বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~ #পর্ব_১৩

0
64

#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_১৩
#সমৃদ্ধি_রিধী

দেড় মাসের মতো সময় কেটে গিয়েছে। বসন্তের শীতল আবহাওয়া কবেই শেষ। এখন প্রচন্ড গরম পড়তে শুরু করেছে। নওশাদ কলেজ থেকে ফিরেছে কিছুক্ষণ আগে। বর্তমানে শক্ত চোখে পুনমের দিকে তাকিয়ে আছে। এদিকে পুনম আসামীর ন্যায় কাচুমাচু মুখ করে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে, মেঝেতে আঙুল ঘষছে। নওশাদ শার্ট খুলে রাখে। গরমে টেকা দায় হয়ে যাচ্ছে।

রাশভারি গলায় বলে, “কিছু বলার আছে?”

পুনম দুদিকে মাথা নাড়ে। নওশাদ পূর্বের ন্যায় শক্ত গলায় বলে,

“ফেল আসলো কেনো?”

বিয়ের ষোলোতম দিন থেকে পুনমের ইনকোর্স এক্সাম শুরু হয়েছিল। ওর সাবজেক্ট পাঁচটা। তার মধ্যে তিনটাতেই ফেল এসেছে। যার রেজাল্ট দিয়েছে তিনদিন আগে। পুনম নওশাদকে জানায়নি। নওশাদ আজ বাসায় ফিরে পুনমকে বিকাশ অ্যাপ থেকে মোবাইল রিচার্জ কিভাবে করে তা শেখাচ্ছিলো সেইসময় ওই সিরাত বদটা মেসেজ দিয়েছে রিটেকের ডেট জানাতে। সিরাত রিটেকের ডেট জানিয়ে পুনমের অনেক উপকার করেছে। পুনমের এত বড় উপকার কেউ কোনোদিনও করেনি। সিরাত মেসেজ দিয়েছে দিয়েছে একদম নওশাদের হাতে পুনমের ফোন থাকাকালীনই দিতে হলো? পুনম ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দাঁড়িয়ে থাকে। মুখে টু শব্দ নেই।

“এই আমার দিকে তাকাও।”

পুনম মাথাই তুলে না। তাকানো তো দূরের কথা। নওশাদ ধমক দিয়ে বলে,

“তাকাতে বলেছি না?”

পুনম তাকায়। নওশাদ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলে,

“বলেছিলাম না পড়াশোনা করতে?”

পুনম জবাব দেয় না। নওশাদ বলে, “উত্তর দিচ্ছো না কেনো?”

“জ্বি।”

“পড়াশোনা করেছো?”

পুনম ক্ষীণ স্বরে উত্তর দেয়, “না।”

“কেনো? তোমার পড়ার সময় দেওয়া হয়নি? পড়ার পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া হয়নি? নাকি তোমার বই খাতা নেই কোনটা?”

পুনম ঠোঁট কামড়ে মেঝের দিকে পুনরায় তাকিয়ে থাকে। নওশাদ উঠে দাঁড়ায়।

“বলেছিলাম না আমি শুধু রেজাল্ট দেখবো?”

“জ্বি।”

নওশাদ তোয়ালে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়িয়ে বলে,

“পরীক্ষায় ভালো করানোর দায়িত্ব এখন থেকে আমার। বই খাতা নিয়ে বসো। আমি আসছি।”

পুনম ঘড়ির দিকে তাকায়। ছয়টা পঞ্চাশ বাজে। এখন বই নিয়ে বসবে? ও কি স্কুল-কলেজ ছাত্রী নাকি! আজব! মুখ কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল। এতো বাজেভাবে ধরা খেলো? ধুরররর! পুনম বই খাতা নিয়ে বসলো না। নওশাদের টাউজার, টিশার্ট বের করলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খোঁপা করে রাখা চুল খুলে আঁচড়াতে লাগলো। গুনগুনিয়ে গান গাইছে,

“আমি কী দেখেছি হায়
একলা পথে দাঁড়িয়ে
সে ছিল দূরে দূরে তাকিয়ে
আহারে, আহারে
কোথায় পাবো তাহারে?
যে ছিল মনেরও গহীন কোণে,”

নওশাদ ওয়াশরুম থেকে বের হলো। পুনম তখম বেণী করছিলো। নওশাদকে দেখেও গুনগুনিয়ে গাওয়া বন্ধ হলো না। নিজের মতো গাইতে লাগলো,

“ও আমি কি দেখিনি হায়
বুঝিনি, শুনিনি হায়
তাহারও মনেরও আকুলতা
কেনো সে বোঝেনি হায়?
শোনেনি, জানেনি হায়
আমারও বুকেরও অবুঝ কথা,,”

নওশাদ পুনমের নেওয়া টিশার্ট ওয়ারড্রবে ঢুকিয়ে রাখলো। পুনম বেণী করে তা ডান কাঁধে রাখে। গান গাইতে গাইতেই নওশাদের দিকে ভ্রু কুচকে তাকায়। নওশাদ ওশান ব্লু কালারের একটা টিশার্ট বের করে পড়ে। পুনম ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বলে,

“আমার বের করা জামাকাপড় পড়লেন না কেনো?”

“টিশার্ট, টাউজার দুটোই কালো বের করেছো তাই।” বলেই টিশার্ট পড়ে।

“দুটোই কালো পড়লে কি হবে?”

“ওয়েটারের মতো লাগে। আমি দুটোই কালো পড়ি না। আই হোপ দেখেছো। ভালো লাগে না আমার।”

পুনম কথা বাড়ালো না এই প্রসঙ্গে। ও বুঝতে পেরেছে বিষয়টা। নওশাদ বারান্দায় তোয়ালে মেলে দিয়ে টেবিলের সামনে গিয়ে পুনমের বই খাতা, কলম নিয়ে বিছানায় বসে। পুনম কোমরে হাত দিয়ে তাকিয়ে থাকে। সিরিয়াসলি পড়াবে নাকি?

পুনম জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে, “চা খাবেন না? চা বানিয়ে আনি?”

“না লাগবে না। তুমি আমার সামনে বসো।”

“আপনি তো এইসময় চা খান। এখন চা না খেলে মাথাব্যথা উঠবে। আমি নিয়ে আসছি।”

নওশাদ চোখ রাঙিয়ে বলে, “বলেছি না লাগবে না?”

পুনম চোখ রাঙানো দেখে দমে যায়। মিনমিন করে বলে, “সন্ধ্যায় গোসল করেছেন। চা না খেলে ঠান্ডা লেগে যাবে। বানিয়ে নিয়ে আসি? তারপর পড়তে বসি?”

“না। এখনই বসো।”

পুনম মুখ কুচকে বসে। নওশাদ কয়েক পেজ দাগিয়ে দিয়ে বলে, “এগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ো। আমি পড়া ধরবো।”

পুনম মুখ কুচকে রাখে। রিটেকের ডেট কত পরে এখনই বুঝি বই নিয়ে বসতে হয়? পুনম ভার্সিটিতে পড়ে। ভার্সিটি লাইফে শুধু চিল আর চিল! তা না পুনমকে বই খাতা নিয়ে বসিয়ে দিয়েছে যত্তসব। নওশাদ উঠে দাঁড়ায়।

“পড়ো, আমি চা বানিয়ে নিয়ে আসছি। এসে আমি পড়া ধরবো। আহামরি কঠিন কিছু দেইনি পড়ার জন্য।”

পুনম মনে মনে হুবহু কথাগুলো বলে নওশাদকে ভেঙ্গায়। নওশাদ রুম থেকে বের হয়ে যায়। পুনম নওশাদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে আফসোস করে। কত সুন্দর লোক! আর ব্যবহার? পুরো মার্কামারা। পুনম লাজুক, নিজ থেকে তেমন কথাবার্তা বলতে পারে না, লজ্জা লাগে ওর। তা বলে নওশাদও গল্প টল্প করবে না। বেরসিকের ঘরে বেরসিক একটা।

ধূররর! দুটো ইন্ট্রোভার্টের জুটি হওয়া কি খুব দরকার ছিল? পুনম নাহয় মেয়ে মানুষ, মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। তাই বলে নওশাদ কি মেয়ে নাকি? রাত হলে লাইট নিভিয়ে দুটো মিষ্টি কথা বলে তাছাড়া আর কিছু না। মিষ্টি কথা বলে যে একদম শুধু দুটোই বলে। তিনটে বলে না। নওশাদ পুরুষ মানুষ হয়েও পুনমকে দেড়মাসে ওর সাথে ফ্রি করতে পারেনি এটা নওশাদের ব্যর্থতা। পুনমের কোনো দোষ নেই।

পুনম আরো আরো অনেক কথা ভাবতে থাকে। নওশাদ দুই কাপ চা নিয়ে রুমে আসে। পুনমকে মুখ কুচকে ওভাবে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে এসে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করে,

“এই পড়তে বলেছি না? কি ভাবছো?”

পুনম কেঁপে ওঠে। বইয়ের দিকে তাকায়। নওশাদ বসে। পুনমের দিকে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়ে বলে,

“চা খাও।”

পুনম নেয় না। ক্লান্ত গলায় বলে, “খাবো না। আমার না অনেক মাথা ঘোরাচ্ছে! বমি বমিও লাগছে।”

নওশাদ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলে,

“মাথা ঘোরানোর মতো, বমি আসার মতো কিছুই হয় নি।”

বারোটার পর লাইট নিভিয়ে ভোগলামি করে আবার বলে মাথা ঘোরানোর মতো কিছু হয়নি। নোয়াখাইল্লা বেডা এত ধুরন্ধরের ধুরন্দর! এত নিমচা শয়তানের শয়তান। পুনম নওশাদের ভোগলামির বর্ণনা দিয়েও শেষ করতে পারবে না।

পুনম দুহাতে মাথা চেপে ধরে বলে, “সত্যিই বলছি আমার ভীষণ মাথা ঘোরাচ্ছে, অনেক বমি বমি লাগছে। ভালো লাগছে না। মনে হচ্ছে এক্ষুণি মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাবো। আজকে না পড়ি, কালকে থেকে সিরিয়াসলি পড়বো প্রমিস।”

নওশাদ বুকে হাত গুঁজে গম্ভীর গলায় বলে, “আমি সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করি কাদের জানো? যারা পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েও পড়াশোনা করে না। অহেতুক বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলে তালবাহানা করে। তখন এত রাগ লাগে যে মন চায় একনাগাড়ে কানের নিচে শ’খানেক চড় দেই।”

পুনমের মাথা ঘোরানো, বমি বমি ভাব সব বাপ বাপ করে পালালো। বইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। নওশাদ বাজখাঁই ধমক দিয়ে বলে,

“বই সোজা করে ধরো ইডিয়েট।”

পুনম কেঁপে ওঠে। উল্টো বই সোজা করে ধরে বইয়ের লিখার দিকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকিয়ে রইলো। নওশাদের এমন হুটহাট ধমকে একদিন ও স্ট্রোক করে মরবে। তাই পুনম আজ রাতেই গোটা গোটা অক্ষরে ডায়েরিতে লিখে রাখবে ওর মৃত্যুর জন্য একমাত্র, কেবল এবং কেবল মাত্র নওশাদ বিন নাসির দায়ী।পুনম মারা গেলে তাহলে তদন্ত করা হলে নওশাদ বিন নাসির জেলে যাবে, বেশ হবে তখন। নাহলে দেখা যাবে পুনম মেরেছে বছরও গড়ায়নি, এই নোয়াখাইল্লা বেডা আরেকটা বিয়ে করে ঘরে তুলেছে। এই লোকের যে ছুঁকছুঁক স্বভাব! একে বিশ্বাস নেই।

নওশাদ ধমকে বলে, “চা খাও?”

পুনম চোখ মুখ কুচকে বলে, “না। চা দেখলেই বমি আসে।”

“প্রেগন্যান্সি কিট এনে দেই?”

পুনম আঁতকে উঠে বলে, “কেনো?”

“এত মাথা ঘোরানো, বমি বমি আসার কারণ সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। রেজাল্ট নেগেটিভ আসলে কানের নিচে দিবো একটা। এন্ড ইউ নো যে নেগেটিভই আসবে।”

পুনম তেজ দেখিয়ে বলে, “চা খাবো না।”

চায়ে চুমুক দিয়ে নওশাদ বলে, “খেও না। তোমাকে চা খাওয়াতে আমি মরে যাচ্ছি না।”

পুনম মনে মনে নওশাদকে বকা দিতে লাগলো। পুনমকে নওশাদ প্রায় দু’ঘন্টার মতো পড়ালো। পুনমের মাথা ঝিমঝিম করে উঠলো। তখন কলিংবেল বেজে উঠে। নওশাদ পড়া বোঝানো বন্ধ করে পুনমের দিকে তাকায়। পুনম আগেভাগেই বলে,

“পারবো না যেতে। আপনি খুলুন গিয়ে।”

নওশাদ বই বন্ধ করে উঠে গেল। পুনম ওর খাতা বের করে। খাতার পিছনের পেজে নওশাদের একগাদা বদনাম আগে থেকেই লেখা আছে। ওখানটায় তাড়াহুড়ো করে নওশাদের নামে আরো একগাদা কুকথা লেখে। এইসব তো নওশাদকে বলতে পারবে না মুখে, তাই লিখতে হলো। পেজটা ছিঁড়ে অন্যকোথাও রাখবে তখনই নওশাদ রুমে ঢোকে। পুনম তড়িঘড়ি করে অন্য খাতার ভিতর পৃষ্ঠাটা ঢুকিয়ে ফেলে।

নওশাদ পুনমকে বলে, “এই জাইমা এসেছে যাও।”

“কেনো?”

“আমি জানি না। তোমাকে দরকার বললো।”

পুনম বইয়ের ভাঁজে খাতা ঢুকিয়ে চলে গেল। একটু পর আসে। ওয়ারড্রব থেকে ন্যাপকিন বের করে নিয়ে যায়। নওশাদ দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে গেল। পুনমকে আর পড়তে বসানো যাবে না নওশাদ বুঝে গিয়েছে। তাই পুনমের বই খাতা গুছিয়ে টেবিলে রাখলো। এই টেবিলটা বড়ই। ডানপাশে নওশাদের বই, খাতা; বাম পাশে পুনমের বই। ডান দিকটা সবসময় গোছানোই থাকে। কিন্তু বামদিকে তাকানো যায় না।

নওশাদ সব গুছিয়ে ফেলে। বিছানা থেকে খাতা রাখার সময় খাতার ভিতর থেকে একটা কাগজ পড়ে। কাগজটা মাঝ বরাবর ভাজ করা। নওশাদ পড়তো না। কিন্তু ফ্লোর থেকে কাগজ তোলার সময় প্রথমেই চোখ পড়ে “নওশাইদ্দা” লেখাটায়। নিজের নাম দেখে ভদ্রতা বাদ দিয়ে কৌতুহলবশত কাগজটা খোলে। নওশাদের পুরোটাও পড়ার নিয়ত ছিল না। তবে কাগজের প্রথম লিখার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকে গেল।

প্রথমেই লিখা “জীবনে একটা নোযাখাইল্লা বেডা বিয়ে করেছিলাম।”

নওশাদের বুঝতে সময় লাগলো না। বিড়বিড়িয়ে বলে, “এত বড় মেয়ে হয়েও য় এর নিয়ে ফোঁটা দেয় না। গাধা।”

চোখ বুলিয়ে পুনমের লিখাগুলো পড়া শুরু করলো,

“গান গাইতে মন চায়,

“আমি জোয়ান একটা মাইয়া, মা ভাইয়ে ধইরা বিয়া দিয়া উপহার দিছে নোয়াখাইল্লা বেডা।

তো এই নোয়াখাইল্লা বেডা একটা একটা বর্বর প্রকৃতির লোক। এই বর্বর আবার সেই বর্বর নয়। এইটা বলেছি কারণ তার ভাব বেশি। আমার সাথে এমন ভাব দেখায় মন চায় ঘুমের মধ্যে তার নাকে একটা ঘুষি মারি। কিন্তু আফসোস মারতে পারি না। আমি ভয় পাই আপনারা আবার তেমনটা ভাববেন না। আসলে ওই নোয়াখাইল্লা বেডা অনেক চতুর। বেডায় দিনের বেলা আমাকে চিনেই না, মনে হয় যেন আমি ওনার প্রতিবেশী। উনি মেসে থাকে, আমি ওনার রুমমেট। কিন্তু রাত্রে..মানে বারোটার পর থেকে লোকের ভোলই পাল্টে যায়। ওয়েট ওয়েট.. এত সব বলছি কেনো? কেনো ঘুষি মারতে পারি না তা বলছি। লোকটা আমাকে জড়িয়ে ধরে চ্যাপ্টা বানিয়ে ফেলে। হাত ধরে ঘুমায়। আরো অনেক কিছু আছে সেগুলো বলা যাবে না। তো আমার তখন মায়া লাগে তাই ঘুষি মারতে পারি না।”

নওশাদ দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড়ায়, “ইডিয়েট একটা।”

পড়া শুরু করলো। “আরেকটা আশ্চর্যজনক ব্যাপারও আছে। বেডায় ভালোই ভদ্র। ওভারঅল ভালোই। মানে স্বামী হিসেবে ভালো, রুমমেট হিসেবেও ভালো। আশা করি বুঝেছেনই। তো কথা হলো আমার বিরাট একটা সমস্যা হয়েছে। তা হলো, ওই হারামজাদা নওশাইদ্দাকে দেখলে প্রেম প্রেম লাগে এখন। মানে ওই নওশাইদ্দা এত কিউট, কুচুপুচু, লুতুপুতু যে মন চায় গাল দুটো টানি, গালে হাত দিয়ে রাখি। যদিও টেনেছি, গালে হাত দিয়েছি সময় মতো, নওশাইদ্দাও তখন কিছু বলেনি। দিনের বেলা টানলে আবার ছ্যাতছ্যাত করতো। কিন্তু এইসব আবার তাকে মুখে বলা যাবে না। কারণ আমার লজ্জা বেশি। ওই নওশাইদ্দার তো মিনিমাম লজ্জা নেই, মানে একটুও নেই, একটুও না। এক চিমটিও না। কেনো তা বলা যাবে না। ওগুলো আঠারো প্লাস কথা। আমার বাইশ বছর বয়স হলেও এখনও লজ্জা বেশি, আঠারো প্লাস কথা বলার মতো লজ্জা এই বয়সেও ভাঙেনি।”

নওশাদ কপাল চুলকায়। এইসব কথা কাগজে কে লিখে? কাগজটা অন্যকারো হাতে পড়লে? যেভাবে খাতার ভিতর ঢুকিয়ে রেখেছে, অন্যকারো হাতে পড়তে কতক্ষণ? নওশাদের হাতে পড়লো না এভাবে? এতটা গাধা কি করে একটা মানুষ হতে পারে? নওশাদ কাগজ উল্টে অপর পৃষ্ঠার লিখাও পড়লো।

“আরেহ সেই। বাবর স্যারের ক্লাস করতে যে বোরিং লাগতো, নোয়াখাইল্লা বেডাকে নিয়ে লিখতে লিখতে দেখি ক্লাসের টাইম আরমসে পার করা যায়। এখন থেকে বিবাহিত জীবনের ওপস সরি বাঁশ জীবনের কাহিনি লিখে বাবর স্যারের ক্লাস কাটিয়ে দেওয়া যাবে অনায়াসেই। আরেহ সেই। নওশাইদ্দা কামের আছে তো!”

নওশাদ বিড়বিড় করে বলে, “ফেল এইজন্যই করেছে।”

পড়ের প্যারার অক্ষরগুলো বেশ এলোমেলো। দেখে মনে হলো খুব তাড়াহুড়ো করে লেখা। নওশাদের মনে হচ্ছে রিসেন্ট লেখা। ভ্রু কুচকে পড়লো,

“হারামজাদা নওশাইদ্দা তুই হলি গিয়ে জামাই। তুই প্রেম পিরিত করবি, বলবি তোমার পড়তে হবে না, আমার বউকে আমি বাইরে যেতে দিবো না। আমার বউকে দেখার অধিকার পরপুরুষের নেই। তা না! তুই পড়াচ্ছিস কেনো? মানে বেশি বেশি না? আর মাথা ঘোরানোর মতো, বমি আসার মতো কিছু হয় নি? তুই সাধু শ্লা? যদিও বমি আসার বিষয়টা সত্যি না, তাও ডাউটও করে না মানুষ? আজাইরা বেডা একটা। আমি আমার সব খাতায় লিখে রাখবো আমার মৃত্যুর জন্য নওশাদ বিন নাসির দায়ী। তখন দেখবো তো আমি মরলে কেমনে আরেকটা বিয়ে করোস! হুহ আসছে!”

নওশাদের প্রতিক্রিয়া বোঝা গেল না। কাগজটা সাইডে রেখে পুরো টেবিল গুছিয়ে খাটে বসে। পুনম তখন রুমে আসে। নওশাদ ঠান্ডা গলায় বলে,

“ও চলে গিয়েছে?”

“জ্বি।”

“দরজা লাগিয়েছো?”

“জ্বি।”

“এইদিকে আসো।”

পুনম আসলো। নওশাদ ইশারা দিয়ে বলে, “বসো।”

পুনম দেখলো বই খাতা সব গুছিয়ে রাখা। পড়তে হবে না ভেবে খুশি মনে বসলো। নওশাদ বলে,

“তোমাকে একটা জিনিস রিডিং পড়তে দিবো। এ টু জেড পড়বে, ওকে?”

“ওকে, কিন্তু বাংলা না ইংরেজি?”

“বাংলা।”

“আচ্ছা।”

নওশাদ কাগজটা পুনমের দিকে বাড়িয়ে দিল। পুনমের তো কাগজটা দেখেই মাথা ঘুরিয়ে গেল যেন। নওশাদের হাত থেকে কাগজটা দ্রুত নিয়ে ছিঁড়ে ফেললো। যত ছোট টুকরো করে ছিঁড়া যায় তত ছোট টুকরো করে ছিঁড়লো। লাফিয়ে উঠে কাগজগুলো জানালা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়। হাত ঝেড়ে বলে,

“কিছু নেই রিডিং পড়ার। কিচ্ছু নেই।”

নওশাদ উঠে দাঁড়ায়। পুনমের দিকে পা বাড়িয়ে বলে,

“ছিঁড়ে লাভ কি হলো? পড়িনি আমি? আর নওশাইদ্দা না? হারামজাদা বলেছো পড়িনি আমি? আবার ঘুষিও মারতে মন চায়? সাহস বেড়েছে ভীষণ? তারপরের প্রশ্ন আমি সাধু কিনা? না আমি সাধু না, একদমই না। সোজা কথায় স্বীকার করছি না। কি করবে? এতদিন বারোটার পর অসাধুগিরি দেখিয়েছি আর এখন, দশটার পর কেনো সাধু না তা দেখাবো। যেহেতু আমার লজ্জাই নেই, একটুও নেই, বিন্দুমাত্র নেই।”

পুনম পালানোর পথ পায় না। কি করবে? নওশাদকে তো শয়তানের চেয়ে কম কিছু লাগছে না। নওশাদ ঠিক পুনমের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। ওদের মধ্যে দূরত্ব কিঞ্চিৎ। নওশাদ পুনমের গালে হাত দিয়ে বলে,

“প্রেম প্রেম পায় না ভীষণ? দেখাও, আমিও দেখি কতটা গভীর প্রেম পায়। প্রেম প্রেম পেলে মানু্ষ ঠিক কি কি করতে পারে আমিও দেখবো আজকে।”

পুনমের গালে চুমু খেয়ে বলে, “এক বিয়ে করেই বউয়ের যে ভেলকির নাচ দেখতে পাচ্ছি, আরেকটা বিয়ে করার শখ নেই।”

পুনম পিটপিট করে তাকিয়ে থাকে। নওশাদ পুনমের চুল ঠিকঠাক করে বলে,

“জীবনে অনেক সিনেমা দেখেছো না? বিশেষ করে সিরিয়াল?”

পুনম উপরে-নিচে মাথা ঝাঁকায়। নওশাদ পুনমের গাল আলতো করে চেপে ধরে বলে, “এইজন্যই তো বিয়ের রাতে শুনেছি বিয়ে মানবো না, তারপর সময় লাগবে, বেশি না একসপ্তাহ দিলেই হবে, তারপর আবার প্রেম প্রেম পায়। এত সিরিয়াল দেখে লাভ কি হলো? দিনশেষে তো ফেলই করো আর গাধাই রয়ে গেলে।”

পুনম নওশাদের বুকে ধাক্কা মেরে দৌঁড়ে পালাতে গিয়েও পারলো না। নওশাদ পুনমের হাত টেনে ওকে বুকে জড়িয়ে নেয়। পুনম ঢোক গিলে। ভোগলামি শুরু হলো বলে।

চলমান………

(হ্যাপি রিডিং…)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here