বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~ #পর্ব_১২

0
59

#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_১২
#সমৃদ্ধি_রিধী

নওশাদ বাজার নিয়ে এসেছে ঘন্টাখানেক আগে। ওগুলো এখন পরিষ্কার করছে। পুনম রান্নাঘরের দরজার সামনে নাকে ওড়না চেপে দাঁড়িয়ে আছে। নওশাদ রুইমাছ ধুয়ে তা বক্সে ঢুকিয়ে ফ্রিজে রাখে। পুনমের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলে,

“সহ্য না হলে রুমে চলে যাও।”

“আপনার ঘৃণা লাগছে না? নাকে গন্ধ লাগছে না? আবার রক্তও লেগে আছে হাতে।”

“অভ্যাস আছে।”

পুনম চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। নওশাদ মুরগিও ধুয়ে ফ্রিজে রাখে। পুনমকে জিজ্ঞাসা করে,

“কয়টা বাজে?”

পুনম মোবাইলে সময় দেখে। বলে, “দশটা তিন।”

নওশাদ দ্রুত হাত চালায়। ওগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতেই বলে,

“জীবনে রান্নাঘরের দুয়ারেও যাওনি না?”

“আম্মু ভাবি যেতে দেয়নি। আমার দোষ নেই।”

“এখন আমি ঢুকতে দিচ্ছি না। এটায় কি আমার দোষ?”

“আমি তখন শিখতাম না, এখন দেখে দেখে শিখে নিচ্ছি। ভবিষ্যতে সব আমিই করবো।”

“ইনশাআল্লাহ।”

“আপনার আর কতক্ষণ লাগবে?”

“কেনো কোনো দরকার?”

“বড় আপা আপনাকে না পেয়ে আমাকে কল করেছিল। আমি বলেছি আপনি বাজারে গিয়েছেন। আপা বলেছেন আপনি ফিরলে আপনাকে যেন বলি আপাকে কল দিতে।”

নওশাদ ফ্লোর মুছতে মুছতে বলে, “মুখস্ত করেছিলে নাকি এভাবে ফরফর করে বলেছো যে?”

পুনম আসলেই মনে মনে কথা রেডি করে তারপর বলেছে। তাই জবাব দিলো না কোনো। নওশাদ আরো আধাঘন্টা লাগিয়ে রান্নাঘর পরিষ্কার করে। তারপর সোজা রুমে গিয়ে ওয়াশরুমে ঢোকে। পুনম তো নওশাদের পিছন পিছনই ঘুরঘুর করে। নওশাদ অন্যান্য সময় গোসল করতে যাওয়ার আগে পোশাক নিয়ে যায়। তবে আজ নিলো না। পুনম নওশাদের বাসায় পড়নের টাউজার, টিশার্ট বের করে বিছানায় রাখে। টেবিলের উপর এলোমেলো হয়ে থাকা বইগুলো গোছায়। নওশাদ তখন দরজা খুলে।

“এই সময় লাগবে শোনো?”

পুনমের ইচ্ছে হলো জোরে চেঁচিয়ে বলতে, “শুনবো না, শুনবো না, শুনবো না।”

তা না করে ভদ্র মানুষের মতো ওয়াশরুমের দরজার সামনে গেল। “কি?”

“বেলকনি থেকে আমার তোয়ালেটা দাও তো।”

পুনম বারান্দা থেকে তোয়ালে এনে নওশাদকে দেয়।

“টাউজার, টিশার্ট দিবো?”

“লাগবে না।”

নওশাদ দরজা লাগিয়ে দিলো। পুনম বিছানার উপর বসে নখ কামড়াতে লাগলো। নওশাদ আরো মিনিট দুয়েক পর বের হয়। কোমরে কেবল টাওয়াল পেঁচানো। পুনম নওশাদের বুকের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। মেঝের দিকে তাকিয়ে পায়ের আঙুল দিয়ে মেঝেতে আঁকাআকি করতে থাকে। নওশাদ পুনমের দিকে তাকায় তারপর তাকায় পুনমের পাশে থাকা ওর পোশাকের দিকে।

ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। পুনম পাশ থেকে টাউজার, টিশার্ট নিয়ে রুমেই তা পড়ে নেয়। চুল মুছতে মুছতে বলে,

“কিচেনে আসো এখুনি।”

“কেনো?”

“রান্না করতে।”

“আমি তো পারি না।”

“আমি শিখিয়ে দিবো আসো।”

পুনম নওশাদের পিছন পিছন গেলো। নওশাদ প্রথমে পুনমকে মসুর ডাল রান্না করা শিখালো। তারপর আলু দিয়ে কাতলা মাছও রান্না করালো। সবশেষে ভাতটা নওশাদই বসায়।

পুনম বেশ উচ্ছ্বাসের সাথে বলে, “আল্লাহ কতকিছু রান্না করা শিখে গেলাম।”

খাবার ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিয়ে নওশাদ বলে,

“অল ক্রেডিট গোস টু মি।”

পুনম ভেঙ্গায়। রান্না শিখানোর সময় কতরকম হাঙ্গামা যে এই লোক করে তা যদি পুনম লজ্জার মাথা খেয়ে বলতে পারতো তাহলে তো হতোই। নেহাৎ-ই পুনম অনেক লাজুক তাই মুখে রা নেই। অন্য কেউ হলে ওই নোয়াখাইল্লা বেডাকে দেখিয়ে দিতো। হুহ!

পুনমের মনে পড়তেই পুনম বলে, “বড় আপাকে কল দিলেন না?”

“দিবো। আমার মোবাইল নিয়ে আসো।”

পুনম নওশাদের মোবাইল নিয়ে আসে। নওশাদ টেবিলে খাবার রেখে পুনমকে বলে, “প্লেটে বাড়ো। আমি কথা বলে আসছি। খেতে বসবো এখন।”

নওশাদ রুমে চলে যায়। পুনম কথা মতো তাই করলো। মনে মনে নওশাদকে বকা দিতে লাগলো,

“এ্যাঁহে কথা বলতে অন্যরুমে যাওয়া লাগে? আমার সামনে বললে কি হতো? ঢং, প্রাইভেসি দেখায়।”

পুনম খাবার বেড়ে চেয়ার টেনে বসে। গালে হাত দিয়ে বসে থাকে। নওশাদ আসে একটু পর। হাত ধুয়ে চেয়ার টেনে বসে। পুনম জিজ্ঞাসা করে,

“আপা কি বলেছে?”

“আফতাবনগর যেতে বলেছে।”

“যাবেন?”

“না।”

“ওমাহ কেনো?”

“ভালো লাগে না।”

“কেনো? বোনের বাসায় যেতে বুঝি ভালো লাগে না? এটা কোনো কথা?”

নওশাদ চুপচাপ খেতে থাকে। পুনম ঘ্যানঘ্যান করেই যাচ্ছে। “আপা কি আমাকে নিয়ে যেতে বলেননি?”

“বলেছে।”

“প্লিজ চলুন। আমি আফতাবনগরে কখনো যাইনি। আমি দেখবো ওখানে কি আছে।”

“কি আছে? ওটা একটা আবাসিক এলাকা। উঁচু দালানকোঠা আছে।”

“প্লিজ নিয়ে চলুন। কোথাও যাইনি বিয়ে হয়েছে পর থেকে।”

“গত শুক্রবার আমাদের বিয়ে হয়েছে। এরমধ্যে তুমি দুবার বাপের বাড়ি গিয়েছো। আবার বলছো কোথাও যাওনি?”

“বড় আপা আফতাবনগর থাকে, মেজো আপা থাকে মোহাম্মদপুর, সেজো আপা থাকে বড্ডায়, জবা আপার বাসা তো এটাই, জুঁই আপা থাকে গুলশানে। আমি আপনার বোনেরা যেখানে থাকে তার একটা জায়গায়ও যাইনি। নিয়ে গেলে কি হয়? নতুন জায়গা দেখতে ইচ্ছে হয় না বুঝি?”

“আবাসিক এলাকা দেখার কি হলো?”

“আপনি দেখেছেন তাই মনে হচ্ছে দেখার কিছু নেই। আমি তো দেখিনি, আমাকে একটু ঘুরতে নিয়ে গেলেও তো পারেন।”

“অন্যদিন নিয়ে যাবো।”

“প্লিজ আজকে চলুন। আজকে শুক্রবার। অন্যদিন তো আপনার সময়ও হয় না। একটু ঘুরে আসলে কি হয়?”

নওশাদ পুনমের দিকে ঠান্ডা চোখে তাকায়। পুনম থতমত খায়। মাথা নত করে, মুখ গোমড়া করে খেতে লাগলো। নওশাদ নিজেও খায়।

“ভাত দিবো একটু?”

পুনম প্লেট সরিয়ে ফেলে, “লাগবে না ভাত। ঘুরতে নিয়ে যায় না, ভাত খেয়ে কি হবে?”

নওশাদ পুনমের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। অমাবস্যার আঁধার নেমেছে নওশাদের বউয়ের মুখে। নওশাদ খাওয়া শেষ করে উঠে যায়। পুনম বিড়বিড় করে,

“পাষাণ একটা।”

নওশাদ হাত ধুতে ধুতে বলে, “বিকালে রেডি থেকো। একটু রেস্ট নিয়ে বের হবো।”

পুনম উচ্ছ্বাসের সাথে চেঁচিয়ে উঠে। “সত্যি নিয়ে যাবেন?”

“না মিথ্যা।”

“আচ্ছা আচ্ছা, আমাকে একটু ভাত দিন তো। খিদে পেয়েছে ভীষণ।”

নওশাদ ছোট করে শ্বাস ফেলে পুনমের প্লেটে এক চামচ ভাত দেয়। এঁটো প্লেট ধুয়ে দেয়। পুনমের খাওয়া শেষ হলে পুনমের প্লেটও ধুয়ে দেয়। নওশাদ রুমে এসে চোখের উপর হাত দিয়ে শুয়ে থাকে। আর পুনম? ও একটা সুন্দর, সিম্পল থ্রি পিস বের করে। ম্যাচিং করে হিজাব বের করে। নিজের সাথে মিলিয়ে নওশাদের শার্টও বের করে। টাকা জমিয়ে নওশাদকে সুন্দর, সুন্দর, ওর ড্রেসের সাথে ম্যাচিং করে শার্ট কিনে দিবে সেই প্ল্যান করে। নওশাদের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ পর পর ঠোঁটও বাঁকায়।

——–

নওশাদ পুনম সন্ধ্যার দিকে হাসনাহেনার বাসায় এসেছে। হাসনাহেনা নওশাদের সাথে আলাপ আলোচনা করলো আরিফের বিয়ে নিয়ে। ছেলে ঘরে থাকে না, সবার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে সিআইডিতে জয়েন করলো, জীবন-মরণের তোয়াক্কা করে না, কারো কথা শোনে না, চারদিন হলো ঢাকার বাইরে গিয়েছে; একবারও কারো সাথে যোগাযোগ করেনি। হাসনাহেনার ছেলের এহেন খামখেয়ালী আচরণে পাগল পাগল লাগে। ছেলে সুস্থভাবে ফিরলেই বিয়ে করাবো এমন সিদ্ধান্ত নেয়।

নওশাদ সব শুনলো। “যিগা ভালা মনে হয়, কর।” (যেটা ভালো মনে হয় কর।)

নওশাদের মাথায় অন্য চিন্তা। ওদিকে পুনম আরিফের আব্বুর সাথে ড্রয়িংরুমে বসা। আলামীনের কথাবার্তা ভালো না। নওশাদকে, ওর বাবা-মাকে হেয় করে কথা বলে। পুনমের ভালো লাগছে না। ঘুরে ফিরে এক কথা। গরীব ঘরের মেয়ে বিয়ে করে ওনার হয়েছে যত জ্বালা। নওশাদের আব্বা মরে ওনার কাঁধে সব চাপিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। জবা, জুঁইকে নিজের খরচে বিয়ে দিয়েছে। নওশাদের খরচ বহন করেছেন ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত।

এই যে নওশাদের পিছনে টাকা খরচ করেছে, শ্বাশুড়ির অসুস্থতার সময় নওশাদের তেমন ইনকাম ছিল না, তখন শ্বাশুড়ির খরচ বহন করেছে। শুধু কি ওনারই দায় নাকি সবার পিছনে টাকা খরচ করার? নওশাদের তো আরো বোন আছে, আরো বোনের জামাই আছে তাও সব করেছেন উনি। এখন নওশাদের ইনকাম ভালো। নওশাদ তো পারে সবটা পরিশোধ করতে তাও করে না। আবার এত বছর ওদের সংসার চালালো মুখে কোনো কৃতজ্ঞতা নেই। নওশাদকে বেইমান আরো কতকিছু বললো। পুনম উঠেও যেতে পারছে না। একটু পর আলামীন নিজ থেকেই উঠে চলে গেল।

পুনম হাসনাহেনার ঘরে যায়। হাসনাহেনা, নওশাদ কথা বলছিলো। তখুনি হাসনাহেনার ডাক পড়ে। হাসনাহেনা যেতেই পুনম নওশাদকে বলে,

“একটা কথা জিজ্ঞাসা করি?”

“দুলাভাই কি বলেছে সেটা বলো।” নওশাদের তীক্ষ্ণ চাহনি।

“উনি আপনার খরচ চালিয়েছে?”

“হুম।”

“ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত?”

“হুম। মাস শেষে আট হাজার টাকা দিতো।”

পুনম অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে, “আপনার আর আম্মার হতো তাতে?”

নওশাদের মুখ শক্ত। পুনম নওশাদের বাহুতে হাত রেখে বলে, “বলুন না? আমাকে সব বলেনও না আপনি।”

“কি বলবো? হোটেলে পার্ট টাইম কাজ করেছি সেটা বলবো? মানুষ খেয়ে উঠার পর টেবিল মুছেছি সেটা বলবো? এখন এগুলো শুনেছো ছেড়ে চলে যাবে? সংসার করবে না?”

পুনম বিস্মিত হয়। “হোটেলে কাজ করেছেন?”

“তো কি করতাম? আট হাজার টাকায় ঘর ভাড়া দেওয়া হতো না, বই কিনার টাকা হতো না, খাওয়া খরচ চলতো না তা বলবো? আপারা লুকিয়ে লুকিয়ে যা দিতো তা দিয়ে বই কিনতাম, অমাবস্যায় চাঁদ দেখার সুখ পেতাম তা বলবো? বড় দুলাভাই আমার খরচ চালিয়ে উপকার করে ফেলেছে। আম্মার চিকিৎসার খরচ দেওয়া মাঝপথে বন্ধ করে দিয়েছিল। টাকার অভাবে আমি ভর্তি পরীক্ষার ফরম কিনতে পারিনি। বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে ঢাবির একটাই কিনেছিলাম, আল্লাহর বিশেষ রহমতে তাই হয়েছে। যদি না হতো না এই নওশাদ এখানে থাকতো না। এখনও মানুষের লাথি খেতো।

মেজো দুলাভাই যে পর্যন্ত জীবিত ছিলেন আমরা ভালো ছিলাম। অনেক উপকার করেছিলেন উনি আমার। ভালো মানুষের ঠাঁই নেই দুনিয়ায়। উনিও নেই আর। সেজো দুলাভাই, মোতালেব ভাই নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী দিয়ে আম্মার চিকিৎসা করেছেন। আমার আম্মার চিকিৎসার খরচ পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে চালিয়ে গিয়েছেন। ওনারা সাহায্য না করলে চিকিৎসার অভাবেই আমার আম্মা মারা যেতো। অবশ্য হায়াতও ছিল৷ নাহলে আল্লাহ ছাড়া কার সাধ্যি মানুষকে বাঁচানোর? আমার সামর্থ ছিল না চিকিৎসার খরচ চালানোর। তারেক ভাইয়ের জন্য এখন চাকরি করছি। তারপরও ওনাদের কাছে নিজের খরচ চাইতাম?”

পুনম নওশাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। নওশাদ বড় বড় শ্বাস ফেলে ওয়াশরুমে চলে গেল। পুনম নওশাদের যাওয়ার পানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। নওশাদ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে পুনমের হাত ধরে বলে,

“চলো। বহুত শুনে নিয়েছো। বাসায় যাবো এখন।”

পুনম কথা বাড়ায় না। হাসনাহেনাকে বাসায় যাওয়ার কথা বললে হাসনাহেনা খেয়ে যেতে বলে। নওশাদ বারবার নিষেধ করলেও শোনে না। বক্সে একটু ইলিশ মাছ দিয়ে দেয়। পুনম নওশাদকে নিয়ে যখন বাসায় নিচে নামে তখন শুনতে পায় আলামীন গাড়ির ড্রাইভারকে বলছে,

“শালা আবার খাইতে চলে আসছে। এত বছর খাওয়াছি তাও হয় না। বোইনের কাছে আইলেই তো বোইনে খাবার দিয়া দিবো। আমার পুতের খবর নাই আজকা চারদিন, হেই দিকে খেয়াল নাই। নতুন বিয়া করছে, বউ লইয়া আইয়া পড়ছে খাইতে। বাপ মায় মরছে তো কি হইছে? বড় বইনেরে তো বড় ব্যবসায়ীর লগে বিয়া দিছে। ফয়দা তুলতে হইবো না?”

পুনম নওশাদের দিকে তাকায়। নওশাদের মুখ শক্ত। নওশাদ পুনমের হাতে জোরে টান মেরে বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে পড়ে। নওশাদ পুনমের হাত এতটাই জোরে ধরেছে যে পুনম হাতে ব্যথা পায়। তাও মুখে কিছু বলে না। ওর ভীষণ কান্না পাচ্ছে নওশাদের কথা ভেবে। নওশাদ যে ছোটবেলা থেকে ভীষণ কষ্টে বড় হয়েছে তা ও বুঝতে পারছে।

————-

বাসায় আসার পর থেকেই নওশাদের মন মেজাজ ভালো নেই। রাত একটা বাজলেও ঘুমাতে আসার নামগন্ধ নেই। পুনম বেশ কিছুক্ষণ যাবত এপাশ ওপাশ করে উঠে বসে। নওশাদ উদাস ভঙ্গিতে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। নওশাদের সেই উদাস মুখ পুনমের সহ্য হলো না। দৌঁড়ে নওশাদকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। নওশাদ ভারসাম্য রাখতে না পেরে জানালার গ্রিল শক্ত করে ধরে। দু পা সামনেও এগিয়ে যায়। নওশাদ পুনমের হাত ছাড়াতে চায় পুনম তাও ছাড়ে না। পুনম পিছন থেকে জড়িয়ে ধরেই নওশাদের বুকে হাত রাখে।

“মন খারাপ করবেন না প্লিজ। যে যা বলেছে বলেছে, সব কানে নিতে হবে না। আপনাকে এইভাবে দেখতে ভালো লাগছে না। বাসায় ফিরার পর থেকে আমার সাথেও কোনো কথাবার্তা বলেননি। এই বাসায় শুধু আমি আর আপনিই থাকি। আপনিও যদি কথা না বলেন আমার সময় কাটে না। আপনি চলে গেলে সারাদিন তো একা থাকিই, এখন আপনি বাসায় থাকাকালীনও কথা বলছেন না। আমার একা একা লাগে ভীষণ। এভাবে একা একা থাকা যায়?”

নওশাদ জবাব দেয় না। পুনম নওশাদকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। “সরি আমি জেদ না করলে আপনাকে ওখানে যেতে হতো না। কথাও শুনতে হতো না। আমি আর জেদ করবো না। আপনি যা বলবেন শুনবো। আমার বোঝা উচিত ছিল আপনি আমার থেকে ভালো বুঝেন, আপনি যেহেতু যেতে চাচ্ছিলেন না নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। সরি। আমি এখন থেকে আপনার কথা মতো চলবো। জেদ করবোই না।”

নওশাদ শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে অনেকক্ষণ পর পুনমের হাতের উপর হাত রেখে কাতর গলায় বলে,

“আমার দিনশেষে তুমি ছাড়া আর কেউ নেই পুনম। এগুলো কোনো সিনেমাটিক কথা নয়, সিনেমাটিক কথাবার্তা আমার সাথে যায়ও না। আমার আসলেই তুমি ছাড়া কেউ নেই। আব্বা বুঝ হওয়ার আগে থেকেই নেই, আম্মাও জীবনযুদ্ধে একা ফেলে আর নেই। বড় বোনেরাও নেই। বোনেরা বিয়ের পর পরের সংসারে গিয়ে চাইলেও থাকতে পারে না। এই নওশাদ বিন নাসিরের আপন বলতে সত্যিই পুনম ছাড়া কেউ নেই।”

লম্বা শ্বাস নিয়ে বলে, “জীবনে যাই হয়ে যাক, আমি থাকি আর না থাকি তুমি নিজের পায়ে দাঁড়াবে। প্রতিষ্ঠিত হবে, কখনো কারো কাছে হাত পাতবে না।আমি জীবিত থাকা অবস্থায় পাগলামি, বোকামি যা ইচ্ছে তাই করো, তবে আমি না থাকলে কখনোই ভেঙে পড়বে না। নরমদের কেউ নেই, নরমকে সবাই পিষে মারে। ভবিষ্যতে আমাদের সন্তান হলে আমার অবর্তমানে যাতে কখনো কোনো কিছুর অভাববোধ না করে, কখনো মানুষের জিনিস দেখে আফসোস না করে ‘ইস এটা যদি আমারও থাকতো!’ কখনো যাতে খাওয়ায় কষ্ট না করে। পরীক্ষার আগে ফরম ফিলাপ করার জন্য যাতে এর ওর কাছে হাত পাততে না হয়। তুমি আমার সন্তানকে কখনোই আমার মতো জীবন দিবে না সেই কথা দাও। তোমার কাছে আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। শুধু কথা দাও নওশাদ বিন নাসিরের সন্তান হলে তার অবর্তমানে তার সন্তানকে যেন তার মতো কষ্ট না করতে হয়। কথা দাও? ”

পুনম কথা দিবে কি? তার আগেই ফুপাতে লাগলো। ক্রমশ কান্নার বেগ বেড়ে গেল। নওশাদ নিজের দুঃখের কথা বলছিলো, পুনমের কান্না শুনে ও পুনমকে নিজের দিকে ঘোরায়। পুনমের দুগালে হাত রেখে বলে,

“কি? এভাবে কাঁদার কারণ কি?”

পুনম নওশাদের টিশার্ট শক্ত করে ধরে ফোপাঁতে ফোপাঁতে বলে, “আপনি এত খারাপ কেনো? হুম এত খারাপ কেনো?”

“কি করেছি আমি?”

“আপনি শুরু থেকে খারাপ ব্যবহার করেন আমার সাথে। এখন আবার উল্টাপাল্টা কথা বলছেন। একসপ্তাহ হয়েছে কেবল বিয়ের। এরমধ্যেই এইসব মরার কথা বলছেন কেনো? আমার খারাপ লাগে না? সংসার করার স্বপ্ন দেখি না আমি? আপনি আমাকে স্বপ্ন দেখানোর আগেই খারাপ খারাপ কথা বলে সবটা মাটিচাপা দিচ্ছেন কেনো?”

নওশাদ হাসলো। “হুট করে কি মারা যায় নাকি পাগল?”

“আমার আব্বু জানেন খুব ভালো মানুষ ছিল। সেদিন দুপুরবেলা আমরা সবাই একসাথে পর্যন্ত খেয়েছিলাম। কেনো জানি আব্বুর উপর খুব রেগে ছিলাম। আব্বু আমার প্লেটে ভাত তুলে দিতে চেয়েছিল আমি রাগ করে নেইনি। খেয়েদেয়ে আব্বু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে দোকানের উদ্দেশ্যে বের হলো। আমি ছ্যাতছ্যাত করেছিলাম অনেক। আব্বু তো সুস্থভাবে ঠিকই বের হয়েছিল তবে দোকানে পৌঁছাতে পারেনি আর। হাইরোডে এক্সিডেন্টে স্পটেই শেষ হয়ে গেল। তারপর থেকে মাথায় ওভাবে কারো হাতের স্পর্শ পাইনি। মানুষ হুট করেই হারিয়ে যায়। মানুষ বলে কয়ে হারায় না।”

নওশাদ পুনমকে জড়িয়ে ধরে। পুনমের মাথা বুকে চেপে ধরে। পুনম ফোপাঁতে ফোপাঁতে বলে, “এই যে আমার সবার উপর কত রাগ! কিন্তু আমি রাগ দেখাতে পারি না। আমার ভয় হয়। যদি আব্বুর মতো হারিয়ে যায়? আমি রাগ দেখিয়েছি আম্মু অসুস্থ হয়ে পড়েছে! আপনার উপরও তো আমার কত রাগ। আমি ভয়ে আপনার উপরও রাগ দেখাতে পারি না। আর আপনি উল্টাপাল্টা কথা বলছেন।”

“আমার উপর কি নিয়ে রাগ?”

“আপনি আমার সাথে শুরু থেকেই কেমন একটা ব্যবহার করেছেন। কথায় কথায় আমাকে খোঁচা মারেন। আমার কথার পয়েন্ট ধরে ধরে আমাকে রোস্ট করেন। আমি….”

“তোমার সাথে ফর্মালিটি মেইনটেইন করবো?”

“না। তা কেনো?”

“সবার সাথে যেমন মেপে মেপে কথা বলি তেমন মেপে মেপে বলবো?”

“না।”

“তাহলে আমার কথাবার্তা এমনই যেমনটা আমি তোমার সাথে বলি।”

পুনম নওশাদের টিশার্টে নাক মুখ মুছে। নওশাদ বলে,

“আমার আর কি নিয়ে রাগ?”

“আপনার ছুঁকছুঁক স্বভাব নিয়ে।”

“আমার ছুঁকছুঁক স্বভাব?” নওশাদ অবাক হয়ে বলে।

“কোমরে হাত রেখেছেন কেনো এভাবে? মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে পারছেন না? বউ কাঁদছে আর উনি কোমরে হাত দিয়ে রেখেছে। এটা তো ছুঁকছুঁক স্বভাবেরই পরিচয়।”

নওশাদ দ্রুত পুনমের মাথার হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। এই মেয়েকে সিধা ভেবে ভুল করেছে। এই মেয়ের মুখ ভালোই চলে। শুধু বোকা বোকা মুখ করে চলে এই যা৷ নওশাদ মুখ কুচকে বুকের দিকে তাকালো। পুনম নাকের পানি, চোখের পানি মুছে কি অবস্থা করেছে ছিহ! তবে আশ্চর্যের বিষয় দুঃখ প্রকাশ করছিলো নওশাদ। এখন ও পুনমকে সাত্ত্বনা দিচ্ছে। পুনম নওশাদকে নওশাদের দুঃখ প্রকাশ করার সুযোগই দিল না। একই মাঠ কাঁপিয়ে দিলো। এমনকি নওশাদের খারাপ লাগা পুনমকে সামলাতে গিয়ে কোথায় যেন গায়েব হয়ে গেল। সত্যিই গায়েব হয়ে গেল নাকি নওশাদ পুনমের চুলের ভাজে নাক ডুবিয়ে খারাপ লাগাকে লুকাতে চাইলো কে জানে?

চলমান…..

(হ্যাপি রিডিং….)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here