#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_১৬
#সমৃদ্ধি_রিধী
আদৃতের রিসেপশন দিন রাতে আহসান এবং ফারিনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়েছে। তুমুল কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে আহসান ফারিনকে চরম বিতৃষ্ণা এবং একরাশ ঘৃণা নিয়ে বলেছে আহিয়ানের আম্মু না হলে ও অনেক আগেই ফারিনকে ডিভোর্স দিয়ে দিতো। ফারিন এই কথাটা একটুও মানতে পারিনি। সেখানে ও আহসানকে মন থেকে ভালোবাসে, আহসানের এত এত অন্যায়, অবহেলা মুখ বুজে সহ্য করার পরও এই সংসারে টিকে আছে, সেখানে আহসান কি করে পারলো ওকে এমন একটি কথা বলতে? আচ্ছা দুই বছরের এই মান অভিমানে কি আহসানের একটুও ভুল নেই? সব দোষ কি ফারিনের? ফারিন শুরুতে নিজের ইনসিকিউরিটির জন্য বেশি মুখ চালাতো বলেই সব দোষ ওর? ফারিন ফ্লোরে বসে খাটে মাথা রেখে নিজের জীবনের হিসেব কষছিল।
আহিয়ান আহসানের সাথে। ফারিন আনেনি ওকে। ফারিন মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল ও ফাতেমা বেগমের কাছে কালকে সকালে আহসানকে না জানিয়ে চলে যাবে। আহসান যখন ওকে বলেছে ও অযোগ্য মা, নিজের ছেলে খেয়াল রাখতে পারে না তাই ও আহিয়ানকেও নিবে না। আহসান তো যোগ্য বাবা। আহসান তাহলে ছেলেকে রাখুক দুই দিন। আহসান তো ছেলেকে এখন অব্দি দুবেলার জন্যও রাখেনি। তাহলে রাখুক দুই, তিনদিন। সমস্যা কি!
পরদিন সকালে ফারিন সত্যি সত্যিই চলে গেল। আহসানের জন্য রেখে গিয়েছিল একটি চিঠি। আহসান আস্ত অকর্মন্য। ছেলেকে সেভাবে দেখভালই করতে পারে না। আহিয়ানকে খাওয়াতে, ঘুম পাড়াতে, আহিয়ানের পটি পরিষ্কার করতে গিয়ে আহসান প্রথম দিনেই প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে আহসান আহিয়ানের ডাইপার চেঞ্জ করতে গিয়ে বমি সমি করে একাকার কাণ্ড করে ফেলেছিল। আহসান ফারিন এর বন্ধু-বান্ধব সবাইকে কল করেও ফারিনের খবর পায়নি। এমনকি শাওনকে কল করেও খবর নিয়েছে সেখানেও ফারিনকে পায়নি। এমন করে দুইদিন পার হয়ে গেল। আহিয়ানকে না আহসান ঠিক করে খাওয়াতে পারে, না ঘুম পাড়াতে পারে।
একদিকে ফারিনের চিন্তা, অন্যদিকে আহিয়ানকে সামলাতে সামলাতে আহসানের অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছে। ফারিন চলে যাওয়ার দুইদিন পর আহসানের মোবাইলে কল আসে। মহিলাটিকে আহসান চিনতো না, কিন্ত সেই মহিলা নিজেকে পরিচয় দেয় ফারিনের নানি বলে। আহসান দেরি না করে পরদিন সকালে আহিয়ানকে নিয়ে ছুট দেয় সেই বৃদ্ধ মহিলার বাড়ি। ওখানে গিয়ে প্রথম ঝটকা খায় সেই লোকটিকে দেখে যার সাথে ফারিনকে নাইট ক্লাবের সামনে দেখেছিল। জানতে পারে লোকটি ফাতেমা বেগমের ছেলে। ফাতেমা বেগম আহসানকে ফারিনের ছোটবেলার সব কাহিনী খুলে বলে। ফারিনের বড় হওয়া, ফারিনের সৎমার কথা, ফারিনের নিজের মার কথা, তার বাবার অত্যাচারের কথা সবকিছু শোনার পর আহসান স্তব্ধ হয়ে যায়।
আহসান বিশ্বাসই করতে পারছিল না কথাগুলো। ওর কাছে সবটা কেমন ধোঁয়াশার মতো লাগে। ফারিনের ছোটবেলার পরিণতি এতটা খারাপ হলে সেইসব কথা কখনো শেয়ার করেনি কেনো আহসানের সাথে? আহসান যদি জানতো তাহলে কি কখনো সেইসব মানুষদের কথা বিশ্বাস করে ফারিনকে অবিশ্বাস করতো যার জন্য ফারিনের জীবন আজ দুর্বিষহ? আহসানের সকল কালো মেঘ কাটতে শুরু করে। ফারিন কেনো বিয়ের শুরু থেকে এমন করতো, কেনো এমন নেগেটিভিটি পুষতো, কেনো কখনো বাবার বাড়ি যেতে চাইতো না সব আস্তে আস্তে পরিষ্কার হতে শুরু করে। আহসানের মাথায় আসে তাহলে কি তারা মিথ্যা বলেছিল? মিথ্যা কথার উপর ভিত্তি করে আহসানকে দুই বছরের মত সময় নষ্ট করেছিল ভাবনা তার মাথা চিরে ওঠে।
অপরাধবোধের আগুনে আহসান দগ্ধ হয়ে যায়। আহসান ফারিনের কাছে মাফ চায়। আহিয়ানের জন্য হলেও ফিরে যেতে বলে। ফারিনকে মানায়, ফারিন মুখে তো বলে আহসানকে ক্ষমা করেছে কিন্তু তার কাজে সেটি প্রকাশ পায়নি। আহসান ২-৩ বার অনুরোধ করতেই ফারিন আহসানের সাথে উত্তরা চলে আসে। কিন্তু এখানে এসে ছেলের অবস্থা দেখে ফারিন খুব রেগে যায়। অযত্ন করে দুইদিনেই ছেলেটার কি অবস্থা বানিয়ে ফেলেছে। ফারিন অনেকক্ষণ যাবৎ নিজে নিজে বকবক করতে থাকে।
আহসান যে দাবি করে ও খুব ভালো বাবা, ছেলের খেয়াল নিজেই রাখতে পারবে এইসব বলে আহসানকে ব্যঙ্গ করতে থাকে। আহসান কিছু বলে না। ফারিনের চোখে চোখ রাখতে পারে না। মা, ছেলে বরাবরের মতো পাশের ঘরে চলে গেলে রাতের আঁধারে ও দুই বছরের হিসাব কষতে থাকে। কোন কথার ভিত্তি থেকে কি ঝামেলা শুরু হয়েছিল, জীবনের দুই বছর কিভাবে চলে গেল, কিভাবে আহিয়ানের জন্মের প্রতুটা মুহুর্ত অহেতুক রাগ জেদে হারিয়েছে সব ভাবনা ওকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।
ফারিন আহসানের সাথে কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে। আহসানকে এতো গ্লানির আগুনে দগ্ধ হতে দেখে ও খুব আনন্দ পাচ্ছে। আহসানের বোঝা উচিত অপরের কথায় কান দিয়ে আপনের কথা না শুনলে ঠিক কি পরিণতি হয়। ফারিন ছেলেকে নিয়ে নিজের মতো থাকছে। মাঝে দুইদিন পার হয়ে গিয়েছে।
ফারিন শ্রেষ্ঠ বাবা দাবি করা আহসানের কাছে আহিয়ানকে রেখে গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু আহসান আহিয়ানের খেয়াল একটুও রাখতে পারিনি। জ্বর না আসলেও দুদিন আহিয়ানের গা খুব গরম ছিল। ফারিন এই দুদিন ছেলের পিছনে, ছেলের আধোঁয়া কাঁথাকাপড় ধুয়ে, আহিয়ানের জন্য কিছু শপিং করে, এগুলার পিছনে সময় পার করেছে। এতসবের মাঝে আহসানের সাথে তেমনভাবে কথা হয়ে ওঠেনি। আহসান ফারিনের সাথে অনেকবার কথা বলতে এসেছে, কিন্তু ফারিনই একপ্রকার আহসানকে এড়িয়ে গিয়েছে। আহসানকে পাত্তা না দিয়ে ও পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছে।
সময় রাত আড়াইটার বেশি। ফারিন মাত্র আহিয়ানকে ঘুম পাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো। আড়মোড়া ভেঙ্গে ওয়াশরুমে চলে যায়। চোখ মুখে পানি ছিটিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হতেই দেখে খাটের উপরে আহিয়ানের পাশে আহসান বুকে হাত গুজে বসে আছে। ফারিন এক পলক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিছানা একপ্রান্তে এসে বসে, আহসানের থেকে অনেকটা দূরত্ব বজায় রেখে। আহসান ফারিনের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকায়। ফারিন পাশ থেকে ওড়না টেনে নিয়ে মুখ মুছে নিম্ন গলায় বলে,
“ঘুমাবে না?”
“আমাদের কথা বলা প্রয়োজন।”
“কি কথা বলবে?”
“অনেককিছুই। কোথা থেকে শুরু করা উচিত আমার জানা নেই। আমি শুধু জানি আমাদের কথা বলা দরকার।”
“পুরোনো ইতিহাস ঘেঁটে লাভ নেই। ঘুমিয়ে পড়ো।”
আহসান উঠে দাঁড়ালো। এগিয়ে এসে ফারিন এর হাত টেনে ওই ঘর থেকো বের করে বেডরুমে নিয়ে যায়। ফারিন বিরক্ত হয়ে বলে,
“হচ্ছেটা কি! আহিয়ান ওই ঘরে একা দেখছো না? আমাকে নিয়ে এসেছো কেনো?”
“আমাদের কথা বলা দরকার।”
“সেটা অনেক আগেই দরকার ছিল। তখন বুঝোনি, এখন বুঝে কি হবে? তুমি আগের দুই বছর ফিরিয়ে আনতে পারবে?”
আত্মগ্লানিতে দগ্ধ আহসানকে ফারিন আবারো গ্লানির সাগরে ফেললো। আহসান গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,
“যা হয়ে গিয়েছে তা পরিবর্তন করতে পারবো না। কিন্তু আমরা আগামীটা সুন্দর করতে পারি, তাই না?”
“ভাঙা কাঁচের গ্লাস কে জোড়া লাগাতে পারবে?”
“তা পারবো না। কিন্তু নতুন আরেকটা গ্লাস কিনতেই পারবো।”
“টাকা দিয়ে সব হয়? তোমার কাছে জীবন মানে কি আমি এখনো বুঝতে পারিনি। তুমি আমার সৌন্দর্য দেখে বিয়ে করেছিলে। তুমি আমাকে প্রথম দেখায় ভালোবেসে ফেলেছিলে। কথা শুনে বুকে অবিশ্বাস করো তোমার ভালোবাসার নমুনা ছিল? মানুষের কথায় স্ত্রীকে বিশ্বাস না করা, জীবন থেকে দুই বছর বিনা কারণে নষ্ট করা তোমার ভালোবাসার ধরন?”
আহসান ফারিনকে খাটে বসালো। তারপর হাঁটুর সামনে বসে ওর কোলে মাথা রাখলো। ফারিনের দু হাতের তালুতে চুমু খেয়ে বলে,
“ভুল করেছি আমি। আমার ক্ষমতা নেই সে সময়গুলোকে ফিরিয়ে আনার। কিন্তু আমরা নতুন করে সবটা শুরু করতেই পারি তাই না?”
ফারিন কাঠের পুতুলের ন্যায় বসে রইল। আহসান ফের ফারিন এর হাতের তালুতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে,
“প্লিজ কিছু বলো।”
ফারিন অত্যন্ত উদাসীন গলায় বলে, “তুমি ভুল বুঝেছিলে, বাবা হিসেবে তোমার তৎক্ষনাৎ সে বোঝাটাকে আমি ভুল বলছি না। কিন্তু তোমার উচিত ছিল না আমার কথা শোনা? আমাকে একটা আবার কিছু বলার সুযোগ করে দেওয়া?”
আহসান চুপ করে রইলো। ফারিন ফের একই গলায় বলে, “আমি মানছি আমিও ভুল করেছি। আমি বিয়ের প্রথম প্রথম অনেক বেশি কথা বলেছিলাম, কিন্তু পরে তো ঠিক হয়ে গিয়েছিলাম না? তোমার সাথে আমি কয়দিনই বা ওগুলা বলেছি? সর্বোচ্চ একমাস? আচ্ছা সর্বোচ্চ দুই মাস বলেছিলাম? তারপর কি আর বলেছিলাম? তোমার কি এতোটুকু বোঝা উচিত ছিল না যে মেয়েটাকে তুমি হাসিখুশি রেখে গিয়েছিলে সে কেন তোমার অনুপস্থিতিতে এগুলা করবে? তোমার চোখে আমি দোষী ছিলাম মানছি। তোমার উচিত ছিল না তোমার দোষীর মুখে সবকিছু শোনার, জানার? সেদিন কি হয়েছিল তা নিয়ে জানতে মন চায়নি?”
“নার্সগুলোও তো বলেছিল।”
“আমার গর্ভের ফিটাসের বয়স ছিল সাত সপ্তাহ। আর যে ইচ্ছাকৃত মেরেছে তার ছিল পাঁচ সপ্তাহ। জেনে বুঝেই ঝামেলা করতে নাহয়!”
“ভুল করেছি।”
“ভুলের মাশুল তাই বলে দুই বছর ধরে দিলাম আহসান? মাঝের এই দুই বছর আমার জীবনে কি কি হয়েছে তুমি সেই হিসেবে নিবে? শুনবে সেসব দিনের কাহিনি?”
আহসান চুপ করে থাকে। ফারিন এর গলার স্বর বাড়ে, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বাড়ে, আহসানের চোখে চোখ রেখে বলে,
“তোমার মা আছে, তোমার বাবা আছে। আদৃত ভাইয়ের মতো ভাই আছে, যার কাছে তুমি সব বলতে পারো। কিন্তু আমার কেউ ছিল না। মিসক্যারেজের পরের ওই হার্ড টাইমটা আমি একা একা পার করেছি। তুমি দিনশেষে বাজার করে পাঠিয়ে দিয়েছো। টাকা পাঠিয়ে দিয়েছো। আমি তোমার আশ্রিতা ছিলাম? ওটা আমার জীবন ছিল না। আমার মেন্টাল সাপোর্টের প্রয়োজন ছিল। তোমার সাপোর্টের প্রয়োজন ছিল। তুমি হাজবেন্ড হিসেবে দিয়েছিলে আমাকে সেই সাপোর্ট? দাওনি।
কিছুক্ষণ আগেও বললাম বিয়ের প্রথম আমি অনেক, অনেক উল্টাপাল্টা কথা বলেছি আমি মানছি। কিন্তু পরে আমার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করোনি তুমি? একটুও মনে হয়নি তোমার সংসারের প্রতি আমি আগ্রহী? তোমার প্রতি আগ্রহী? ওই মহিলা এমন কি বলেছিল যার জন্য তোমার আমার প্রতি এত ঘৃণা, বিতৃষ্ণা, জন্মেছিল?”
“তুমি যা বলতে ওগুলোই শুনিয়েছিল। যার জন্য আমি বিশ্বাস করেছি।”
ফারিন মুখ খোলার আগে আহসান ফারিন এর চোখে চোখ রেখে বলে,
“কাকতালীয়ভাবে এতটা মিল কি করে হতে পারে ফারিন? তোমার বলা কথার সাথে তোমার সৎমার বলা প্রতিটা কথা কিভাবে হুবহু মিলতে পারে আমাকে সেটা বোঝাও।”
ফারিনের কাছে কোনো উত্তর নেই। আহসান বলে,
“তুমি যদি আগে আমাকে ওনাদের সম্পর্কে বলতে তাহলে এত কিছু হতোই না। সব সময় ব্যক্তিগত, ব্যক্তিগত বলে এড়িয়ে গিয়েছো। তুমি মহিলা মানুষ তোমার ব্যক্তিগত অনেক কিছুই থাকবে। আমি তোমার হাজব্যান্ড হলেও তোমার নিজস্ব বাউন্ডারির ভিতরে ঢুকতে পারি না। তোমার একটা পার্সোনাল স্পেস রয়েছে মনে করে আমি কখনো সেখানে ইন্টারফেয়ার করিনি। আমি যদি তোমাকে জোর করতাম তাহলে হয়তো তুমি আমাকে সবটা বলতে। তোমার সাথে এত কিছু হয়েছে জানলে আমি অবশ্যই ওদেরকে বিশ্বাস করতাম না। উনি তোমার সৎ মা, এটা যদি আমি জানতাম তাহলে আমি কেন ওনার কথা বিশ্বাস করতাম বলো? কোন মা কি কখনো নিজের মেয়েকে নিয়ে এভাবে মিথ্যা কথা বলতে পারে?”
ফারিন ঢোক গিলে বলে, “বাদ দাও সেসব কথা। ভাগ্যে ছিল এইসব।”
আহসান এর দুই হাত ধরে বলে, “আমরা আবার শুরু করতে পারি ফারিন। একদম শুরু থেকে, আমাদের ছেলেকে নিয়ে। মানতে পারছি না আর এইসব। আমি আত্মগ্লানিতে মরে যাচ্ছি।”
ফারিন চাপা শ্বাস ফেলে। আহসান আকুতি করে বলে,
“আমি চাইলেও দুই বছর ফেরাতে পারবো না কথাটা সত্যি৷ কিন্তু সবটা আবার নতুন করে শুরু করতে চাই। আহিয়ানকে নিয়ে।”
“মাঝের দুই বছরে মিসক্যারেজের ধকল সামলেছিলাম। কিন্তু পুরো প্রেগনেন্সি টাইমে আমার কত কষ্ট হয়েছে সেই খবর নিয়েছিলে? আমি ভুলে যাব একা রাতে কতটা ছটফট করেছি সেইসব? মাঝে মাঝে দম বন্ধ হয়ে আসতো। হাতের কাছে ইনহেলার পেতাম না। জানো আমার সেই সময় কত কষ্ট হতো? প্রেগন্যান্সির সময়ও কত কষ্ট হয়েছে জানো? তখন কোথায় ছিলে? একটা ভুল বোঝাবুঝি ছিল মানছি, কিন্তু আমি তোমার সন্তানই গর্ভে রেখে এত কষ্ট করেছি। দিনশেষে প্রতিদিন কেমন আছো জিজ্ঞাসা করতে। আর কি করেছো? এখন এসে সবকিছু নতুন করে শুরু করি, নতুন করে শুরু করি– এই বুলি আওড়াচ্ছো। এগুলা পারবো আমি ভুলতে?”
“ভোলার চেষ্টা করতে পারো। আমিও হ্যাপি মোমেন্ট ক্রিয়েট করে ভোলানোর চেষ্টা করতে পারি। তোমার কষ্ট হয়েছে জানি, আমিও কম কষ্ট পাইনি। আহিয়ানের ধীরে ধীরে বড় হওয়া আমি অনুভব করতে পারিনি। আমার কি সেই বিষয়ে কোনো আক্ষেপ নেই?”
“সে আক্ষেপ নিয়েই দিন কাটিয়ে দাও।”
“আমরা কি এই ভিত্তিহীন মান অভিমান নিয়েই পড়ে থাকবো? আমাদের জীবনে এগোতে হবে না? আহিয়ানকে সুস্থ পরিবেশে মানুষ করতে হবে না?”
“নানী তোমাকে ওগুলো না বললে তোমার মাথায় আসতো আহিয়ানকে সুস্থ পরিবেশে বড় করার কথাটা? আসতো না। তুমি তোমার রাগ জেদ নিয়েই থাকতে। এতদিন যেভাবে ছিল সেভাবেই থাকতে।”
“আমি তো বলেছিই আমরা আর আগের ঘটে যাওয়া ভুলগুলো সব ঠিক করতে পারবো না ঠিকই, কিন্তু আমাদের সবটা নতুন করে শুরু করা উচিত। এই একটা ভুল নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিবো? আর কত?”
ফারিন উঠে গেল। আহসান ফারিনের হাত টেনে ধরে। নিজের সাথে জাপ্টে ধরে রাখে। ফারিনের গালে হাত দিয়ে বলে, “কিছু বলো?”
“কিছু বলার নেই। এখন বলে লাভও নেই।”
আহসান ফারিনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,
“তুমি কি মিন করতে চাচ্ছো তুমি আর আমার সাথে সবটা আগের মতো শুরু করতে পারবে না?”
“না।”
“তুমি আমাকে আর ভালোবাসো না?”
“এত কিছুর পরও ভালোবাসার দাবি করছো?”
আহসান ফারিনকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। “ফারিন প্লিজ।”
“ঝামেলার শুরুর দিকে আমি যখন তোমাকে সব বলার জন্য তোমার পিছন পিছন ঘুরতাম, তোমার এত রাগ কেনো তা খোঁজার চেষ্টা করতাম, তোমার সাথে সামনাসামনি কথা বলতে চাইতাম, তখন তুমি আমাকে পাত্তা দিয়েছিলে? বোঝার চেষ্টা করেছিলে আমার কথা? করোনি। তাহলে আমি কেন এখন তোমার আকুল আবেদন শুনবো?”
“আমরা হাজব্যান্ড ওয়াইফ। একজন না একজনকে মাথা নত করতেই হবে। এতে মান, অপমানের কিছু নেই। আমাদের দুজনেরই এত ইগো যে আমাদের মধ্যে বিগত দুই বছর ধরে একটা প্রতিশোধ স্পৃহা কাজ করেছে। এই প্রতিশোধ স্পৃহা এখনো থাকলে আমরা জীবনে কিছু করতে পারবো?”
“তো তুমি মাথা নত করতে? করতে না। আমাকেই কেনো করতে হবে?”
আহসান ফারিনকে ছেড়ে দিল। দুই কদম পিছিয়ে গিয়ে বলে,
“একটা ভুল করেছি এর মাসুল আজীবন দিব?”
“সেই একই ভুল আমি করলে তুমি ক্ষমা করতে? করতে না।”
“তোমার কি সবটা শুরু করার কোন ইচ্ছা নেই? দু’জনেই ইগো ধরে রেখে সুস্থ সম্পর্ক নষ্ট করেছি, এখনও তাই করবো? ভবিষ্যতেও তাই করবো?”
ফারিন মুখ ঘুরিয়ে নিল। আহসান দরজার থেকে আঙুল তাক করে বলে, “আমি জোর করব না। তুমি তোমার মত থাকতে পারো। আমার একটা চরম ভুল ছিল তোমার খোলাখুলি ভাবে কথা না বলা। এটা ছাড়া আমি আমার দোষ কোথাও দেখি না। তুমি যদি আমার সাথে পুরোপুরি ফ্রি হয়ে যাওয়ার পর, ইভেন সিঙ্গাপুরে যাওয়ার আগে রাতেও উল্টাপাল্টা কথাগুলো না বলতে তাহলে আমি তোমার সৎ মার কথা ওইভাবে বিশ্বাস করতাম না। এই এত বছরের মান অভিমানে আমাদের দুইজনেরই দোষ আছে। এক হাতে কখনোই তালি বাজে না।”
ফারিনের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। সম্পূর্ণটাই রাগে, ক্রোধে। ফারিন আহসানের দিকে এগিয়ে এসে আহসানের গলার শক্ত করে ধরে। ঝাঁকিয়ে বলে,
“তোমার মতো কাপুরুষ আমি আমার জীবনে দুটো দেখিনি। তুমি কি তুমি নিজেও জানো না। আমাকে বিয়ে করেছ কেনো? এইসব সস্তা ইগো দেখানোর জন্য? সিগমা, আলফাম্যান হওয়ার অনেক ইচ্ছা তাই না?”
আহসান ফারিনের ক্রোধিত দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল। ফারিন ফের আহসানের কলার ঝাঁকিয়ে বলে,
“আমি আমার ছেলেকে তোমার মত কাপুরুষ কখনোই বানাবো না। কখনোই না, কখনোই না, কখনোই না। তুমি পুরুষ মানুষ হওয়ার যোগ্যই না।”
আহসান চুপচাপ শুনে গেল। ফারিন আহসানকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিল। আঙুল তাক করে বলে,
“হাজবেন্ডরা তোমার মত ভেড়া হয় না।”
আহসান মাথার নিচে হাত দিয়ে ফারিনের দিকে তাকায়। ফারিন এমন দায়সারা ভাব দেখে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো। আহসানের উপর চড়াও হয়ে আহসানের বুকে দাঁত বসিয়ে দেয়। আহসান মুখ কুচকে ফেলে। ফারিন সহজে ছাড়ে না। আহসানও ব্যথা পেয়েও কিছু বলে না। পারেন আবু স্যারের দিকে থাকে আহসানের চুল টেনে ধরে বলে৷ “তুমি কি কিছু বোঝো না?”
“তুমি যে আমাকে ভালোবাসো সেটা বোঝার কথা বলছো?”
“তোমাকে আমি ভালোবাসি না আহসান। তুমি সে যোগ্যতা হারিয়েছো। আমি আমার ২৪ বছর জীবনে অনেক কষ্ট করেছি, কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু কখনোই আত্মাহত্যার কথা ভাবিনি। তুমি, আমার প্রতি তোমার নিকৃষ্ট ব্যবহার আমাকে সেই কথা ভাবতে বাধ্য করেছে।”
আহসান ফারিনের মাথা বুকে চেপে ধরে। “সুইসাইড করার কথা ভেবেছো?”
“তুমি ভাবতে বাধ্য করেছো।”
“কবে?”
“খুব ভালো হতো সেদিন আমি মরে গেলে। আমি মরার পর সব জানতে পেরে খুব খুব পস্তাতে। তুমি একটা উপযুক্ত শিক্ষা পেতে তখন। বেশ হতো।”
“এখন পস্তাচ্ছিনা বলছো?”
“এখন পস্তালেও আমার দুর্বলতার জন্য তুমি ক্ষমা পাচ্ছো। কিন্তু তখন তোমাকে ক্ষমা করার মতো মানুষটাই থাকতো না। তুমি তো আমাকে হারাতেই, সাথে নিজের সন্তানকেও হারাতে। তখন তুমি বুঝতে কত ধানে কত চাল।”
“শাস্তি দিতে চাও? দাও।”
“নিজের কাছে শাস্তি পাওয়ার থেকে বড় শাস্তি কিছু হয় না আহসান। তুমি নিজেই বুঝতে পারছো নিজের সামান্য ইগোর জন্য তুমি কি কি হারিয়েছো। আমি তোমাকে কি শাস্তি দিব? নিজের অপরাধবোধ থেকে আগে বাঁচো তারপর ভাবা যাবে।”
“আমি তোমাকে ভালবাসি ফারিন। আমার তোমার সাথে কথা না বলার একটাই কারণ, তোমার সাথে অযথা ইগো দেখানোর একটাই কারণ। আমি সবসময় এটাই ভাবতাম আমি যে মেয়েটাকে মন থেকে এতটা, এতটা ভালবাসি সে কি করে আমার এতো ভালোবাসা, এতো যত্নের পরেও আমার সাথে সংসার না করার কথা ভাবতে পারে। কি করে আমার সন্তানকে মেরে ফেলার মত করে নিষ্ঠুর হতে পারে। এর বাইরে আমার তোমাকে নিয়ে অন্য কোন রাগ ছিল না। ওনার বলা প্রতিটা কথা তো হুবুহু তুমি বলতে। তখন মজা মনে হল তোমার সৎমার কথা শুনে ওগুলোকে আর মজা মনে হয়নি। এমন হতো যে আমি তোমার মুখে কখনোই কথাগুলো শুনিনি তাহলে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করতাম, জবাবদিহিতা চাইতাম তুমি এগুলো কেনো বলেছো। তোমার মুখ থেকেই শোনা কথা অক্ষরে অক্ষরে ওনার মুখ থেকে শোনার পর আমি কি করে বিশ্বাস করতাম সেগুলো বানানো হতে পারে? বানানো কথায় এতটা মিল কি করে হয় বলো? আমার আকাশসম রাগ নিয়ে আমি এইসব করেছি কিন্তু বুঝতেই পারিনি আমার এই রাগগুলো এতটা অযৌক্তিক, মিথ্যা, বানোয়াট কথায় হয়েছিল।”
ফারিন চোখ বন্ধ করে নিল। আহসান ফারিং এর চুলের ভাজে হাত গলিয়ে বলে, “এভ্রি কয়েন হ্যাজ টু সাইডস। আমাদের এই এত এত ভুল বোঝাবুঝিও এপিঠ ওপিঠ আছে। তুমি শুধু এক পিঠের হিসেব দেখে, অপর পিঠের হিসেব না দেখে অংক ঠিকঠাকভাবে, সঠিকভাবে মিলাতে পারবেনা। তোমার দৃষ্টিকোণ থেকে তুমি ঠিক, আমার দৃষ্টিকোণ থেকে আমি ঠিক। আমরা পরিস্থিতির স্বীকার। দাঁড়িপাল্লার হিসেবে আমাদের দোষগুণ কম বেশি হলেও আমরা সমান দোষী।”
ফারিন আহসানের বুকে ধাক্কা মেরে উঠে গেল। আহিয়ানের কাছে চলে আসে। আহসানও পিছন পিছন আসে। ঘুমন্ত আহিয়ানকে কোলে তুলে নিলে ফারিন বলে,
“ওকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছো?”
“রুমে। তুমিও আসো।”
“তোমার কি মনে হয় তোমার সাথে আমার সব মিটমাট হয়ে গিয়েছে যে তুমি আমাকে রুমে আসতে বলছো? এতদিন তুমি অন্যরুমে থাকতে পারলে এখন আমিও পারবো।”
“আহিয়ানকে নিয়ে গেলাম।”
“একদম না। আহিয়ান আমার সাথে থাকবে।”
আহসান ফারিনের কথা অগ্রাহ্য করে আহিয়ানকে বেডরুমে রেখে আসলো। ফারিনের সামনে এসে দাঁড়াতেই ফারিন রেগে আহসানের দিকে আঙুল তাক করে বলে,
“তোমার সবকিছু আমি বরদাস্ত করতে পারলেও একটা জিনিস করতে পারছি না আহসান। তুমি আমার আহিয়ানকে বারবার আমার কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছো। তোমার মা ভাই বোন সব আছে। কিন্তু আমার প্রকৃত অর্থে আসিয়ান ছাড়া কেউ নাই। আমাদের মা, ছেলের মাঝখানে একদম ঢুকবে না তুমি। সারা দুনিয়া যখন আমার সাথে ছিল না, যখন তুমি আমার সাথে ছিলে না তখন আমার ছেলে আমার সাথে ছিল। ওর জন্য আমি বেঁচে আছি।সবসময় আমার কাছ থেকে ওকে ছিনিয়ে নিয়ে যাও। পর পর দুই তিনবার তুমি এই কাজটা করেছো। তোমার অহেতুক আধিপত্য আমি সব জায়গায় সহ্য করলেও, আমার ছেলের ক্ষেত্রে করবো না। তুমি যে আমার ছেলের কত ভালো দেখভাল করতে পারবে তা আমি দুইদিনেই বুঝতে পেরেছি।”
আহসান বিনাবাক্য ব্যয়ে ফারিনকে কোলে তুলে নিল। ফারিন হকচকিয়ে যায়। আহসান ফারিনকে বেডরুমে এনে আহিয়ানের পাশে বসিয়ে দিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে লাইট নিভিয়ে দেয়। ডিম লাইট জ্বালিয়ে ফারিনের পাশে উপুড় হয়ে শুয়ে ফারিনের কোলের উপর দিয়ে আহিয়ানের বুকে হাত রাখে। ফারিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ওকে টাচ করতেও তোমার অনুমতি লাগবে?”
“লাগবে। কারণ ও আমার ছেলে। ওকে আমি কষ্ট করে জন্ম দিয়েছি।”
“আহিয়ানের আম্মু আমি কি আহিয়ানকে ছুঁতে পারি?”
ফারিন কাটকাট গলায় বলে, “না।”
“তাহলে আহিয়ানের আম্মুকে ছুঁতে পারি?”
“মিনিমাম লজ্জাটুকু নেই না?”
আহসান আহিয়ানের বুক থেকে হাত সরিয়ে নেয়। মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ফারিন অনেকক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখে। তারপর আহসানের হাত আহিয়ানের বুকে রেখে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। আহসানের দিকে তাকায় না। আহসান একটু পর ফারিনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ফারিন নিজ থেকে আহসানকে জড়িয়ে ধরে না ঠিকই, আবার সরিয়েও দেয় না।
চলমান…….
(হ্যাপি রিডিং…)

