#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_৩৪(খ)
#সমৃদ্ধি_রিধী
সেন্টার থেকে ফিরেই পুনম প্রথমে শাড়ি পাল্টে নওশাদের ঢিলেঢালা টিশার্ট আর পায়জামা পড়েছে। বিছানায় বসে ঝিমোচ্ছে এখন। নওশাদ হাতে প্লেট নিয়ে রুমে আসে। পুনমের মুখোমুখি বসে ডাল দিয়ে ভাত মাখতে থাকে। পুনম বলে,
“লেবু আনেননি?”
“এনেছি।”
“লেবু চিপুন তাহলে।”
“টক ডাল গাধা। আবার লেবু চিপবো?”
“হুম। টক খেতে ভালো লাগে।”
নওশাদ লেবু চিপলো। পুনমকে খাইয়ে দিতে থাকে। পুনম চিবোতে চিবোতে বলে,
“আপনি খাবেন না?”
“উহু।”
“আপনিও আমার সাথে খান।”
“একে তো আম ডাল, এর উপর আবার লেবু। এত টক খেতে পারি না আমি।”
“আপনার জন্য যে আমাকে খেতে হচ্ছে?”
“মাফ করো।”
“আপনি জানেন জাইমা, জেরিন এতদিন মজা করেছে আমার একটুও খারাপ লাগেনি। কিন্তু এখন ওরা বেশি বেশি করছে।”
“আমি বকে দিবো।”
“না, কিছু বলতে হবে না। পরে বলবে মামি খারাপ।”
“তো ওদের কথা শুনে ওদেরকে কিছু না বলে আমাকে যে জাঁতাকলে পিষছো?”
“আপনার ভাগ্নি, আপনাকেই তো পিষবো। ওদের চোখে খারাপ হয়ে লাভ আছে?”
“পুরো কঠিন গৃহিণী।”
পুনম আর খেতে পারে না। নওশাদ জোরও করলো না। জোর করে খাওয়ালেই বমি করে। তার থেকে ভালো যতটুকু খেয়েছে তা-ই পেটে থাক। প্লেটে থাকা বাকি ভাতের দিকে নওশাদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর তা খেতে থাকে।
পুনম বলে, “এত টক খেতে পারছেন?”
“সমস্যা নেই।”
“আপনি না বেশি টক খেতে পারেন না?”
“তো ভাত ফেলে দিবো নাকি? কত কষ্টের টাকা আমার।”
পুনম আর কি বলবে? নওশাদ খেয়ে ফেলে। প্লেট রেখে হাত ধুয়ে আসে। বেডরুমে এসে দরজা লাগিয়ে দেয়। পুনমকে বলে,
“উঠো, ব্রাশ করো গিয়ে।”
পুনম কিউট মুখ করক বলে, “আজকে না করি? প্লিজ?”
“নো।”
পুনম মুখ কুচকে তাকিয়ে থাকে। নওশাদ ওর হাত টেনে তুলে। “পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে।”
পুনম ব্রাশ করে, হাত মুখ ধুয়ে এসে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ে। নওশাদ ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। ধমক দিয়ে বলে,
“এভাবে ধুপধাপ করে শুয়ে পড়ছো কেনো? কেয়ারফুল থাকতে হয় না?”
“কিছু হয় না।”
“বেশি বুঝবে না।”
“কি হয়?”
“রিস্ক অনেক।”
“মেয়েরা প্রেগন্যান্ট অবস্থায় কত কাজ করে জানেন? আপনি এমন ভাব করছেন যেন আমিই প্রথম মা হচ্ছি?”
“তুমিই প্রথম মা না হলেও তুমি এই প্রথমই মা হচ্ছো।”
পুনম চুপ করে গেল। নওশাদ চিরুনি নিয়ে ওর সামনে আসে।
“ধরো মাথা আঁচড়াও।”
পুনম উঠে বসে। “আপনি আঁচড়ে দিন।”
নওশাদ মাথা আঁচড়ে দিলো। পুনম বলে, “বেণী করে দিন।”
নওশাদ তাও দিলো। পুনম নওশাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আপনি আমাকে ইমম্যাচিউর ভাবেন না?”
“তোমাকে ম্যাচিউর ভেবে ম্যাচিউরকে অপমান করতে চাই না।”
পুনম অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। নওশাদ পুনমের সামনের কাটা চুল কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে বলে,
“বলো কি বলছিলে।”
“আমি কিন্তু অতটাও ইমম্যাচিউর না, আপনি যতটা ভাবেন।”
“আচ্ছা।”
“কি আচ্ছা?”
“তুমি ম্যাচিউর বুঝেছি আমি।”
“সত্যি বলছি। আমাকে ভাইয়ারা পুতুলের মতো রাখতো। তাই আমিও পুতুলের মতো থাকতাম। দ্যান আপনিও আমাকে পুতুলের মতো ট্রিট করেন। আমিও ওভাবে থাকি। আমাকে আসলে সবাই প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট দিয়ে খারাপ করে ফেলেছে।”
“দিন ফুরালো বলে।”
“মানে?”
“কিছু না।”
পুনমের চুল বেঁধে দিয়েই নওশাদ উঠে গেল। চারুনি জায়গা মতো রেখে জানালার পর্দা টেনে দিলো। লাইট নিভিয়ে দিলো। পুনম পাশবালিশ জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে। নওশাদও শুয়ে পড়লো। পুনম পাশ ফিরে শুয়ে ছিল। নওশাদ ওকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। পুনম সাথে সাথে নওশাদের হাতে থাপ্পড় দিয়ে বলে,
“সরুন। গরম লাগে আমার।”
নওশাদ ছেড়ে দিলো। চিৎ হয়ে বুকে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে ফেললো। চোখে যখন ঘুম লেগে আসে তখন পুনম নওশাদের হাতে টোকা দেয়। নওশাদ চোখ খুলে বলে,
“কি?”
“ওপাশে ফিরুন।”
“কোন পাশে?”
“আমার দিকে পিঠ দিয়ে ঘুমান।”
“কেনো?”
“বেশি কথা বলেন।”
নওশাদ ঘুরে গেল। পুনম নওশাদের পিঠে গাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে। একটু পর পুনম নওশাদের টিশার্টের নিচে হাত রেখে নওশাদের পিঠে নিজের গরম হাত চেপে ধরে। নওশাদ কপাল কুচকায়। পুনমের হাত ধরে বলে,
“গা এত গরম কেনো? জ্বর, টর আসবে নাকি?”
“হাত ধরেছেন কেনো? ছাড়ুন।”
নওশাদ পুনমের হাত টেনে বুকে চেপে ধরে। পুনম নওশাদের পিঠে দাঁত বসিয়ে দেয়। বলে, “হাত না ছাড়লে কিন্তু কামড় দিবো।”
“দাও।”
“বমি আসছে কিন্তু ছাড়ুন।”
নওশাদ ছেড়ে দিলো। পুনম নওশাদের পিঠে গরম হাত চেপে বলে,
“আপনার শরীর কি ঠান্ডা রে!”
“তোমার হাত গরম।”
পুনম নওশাদের পিঠে গাল ঘষে। নওশাদ পুনমের দিকে ফিরে। “তুমি কি বিড়াল? বিড়াল যেভাবে মালিকের গায়ে মুখ ঘষে তুমিও ওইভাবে ঘষছো কেনো?”
“এমনিতেই।”
নওশাদ পুনমের মাথা নিজের বুকে চেপে ধরলে পুনম নওশাদের পেটে চাপড় মেরে বলে, “ওপাশে ফিরুন।”
“সমস্যা কি?”
“এভাবে শুলে বমি আসে।”
নওশাদ পুনমকে ছেড়ে ওপাশে ফিরে গেল। পুনম নওশাদের পিঠে গাল লাগিয়ে রাখে। নওশাদ বুকে হাত গুঁজে বলে,
“বমি আসে বলে শুধু অজুহাত দেওয়া হয় না?”
“বেশি কথা বলবেন না। সব আপনার দোষ।”
“কি আমার দোষ?”
“আপনার জন্যই তো সব। আপনার জন্যই সবাই মজা নেয়। আপনার জন্যই আমি কোথাও ঘুরতে যেতে পারিনি৷ আপনার জন্যই খেতে পারি না৷ সব আপনার দোষ।”
নওশাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। পুনম ওভাবে নওশাদের পিঠে গাল লাগিয়ে শুয়ে থাকে। এভাবে শুয়ে থাকলে পুনমের ঘুম চলে আসে। বিড়বিড়িয়ে বলে,
“কোনদিন জানি এই লোকের পিঠের নিচে চাপা পড়ে আমি ভর্তা হয়ে যাই।”
__________________
রিমির বিয়ের দিন প্রচুর গরম পড়েছিল। অসম্ভব গরম যাকে বলে। পুনম সেন্টারে কিছুক্ষণ থাকার পরই অসুস্থ হয়ে পড়ে। নওশাদ আরিফের উপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে সেন্টার থেকে পুনমকে নিয়ে সোজা শনি আখড়ায় চলে আসে। সেদিন পুনম সারাদিন বমি করেছে। শেষ পর্যন্ত স্যালাইন দিতে হয়েছিল।
পুনমের অসুস্থতা যে সেদিন শুরু হয়েছিল এইযে এই মাসে নয়মাসে পড়লো তাও অসুস্থতা ওকে ছাড়েনি৷ অস্থির অস্থির লাগে, নয়তো গরম লাগে, নয়তো বাচ্চা এমন জোরে লাথি মারে, পুনমের পেট ব্যথা হয়ে যায়। জার্নি একদমই করতে পারে না। সামান্য ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময় কাহিল হয়ে যায়। নওশাদ একটা জিনিস ভালোই বুঝতে পেরেছে। তা হলো পুনমকে শারীরিক অসুস্থতা যতটা না কাবু করেছে তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি কাবু মনের ভয়।
সাড়ে আটমাসের সময় একদিম সারাটা দিন বাচ্চার নড়াচড়া ছিল না। পুনম এত ভয় পেয়েছিলো। কান্নাকাটি করে সে কি অবস্থা! পরে নওশাদ মাহতাবের সাথে কথা বলে ওকে চিনির পানি খাওয়ায়। দুই ঘন্টা বাম কাত হয়ে শুয়ে থাকার পর বাচ্চা নড়ে। তারপর থেকেই দিন যত ঘনিয়ে আসছে পুনমের ভয় ততটাই বাড়ছে। পুনম নিজেও জানে না ওর এত কিসের ভয়, তবে পুনম ভীষণ ভয় পায় ইদানীং।
নওশাদ শুরু থেকেই প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার মাস্ট আসে। আবার মাঝেমধ্যেই সুযোগ পেলে চলে আসতো। নওশাদকে আলাদা করে দাওয়াত টাওয়াত দেওয়ার প্রয়োজন পড়তো না। পুনমও তাতেই খুশি ছিল। নওশাদের টানাহেঁচড়া দেখতে ওরও ভালো লাগতো না। কিন্তু এই নয়মাসে পড়ার পর থেকে পুনম কলেজ খোলার দিনগুলোতেও কল দিয়ে কান্নাকাটি করে। ওর ভালো লাগে না। খালি একা একা লাগে।
আজ বৃহস্পতিবার। তাই আজকে নওশাদ আসবে। পুনম তাই ভীষণ খুশি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে হোম মেড প্যাক দিচ্ছে। মূলদানি মাটি, গোলাপজল, হলুদ দিয়ে বানানো প্যাক। গুনগুনিয়ে গান গেয়ে প্যাক দিচ্ছে। তখন প্রিতম ওর রুমে আসে। এটা প্রিতমের ডেইলি রুটিন। দোকান থেকে ফিরেই পুনমের সাথে দেখা করে।
প্রিতম দোকান থেকে ফিরেই ফ্রেশ হয়ে পুনমের ঘরে যায়। চেয়ার টেনে বসতেই পুনম মুখে প্যাক দিতে দিতেই বলে,
“কি চাই?”
“শরীরের কি অবস্থা?”
“আলহামদুলিল্লাহ।”
মুখ কুচকে বলে, “মুখে এইসব কি গু দিচ্ছিস?”
পুনম কপাল কুচকে তাকায়। প্রিতমের দিকে এগিয়ে আসে। চুল টেনে বলে,
“চোখ বন্ধ কর।”
“কেনো?”
“তোর মুখেও দিয়ে দিবো।”
প্রিতম মুখ ঢেকে বলে, “দিবো না আমি এইসব গু।”
“আমি কিন্তু আম্মুকে, বড় ভাইয়াকে ডাক দিয়ে বলবো তুই আমাকে মেরেছিস।”
মুখ ঢেকেই বলে, “আমি কখন মারলাম?”
“তাহলে মুখ থেকে হাত সরিয়ে চোখ বন্ধ কর।”
প্রিতম তাই করলো। পুনম প্রিতমের মুখে প্যাক দিয়ে আবারও আয়নার সামনে দাঁড়ায়। প্রিতম আয়নার পিছনে তাকায়।
“ছিহ লাগছে কেমন! থু!”
পুনম বিছানায় বসে। “পুরো গুয়ের মতো লাগছে।”
প্রিতম বড় বড় পা ফেলে পুনমের রুম থেকে বেরিয়ে গেল। পুনম হাসে। নওশাদকে কল দেয়। নওশাদ রিসিভ করতেই সালাম দিয়ে বলে,
“কোথায়?”
“তোমাদের বাসার নিচে।”
“ওহ তাড়াতাড়ি আসুন।”
“কিছু লাগবে? কিনবো?”
“চিপস নিয়ে আসুন।”
“না। অন্যকিছু বলো।”
“কিটকেট?”
“এখন এইসব খাওয়া যাবে না।”
“ডাক্তার কি নিষেধ করেছে?”
“না, আমি করলাম।”
“বেশি বেশি।”
“ফল কিনেছি। ওগুলো খাওয়াবো।”
পুনম কেটে দিলো। একটু পরেই নওশাদ আসে। ঘরের দরজা লাগিয়ে হাত পা ছড়িয়ে বসে বলে,
“কি অবস্থা? মুখে কি লাগিয়েছো আবার?”
“আনেননি চকলেট?”
নওশাদ পকেট থেকে কিটকেট বের করে পুনমের কোলে ছুঁড়ে মারে। পুনম খুশি হয়।
“আমি জানতাম নিয়ে আসবেন।”
নওশাদ হাত মুখ ধুয়ে আসে। সাথে ভেজা গামছা এনে পুনমের মুখ মুছে দেয়। বিরক্ত হয়ে বলে,
“মুখের মধ্যে কয়দিন পর পর কি কতগুলো দিবে।”
পুনম নওশাদের হাত ধরে বলে, “জানেন আমার দাদি বলতো মেয়ে বাচ্চা হলে নাকি মায়েরা সুন্দর হয়ে যায়। তাই আমি নিজেকে সুন্দর বানাচ্ছি।”
“ছেলে বা মেয়ে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। এখন এইসব দিয়ে লাভ নেই।”
“আচ্ছা অর্কর সময় ভাবিকে বলেছিলো ছেলে হবে নাকি মেয়ে। তাহলে আমাদেরকে বললো না কেনো?”
“রিসেন্টলি দুই তিনবছর ধরে বলে না।”
“ইসরাতের মেয়ের সময়ও বলেনি।”
“হুম বলে না এখন।”
“জানেন আজকে বিকালে জাইমা, জেরিন, রুমঝুম এসে দেখা করে গিয়েছে।”
নওশাদ কপাল কুচকে বলে, “ওরা একাই এসেছিল?”
“হুম। পুরো বিকেল গল্প করেছি।”
“এইজন্যই তো আজকে এত ঝরঝরা।”
“ঝরঝরা তো আপনি আসবেন বলে। ওদের জন্য না।”
নওশাদ শার্ট খুলে ফেলে। পুনমের কপালে চুমু খায়। পেটে চুমু খায়।
“নড়াচড়া আছে?”
“হুম। লাথি মেরেছে আজকে ভালো।”
“মারুক। নড়াচড়া করলে ভালো।”
“আচ্ছা আপনার মনে হয় না আমার পেট বেশিই ছোটখাটো?”
“তুমিও তো ছোটখাটোই, তোমার বাচ্চা বেশি বড় হবে কিভাবে?”
“আপনি বেশি লম্বা যে। আমি ঠিকই আছি।”
নওশাদ পুনমের চুল ঠিকঠাক করে দেয়। পুনম হেসে ওঠে। নওশাদ ভ্রু নাচিয়ে বলে,
“কি?”
“মুখে যখন প্যাক দিচ্ছিলাম তখন ভাইয়া ঘরে এসেছিল। ভাইয়া উল্টাপাল্টা কথা বলায় ওর মুখেও প্যাক দিয়ে দিয়েছি।”
“এতগুলো বানিয়েছো কেনো?”
“এগুলো তো বানিয়েছি আপনার মুখে দিতে। ভাইয়া টিটকারি মারায় ওকে দিয়ে দিয়েছি।”
“আরো কত কিছু দেখা লাগবে!”
পুনম নওশাদকে জড়িয়ে ধরে। “কত মিস করি আপনাকে।”
নওশাদ পুনমের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। পুনম বলে,
“ছেলে হলে বেশি খুশি হবেন নাকি মেয়ে?”
“আল্লাহ যা দিবেন।”
“দেখেন যদি মেয়ে হয় তাহলে?”
“কি হবে? কিছুই হবে না।”
“হবে তো একটা অবশ্যই।”
“কি?”
“আপনার মা, পাঁচ বোন। তারপর বউ, তারপর যদি মেয়ে হয় তাহলে আপনার আশেপাশে সব মেয়ে আর মেয়ে।”
নওশাদ কিছু বলে না। পুনম ফের বলে, “আল্লাহ আপনাকে বানিয়েছেও মেয়েদের মন বোঝার মতো। তাই হয়তো আপনার আশেপাশে সব মেয়ে।”
“মেয়েরাই ভালো। কোমল হয়, বুঝদার হয়। ছেলেগুলো হাড়ে বজ্জাতে বেয়াদব।”
পুনম হেসে উঠে। হাসতে হাসতে বলে, “আরিফ আপনাকে ট্রমায় ফেলে দিয়েছে।”
নওশাদ আড়চোখে পুনমের দিকে তাকায়। আরিফ কত বড় বেদ্দব হলে পুনমকে একদিন বলে ওর নানা নাকি নানিকে মেয়ে হওয়ার জন্য কথা শোনাতো। পুনমকে বারবার বলে, মেয়ে হলে নওশাদও যদি এমন কিছু করে তাহলে সাথে সাথে আরিফকে বলতে। আরিফ মামলা করে দিবে। যেহেতু ছেলেরা বাবার মতো হয়।
______________________
পুনমের রাতের খাওয়া অনেক আগেই শেষ। নওশাদ খেয়ে এসে পুনম শুয়ে পড়েছে। নওশাদ দরজা লাগিয়ে দেয়। ওয়াশরুমে চলে যায়। পাঁচমিনিটের মাথায় বের হয়ে লাইট নিভিয়ে ডিম লাইট জ্বালায়। পুনমের পাশে শুয়ে পড়ে। পুনমের পেটে হাত রাখতেই পুনম নওশাদের হাতের উপর হাত রাখে।
“ঘুমাওনি?”
“উহু।”
“ব্রাশ করেছো?”
“হুম।”
নওশাদ পুনমের হাত আলতো করে টিপে দিতে থাকে। পুনম পেটে হাত চেপে পাশ ফিরে। নওশাদের চোখে চোখ রেখে বলে,
“আমাকে এতটা আগলে রাখেন কেনো? এতটা যত্নই-বা করেন কেনো?”
“বউকে তো আগলেই রাখবো। আর বউয়ের যত্ন করবো না তো কার যত্ন করবো?”
“বউ বলেই এভাবে আমার ভালো-মন্দ সবদিকে খেয়াল রাখেন?”
“হুম।”
“আমার জায়গায় অন্য কেউ আপনার বউ হলেও কি এভাবেই আগলে রাখতেন? এতটাই যত্ন করতেন? ভালো-মন্দ সবদিকে এভাবেই খেয়াল রাখতেন? এতটাই কোমল হতেন?”
“হুম।”
“আমার আলাদা কোনো বিশেষত্ব নেই?”
“তুমি নওশাদের বউ। এটাই তো তোমার সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব। অন্য কারো তো আর ক্ষমতা নেই নওশাদের বউ হওয়ার।”
“নওশাদের বউ হওয়াই বিশেষত্ব?”
“তোমার জন্য তা-ই।”
“মানুষ বলে নোয়াখাইল্লারা নাকি খারাপ। আমার সোয়ামি তো একশো তে একশো।”
“মানুষ বলে পুরান ঢাকাইয়া দের নাকি রুচি খারাপ। আমার বউয়ের তো রুচি ভালো। পুরো একশো তে একশো।”
পুনমের শক্ত করে নওশাদের হাত ধরে রাখে। পেটে রাখে। নওশাদ বলে,
“সামনের মাসে আমাদের এনিভার্সারি।”
“সামনের মাসে ডেলিভারিরও ডেট।”
নওশাদ চুপ করে থাকে। পুনম নওশাদের গালে হাত দিয়ে বলে,
“আমার অনেক ভয় লাগে।”
“আল্লাহ ভরসা।”
“আমি যদি আমাদের এনিভার্সারি পর্যন্ত না থাকি?”
“আল্লাহ ভরসা।”
পুনম ফুঁপিয়ে উঠলো। “আমি মরলে তো আপনি আরেকটা বিয়ে করবেন। আপনার মনেও পড়বে না আমাদের কথা।”
নওশাদ পুনমের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। পুনম ফোপাঁতে ফোপাঁতে বলে,
“আমি অনেক ভীতু। আমার শুধু ভয় লাগে। কত শরীর খারাপ লাগে জানেন? আপনিও থাকেন না আমার সাথে।”
“আমার সমস্যা হয়ে যায় এখান থেকে কলেজে যেতে।”
“আমি জানি। সেইজন্যই তো কিছু বলি না।”
নওশাদ পুনমের গালে হাত বুলিয়ে দেয়। পুনম বলে,
“আপনি জানেন আপনি থাকলে কত ভালো লাগে? এইজন্যই মেয়েরা এইসময় স্বামীকে চায়।”
নওশাদ পুনমের কপালে চুমু খায়।
“আমি তো আপনাকে মিস করিই,” নওশাদের হাত পেটে রেখে বলে, “এটাও আপনাকে মিস করে।”
নওশাদ হাসে। “আমিও করি।”
“আপনি অনেক যত্নশীল।”
“তুমি বেশি নাজুক তাই আমি যত্নশীল।”
“বাচ্চা হয়ে গেলে চলে যাবো আপনার কাছে।”
“আরো পরে। একটু বড়সড় হলে।”
“ফাইনাল ইয়ার তো পাশ করতে হবে না আমার। একদিনও ক্লাস করিনি।”
“মা বাচ্চা সহিসালামতে আলাদা হও আগে তারপর আমিই পড়াশোনা করাবো।”
“একবছর ড্রপ দিয়ে ফেললাম। আমি কখনো ভেবেছিলাম আমার পড়াশোনার মাঝপথে এভাবে গ্যাপ যাবে?”
“জার্নি করতে পারতে না। কিভাবে ভার্সিটিতে যেতে?”
“ধূরর! মেঘলা, সিরাতকে ছাড়া কিভাবে ক্লাস করবো আমি?”
নওশাদ কিছু বলে না৷ পুনম বলে, “একা থাকা কত কষ্ট জানেন?”
“জানি।”
পুনমের নওশাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। নওশাদ বলে,
“এখনও একাই আছি। আশা করি সহসাই ঘর পরিপূর্ণ হয়ে যাবে।”
“ইনশাআল্লাহ।”
“বাচ্চা হলে আর গাধা ডাকবেন না।”
“ঠিক আছে গাধা।”
পুনম নওশাদের বাহুতে ঘুষি মারে। নওশাদ হেসে পুনমের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। পুনম নওশাদের হাত শক্ত করে ধরে রাখে৷ নওশাদ পেটেও হাত বুলিয়ে দেয়।
চলমান….
(হ্যাপি রিডিং…আগামী পর্বেই সমাপ্তি…)

