পড়ন্ত বিকেলের মিষ্টি হওয়া ফারিনের বরাবরই ভালো লাগে। সময় পেলেই ও এই সময় ছাদে আসে। এখনও ছাদেই বসা এবং হালকা বাতাস বইছে। তবে এখন ও প্রচন্ড বিরক্ত। যার অন্যতম কারণ সামনে বসা ব্যক্তিটা। ওর নামমাত্র বাবা কোথা থেকে যেন কোন বিজনেস পার্টনারের ছেলেকে ধরে এনে তার সামনে ওকে বসিয়ে দিয়েছে। ফারিন চোখ বন্ধ করে বড় একটা শ্বাস ফেললো। ওর রাগে গা জ্বলছে অথচ সামনে বসা লোকটা না কোনো কথা বলছে, না চলে যাচ্ছে। ফারিনকে আগেও এমন বহু লোকের সামনে বসানো হয়েছিল। তখনও ফারিন আগ বাড়িয়ে কারো সাথে কোনো কথা বলেনি, এবারও বলবে না।
সাফওয়ান সিদ্দিক নীরবতা ভেঙে গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
“আপনার কিছু বলার আছে?”
“বিয়েটা ভেঙে দিন।” ফারিন রুক্ষ গলায় বলে।
সাফওয়ান সিদ্দিক এক ভ্রু উঁচু করে তাকায়। এতক্ষণ কোনো কথাবার্তা না বলে এখন কথা শুরুই করলো বিয়ে ভেঙে দেওয়ার কথা বলে! গুরুগম্ভীর গলায় বলে, “কারণ?”
“আমি বিয়ে করতে চাচ্ছি না তাই।”
“এগজ্যাক্ট রিজন দেখাতে পারলে ভেঙে দিবো।”
ফারিনের রাগে মুখ লাল হওয়ার উপক্রম। মুখ থেকে বাংলা, ইংরেজি ভাষায় গালিও বের হয়ে যাবে যেকোনো সময়। কিন্তু ও চায় না উল্টাপাল্টা কিছু বলে পরে চড় থাপ্পড় খেতে।
“কি হলো বলুন?”
“আমি বিয়ে করতে চাচ্ছি না, সেটা কি এগজ্যাক্ট রিজন নয়?”
“রিলেশন আছে?”
“থাকলেও আপনাকে বলতে বাধ্য নই।”
সাফওয়ান সিদ্দিক একপলকে ফারিনের পায়ের দিকে তাকালো। পা ক্রমাগত নাড়াচ্ছে। পুনরায় ফারিনের চোখে চোখ রেখে বলে,
“আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন না, নাকি কাউকেই বিয়ে করতে চাচ্ছেন না?”
“দ্যাটস নান অফ ইউর বিজনেস।”
“রিলেশন না থাকলে বিয়ে করতে সমস্যা কি?”
“আপনাকে বলতে বাধ্য নই।”
“আমার জানামতে কোনো মেয়েই শুরুতে রাজি থাকে না। পরে ঠিকই মেনে নেয়।”
“আপনাকে আমি সব মেয়ের বুলি আওড়াতে বলেছি?”
“ওকে আপনার বিয়ে করতে না চাওয়ার এগজ্যাক্ট রিজন বলুন।”
“আমি রান্না করতে পারিনা।”
“এটা বিয়ে ভাঙার জন্য পাকাপোক্ত কারণ হতে পারে না।”
“আমি ঘরের কাজ করতে পারি না।”
“লেইম রিজন।”
ফারিন বড় একটা শ্বাস নিয়ে বলে, “আপনি আমার কথা শুনুন মিস্টার।”
“আমি আপনার কথাই শুনছি। এখানে আমি আর আপনি ছাড়া আর কেউ নেই।”
“আপনি আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছেন।”
“আই লাইক ইট।”
“আপনি বিয়েটা ভেঙে দিবেন।”
“ভ্যালিড রিজন তো দেখাতে পারলেন না। কিসব আবোলতাবোল কথা বলছেন। অ্যাকুরেট কিছু দেখাতে পারলে ভেবে দেখতাম।”
“ফালতু লোক একটা।” রেগেমেগে লাল হয়ে উঠে।
“এক্সকিউজ মি। আপনি বিয়ে ভাঙার এগজ্যাক্ট রিজন দেখাতে পারছেন না ভালো কথা, কিন্তু এইসব কি ধরনের ব্যবহার?”
“বিয়ে করবো না, করবো না, করবো না।”
সাফওয়ান সিদ্দিক গো ধরে বলে, “রিজন দেখান।”
ফারিন রেগেমেগে চিৎকার করে বলে, “আমি কোনো নেশাখোর, মেয়েবাজকে বিয়ে করবো না।”
সাফওয়ান সিদ্দিক অবাক। “এক্সকিউজ মি?”
ফারিন রাগে ফুঁসছে। সাফওয়ান সিদ্দিক ভ্রু কুচকে বলে,
“না জেনে শুনে কথা বলা কোন ধরনের স্বভাব?”
“বিয়ে ভাঙবেন কিনা বলুন?”
“না।” একটু থেমে বলে, “এখন তো আরো নয়। আপনাকে বিয়ে ভাঙার রিজন দেখাতে বলেছি, অথচ আপনি আমাকে আপনাকে বিয়ে করার আরো পাকাপোক্ত রিজন দিচ্ছেন।”
“মানে?”
“আমি যে নেশাখোর, মেয়েবাজ নই তা প্রমাণ করার জন্য আমি বিয়েটা করবো। আপনি চাইলেও করবো, না চাইলেও করবো।”
“আমি কোনো বড়লোক বাবার বিগড়ে যাওয়া ছেলেকে বিয়ে করবো না।”
“আমি এখন, এইমাত্র আপনাকে বিয়ে করার আরো একটা রিজন পেয়েছি।”
“আপনাকে আমি দেখে নিবো।”
“সিউর। আপনার সাথে বিয়ে হলে আপনিই তো দেখবেন।”
“আপনাকে আমি বললাম টা কি?”
“আপনি কি বলেছেন সেটা আমি মাথায় নিতে চাচ্ছি না। আপনার মাথার এক, দুটো স্ক্রু ঢিলা তা আমি বুঝেছি। হোয়াটএভার আপনি এটা মাথায় ঢুকিয়ে নিন আপনার সাথে আমার এই শুক্রবারেই বিয়ে হবে। আন্ডারস্ট্যান্ড?”
“আপনি কি বাংলা ভাষা বোঝেন না? আমি বিয়ে করতে চাই না।”
“আপনিও কি বাংলা বোঝেন না? এগজ্যাক্ট রিজন দেখালেই তো না করে দিতাম। আছে এগজ্যাক্ট রিজন?”
“আমি…”
“বিয়েতে কি পড়বেন? লেহেঙ্গা নাকি বেনারসি?”
ফারিন রেগে সাফওয়ান সিদ্দিকের সামনে থেকে বড় বড় পা ফেলে চলে গেল। সাফওয়ান সিদ্দিক চুলে হাত গলিয়ে বড় শ্বাস ফেলে। ও এই মেয়েকেই বিয়ে করবে। এই মেয়ের সাথেই সংসার করবে। এই মেয়েকেই বাচ্চার মা বানাবে, যাই হয়ে যাক। এই মেয়ের সাথেই বুড়ো হবে।
________________________
সিদ্দিক বাড়ির ড্রয়িংরুমে আলোচনা করা হচ্ছে। শিরিনা এবং জেসমিন কেউই সরাসরি মেয়েকে দেখেনি, তবে মেয়ের ছবি দেখে এক দেখায়ই পছন্দ হয়ে গিয়েছে। শিরিনা ফারিনের ছবি দেখে বলে,
“মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ মেয়ে অনেক সুন্দর। আমাদের আহসানের পাশে দারুণ মানাবে।”
আহসানের আম্মু জেসমিন মাথার ওড়না টেনে বলে,
“অনেক সুন্দর না ভাবি?”
“অনেক।”
জেসমিন আনোয়ার সিদ্দিকের উদ্দেশ্যে বলে,
“ভাইজান বিয়ের কথাবার্তা এগোন তাহলে?”
“তোমরা সরাসরি দেখবে না?”
জেসমিন বলে, “ভাবিরও পছন্দ হয়েছে, আহসানের আব্বুরও ভালো লেগেছে, আহসানেরও মেয়ে পছন্দ হয়েছে। আমার আর সরাসরি দেখতে হবে না। বিয়ের কথাবার্তা এগোন৷ আমার সমস্যা নেই।”
আদৃত আহসানের দিকে তাকিয়ে ইশারা দেয়। অনিরুদ্ধ আহসানের গা ঘেষে সোফার হ্যান্ডেলে বসা। আহসান চোখ সরিয়ে নেয়। টিশার্ট টেনে টুনে সোফা থেকে উঠে দোতলার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়৷ আদৃতও আহসানের পিছন পিছন উঠে যায়৷ অনিও মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে উঠে গেল৷ শিরিনা তিনজনের এভাবে যাওয়ার পানে তাকিয়ে বলে,
“হাঁসের বাচ্চার মতো দল বেঁধে চলে গেল।”
আনোয়ার সিদ্দিক এনামুলের সাথে কথাবার্তা বলে রশিদ আলম অর্থাৎ ফারিনের আব্বুকে কল দেয়৷ বিয়ের আয়োজন জলদি করতে হবে। বাড়ির বড় ছেলে আহান মাত্র দেড় সপ্তাহের জন্য কানাডা থেকে দেশে আসবে। তখনই আহসানের বিয়ের আয়োজন করতে হবে।
আহসান এতক্ষণ ওদেরকে পিছন পিছন আসায় কিছু না বললেও পিছন পিছন দুজনকেই নিজের রুমে আসতে দেখে কপাল কুচকায়। “কি চাই?”
অনি বলে, “ভাবি আমাদের অনেক পছন্দ হয়েছে।”
আহসান নির্লিপ্ত গলায় বলে, “তো আমি কি করবো?”
অনি আহসানের বিছানায় বসে বলে, “তোমারও তো পছন্দ হয়েছে।”
“মোটামুটি। আম্মুদের ভালো লেগেছে, সো ইয়াহ।”
অনি পকেট থেকে মোবাইল বের করে। ফারিন আর আহসানের ছাদে থাকা ছবি দেখায়। ফারিন মাথা নিচু করে তাকিয়ে ছিল আর আহসান ফারিনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। আহসান ছবিটা দেখে বলে,
“কি? নরমাল ছবি।”
“এটাকে এডিট করে ভ্যাবলার মতো হা করে তাকিয়ে থাকা ছবি বানিয়ে দিবো।”
আহসান টেনে অনির মোবাইল নিয়ে নিলো। “তোকে এডিট করতে হবে না। আমিই করে দিবো।”
বলে নিজের হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠিয়ে দিলো। “যা এবার।”
“ভাবির ছবিটা কোথায়?”
“কোনটা?”
“তোমাকে যেটা দেওয়া হয়েছিল?”
“কেনো?”
“আমার বন্ধু বান্ধবিকে আমার নতুন ভাবির ছবি দিবো।”
“মনে নেই কোথায় রেখেছি।”
“আরেহ খুঁজো তাহলে?”
“পারবো না। ইচ্ছে নেই কারো ছবি খোঁজার।”
আদৃত বলে, “আমাদের অনির বান্ধবিও আছে। বিশ বছর বয়সেই বান্ধবী। আমি তো আটাশ বছর বয়সেও একটা বান্ধবী জোগাড় করতে পারলাম না। ভাইয়াও একত্রিশ বছর বয়সে বান্ধবী জুটাতে পারেনি।”
অনি চুলে হাত গলিয়ে ভাব নিয়ে বলে, “আমার মতো হ্যান্ডসামের সাথে সবাই কথা বলতে চায়। আমি আবার মেয়েদেরকে নিষেধ করতে পারি না।”
আহসান বলে, “তুই যে ছ্যাবলা প্রকৃতির ছেলে আমরা সবাই জানি। তোর যে আমাদের দাদার মতো বারো দিকে তাকানোর স্বভাব আছে সেটাও জানি। তুই যে ভবিষ্যতে আকাম ঘটাবি সেটাও জানি।”
“কি আকাম?”
আদৃত বলে, “সেটা তুইও বুঝেছিস, আমরাও বুঝেছি।”
“হো পরে জেসমিন আরা আমাকে জুতা খুলে পিটাবে।”
আহসান বলে, “ওইটাও কম পড়বে তোর জন্য।”
অনি বিরক্ত হয়ে চলে গেল। আদৃত আহসানের বিছানায় আয়েশ করে বসে।
“মেয়েটার নাম কি?”
আহসান পকেটে হাত গুঁজে বলে, “ফারিন সম্ভবত।”
“বয়স কত জানো?”
“চব্বিশ শুনেছি।”
“তোমার থেকে আট বছরের ছোট। বিয়ে করতে রাজি হচ্ছো কেনো?”
“এইজ গ্যাপ স্ট্যান্ডার্ড। রাজি না হওয়ার কি আছে?”
“স্ট্যান্ডার্ড? স্যান্ডার্ড এইজ গ্যাপ হায়েস্ট পাঁচ বছর। আমি পারলে সমবয়সী বিয়ে করবো। ভাইব ম্যাচ হতে হবে ব্রো।”
আহসান ল্যাপটপ নিয়ে বিছানায় বসে। “তোর যেটা ভালো লাগে তুই সেটা করিস। আমাকে আমার ভালো লাগা মতো করতে দে।”
“তুমি এক দেখায় পাগল হয়ে গিয়েছো না?”
“তাতে তোর কি?”
“আমার আর কি? আমার কিছু না।”
“এত প্যাঁচাল না পেরে নিজেকে রেডি কর, নেক্সট মান্থ থেকে উত্তরা ব্রাঞ্চে অফিস করবি।”
“আমি যাবো না। ধানমন্ডি ব্রাঞ্চেই থাকবো।”
“উহু৷ এখানে আব্বু, চাচ্চু আছে৷ সবাই এক জায়গায় থাকলে কিভাবে হবে? উত্তরা ব্রাঞ্চে মেম্বার লাগবে।”
“তো আমি উত্তরা গেলে কোথায় থাকবো?”
“আমার অ্যাপার্টমেন্টের উপরের তলায়।”
“একা?”
“দোকা কোথায় পাবো? বিয়ে করিয়ে দেই? বউ নিয়ে থাকিস?”
আদৃত বড় বড় পা ফেলে শিরিনার কাছে গেল। উত্তরায় গিয়ে কি ও একা থাকবে নাকি? কতবার বুঝালো উত্তরা ও যাবে না, একা থাকতে পারবে না। তাও বাপ, চাচা, উত্তরা ব্রাঞ্চের এমডি একই ওয়াজ করছে। আদৃত তো উত্তরায় যাবেই না। আদৃতকে কেউ উত্তরায় নিতে পারবে না, না মানে না।
আদৃত বেরিয়ে যেতেই আহসান দরজা লাগিয়ে দেয়। ড্রয়ার থেকে ফাইলের কাগজের ভাজ থেকে ফারিনের ছবি বের করে। মিষ্টি মেয়ে একটা। আহসানের এক দেখায় পছন্দ হয়ে গিয়েছে। ছবিতে আঙুল বোলায়। আহসানের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে। ল্যাপটপ নিয়ে বসে। ফারিনের সাথে যায় এমন বিয়ের শাড়ি, গহনা দেখতে থাকে। ফারিনের সব জিনিস ও নিজের হাতে কিনবে। শাড়ির চিন্তা বাদ দিলো। ও লেহেঙ্গা কিনবে ফারিনের জন্য। ঠোঁটের কাছে আঙুল চেপে দেখতে লেহেঙ্গার কালেকশন দেখতে থাকে। আধঘন্টা বাদে দরজায় কেউ নক করে।
আহসান বিরক্ত হলো। চাপা শ্বাস ফেলে বলে, “কে?”
ঝাঁঝালো কণ্ঠে আদৃত বলে, “দরজা খোলো।”
আহসানের রাগ লাগলো। ফারিনের ছবি লুকিয়ে রাখে, ফোল্ডার পাল্টে কাজের ফাইল বের করে দরজা খুলে। আহসানের শান্ত মেজাজ সবসময় খারাপ করে দেয় এই আদৃত আর অনি। আহসান দরজা খুলে, প্রচন্ড বিরক্তি সহকারে বলে,
“কি?”
“তোমার কি এই শুক্রবারের পরের শুক্রবারে বিয়ে হলে করলে সমস্যা হবে?”
“কেমন সমস্যা?”
“তাড়াহুড়ো করা হয়ে যাবে না তো?”
আহসান মনে মনে বলে, “আমার তো এই শুক্রবারেই বিয়ের ব্যবস্থা বেশি ভালো হতো।”
“কিছু বলো?”
কপাল চুলকে বলে, “ভাইয়া না আসলে কিভাবে কি?”
আদৃত সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে হিসেব করে বলে,
“এই শুক্রবারের পরের শুক্রবার বিয়ে হলে.. বড় ভাইয়া তোমার হলুদের আগের দিন মানে হলো হলুদের দিন ভোরে ল্যান্ড করবে আরকি।”
“জেঠিম্মু, আম্মু যা ভালো বুঝে তাই করতে বল।”
আদৃত ল্যাপটপের দিকে ইশারা দিয়ে বলে, “কি কাজ করো দেখি?”
আহসান ঠেলে, ধাক্কিয়ে আদৃতকে ঘর থেকে বের করে দিলো। বিড়বিড় করে, “বিরক্তকর কতগুলো!”
____________________
উত্তরা ব্রাঞ্চের সিদ্দিক এন্টারপ্রাইজ। এমডি আহসান ইজি চেয়ারে বসে সামনের দিকে ঝুঁকে ব্যস্ত হাতে ল্যাপটপে টাইপ করছে। মিটিং আছে একটা। আহসানের মেজাজ বেশ চওড়া। আদৃতকে বারবার বলছে উত্তরা ব্রাঞ্চে চলে আসতে, তাহলে আহসানের কাজ সহজ হয়ে যেতো, ওকে আর একা হাতে সবটা সামলাতে হতো না। কিন্তু না! ওই বান্দা আসবে না। আর আহসান চায়ও না আদৃতের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও আদৃতের জায়গায় অন্য কেউ ডিপার্টমেন্ট হেড হোক।
আহসানের মোবাইল বেজে উঠে। টেবিলে থাকা ফোনের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখে একটা আননোন নাম্বার থেকে কল এসেছে। আহসান মোবাইল নিয়ে হেলান দিয়ে বসে কল রিসিভ করে।
“আসসালামু আলাইকুম।”
অপরপ্রান্ত থেকে একটা নারী কণ্ঠ শোনা গেল।
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। সাফওয়ান সিদ্দিক বলছেন?”
“জ্বি।”
“আপনিই কি সেই যার সাথে ফৌজিয়া ফারিনের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে?”
“জ্বি।”
“ও একটা নষ্ট মেয়ে, বাজে মেয়ে, ওর দশ বিশটা বয়ফ্রেন্ড আছে। মেয়ে হয়েও নেশাপানি করে, স্মোক করে। নাইট পার্টি ফার্টিও করে। একটা সংরক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের ছেলে হয়েও এমন মেয়ে সাথে আপনার বিয়ে হলে আমাদের খারাপ লাগবে। আপনার ভালোর জন্যই বলছি। আপনি বিয়েটা ভেঙে দিন।”
আহসান কিছু বলবে তার আগেই মেয়েটি বলে,
“ওওহ হ্যাঁ হ্যাঁ ওর আমার ভাইয়ের সাথে দীর্ঘ আঠারো বছরের সম্পর্ক।”
আহসান কপাল কুচকায়। পর মুহুর্তেই আবছা বিড়বিড় করে বলা কথা শুনতে পায়, “কি লিখেছিস এটা? আঠারো বছর কেনো লিখলি? আট না হওয়ার কথা?”
আহসান মোবাইল সামনে স্ক্রিনের দিকে তাকায়। স্ক্রিপ্টেড তাহলে। তবে বেশ হাসি পেলো এই ব্যাপারটায়। ফারিনের বয়স সবে তেইশ শেষ হয়ে চব্বিশ, ওর নাকি আঠারো বছরের সম্পর্ক! স্ক্রিপ্ট যখন বানিয়েছে ঠিকঠাক করেই বানাতো? আহসান ফের কানে মোবাইল চাপে। মেয়েটি তড়িঘড়ি করে বলে,
“সরি সরি দীর্ঘ আট বছরের সম্পর্ক। আপনি বিয়েটা ভেঙে দিন।”
“না বিয়ে ভাঙবো না।”
“আজব তো! আপনি একটা বাজে মেয়েকে বিয়ে করবেন?”
আহসান হাসে। রয়ে সয়ে বলে, “হুম করবো।”
“আপনি একটা খারাপ মেয়েকে কেনো বিয়ে করবেন?”
“করবো কারণ আমিও খারাপ, নষ্ট, বাজে ছেলে। আমার বিশ, ত্রিশটা গার্লফ্রেন্ড আছে। একটা মেয়ের সাথে আমার দশ বছরের সম্পর্ক। সমস্যা নেই। খারাপের সাথে খারাপেরই বিয়ে হয়।”
আহসান পরমুহূর্তে ঝাঁঝালো কণ্ঠস্বর শুনলো। “এই বেডা এই! আপনার যদি দশ বছর কারো সাথে সম্পর্ক থেকেই থাকে, তাহলে আমাকে কেনো বিয়ে করবেন?”
আহসান নিঃশব্দে হাসলো। “যেভাবে আপনার কারো সাথে দীর্ঘ আঠারো, সরি আট বছরের সম্পর্ক ঠিক সেইভাবে আমারও একজনের সাথে দশ বছরের সম্পর্ক। স্ক্রিপ্ট বানিয়েছেন ভালো কথা, একটু ভালো করেই নাহয় রেডি করতেন?”
ধরা খেয়ে ফারিনের চুপসে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ও দ্বিগুণ তেজ নিয়ে বলে, “ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। আপনাকে আমি লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি- বিয়ে ভেঙে দিন।”
“সুইট আউটলুক, সুইট ভয়েজ। এমন বউই মনে মনে কল্পনা করতাম।”
“বিয়ে ভাঙবেন না?”
“হাইটও পারফেক্ট। অলওভার ওকে।”
“বিয়েটা ভাঙবেন না?”
“চুলগুলোও শর্ট। শর্ট হেয়ার আমার খুব পছন্দের। লং হেয়ার আমার ভালো লাগে না।”
“আপনার বাবা মা জানে আপনি এতটা নিম্ন শ্রেণির লুইচ্চা?”
“আচ্ছা বিয়ের পর উচ্চ শ্রেণির লুইচ্চা হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টায় করবো।”
“পুরোই থার্ডক্লাস।”
“আপনি পুরোই ফার্স্ট ক্লাস।”
ফারিন কেটে দিলো। আহসান মোবাইল রেখে হাসে। ঠোঁটের কাছে আঙুল ঠেকিয়ে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে সুক্ষ্ম হাসি। বিড়বিড় করে বলে,
“ইমম্যাচিউর লেডি।”
চলমান…..
#আফরিন_আখ্যান
#সূচনা_পর্ব
#সমৃদ্ধি_রিধী

