওশাদ দরজা লাগাতেই পুনম নওশাদকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে।

নওশাদ বুকের উপর থাকা পুনমের হাতের উপর হাত রেখে বলে,

“কি?”

“কিছু না।”

“আবার কি শুনেছো যে আমার প্রতি ভালোবাসা উতলে পড়ছে?”

“কিছু না।”

“তো কি হয়েছে?”

নওশাদকে ছেড়ে দেয়। নওশাদ পুনমের দিকে ফিরতেই পুনম বলে, “কিছু না।”

নওশাদ কপাল চুলকায়। “পড়তে বসো। খেয়েছো, গল্প করেছো। এখন তুমি পড়বে, আমি খাতা কাটবো। পরে দুজনে মিলে দুপুরের রান্না করে ফেলবো।”

পুনম আগে আগে হেঁটে রুমে আসে। বই নিয়ে খাটে বসে। নওশাদও বসে বলে,

“ওরা তোমাকে বড় আপার বাসায় যাওয়ার অফার দেয়নি?”

“দিয়েছে।”

“যাওনি কেনো?”

“এমনিতেই। মন চাচ্ছিলো না।”

“ওহ।”

পুনম বই খুলে বলে, “ইসরাত কনসিভ করেছে।”

“কে বলেছে?”

“রুমঝুম বললো।”

“ওহ।”

“আপনাকে বলতে নিষেধ করেছে। ওদের নাকি লজ্জা লাগে।”

“তাহলে বললে কেনো?”

“জানি না। ওহ হ্যাঁ আরিফ ফিরেছে কালকে।”

“আপা বলেছে আমাকে।”

“আমাকে তো বললেন না?”

“মনে ছিল না।”

পুনম বই নিয়ে বসলো। ওর আসলে মন খারাপ লাগছে। কেনো জানে না তবে ওরা যাওয়ার পর থেকেই মন খারাপ লাগছে। নওশাদ আড়চোখে দেখে। বই নিতে বললো আর নিয়ে ফেললো? এত বাধ্য মেয়ে তো বিয়ে করেনি নওশাদ। আবার মুখটাও কালো করে রাখা।

“মামি হওয়ার বয়সে আমাকে বিয়ে করে নানি হয়ে যাচ্ছে তাই মন খারাপ?”

“মানে?”

“ইসরাতরা বয়স অনুযায়ী আমার বোন হওয়ার কথা। ভাগ্যক্রমে ওরা আমার ভাগ্নী। তো তোমার হিসেবে মামি হলে পারফেক্ট হতো। এখন নানি হয়ে যাচ্ছো।”

পুনম জবাব দিলো না। ওর সাথে থাকতে থাকতে নওশাদও পাগল হয়ে যাচ্ছে।

——————–

হাসনাহেনা কাঁথা সেলাই করছে। হাসনাহেনা, রিমি, রুমঝুম, জেরিন, জাইমা হাসনাহেনার রুমে। ইসরাতও ছিল কিন্তু কিছুক্ষণ আগে বমি হওয়ায় নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে আছে। আরিফ বাইরে গিয়েছে। রিমি মুখ কুচকে ছবি দেখে হাসনাহেনাকে বলে,

“খালামণি তুমি কিছু বলছো না কেনো?”

“আমি কি বলবো? তোর খালু বিয়ে ঠিক করেছে।”

জেরিন বলে, “আরিফ ভাইয়া জানে না?”

“জানে।”

জাইমা বলে, “রেগে যায়নি?”

“হুম।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

রুমঝুম শুকনো গলায় বলে, “সব ঠিকঠাক?”

“তোদের খালু এইখানেই ছেলের বিয়ে দিবে। ওনার বন্ধুর মেয়ে। মেয়েটাকে সরাসরি অনেকবার দেখেছি। ভালো মনে হয় নাই। উগ্র অনেক। পোশাক-আশাকের ঠিক নেই। বেয়াদব প্রকৃতির মেয়ে। আমি নিষেধ করেছিলাম। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছে। আমি নাকি আমার মতো ফকিন্নি কাউকে এই বাড়িতে ঢোকাবো। আমার জন্য ছেলে বিগড়েছে। আমার আর সহ্য হয় না।”

রিমি বলে, “আরিফ ভাইয়া মেয়েটা সম্পর্কে জানে না?”

“না।”

রুমঝুম বলে, “মেয়েটা ভালো না হলে খালু বিয়ে দিতে চাচ্ছে কেনো?”

হাসনাহেনা জবাব দেয় না। উনি কেঁদে ফেলেন।

“আমার সংসারে আর শান্তি থাকবে না রে। বড়লোক ঘরের মেয়ে। মা মেয়ে দুটোই উগ্র। তোদের খালু তো টাকা দেখে ছেলেকে বিয়ে দিবে। আমার ছেলে সুখী হবে না রে। ওই মেয়ে সংসার করার মতো না। আমার ছেলেটার জীবন শেষ হয়ে যাবে।”

রিমি, রুমঝুম হাসনাহেনাকে জড়িয়ে ধরে। হাসনাহেনা কাঁদতে কাঁদতে বলে, “তোর খালু সেদিন বলে আমি নাকি আরিফের সাথে তোদের কাউকে বিয়ে দিতে চাই। আমি নাকি আরিফকে তোদের পিছে উস্কানি দেই। নাহলে ছেলেকে নিয়ে এত ঘনঘন বোনের বাসায় যাই কেনো? আব্বা, আম্মাকে ফকিন্নি, ছোটলোক আরো কত বাজে কথা বলেছে। মরা মানুষ দুটোকেও ছাড়ে না। আমি আমার পুরো ফকিন্নি পরিবারকে নাকি ওনার ঘাড়ে বসিয়ে খাওয়াতে চাই। আরিফ যদি ওই মেয়েকে বিয়ে করতে না চায় তাইলে নাকি আমাকে তালাক দিবে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে, ছেলে বিবাহ উপযুক্ত হয়েছে এইসব অশান্তি কেমন লাগে?”

জেরিন, জাইমাও হাসনাহেনাকে জড়িয়ে ধরে। রিমি বলে,

“আরিফ ভাইয়া বা ইসরাত আপুকে বলো নাই?”

“আরিফ, ইসরাতকে বলিস না। ওদের মুখের ঠিক নাই। বাপের সাথে ঝামেলা করলে পরে আমাকে সহ্য করতে হয়। আব্বায় কি দেখে যে আমাকে বিয়ে দিয়েছে কে জানে? ঊনত্রিশ বছরের সংসারে একদিনও শান্তি পাই নাই। একদিনও না। আমার মরণও হয় না। মাঝেমাঝে মন চায় গলায় দড়ি দেই। নামাজ কালাম নাই, যাকাত দেওয়া নাই, হজ, ওমরাহ করা নাই। পরের মেয়েকে যেমনে গালিগালাজ করে জাহান্নামেও ঠাঁই হবে না। মৃত্যুর ভয় নাই, কয় টাকা সাথে নিয়ে মরবে আমিও দেখবো।”

রুমঝুমের চোখ বেয়ে পানি পড়ে। হাসনাহেনা বলে,

“রুমঝুমকে সেদিন কি অপমান করলো! আমার ভাইটাও আসে না। একদিন তাও বউ নিয়ে আসছে, নতুন বউয়ের কাছে যা পারে তাই বলেছে। দেখি নাই কি উপকার করেছে। একমাসে টাকা দিলে দুইমাস দেয় নাই। কুত্তা-বিলাইয়ের মতো ব্যবহার করেছে। আমি ভাইবোনের বড়। আম্মা-আব্বা নাই, দুদিন ভাইবোনগুলোকে বাসায় আনতে পারি না। তোরা একটু বুঝাইস। আরিফ যাতে ওই মেয়েকেই বিয়ে করে একটু বুঝায় বলিস। আরিফকে ঝামেলা করতে মানা করিস। আরিফ অশান্তি করলেই তোদের খালু আমার গায়ে হাত উঠাবে। যেদিকে চোখ যায় চলে যেতে পারতাম। ভালো লাগে না এইসব। আরিফকে একটু বলিস ওর বাপের কথা মতো বিয়ে করে নিতে।”

রিমি বলে, “আচ্ছা বোঝাবো ভাইয়াকে।”

হাসনাহেনা রুমঝুমকে বলে, “আম্মু একটু আরিফকে বলিস বিয়ে করে নিতে। পরের শুক্রবারেই বিয়ে। তোর খালুর সেদিনের কথা তো শুনছোসই।”

রুমঝুম ঠোঁট কামড়ে খালামণির দিকে তাকিয়ে থাকে। বড্ড আফসোস হচ্ছে, বড্ড! কি দরকার ছিল আরিফকে ভালোবাসার। কি দরকার ছিল? ভালোবাসলেও রুমঝুম পারবে না ভালোবাসার জন্য বাবা, মা, খালামণি সবাইকে কষ্ট দিতে। এমনিতেও ওর জন্য ওর বাবাকে অনেক কথা বলা হয়েছে। আর না!

চলমান…….

(রি-চেক করিনি। যে কাহিনী পাকাচ্ছি, ২০ পর্বে শেষ হবে না। হ্যাপি রিডিং)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here