#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_৩৫(খ)
#সমৃদ্ধি_রিধী
সন্ধ্যা নাগাদ নওশাদ, পুনম, প্রথা হাসনাহেনার বাসায় আসে। গতকালকেই রিমি, ফারহান, ফারনাজ দেশে ফিরেছে। রিমি যে বিয়ের পর ফারহানের সাথে গিয়েছিল, একেবারে ছেলেকে বিয়ে ফিরলো। হাসনাহেনা তাই বাসায় ওদের দাওয়াত দিয়েছে। ওদের সাথে বাকি সকলেরই দাওয়াত ছিল। জেরিন, জাইমাও এসেছে। জেরিন ওর ছেলে নির্বাণসহ এসেছে। নীল আসেনি। জাইমাও একাই এসেছে। কেনান নীলেরও অফিস আছে, জাইমার হাসবেন্ড রায়ানেরও অফিস আছে। তাছাড়া জেরিনের বিয়ে ঢাকায় হলেও জাইমার বিয়ে হয়েছে রাজশাহী। জাইমা ওখানেই থাকে।
পুনম, জাইমা, জেরিন, ইসরাত, রিমি, রুমঝুম, তাহিয়া গল্প করছে। আপাতত বাচ্চাদের দিকে ওদের কোনো খেয়াল নেই। ইসরাত, পুনমেরটা তাও তো একটু বড়। ফারনাজ, আর আরাফাতকে ওরা ড্রয়িংরুমের কার্পেটে বসিয়ে দিয়ে এসেছে। দায়িত্বে আছে তিহান। সোফায় বসে টিভিই তো দেখছিল, একটু খেয়াল রাখতেই পারবে। জেরিন নিজের ছয় মাসের বাচ্চাকে জবার হাতে রেখে চলে এসেছে। নানাবাড়িতে আসলে কোনো আম্মু টাম্মু নাই, সব নানি করবে তখন।
রিমি কোলে বালিশ নিয়ে বলে, “তো মামি তুমি গুরুজন মানুষ। আমাদের সবাই বাচ্চাকাচ্চা আছে। তাহিয়া আউট অফ সিলেবাস। জাইমাকে একটু পরামর্শ দাও বাচ্চা নেওয়ার জন্য।”
জাইমা মুখ কুচকে বলে, “বেশি বেশি একদম।”
পুনম হেসে বলে, “সময় হলে নিবে।”
জেরিন বলে, “মামি তোমাকে একটা সিক্রেট বলি।”
“কি সিক্রেট?”
“জাইমা কিন্তু ওর প্রানের স্বামীর সাথে ঝগড়া করে ঢাকা এসেছে।”
জাইমা জেরিনের মাথায় ঠুয়া মারে। জেরিন বলে,
“তুই এক বাচ্চার মাকে এভাবে মারতে পারিস না।”
ইসরাত বলে, “ঝগড়া করেছিস কেনো?”
“এমনিতেই। তোমাদের ঝগড়া হয় না?”
জেরিন শয়তানি হাসি দিয়ে বলে, “এমনিতে তো মানুষ ঝগড়া করে না জাইমা।”
জাইমা ফুঁসে উঠে। “তোকে আমি বলেছি আমাদের ঝগড়া হয়েছে?”
“তাহলে রায়ান ভাইয়া কল করার পর রিসিভ করলি না কেনো?”
“আমিও দেখেছি রিসিভ করেনি।” তাহিয়া বলে।
“আমার জামাই, আমার যা মন চায় তাই করবো।”
রিমি বিরক্ত হয়ে বলে, “তোদের ঝগড়া দেখতে আসছি আমি দু’দিনের জার্নি করে?”
জেরিন বলে, “ভালো কথা, দুলাব্রো কোথায়?”
পুনম বলে, “তোমাদের মামার সাথে বাইরে গিয়েছে।”
রিমি বলে, “হ্যাঁ মামাকে জ্বালাতে গিয়েছে।”
জেরিন বলে, “শাওন ভাইয়া কোথায়?”
“কালকে আসবে ও।”
জেরিন জামার হাতা টেনে বাহাদুরি দেখিয়ে বলে,
“কালকে শাওন ভাইয়া, ফারহান ভাইয়া, আরিফ ভাইয়ার কাছ থেকে টাকা নেওয়া হবে।”
রুমঝুম কপাল কুচকে বলে, “কি উপলক্ষে?”
“শালীদের টাকা নিতে উপলক্ষ লাগে না।”
“আরিফ কানের গোড়ায় দিবে শালী হয়ে টাকা নিতে গেলে।”
জাইমা বলে, “আসলেই। শাওন ভাইয়া, ফারহান ভাইয়া, নীল ভাইয়ার কাছ থেকে আমি জীবনে যত টাকা নিয়েছি, আরিফ ভাইয়ার হাত থেকে দুই পয়সাও পাইনি।”
তাহিয়া বলে, “সব আপুর দোষ।”
“আমাকে মনে হয় দেয়? আমি তো পকেট মারি।”
ইসরাত শয়তানি হাসি দিয়ে বলে, “ছিহ ছিহ ভাইয়ের বউ, পকেট মারা উচিত না।”
“শোনো ননদ, তোমার ভাইয়ের পকেট থেকে দুই টাকা বের হয় না জীবনে। তাও আমার ব্যক্তিভাবে টাকার অভাব নেই। বলো কিভাবে?”
সবাই একসাথে কিভাবে বলে উঠে। পুনম হাসতে থাকে। রুমঝুম বক্তৃতা দেওয়ার মতো হাত উঠিয়ে বলে,
“সে পকেটে টাকা রাখে। আমি মাঝরাতে উঠে টাকা মারি। সে আমার কাছে টাকা রাখতে দেয়, পরে চাইলে দেই না। ভাড়াটিয়ারা এসে আমাকে বা খালামণিকে টাকা দেয়। ওগুলো আর তোমার ভাইয়ের হাতে যায় না। এভাবেই আমার আর আমার খালার হাতে মাস শেষে অনেক টাকা থাকে।”
“লাগাচ্ছি আমার ভাইয়ের কাছে।”
“সে নিতান্তই ভদ্রলোক। টাকা চাইলে টাকা নেই। এমনি মারলে কিছু বলে না।”
তাহিয়া বলে, “একটা প্রবাদ আসে না? পিঁপড়া যাওয়ার জন্য পাঁচবার থাপড়ায়, হাতি গেলে চোখে দেখে না সেরকম।”
রিমি বলে, “তুই নতুন করে প্রবাদ বানাস না। মাফ চাই।”
“আরেহ আসলেই আছে।”
ইসরাত আধশোয়া হয়ে বলে, “এইসব টপিক ফালা। কথা হলো শেষ আমরা সবাই কম বেশি কথা বলছি মামি পুরো পিন ড্রপ সাইলেন্স। তোমার কি মামার কথা মনে পড়ছে?”
পুনম বিরক্ত হয়ে বলে, “ধূরররর।”
রিমি বলে, “আপু মনে আছে মামা মামির বিয়ের দিনও আমরা এভাবে গল্প করেছিলাম। তখনও মামি এমন চুপ ছিল এখনও চুপ। তখন তো ভাবতাম নতুন বউ, কিন্তু এখন কি?”
জেরিন বলে, “পরের বছর স্কুলগামী মেয়ের মা।”
পুনম বলে উঠে, “ফাজিল।”
ইসরাত বলে, “মামি আমি ইন্ট্রোভার্ট দেখেছি, তোমার মতো দেখিনি সত্যি।”
“তোমরা কথা বলছো, আমি শুনছি তো।”
“তুমিও কিছু বলো।”
পুনম মুখ খোলার আগে ইসরাত বলে, “তোমার কি আমাদের সাথে বোরিং লাগছে? চাইলে ননাসদের কাছে যেতে পারো।”
“মাফ করো আমাকে।”
রিমি বলে, “তুমি খালি দেখো মামা ছিল মোটামুটি আমাদের এইজের কাছাকাছি। তুমিও সেইম। এখন প্রথা আমাদের বাচ্চাকাচ্চাদের সাথে খেলে যেখানে ও সবার খালা।”
ইসরাত বলে, “শর্মি তো প্রথা থেকে বড় না? লিট্রেলি শর্মি প্রথাকে নাম ধরে ডাকে, আর প্রথা ওকে মিম্মি ডাকে। আমি কতবার আমার মেয়েকে শিখিয়েছি প্রথা তোমার খালামণি, ওকে মিম্মি ডাকবে। আমার মেয়ে হয়েছে বাপের মতো ত্যাড়া। ওর কথা ও স্কুলে পড়ে, ও বড়। তাই ও নাম ধরে ডাকবে।”
রিমি বলে, “ত্যাড়া ভাইয়ার মতো না, তোমার মতো হয়েছে।”
ইসরাত রিমির পায়ে লাথি মারে। রিমি বাঁকা হয়ে বলে, “আল্লাহ আমার সিজার। মারছো কেনো?”
ইসরাত ব্যঙ্গ করে বলে, “ছেলে হওয়ার আড়াই থেকে তিন বছর পরও তোমার সিজারের ব্যথা করে না? আমাদের তো সিজার হয়ইনি।”
জেরিন বলে, “সহমত পোষণ করছি। আমাদের তো সিজার হয়ইনি।”
তাহিয়া বলে, “রুমঝুম আপু?”
“আমার দুটোই নরমালে।” বলে হাসে। রিমি রুমঝুমের মলিন হাসির দিকে তাকায়।
তাহিয়া কথা এড়াতে বলে, “মামি তুমি সহমত পোষণ করো?”
পুনম বলে, “আমারও তো নরমাল। সহমত পোষণ করতে পারলাম না।”
রিমি বলে, “ধুর তোমাদের সাথে এই কাজ করে লাভ নেই। ফারহানকে এইসব বলে বলে ঘরের কাজ করাই। বলদ বুঝেও না।”
পুনম বলে, “সিরিয়াসলি?”
“আসলেই।”
ইসরাত বলে, “প্রথা যখন আমাকে বড় আপ্পি ডাকে আমার ভিতর থেকে হাসি আসে। আমার মেয়ে থেকে আমার মামাতো বোন ছোট।”
রিমি বলে, “থাক আমাদের বিয়ে শাদী হয়েছে। আমরা ম্যাচিউর হওয়ার এক্টিং করবো। জাইমার মতো।”
জাইমা মুখ কুচকে বলে, “এই! ভালো লাগে না!”
ইসরাত বলে, “এক্টিং ই তো করিস। তুই কি এত ম্যাচিউর নাকি?”
পুনম বলে, “এখানে আমি সহমত পোষণ করছি। জাইমা বিয়ে করে ম্যাচিউর হয়ে গিয়েছে।”
“আমার জামাই বলেছে ম্যাচিউর হতে তাই।”
জাইমা ফোনে তখন কল আসে। রায়ান কল করেছে। জাইমা রিসিভ করার আগেই জেরিন মোবাইল নিয়ে নেয়। ওদের গলার স্বর প্রায় একই রকম। সেই ফয়দাই তুলবে ও এখন। কল রিসিভ করে সালাম দেয়। জাইমা মুখ খোলার আগেই তাহিয়া জাইমার মুখ চেপে ধরে।
জেরিন বলে, “বলো।”
“একা চলে গিয়েছো কেনো? আমি নিষেধ করেছিলাম না? কত বিপদ আপদ হয় জানো?”
জেরিন তেজ দেখিয়ে বলে, “হ্যাঁ গিয়েছি তো কি করবে? আমার যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাবো। তোমার কি?”
রায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে,
“জেরিন?”
জেরিন চমকে উঠে। জাইমা তাহিয়ার হাত সরিয়ে দিয়ে হাসে। জেরিন বড় করে সালাম দিয়ে রেখে দেয়। জাইমাকে জিজ্ঞাসা করে,
“বুঝলো কি করে?”
“আমার টোন ও জানে।”
তাহিয়া বলে, “না ফিল্মি ওয়েতে বলো- ও আমার নিশ্বাসের শব্দও চেনে।”
রিমি রুমঝুমের মোবাইল নেয়। ওয়ালপেপারে মেহার ছবি। রিমি তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। রুমঝুমের দিকে তাকাতেই দেখে রুমঝুমও তাকিয়ে আছে। রিমি বলে,
“ও আরিফ ভাইয়ার চেহারা পেয়েছিল।”
রুমঝুম হাসে। “তুমি তো দেখোনি। তোমাকে আমার মেয়ের আরো ছবি দেখাই।”
রুমঝুম ঠোঁটে ঠোঁট চেপে মেহার ছবি বের করে। পুনম ইসরাতের দিকে তাকায়। রুমঝুম রিমিকে ছবি দেখাতে থাকে। পুরো একটা ফোল্ডারে মেহার সাথে সবার ছবি। আরিফ, মেহার বেশি। কোনটা কখন তোলা সব রিমিকে বলতে লাগলো। রুমঝুমের চোখো পানি আসে। তাও হেসে বলে,
“অল্পদিনে বেশিই ভালো সময় কাটিয়ে ফেলেছিলাম।”
রিমি রুমঝুমকে জড়িয়ে ধরে। “কাঁদিস না।”
রুমঝুম কান্না চেপে বলে, “কাঁদবো কেনো? আরিফ কি বলেছে জানো? আল্লাহ তার প্রিয় ফুলগুলোকে আগে নিয়ে যায়। আমার মেহাও আল্লাহর প্রিয় ফুল ছিল।”
রুমঝুম চোখের পানি মুছে। তাহিয়া বলে, “কেঁদো না আপু।”
রুমঝুম আরিফের বলা কথা মনে করে। সবাই ক্ষণিকের জন্য ভুলে গেলেও আরিফ আর রুমঝুম তো কখনো মেহার কথা ভুলবে না। মেহা তো ওদের মনেই আছে। শুধুশুধু কেঁদে লাভ কি? রুমঝুম হেসে উঠে দাঁড়ায়।
“আরাফাতের কাছে যাই। অনেকক্ষণ ধরে একা।”
রুমঝুম চলে গেল। সাড়ে সাতটা বাজে। আরিফ আটটার মধ্যে চলে আসবে। রুমঝুম ফারনাজকে রিমির কাছে গিয়ে আরাফাতকে নিয়ে রুমে চলে যায়। আরিফ না আসা অব্দি ঘরের দরজা খোলে না।
_______________________
নওশাদ আর ফারহান যে সাড়ে ছয়টা নাগাদ বাসা থেকে বেরিয়েছিল নয়টা বাজলেও আসার খবর নেই। ইসরাত ইলিশ মাছ দিয়ে শর্মিকে খাইয়ে দিচ্ছে। দশটার মধ্যে ঘুম পাড়িয়ে দিবে। মোটামুটি সারারাত জাগার প্ল্যান আছে আজ। পুনম রুই মাছ ভাজি করছে। ইলিশ প্রথাকে খাওয়ায় না। প্রথার শরীর চুলকায় পুনমের মতো।
প্রথা শর্মির সাথে খোঁচাখুঁচি করছিলো বিধায় রুমঝুম প্রথাকে কোলে নিয়ে রুমে চলে আসে। আরিফ আধশোয়া হয়ে ফোন টিপছিলো। প্রথাকে ওভাবে চিপটাং করে কোলে করে নিয়ে আসায় আরিফ মোবাইল রাখে। প্রথা আরিফকে দেখে করুণ গলায় ডাক দেয়,
“দাদা ভাইয়া?”
রুমঝুম প্রথাকে আরিফের কোলে দেয়। প্রথা এবার আরিফের কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য মোচড়ামুচড়ি করে। আরিফ প্রথার দুইহাত ধরে বলে,
“কি? এমন মোচড়ামুচড়ি করছিস কেনো?”
“খেলবো আমি।”
“কার সাথে?”
“মিম্মির সাথে।”
“শর্মির সাথে?”
“হ্যাঁ। আপ্পি খেলতে দেয় না।”
রুমঝুম বিছানায় বসে বলে, “আপু শর্মিকে খাওয়াচ্ছে। তাই নিয়ে এসেছি।”
“ও খায়নি কেনো?”
“ইলিশ মাছ খেলে মায়ের মতো মেডামেরও গা চুলকায়। তাই মামি রুই মাছ ভাজি করছে।”
“মামিকে হেল্প কর গিয়ে।”
“খালামণি আছে, আপু আছে। পারবো না আমি।”
“ফারনাজ কোথায়?”
“ঘুমে।”
প্রথা নিজেকে ছাড়াতে চেয়ে বলে, “আহা! আমিও যাবো।”
আরিফ প্রথাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “একটু ভাইয়ার কাছে থাক।”
কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, “নাআআ। ছাড়ো না?”
“এমন করছিস কেনো? পরে তোর বাবা এসে বলবে তোকে আমি মারি। আমি তোকে মারছি যে কাঁদছিস?”
“না তো।”
“তো থাক।”
“খেলবো!”
রুমঝুম প্রথার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, “মিম্মি খেয়ে নিক? তারপর যাস।”
“আহা্হারে!”
আরিফ কথা ঘোরাতে বলে, “তোর বয়স কত রে?”
“জানি না।”
“তুই এইটুকু কেনো? কি ছোট!”
প্রথা তাকিয়ে থাকে। আরিফ গাল টিপে বলে,
“সবসময় পাকনাদের মতো বকবক করিস, এখন বল?”
‘জানি না।”
“দেখ তোর আপ্পি কত বড়? তুই এমন বড় হতে পারলি না?”
প্রথা দুদিকে মাথা নাড়ে। প্রথার গাল টিপে দিয়ে বলে,
“তুই আমার বোন হয়ে এই চঁড়ুইপাখির মতো ছোট কেনো?”
“তুমি বেশি বড়।”
“এই রুমঝুমি ও পুরো টিয়া পাখির মতো কথা বলে না?”
“হুম।”
আরিফ ওর দুগালে চুমু দেয়। গাল টেনে বলে,
“আপ্পি বেশি ভালো নাকি দাদা ভাইয়া বেশি ভালো?”
আরিফের গাল জড়িয়ে ধরে বলে, “দাদা ভাইয়া ভালো।”
রুমঝুম আঙুল তাক করে বলে, “আর কল দিবি না আমাকে। ভিডিও কল দিয়ে বলিস একটু আরাফুকে দেখাও। একদম দেখাবো না।”
প্রথা আরিফের গলা জড়িয়ে ধরে করুণ গলায় বলে,
“দাদা ভাইয়া?”
আরিফ রুমঝুমকে চোখ রাঙিয়ে বলে, “মেরে ফেলবো কিন্তু।”
রুমঝুম বলে, “তোমাদের সাথে কথা নাই। কাট্টি।”
“দাদা ভাইয়া?”
“কি খালি দাদা ভাইয়া? তোর একার ভাই?”
প্রথা চোখ গোল গোল করে বলে, “তোমারও ভাই?”
“কিরে তোরও ভাই লাগি?”
রুমঝুম প্রথাকে কোলে তুলে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। প্রথা অবুঝ গলায় বলে, “কি হয়েছে?”
“কিছু না।”
আরিফ তাকিয়ে থাকে।
“আপ্পি?”
“কি?”
“প্রজাপতি গানটা শোনাবে?”
“কেনো শুনাবো? তুই কে আমার?”
“তুমি না আমার আপ্পি?”
“তোর না দাদা ভাইয়াকে বেশি ভালো লাগে? দাদা ভাইয়াকে বল শোনাতে।”
“তুমিও ভালো।”
“না তোর দাদা ভাইয়াকে বল।”
আরিফ হাত বাড়িয়ে বলে, “আয় শুনাই তোর প্রজাপতি গান।”
প্রথা রুমঝুমের গলা জড়িয়ে ধরে। কানে কানে বলে,
“দাদা ভাইয়ার গান ভালো লাগে না।”
রুমঝুম হেসে উঠে। আরিফকে বলে, “শুনে যাও তোমার লাডলি কি বলেছে?”
প্রথা রুমঝুম মুখ চেপে ধরে। “বলো না।”
রুমঝুম ইংরেজিতে আরিফকে বলে।
আরিফ উঠে বসে। বিড়বিড়িয়ে বলে, “তোর বাপ থেকে তো ভালো গান গাই।”
রুমঝুম আরিফের মুখের রিয়েকশন দেখে হাসে। প্রথাকে কোলে নিয়ে হেঁটে গান শোনালো।
“প্রজাপতিটা যখন-তখন, উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে
রাঙা মেঘের মতন বসে আমার আকাশ জুড়ে..
কেমন লেগেছে?”
“খুব ভালো।”
“তোর প্রিয়?”
“অনেক প্রিয়।”
“এখানে প্রজাপতি কে জানিস?”
প্রথা অবুঝ গলায় বলে, “কে? আরাফু?”
রুমঝুম মেহার ফটোফ্রেমে থাকা ছবি দেখায়। আঙুল তাক করে বলে, “উহু। এইযে? ও।”
প্রথা হাসি দিয়ে বলে, “ঝুমঝুমি?”
“হুম হুম। আপ্পি আর দাদা ভাইয়ার প্রজাপতি।”
আরিফ চাপা শ্বাস ফেলে। রুমঝুম মেহাকে এই গান শুনিয়ে ঘুম পাড়াতো। আরাফাতকেও এখনও এই গান শুনিয়ে ঘুম পাড়ায়। আরিফ টিশার্ট পাল্টে বলে,
“চল ঘুরতে যাই।”
প্রথা একপায়ে রাজি। “আরাফুকে নিবে?”
“না।”
প্রথা মন খারাপ করে বলে, “ওকেও নাও?”
রুমঝুম প্রথাকে বুঝিয়ে বলে, “আরাফু ঘুমাচ্ছে না? উঠলে কান্না করবে তো।”
প্রথা মাথা দুলিয়ে বলে, “তাহলে মিম্মিকে নিবে?”
আরিফ চুল ঠিক করে বলে, “এই রুমঝুমি শর্মিকে রেডি করিয়ে দিতে বল।”
রুমঝুম চলে গেল। আরিফ প্রথাকে আয়নার সামনে এনে ওর চুল ঠিক করে দেয়। শর্মির খাওয়া শেষ হয়নি। তাই আরিফ আর শর্মিকে নিলো না। শুধু প্রথাকে নিয়েই নিচ থেকে হেঁটে এলো। নওশাদ আর ফারহানের সাথে রাস্তায় দেখা হয়। ওরাও বাসায় আসছিলো। ফারহান প্রথাকে কোলে নিয়ে বলে,
“কি ম্যাডাম আপনার তো দেখাই পাইনি। ভালো আছেন?”
“হুম ভাইয়া। তুমি ভালো আছো?”
ফারহান মুখ কুচকে নওশাদকে বলে, “তোকে না বলেছি আমাকে আঙ্কেল ডাক শেখানোর জন্য? ভাইয়া শুনতে লাগে কেমন? ওর বাপের বন্ধু আমি। অথচ ডাকে ভাইয়া!”
নওশাদ প্রথাকে ফারহানের কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বিল্ডিংয়ের ভিতর ঢুকে গেল। সন্ধ্যা থেকে জ্বালিয়েছে অনেক। আর সহ্য করা যাচ্ছে না। বাসায় যেতেই পুনম প্রথার জামা বদলে দিলো। খাওয়ানোর পর সময় নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। ঘুমন্ত প্রথাকে নওশাদের পাশে শুইয়ে দিয়ে রুম থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ালেই নওশাদ বলে,
“বিসিএস এর সম্ভাব্য ডেট দিয়ে দিয়েছে গাধা।”
পুনম নওশাদের দিকে তাকায়। নওশাদ প্রথার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে, “যতো উড়ার আছে আজকেই উড়ে নাও। আগামী তিনমাস নাওয়া খাওয়া ছেড়ে পড়াশোনা করতে হবে।”
পুনম নিজের শোচনীয় অবস্থা দেখতে থাকে। প্রথা হওয়ার পর ভেবেছিল এই দানবীয় অত্যাচার থেকে রক্ষা পাবে। কিন্তু ভুল ছিল। নওশাদ পরীক্ষার সময় পাপিয়াকে বাসায় আনতো, নিজে যতটুকু পারতো প্রথাকে সামলাতো, যাতে পুনমের সমস্যা না হয়। পরীক্ষার সময় ছুটি নিয়ে চারঘন্টা বাবা, মেয়ে ঘুরতো। পুরো ভার্সিটি ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়াতো। পুনমকে কমপ্লেন করার সুযোগ দিতো না যে ওর এইজন্য রেজাল্ট খারাপ করেছে।
নওশাদ বলে, “আমি তো আছিই। মেয়েকে নিয়ে ভাবতে হবে না। কালকে থেকে কঠিন দমে পড়াশোনা চলবে।”
“বিসিএস না হলে?”
“বিসিএসে কম্পিটিশন অনেক। তোমার হবে না আমি জানি। না হলে কিছুই বলবো না। কিন্তু চেষ্টায় কমতি থাকলে খবর আছে। মাইন্ড ইট।”
“জালিম। এই পড়ালেখার জন্য আমাকে রাতে ঘুমাতেও দিতো না। সারাদিন মেয়েকে সামলে রাতে পড়তে হতো। কি লাভ হয়েছে?”
“লুক এট ইউর সিজিপিএ। মেয়ে নিয়ে কয়জন এত ভালো রেজাল্ট করে?”
“আসুক গিয়ে ভালো রেজাল্ট। মাথা নষ্ট পাবলিক। পরীক্ষার সময় মেয়েকেও ঘেষতে দিতো না আমার কাছে। রেজাল্ট গুলে খাই এখন আমি।” পুনম রুম থেকে বের হয়ে গেল।
চলমান…
(হ্যাপি রিডিং…..রাত এগারোটা বা এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যেই শেষ পার্ট আসবে। নওশাদ-পুনমময় পার্ট।)

