বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~ #পর্ব_৩৫(গ) #অন্তিম_পর্ব

0
70

#বলো_কোন_প্রিয়_নামে_ডাকি:~
#পর্ব_৩৫(গ)
#অন্তিম_পর্ব
#সমৃদ্ধি_রিধী

বৃহস্পতিবার, শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত পুনম, নওশাদ, প্রথা হাসনাহেনার বাসায়ই থাকলো। নীল শুক্রবার সকালে ওই বাসায় এসেছে। রায়ানও দুপুরের দিকে এসেছে। পুনমরা শুক্রবারেও থাকতো। কিন্তু নওশাদ শনিবারে নিজের বাসায় সব ভাগিনা, ভাগিনা বউ, ভাগ্নি, ভাগ্নির জামাইদের দাওয়াত দিয়েছে। শুক্রবার রাতে এসেই নওশাদ, পুনম প্রথাকে ঘুম পাড়িয়ে সব ব্যবস্থা করেছে।

যদিও শুক্রবার রাতেই সব ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছিল, নওশাদও সাহায্য করেছিল তবুও পুনমের পোলাও, গিলা-কলিজা দিয়ে ডাল, চার পদের মাছ, রোস্ট, খাসি, ডিম ভুনা রান্না করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। জবা নাস্তার ব্যবস্থা করেছিল। ওরা সবাই দশটা নাগাদই নওশাদের বাসায় চলে আসে। সকালের নাস্তা জবার বাসায় করে এবং দুপুরের খাবার নওশাদের বাসায়। পুরো জমজমাট অবস্থা ছিল বাসার। নওশাদের বিয়ের সময়ও এতটা জমজমাট আবহ ছিল না।

দুটোর দিকে জেরিন বাদে মায়েরা বাচ্চাদের খাইয়ে দিয়েছে। রুমঝুম আরাফাত, শর্মি, প্রথাকে খাইয়ে দিয়েছে। ইসরাত তখন জবার বাসায় ছিল। পুনম বাচ্চাদের সাথে ওদেরকেও খেয়ে নিতে বলে। ওরা খায় না, পুনমসহ সবাই একসাথে খাবে বলে। বাচ্চাদের খাওয়া শেষ হতেই শাওন, ফারহান, নীল, রায়ান ওরা বসে। নওশাদ ওদের সাথে আরিফকেও বসতে বললে আরিফের এক কথা-আরিফ বসবে না। পুনম বলে,

“কেনো বসবে না?”

“তুমি তোমার ভাগ্নি জামাইদেরকে খাওয়াচ্ছো, খাওয়াও। আমি পরে মামার সাথে বসবো।”

“তুমিও তো ভাগ্নির জামাই।”

“না, আমি ঘরের ছেলে।”

“বিশেষ আপ্যায়ন মিস করলে।”

“এতো আপ্যায়নের দরকার নেই।”

পুনম আর জোর করলো না। এটা যে মামার মতোই ত্যাড়া আগেই বুঝেছিল ও। পুনম প্লেট ধুয়ে রুমঝুমের হাতে প্লেট দেয়। জেরিন বলে,

“রুমঝুম আপুও ভাগিনা বউ না, আরিফ ভাইয়াও ভাগ্নির জামাই না। ওরা জামাই বউ তাও একজন আরেকজনের আম্মুকে এখনও খালামণি ডাকে। দ্যান আপু শর্মির খালা, ভাইয়া ফারনাজের মামা। হেল ম্যান!”

জাইমা বলে, “আরাফাত আরেকটু বড় হলে আপুকে ফুপ্পি আর ভাইয়াকে মামা ডাকতে শিখাবো।”

পুনম কাজ করতে করতে বলে, “বিয়ের পর মাইর খেও না।”

জেরিন বলে, “কি হয়েছে জানো মামি?”

“কি?”

“আমরা আই মিন নীল, আমি, জাইমা, রায়ান ভাইয়া তো বাসায় এসেছিলাম কালকে রাতেই। তো জাইমার অ্যারেঞ্জ ম্যারেজের জামাই আর জাইমার মধ্যে টানটান ঝগড়া চলছিলো। ওমাহ সকালে দেখি জাইমা গোসল করেছে। ঘটনা বুঝেছো?”

জাইমা জেরিনের হাতে ঠাস ঠাস করে থাপ্পড় মারে।
পুনম চোখ রাঙিয়ে বলে, “মাইর খাবে?”

“বি প্র্যাকটিকাল মামি। তুমি ফের নানুমণি হবে।”

জাইমা বেয়াদব বলে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পুনম সার্ভ করে। আরিফকে আরো দুইবার বসতে বলে। আরিফ বসে না, বসেই না। শেষে মামা, সব ভাগিনারা একসাথে খেয়েছে। ভাগিনা বউ বলতে অফিসিয়ালি রুমঝুম আর মাহতাবের বউ। মাহতাবের বউও মেডিকেল স্টুডেন্ট। ওর প্রফ চলছে বিধায় আসেনি। সবার ঝামেলা মিটতেই পুনমরা খেয়ে উঠে। আগামীকাল রিমিরা চাপাইনবাবগঞ্জ যাবে। সেইজন্য ওরা সন্ধ্যা হওয়ার পরপরই চলে গেল। শাওন, ইসরাত, আরিফ, রুমঝুমও বাচ্চাদের নিয়ে চলে যায়। জেরিন জাইমারা নিচে নেমে যায়।

বাসা খালি হতেই পুনম অনুভব করে ও ভীষণ ক্লান্ত। বাচ্চারা যে তুফান চালিয়েছে এখন ড্রয়িংরুমের অবস্থা বেহাল। পুনমের কিছু গোছানোর এনার্জি হলো না। শাড়ি পাল্টে নরমাল সেলোয়ার কামিজ পড়ে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়লো। এদিকে, মিম্মি, আরাফু, ফারনু চলে যাওয়ায় প্রথার মন খারাপ হয়ে গিয়েছে। মুখ কালো করে প্রথা পুতুল নিয়ে খেলতে খেলতে রুমে আসে। পুনম শুয়ে থাকতে দেখে বিছানায় উঠে পুনমের গা ঘেষে শোয়। পুনমের বুকে মাথা রেখে গালে আঙুল দিয়ে খোঁচা দিয়ে ডাকে,

“মা? ওহ মা?”

পুনমের পক্ষে চোখ খোলা রাখা দায় হয়ে যাচ্ছে। ক্লান্ত গলায় জবাব দেয়, “কি বাবা?”

“ঘুমাও?”

পুনম চোখ বন্ধ করে বলে, “হুম।”

“আমার সাথে একটু খেলো?”

“বাবাকে বলো মা? আমি অনেক টায়ার্ড। কালকে খেলবো?”

পুনম কাত হয়ে শুয়ে ছিল। প্রথা পুনমের ডান হাতের বাহুতে মাথা রেখে বুকের সাথে লেপ্টে শুয়ে থাকে। পুনম প্রথাকে জড়িয়ে ধরে। কিছুক্ষণ পর নওশাদ রুমে এসে প্রথাকে পুনমের বুকের সাথে লেপ্টে থেকে পুতুল দিয়ে খেলতে দেখে ডাক দেয়,

“আমার ময়না পাখি কই রে?”

প্রথা বাবার দিকে তাকিয়ে হাসে। বুকে হাত দিয়ে বলে,

“এখানে।”

নওশাদ বিছানার কাছে যায়। হাত বাড়িয়ে বলে,

“বাবার বুকে আসো?”

প্রথা পুনমের বাহুডোর থেকে বেরিয়ে নওশাদকে জড়িয়ে ধরে। নওশাদ প্রথার পিঠে হাত দিয়ে বলে,

“দেখেছো পুরো ঘেমে গিয়েছো।”

নওশাদ প্রথার জামা পাল্টে গায়ে পাউডার মেখে সেন্টু গেঞ্জি পড়িয়ে দেয়। নিজেও পোশাক পাল্টে ফেলে। পুনম ঘুমিয়ে পড়েছে। নওশাদ ডাকলো না আর। হাতের চুড়ি খুলে গায়ে কাঁথা টেনে দিলো। প্রথাকে নিয়ে সময় কাটাতে লাগলো। প্রথা সিলেটে চক দিয়ে ক, খ লিখতে পারে। নওশাদ আজ ওকে আজ পেনসিল দিয়ে লিখতে শেখালো। প্রথা লিখে কম, কথা বলে বেশি।

নওশাদ প্রথাকে কোলে নিয়ে জড়িয়ে ধরে। নওশাদের বুকে মাথা রেখে প্রথা নিজের মতো পুতুল দিয়ে খেলতে থাকে। মেয়ের হাতের তালুতে চুমু দিয়ে নওশাদ বলে,

“বাবা কেমন আম্মা?”

দুই হাত প্রসারিত করে বলে, “অনেক ভালো।”

“বাবার সাথে থাকলে আনন্দ হয়?”

“হুম হয়।”

“বাবা বাসায় না থাকলে কেমন লাগে?”

“ভালো লাগে না।”

“বাসায় থাকলে?”

“অনেক ভালো লাগে। তুমি কলেজে গেলে..”

প্রথা থেমে যায়। নওশাদ বলে, “কলেজে গেলে কি?”

“তুমি কলেজে গেলে আমি আর মা খালি ঘুমাই, একা একা খাই, মজা হয় না। তুমি থাকলে অনেক মজা হয়।”

“আর?”

“তোমার সাথে, মার সাথে ঘুরতে যেতেও ভালো লাগে।”

“আর?”

“তোমার কাছে পড়তেও ভালো লাগে।”

“আমার হাতে খেতে কেমন লাগে?”

“অনেক ভালো লাগে।”

“বাবা তোমাকে অনেক ভালোবাসি বুলবুলি।”

“আমিও অনেক ভালোবাসি।”

“বাবা না থাকলে কষ্ট পাবে?”

“কোথায় যাবে?”

“যদি অনেক দূরে চলে যাই?”

“আমাকে আর মাকেও নিও?”

“ওখানে একা যেতে হয়।”

“তাহলে যেও না। আমাদের সাথে থাকো।”

“না বলে হঠাৎ করে চলে গেলে রাগ করবে? কষ্ট পাবে?”

“হুম পাবো তো। তুমি না থাকলে আমিও কষ্ট পাবো। মাও কষ্ট পাবে। আমরা অনেক কান্না করবো।”

নওশাদ প্রথাকে জড়িয়ে ধরে পুনমের দিকে তাকায়। পুনম ঘুমে কাঁদা। নওশাদ একবার পুনমকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘বাবার ভালোবাসা ঠিক কেমন?’ পুনম উত্তর দিতে পারেনি। তবে নওশাদ আজ বাবা হয়ে বুঝতে পারছে ওর ভালোবাসা ছাড়া, ও না থাকলে মা, মেয়ে থাকতে পারবে না।

__________________________

বাসায় ফিরতে ফিরতেই আরাফাত ঘুমিয়ে গিয়েছে। রুমঝুম বাইরের পোশাক বদলে ঘরের পোশাক পড়ে বের হয়৷ আরিফ আরাফাতের পাশে বসে ঘুমন্ত আরাফাতের বুকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। রুমঝুম ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আরিফকে জড়িয়ে ধরে। আরিফ রুমঝুমের পিঠে হাত রেখে বলল,

“কি হয়েছে?”

“কিছু না।”

“মন খারাপ?”

“উহু।”

আরিফ রুমঝুমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। রুমঝুম অস্ফুটস্বরে বলে, “মাথায় হাত বুলিয়ে দাও একটু।”

আরিফ দিলো। রুমঝুম ফুঁপিয়ে উঠলো। আরিফ বলে,

“কিছু হয়নি।”

“কতকিছু হয়েছে।”

“আল্লাহ পরীক্ষা নিয়েছে।”

“ভালো লাগে না।”

“কিছু হয়নি।”

আরিফ রুমঝুমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। রুমঝুম নাক টেনে বলে, “আমার লাইফের বেস্ট ডিসিশন তোমাকে বিয়ে করা।”

“আমাকে বিয়ে করে তো শুধু কাঁদতেই হয়।”

“কাঁদলেও তো ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি পাই।”

আরিফ রুমঝুমের গাল মুছে দেয়। “চোখ মোছো। অনেক কেঁদেছো আর না।”

রুমঝুম চোখ মুছে। আরিফ রুমঝুমের কপালে চুমু খায়। অনেকক্ষণ ধরে। রুমঝুম আবারও জাপটে জড়িয়ে ধরে। আরিফ রুমঝুমের ঘাড়ে মুখ গুঁজে।

মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, “সব ঠিক আছে। না?”

রুমঝুম মাথা ঝাঁকায়। আরিফ রুমঝুমের গালে চুমু খায়। “গুড গার্ল।”

রুমঝুম হেসে বলে, “আমি প্রথা না।”

“কাজিনই তো।”

“মেরে ফেলবো। আগে কাজিন ছিল। এখন বউ।”

আরিফ আবারও চুমু খায়। রুমঝুমের মন খারাপ গায়েব হতে থাকে।

_______________________

পুনম দেড় থেকে দুই ঘন্টার মতো ঘুমিয়ে উঠেছে। উঠে মুখ ধুয়ে নওশাদসহ ডাইনিং টেবিল, ড্রয়িংরুমের জায়গা গুছিয়েছে। প্রথাও ওদের সাথে ছিল। প্রথা ছোট ছোট হাত দিয়ে পুনমকে যা পারে সাহায্য করে। সোফা পরিষ্কার করার সময় কুশন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। প্লেট ধুয়ে দিলে শেলফে রেখে আসে।

তখন সাড়ে আটটা বাজে। পুনম প্রথাকে খাইয়ে দিচ্ছে। নওশাদ ডাইনিং টেবিলের সামনে আসে। প্রথার হাতে দুটো পুতুল। পুনম প্রথাকে মোবাইল বা টিভি দেখিয়ে খাওয়ার অভ্যাস করেনি। নওশাদের মেয়ের ব্যাপারে অনেক নিষেধাজ্ঞা আছে। খাওয়ার সময় মোবাইল দেওয়া যাবে না, সব খাওয়ানোর অভ্যাস করতে হবে। জবা, জিসান, জাইমা, জেরিন ছাড়া বিল্ডিংয়ের কারো সাথে প্রথাকে একা রাখা যাবে না। নিচতলা, দোতলার বাচ্চা আছে কিছু। ওদের সাথে খেললেও যেন পুনম সামনে থাকে। পুনম বরাবরের মতোই নওশাদের সব কথা মেনে চলে। খাওয়ার সময় হাতে অন্যকিছু দেয়, প্রথা ওগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকে। নওশাদ প্রথার সাথে বসে বলে,

“আমার কোয়েল পাখি কি করে?”

“ভাত খাই।”

পুনম মাছের কাটা বেছে বলে, “হ্যাঁ দুনিয়ার যত পাখি আছে সব ঘরে নিয়ে এসো।”

“তুমি চুপ করো। আমাদের বাবা মেয়ের মাঝে ঢুকবে না।”

“এত শখ নেই তোমার আর তোমার বুলবুলি, ময়না, টিয়া, কোয়েল পাখির মাঝে ঢোকার।”

“জেলাস?”

“আল্লাহ মাফ করুক।”

প্রথা পুতুলের জামার লেইস ছিঁড়তে ছিঁড়তে শান্ত বাচ্চার মতো খাবার খেতে থাকে। পুনম নওশাদকে বলে,

“আমরা মা, মেয়ে পছন্দ করে একটা সেম ড্রেস অর্ডার দিয়েছি। কালকে, পরশুর মধ্যে পার্সেল চলে আসবে। বুঝেছো? টাকা লাগবে।”

“মা, মেয়ে পছন্দ করে নাকি মায়ের পছন্দ মেয়ের উপর চাপিয়ে দিয়ে?”

“একই কথা। আল্লাহর দুনিয়ায় তোমাদের দুজনের তো সেম ড্রেসের অভাব নেই। আর কত?”

“সবে শুরু।”

পুনম প্রথাকে জিজ্ঞাসা করে, “বাবা একটা কথা বলো তো?”

“কি?”

“মায়ের নাম কি?”

“পুনম।”

“বাবার নাম কি?”

“নওশাদ।”

“এখন পুনম নওশাদ বেশি ভালো? নাকি প্রেম পুনম?”

“প্রেম পুনম।”

নওশাদ দাঁতে দাঁত চেপে পুনমের দিকে তাকায়। পুনম হাসতে থাকে। পুনমের দেখ দেখায় প্রথাও হাসতে থাকে। নওশাদ দাঁত কিড়মিড় করে বলে,

“মা মেয়ে দুটোকেই বাইরে ফেলে আসবো।”

প্রথাকে এক লোকমা ভাত খাইয়ে দিয়ে বলে,

“পারবে না। অযথা হুমকি ধামকি দিও না।”

“উঠো এখনই রেডি হও। বাইরে রেখে আসি।”

প্রথা আরো জোরে জোরে হাসতে থাকে। নওশাদ পুনমের দিকে গরম চোখে তাকায়। পুনম বলে,

“বাইরে রেখে আসবে ওটার জন্য আবার রেডি হতে হয়?”

নওশাদ কিছু বলতে গিয়েও বলে না। প্রথা খিকখিক করে হাসতেই থাকে। পুনম প্রথাকে বলে,

“আর হেসো না। বাবা রেগে গিয়েছে।” বলতে বলতে হেসে দেয়।।

প্রথা নওশাদের দিকে তাকিয়ে আরো জোরে জোরে হাসতে থাকে। নওশাদ চেয়ার টেনে বসে বলে,

“মা মেয়ে দুটোই শয়তান। ইচ্ছে করে শয়তানি করে। গাধাটা আগে থেকেই গাধা, আমার মেয়েকেও গাধা বানাচ্ছে।”

মেয়ের সামনে গাধা বলায় পুনম ফুঁসে ওঠে। “গাধা বলবে না বলে দিলাম।”

পুনমকে ভেঙ্গিয়ে বলে, “নয়মাস আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, মাফ করে দিয়েন। গাধা।”

“ভালো হবে না কিন্তু প্রথার বাবা।”

“ভালো মানুষদের ভালো কখনোই হয় না।”

প্রথা খিকখিক করে হাসতে থাকে। পুনম দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “তুই হাসছিস কেনো?”

“হুদাই। তোমার মেয়ের হাসতে কিছু লাগে নাকি? কিছু একটা শুনলেই হাসে।”

“বাপের মতো ঢিলা হয়েছে।”

নওশাদ কপাল কুচকে বলে, “এক্সকিউজ মি?”

“এক্সকিউজিং ইউ।”

প্রথার হাসতে হাসতে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। নওশাদ বলে, “হয়েছে আমার ইন্দুবালা, এবার একটু থামেন৷ আর হাসতে হবে না।”

পুনম মুরগির রানের মাংস নেয়। রোস্টের ঝোল মেখে প্রথাকে খাইয়ে দিতে থাকে। নওশাদ বলে,

“মজা আম্মা?”

“খুব মজা।”

প্রথাকে খাওয়ানো শেষ। পুনম প্রথার মুখ ধুইয়ে মুছে দেয়। নওশাদ প্রথাকে নিয়ে হোসনেআরার ঘর, বারান্দা থেকে ঘুরে আসে। ফুল গাছে পানি স্প্রে করে। প্রথাকে খাওয়ানোর পর সাথে সাথে শোয়ায় না। পুনম টেবিলে নিজের আর নওশাদের খাবার বেড়ে ঢাকনা দিয়ে রাখে। রান্নাঘরের বাকি কাজ শেষ করে লাইট নিভিয়ে ড্রয়িংরুমে আসে। প্রথা নওশাদের ডান পা ধরে ফ্লোরে বসে আছে। আর নওশাদ ফোনে কথা বলছে।

পুনম বুঝে না প্রথা এভাবে নওশাদের পা ধরে বসে থাকে কেনো? পুনম সোফায় গিয়ে বসে। নওশাদ আল্লাহ হাফেজ বলে কল কেটে দেয়। পুনম বলে,

“কে কল করেছে?”

“জুঁই আপা।”

“কেনো?”

“এমনিতেই।”

নওশাদ নিচে তাকিয়ে বলে, “আমার পায়ে কি সবসময়?”

“মজা।”

পুনম প্রথার হাত টেনে তুলে। “আসো আমরা ঘুমাবো।”

“না ঘুমাবো না।”

“কি করবে?”

প্রথা পুনম হাত ছেড়ে দৌঁড় মারে। ডাইনিং টেবিলের ওপাশে গিয়ে বলে,

“খেলবো।”

পুনম শান্ত গলায় বলে, “সাড়ে দশটা বাজে বাবা। ঘুমাতে হবে।”

“আজকে খেলি? একটু খেলি? কালকে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়বো।”

পুনম নওশাদের দিকে তাকায়। নওশাদ হেসে বলে,

“আসো খেলি। কি খেলবে?”

“আমাকে ধরো।”

“যদি ধরতে পারি?”

হাত প্রসারিত করে বলে, “এতগুলো পাপ্পি দিবো।”

নওশাদ মাথা নাড়িয়ে বলে, “শুরু হ্যাঁ?”

“ইয়ে ইয়ে”

নওশাদ প্রথার দিকে এগিয়ে যায়। প্রথা এক ছুটে ডাইনিং টেবিলের নিচে ঢুকে যায়।

পুনম বলে, “বাবা মাথায় ব্যথা পাবে। টেবিলের নিচ থেকে বের হও।”

প্রথা বলে, “বাবা তো ধরে ফেলবো।”

নওশাদ থেমে বলে, “ধরবো না। বের হও তারপর খেলবো।”

প্রথা বের হয়ে এলো। পুনম বলে, “কিচেন এড়িয়া থেকে বের হও। সোফার ওখানে গিয়ে খেলো।”

প্রথা দৌঁড়ে সোফার সামনে যায়। নওশাদ কিছুক্ষণ ইচ্ছে করে প্রথাকে ধরে না। প্রথা খিলখিল করে হাসছে আর বলছে, “বাবা ধরতে পারে না ধরতে পারে না।”

বাবা মেয়ের কান্ড দেখে পুনম হাসে। প্রথা যখন ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে যায় তখন গিয়ে প্রথাকে ধরে। কোলে তুলে বলে,

“কি? হলো না মজা?”

প্রথা খিলখিল করে হাসে। নওশাদ প্রথার গালে চুমু দিয়ে বলে, “ঘুমাতে হবে না এখন?”

প্রথা মাথা ঝাঁকায়। পুনম প্রথাকে কোলে তুলে নেয়। প্রথা পুনমের কোলে গিয়ে নওশাদের কপালে, দুগালে চুমু খায়। নওশাদ প্রথার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

“আমার ভালো আম্মা।”

“আমার ভালো বাবা।”

পুনম প্রথাকে নিয়ে রুমে চলে যায়। সময় নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে ড্রয়িংরুমে আসে। প্রথাকে সামলাতে পুনমের একটা জায়গাই বেগ পেতে হয় তা হলো প্রথার ঘুমের সময়। মেয়েটার ঘুম সহজে আসতেই চায় না আর ঘুম অনেক পাতলাও। নওশাদ ফেসবুক স্ক্রল করছিল। পুনমকে আসতে দেখে হাত ধুয়ে টেবিলে বসে। পুনমও চেয়ার টেনে বসে।

নওশাদ খেতে খেতে বলে, “তো সংসার জীবন কেমন লাগছে?”

“নট ব্যাড। তোমার?”

“এক গাধার আমাকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল। আমি কেমন হবো? আমি ভালো হবো না, আমি নাকি ছিলা মুরগি। তার ওইসব ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে দিতে পেরে খুবই গর্বিত।”

“ভালো স্বামী, একই সাথে ভালো বাবা।”

“তা আর বলতে?”

“মোটেও ভালো স্বামী নন। আমার কত স্বপ্ন ছিল বড় করে বিয়ে করার। তোমার মতো চামারের জন্য সেটা হয়নি। বজ্জাত।”

“বড় করে বিয়ে করার কি আছে? লোক দেখানো কাজ কারবার। সুখে আছি না?”

“সুখে তো তুমিই আছোই। তোমার মতো সুখে আছে কে? না চাইতেই সব হাতের সামনে। ত্রিশে বিয়ে করেছো, বিবাহ বার্ষিকী আসার দুই দিন আগেই একত্রিশে বাপ হয়েছো। তোমার মতো সুখী কেউ আছে?”

“বিয়ে করে সুখে আছি ঠিক আছে। বিয়ের পর পরই বাপ হয়েছি সেটাও ঠিক আছে। কিন্তু তোমার প্রেগনেন্সির টাইমে মোটেই সুখী ছিলাম না।”

“কেনো বউ দূরে ছিল নলে?”

“সেটার জন্য টেন পার্সেন্ট, বাকিটা নাইনটি পার্সেন্ট টেনশনে।”

“কিসের টেনশন?”

“সেভাবে রাত বিরাতে কল দিয়ে বলতে ও তো নড়ে না, আমি খেতে পারি না, হাঁটতে পারি না, হাঁচি দিতে পারি না, কাশি দিতে পারি না। এগুলো শুনলে চিন্তা হয় না? তার উপর বউ আমার ইমম্যাচিউর। আমি গেলে খুশি, না গেলে কান্নাকাটি করে একাকার অবস্থা। ভোর তিনটায় কল দিয়ে হাত কেটে ফেলবে, মরে যাবে কম হুমকি দাও নি আমাকে। আহ্লাদী মেয়ে, বাচ্চা একটা লাথি খেয়ে তিন মিনিট কাঁদতে, বয়স কম ছিল। চিন্তা হবে না?”

“অনেক টেনশন হতো?”

“তুমি আমাকে সেইসময় অনেক জ্বালিয়েছো গাধা। আমি রাতে ঘুমানোর আগে দোয়া পড়তাম যাতে আমার বউয়ের রাতে ভালো ঘুম হয়। নাহলে আমার ঘুম হারাম হয়ে যেতো।”

পুনম ভেংচি কাটে। “তখন তো এমন ভাব করতে যেন কোনো ব্যাপারই না। তুমি মহান মানব। বউয়ের বিরক্ত করাকে বিরক্ত করাই ভাবতে না।”

“ব্যাপারটা তোমাকে বললে তখন তুমি কাঁদতে। এমনিতেই যে কেঁদেছো পানি শূনত্যা দেখা দেয়নি সেটাই আমার মেয়ের ভাগ্য।”

“পুরুষ মানুষ এইজন্যই ঘেন্না লাগে।”

নওশাদ হাসে। পুনম বলে, “তো তোমার বিবাহিত জীবন কেমন?”

“তোমাকে আপনি থেকে তুমিতে কনভার্ট করতে যেমন কষ্ট হয়েছে তেমন কষ্টের।”

পুনম শীতল চাহনি দেয়। নওশাদ বলে, “সব মিলিয়ে ভালো আছি আমি। খুব ভালো।”

পুনম ভারী শ্বাস ফেলে। এই লোক মহা খারাপ।

______________________

শুয়ে পড়লেও পুনমের চোখে ঘুম নামে না। কিছুক্ষণ ছটফট করেও ঘুম না আসায় মোবাইল টিপতে থাকলে নওশাদ মোবাইল নিয়ে নেয়। নওশাদের কথা ঘুম না এলে পড়ো। পুনম তা মানতে না চাইলে জোর করে টেবিলে এনে বসিয়েছে। নওশাদ ওকে পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু পুনমের মনোযোগ নেই। ও গালে হাত দিয়ে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় নওশাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। নওশাদ বুঝিয়ে দিতে দিতে পুনমের দিকে তাকায়। পুনমকে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে নওশাদের কপাল কুচকে গেল।

“এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো?”

“ভাবছি।”

“কি?”

“কার কপাল ভালো? আমার নাকি তোমার?”

“কি ব্যাপারে?”

পুনম নওশাদের গাল টেনে বলে, “তুমি খুব ভালো ফেনীর মধু।”

“রাত হলে সব ইমম্যাচিউরিটি বের হয়ে আসে না?”

“না।”

“তো কি সবার সামনে ইন্ট্রোভার্ট হয়ে আমার সামনে বাঁচাল হতে মন চায়?”

“সত্যিই তাই।”

“পড়ো পড়ো।”

“আমরা দুজন কতদিন গল্প করি না বলো তো?”

“এক্সামের ডেট দিয়ে দিয়েছে। গল্প করার সময় না এটা।”

“পড়তে ইচ্ছে করছে না৷ প্লিজ না পড়ি? অনেক ক্লান্ত আজকে।”

“না পড়লে কিভাবে হবে? আমি চাই তুমি বিসিএস ক্র্যাক করো।”

“আল্লাহ ভরসা হবে। কিন্তু আজকে না প্লিজ? কত কাজ করেছি বলো?”

নওশাদ বই বন্ধ করে ফেললো। পুনম নওশাদের হাত ধরে। নওশাদ কোমল গলায় জিজ্ঞাসা করে,

“কি হয়েছে?”

“কিছু না এমনিতেই।”

নওশাদ পুনমের চেয়ার টেনে ওকে কাছে নিয়ে আসে৷

“মন খারাপ কেনো?”

“মন খারাপ না।”

“তো?”

“ক্লান্ত।”

“ঘুমাও তাহলে?”

“ঘুমও আসছে না।”

নওশাদ পুনমের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। পুনম নওশাদের হাতে গাল ঠেকিয়ে বলে,

“আমাকে যদি ধরে বেঁধে বিয়ে না দিতো তাহলে তোমার মতো কেয়ারিং হাসবেন্ড অন্যকেউ পেতো। ভাগ্যিস বিয়ে দিয়েছিল!”

“যাও মা, ভাইকে ধন্যবাদ দিয়ে এসো।”

“না। ওরা আমাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দিয়েছিল।”

“এখন তো আগের মতো ছ্যাতছ্যাত করো না।”

“ট্রাস্ট মি লেবার পেইন উঠার পর আমি যে কষ্ট সহ্য করেছি তারপর থেকে আম্মুর সাথে রাগারাগি করতে ইচ্ছে হয় না। মা হওয়া অনেক কষ্টের। এত কষ্ট করে প্রথাকে জন্ম দেওয়ার পর প্রথা যদি খারাপ ব্যবহার করে আমার অনেক কষ্ট হবে। আমি খারাপ ব্যবহার করলেও নিশ্চয়ই আম্মুর খারাপ লাগে?”

“তো সব তো তুমিই বলছো। জোর না করলে মন থেকে বিয়ে করতে?”

“তা হয়তো করতাম না।”

“সো এবার চুপ থাকো।”

“আমি রাজি হতাম না এটা সিউর। তুমি আমাকে একটু মানাতে? প্রেমিকদের মতো পিছে পিছে ঘুরতে।”

নওশাদ ভ্রুদ্বয় কুচকে বলে, “তোমাকে আমি চিনতাম নাকি যে ঘুরবো?”

“বিয়ের আগে তুমি তো আমার ছবি দেখেছিলে তাই না? একটু নায়কদের মতো হাবভাব করতেই পারতে। লাইক ছবি দেখেই প্রেমে পড়ে গিয়েছিলে, এই মেয়ে ছাড়া আর কাউকেই বিয়ে করবে না এমন। মেয়ে রাজি না তাতে কি? মেয়েকে নিজের ভালো মানুষি দেখিয়ে মানিয়ে নিবো।”

“অধিক মুভি দেখার ফল। আগে নিজে মুভি দেখতো, এখন আমার মেয়েকে সাথে নিয়ে দেখে।”

“মেয়ে শুধু তোমার? আসছে।”

নওশাদ পুনমের কপালে টোকা মারে। পুনম কপালে হাত ঘষে বলে,

“প্রথম দেখায় প্রেমে না পড়লেও, আমার ভালো লাগার জন্য তো বলতেই পারো।”

“মিথ্যা বলি না।”

“মানে আসলেই রসকষহীন।”

“তোমার চেহারায় একটা বলদ বলদ ভাব আছে। ওটা দেখেই ভালো লেগেছিল। শিওর ছিলাম একে বিয়ে করলে ছড়ি ঘোরাতে পারবো।”

“বেশি করলে কালকে আবার ডিম সিদ্ধ, ভাত করবো। ভালো ভালো খাবার সব বন্ধ।”

“মাফ করো।”

“ধরুন আমি বিয়ে করতে রাজিই না। আর তোমার আমার ছবি দেখেই ভালো লেগে গিয়েছিল। তো তুমি কি অপেক্ষা করতে?”

নওশাদ মুখ খোলার আগেই পুনম মাথা নিচু করে হাত জোর করে বলে, “মিথ্যা হলেও মিথ্যা বলে একটু প্রেমিকার ফিল নিতে দাও প্লিজ।”

নওশাদ হাসে। “আমার তখন পুরোপুরি বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল। আমি কেনো ওয়েট করতাম? আল্লাহর উপর বিশ্বাস করে যাকে পেতাম তাকেই বিয়ে করে ফেলতাম। আর তোমার প্রতি ছবি দেখার পর টর কোনো ফিলিংস কাজ করেনি। কবুল বলার পর থেকেই অটো মায়া জন্মে গিয়েছে।”

পুনম দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “এইজন্যই আমার পুরুষ মানুষ ঘেন্না লাগে।”

নওশাদ হাসে। পুনম আফসোস করে বলে, “আমার বয়স মাত্র আটাশ। মাত্র। এই যুগে আমার বয়সী মেয়েরা বিয়ে করে। আর আমি? এক বাচ্চার মাও হয়ে গিয়েছি।”

“ভালো তো। জীবনে এগিয়ে আছো।”

“তোমার আর কি!”

“সেটাই।”

পুনম নওশাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। নওশাদ ভ্রু নাচিয়ে বলে,

“কি?”

“বিয়ের প্রথম দিনের কথা ভাবছি।”

“কি?”

“ক্লিন সেভ করা ছিলে বলে ছিলা মুরগি ডেকেছিলাম।”

“এখনও ক্লিন সেভ করাই।”

পুনম হেসে বলে, “তখন তো বুঝিনি দাঁড়ি রাখলে তোমাকে বনমানুষের মতো লাগে। আল্লাহ মেয়ে হওয়ার সময় দাঁড়ি না কাটায় কেমন যে লাগছিলো!”

নওশাদ কপাল কুচকায়। “খুব ফানি কথা বললে।”

“যাই হোক। তুমি প্রথমদিন বেশ ভাব দেখিয়েছিলে। সে কি হম্বিতম্বি! আল্লাহ গো!”

“বিয়েতে মত নেই, জোর করে বিয়ে দিয়েছে- নায়িকাদের মতো ডায়ালগ দিলে রাগ হবে না?”

“তুমি আমার তখনকার মনের অবস্থা বুঝবে না।”

নওশাদ তাকিয়ে থাকে। পুনম বলে,

“শুধু আমার অবস্থাটা ভাবো। একজন অচেনা লোকের সাথে আমার বিয়ে হচ্ছে। তাকে আমি চিনিও না, জানিও না। এখন আমার কপাল ভালো তোমার মতো মানুষ পেয়েছি। সে লুইচ্চা হলে? আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার দাম না দিলে? গায়ে হাত তুললে?”

“আমার মনের অবস্থা ভাবো? জল্পনা কল্পনা করে বিয়ে করলাম। ওমাহ মেয়ে বিয়েতে রাজি না। আবার বলে আমার টাকায় পড়ে আমাকে ডিভোর্স দিবে। একে পাঁচ লক্ষ টাকা কাবিন, এরমধ্যে আরো খরচ। কি আজব প্রস্তাব।”

“ওইসব কথা বাদ। আমাকে বলো তুমি খারাপ হলে আমার কি হতো? আমি তো মরেই যেতাম।”

“যা হয়নি তা আর ভাবতে হবে না।”

“ফেনীর মধু?”

“হুম।”

“চলো ফ্লোরে গিয়ে বসি।”

দুজনে খাটে হেলান দিয়ে বসলো। পুনমের হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বলে, “তো মিসেস নওশাদ আপনার অনুভূতি জানতে চাই?”

“কিন্তু অনুভূতির কথা তো সবসময় আমি জানতে চাই।”

“আমি চাইলে সমস্যা কি?”

“কি ব্যাপারে অনুভূতি?”

“বিয়েতে তো মত ছিল না। তো হবু স্বামীর নাম অবশ্যই শুনেছিলেন?”

“হুম শুনেছিলাম।”

“তো কেমন অনুভূতি ছিল?”

নওশাদের মতো করে বলে, “যেমন থাকে তেমনই ছিল।”

“তাও স্পেসিফিক অনুভূতি জানতে চাই।”

“খুব ঘৃণ লাগছিলো। ওই নওশাদ বিন নাসিরকে সামনে পেলেই মেরে ফেলার মতো অনুভূতি ছিল। আমার এমনিতেই পুরুষ মানুষ ভালো লাগে না। এরমধ্যে ওই লোক এবারও কথাও বলেনি, আমার মত নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি। সব মিলিয়ে মেজাজ অনেক খারাপ ছিল। বাংলা গালি দেওয়ার মতো খারাপ।”

“বিয়ের ঠিক পরবর্তী মুহুর্তে?”

“ওই বাসা থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতেও জেদ নিয়ে ছিলাম। কিন্তু এই বাসায় আসার পর থেকে প্রচুর ভয় লাগছিলো। যার সাথে বিয়ে হলো সেই লোকটা কেমন না কেমন? আমাকে বুঝবে কিনা? তার ক্যারেক্টার কেমন? এতগুলো ননাস, ওনারা যদি আমার উপর ছড়ি ঘোরায় তাহলে কিভাবে হবে? ভাগ্নিগুলো কেমন? ভাগিনাগুলো কেমন? অনেক ভয় লাগছিলো।”

“আমার সাথে প্রথম কথা বলার পর?”

“তোমার সাথে কথা বলার আগেই সবাই বলছিলো তুমি অনেক রাগি। সবাইকে কথায় কথায় থাপ্পড় মারো। ভেবেছিলাম অনেক বদরাগী। তখন তো বুঝিনি ওরা আসল বদ। তারপর সিরাতকে বলা আমার কথাগুলো শুনে ফেলেছিলে। তারপর থেকে তো ওই বাসায় গিয়ে খোলাখুলি কথার বলার আগ পর্যন্ত অনেক ছ্যাতছ্যাত করতে। কিছু বললেই পয়েন্টে পয়েন্টে অনেক কথা শুনিয়ে দিতে। ভালো লাগতো না সেসব। খারাপই লাগতো।”

“তারপর?”

“তারপর কি? মানিয়ে গুছিয়ে নিলাম। তিনমাসে অনেকটাই চিনে গিয়েছিলাম। মোটামুটিভাবে ফ্রিও হয়ে গিয়েছিলাম কথা বলতে বলতে। বিয়ের পাঁচ মাসের সময় তো শুনি দুইমাসের প্রেগন্যান্ট। সব আনএক্সপ্টেড। তারপর তোমার আরো কেয়ারিং সাইড দেখলাম। আমি লাকি তোমার মতো আন্ডারস্ট্যান্ডিং হাসবেন্ড পেয়েছি। সবাই পায় না।”

“প্রথা হওয়ার সময়টা?”

“অনেক কষ্ট হয়েছিল আমার। অনেক। মনের ভয়ে, শারীরিক যন্ত্রণায়, তুমি কাছে থাকতে না, তোমার মেয়ে পেটে থাকতে অনেক জ্বালিয়েছে। বারো ঘন্টা লেবার পেইন সহ্য করেছি।”

“আমি তো বলেছিলাম সিজার করে ফেলতে।”

“সিজার করলে আমাকে বাঁচা লাগতো না। ভয়েই ওটিতেই কেল্লা ফতে।”

“হ্যাঁ এইজন্যই আমাকে মাফ করে দিয়েন। নয়মাসে অনেক কষ্ট দিয়েছি না?”

“ভালো লাগে না কিন্তু।”

নওশাদ পুনমের কাঁধ জড়িয়ে ধরে। পুনমের বাহু নওশাদের বুকে গিয়ে ঠেকে। পুনম বলে,

“তোমার অনুভূতি কি ছিল?”

“লজ্জা পাবে।”

“না বলো।”

“কবুল বলেছিলাম, তোমাদের ড্রয়িংরুমের কারো সামনে তোমার দিকে তাকাইনি। গাড়িতে আড়চোখে অনেকবার তাকিয়েছিলাম। কাঁদছো না দেখে অবাক হয়েছিলাম প্রথমে। ভেবেছিলাম লজ্জায় আমার সামনে কাঁদছো না। বাসায় আসলাম, তারপর তোমাকে দেখলাম খাওয়ার সময়। ভালোই লেগেছিল লাল শাড়িতে। দ্যান ছবি তুললাম না তোমার কাঁধে হাত দিয়ে?”

পুনম চোখ ছোট ছোট করে বলে, “হ্যাঁ? তো?”

“ফিলস লাইক কটন।”

“আমি জানতাম, আমি জানতাম তোমার মধ্যে সমস্যা আছে। ছুকছুক করার স্বভাব।”

নওশাদ হাসলো। “বাসর ঘরে ঢোকার সময় নিয়ত আমার ভালোই ছিল। ভেবেছিলাম আমার থেকে আট বছরের ছোট একটা মেয়ে বিয়ে করেছি। মেন্টাল হেল্থ বুঝতে হবে। গল্পটল্প করে ভালো সময় কাটানোর নিয়ত ছিল। ওমাহ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শুনি মেয়ে বলছে ওর বিয়েতে মত নেই। জোর করে বিয়ে দিয়েছে। স্বামী ওর মামার মতো। সংসার করবে না। ছিলা মুরগি আরো কতকি! অনেস্টলি আমি ভেবেছিলাম তোমার এফেয়ার আছে তাই রাজি ছিলে না।

পরে দেখলাম কাজ টাজও পারো না। ভাবতাম কাজ পারে, কিন্তু মন থেকে বিয়েতে রাজি না তাই কাজ করে না। কারণ আপাদেরকে এই বয়সে অনেক কাজ করতে দেখতাম। তো ভাবতাম সব মেয়েই বুঝি পারে। পরে দেখলাম না ভুল। আমার আপারা পারে বলে সব মেয়েই পারবে এমন কোনো কথা নেই। তারপর দেখতাম গাধামি করতে। ওখানেও রাগ কাজ করতো। নিশ্চয়ই রাজি ছিল না বলে বোকামি করে, এমন ধারণা ছিল। পরে ডে বাই ডে দেখলাম না মেয়েটা ভালোই। জেদ করে উল্টাপাল্টা কাজ করে শুধু। আমার বউ শুধু ভালো না, খাঁটি সোনা সে।”

নওশাদকে জড়িয়ে ধরে। বুকে নাক ঘষে বলে, “আমি ভালো। তুমি খারাপ।”

“তো এখনও নওশাদ বিন নাসির নামটাকে ক্ষেত লাগে?”

“না। আপন লাগে।”

“তা গাধা এখন ওভারঅল কেমন লাগছে?”

পুনম মাথা তুলে বলল, “নজর লাগবে। তোমার?”

“আমারও নজর লাগবে।”

“ধন্যবাদ আমাকে এতটা সাপোর্ট করার জন্য।”

“ধন্যবাদ গাধা এত কষ্ট সহ্য করে আমাকে চমৎকার একটা মেয়ে উপহার দেওয়ার জন্য। আমাকে একটা পরিপূর্ণ ফ্যামিলি দেওয়ার জন্য।”

“ধন্যবাদ আমার শাশুড়ি মাকে, তোমাকে একা হাতে এত কষ্ট করে এমন সুন্দর, চমৎকার মন-মানসিকতা সম্পন্ন মানুষ বানানোর জন্য। নাহলে আমি এত ভালো স্বামী, প্রথা এত ভালো বাবা কি করে পেতো?”

নওশাদ হাসে। “এক আম্মা ভালো মানুষ বানিয়েছে, আরেক আম্মা আমাকে আরো কিছু শিখাবে।”

পুনম নওশাদকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,

“এভাবেই থেকো গাধা।”

“সব ভালো কিন্তু সবসময় গাধা ডাকো কেনো আমাকে? মেয়ের সামনেও একবার দুইবার ডেকেছো। ভালো লাগে না কিন্তু।”

“তাহলে কি ডাকবো?”

“সেটাও শিখিয়ে দিবো? আমি তোমাকে কত সুন্দর সুন্দর নামে ডাকি আর তুমি?”

ভেঙ্গিয়ে বলে, “সে বউকে কোন নামে ডাকবে সেটা নাকি বউকে শিখিয়ে দিতে হবে! জীবনে গাধা আর এই সময় লাগবে ছাড়া তো অন্য নামে ডাকোও নি।”

“দুটোই পারফেক্ট তোমার সাথে। বেশি না, বেশি না, এক সপ্তাহ সময় দিলেই হবে। কি ভেবেছো ভুলে গিয়েছি?”

ফের বলে, “আরেকটাও আছে। আমাকে মাফ করে দিয়েন, আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি।”

“ভয় তো পেয়েছিলেই। এখন নিজের দুর্বলতা লুকাতে এইসব বলে খোঁটা দাও।”

“চুপ করো গাধা।”

পুনম মুখ কুচকে ফেলে। নওশাদের বুকে এলোপাতাড়ি ঘুষি মেরে উঠে যায়। নওশাদ হাসে। পুনম ধুপধাপ পা ফেলে প্রথার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ে। প্রথাকে জড়িয়ে ধরে। নওশাদ লাইট নিভিয়ে পুনমের পিছনে গিয়ে শোয়। এক ঝটকায় পুনমকে নিজের দিকে ফিরায়। গালে আঙুল স্লাইড করতেই পুনম খাপছাড়া গলায় বলে,

“ভালো হচ্ছে না কিন্তু। প্রথা জেগে যাবে।”

“প্রথার কখনোই রাতে ঘুম ভাঙে না।”

“আপনি আমার সাথে কথা বলবেন না। আপনাকে চিনি না আমি।”

নওশাদ পুনমের গালে গাল ঘষে। ঠোঁট চেপে ধরে। পুনম নওশাদের বুকে হাত রেখে বলে, “গাধা ডাকবে না। তুমি একজন গ্র্যাডুয়েশন কমপ্লিট করা মেয়েকে গাধা ডাকতে পারো না।”

“তাহলে এই সময় লাগবে ডাকবো?”

“না। একদম না। আমি তখন অবুঝ ছিলাম তাই বলে ফেলেছিলাম। তুমি সময়ে অসময়ে শুধু এটার মজা নাও। পছন্দ না আমার বিষয়টা।”

“আর মাফ করার বিষয়টা?”

“ওটা কেনো বলেছিলাম নিজেরও মনে নেই। এত পেইন হচ্ছিলো যে বলতে মন চেয়েছে তাই বলে ফেলেছি।”

নওশাদ আবারও হাসলো। পুনমকে ডিঙিয়ে প্রথার কপালে চুমু খায়। পুনমের দিকে তাকায়। নওশাদের দুই শান্তির জায়গা এই মা মেয়ে। নওশাদ পুনমের গালে গাল ঘষে। গালে গাল লাগিয়ে রেখেই বলে,

“আমাদের অপরিচিত থেকে পরিচিত হওয়ার গল্পটা দারুণ না?”

“হুম।”

“দুই ইন্ট্রেভার্টের সংসার দারুণ না?”

“হুম।”

“এক্সট্রেভার্ট, ইন্ট্রেভার্টের সংসার হওয়ার চাইতে দুই ইন্ট্রোভার্ট সহজেই একে অপরের কাছে নিজেদের কনফেশ করতে পারে না?”

“হুম।”

“আমরা প্রথাকে নিয়ে অনেক ভালো আছি না?”

“হুম।”

“এবার একটু নিজের ফিলিংস শেয়ার করি?”

“করো?”

ফের পুনমের গালে গাল ঘষে। ধীমে গলায় বলে,

“তুমি আমার অনেক প্রিয়।”

পুনম চোখ বন্ধ করে ফেলে। নওশাদ গালে গাল ঘষে কানের সামনে মুখ নিয়ে বলে,

“আশনূহার মা, আশনূহার বাবার অনেক প্রিয়। এখন আমার এই প্রিয় মানুষটিকে গাধা, সময় লাগবে ছাড়া অন্য কোন প্রিয় নামে ডাকা যায়? গাধা, এই সময় লাগবেই তো অনেক আমার প্রিয় ডাক।”

পুনম অস্ফুটস্বরে বলে, “জানি না। এগুলো বুঝি প্রিয় ডাক হয়?”

“তোমার বোকামি আমাকে তোমাকে গাধা ডাকার জন্য বাধ্য করে।”

“সবসময় বাড়াবাড়ি। জীবনেও তোমার মতো রষকষহীন স্বামী দেখিনি। আমি ডাকি মধু আর উনি ডাকে গাধা। আবার বলে প্রিয় ডাক! ভোগলামি ভালোই পারে নোয়াখাইল্লা বেডা।”

নওশাদ পুনমের গাল চেপে ধরে বা গালে অনেকক্ষণ ঠোঁট চেপে ধরে রাখে। তারপর গালে গাল ঘষে কানের সামনে বলে, “তাহলে বলো কোন প্রিয় নামে ডাকি?”

নওশাদ পুনমের কপালে কপাল ঠেকায়। গুনগুনায়,

“কোন প্রিয় নামে ডাকি? বলো কোন প্রিয় নামে ডাকি? মান ভাঙাব মানিনী? বলো, কোন প্রিয় নামে ডাকি?”

______________সমাপ্ত_____________

(হ্যাপি রিডিং) {১৮/০১/২০২৬ টু ০৩/০৩/২০২৬}

{অসংখ্য ধন্যবাদ এতটা সময় ধরে আগডুম বাগডুম গল্পটা পড়ার জন্য। ১২/০৩/২০২৬ এ প্রথা যেদিন হয় সেদিনের একটা পার্ট দিবো। কারণ সেদিন প্রথার জন্মদিন। আর হ্যাঁ কেমন লাগলো জানাবেন কিন্তু…..}

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here