#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_২
#সমৃদ্ধি_রিধী
আজ আহসানের বিয়ে। গতরাত রাতেও ফারিন বিয়ের ভেঙে দেওয়ার কথা বলে অসংখ্য মেসেজ দিয়েছে। আহসান ফারিনের মজা নিয়ে চুটকি দিয়ে সব হুমকি ধামকি উড়িয়ে দিয়েছে শুধু। এখন এগারোটা বাজে। আহসান অধির আগ্রহে রেডি হয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আগ্রহের পাশাপাশি ওর মেজাজও ভীষণ খারাপ। সবাই রেডি, বরের গাড়ির আগে একটা গাড়ি বেরও হয়ে গিয়েছে কিন্তু আদৃত, অনি না আসার কারণে আহসানের গাড়ি ছাড়লো না। আহান বিরক্ত হয়ে ওদের আনতে গিয়েছে। আদৃত, অনিরুদ্ধর তো নামার কোনো খোঁজ খবর নেই-ই এখন আহানেরও খবর নেই। এদিকে আনোয়ার সিদ্দিক শিরিনা, জেসমিনকে বকাবকি করছে।
আহসানের এত রাগ লাগছে তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। ও ঘড়ি দেখে। শেরওয়ানির পকেট থেকে মোবাইল বের করে আহানকে কল দেয়। আহান কেটে দিয়েছে। আহসান বিরক্তিতে চ সূচক শব্দ করে পায়ের সামনে থাকা ইট ছুঁড়ে মারে। সামনে তাকিয়ে দেখে অনিরুদ্ধ চোখ কচলাতে কচলাতে আসছে। আহসান মুখ স্বাভাবিক করে ফেলে। অনিরুদ্ধ আহসানকে এসে জড়িয়ে ধরে।
“ভাইয়া তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে।”
আহসান কপাল কুচকে অনিকে সরিয়ে দিয়ে বলে,
“ব্রাশ করিসনি? মুখে গন্ধ!”
অনিরুদ্ধ মাথায় হাত দেয়। “আয়হায় বড় ভাইয়া এত তাড়া দিচ্ছিলো যে ব্রাশ করতেই ভুলে গিয়েছি।”
আহসানের নাকের পাটা ফুলে ওঠে। অনিরুদ্ধ বলে,
“আমি এক দৌড়ে ব্রাশ করে আসি?”
“না। ভুলেও না। বড় চাচ্চু চিল্লাচিল্লি করছে, দেরী হয়ে যাচ্ছে দেখছিস না?”
অনি মুখ কুচকে বলে, “তো আমি এই মুখ নিয়ে যাবো?”
আহসান শেরওয়ানির পকেট থেকে চুইংগাম বের করে অনিকে দেয়। “খা এটা।”
অনিরুদ্ধ চুইংগাম চিবোতে থাকে। একটু পর আদৃত, আহান আসে। আদৃত, আহানকে দেখে আনোয়ার সিদ্দিক চেঁচামেচি করতে থাকে। এত দেরী কেনো? এত বড় হওয়ার পরও দায়িত্বজ্ঞানের অভাব, সময় নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই আরো কতকি। এমনিতেই ভোর রাত পর্যন্ত নাচানাচি করে আদৃত ঘুমিয়েছে ভোর ছয়টার পর, এরমধ্যে আবার আনোয়ার সিদ্দিকের চিল্লাচিল্লি। আদৃতের চড়ে থাকা মেজাজ আরো মেজাজ খারাপ হলো। ব্যাক সিটে বসে জেদ করে ধরাম করে গাড়ির দরজা লাগিয়ে দেয়।
আনোয়ার সিদ্দিক ছেলের বেয়াদবিতে আরো ক্ষেপে গেল। আদৃতকে বকাঝকা করার সাথে আহানকেও বকতে শুরু করে। আহসান পড়ে বিপাকে। মানে ওর বিয়ের দিনই হাঙ্গামা লাগতে হলো? এনামুল সিদ্দিক পরে বুঝিয়ে আনোয়ার সিদ্দিককে গাড়িতে বসায়। আহসান গাড়িতে উঠে মাঝে বসে। ওর পাশে অনি বসে। ড্রাইভারের সাথে আহান বসে।
আহসান আদৃতকে বলে, “মাথা ঠান্ডা কর।”
আদৃত তেজ দেখিয়ে বলে, “তোমার বিয়ে করার জন্য এত তাড়া থাকলে চলে যেতে। তোমার চাচাকে আমার জন্য অপেক্ষা করতে বলেছে কে? আমি বলেছি আমি না আসা অব্দি অপেক্ষা করো? মরে যাচ্ছি না আমি কারো বিয়ে খেতে।”
“আমার বিয়ে করার জন্য তাড়া নেই। দেরী হচ্ছিলো বিধায় বড় চাচ্চু চিল্লাচিল্লি করেছে।”
আদৃত পকেট থকে এয়ারপড বের করে। বিড়বিড়িয়ে বলে, “একবার দেশ ছাড়তে পারলে আমি জীবনেও আসতাম না এই টক্সিকদের মাঝে। অসহ্যকর।”
আহান মাথা বাঁকিয়ে ডাক দেয়, “আদি?”
আদৃতের মেজাজ অসম্ভব খারাপ। চৌদ্দ গোষ্ঠীর সামনে ওকে বকেছে, ওর ভীষণ গায়ে লেগেছে। “তুমি তো কথাই না বলো। বিদেশে আছো, দুই তিন বছর পর পর আসবে, তাই এখন গাইল্লানি শুনতে মজাই লাগবে। আমার মতো বারো মাস শুনলে ভালো লাগতো না।”
আহান কথা বাড়ালো না। তিন্নিকে মেসেজ দিলো। কানাডায় এখন রাত। তিন্নি রাতের খাবার রান্না করছে সেই ভিডিও পাঠালো। আহান দেশে একাই এসেছে। তিন্নিকে আনেনি। তিন্নি এখন দেশে আসলে ওর কানাডার সিটিজেন হতে আরো সময় লাগবে তাই। আহান আদৃতের দিকে তাকালো। এই ছেলে এটা নিয়ে আগামী একমাস কাহিনি করবে।
আহসান আদৃতকে ফের ডাক দিলো। “আদি?”
“সমস্যা কি তোমার?”
“বকা তো অনিও খেয়েছে। ও কি তোর মতো করছে?”
“ওর গায়ে চামড়া আছে যে ওর গায়ে লাগবে?”
অনিরুদ্ধ আদৃতের দিকে তাকিয়ে বলে, “আমার গায়ে চামড়া আছে। সাদা ফকফকে চামড়া আছে। কেটে গেলে আবার লাল টকটকে রক্ত বের হয়।”
আদৃত হাত বাড়িয়ে আহসানকে ডিঙিয়ে অনির মাথায় জোরে থাপ্পড় মারে। অনি মাথা ঘষে বলে, “আজব! তুমি বড় চাচ্চুর রাগ আমার উপর মিটাচ্ছো কেনো?”
“আরেকটা কথা বললে তোকে আলামগীর সিদ্দিকের কবরের উপর কবর দিয়ে দিবো।”
অনি কথা বাড়ালো না। পকেট থেকে মোবাইল বের করে ওর তথাকথিত বান্ধবীদের সাথে চ্যাটিংয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আহসান আর তেলায় না। নিজের ভাবনায় মত্ত হয়ে পড়ে। ওর কেনা লেহেঙ্গা পড়ে ফারিনকে না জানি কতটা সুন্দর লাগছে। আচ্ছা মেয়েটা সাজবে তো একটু? ওর বিয়ে, একটু তো সাজা উচিত। অবশ্য না সাজলেও খারাপ লাগবে না। ফারিন এমনিতেই অমায়িক। রাস্তায় ভীষণ জ্যাম। আহসানের নিজের ভাগ্যের উপর এবার রাগ হলো। ফারিনকে দেখার জন্য রীতিমতো ও তড়পাচ্ছে আর এদিকে? একবার ভাইয়েরা আসতে দেরী করে, আরেকদিকে রাস্তায় জ্যাম। অসহ্য লাগছে আহসানের। সিটে মাথা এলিয়ে দেয়।
__________________
বিয়ে পড়ানো শেষ। আহসান ফারিনকে দেখেনি এখনও। মেয়েটা কবুল বলতে প্রায় ঘন্টাখানেক সময় নিয়েছে। ইচ্ছে করেই কবুল বলছিলো না। আহসান সেকেন্ডর মাঝে কবুল বলে দেয়। তবে কবুল বলার কায়দা দেখে আশেপাশের কেউ বুঝলো না ওর মধ্যে বিয়েটা দ্রুত হওয়ার জন্য কোনো তাড়াহুড়ো ছিল।
আহসান ফারিনের মাঝে ফুলের পর্দা। আহসানের ফুফাতো ভাই রিজভী পাশ থেকে আহসানকে তাড়া দেয় ওপাশে গিয়ে ফারিনের ঘোমটা তোলার জন্য। আহসান এটার অপেক্ষায়ই ছিল। আহসান ফুলের পর্দা সরালো। ফারিনের মাথা নোয়ানো। আহসান ফারিনের ঘোমটা তুললো। আহসান কয়েক সেকেন্ড ধরে ফারিনের দিকে তাকিয়ে রইলো। না মেয়েটা সেজেছে। মনে মনে প্রশান্তি অনুভব করে। এতো সুন্দর বউ ওর! বিয়ের সাজে ফারিনকে মারাত্মক লাগছে। না, না আহসানের বউ হয়ে, আহসানের পছন্দে কেনা প্রতিটা জিনিস পড়ে ফারিনকে মারাত্মক লাগছে।
আহসানের বুক ধুকধুক করছে। সামনে বড়, ছোট কারো হুশ নেই ওর। ফুলের পর্দা ভেদ করে ফারিনের দিকে এগিয়ে গিয়ে ফারিনের টিকলির উপর ধীরে অধর ছোঁয়ালো। ফারিন বিড়বিড় করে বলে,
“ফালতু লোক।”
আহসান শুনে। ফারিনের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসে। ফারিন চোখ সরিয়ে নেয়। আহসান সরে আসে। ভাবে এভাবেই ফারিনকে এতটা মারাত্মক লাগছে, হাসলে না জানি কতটা সুন্দর লাগতো! আহসান সরে এলো। ওদেরকে স্টেজে নিয়ে বসানো হলো। ফটোশুট করা হলো। আহসানের বড্ড আফসোস হচ্ছে ইসস মেয়েটা হাসলে কি দারুণ দারুণ সব ছবি উঠতো। আহসান বউসহ ছবিতে আলহামদুলিল্লাহ লিখে প্রোফাইল পিকচার দিতো। মেয়েটা সব ইচ্ছা মেরে দিচ্ছে।
আদৃত খাওয়া শেষ করে চেয়ার টেনে বসে। ফারিনের খালাতো বোন পুষ্প আদৃতের আশেপাশে বেশ কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করলো। পুষ্পকে ওর বাকি কাজিনগুলো খোঁচাচ্ছে আদৃতের সাথে গিয়ে কথা বলার জন্য। শেষমেশ পুষ্প আদৃতের পাশে বসে। আদৃত মোবাইলে মুখ গুঁজে ছিল। পুষ্প গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
“হাই?”
আদৃত মোবাইলের দিক থেকে চোখ সরিয়ে পুষ্পর দিকে তাকায়। আবার চোখ সরিয়ে নেয়। পুষ্প নিজ থেকেই বলে,
“আমি পুষ্প মেহেজাবিন। ফারিনের খালাতো বোন।”
“ওহ।”
খুবই ছোট উত্তর। পুষ্প আশাহত হলো। পুষ্প তাও বলে,
“আপনার নাম?”
“শাহফায়েত সিদ্দিক।”
“আপনার নাম্বার দেওয়া যাবে?”
“নো।” কাটকাট গলায় বলে।
“আপনার কি গার্লফ্রেন্ড আছে?”
আদৃত চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। পুষ্প বলে,
“আই মিন সিঙ্গেল নাকি আছে কেউ? নাকি বিবাহিত?”
আদৃত উঠে চলে গেল। যাওয়ার আগে অবশ্য বললো,
“ঠিক সময় বিয়ে হলে আমার তোমার বয়সী একটা মেয়ে থাকতো। রাবিশ।”
পুষ্প হিসেব মেলাতে পারছে না। ওর বয়স তো বিশ। তবে আদৃতের বয়স কত? দেখলে তো মনে হয় ত্রিশও পার হয়নি। আদৃত স্টেজে উঠে ফারিনের কাছে গেল। ফারিনকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“আপনার খালাতো বোনের সমস্যা কি?”
ফারিন অবাক হয়ে তাকায়। আহসান বলে, “কি হয়েছে?”
“ভাবির খালাতো বোন নাম্বার চায় আমার। মেয়ে মানুষ এমন হয় কি করে?”
ফারিনের রাগ হলো। ক্যারেক্টারলেস মহিলার ক্যারেক্টারলেস বোনের মেয়ে। ফারিন শক্ত গলায় বলে,
“আমার কোনো খালাতো বোন নেই। যেই বলেছে মিথ্যা কথা বলেছে।”
আদৃত আহসানকে বলে, “দেখেছো অবস্থা?”
আহসান বলে, “বাদ দে। খেয়েছিস?”
“হুম। তোমাদের একটু পর নিয়ে যাবে।”
“আচ্ছা।”
আহসান উঠে আদৃতকে স্টেজের একপাশে নিয়ে গেল। আদৃতকে ফিসফিসিয়ে কিছু বলে ফের ফারিনের পাশে বসলো। আহসান বসতেই ফারিন ওপাশে আরেকটু চেপে বসে। ফারিনের হাত সোফার উপর ছিল। আহসান ফারিনের হাতের উপর হাত রাখে। ফারিন প্রথমে ভদ্রভাবে ছাড়াতে চায়। কিন্তু পারে না, আহসান ছাড়ে না। ফারিন পরমুহুর্তে নখ দাবিয়ে দেয়। আহসান হাত ঝেড়ে হাত ছাড়িয়ে নেয়। বাম হাতের উপর নববধূর খামচির দিকে তাকিয়ে থাকে।
আহসান হাত ঝাড়ছিলো। তখনই ফারিনের বাবা রশিদ আলম ওদের নিয়ে খাওয়ার জায়গায় নিয়ে গেল। কাজিন সবার জোরাজোরিতে আহসান ফারিনকে খাইয়ে দিলো। তবে আহসান যতবার ফারিনকে খাইয়ে দিয়েছে ফারিন ততবার আহসানের আঙুলে কামড় দিয়েছে। আহসানকেও তো ফারিন খাইয়ে দিয়েছে, আহসান তো ওভাবে কামড়ায়নি? আহসান না পারে সবার সামনে কিছু বলতে, না পারে ফারিনকে থামাতে। খাওয়া শেষ হতেই আঙুলের দিকে তাকায়। জ্বলছে রীতিমতো।
____________________
বিয়ে বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে সিদ্দিক নিবাসে আসার পথে ওরা সাংঘাতিক জ্যামের সম্মুখীন হয়েছে। ফিরতে ফিরতে রাত নয়টা বেজে গিয়েছে। জেসমিন, শিরিনা বিয়েতে যায়নি। জেসমিন তো সরাসরি বউকে দেখে রীতিমতো মুগ্ধ। জেসমিনের যে মেয়ের কি শখ ছিল তা বলে বোঝানো যাবে না। জেসমিন হাতে তুলে ফারিনকে খাইয়ে দিয়েছে। কিন্তু ফারিন খুব বেশি খায়নি। জেসমিন ভেবে নেয় লজ্জায়। বড় বউয়ের জন্য কেনা সব উপহার ফারিনকে দেয়। ফারিন হাসেও না, কিছু বলেও না৷ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে যে যা দেয় নেয়, যে যা বলে কাঠের পুতুলের মতো উত্তর দেয়। আয়েশা খাতুন ফারিনকে কিছুক্ষণ খুঁচিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু মজা পাননি কথা বলে।
সাড়ে এগারোটা বাজে। ফারিন বিয়ের লেহেঙ্গা পড়াই। আহসানের মামাতো ভাইয়ের বউ ফারিনকে নিয়ে আহসানের ঘরের সামনে গেলে অনিরুদ্ধ পথ আটকে দাঁড়ায়। অনিরুদ্ধর কথা আহসান ফারিনকে কোলে নিয়ে ঘরে ঢুকবে। ফারিনের এত রাগ উঠছিল, ও পারে না অনিরুদ্ধর কান বরাবর থাপ্পড় দিতে। আহসান আসে তখন। সাথে আদৃত, আহান।
“কি?”
“তুমি ভাবিকে কোলে নিয়ে রুমে ঢোকো। নাহলে ঢুকতে দিবো না।”
আহসান চোখ রাঙিয়ে বলে, “বড়দের সামনে এইসব কি?”
“বড় কে? বড় ভাইয়া আর ভাবি। আমাদের জেনারেশন ব্রো।”
আহসান চোখ রাঙায়। অনি দরজা ধরে দাঁড়িয়ে ধরে,
“কোলে না নিলে ঢুকতে দিবো না। তোমার থেকে তো টাকাও চাচ্ছি না ভাইয়া।”
“মার খাস না?”
“আমি ঘরে গেলাম। আদি তুইও আয়।” আহান নিজের ঘরে চলে গেল। আদৃতও আহানের পিছন পিছন যায়। আহসান ফের বলে,
“পথ ছাড় অনি।”
“ভাবিকে কোলে নিয়ে ঘরো ঢুকতে হবে।”
আহসান অনির কান টেনে ধরে। অনি কান ছাড়িয়ে বলে, “লাভ নেই।”
আহসান অনির হাতে ঠাস ঠাস করে দুটো থাপ্পড় মারলে অনি গো ধরে বলে, “ছাড়বো না দরজা।”
আহসান তপ্ত হাসে ফেলে। আহসান ফারিনকে বলে,
“কিছু করার নেই।”
ঝুঁকে ফারিনকে কোলে তুলে নেয়। অনি পথ ছেড়ে দাঁড়ায়। রাহিমের বউ বলে,
“একটা ছবি তুলে এভাবে।”
আহসান হেসে বলে, “শিওর।”
রাহিমের বউ ছবি তুললো। আহসান ফারিনকে কোলে নিয়ে রুমে গেল। ফারিনকে খাটে বসানো মাত্র ফারিন ধাক্কা দিয়ে আহসানকে সরিয়ে দেয়। রাহিমের বউ ঘরে ঢুকতেই আহসান বাঁকা হেসে রুম থেকে বের হয়ে যায়।
অনিকে বগলদাবা করে পকেট থেকে দুই হাজার টাকা দেয়। “নে তোর বকশিস।”
অনিরুদ্ধ টাকা পকেটে ঢুকিয়ে বলে, “তখন ওভাবে মারলে কেনো? আমাকে তো তুমিই শিখিয়ে দিয়েছো কোলে নেওয়ার কথা বলতে। সবার সামনে মেরে ভাব নিলে না?”
“না, তোকে বাঁচিয়েছি। আম্মু তোর দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে ছিল। আমি যদি না থাপ্পড় দিতাম তাহলে আম্মু তোকে ঘরে নিয়ে উত্তমমধ্যম দিতো। আমি হালকার উপর ঝাপসা মেরে তোকে বাঁচিয়েছি।”
“আম্মু কোথা থেকে আসলো? আম্মু দেখবে কি করে?”
জেসমিন তো ত্রিসীমানায় ছিল না। আহসান মনে মনে হাসে। অনির সাথে এই প্ল্যান না করলে আজকে ফারিনকে কোলে নেওয়ার শখ শখই থেকে যেতো। অনির চুল ঠিক করে দিয়ে মুখ মাসুমের মতো করে বলে, “নাহলে তোকে মেরেছি কেনো? আমিই তো শিখিয়ে দিয়েছিলাম না? আম্মু সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।”
অনি মাথা দোলায়। আহসান আরো পাঁচশো টাকা দিয়ে বলে, “নেন ধর। কালকে আরো দিবো। যা ইচ্ছা খাস৷ শুধু আমি যা শিখিয়ে দিবো তা করিস আর কাউকে কিছু বলিস না।”
অনিরুদ্ধ আড়াই হাজার টাকা ইনকাম হওয়ায় বেশ খুশি। “ওকে বস।”
“যা এবার।”
অনিরুদ্ধ আহানের রুমের দিকে যায়। রাহিমের বউ বের হতেই আহসান ঘরে ঢুকে। মনে মনে হেসে দরজা লাগায়। ফারিন খাটের মাঝে বসা, মাথায় ঘোমটা দিয়ে। আহসান বন্ধ দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। লম্বা একটা শ্বাস ফেলে বলে,
“ইতনা সুকুন!”
ফারিন নড়েচড়ে বসে। ও ঘোমটার আড়াল থেকে দেখছে বেহায়া লোকটা ওকে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। ফারিনের অস্বস্তি হচ্ছে। আহসান এক পা দুই পা করে এগিয়ে গেল। ফারিনের সামনে গিয়ে বসে। ফারিন আরো গুটিয়ে যায়। আহসান ধীর হাতে ঘোমটা তোলে। ফারিন ওর পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের পাতা পিটপিট করছে। আহসান এক কাত হয়ে শুয়ে পড়ে। কনুইয়ে ভর দিয়ে গালে হাত রেখে ফারিনের দিকে তাকিয়েই থাকে।
ফারিনের ভীষণ অস্বস্তিবোধ হচ্ছে। লেহেঙ্গা খামচে ধরে। ঢোক গিলে দুবার। একবার আহসানের দিকে তাকায়। আহসান নিলজ্জের মতো পূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকিয়ে আছে আর মিটিমিটি হাসছে। ফারিন চোখ সরিয়ে নেয়। ফারিনের কানে একটা গান বাজছে, “mera chain vain sab ujda, jaalim nazar hata le…”
আহসান হাসলো। উঠে বসে। শেরওয়ানির পকেট থেকে এক জোড়া নূপুর বের করে। ফারিনের পায়ের দিকে হাত বাড়ালে ফারিন পা গুটিয়ে ফেলে। লেহেঙ্গা দিয়ে পা ঢেকে ফেলে। আহসান উঠে চেকবই নিয়ে এলো। একটা চেক লিখে ফারিনের দিকে এগিয়ে দিলো।
“তোমার মোহরানা।”
ফারিন নিলো না। আহসান জোর করে ওর হাতে দিলো। ফারিন কাগজটা দলা পাকিয়ে ফেলে দিলো। আহসান গায়ে মাখলো না বিষয়টা। ফারিনের পায়ে উপর থেকে লেহেঙ্গা সরিয়ে নূপুর পড়াতে নিলে ফারিন বাঁধা দেয়। আহসান জোর করে ডান পায়ে নূপুর পড়িয়ে দেয়।
ফারিন রেগে বলে, “গায়ে হাত দিচ্ছেন কেনো?”
“মোহরানা শোধ হয়ে গায়ে হাত দিয়েছি।”
“আপনার মোহরানা গ্রহণ করিনি আমি।”
“আমি তো শোধ করেছি। তুমি তারপর সেই টাকা দিয়ে কি করবে তা আমি কি করে বলবো?”
আরেক পায়েও নূপুর পড়িয়ে দিলো। ফারিন আহসানের হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দেয়। পা দুটো ফের লেহেঙ্গার আড়ালে নিয়ে বলে,
“বিয়ে করে কিনে নিয়েছেন?”
“না, বিয়ে করে বউ বানিয়েছি।”
“আপনাকে বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল না আপনি জানতেন না?”
“জানতাম।”
“আমার সৌন্দর্যের জন্য বিয়ে করেছেন?”
নির্লিপ্ত গলায় আহসান বলে, “জ্বি।”
“সৌন্দর্য সবসময় থাকে না।”
“জ্বি জানি। আপনার সৌন্দর্য বিলীন হতে হতে আমার আশি বছর হয়ে যাবে। তখন আর অন্য কারো দিকে চোখ যাবে না।”
“যে সম্পর্ক কেবল সৌন্দর্য দেখে হয় সেই সম্পর্কে ফাটল ধরতে বেশিদিন লাগে না।”
“অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ সৌন্দর্য দেখেই হয়। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে মন বোঝাবুঝি চলে না। এটাই হার্স রিয়েলিটি।”
ফারিন রেগে বিছানা থেকে নামতে নিলে আহসান ফারিনের হাত টেনে ধরে। চোখে চোখ রেখে বলে,
“তোমার রিলেশন ছিল না। খোঁজ খবর নিয়েছি আমি। তোমার রিলেশন থাকলে আমিই তোমাকে বিয়ে করতাম না। এখন বলো আমাকে বিয়ে করতে চাওনি কেনো? এখনও এমন করছো কেনো?”
“দুদিন পর আরেক মহিলার আঁচল ধরে যখন ঘুরবে তখন নিজেকে প্রশ্ন করো কেনো আমাকে বিয়ে করে আমার জীবনকে নষ্ট করেছো।”
“বিয়ে করেছি তোমাকে, আঁচল ধরে ঘুরলেও তোমার আঁচল ধরে ঘুরবো। আরেকজনের আঁচল ধরে ঘুরবো কেনো?”
“পুরুষ মানুষ, বাইরে চোখ আটকাবে না? প্রেমিকাকে বিয়ে করে ঘরে তুলতে মন চাইবে না?”
“আমার প্রেমিকা নেই।”
“বিশ্বাস করি না।”
“সেটা তোমার ব্যাপার।”
ফারিন চোখ বন্ধ করে বড় করে শ্বাস ফেলে।
“ছাড়ো আমাকে।”
আহসান এবার ফারিনের কোমরে হাত রাখে।
“ছাড়তে বিয়ে করেছি?”
“ছাড়ো।”
“না।”
“ভালো হবে না বলে দিচ্ছি।”
“প্লিজ খারাপ কিছু হোক। একত্রিশ বছর অনেক সাধু হয়ে থেকেছি।”
ফারিন হাত ছাড়াতে চায়। আহসান এক্সট্রিম কাজ করলো। ফারিনের কোমরে হাত রেখে ওকে নিজের সাথে চেপে ধরে। ফারিনের কান্না পেলো। কিন্তু নিজেকে কারো সামনে দুর্বল করবে না ও। আহসান বলে,
“ছাড়াতে পারলে ছেড়ে দিবো। প্রমিস।”
“আমাকে বিয়ে করেছো কেনো? এইসব নষ্টামি করতে? জোর করে স্পর্শ করতে?”
আহসান নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে, “উহু, তোমাকে বিয়ে করেছি আমার বাচ্চার মা বানানোর জন্য।”
ফারিন রেগেমেগে বলে, “তোমার বাচ্চার মা আমি জীবনেও হবো না।”
“ডান, ছেলেমেয়ে হলে আমার নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখবো।”
“তোমার ছেলেমেয়েকে আমি রাখবো না।”
“কি করবে?”
“পেটে থাকতেই মেরে ফেলবো। ডমিনেট করা ব্যক্তির সন্তান আমি আমার গর্ভে রাখবো না।”
আহসান ফারিনের চুল কানের পিছনে গুঁজে দিলো।
“এইসব বলে না ফারিন।”
“তুমি তোমার বিশ্রি মুখে আমার নাম নিবে না।”
“সবাই বলে আমি নাকি আম্মুর মতো সুন্দর। আর তুমি বলছো বিশ্রি?”
“তোমার স্বভাব চরিত্র ভালো না।”
“তুমি কোনো হাসবেন্ডকে দেখেছো বউয়ের সামনে সাধু হয়ে থাকতে?”
“ছাড়ো।”
“না।”
“আমার বিয়েতে মত ছিল না জানো না? জোর করে স্পর্শ করছো কেনো?”
“মত ছিল না? বিদায়ের সময় তো মা, বাপ, ভাইকে ধরো কাঁদোওনি? ঢ্যাং ঢ্যাং করতে করতে চলে এসেছো। কাঁদলেও না, আবার ন্যাকামি করে বলো বিয়েতে মত ছিল না। মত ছিল না, মনে তো হয়নি।”
ফারিন মনে মনে তাচ্ছিল্যের হাসি আসে। যে না বাবা মা! শক্তি প্রয়োগ করে নিজেকে ছাড়াতে চেয়েও পারে না। শেষমেশ আহসানের বুকে জোরে কামড় দিয়ে আহসানকে ধাক্কা মেরে ওয়াশরুমে চলে যায়। আহসান শেরওয়ানির উপর হাত ঘষে। শেরওয়ানি খুলে ওয়াশরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফারিনকে শুনিয়ে বলে,
“চোর পুলিশ খেলার শখ হয়েছে না? শুধু বের হও ওয়াশরুম থেকে।”
ফারিন এক ঘন্টা পার হলেও বের হয় না। আহসান ফারিনের অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে। ফারিন বের হয় আরো অনেক পরে। আহসান ঘুমে কুপোকাত। ফারিনের ইচ্ছে হলো মুখে বালিশ চেপে খুন করতে। তাও সব ইচ্ছে হলেই পূরণ করা যায় না। ও লাগেজ খুলে পোশাক নেয়। ধীর পায়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। পোশাক পাল্টে এই ভারী লেহেঙ্গা লাগেজের উপর রেখে ধীরে বিছানার অপর প্রান্তে শুয়ে পড়ে। তবে হকচকিয়ে যায় যখন আহসান পিছন থেকে ওকে জড়িয়ে ধরে। ফারিন নিজেকে শক্ত বাহুডোর থেকে ছাড়াতে পারে না। আহসান বাঁকা হেসে বলে,
“এখন কোথায় যাবে সুন্দরী? ভাগ্যিস শব্দ করে ওয়াশরুমের দরজা খুলেছিলে নাহলে তো আমার ঘুমই ভাঙ্গতো না। বাসর রাত ঘুমিয়েই পার করে দিতাম।”
ফারিন আহসানের হাতে কামড়ে দেয়। আহসান তাও ছাড়ে না। ফারিন হাত, পা সব ছুঁড়লেও লাভ হয় না। আহসান ওভাবেই শুয়ে থাকে। ফারিন একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আহসানও ছাড়ে না, ওভাবেই ঘুমিয়ে পড়ে। তবে ফারিন সারারাত সজাগ ছিল, হাতে সেফটিপিনও ছিল। আহসানের হাত এদিক ওদিক উঠলেই পিন ফুটিয়ে দিবে। কিন্তু ফারিনকে হতাশ করে আহসান খুবই ডিসেন্ট ভঙ্গিতে ফারিনের বাম হাতের উপর নিজের ডান হাত রেখে ফারিনকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে ছিল শুধু। ফারিনের আফসোস আহসানের হাতে পিন ফুটানো হলো না।
চলমান…….
(হ্যাপি রিডিং)

